[কামরুল হাসান ১৯৭৬ সালে জয়পুরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। মাধ্যমিক স্তরে পড়াকালীন দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে লেখালেখিতে প্রবেশ। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আরবি বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন ২০০২ সালে। বর্তমানে তিনি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। পাশাপাশি চারুকলা বিভাগে চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন।
সমাজ বাস্তবতা ও পুনর্গঠন ড. হাসানের চিন্তনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বাস আর কল্পনার দোলাচালে তিনি সর্বদাই বিশ্বাসী মসিযোদ্ধা। আরবি সাহিত্যের অনুধ্যান ও বাংলা সাহিত্যে রূপান্তর তার কর্ম প্রচেষ্টার বড় অংশ। বাংলা ও আরবি সাহিত্যের সেতুবন্ধন সৃষ্টিতে তার ভূমিকা স্বচিহ্নিত। মৌলিক ও অনুবাদ মিলিয়ে তার বইয়ের সংখ্যা তিন ডজনের বেশি। ড. কামরুল হাসান একাধারে দক্ষ অনুবাদক, সন্ধানী সাহিত্যচিন্তক, সংস্কৃতি বিশ্লেষক এবং জনপ্রিয় বাগ্মী, আলোচক ও উপস্থাপক। সাহিত্য-সংস্কৃতির নানা প্রসঙ্গ নিয়ে তার সাথে আলাপে যুক্ত হন তরুণ লেখক ও গবেষক ইয়াসিন মাহমুদ। গুরুত্বপূর্ণ সেসব আলাপের চম্বুক অংশ নতুন এক মাত্রার পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হলো।]
এখন কী লিখছেন?
আপনাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই। বহুল প্রচারিত নতুন এক মাত্রার সাক্ষাৎকারের জন্য আমাকে মনোনীত করেছেন। অতি সম্প্রতি লেখালেখি হয়ে উঠছে না। কিংবা খুবই অল্প লেখা হচ্ছে। বিশেষত বিপ্লব পরবর্তি দিনগুলোতে দেশ উন্নয়নে মাথা দেয়াতে এবং আপন কর্মস্থলের পেশাগত দায়িত্ব বৃদ্ধি পাওয়াতে লেখালেখির ফুসরত একেবারেই কমে গেছে।
অবশ্য এর মধ্যেও মিশরীয় আরবি ছোটগল্পের অনুবাদ প্রকল্পের কাজ চলছে ঢিমে তালে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বাসী গান ও কবিতার ভাষান্তরে হাত দিয়েছি। পাশাপাশি আল-কুরআনুল কারিমের নান্দনিক সৌন্দর্য্যের অন্যতম আকর উপমা নিয়ে কাজটি শেষের পথে। বইটি প্রকাশের শেষ প্রস্তুতি চলছে।
আর আমাদের মতো যারা অপ্রথিতযশা লেখক তাদের ফরমায়েশী কাজের একটি ব্যাপার তো থাকেই। দেশের বিভিন্ন পত্রিকা ও ম্যাগাজিনের জন্য বিশেষ নিবন্ধ-প্রবন্ধ লেখালেখি চলছে নিয়মিত। সবমিলিয়ে বলা যায় লেখালেখির গতি কমে গেলেও একেবারে তা থেমে যায়নি। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা এজন্য যে, অনুবাদ এবং মৌলিক দুইয়ে মিলে কমবেশি লেখালেখি চলছে। অন্তত সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে যে সময় পাওয়া যায় লেখালেখির জন্য তাও কম নয়। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আর যারা আমাকে পাঠ করেন ভালোবাসেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।
উত্তরাধুনিক জামানায় উত্তর-ঔপনিবেশিক দৃষ্টির সাহিত্যকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
সর্বাগ্রে যে বিষয়টি উল্লেখ করতে চাই- সাহিত্যের উপর সংস্কৃতির সম্পর্ক অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। দেশ হতে উপনিবেশবাদের প্রস্থান বা বিলোপ হলেও তারা চলে যাবার কালে তাদের সংস্কৃতি পুরোটাই রেখে যায়। ফলে উত্তর-ঔপনিবেশিককালের সাহিত্যে অবয়ব বা ফরমেটে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। হয়তো কিছুটা রূপান্তর ঘটেছে।
আরও একটি বিষয় স্মর্তব্য যে, যারা উপনিবেশকালের সাহিত্যিক তারা অবশ্যই ঔপনিবেশিকতার মধ্যে বেড়ে উঠা মানুষ। ঔপনিবেশ সাহিত্য, সংস্কৃতির আলো-বাতাসে বেড়ে উঠেছেন। ফলে যখনই তারা সাহিত্য রচনায় হাত দিয়েছেন তখনই তাদের ঠোঁট বাধাগ্রস্ত হয়েছে। মন খুলে প্রাণ উজাড় করে লিখতে তারা বাধাগ্রস্ত হয়েছেন। মনের কথা মনের মতো করে লিখতে অসমর্থ হয়েছেন। কারণ প্রত্যেক ঔপনিবেশিক শক্তিই মসির স্বাধীনতা হরণ করতে সিদ্ধহস্ত হয়ে থাকে। এর ফলশ্রুতিতে আমরা দুনিয়াব্যাপী দেখতে পাই-উপনিবেশকালে এক জাতীয় সাহিত্যের চর্চা হয় যাকে আমরা প্রতিরোধী বা প্রতিবাদী সাহিত্য হিসেবে চিহ্নিত করি। বিশে^র সকল অঞ্চলে, সকল ভাষায় এর রূপ প্রায় এক ও অভিন্ন।
