চব্বিশের বিপ্লবের মধ্যদিয়ে নতুন এক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। কাজেই সব জরাজীর্ণতাকে মাড়িয়ে দেশকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। একটা দেশের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংস্কৃতিকে কালচারের মাধ্যমে পরিবর্তন খুব জরুরী। তা না হলে সব বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য। চব্বিশের বিপ্লবের পর যে কালচার সামনে আনতে হবে তার জন্য একদিকে আমাদের হারিয়ে যাওয়া বাঙালি সভ্যতা থেকে যেমন রসদ সংগ্রহ করতে হবে অন্যদিকে সমকালীনতাকে ধারণ করতে হবে। উভয়ের সংমিশ্রণে এক নয়া কালচারাল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এক.
মুসলমান আগমনের আগে বাঙলা নামটির সাথেও এদেশের মানুষের পরিচয় ছিল না। মুসলমানেরাই প্রথম এদেশের খন্ড খন্ড অঞ্চল, একটা রাজনৈতিক ঐক্যে সংহত করে এর নামকরণ করেন বাংলা। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ খন্ড খন্ড অঞ্চলের রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত ঐক্য প্রতিষ্ঠিত করে বাঙলা নামের একটি দেশ, বাঙালি নামের একটি সংঙ্গবদ্ধ জাতি সৃষ্টি করেন। এবং নিজে শাহ-ই-বাঙালা উপাধি ধারণ করেন। মূলত মুসলমানরাই বাংলা ভাষার জনক। শ্রী দীনেশ চন্দ্র সেন লিখেছেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ই বঙ্গভাষার এই সৌভাগ্যের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল।’ মুসলমান আগমনের আগে বাংলা ভাষায় এমন কিছুই আবিষ্কৃত হয়নি যাকে সাহিত্য পদবাচ্য বলা যেতে পারে। ড. এম এ রহীম তার ‘বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘যদি বাংলায় মুসলিম বিজয় তরান্বিত না হত এবং এদেশে আর কয়েক শতকের জন্য হিন্দু শাসন অব্যাহত থাকত, তা হলে বাংলাভাষা বিলুপ্ত হয়ে অতীতের গর্ভে নিমজ্জিত হত।’ মুসলমান শাসকরাই ঘৃণিত ও অবহেলিত বাংলা ভাষাকে রাজ দরবারে আমন্ত্রণ জানান এবং বাঙালী কবি ও বিদ্বান ব্যক্তিদের প্রতি উদার পৃষ্ঠপোষকতা দান করেন। এর বহু নযীর উপস্থাপন করা যায়। সুলতান গিয়াস উদ্দীন আযম শাহ-এর পৃষ্ঠপোষকতায় বিপুল প্রতিভার অধিকারী মুসলিম কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর তাঁর বিখ্যাত কাব্য ‘ইউসুফ জুলেখা’ রচনা করেন, যা বাংলা সাহিত্যে বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল। সুলতান আলাউদ্দীন হুসাইন শাহের রাজত্বকালকে বাংলা সাহিত্যের স্বর্ণযুগ বলা হয়। মুসলমান কবিরাই ছিলেন বাংলা সাহিত্যে ইতিহাসবিষয়ক সাহিত্য রচনার পথিকৃত। সুলতান ইউসুফ শাহের সভাকবি শেখ জয়নুদ্দীনই প্রথম রাসূলুল্লাহ সা.-এর অসাধারণ জীবন বৃত্তান্ত অবলম্বনে রচনা করেন বিখ্যাত ‘রসূল বিজয়’ কাব্য। সুলতান বারবক শাহ-এর বিখ্যাত সেনাপতি দরবেশ ইসমাঈল গাজীর জীবন অবলম্বনে শেখ ফয়জুল্লাহ লেখেন ‘গাজী বিজয়’ কাব্য। এক কথায় মুসলমান কবিগণই বাংলাসাহিত্যকে নানাভাবে ঐশ্বর্যম-িত করে তোলেন। মুসলমান কবিরাই বাংলাসাহিত্যে আরবি-ফারসি সাহিত্যের মূল্যবান ঐশ্বর্য এনে বাংলা সাহিত্যের সম্পদ বৃদ্ধি করেন। মুসলমান কবিরাই বাংলা সাহিত্যে হিন্দু সাহিত্যের সম্পদও আনয়ন করেন। আলাওলের ‘পদ্মাবতী’ কাব্য মুসলমান কবিদের ওপর সেই প্রভাবের দৃষ্টান্ত বহন করে।
দুই.
