হলে ম্যাক্সম্যুলারের উদ্ধৃতিটি দিয়েই প্রবন্ধটি শুরু করা যাক। তাঁর মতে, “যে জাতি তার অতীত, ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে গর্ববোধ করে না, সে-জাতির কোনো জাতীয় চরিত্রই তৈরি হয় না।” ইতিহাস পাথরের মতো জমাটবদ্ধ কোনো কঠিন বস্তু নয়। প্রতিটি প্রজন্ম তার নিজের মতো করে এটিকে বোঝে, এর প্রতি প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে ও এর নবায়ন করে। তবে এই যে নবায়নপ্রক্রিয়া, তা কিন্তু পুরাতনের শক্ত ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। থাকতে হয়। এই ভিত্তি থেকে সরে গেলে বানোয়াট ইতিহাসের বয়ানের ইমারত যতই চকচকে দেখাক না কেন, তা ভূপাতিত হতে বাধ্য। নিজেদের ‘নিজ’ হয়ে ওঠার তাগিদেই ইতিহাসের নিবিড় পাঠ জরুরি। সর্বোপরি, ইতিহাসের প্রতি আমাদের তো দায় রয়েছে। এ দায় কোন অজুহাতেই কি এড়ানো যায়? নাহ। ২০২৪ সালের সাহিত্যে নোবেলজয়ী হ্যান ক্যাংও এড়ান নি। তাঁর সাহিত্যের গভীর ও কৌতূহলী পাঠ পাঠককে ইতিহাসের অলিতে গলিতে উঁকি দিতে উদ্বুদ্ধ করে। সেটি প্রত্যক্ষ ভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাস হলেও পরোক্ষ ভাবে পাঠকের নিজের ইতিহাসের প্রতিও মনোযোগী হবার প্রেরণা জোগায়।
এ কথা সত্য, ইতিহাস শক্তিশালী। তবে মহাশক্তিশালী বললে ভুল হবে না। এটি রূপকথার ফিনিক্স পাখির মতো। এর পুনর্জন্ম অনিবার্য। এর শক্তিকে অস্বীকার করলে এবং একে বিস্মৃতির অতলে ঠেলে দেয়ার পাঁয়তারা করলে তা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এনেছেও। একবার দু’বার নয়, বারবার। এর দৃষ্টান্ত এই উপমহাদেশেও ভূরি ভূরি বিদ্যমান। ভারতীয়রা ইতিহাস-জ্ঞান-বিচ্যুত হয়েছিল বলেই বারবার বহিরাগতরা তাদের হাত থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছিল। আবার ইতিহাসের সঠিক জ্ঞান ছিল না বলে মুঘলদের হাত থেকে ইংরেজরা এই ভারতবর্ষ ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং প্রায় দু’শো বছর ঔপনিবেশিকতার জোয়াল এখানকার মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিল। আমাদের ইতিহাসের সঠিক জ্ঞানের অভাবের কারণে ভারত ভাগ হয় এবং এরপর থেকে আজও সাম্প্রদায়িকতার ক্ষত প্রায়ই দুর্গন্ধ ছড়াতে চায়। ছড়ায় না যে তা নয়। বারবার বিপ্লব ঘটানো হলেও ইতিহাসের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হলে সেই বিপ্লব বেহাত হয়ে যেতে পারে। হয়েছেও অনেক। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে পৃথিবীর অনেক বড় বড় বিপ্লবের ভাগ্যে ছিনতাই হবার ঘটনা ঘটেছে। বিপ্লব ঘটায় প্রান্তিক, সর্বহারা মানুষ, আর বিপ্লবের পরে ক্ষমতাকাঠামোর কেন্দ্র দখল করে সুবিধাভোগী বুর্জোয়ারা। সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়েছে, বিপ্লব হয়েছে, আপাত ভাবে সামন্ততন্ত্রের পরাজয় হয়েছে বলে প্রতিভাত হয়েছে। কিন্তু তার জায়গায় পুঁজিবাদ এসে যা করেছে ও করছে তা তো আরো ভয়াবহ। ইতিহাসের পরতে পরতে আছে ট্রমা। ইতিহাসের নানান ঘটনা-দুর্ঘটনায় কত-শত মানুষের যে প্রাণ সংশয় হয়; কত শত মানুষ যে স্বজনহারা হয়, তার কোন ইয়ত্তা নেই। যারা বেঁচে থাকে তাদের মনে তৈরি হয় দগদগে ক্ষত। ট্রমা। গ্লানি। কখনও কখনও দুরারোগ্য অপরাধবোধ। এই বোধ অনপনেয়। একে পেছনে ফেলে সামনে এগোনো দুরূহ। এটি মানুষের সঙ্গে ছায়ার মতো সামনের দিকে চলতে থাকে। চলতে চলতে হয়ে ওঠে মানুষের গল্পের প্রধান উপজীব্য, কিংবদন্তি, ন্যারেটিভ। সাহিত্যেরও। কখনও কখনও সাহিত্য আর ইতিহাস একটি ধূসর রেখায় এসে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়, একে অপরের মধ্যে সংশ্লেষিত হয়।
২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল জয়ী হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্মে ইতিহাস এমন এক বিন্দুতে এসে সাহিত্যের ন্যারেটিভে রূপান্তরিত হয় যেখানে এই দু’য়ের মধ্যে সুস্পষ্ট কোন ভেদরেখা টানা কঠিন হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক বাস্তবতা আর কল্পনা একে অপরের শরীরে লেপ্টে যায়। বাস্তব ও কল্পনার মাখামাখিতে যে পরাবাস্তব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তা পাঠককে শুধু ভাবালুতা নয়, প্রজ্ঞা, যুক্তি ও আত্মান্বেষণের পথেও টানে। এটিই আসলে হিস্টোরিসিটি অব টেক্সট এবং টেক্সুয়ালিটি অব