ইউরোপের কতিপয় রাজশক্তি ও পরাশক্তি দুনিয়াব্যাপী তাদের কলোনি গড়ে তোলে। সকল দেশকে তাদের সাংস্কৃতিক গোলাম বানানোর অবিনাশী প্রয়াসে মেতে ওঠে। আর ঐ জাতির, ঐ ভাষার, ঐ অঞ্চলের কবি-সাহিত্যিকরা এ নির্মমতার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হয়। গড়ে তোলে উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, এর প্রতিবাদে রচিত হতে থাকে এক অনন্য সাহিত্য যাকে আমরা ‘প্রতিবাদী সাহিত্য’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি।
বাংলাদেশের কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রমুখ সাহিত্যিকবৃন্দ এ ধারার অন্যতম। একইভাবে মিশরের জাতীয় কবি হাফিজ ইবরাহিম, মিশরীয় জাগরণের অগ্রদূত কবি মাহমুদ সামি আল-বারুদি, কবি ইসমাইল সাবরি পাশা, ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ, ফিলিস্তিনের আরেক কবি সামিহ আল-কাসিম প্রমুখের সাহিত্যে প্রতিরোধ ও প্রতিবাদের ঢের উদাহরণ পাওয়া যায়।
এভাবে প্রায় সকল দেশে এমন প্রতিবাদী সাহিত্যের সন্ধান মেলে। সামিহ আল-কাসিমকে তো শায়িরুল মুকাওমাহ বা প্রতিরোধী কবি অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়। উত্তর ঔপনিবেশ জামানায় যে সাহিত্য তাতে সাহিত্যে রাষ্ট্রীয় অনাচার না থাকলেও উপনিবেশিকদের রেখে যাওয়া সংস্কৃতি অটুট থাকে। ফলে এই কালের-সাহিতিকদের লেখায় বিদ্রোহ, প্রতিরোধ, প্রতিবাদের সুযোগ কম থাকে। এ সময়ের সাহিত্যে স্বাধীনতার গল্পকাহিনী, পরাধীনতার কষ্টকথা নতুন আদলে পুরান নির্মমতা, নিগ্রহের ইতিকথা ইত্যাদি সাহিত্যের উপজীব্য হয়ে দাঁড়ায়।
ঔপনিবেশকাল ও তৎপরবর্তীতে আরবি সাহিত্যে প্রতিরোধ সাহিত্যের সৃষ্টি হয়েছে অনেক বেশি। বিশেষত সুয়েজ খাল বিশ^রাজনীতির মূল কেন্দ্রে থাকায় মিশর নিয়ে মাথা ঘামিয়েছে ঔপনিবেশবাদী সকল রাষ্ট্র। বিশেষত মিশর নিয়ে বৃটেন ও ফরাসিদের চিন্তার কোনো শেষ ছিল না। সর্বোতভাবে তারা মিশরকে কব্জায় রাখতে নিগ্রহের সকল কৌশল প্রয়োগ করেছে। ফলে মিশরে গড়ে উঠেছে প্রতিরোধ সাহিত্যের এক সুবিশাল খাজাঞ্চি। ঔপনিবেশ আমলের সকল কবি ও সাহিত্যিকদের লেখায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রতিবাদের ঝংকার উঠেছে। জাতিকে সচকিত করতে তারা ছিলেন সদা সচেষ্ট।
মিশরের কালজয়ী ঔপন্যাসিক নাজিব কিলানী, ইয়াহইয়া হাক্কী, ইউসুফ ইদরিস, মারুন নাক্কাশ আল-লুবনানি প্রমুখ সাহিত্যিকবৃন্দ তাদের উপন্যাস, নাটক ও সাহিত্যকর্মে শোষিত ও বঞ্চিত জনতার পক্ষ নিয়ে বেনিয়া শক্তির বিরুদ্ধে কলমকে শানিত করেছেন।
আমাদের দেশে ঔপনিবেশিক শাসন আমলে কিংবা ঔপনিবেশ উত্তর কালে যে সকল কবি সাহিত্যিক কলম ধরেছেন যে-কোনো অর্থেই তারা মানবতা, মানবিকতার পক্ষে কথা বলেছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বৈষম্য নিরসন, মানবতার উত্থান, বেনিয়া শক্তির বিতাড়ন, জুলুমের অপসারণ, বৈরিতার অবনয়ন, অহিংসার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করেছেন। তাই আমরা মনে করি-ঔপনিবেশিক ও উত্তর ঔপনিবেশিক জামানায় লেখকরা প্রায় সর্বোতভাবে ছিলেন মানবতাবাদী। অবশ্য সকল যুগের সাহিত্যিকরাই মানবতাবাদী হয়ে থাকেন। আর এই জামানার সাহিত্যিকবৃন্দ মানবতাবাদের সাথে ছিলেন প্রতিবাদী এবং প্রতিরোধী। এর বাইরেও তারা ছিলেন বিদ্রোহী, দ্রোহের কবিতা, দ্রোহের গল্প, দ্রোহের উপন্যাস, দ্রোহের প্রবন্ধ, দ্রোহের নাটক উঠে এসেছে এই সময়ের সাহিত্যিকদের কলমে।
বিশ^সাহিত্যের অন্যতম সেরা সাহিত্য আরবি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে অনুভূতি কেমন?