বর্তমানের সাথে অতীতের মেলবন্ধন ঘটাতে হবে এবং যুগের জাহেলিয়াতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নতুন নতুন পরিভাষা হাজির করতে হবে। বাংলাদেশে নতুন পরিভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্রে দক্ষতা দেখিয়েছেন ফরহাদ মজহার। এছাড়া আর কেউ কালচারাল ক্ষেত্রে তেমন পরিভাষা সৃষ্টি করতে পারেনি। নতুন যারা কালচারাল অঙ্গনে কাজ করছে তারা অনেকেই ভালো কাজের পরিবর্তে মন্দটা হাজির করছে। অনেকেই কালচার মানে মনে করে শুধু গান গাওয়া। এজন্য তারা নাশীদ নিয়ে ব্যস্ত থাকে সর্বদাই। কিন্তু কালচারের মূল কাজগুলো অবহেলিতই থেকে যাচ্ছে। কালচারকে পুরো দমে এগিয়ে নিতে চাইলে আমাদের সর্বপ্রথম যে কাজটা করতে হবে তা হলো ভাষার বিনির্মাণ। আমাদের যে বাংলা ভাষা তার প্রকৃত রূপ ধ্বংস করেছে বৃটিশরা। বর্তমানে যে ভাষা আমরা পাচ্ছি এটা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ভাষা, এটা সংস্কৃত প-িতদের বানানো ষড়যন্ত্রমূলক ভাষা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহসহ আমাদের ভাষাবিজ্ঞানী যারা রয়েছেন তারা বাংলাকে আসল চেহারায় আনতে ব্যর্থ হয়েছেন, বরং তারা ওই বৃটিশদেরই সহায়ক হয়েছেন। বাংলা ভাষাকে আসল চেহারায় ফেরাতে দুইজন কবি সবচে বড় ভূমিকা পালন করেছেন; একজন জাতীয় কবি কাজীন নজরুল ইসলাম আরেকজন ফররুখ আহমদ। নজরুল কিন্তু বাংলাসাহিত্যে আরবি-ফারসি প্রথম ব্যবহার করেননি, বরং অনেক আগে থেকেই বাংলা ভাষাটাই ছিল আরবি-ফারসি মিশ্রিত। ওইটাই ছিল বাংলার আসল অবয়ব। নজরুল ওই রূপকে তুলে এনেছিলেন দক্ষতার সাথে। এজন্য তাকে বাংলাসাহিত্যের মুখপাত্র বলে আখ্যায়িত করা উচিত।
কাজেই নতুন করে ভাষার বিনির্মাণ এবং পরিভাষা সৃষ্টি নিশ্চিত করতে হবে। যেসব পরিভাষা বাংলায় নেই সেগুলো আরবি, ফারসি, ইংলিশ, জার্মান, ফ্রেঞ্চ, মান্দারিন, স্পেনিশ, জাপানিজ যে ভাষায় থাক না কেন সেখান থেকে তা বাংলায় আনতে হবে এবং তার আত্মীকরণ করতে হবে। যেমন সেলফির পরিবর্তে নিজস্বী বলার কোনো প্রয়োজন পড়ে না। সেলফিই এখন আমাদের জনগণের ভাষায় পরিণত হয়েছে। ফেইসবুক, ইউটিউব, গুগোল, ইনস্টগ্রাম, হোয়াটস্যাপ, টেলিগ্রাম, আইডি, মেজেঞ্জার, সেটিং, ফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট, পাসওয়ার্ড, পিন, কোড, ডাটা, এমবি, অনলাইন, অফলাইন, কল, মেসেজ- প্রভৃতি পরিভাষার এখন বিকল্প বাংলা পরিভাষার দরকার নেই। বরং এগুলোই এখন আমাদের ভাষা হিসেবে প্রবেশ করেছে। শুধু যোগ করতে হবে তাই-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ভাষা ও পরিভাষাকে মাইনাস ফর্মুলায় ফেলতে হবে। যেমন আমরা ‘উপাচার্য’ ব্যবহার করব না। আমরা এর পরিবর্তে ‘ভিসি’ (ভাইস চ্যান্সেলর) বলব। কারণ উপাচার্য আমাদের কালচার বহন করে না। আমাদের কালচারে প্রয়াতের জন্য দুই-চার মিনিট দাঁড়িয়ে নীরবতা পালনের কোনো প্রথা নেই, বরং আমাদের কালচার হচ্ছে মরহুমের জন্য দোয়া করা কিংবা মাগফিরাত কামনা করা। শেষকৃত্য শেষে মৃতের সৎকার করা আমাদের কালচার নয়, আমাদের কালচার হচ্ছে জানাযা শেষে দাফন করা। ভাষা ও পরিভাষাতেই বাংলাদেশের কালচার ফুটে ওঠে। আর কালচার হচ্ছে আমাদের পরিচয়। এর মধ্যদিয়েই আমাদের জাতিসতত্তার স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়। তাই এসবে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করতে হবে।
তিন.
