বাংলাদেশিদের জাতীয় জীবনে নতুন সংযোজিত স্মরণীয় দিন হচ্ছে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব। ছাত্র-জনতার বহু ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই অবিস্মরণীয় কীর্তিগাথা অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিপ্লব আকস্মিকভাবে সংঘটিত হয় বলে প্রতীয়মান হলেও এর পেছনে বহুবিধ কারণ ও উপাদান সক্রিয় থাকে। পৃথিবীতে সংঘটিত বিপ্লবসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সুদীর্ঘ কালব্যাপী অসাম্য ও প্রবঞ্চনার প্রতিক্রিয়া; শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক সাধারণ জনগণকে নানাভাবে নির্যাতন; দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা; মুদ্রাস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের অগ্নিমূল্য, খাদ্য ঘাটতিসহ নানাবিধ কারণে জনগণকে বিপ্লব সংঘটনে বাধ্য করেছিল। বাংলাদেশের চব্বিশের বিপ্লবও এর ব্যতিক্রম নয়; এর চরিত্রও প্রায় একই। ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত খুব সময়ই বাংলাদেশের জনগণ গণতান্ত্রিক শাসনের নির্যাস পেয়েছে। অধিকাংশ সময় এখানে গণতন্ত্রের নামে একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র এবং স্বৈরতন্ত্র শক্তিশালীভাবে কার্যকর ছিল। আর বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এখানে অতি নিকৃষ্টমানের স্বৈরশাসন বলবৎ ছিল। নিকৃষ্ট এই স্বৈর প্রশাসন পুরো দেশে ভয় এবং ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে এদেশের মানুষের ওপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে মানুষের ন্যূনতমও স্বাধীনতা দিতে নারাজ ছিল পতিত ফ্যাসিস্ট সরকার। বলা যায় ‘জুলাই বিপ্লব’ বাংলাদেশের মানুষের বহু কাক্সিক্ষত ও বহু প্রত্যাশিত বিপ্লব। এই বিপ্লব বাংলাদেশের মানুষকে নতুন করে বাঁচার এবং নতুন স্বাধীনতার বারতা নিয়ে এসেছে।
১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা বিজয় এ অঞ্চলের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। ত্রয়োদশ শতকের শুরু থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এই সুদীর্ঘ সময় বাংলায় বলবৎ ছিল মুসলিম শাসন। এই সুদীর্ঘ সময়ে মুসলিম শাসকদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা নামক ভূ-খণ্ডটি আখ্যায়িত হতে থাকে স্বর্গরাজ্য, ভারতের বেহেশত, বিশে^র জান্নাত, সোনার বাংলা প্রভৃতি নামে। এই সময় বাংলার সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। মুসলিম শাসকদের সহযোগিতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও এক নবযুগ সূচিত হয়।
মুসলমানদের বাংলা বিজয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বহুবিধ উপকার সাধিত হয়। মুসলিম শাসনামলে ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রাষ্ট্রীয়ভাবে পিষ্ট বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। ড. আহমদ শরীফের ভাষায়, এই বিজয়ের ফলে কেবল সদ্ধর্মীদেরই পীড়ন মুক্তির নিঃশ্বাস পড়েনি, বাংলা ভাষারও সুদিনের শুরু হয়েছিল। কেননা ইতঃপূর্বে বাংলাভাষা রাজ-রাজড়াদের কাছে ‘ইতর’দের ভাষা হিসেবে অপাঙক্তেয়, অনাদার ও উপেক্ষার পাত্র ছিল। মুসলিম শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার ফলে বাংলার সর্বত্র প্রসার লাভ করেছিল।