হিস্ট্রি, অর্থাৎ টেক্সট ও হিস্ট্রির আন্তঃগ্রন্থিকতা। হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্ম পঠনকালে উত্তর-কাঠামোবাদী দার্শনিক দেরিদার সেই কথাই মনে পড়ে, অর্থাৎ টেক্সটের বাইরে কিছুই নেই। হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্ম পাঠককে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের এক বিশেষ কালপর্বের পাঠসূত্রের অন্বেষণে উদ্বুদ্ধ করে; মানুষের সমবেত মননের খোঁজ করতে কৌতূহলী করে তোলে। তাঁর সাহিত্যে সমাজ ও ইতিহাসচর্চা একটি অভিন্ন ধারায় এসে মেশে এবং এর পরতে পরতে প্রান্তবাসী, নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্লোগান ধ্বনিত হয়। শুধু সামগ্রিক নয়, স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার শ্বাসরূদ্ধকর সংকটও উচ্চারিত হয়। মানুষের সঙ্গে মানুষের, মানুষের সঙ্গে তার পারিপার্শ্বিকতার প্রতিনিয়ত গলে যেতে থাকা সম্পর্কের বয়ান নিয়ে নির্মম সব প্রশ্ন উত্থিত হয়। হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যে ইতিহাসের রসদ এতটাই অন্তর্ব্যাপ্ত যে, তা পড়তে গিয়ে নিৎশের কথা পাঠকের মনে উঁকি দেয়। কথাটি হলো-ফ্যাক্ট বলে কিছু নেই; আছে শুধু ব্যাখ্যা। এ কথা সত্য। ফ্যাক্ট তো জড়তারই নামান্তর। আর ব্যাখ্যা একটি চলমান প্রক্রিয়া। জড়তা জ্ঞান উৎপাদন করে না। তৈরি করে কূপম-ূকতা। আর চলিঞ্চুতা নতুন নতুন জ্ঞানের উৎসারণ ঘটায়। আসলে সবদিক বিবেচনায় এ কথা বলাই যায় যে, হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্য পাঠককে ইতিহাসের পুনঃপাঠে উদ্বুদ্ধ করে। লেখার ধার ও ধাঁচে স্পষ্টতই বোঝা যায়, তিনি ইতিহাস-সচেতন সাহিত্যিক।
আসলে, প্রতি বছর নোবেল পুরস্কার ঘোষণার বেশ পূর্ব থেকেই সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে বিশ^ব্যাপী জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। কেউ মুরাকামী, কেউ সালমান রুশদী আবার কেউ বা নগুগিকে নিয়ে বাজি পর্যন্ত ধরেন। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও সব জল্পনা-কল্পনাকে ভ্রান্ত প্রমাণ করে নোবেল কমিটি পুরস্কার প্রদান করেছে দক্ষিণ কোরিয়ার চুয়ান্ন বছর বয়সী নারী সাহিত্যিক হ্যান ক্যাং-কে। নোবেল কমিটি তাঁকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি কাব্যময় গদ্যের ভাষায় ইতিহাসের ট্রমা উপস্থাপন করেন এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে মানুষের জীবনের ভঙ্গুরতার বয়ান হাজির করেন। বইয়ের সংখ্যা বিচারে হ্যান ক্যাং-এর সৃষ্টিকর্ম যে অনেক বেশি, তা কিন্তু নয়। দ্য ভেজিটেরিয়ান, দ্য হোয়াইট বুক, হিউম্যান এক্টস এবং গ্রিক লেসন্স তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। তিনি যে নোবেল বিজয়ী হবেন, তা নিজেও ভাবেন নি। সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সেক্রেটারি ম্যাট্স মাল্ম-এর ফোন পেয়ে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে অনাবিল পুলকও বোধ করেন। ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠেছেন কোরীয় সাহিত্যের সাহচর্যে। কাজেই, তার এই পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘটনা বিশ্বের নানান প্রান্তের সাহিত্যানুরাগীদের কোরীয় সাহিত্য পঠন-পাঠনে যে উদ্বুদ্ধ করবে, তা ভেবে তিনি সত্যিই আনন্দিত হন। বাংলাদেশের পাঠকদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যের প্রতি দুর্বিনীত আগ্রহ। এই হ্যান ক্যাংকে জানার কৌতূহলের অভিঘাতে এ পর্যন্ত বাংলাভাষায় তাঁর উপন্যাস ভেজিটেরিয়ান থেকে শুরু করে কয়েকটি ছোটগল্পও অনূদিত হয়েছে। অন্তর্জালে তাঁর নিরলস খোঁজখবর চলছে। তাঁকে নিয়ে স্থানীয় কতিপয় প্রতিষ্ঠান আলোচনার সভারও আয়োজন করেছে।