ধন্যবাদ আপনাকে। আরবি সাহিত্যের শিক্ষানবিশ ও শিক্ষক হিসেবে আমার অনুভূতি অত্যন্ত গৌরবের। বিশ^ সাহিত্যের বৃহৎ অংশীদার আরবি সাহিত্যের রয়েছে সুবিশাল সাহিত্য খাজাঞ্চি। প্রতিটি শাখায় আরবি সাহিত্যেও রয়েছে সম্ভার।
আরবি সাহিত্যের কাব্য শাখা এত বেশি সমৃদ্ধ যে অন্য ভাষার সাহিত্যে তার তুলনা মেলা ভার। আরবি সাহিত্যের ইতিহাস আমাদের জানায় যে, আরব ভূখ- পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল যার প্রতিটি মহল্লায়, প্রতিটি বাড়িতে কবির জন্ম হতো। ওই আমলে আরবের প্রতিটি মানুষই কবি ছিলেন, কাব্য প্রতিভা ছিল তাদের জন্মগুন।
আরবি সাহিত্যের কাব্য শাখা প্রায় দুই হাজারের পুরনো। অথচ আজও তা সহজবোধ্য। আরবি কাব্য শাখার প্রাচীন কবিতাসমূহ ঢঙে, বৈচিত্রে, উপমায়, উৎপ্রেক্ষায় আজও অনবদ্য। বিশ্বের প্রায় সকল বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে সাহিত্যের পাঠ বর্তমানে সেখানেই আরবি কবিতার পুরাতন কবিতাগুলো পাঠ্যভুক্ত। এটা প্রকৃতই আমার জন্য অনেক আনন্দের ও গর্বের।
প্রবন্ধ সম্ভারে আরবি সাহিত্য প্রাচুর্যে ভরা। প্রবন্ধ সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের কিছু অনবদ্য সৃষ্টি আছে। যা অন্য কোনো সাহিত্যে নেই। অবশ্য উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প আরবি সাহিত্যে অধুনা আমদানীকৃত। উনবিংশ শতকের শুরু হতে এসব বিষয়ের আগমন ঘটে আরবি সাহিত্যে। অত্যল্প সময়ের মধ্যে নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্পে আরবি সাহিত্য এত বেশি সমৃদ্ধ হয় যে, বিশ্ববাসী আরবি সাহিত্যের অভূতপর্ব ঋদ্ধিতে অভিভূত হয়। এমন গতিময় ও প্রগতির সাহিত্য যে কারো জন্যই অতিব গর্বের।
আরবি সাহিত্যে সাহিত্যিকদের জীবন কাহিনি সত্যিই বৈচিত্রে পরিপূর্ণ। বিশেষত জাহেলি যুগের কবিদের জীবনগাঁথা নানা অনবদ্যতায় সৌন্দর্যম-িত। ঐ সকল কাহিনী আজ কিংবদন্তিতে পরিণত।
আরবি সাহিত্যের পাঠ, আরবি কবিতার অনুধ্যান যে-কোনো কাব্যপ্রেমিকে উন্নত মানবতার সবক শেখাতে সক্ষম। সমাজকে অনন্য সমাজে পরিণত করতে নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারে আরবি কবিতা। হযরত উমর রা. যথার্থই বলেছেন- তোমরা সন্তানদের আরবি কবিতা শেখাও। অবশ্যই তা তোমাদের সন্তানদের সভ্য করবে। এমন একটি সাহিত্যের বিদ্যার্থী হতে পেরে সত্যিই আমি আনন্দিত ও গর্বিত।
‘আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা’ নামে আপনার যে সিরিজ আছে সে সম্পর্কে জানতে চাই।
‘আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা’ নামে আরবি সাহিত্যের কবিসাহিত্যিকদের জীবন ও সাহিত্যকর্ম বিষয়ক চার খ-ে বই রচনা করেছি আমি। এই সিরিজটি বলা যায় আমার লেখা প্রথম মৌলিক গ্রন্থ। এই মঞ্জুষা সিরিজে প্রায় পয়ত্রিশের মতো আধুনিক আরবি সাহিত্যের দিকপালদের জীবনের কিয়দছটা ও সাহিত্যকীর্তি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলী ও ক্ষেত্র বিশেষে সাহিত্য নমুনা উল্লেখ করার চেষ্টা করেছি।
এই মঞ্জুষা সমগ্র রচনা নেপথ্যে কাজ করেছে- যেটি তা হলো আমরা ছাত্রজীবনে এই সকল কবি-সাহিত্যিকদের নাম শুনতাম। স্যারদের মুখ নিঃসৃত বক্তব্যের বাইরে তাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারতাম না। ছাত্রদের জানবার এ তৃষ্ণাকে নিবৃত করতে এবং বাংলা ভাষাভাষি পাঠকদের সামনে আরবি সাহিত্যের ঋদ্ধ খাজাঞ্চির ছিটেফোঁটা উপস্থাপন করতে আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা এক, দুই, তিন ও চার।
এই চার খ-ে আধুনিক আরবি সাহিত্যের ত্রিশের বেশি কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্পকারের জীবনী, সাহিত্যকর্ম ও সাহিত্য নমুনার অংশবিশেষ আলোচনা করার প্রয়াস পেয়েছি। এ সকল গ্রন্থে কেবল মিশরের কবি সাহিত্যিকবৃন্দ স্থান পায়নি। বরং আরব বিশে^র নানান দেশের যারা আরবি ভাষায় সাহিত্য করেন তাদের জীবনী ও সাহিত্যকর্ম এতে স্থান পেয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ আমরা যাদের নিয়ে লিখেছি তাদের মধ্যে রয়েছেন- আরবি সাহিত্যে রেনেসাঁ আমলের প্রবীণ কবি মাহমুদ সামী আল-বারুদি, আধুনিক আরবি সাহিত্যের কবি স¤্রাট আহমাদ শাওকি, ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ, লেবাননের দার্শনিক