শাহ মুহাম্মদ সগীরের ইউসুফ জুলেখা, বড়– চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, কৃত্তিবাসের রামায়ণ, মালাধর বসুর (গুনরাজ খান) শ্রীকৃষ্ণবিজয়, কবি জৈনুদ্দীনের রসূলবিজয়, বিজয় গুপ্তের পদ্মাপুরাণ, কবিচন্দ্র মিশ্রের গৌরীমঙ্গল, কবীন্দ্র পরমেশ্বর দাসের মহাভারত, শ্রীকর নন্দীর অশ্বমেধপর্ব, বৈষ্ণব সাহিত্য বাংলার তুর্কি আফগান সুলতান সুবাদারের প্রতিপোষণে রচিত হয়েছিল।
মুসলিম শাসকদের আগ্রহ ও প্রতিপোষণে কৃষ্ণ রামদাস, দৌলত উজির বাহরাম খান, মুকুন্দরাম, ভারতচন্দ্র, রামপ্রসাদ, মুকিমসহ অনেকেই কাব্য রচনা করেছেন। আহমদ শরীফ বলেন, ‘বাংলাদেশে সবাই দেশজ মুসলমান। তাই বাংলা সাহিত্যের উন্মেষ যুগে সুলতান-সুবাদারের প্রতিপোষকতায় কেবল হিন্দুরাই বাংলা সাহিত্য সৃষ্টি করেনি, মুসলমানেরা তাঁদের সাথে সাথে কলম ধরেছিলেন এবং মধ্যযুগের বাঙালি মুসলমানগণের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এই যে, ধর্ম প্রেরণাবিহীন নিছক সাহিত্যরস পরিবেশনের জন্য তাঁরাই লেখনী ধারণ করেন। আধুনিক সংজ্ঞায় বিশুদ্ধ সাহিত্য আমরা তাঁদের হাতেই পেয়েছি। কাজের বিষয়বস্তুতে বৈচিত্র্যদানের গৌরবও তাদের। মুসলমান কবিগণ যখন আধুনিক সংজ্ঞায় বিশুদ্ধ সাহিত্য প্রণয়োপাখ্যান রচনা করেছিলেন, হিন্দু লেখকগণ তখনো দেবতা ও অতিমানব জগতের মোহমুক্ত হতে পারেননি।’
চৌদ্দ শতকের শেষ কিংবা পনেরো শতকের প্রথম দশকে রচিত হয় শাহ মুহম্মদ সগীরের (১৩৮৯-১৪১০খ্রি.) ইউসুফ-জুলেখা। এটিই সম্ভবত গোটা আধুনিক উপমহাদেশীয় সাহিত্যে প্রথম লৌকিক প্রণয়োপাখ্যান। ষোলো শতকে দৌলত উজির বাহরাম খানের ‘লায়লি-মজনু’, মুহম্মদ কবীরের ‘মধুমালতী’, শাহেরাবিদ খানের ‘বিদ্যাসুন্দর’। সতেরো শতকের উপাখ্যান হচ্ছে দোনা গাজীর ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’; কাজী দৌলতের ‘সতীময়না-লোর-চন্দ্রানী’; আলাউলের ‘পদ্মাবতী’, ‘সয়ফুলমুলুক বদিউজ্জামাল’, ‘সপ্ত পয়কর’, ‘রতন কলিকা’; মাগন ঠাকুরের ‘চন্দ্রাবতী’, আবদুল হাকিমের ‘লালমোতি সয়ফুলমুলক’, ‘ইউসুফ জোলেখা’; নওয়াজিস খানের ‘গুলে বকাউলি’; পরাগলের ‘শাহপরী’; মঙ্গলচাঁদের ‘শাহজালাল-মধুমালা’; সৈয়দ মুহম্মদ আকবরের ‘জেবল মুলক শামারোখ’; আবদুল করম খোন্দকারের ‘তমিম আনসারী’; শরীফ শাহের ‘লালমোতি সয়ফুলমুলক’। আর আঠারো শতকে রচিত হয়েছে মুহম্মদ রফিউদ্দিনের ‘জেবল মুলক শামারোখ’; শাকের মাহমুদের ‘মনোহর মধুমালা’; নূর মুহাম্মদের ‘মধুমালা’; ফকির গরীবুল্লাহর ‘ইউসুফ জোলেখা’; সৈয়দ হামজার ‘মধুমালতী’, ‘জৈগুনের কেচ্ছা’; মুহম্মদ আলীরজার ‘তমিম গোলাম চতুন্নছিলাল’, ‘মিশরীজামাল’; মুহম্মদ আলীর ‘শাহপরী মল্লিকাজাদা’, ‘হাসান বানু’; আবদুর রাজ্জাকের ‘সয়ফুলমুলুক লারবানু’; শমশের আলীর ‘রেজওয়ান শাহ’ এবং মুহম্মদ জীবনের ‘বানু হোসেন বাহরাম গোর’, ‘কামরূপ কালাকাহ’, খলিলের ‘চন্দ্রমুখী’ প্রভৃতি।
মুসলমান কবিগণ এক বিরাট জীবনী সাহিত্যও সৃষ্টি করেছেন। চরিতাখ্যানের মধ্যে উল্লেখ্য জৈনুদ্দিনের ‘রসুল বিজয়’ (১৪৭৩ খ্রি.), সৈয়দ সুলতানের ‘নবিবংশ’ (১৫৮৬ খ্রি.), শাহ বারিদ খানের ‘হানিফার বিজয়’ ও ‘রসুল বিজয়’; শেখ ফয়জুল্লাহর ‘গাজী বিজয়’; শেখ চাঁদের ‘রসুল বিজয়’; নসরুল্লাহ খোন্দকারের ‘জঙ্গনামা’, আবদুন নবির ‘আমীর হামজা’; গরিবুল্লাহর (পশ্চিমবঙ্গ) ‘আমীর হামজা’, হাতেম তাই’, উজীর আলির ‘নসরে উসমান ইসলামাবাদ’ (কুলজী-মূলক) এবং বিভিন্ন কবির ‘কাসাসুল আম্বিয়া’, ‘সিফাতুল আম্বিয়া’ ও অন্যান্য আউলিয়া কাহিনি প্রভৃতি।