১৯৭০ সালের ২৭শে নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার গুয়াংজুতে হ্যান ক্যাং-এর জন্ম। ঐ গুয়াংজুতেই দক্ষিণ কোরিয়ার স্বৈরাচারী সামরিক সরকার-বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ১৯৮০ সালের ১৮ই মে। চলে ২৭শে মে পর্যন্ত। গুয়াংজুতে সামরিক জান্তা চুন দু হুয়ানের সামরিক সরকারের স্বৈরশাসনের প্রতিবাদে চোন্যাম ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সাধারণ জনতা। সামরিক সরকার প্রতিবাদের এই ঘটনাকে শুধুই দাঙ্গা বলে আখ্যায়িত করে। সন্দেহ করে, এর পেছনে উত্তর কোরিয়ার বামপন্থীদের ইন্ধন রয়েছে। নির্মম ভাবে দমন করে। খুন, নির্যাতন, ধর্ষণ- এহেন কোনো বর্বরতা নেই যা সামরিক বাহিনীর সদস্যরা প্রয়োগ করেনি। সরকারি হিসেবেই একশত পঁয়ষট্টিজন আন্দোলনকারী খুন হয়। হতাহত হয় শতশত ছাত্র-জনতা। সামরিক সরকার অত্যন্ত বেপরোয়া ও নৃশংসভাবে আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়নে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তখন জিমি কার্টার। তাঁর প্রশাসনের মদদে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সরকার তখন লাগামহীনভাবে নিষ্ঠুরতার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায়। এই ঘটনার চার মাস আগেই, অর্থাৎ নয় বছর বয়সে হ্যান ক্যাং তার বাবা-মার সঙ্গে চলে যান রাজধানী-শহর সিউলে। পরিবারের সঙ্গে আগেভাগে সিউলে চলে গিয়ে প্রাণ রক্ষা হলেও হ্যান ক্যাং বেঁচে গিয়ে কখনই অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাননি। যখন শত শত আন্দোলনকারী অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, বুকের তাজা শোণিতে রাজপথ রঞ্জিত করেছেন, তখন তিনি পরিবারের সঙ্গে নিরাপদে সিউলে বসবাস করেন- এই বিষয়টি সবসময় তাঁর মধ্যে অপরাধবোধ জাগ্রত রাখে, এখনও। এটি একটি ট্রমা তৈরি করেছে তাঁর মনে। এই ট্রমা তাঁর লেখালেখির পেছনে প্রণোদনা হিসেবে কাজ করে।
গুয়াংজুর ঘটনার সময় হ্যান ক্যাং দশ বছরের বালিকা। কোন রকম প্রতিবাদ করতে পারেন নি। তাঁর এই নিষ্ক্রিয়তা বা প্যাসিভিটি তাঁকে আহত করে, ভেতরে ভেতরে ক্ষতবিক্ষত করে। তাঁর ভাবজগতে তোলপাড় তোলে। ভেজিটেরিয়ান- এর প্রধান নারীচরিত্র ইয়ুং হাইয়ের মানসিক ও শারীরিক মেটামরফোসিস যেন হ্যান ক্যাংয়ের অসহায়ত্ব, অপারগতা ও ট্রমার বহিঃপ্রকাশ। ইয়ুং হাই একজন খ-কালীন গ্রাফিক আর্টিস্ট। রক্তপিপাসু, ক্ষমতালোভী মানুষের বর্বরতা ও নির্মমতার প্রতি ঘৃণা, ক্রোধ ও ক্ষোভে সে বদলে যায়। এই বদল তার ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। এমন কাহিনীনির্ভর উপন্যাসটি নিয়ে ২০০৯ সালে লিম উ সিয়ং একটি সিনেমা তৈরি করেন।
এরকম সব কাহিনীর নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় বিশেষ জীবনবোধের, আলাদা অন্তর্দৃষ্টির। এটি নির্মাণের জন্য শুধু পঠন-পাঠন যথেষ্ট নয়। এর জন্য পরম্পরারও প্রয়োজন। যেকারোও জীবনে বিশিষ্টতা অর্জন করা বা বিশেষ কিছু হয়ে ওঠার পেছনে পারিবারিক পরম্পরা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। হ্যান ক্যাং-এর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। হ্যানের বাবা পেশায় একজন শিক্ষক। উপন্যাসও লিখেছেন। কিন্তু তেমন নাম-ডাক কামাতে পারেননি। আর লেখালেখি করে অর্থ উপার্জন করতে তিনি পুরোপুরিই ব্যর্থ। তবে বাবার লেখক ও শিক্ষক হওয়ার সুবাদে হ্যান ছোটবেলা থেকে সঙ্গ পেয়েছেন অসংখ্য বইয়ের। প্রতিবেশীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার পূর্বেই হ্যান-এর সখ্যতা গড়ে ওঠে বই-পুস্তকের সঙ্গে। বইয়ের সাহচর্য তাঁকে বিভিন্ন পরিস্থিতির পার্থিব তথ্যনির্ভর বিষয়াদি পরিবেশনে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। ব্যক্তিগত চৈতন্যের সঙ্গে বিশ্বচৈতন্যের আন্তঃগ্রন্থিকতা বা মিথষ্ক্রিয়া ঘটাতে সিদ্ধহস্ত করে তোলে। শৈশবে হ্যান সো-চিওন এবং মা হাইসং- এর সাহিত্যকর্মের ভক্ত-পাঠক হয়ে ওঠেন। সুইডিশ শিশুসাহিত্যিক অ্যাসট্রিড লি-গ্রেন-এর কল্পকাহিনীভিত্তিক উপন্যাস দ্য ব্রাদার্স লায়নহার্ট-ও তাঁকে মুগ্ধ করে। এই উপন্যাসটি ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হলে শিশুপাঠ্য হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। কিশোর বয়সে এসে তিনি রাশিয়ান লেখক ফিয়েদর দস্তয়েভস্কি ও বোরিস পাস্তারনাকের সাহিত্যকর্মের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার আরেকজন বিখ্যাত লেখক যিনি ১৯৮০ সালে গুয়াংজুতে ছিলেন এবং খুব ঘনিষ্ঠভাবে সরকার-বিরোধী আন্দোলনের দ্বারা প্রভাবিত হন, তিনি হলেন ইম চুল ঊ। তিনি কোরিয়ার বিভাজন ও গুয়াংজুর স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনকে বিষয়বস্তু করে উপন্যাস রচনা করেন। তাঁর রচনাও হ্যান ক্যাং-এর উপর তাঁর কৈশোরেই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে।