কবি জুবরান কাহলিল জুবরান, আধুনিক আরবি সাহিত্যের স্থপতি ত্বহা হুসায়ন, আরবি সাহিত্যের জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক ও ঐতিহাসিক ড. হুসায়ন হায়কল, বিশ^খ্যাত নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিম, ইসলামী উপন্যাস রচনার পথিকৃত ড. নাজিব কিলানি, তিউনিসিয়ার জাতীয় কবি আবুল কাসেম আল-শাবি, বুকার প্রাপ্ত কুয়েতি লেখক সাউদ আল-সানুসি, দুই ভূখন্ডের কবি খলিল মাতরান, মানবতার কবি সালাহ আব্দুস সবুর, প্রতিবাদী-প্রতিরোধী কবি সামিহ আল-কাসিম, ইসলামী মহাকাব্যের রচয়িতা আহমদ মুহাররামসহ প্রথিতযশা কবিবৃন্দের আলোচনা।
এই বইয়ের মাধ্যমে অন্তত আরবি সাহিত্যর পাঠক শ্রেণি বিশেষত যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত তাদের অনেকটা সুবিধা হয়েছে। অনেকগুলো কবি-সাহিত্যিকের জীবনী একত্রে পাওয়ায় তারা পরিশ্রম ও দৌড়াদৌড়ি থেকে মুক্তি পেয়েছে।
আরবি সাহিত্য মঞ্জুষা বইটির কল্যাণে আরব দেশসমূহের সাহিত্য-সংস্কৃতি-সভ্যতার পাঠ সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করার সুযোগ পেয়েছে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকশ্রেণি। বাংলা সাহিত্যের সাথে আরবি সাহিত্যের তুলনারও একটি সুযোগ পেয়েছি আমরা।
বিশ^সাহিত্যে আরবি সাহিত্যের অবস্থান কতটা সুদৃঢ়? বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে আরবি সাহিত্যের অনুবাদ কী আমরা পৌঁছাতে পারছি?
এটি অত্যন্ত সংগত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ কথা নিদির্¦ধায় বলা যায় বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে এখনও আরবি সাহিত্যের অবস্থান সুদৃঢ় হয়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন বিষয় আরবি সাহিত্য। তথাপিও আমরা ঢাবিতে আরবি সাহিত্যের কাক্সিক্ষত অবস্থান নিশ্চিত করতে পারিনি। এর পশ্চাতে প্রধান অন্তরায় হলো- বাংলাদেশে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের অর্থনৈতিক মর্যাদা সুনিশ্চিত করা যায়নি। আরবি বিভাগ সে অর্থে যথার্থ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পায়নি কোনো আমলেই। সমাজে আরবি সাহিত্যকে প্রায়শ ইসলামী সাহিত্যের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। কিংবা আরবি সাহিত্যর অমর প্রতিভা ইমরুল কায়েসকে কেন্দ্র করে নৈতিকতাবিরোধী বিষবাষ্প ছড়ানো হয় নির্দ্বিধায়।
অন্যদিকে আমরা যারা আরবি সাহিত্যের পাঠক, গবেষক, অনুশীলক রয়েছি আমাদের দায়ও রয়েছে অনেকখানি। আমরা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের নিকটে যথামাত্রায় আরবি সাহিত্যকে পৌঁছাতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি আগ্রহ দেখাতে পারিনি। ফলে আরবি সাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তা তার প্রকৃত স্থান স্পর্শ করতে পারেনি।
আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক যোগ্যতাসম্পন্ন ও দক্ষ অধ্যাপক থাকার পরেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ ও উদ্যোগের অভাবে আরবি সাহিত্যকে প্রান্তিক পাঠকশ্রেণির কাছে পৌঁছাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।
তবে এ কথা নিশ্চিত করে বলা যায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আরো বেশি পেলে আরবি ভাষার অর্থনৈতিক মর্যাদা সংরক্ষণ করতে পারলে, এ দেশের পাঠকশ্রেণির সামনে আরবি সাহিত্যের বাছাইকৃত অংশের অনুবাদ উপস্থাপন করতে পারলে নিশ্চয়ই দেশের বিশ^বিদ্যালয়সমূহে আরবি সাহিত্যের অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে।
অবশ্য এক্ষেত্রে আরব বিশ্ব ও তাদের দূতাবাসসমূহের এগিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে। তাদের ভাষা-সংস্কৃতি ও সভ্যতার সম্প্রসারণে বৃত্তি দেওয়া, কর্মসংস্থানে আরবির ছাত্রদের অগ্রাধিকার দেওয়া, দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে নানাবিধ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মসূচি হাতে নেওয়ার বিষয়গুলোও অনস্বীকার্য।
আরবি সাহিত্যকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠক সমাজের কাছে জনপ্রিয় করতে আপনার উদ্যোগ, সীমাবদ্ধতা ও আগামীর পরিকল্পনা কী?