কারবালার কাহিনি নিয়েও অনেক যুদ্ধকাব্য ও মর্সিয়া সাহিত্য গড়ে উঠেছে। এগুলো সাধারণত ‘জারি’ ও ‘জঙ্গনামা’ নামে পরিচিত। এ-বিষয়ক ফারসি কেতাব মক্তুল হোসেনকে আদর্শ করেই বাংলা জঙ্গনামাগুলো রচিত হয়েছে। বাংলায় মক্তুল হোসেন বা জঙ্গনামার আদি কবি দৌলত উজির বাহরাম খান (১৬ শতক)। দ্বিতীয় কবি শেখ ফয়জুল্লাহ। ইনি জায়নবের চৌতিশা নামে বিলাপ রচনা করেন। তৃতীয় কবি মুহাম্মদ খান। ইনিই জঙ্গনামার শ্রেষ্ঠ কবি। তাঁর কাব্যের নাম মক্তুল হোসেন। এরপর যাঁরা জঙ্গনামা রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে হায়াৎ মাহমুদ, জাফর, গরিবুল্লাহ, সফী উদ্দিন, সা’দ আলী, আলি মোহাম্মদ, জিন্নাত আলী, হামিদুল্লাহ খান, আবদুল ওহাব, রাধাচরণ গোপ, মুহম্মদ মুন্সী, আবদুল হামিদ ও জনাব আলীর নাম উল্লেখ্য। এ ছাড়া রাগ-তাল, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসাশাস্ত্র, তুকতাক প্রভৃতি নানা বিষয়ক অনেক রচনা পাওয়া যায়। এভাবে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি, পুষ্টি ও বৈচিত্র্যের মূলে রয়েছে মুসলমানদের বিশেষ সাধনা ও দান।
ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খলজির মাধ্যমে বাংলায় যে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয় তার মাধ্যমে এদেশের সার্বিক ক্ষেত্রে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয় এবং এক বিস্ময়কর মানবিক চৈতন্যবোধের জন্ম হয়। ইসলামের অন্তর্নিহিত শক্তি ও প্রেরণা, উদার, অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন মানবিক আবেদন, ইসলামের প্রচারশীলতা ও ইহলৌকিকতা এবং এর সাম্যভিত্তিক বিধিবদ্ধ সামাজিক আইন এই এলাকার মানুষের জন্য আশীর্বাদ বয়ে আনে। অভিন্ন ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ায় স্বতন্ত্র ধর্ম বিশ্বাস ও আলাদা জীবনাচরণের মাধ্যমে ধর্মীয় জীবনের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেও বসবাস করেছে।
১৭৫৭ সালে পলাশীতে মুসলমানদের ভাগ্য বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে পাঁচশ‘ বছরের মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ক্ষমতা চলে যায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। মুনাফাকে কেন্দ্র করে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাকে শাসন করতে শুরু করে এবং তারা নজিরবিহীন শোষণ ও লুণ্ঠনে লিপ্ত হয়। বিলীন হয় স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ মানুষের নিরাপত্তা, মুসলিম শাসক, জমিদার ও বিত্তশালী পরিবারগুলো অস্তিত্বহারা হয় এবং মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রতিপত্তিশালী ও উন্নত মুসলিম সমাজ অনুন্নত অবস্থায় পতিত হয়। মুসলিম সমাজের সর্বত্র হতাশা ও নৈরাজ্য সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত মুসলমানদের সমৃদ্ধি নষ্ট করে। উপরন্তু মুসলিম শাসক কর্তৃক প্রদেয় জায়গির এবং লাখেরাজ সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হয় মুসলিম সাধক ও প-িতদের নিকট হতে। ফলে মুসলিম সম্প্রদায় রাতারাতি নিঃস্ব সম্প্রদায়ে পরিণত হয়। মুসলমানগণ হয়ে পড়েন অশিক্ষিত, দরিদ্র ও অনুন্নত। তারা ব্রিটিশ শাসন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান; ইংরেজরাও তাদেরকে বিশ্বাস করত না। এ সময় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা ব্রিটিশ শাসন মেনে নেয় এবং কোম্পানির শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করে। স্বভাবতই ইংরেজ শাসকগণ হিন্দুদিগকে বিশ্বাস করে এবং তাদেরকে অনুগ্রহ করে। অর্থাৎ শাসকের গোষ্ঠী মুসলমানগণ নিভৃতে চলে যান আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন হিন্দু জনগোষ্ঠী। এই সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে পরবর্তীতে কলকাতাকেন্দ্রিক এক নব্য এলিট শ্রেণির জন্ম হয়-যারা ছিল উচ্চবর্ণীয় হিন্দু। এদের মধ্য থেকে একটি শ্রেণি ইংরেজদের মতো হওয়ার চেষ্টা করেছে এবং আরেকটি শ্রেণি ইংরেজ শিক্ষা ও ভারতীয় ঐতিহ্য নিয়ে বড় হতে চেয়েছে। এসবের প্রভাব সাহিত্য ও সংস্কৃতির জগতে পড়ে। মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ অনেকে পশ্চিমা সাহিত্যের সাথে বাংলা কাব্যের যোগসূত্র স্থাপন করে বাংলা সাহিত্য জগতে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। নাটক ও কাব্যে বাংলা সাহিত্য নতুন যুগে প্রবেশ করে। বঙ্কিমচন্দ্রের হাত ধরে বাংলা ভাষা সাহিত্যের ভাষায় রূপান্তরিত হয় এবং বরীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাকে বিশ^-সাহিত্যের দরবারে উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেন। এসব সাহিত্যিকদের মধ্যে রাজা রামমোহন রায়, ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রমুখ ইংরেজি শিক্ষাকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত খ্রিস্টান ধর্ম পর্যন্ত গ্রহণ করে নেন। শুধু তাই নয় তিনি নিজ সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করে বসেন। বাংলা উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের জনক বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজ শিক্ষায় ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হলেও হিন্দুত্ববাদকে অগ্রাধিকার দিতেন। তিনি উচ্চবর্গীয় হিন্দুদের বিশেষ স্থান দিতেন আর সচেতন ও নিম্নবর্ণের হিন্দুদের অবজ্ঞা এবং তুচ্ছতার চোখে দেখতেন; মুসলমানদের করতেন চরম ঘৃণা।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য যাত্রা শুরু করেছিল ধর্মীয় বিষয়বস্তু নিয়ে। কিন্তু পরবর্তীতে তাতে দৈহিক প্রেমের রগরগে কাহিনীসহ নানাবিধ বিষয়াবলি সংযুক্ত হয়। তবে উপনিবেশ যুগে বাংলার সাহিত্যিকগণ দেবতা ও পুরাণ থেকে সরে এসে সমকালীন মানুষকে সাহিত্যের অনুষঙ্গ বানিয়ে ফেলেন। নববর্ষ, পিঠাপুলি, ঋতুর সৌন্দর্য; এমনকি পাঠা এবং তপসে মাছও বাদ পড়নি তাদের রচনা হতে। নীলকরদের অত্যাচার, দুর্ভিক্ষ, মাতৃভাষা, স্বদেশ ইত্যাদি বিষয়ও সাহিত্যের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে। বিদ্যাসাগরের রচনায় পৌরাণিক কাহিনীগুলোতে মানবিকরূপ প্রতিফলিত হয় এবং ঈশ^রচন্দ্র গুপ্তের রচনায় ওঠে আসে সমকালীন জীবনচিত্র। মাইকেল