১৯৯৩ সালে হ্যান সিউলের উনসেই বিশ^বিদ্যালয় থেকে ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। সেই বছরই তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশিত হয় কোরিয়ান সাহিত্য পত্রিকায়। পরের বছর সিউল সিনমুন খবরের কাগজে প্রতিযোগিতার উদ্দেশে কবিতা প্রকাশিত হয় এবং তিনি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৫ সালে ইয়েওসু নামে তাঁর ছোটগল্প সংকলন ছাপা হয়। ১৯৯৮ সালে আইওয়া বিশ^বিদ্যালয়ে তিনি আন্তর্জাতিক লেখালেখি কার্যক্রমে যোগ দেন। পরের বছর তাঁর প্রথম উপন্যাস জিওমিউন স্যাসেউম প্রকাশ পায়। ২০০৭ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত তিনি সিউল ইনস্টিটিউট অব আর্টে ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর শিক্ষকতা করেন। এটিও তাঁর বৌদ্ধিক ও শৈলীগত সৃষ্টিসত্তাকে প্রভাবিত করে।
তবে ঔপন্যাসিক হয়ে ওঠার পূর্বে হ্যান ক্যাং কবি হয়ে উঠেছিলেন বলে তাঁর গদ্যের ভাষা কাব্যময়। তাঁর লেখায় প্রচুর রূপকালংকার রয়েছে। রয়েছে অসাধারণ সব কল্পচিত্র ও বুদ্ধিবৃত্তি ও হৃদয়বৃত্তিকে একই সুতোয় গাঁথার সূক্ষ্ম নৈপুণ্য। উপন্যাসের বিষয়বস্তু হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন সংঘাত, বেদনা ও পিতৃতান্ত্রিকতা। এই সংঘাত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির, ভেতরের সঙ্গে বাহিরের। গুয়াংজুর ঘটনা তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। যেকোন আন্দোলনে মোটাদাগে মানুষের দু’টি দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন- মানবিকতা বা মানবতা মানুষকে মানুষের সাহায্যার্থে একে অপরের কাছাকাছি নিয়ে আসে। আবার অপরদিকে, আন্দোলন দমনের নামে ক্ষমতাকাঠামো যে শক্তির প্রয়োগ করে, তার মধ্য দিয়ে মানুষের নির্মমতা, নিষ্ঠুরতা ও দানবিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। হ্যান ক্যাং-এই দুই-ই লক্ষ্য করেছেন। প্রচুর বই পড়ার কারণে মানুষের এই বাইনারি চরিত্রকে তিনি দার্শনিক কাঠামোতে ফেলে নিবিড় ভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। শেষ পর্যন্ত মানুষই হয়ে উঠেছে তাঁর রচনার প্রধান বিষয়। তাঁর লেখার মধ্যে চিরন্তন মানব চরিত্রের মাধুর্য যেমন ফুটে উঠেছে, তেমনি মানুষের মনোজগতের বিকারগ্রস্ততা, বীভৎসতা ও অন্ধকারাচ্ছন্নতাও উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। গতানুগতিক ভাবনার বাঁধাছক প্রশ্নের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে তাঁর রচনায়। বাস্তবতা তার অতিপরিচিত সীমা উতরে গিয়ে পৌঁছে গেছে জাদুবাস্তবতার স্তরে। রিয়েল আলিঙ্গন করেছে সুরিয়েলকে।
২০০৭ সালে হ্যান ক্যাং প্রথম ঔপন্যাসিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। এর আগ পর্যন্ত অবশ্য তিনি কবি ও ছোটগল্পকার হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কোরিয়ান ভাষায় চেসিকজুইজা নামে উপন্যাসটি ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয়। এটি ২০১৫ সালে দ্য ভেজিটেরিয়ান নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয় এবং ২০১৬ সালে উপন্যাসটি বুকার পুরস্কার লাভ করে। এই পুরস্কারপ্রাপ্তির ঘটনার মধ্য দিয়ে হ্যান প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক পাঠকের নজরে আসেন। তবে এই উপন্যাসের ভ্রƒণ অংকুরিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালে একটি ছোটগল্পের আকারে। তখন কোরীয় ভাষায় এর শিরোনাম ছিল নি ইয়েজাওয়ি ইয়েলমি, যার ইংরেজি অনুবাদ দ্য ফ্রুট অব মাই উয়োম্যান। উপন্যাসের আখ্যান কিছু ভয়ানক সত্যের ব্যবচ্ছেদ করে। এক দম্পতি থাকেন অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে। হঠাৎ একদিন কিছু কুঁচকে যাওয়া চামড়ার মতো নীলাভ ক্ষত আবিষ্কৃত হয় স্ত্রী, ইয়ুং হাই- এর শরীরে। এগুলো ব্যথাহীন। প্রথমদিকে স্বামী তেমন পাত্তা বা মনোযোগ দিতে চান না স্ত্রীর এই সমস্যার প্রতি। তিনি তাঁর চাকরি নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু ধীরে ধীরে স্ত্রী মানসিক ও শারীরিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তার শরীরের বিকৃতি ঘটতে শুরু করে। মাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়। রোদে নগ্ন হয়ে বসে থাকতে তার ভালো লাগে। কেউ কিছু মনে করলো কি-না, তাতে তার কোনো বিকার নেই। আগের চেয়ে এখন অনেক বেশি পানি পান করে। কিন্তু স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করা সে কমিয়ে দেয়। আর মাংস খাওয়া তো একেবারেই ছেড়ে দেয়, যা তার সংস্কৃতিবিরোধী। তার সংস্কৃতিতে মাংস খাওয়ার চর্চা চালু আছে। রূপকালঙ্কারিক ভাবে তার এই অবস্থা আসলে তার প্রচলিত সংস্কৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান। তার পরিবার তাকে খাওয়ানোর ব্যাপারে জোর-জবরদস্ত করলে সে একেবারেই খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেয়। ছোটগল্পের শেষে দেখা যায় স্বামী প্রায় সপ্তাহ খানেক পরে বাড়ি ফিরেছে। কলিংবেলের বোতাম চেপে কোনো সাড়া পান না। তার কাছে থাকা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে দেখে বাড়ির ভেতরে কেমন এক অস্বস্তিকর বাজে গন্ধ। সবকিছু ল-ভ-। রান্নাঘর অগোছালো। স্ত্রীর কোনো সাড়াশব্দ নেই। বেলকোনিতে গিয়ে দেখে তার স্ত্রী বাক ও চলৎশক্তিহীন একটি কিম্ভূতকিমাকার সবুজ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে। এই কাহিনীর মধ্য দিয়ে হ্যান ক্যাং রূপকালঙ্কারিক ভাবে ঔপনিবেশিক এবং উপনিবেশিতের সম্পর্কের মধ্যকার টানাপড়েনও তুলে ধরেছেন। নিপীড়ন-নির্যাতনের প্রতিবাদ পরোক্ষতা বা প্যাসিভিটি যে হতে পারে, তা-ও হ্যান ক্যাং তাঁর এই রচনায় দেখিয়েছেন এবং উৎসুক ও খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে-পড়া পাঠক এ বিষয়টি ধরতে পারেন।
২০১১ সালে প্রকাশিত হয় ক্যাং- এর উপন্যাস হুইরা বিও সিগান। উপন্যাসটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ২০২৩ সালে গ্রিক লেসন্স নামে। অনুবাদ করেন দেবোরাহ স্মিথ এবং এমিলি ইয়ে ওয়ান। উপন্যাসের আখ্যানে দেখা যায়, এক বোবা তরুণী সম্প্রতি গ্রিক ভাষার ক্লাসে যোগ দিয়েছে। সে মনে করে, সে কথা বলতে শিখতে পারবে। তার শিক্ষক যিনি ধীরে ধীরে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলছেন তিনিও তার সঙ্গে কালক্রমে ঘনিষ্ঠ হলেন। যখন এরা একে অপরের কাছাকাছি এলেন তখন এরা নিজেদের দুঃখ ও বেদনার কথা ভাগাভাগি করেন গল্পগুজব করে। কাহিনী বিশ্লেষণে বোঝা যায়, এখানেও হ্যান ক্যাং পরোক্ষতার নির্মম চিত্র অংকন করেছেন। অন্ধত্ব ও বধিরতা সমাজের, রাষ্ট্রের ও ক্ষমতাকাঠামোর নানান অন্যায়ের প্রতি রূপকালঙ্কারিক ভাবে নিস্পৃহতা বা প্যাসিভিটি প্রকাশ করে। তবে ভালোলাগা, মন্দলাগা, প্রতিবাদ, প্রতিপ্রপঞ্চ- ইত্যাদির বহিঃপ্রকাশ কোন না কোন ভাবে ঘটবেই। প্রতিবাদ করা মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য। তবে প্রতিবাদ-প্রতিক্রিয়া-প্রত্যুত্তর প্রকাশের ভাষা, ভঙ্গি ক্ষেত্রভেদে ভিন্ন হতে পারে। কেউ রাজপথে নেমে প্রতিবাদের কিংবদন্তি নির্মাণ করে; আবার কেউ গল্প বলে, গল্প লিখে ও গল্প নির্মাণ করে তার প্রতিটি গ্রন্থিতে জুড়িয়ে দেয় নিজের মন্দলাগার কথা। গ্রিক লেসন্স উপন্যাসের বোবা ও অন্ধ চরিত্র দু’টির মধ্য দিয়ে হ্যান ক্যাং এই বার্তাটিই প্রচার করেছেন।
এছাড়া তাঁর ২০১৬ সালে প্রকাশিত উপন্যাস হুইন ২০১৭ সালে দ্য হোয়াইট বুক শিরোনামে অনূদিত হয়। এটি ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক ম্যান বুকার আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত হয়। উপন্যাসের সেটিং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পোল্যান্ডের ওয়ারসো। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায় গল্পকথকের ছোটবোন জন্মের দু’ঘণ্টা পরে মারা যায়। সেই স্মৃতি খ-িতকারে আত্মজৈবনিক ঢংয়ে উপস্থাপিত হয়েছে উপন্যাসের আখ্যানে। দুঃখের বিশেষ কোর রং নেই। এটি সাদা, আর সাদা কিন্তু বিশেষ কোন রং নয়। এটি সাতটি রংয়ের সমন¦য়। তাই দুঃখও নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার নির্যাস নয়। এর নিঃসরণ কী থেকে যে হতে পারে, কখন যে হতে পারে, তা নির্ধারণ করা সত্যিই দুরূহ। এটি আপেক্ষিক। কারো দুঃখ অপ্রাপ্তিতে, কারো আবার অতি প্রাপ্তিতে। দুঃখ কারো নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়; কেউ আবার একে বিলাসী পণ্যে পরিণত করে; বিকোয় মানুষকে মানসিক ভাবে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য। তাই দুঃখ কালো নয়, সাদা। এর মধ্যে সব রং এসে একে অপরের সঙ্গে লেপ্টে গেছে।