আমাদের কালচারকে ধ্বংস করার জন্য হিন্দুত্ববাদীরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা কলকাতা থেকে বিভিন্ন পরিভাষা আমদানী করে আরবি ও ফারসি পরিভাষা বাদ দিতে চাচ্ছে। ড. শমশের আলী বলেন, “কথিত বুদ্ধিজীবীরা বলেন, ‘বাংলা হতে এই আরবি, ফারসি বাদ দিলে ভালো হয়’। কিন্তু সমস্যা হলো এই বাদ কথাটাই আরবি।’’ “বর্তমান সময়েও কোনো অভিধান খুললে অন্তত ২৫০০ আরবি, ফারসি উদ্ভূত বাংলা শব্দ পাওয়া যায়। বাস্তবে এ সংখ্যা আরো অনেক বেশি। মুসলমানী পুঁথি সাহিত্য এই শব্দগুলোকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে। শুনতে পাওয়া যায় পুঁথির মোট সংখ্যা ৮৩২৫টি। আর এসব পুঁথির ভাষাই আমাদের ভাষা।
বলা বাহুল্য যে এ দেশের কালচারের স্রষ্টাই মুসলিমরা। চিন্তাশীল, গবেষক সবাই এর স্বীকৃতি দেন। যেমন প্রফেসর যতীন্দ্রনাথ সরকার বলেছেন, “মুসলমানরা এ দেশে আসার আগে সংস্কৃতি এদেশে ছিল না।… শুধু যে বাংলাদেশেই সংস্কৃতির ভিত্তি ইসলাম তা নয়, সারা বিশ্বব্যাপী এর ভিত্তি। বিশ্বব্যাপী কালচারে ওপর ইসলামের প্রভাব রয়েছে। মুসলমানদের প্রবেশের পরে ইউরোপে সাংস্কৃতিক আন্দোলন এসেছিল। তার আগে তারা বর্বরতার গভীরে পৌঁছে গিয়েছিল।”
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন একটা সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ। যুদ্ধ বা আগ্রাসন তিন ধরনের হতে পারে। সামরিক আগ্রাসন, অর্থনৈতিক আগ্রাসন এবং সাংস্কৃতি আগ্রাসন। এই তিনটিরই উদ্দেশ্য এক ও অভিন্ন, দেশ জয় করা। আজকাল সৈন্য পাঠিয়ে দেশ জয় করার পুরনো পদ্ধতি অকার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো ভাবতে লাগল, যুদ্ধ ছাড়াই কীভাবে একটি দেশকে আত্মসাৎ করা যায়। অর্থনৈতিক শোষণের পথ আবিষ্কার করতে গিয়ে তারা দেখল একটা দেশের স্বাতন্ত্র্যবোধ ও জাতিসত্তা মুছে দিতে পারলেই চিরস্থায়ীভাবে সেই দেশটিকে পদানত করে রাখা সম্ভব। এই চিন্তার ফলশ্রুতি হিসেবেই আবিষ্কৃত হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বর্তমান ধারা।