একত্রে তিনটি প্রশ্ন, আরবি সাহিত্যকে বাংলা ভাষাভাষী পাঠকশ্রেণির কাছে সমাদৃত করতে আমার উদ্যোগ খুবই সামান্য। কিছু কিছু সাাহিত্যের অনুবাদ করে পাঠকের হাতে পৌঁছানোর চেষ্টা করি। অবশ্য আমার পাঠকশ্রেণির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে আমার ছাত্রছাত্রী। এর বাইরে সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামের আলোচনায় অংশগ্রহণ।
আর সীমাবদ্ধতা সে তো ঢের। আরবি সাহিত্যকে এ দেশে জনপ্রিয় করতে আমাদের প্রথম সীমাবদ্ধতা হলো- এখনও আমরা আরবি সাহিত্যের পাঠক শ্রেণি তৈরিতে সক্ষম হইনি। আরবি সাহিত্যের সুবিশাল খাজাঞ্চি দেশ ও জাতির কাছে উপস্থাপন করতে পারিনি। আরবি সাহিত্যের লোভনীয় জিনিসগুলো মানুষ হুমড়ি খেয়ে সংগ্রহ করবে সেই আগ্রহ ও বিপণন ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারিনি। একটি সাহিত্যবান্ধব সমাজ গড়তে আমাদের অক্ষমতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সব থেকে বড় কথা হলো- আমরা পেশাদার সাহিত্যিক হতে পারিনি। পেশাদারিত্ব না থাকলে অর্থসংকট দূরীভূত না হলে, অল্পে তুষ্টি মানসিকতা নিজের মধ্যে না জন্মালে এ সীমাবদ্ধতা দূর হবে না কোনোদিনও। আল্লাহ আমাদের সমস্যা দূর করে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার তৌফিক দিন।
আরবি সাহিত্য জনপ্রিয়করণে আমার আগামীর পরিকল্পনা এখনও অদৃশ্যমান। আসলে পরিকল্পনা নেওয়াই হয়ে ওঠেনি। তবে জুলাই বিপ্লব-২০২৪ পরবর্তী সময়ে এক ধরনের স্বপ্ন জাগানিয়া চিন্তা মাথায় ভর করছে। এবার হয়তো কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। সবকিছু মিলে বৈষম্যবিরোধী বাংলাদেশে বিদেশি সকল সাহিত্য যেভাবে মেলে ধরার সুযোগ পায় আরবি সাহিত্যও তা পেলে আরবি সাহিত্যের স্বর্ণদুয়ার জাতির সামনে উন্মুক্ত হবে নিঃসন্দেহে। আরবি তার স্বকীয় অবয়বে নিজেকে উপস্থাপনের সুযোগ পাবে।
সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, পৃষ্ঠপোষকতা, কর্মসূচি গ্রহণ, অনুবাদের পারিতোষিক নির্ধারণ, গ্রন্থাদি প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে হবে। তবেই বাংলাদেশে জনপ্রিয় সাহিত্যের কাতারে আরবিও তার সুনিশ্চিত অবস্থানের জানান দিবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
অনুবাদ সাহিত্যে আপনার আগ্রহ বেশি কেন?
অনুবাদ সাহিত্যে আগ্রহের কারণ আসলে ঐভাবে কখনও অনুসন্ধান করা হয়নি। তবে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের উপকারে আসার দায়বোধ থেকে হয়তো অনুবাদে আগ্রহের নেপথ্যে কাজ করে থাকতে পারে।
আরো একটি বিষয় মনে পড়ে। যখম আমি ছাত্র ছিলাম আরবি সাহিত্যের বিভিন্ন কোর্সের টেক্সট অনুবাদ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হতাম। প্রত্যাশা করতাম যদি এর কোনো অনুবাদ কাছে পেতাম তবে কতইনা ভালো হতো। শেষত নিজেই ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে বেশি কিছু গল্প-কবিতা-নাটকের অনুবাদ করি। স্যারদের কাছে অনুবাদ প্রত্যাশা করলে তাতে সম্মানিত স্যারবৃন্দ বেশি আগ্রহ দেখাতেন না। ফলে মনে অতৃপ্তি রয়েই যেত।
যখন শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলাম, তখন অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকরা বলতেন তোমাদের আরবির শিক্ষকরা তো আরবি নিয়ে কোনো কাজ করে না। উনারা আছেন কুরআন, হাদিস নিয়ে। অথচ আরবি হলো তোমাদের মাদার সাবজেক্ট। তাদের কথায় মনে হতো- অনেক দূর হতে তারা আরবির শিক্ষকদের যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাচ্ছেন কি না। সেই থেকেই- আরবি ভাষা ও সাহিত্য আমার জীবন, জীবন ধারণের উৎসভূমি। বাংলাদেশে আরবি সাহিত্য নিয়ে সঠিক প্রচারণা ও ছাত্রছাত্রীদের সহযোগিতার নৈতিক দায়িত্ব আমার কাঁধেও বর্তায় অনেকখানি। এই বোধ থেকে আরবি গল্প, কবিতা, নাটক, কথিকা ও প্রবন্ধের অনুবাদে হাত দেয়।
আরবি সাহিত্যের উন্নয়নে ও সম্প্রসারণে কী কোনো সংস্থা বাংলাদেশে কাজ করে? এর পরিধি বাড়ানোর ব্যাপারে আপনার পরিকল্পনা কী?
আরবি সাহিত্যের উন্নয়নে ও সম্প্রসারণে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কোনো সংস্থা কাজ করে বলে আমাদের জানা নেই। তবে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ তার নিয়মিত কাজের অংশে হিসেবে কখনও কখনও আরবি সাহিত্য সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রকাশ ও বিপণন করে থাকে।
অবশ্য সেক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস এর চেয়ে ব্যক্তি যোগাযোগের প্রভাব বেশি বলে প্রতীয়মান হয়। যেমন মুসলেহ উদ্দিন স্যারের আরবি সাহিত্যের ইতিহাস, ড. আ ব ম সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকীর আরবী প্রবাদ সাহিত্য, ড. আব্দুুল জলিলের কবি ও কবিতা সম্পর্কে রাসুল সা. ও সাহাবীদের মনোভাবসহ এমন জাতীয় কিছু বই প্রকাশে করেছে।
এর বাইরে বিআইআইটি, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার প্রভৃতি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আরবি সাহিত্য সংশ্লিষ্ট দু’একটি বই প্রকাশ করে থাকে। এটি তাদের দায় থেকে নাকি নিয়মিত প্রকাশনার অংশ সেটি আমি বলতে পারি না।
আরবি সাহিত্যের উত্থান পরিধি বৃদ্ধির পরিকল্পনা সম্পর্কে বলতে চাই- এজন্য পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। ব্যক্তি পর্যায়ে উদ্যোগ নিয়ে এ বিষয়ে বেশি কিছু করার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। রাষ্ট্র-উদ্যোগী হতে চাইলে রাষ্ট্রকে কৌশল ও নানামাত্রিক পরামর্শ দেওয়া যাবে। তবে সবার আগে দেশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আরবি উন্নয়ন একাডেমি কিংবা আরবি সাহিত্য পর্ষদ গঠনের উদ্যোগ নিতে হবে।
আধুনিক আরবি সাহিত্য মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে কী কী বৈশিষ্ট্যে আলাদা?
দেখুন আরবি সাহিত্যে মধ্যযুগ বলে কোনো যুগ বিভাগ নেই। যদি আধুনিক যুগ-পূর্ব সময়কে বুঝিয়ে থাকেন- তাহলে তো সে যুগে আরবি সাহিত্যে ছিল বিশ্বকোষ, অভিধান প্রণয়ন ও তার সমৃদ্ধির যুগ। সাহিত্যের বিনোদন শাখার উন্নয়ন এ যুগে লক্ষ্য করা যায় না। আর আধুনিক যুগে আরবি সাহিত্যের প্রসার হয়েছে সাহিত্যের সকল শাখায় যথামাত্রায়। নাটক, গল্প, কবিতা, ছড়া, কথিকা, উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, গদ্য-পদ্য, সমালোচনা, আত্মজীবনী, মহাকাব্য, কাব্যনাট্য, অপেরাসহ সাহিত্যের সকল শাখায়। আর যদি মধ্যযুগ বলতে রাজনৈতিক পরিভাষায় ৬ষ্ট ও ৭ম শতক বুঝানো হয় তবে সে সময় তো আরবি সাহিত্যের খাজাঞ্চি ছিল কবিতা দিয়ে পরিপূর্ণ। বিশ্ব সেরা কবিতা, মানোত্তীর্ণ কবিতা, চিরন্তন কবিতাসমূহের মালিক ছিল আরবি সাহিত্য। আধুনিক যুগের সাথে তার কোনো তুলনাই চলে না।
বিশ^সাহিত্যে কোন কোন দেশের আরবি সাহিত্য সম্মানের জায়গা করে নিয়েছে? কেন?
সত্যি বলতে আরবি সাহিত্য বিশ্ব সাহিত্যের অনিবার্য অংশ। আরবি সাহিত্য ব্যতিরেকে বিশ্ব সাহিত্য অবশ্যই অপূর্ণাঙ্গ। রাষ্ট্রীয়-ভাষা আরবি এমন সকল দেশই আরবি সাহিত্যে নিয়মিত অবদান রেখে চলেছে। আরবি ভাষায় সাহিত্য অবদান রেখেছে নীল নদের দেশ মিশর। মিশরই আরবি সাহিত্যের প্রাণভূমি। আরবি সাহিত্যে অবদান রেখেছে মিশরের কবি, সাহিত্যিক, বোদ্ধা ও চিন্তকসমাজ। এরপরেই আমরা লিবিয়া, ইরাক ও ফিলিস্তিনের নাম করতে পারি। অবশ্য সাম্প্রতি কুয়েতের সাহিত্যিকরাও সবিশেষ অবদান রাখছেন। ১৯৮৮ সালে মিশরের নাজিব মাহফুজ নোবেল বিজয়ের পরে ২০১৩ সালে কুয়েতের সাদ সানুসি বুকার পুরস্কার লাভের মধ্য দিয়ে আরবি সাহিত্যের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুণ।
আরবি সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরির পেছনে রয়েছে সাহিত্যকদের দক্ষতা, রচনার বিষয়বস্তুতে মানবিকতা ও সামাজিকতার প্রাধান্য, রাজনৈতিক নিপীড়নের পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রভাব। জীবনের মূল্যায়নে মিশরীয় সাহিত্যিকদের নিষ্ঠতা ও পাঠক নন্দন রচনা উপস্থাপনের জন্যই আরবি সাহিত্যের পাঠ ও রস আস্বাদন বিশ্বব্যাপী এত জনপ্রিয়।
আরবি সাহিত্য ও বিশ^সাহিত্যে ফিলিস্তিনি সাহিত্যের কদর ও মূল্যায়ন কেমন?