২০০২ সালে প্রকাশিত জিওদাউই চাগাউন সান উপন্যাসটির ইংরেজি নাম ইউর কোল্ড হ্যান্ডস। এই উপন্যাসে তিনি গুয়ানজুর আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করেন। উপন্যাসের কাহিনীতে দেখা যায় জাং উনহিয়োং নামের এক ভাস্কর একদিন হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান। তাঁর কোন হদিস মেলে না। তবে তিনি যে প্লাস্টার কাস্ট রেখে যান তা পরীক্ষা করে দেখা যায়, তিনি আসলে সারাটা জীবন সত্যের অনে¦ষণ করে গেছেন। পৃথিবীতে মুখের চাইতে মুখোশের সংখ্যা অনেক বেশি। এই মুখোশের অন্তরালে সত্য ঢাকা পড়ে। তিনি এই সত্যের অনে¦ষণ করেন। অখংখ্য মুখোশের ভিড়ে নিজেকে তিনি হারিয়ে ফেলেন প্রথমে মানসিক ভাবে, পরে শারীরিক ভাবে। তিনি হারিয়ে গেছেন; হয়তো গুম হয়েছেন। সত্যসন্ধানী মানুষকে তো ক্ষমতাকাঠামো ভয় পায়। এই ভয় থেকেই তো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠা। এমন পরিস্থিতিতে জাং উনহিয়োংয়ের মতো সত্যসন্ধানীরা উধাও হয়ে যেতেই পারেন! ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্তের কি কোন অভাব রয়েছে? ইউর কোল্ড হ্যান্ডস এমনই সব প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পাঠকদের। এই চক্ষুরুম্মিলনকারী উপন্যাস পাঠকের পাঠোপলব্ধিতে প্রচ- অভিঘাত তৈরি করে।
তাঁর ২০২১ সালের প্রকাশিত উপন্যাস জ্যাকবিওলহাজি অ্যানেউন্ডা-র ইংরেজি অনুবাদ উই ডু নট পার্ট প্রকাশিত হবে ২০২৫ সালে। ২০২৩ সালে হ্যান ক্যাং-এর উই ডু নট পার্ট (অনুবাদ) চৎরী গবফরপরং পুরস্কার লাভ করে। ১৯৪০ সালে জেজু দ্বীপে সংঘটিত বিপ্লবের বয়ান হাজির করবেন হ্যান ক্যাং এই উপন্যাসের ক্যানভাসে। ইতিহাসের আখ্যানের আড়ালে মানুষের জীবনের ভঙ্গুরতার বয়ান এতে হাজির হয়েছে। দুই মহিলার বন্ধুত্বের বর্ণনার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ইতিহাসের নানান অলিগলিতে উঁকি দিয়েছেন হ্যান ক্যাং। ধারণা করা হয়, ভেজিটেরিয়ান-এর পরে এটিই তাঁর সবচেয়ে প্রভাবশালী উপন্যাস। এক শীতের সকালে কিয়ুংগা তার বান্ধবী ইনসেওনের কাছ থেকে একটি জরুরি বার্তা পায়। দুর্ঘটনায় আহত হয়ে সে এখন সিউলের একটি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। সে কিয়ুংগাকে জিতু দ্বীপে ফিরে যেতে বলে। ওখানেই সে থাকে। আমা নামের তার পোষা পাখিটির প্রাণ রক্ষার্থে। কিয়ুংগা যখন সেই দ্বীপে পৌঁছে তখন সেখানে বরফঝড় আছড়ে পড়েছে। কিন্তু তাকে যেকোনো মূল্যে ইনসেওনের বাসায় পৌঁছতেই হবে। রাত নামে। তার আশঙ্কা আরো বেড়ে যায়। সে পড়ে যায় উভয় সঙ্কটে। পাখিটিকে বাঁচাবে না-কি নিজের প্রাণ রক্ষা করবে প্রাণঘাতী শীতের হাত থেকে। এ এক মহাসঙ্কট। এটি শুধু এই কিয়ুংগার নয়, এটি পুরো মানবজাতির সঙ্কট। এই সঙ্কট থেকে উত্তরণের একটি উপায় অবশ্য আছে এবং তা হলো সহমর্মিতা, সমবেদনা, যাকে ইংরেজিতে এমপ্যাথি বলা হয়। এটির চর্চাই পারে মানুষকে সংঘাত, বর্বরতা, খুন ও জিঘাংসার পথ থেকে রক্ষা করতে।
২০২৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভের পর হ্যান ক্যাং-এর প্রশংসায় যেমন গোটা দক্ষিণ কোরিয়া উদ্বেলিত, তেমনি তাঁকে নিয়ে বিতর্কও শুরু হয়েছে। এমন ঘটনা অবশ্য সাহিত্যে নোবেল বিজয়ীদের নিয়ে কম-বেশি হয়। স্বয়ং দক্ষিণ কোরিয়াতেই এই বিতর্ক চাগিয়ে উঠেছে তাঁর দ্য ভেজিটেরিয়ান উপন্যাস নিয়ে। গত বছর এই বিতর্ক শুরু হয়েছিল। গিয়োংগি প্রদেশের দুই হাজার চারশত নব্বইটি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে দ্য ভেজিটেরিয়ান উপন্যাসটি সরানো হয়েছে। অভিযোগ হলো- এতে যৌন সম্পর্কের নগ্ন বর্ণনা রয়েছে যা শিশু-কিশোরদের নৈতিক স্খলনের কারণ হতে পারে। একটি রক্ষণশীল এনজিওর পরামর্শে ঐ প্রদেশের শিক্ষা-অফিস ওখানকার স্কুলগুলোতে এ সংক্রান্ত নোটিশ পাঠায় যেন দ্য ভেজিটেরিয়ান উপন্যাসটি কারিকুলাম ও লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে তাঁর এই উপন্যাস নিয়ে স্থানীয় পাঠকদের মধ্যে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ কেউ বলেন, এটি কোমলমতি শিশুদের নৈতিক স্খলন ঘটাবে। আবার কেউ বলেন, যে বইটি বিশ^জুড়ে ব্যাপক ভাবে পঠিত হয়, সেটি বাচ্চাদের জন্য নিষিদ্ধ করা উদ্ভট একটি সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। বোদ্ধা পাঠকরা বলেছেন, একটি বই ভালো না খারাপ; পড়ব না-কি পড়ব না- এটি শুধুই দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপার। এ বিষয়টি পাঠকের উপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। স্থানীয় ব্রডকাস্টার এস বি এস পাঁচজন যৌন বিশেষজ্ঞের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, বইটির মূল্যায়ন করতে হবে সমাজের উপর এর ফলপ্রসূ প্রভাবের প্রেক্ষিতে; যৌন সংবেদনশীলতা দিয়ে নয়। বইটি বরং একটি সুস্থ যৌনজীবনের মূল্যবোধ উপলব্ধিতে বেশ সহায়ক হবে। যৌনতা নিয়ে সংবেদনশীলতা না ছড়িয়ে, বরং সবারই এমন একটি সুস্থ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে হবে যেখানে যৌন বিষয়ে কথাবার্তা বা আলোচনা নিষিদ্ধ নয় বা ট্যাবু নয়, বরং সেটি নিয়ে সোজাসাপটা কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। তাহলে সেটি তরুণ প্রজন্মের নৈতিক চরিত্র নির্মাণে সহায়ক হবে।
তবে বিতর্ক তো খারাপ কিছু নয়। বিতর্ক যেখানে থাকে সেখানে পাঠ থাকে, পুনঃপাঠ থাকে, নতুন নতুন জ্ঞানের উন্মোচন ও নির্মাণ থাকে। বিতর্ক ছাড়া নতুন জ্ঞানের পথ খোলে না। আর একটি সমাজ ও সভ্যতা জ্ঞান উৎপাদন করতে না পারলে তার স্থবিরতা ও এক পর্যায়ে বিলুপ্তি অপরিহার্য নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। প্রকৃত অর্থে জ্ঞানকা-ের স্থবিরতাই সমাজ-সভ্যতার স্থবিরতা। যাই হোক, জ্ঞানকা-ে প্রচ- অভিঘাত সৃষ্টির মধ্য দিয়ে হ্যান ক্যাং শুধু কোরীয় সাহিত্যকে যে একটি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেন, তা নয়। কোরিয়ার ইতিহাসের প্রতি বিশে^র মনোযোগ আকর্ষণেও তাঁর এই নোবেলপ্রাপ্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলেই মনে হয়। কোরিয়ার প্রকাশনা শিল্পে তাঁর নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির ঘটনা নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। সাইবার টেকনোলোজির যুগে কাগুজে বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ নিশ্চয় কিছুটা কমে যে গেছে, এ কথা মানতেই হবে। এটি বৈশি^ক বাস্তবতা। কিন্তু হ্যান ক্যাং-এর নোবেল প্রাপ্তির পর কোরিয়ার নামকরা সব প্রকাশনা সংস্থাগুলোর বেচা-বিক্রি শতকরা বিয়াল্লিশ ভাগ বেড়ে গেছে। আরেকটা দিক হলো- হ্যান ক্যাং-এর নোবেল প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে কোরিয়ার অনুবাদ প্রকাশনাশিল্পও বেশ গতিপ্রাপ্ত হয়েছে। অনুবাদ এখন বেশ গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। হ্যান ক্যাং-এর উপন্যাস বা ছোটগল্পসমূহ সম্বন্ধে বিশে^র পাঠকরা জেনেছেন এবং জানছেন এগুলোর ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। ২০১৬ সালে দেবোরাহ স্মিথের করা অনুবাদ দ্য ভেজিটেরিয়ান যখন বুকার পুরস্কার পায়, তখন কোরিয়ার কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে তাঁদের সাহিত্যকর্ম অনুবাদের ব্যাপারে তুমুল আগ্রহ তৈরি হয়। বলা যায়, এই ঘটনা কোরীয় সাহিত্যকে বিশে^র পাঠকদের সামনে আনার ক্ষেত্রে একটি রেনেসাঁ বা বিপ্লব ঘটিয়ে দেয়। এরপর কোরিয়ার অনেক সাহিত্যিক, যাঁদের বেশির ভাগই মহিলা, তাঁরাও অনুবাদের বাতাবরণে বিশে^র পাঠকের সামনে হাজির হয়। অনেকে আবার আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনীতও হন। নারী সাহিত্যিকদের বিশ্বমঞ্চে হাতছানি দিয়ে ডাকেন হ্যান ক্যাং। তাঁর এই আহবানে বেশ বড়সড় সাড়া পড়েছে। এ তো তাঁর এক বিরাট অর্জন। কোরিয়ান কবি কিম হাইসুন্ এর ফ্যান্টম পেইন উইংস ২০২৪ সালে ন্যাশনাল বুক ক্রিটিক্স সার্কেল অ্যাওয়ার্ড বিজয়ীদের তালিকায় নাম ওঠে চুং বোরার ছোটগল্প সংকলন কার্ন্স্ড বানি। এভাবে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ^ জানতে পারে যে, কোরিয়ান সাহিত্য একটি নতুন, অভিনব ও সজীব কণ্ঠস্বর হিসেবে ধ্বনিত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে অনুবাদ কোরীয় সাহিত্যের প্রতি বিশে^র মনোযোগ আকর্ষণে সাহায্য করে এবং হ্যান ক্যাং এর নোবেল প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে কোরীয় সাহিত্য বিশ^সাহিত্যের আঙিনায় একটি স্বতন্ত্র জায়গা করে নিয়েছে।