স্বাধীনতা মানে জাতীয় মূল্যবোধের ভিত্তি স্থাপন। আমাদের স্বাধীনতা দীর্ঘ সময়েও প্রকৃত স্বাধীনতায় পরিণত হতে পারেনি। একটু গভীরভাবে অনুধাবন করলে বুঝতে কষ্ট হবে না যে, কালচারাল পরাধীনতাই এর কারণ। স্বাধীনতার পর সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার যে প্রয়োজন পড়ে, নিজস্ব তাহযীব ও তমদ্দুনী ধারার অনুগামী হতে হয়, সেই ধারাটি প্রতিষ্ঠা করতে আমরা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছি। যার ফলে স্বাধীনতার মুখোশ পরে দাসত্বের আয়োজন করেছি মাত্র। স্বাধীনতার পরপরেই এদেশের একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী নানান লোভ-লালসার বশবর্তী হয়ে আমাদের ঈমান-আকীদা, জাতীয় আদর্শ, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কালচার সবকিছু মুছে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। এসব বুদ্ধিজীবীর অধিকাংশই বিদেশী স্কলারশিপ, পদক, খেতাব, পুরস্কার এবং নগদ অর্থ প্রাপ্তির লোভে লালায়িত হয়ে আত্মবিক্রয় করে বিদেশের দালাল শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়েছেন।
একাত্তরকে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। একাত্তরভিত্তিক আলাদা ইতিহাস, সাহিত্য, কালচার, সিনেমা, নাটক ইত্যাদি দাঁড় করানো হয়েছে। এগুলোতে ইসলামী বিশ^াসকে শুধু এড়ানোই হয়নি। একইসাথে জোর করে একাত্তরের চেতনা প্রকাশের জন্য ইসলামী মূল্যবোধের বিরোধিতা করা হয়েছে, কটাক্ষ করা হয়েছে। ইসলামী বিশ্বাসকে অপদস্থ করা হয়েছে। ভারতের পয়সা পেয়ে এসব বুদ্ধিজীবী নামক দাসরা নিজেদের জাতিসত্তার পরিচয়কে বিকিয়ে দিয়ে অন্যের সংস্কৃতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন।
প্রতিটি সভ্যতা তার সাফল্যের চূড়ায় উপনীত হয় জাতীয় ঐতিহ্য, চেতনা এবং নিজস্ব কালচার চর্চার মাধ্যমে। ধর্মই সেই কালচারের পাদপীঠ রচনা করে। স্বাধীনতার পর জীবনের বিকাশকে রুদ্ধ করা হলো ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এক প্রকার ধর্মহীনতা আমদানী করে। এর পর জাতিসত্তা মুছে গিয়ে আমরা হলাম হিন্দুত্ববাদের সংস্কৃতির অনুসারী। এভাবেই আমাদের চিন্তা-চেতনায়, ঐতিহ্যরীতিতে, সাধে, অভিলাষে, ভারতীয় হিন্দু রাষ্ট্রদর্শনের দূরভিসন্ধিমূলক জাতীয়তাবাদের চেতনা এমনভাবে ইনজেক্ট করে দেওয়া হলো যে, মানুষ ভুলে গেল বাংলাদেশ নামক স্বাধীন রাষ্ট্রটির জন্ম-ইতিহাস কী, এর প্রয়োজনীয়তাই বা কী ছিল।
চার.