মধুসূদন, হেমচন্দ্র, বিহারীলাল, রঙ্গলাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গড়ে তোলেন অসাধারণ বাংলা সাহিত্যের ভা-ার। এসব সাহিত্যিকদের রচনায় ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাব লক্ষণীয়। উল্লেখ্য যে, এ সময়ের সাহিত্যে মুসলমানদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। অনেক ঐতিহাসিক ক্ষমতা দখলকারী ইংরেজদের পদলেহন করত আর বিত্ত-বৈভব হারানো মুসলমানদের ‘বহিরাগত’ বলে গালি দিয়ে সুখানুভব করত। সাতচল্লিশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময় হতে এ পর্যন্ত মোটামুটি এমন ধারাই বলবৎ আছে।
আমরা শুরুতেই বলেছি বাংলাদেশিদের জাতীয় জীবনে নতুন সংযোজিত স্মরণীয় দিন হচ্ছে চব্বিশের জুলাই বিপ্লব। এ বিপ্লবের প্রতিটি বিষয় বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। একটা জাতির জীবনে জাতীয় সঙ্গীতের প্রভাব অপরিসীম। কিন্তু এই বিপ্লবে কোথাও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন না। আমাদের তরুণ প্রজন্ম বিশেষ করে ছাত্ররা ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির আইকন হিন্দুত্ববাদী রবীন্দ্রনাথকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে সাম্যবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে তুলে ধরেছেন। এই মানসিকতাকে ‘হিন্দু-বিদ্বেষী’ মনোভাব বলারও সুযোগ তারা রাখেননি, কেননা দ্বিজেন্দ্রনাথ লাল রায়ের ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা আমাদের এই বসুন্ধরা’কে আবেগ দিয়ে ধারণ করেছেন। এ বিপ্লবে মানবতাবাদী ও বিদ্রোহী কবির অবিনাশী গান ও লেখনী অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে অনুপ্রেরণা হিসেবে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। স্লোগান, মিছিল, গ্রাফিতি সব কিছুতেই ছিল তার সরব উপস্থিতি। চব্বিশের এই বিপ্লবে তিনি ছিলেন যে কোনো সময়ের চেয়ে অগ্রগামী ও অনুকরণীয় পথিকৃৎ। এই বিপ্লবে তিনি নিপীড়িত ও মজলুম মানুষের সাথে বিলীন হয়ে গিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে ছাত্ররা পরম মমতায় কবিকে ধারণ করে। তারা কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে ওঠে ‘মোরা ঝঞ্ঝার মতো উদ্দাম।’ তারা দ্বীন্ত কণ্ঠে গাইতে থাকে,
কারার ঐ লৌহ কপাট
ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট।
মুক্তি পাগল মানুষের এমন দীপ্ত উচ্চারণে কেঁপে ওঠে জালিমশাহীর মসনদ। ‘গাজনের বাজন বাজা! কে মালিক? কে সে রাজা?’ এসব গান ফ্যাসিস্ট সরকারের বুকে শেল হিসেবে বিদ্ধ হয়। রিলস, ফেসবুক, টুইটার সব কণ্ঠ একাকার হয়ে যায় কবির কণ্ঠের সাথে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানে যেমন সা¤্রাজ্যবাদী, ফ্যাসিবাদী, নিপীড়নকারী শক্তি পরাজিত হয়েছিল ঠিক তেমনি চব্বিশের বিপ্লবেও পতিত স্বৈরাচার মুখ থুবড়ে পড়ে নজরুল-গানের মোহিনী শক্তির কাছে। বিজয় পরবর্তী সময়েও কবি মানুষের মনের কোঠরে সযত্নে লালিত হয়েছেন। বিজয় পরবর্তী গ্রাফিতিতে পুরো বাংলাদেশ যেন নজরুলময় হয়ে ওঠে। এ যেন আমাদের আবেগ আর ভালোবাসার যথার্থ যথার্থ স্ফুরণ। চব্বিশের জুলাই বিপ্লব এটাও স্মরণ করিয়ে দিল নজরুলই আমাদের জাতীয় চেতনার কবি; জাতীয় ঐক্যের কবি।