এ কথা সত্য যে, অনুবাদে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। আবার অনেক কিছুর যোগও হয়। এ কারণেই জাঁক দারিদা তাঁর হোয়াট ইজ আ রিলেভেন্ট ট্রানস্লেশন প্রবন্ধে বলেছেন যে, অনুবাদ একই সঙ্গে সম্ভব এবং অসম্ভব। অনুবাদ সম্ভব কারণ যেকোনো গ্রন্থকে তার উৎস ভাষা থেকে উদ্দিষ্ট ভাষায় ভাষান্তর করা যায়। আবার অনুবাদ অসম্ভব এ কারণে যে, ভাষার মধ্যে অনেকগুলো স্তর থাকে। কথা আর ভাষা এক নয়। ভাষার মধ্যে হেঁয়ালি থাকে। অর্থও খামখেয়ালি। প্রেক্ষিত, সময়, বাস্তবতা পরিবর্তনশীল। এই সবকিছু অনুবাদে ধরা কঠিন। হয়ত অসম্ভবও। তাই দেরিদা অনুবাদকে সম্ভব, অসম্ভব-দুই-ই বলেছেন। তবে অনুবাদ সম্ভব-অসম্ভব যাই হোক না কেন, এর প্রয়োজন অপরিহার্য। এটি নিজেই একটি ভাষা, প্রকাশভঙ্গি। এই ভাষা আসলে ব্রিজ বা সেতুর কাজ করে। এই সেতুর প্রয়োজন আছে। একেবারেই ওপারে না যাওয়ার চাইতে একটি সেতু, তা যেমনই হোক, তা দিয়ে যদি ওপারে যাওয়া যায়, নতুন জ্ঞানের সন্ধান পাওয়া যায়, তবে খারাপ কি? মূল থেকে একটু-আধটু সরে যাওয়ার ঝুঁকি তো আছেই। তবে অনুবাদের বিশ^স্ততা বাড়ানোর জন্য এখন অনেক তত্ত্ব-কাঠামোর প্রচলন হয়েছে। সেগুলোও অনুবাদের শক্তি অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। যাই হোক, অনুবাদের পক্ষে-বিপক্ষে যাই বলা হোক না কেন, এই অনুবাদই কিন্তু হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্মকে বিশে^র নজরে এনেছে। এ ঘটনা অনেকের জন্য, অনেক দেশের সাহিত্যের জন্য, এমনকি বাংলা সাহিত্যের জন্য বড় একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে হয়।
শুধু তাই নয়, অনুবাদ এখন বড় একটি ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। দেবোরাহ স্মিথ হ্যান ক্যাং-এর দ্য হোয়াইট বুক, হিউম্যান এক্ট্স, গ্রিক লেস্নস অনুবাদ করেছেন। এশিয়া এবং আফ্রিকার সাহিত্য অনুবাদের উদ্দেশে তিনি এক্সিস প্রেস বলে একটি প্রকাশনা সংস্থা খুলেছেন। আবার, কোরিয়ান সরকার কোরিয়ান সাহিত্য অনুবাদে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। কোরিয়ার মিনিস্ট্রি অব কালচার, স্পোর্টস অ্যান্ড ট্যুরিজম দুই হাজার একশত সত্তরটি এবং ডিজান ফাউন্ডেশন বলে একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় চারশত বই অনুবাদে সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে শুধু কোরিয়া নয়, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের সাহিত্যের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক বিষয়। কোরীয় সরকার প্রায় আঠাশটি ভাষায় হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্ম অনুবাদ করিয়েছে। হ্যান ক্যাং-এর নোবেল বিজয় নিশ্চয় কোরীয় সরকারকে আরো বেশি বেশি উৎসাহিত করবে অনুবাদে পৃষ্ঠপোষকতা বাড়াতে। এখান থেকে আমাদেরও মনে হয় কতিপয় বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হবে। বাংলা সাহিত্যে অনেক মূল্যবান সৃষ্টি রয়েছে। সেগুলোর একাধিক ভাষায় অনুবাদ করে বিশে^র পাঠকের কাছে হাজির করা জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার কোনো বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে বাংলা একাডেমিসহ আরো সব প্রতিষ্ঠান ম্যানেজেরিয়েল দক্ষতা ও সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করাই যায়।
যাই হোক, এ কথা অনস্বীকার্য, হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্যকর্ম বিশে^র সঙ্গে একটি বোঝাপড়া তৈরি করেছে। যে সাহিত্য পাঠকের সঙ্গে ডায়ালেক্টিক যোগাযোগ বা দ্বিরালাপ তৈরি করতে পারে না, সেই সাহিত্য পাঠক কর্তৃক গৃহীত হয় না। তার আয়ু খুব কম। হ্যান ক্যাং-এর সাহিত্য প্রথমত. স্থানিক ও বৈশি^ক আবেদন আছে এমন বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে রচিত। দ্বিতীয়ত. তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান উপজীব্য কোরীয়দের অতীত-স্মৃতি যেটি রক্তে ভেজা এবং একই সঙ্গে ত্যাগের মহিমায় মহিমানি¦ত। মানুষ তো স্মৃতিতেই বাঁচে। স্মৃতি বাঁচলে মানুষ বাঁচবে। তাই এই স্মৃতিকে বিস্মৃতির গহবর থেকে তুলে এনে বিশে^র পাঠকের সামনে হাজির করেছেন হ্যান ক্যাং। তাঁর নোবেল প্রাপ্তির ঘটনার মধ্য দিয়ে বিশ^ কোরিয়ার সাহিত্য শুধু নয়, কোরিয়ার ইতিহাসও জানবে। কোরীয় সাহিত্য বিশ্বের সব সাহিত্যের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ায় আন্তঃগ্রন্থিকতা নির্মাণ করবে। নেবে আর দেবে এবং এভাবে সবাই পরস্পরকে সমৃদ্ধ করবে। এই উপলব্ধির জায়গায় স্পন্দন সৃষ্টি করতে পারা হ্যান ক্যাং-এর একটি বড় অর্জন বটে।