আরবি সাহিত্য ও বিশ^ সাহিত্যে ফিলিস্তিনি সাহিত্যের কদর বেশ এবং মূল্যায়ন আশাব্যঞ্জক। আরব বিশে^ ফিলিস্তিনের পরিচিতি সুবিদিত। এটি ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক উভয় কারণেই। ফিলিস্তিন এশটি ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও লেগে থাকা অবিরাম সংগ্রাম ও সংঘর্ষের কারণেই গোটা বিশ্বের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে ফিলিস্তিন।
ফিলিস্তিনের সাহিত্য ও কবিতা তার শান ও মানের কারণেই বিশ্বে সমাদৃত। ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশ বিশ্বের অন্যতম সাহিত্য সম্পদ। একইভাবে সামিহ আল-কাসিম প্রতিরোধী সাহিত্যিক হিসেবে মজলুম ও নিপীড়িত জনতার অনুপ্রেরণার উৎস তার কাব্য সম্ভার। এর আগে অনেক কবি সাহিত্যিকের নাম আমরা বলতে পারব যারা ফিলিস্তিনের সাহিত্যকে বিশে^র দরবারে সর্বোচ্চ স্থাপন করতে সদা প্রয়াসী থেকেছেন।
আরবি অনুবাদ সাহিত্যের ভবিষ্যৎ কিভাবে দেখছেন?
ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য অসমীচীন। তবুও বলা যায় এমন কোনো উদ্যোগ পরিদৃশ্যমান নয় যা আরবি অনুবাদ সাহিত্যের উজ্জ্বলতার দৃষ্টান্ত হতে পারে। তবে অবশ্যই আমি আশাবাদী যে শীঘ্র এমন সাহিত্যবান্ধব দেশনেতা পাব যিনি বা যারা আরবি সাহিত্যকে বাংলাদেশি পাঠক-পাঠিকার কাছে পৌঁছে দিতে যথাযথ উদ্যোগ নিবেন। আমরা তেমন একটি ভবিষ্যতেরই কল্পনা করতে চাই। আমরা মনে করি- আরবি সাহিত্য যতবেশি অনুবাদ করে তুলে ধরা যাবে দেশ ও জাতি তত বেশি উপকৃত হবে। মনে রাখতে হবে-জীবনের প্রয়োজনে সাহিত্য, দেশ ও জাতির টেকসই উন্নয়নে সংস্কৃতি।
বাংলা সাহিত্য ও আরবি সাহিত্যের মাঝে কী কোন সম্পর্ক আছে? থাকলে কেমন?
আমরা জানি- সাহিত্য জীবনের দর্পণ, সাহিত্য জীবনের কথা বলে। মানবতার কথা বলে। বিশে^র সকল সাহিত্যেই- মানবতা ও মানবিকতার জয়জয়কার নিত্য-লক্ষ্যণীয়। অতএব সকল ভাষার সাহিত্যের সাথেই অপর ভাষার সাহিত্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এখানে উল্লেখ করা সমীচীন হবে বাংলা সাহিত্যের সাথে আরবি সাহিত্যের সখ্য একটু বেশিই বটে। কারণ আরবি সাহিত্যের প্রাণভূমি যদি মিশরকে কল্পনা করি তবে দেখতে পাব মিশর ও বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি একই রকম। দুই দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাও সমপর্যায়ের। দুই দেশই বৃটিশ বেনিয়ার কলোনি ছিল। ফলে এই দুই দেশের সাহিত্যও প্রায় একই পথে চলমান থেকেছে। এই দুই দেশের কবিদের মাঝেও রয়েছে অতীব সামঞ্জস্য। মিশরের জাতীয় কবি হাফিজ ইবরাহিম ও বাংলাদেশের কবি কাজী নজরুল ইসলামের মাঝে রয়েছে ব্যাপক মিল। কাব্যগাঁথা, বিষয় নির্বাচন, বৃটিশ বিরোধী বিদ্রোহ প্রভৃতি বিষয়ে তারা দুই জনই লিখেছেন সমানতালে।
আবার মিশরের কবি স¤্রাট আহমদ শাওকি এবং বাংলার কবি স¤্রাট রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেও রয়েছে অনেক সাদৃশ্য। এমন আরো অনেক সাদৃশ্য ও সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায় বাংলা ও আরবি সাহিত্যের প্রতিথযশা কবিদের মাঝে।
আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে কী কী বাধা আছে বলে মনে করেন?
আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদে নানাবিধ সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।
প্রথমত, আরবি ভাষার গভীরতার মূল্যায়ন আমাদের জন্য প্রায়শ কঠিন হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, আরব কালচারের সাথে আমাদের নিবিড় সখ্য না থাকায় আরবি সাহিত্যের যথাযথ অনুবাদ আমাদের জন্য কষ্টকর হয়ে থাকে।
তৃতীয়ত, আরবি সাহিত্যে ঐ দেশের আঞ্চলিক আরবির ব্যবহার আমাদেরকে অসহায়ত্বের মধ্যে নিপতিত করে সহজেই।
চতুর্থত, আরবি শব্দাবলির যথাযথ বাংলা শব্দের অফুরন্ত ভা-ার আমাদের আয়ত্বে না থাকায় আমরা সাবলীল অনুবাদে ব্যর্থতার ছাপ রাখি।
এমন আরো দু’চারটি সমস্যা ও প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে আরবি ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা ও অনুবাদ সম্পর্কে জানতে চাই।
যেকোনো ভিনদেশি ভাষার চর্চা ও সাহিত্য চর্চা অপেক্ষা বেশি হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশে আরবি ভাষা ভিনদেশী ভাষার মতো নয়। যেন এটি আমাদের মনেরই ভাষা। দেশের বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে আরবি ভাষার চর্চা অল্প-বিস্তর হয়ে থাকে। তবে আরবি সাহিত্যের চর্চা একেবারেই অপ্রতুল। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহেও আরবি সাহিত্যের চর্চা দেখা যায় না।
আরবি সাহিত্য-অনুবাদ প্রয়াসও অতি নগণ্য। অল্প কয়েকজন মানুষ আরবি সাহিত্য অনুবাদে সময় দিয়ে থাকেন। আরবির সকল পাঠক, গবেষক, শিক্ষক, বোদ্ধা আরবির অনুবাদে সক্রিয়ভাবে এগিয়ে না আসলে অনুবাদের বন্ধ্যাত্ব খুলবে না।
আরবি থেকে বাংলায় অনুবাদে আপনার কাজগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।
আলহামদুলিল্লাহ। ইতোমধ্যে আমি আরবি সাহিত্যের সুবিশাল ভাণ্ডার হতে অল্প কয়েকটি বইয়ের অনুবাদে সাহস দেখিয়েছি। এসবের মধ্যে নাটক, উপন্যাস, কথিকা, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও ইসলামী জ্ঞান বিষয়ক রচনা রয়েছে।
বিশ্বখ্যাত নাট্যকার তাওফিক আল-হাকিমের তেলাপোকার ভাগ্য, ইজিস, রাজা ইডিপাস, সবার জন্য খাদ্য, ফেরেস্তার প্রার্থনা, রাজা সুলাইমান ইত্যাদিসহ আলি আহমাদ বাকাছিরের অভিশাপ ও মাহমুদ তাইমুরের মরুর ঈগল প্রভৃতি নাটক রয়েছে। জনপ্রিয় ইসলামী ঔপন্যাসিক ড. নাজিব কিলানির জামরাদার স্বপ্ন, স্বর্ণরাঙা প্রভাত, আংগুরের রানি প্রভৃতি উপন্যাস এবং সুখ স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন নামে আরো দুটি ছোটগল্প সংকলনের অনুবাদ করেছি।
দার্শনিক কবি জুবরান কাহলিল জুবরানের দ্যা ম্যাডম্যান-এর অনুবাদও ইতোমধ্যে শেষ করেছি। আরো কিছু বইয়ের অনুবাদ প্রকল্পের অধীনে রয়েছে। আপনাদের কাছে দুআ আল্লাহর কাছে তাওফিক কামনা করছি।
বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রে কী ধরনের সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে ?
সমস্যাগুলোর কথা এর আগেও বলেছি। এর বাইরেও রয়েছে পাঠক ও বিপণন সমস্যা। স্বীকার্য সত্য এই যে, বাংলাদেশের সাধারণ পাঠকদের মাঝে আরবি সাহিত্য সম্পর্কে কেবল ভ্রান্তি নয় ভ্রান্তিবিলাস রয়েছে। এই ভ্রান্তিবিলাস দূর করতে অনুবাদকদেরই এগিয়ে আসতে হবে।
সৃজন, মনন ও অনুবাদে আগামী দিনে আপনার পরিকল্পনা কী?
আমি আগামী দিনে আমার পূর্ণ মনোযোগসহ সৃজনে থাকতে চাই। মননে নিবিষ্ট সময় কাটাতে চাই। অনুবাদ সাহিত্যের পাঠকদের মন জয় করতে চাই। অনুবাদ নিয়ে যত অপলাপ দূর করতে চাই। আল্লাহ আমাদের মেধা ও যোগ্যতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করে দিন।
রাষ্ট্র বা বাংলা একাডেমির কী কোন করণীয় আছে আরবি সাহিত্যের বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রে?
জ্বী, অবশ্যই করণীয় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতীত আরবি অনুবাদের ক্ষেত্রটি পূর্ণতা পাবে না। বাংলা একাডেমি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। এমন প্রতিষ্ঠানই ভাষা, সভ্যতা, সংস্কৃতি বিনিময়ের গুরুদায়িত্ব পালন করে থাকে। বাংলাদেশে আরবি সাহিত্য নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি থাকলেও এর পাঠক চাহিদাও রয়েছে। পাঠক চাহিদার কথা বিবেচনা করলে অবশ্যই বাংলা একাডেমির মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অন্য দেশের ভাষা ও সাহিত্যের সাথে আমাদের পরিচিতি সংঘটনের ব্যবস্থা করতে পারে অনায়াসেই। আরবির ক্ষেত্রে এটি আরও ফলপ্রসু ও উপাদেয় হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।