কমিউনিজমের পতনের পর পশ্চিমারা নতুন করে ইসলামের দিকে তাকাচ্ছে এবং ইসলামের প্রতি তারা আকৃষ্ট হচ্ছে, এটা পশ্চিমা সভ্যতার কাছে গ্রহণীয় নয়। পাশ্চাত্যের সংস্কৃতির ভিত খুবই দুর্বল, তাই মুসলিমদের শক্তিশালী কালচারকে তারা ভয় পায়। তাই হান্টিংটনের ফর্মুলায় তারা শুরু করেছে ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তথা সভ্যতার সংঘাত। তারা জেনে বুঝেই হামলা করেছে ইরাক, আফগানিস্তানে ইসলামী সভ্যতার চিহ্নসমূহ মুছে দিতে। ইসমাঈল রাজী আল ফারুকীর ভাষায়- “…একজন মুসলিম নিজে পাশ্চাত্যের অনুকরণ করতে গিয়ে প্রকৃতপক্ষে সে নিজেকে অসভ্যে পরিণত করছে। বড়জোর তাকে আধুনিককালের এক সাংস্কৃতিক দানব হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে।” অথচ আজ মজার বিষয় হচ্ছে আধুনিক বিজ্ঞানের মোকাবেলায় এই পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সকল ভিত্তি তথা ডারউইনবাদ, ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব, বস্তুবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও নাস্তিক্যবাদ বাতিল বলে প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির স্কলার প্যাট্রিক গাইন তার এড়ফ : ঞযব ঊারফবহপব গ্রন্থে লিখেছেন : “আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ ও নাস্তিক চিন্তাবিদরা সৃষ্টিকর্তা তথা আল্লাহ সম্পর্কে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অনুমান ও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তার প্রায় সবই বিগত দুই দশকের গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে।’’
পাঁচ.
যেসব জিনিসের মধ্যদিয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন পরিচালনা করা হয় তা হলো- ১. রেডিও ২. টেলিভিশন ৩. চলচ্চিত্র ৪. নাট্যশালা ও নাটক ৫. বিজ্ঞাপন শিল্প ৬. সংগীত শিক্ষালয় ৭. নাট্য বিদ্যালয় ৮. আর্টস্কুল ৯. ফ্যাশন শো ১০. মেলা ১১. জাদুঘর ১২. ভাস্কর্য ১৩. শিক্ষাঙ্গণ ১৪. লাইব্রেরি ১৫. খেলাধুলা ১৬. সংবাদপত্র ১৭. সাহিত্য ১৮. পাঠ্য-পুস্তক ১৯. সেমিনার ২০. এনজিও ২১. ধর্মাচরণ ২২. স্মরণোৎসব ২৩. রাজনৈতিক দর্শন ২৪. স্যাটেলাইট বা আকাশ সংস্কৃতি ২৫. ম্যাগাজিন ২৬. পণ্য ২৭. শিক্ষাবৃত্তি ২৮. উচ্চশিক্ষা প্রদান ২৯. স্বাস্থসেবা ৩০. এনজিও কার্যক্রম ও সহযোগিতা ৩১. এজেন্ট নিয়োগ ইত্যাদি।
আমাদের কালচার প্রতিষ্ঠা করতে এবং সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলায় সকল দিক ও বিভাগে বিশেষভাবে কাজ করতে হবে। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ দুর্বল রাষ্ট্র খুব সহজে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়। আর রাজনৈতিকভাবে দেশকে স্থিতিশীল করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হলো ভারতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। এর মোকাবেলায় সবার আগে চীন ও পাকিস্তানের সাথে ট্রেড রিলেশন ঠিক করতে হবে। আমদানি হওয়া প্রতিটি ইন্ডিয়ান প্রোডাক্টের ১০টি করে বিকল্প প্রোডাক্ট রেডি করতে হবে। স্থলবন্দরগুলো শক্তিশালী করতে হবে আর সমুদ্র বন্দর থেকে আগ্রাসী গোষ্ঠীর সব এজেন্ট হটিয়ে সুরক্ষা বলয় তৈরিতে সহায়ক শক্তিকে স্পেশাল এডভান্টেজ দিতে হবে। একই সাথে প্রতিবেশি বিকল্প শক্তির সাথে জোট গঠন করে বে অফ বেঙ্গলে মাঝেমধ্যেই সামরিক মহড়া করতে হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে আগ্রাসী শক্তির একটা স্ক্রুও যদি থেকে থাকে তা সাথে সাথেই রিপ্লেস করতে হবে। প্রতিবেশি অন্যান্য পারমানবিক শক্তিশালী রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়ে এয়ার ডিফেন্স, এন্টি ট্যাঙ্ক আর মেরিটাইম ডিফেন্স ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশ যত দ্রুত অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী হবে তত দ্রুত সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ব্যর্থ হবে। শুধু কবিতা আর সঙ্গীত দিয়ে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মোকাবেলা করা যায় না। এজন্য দরকার নিজের অবস্থান সকল দিক থেকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করা। আর সেজন্য দরকার আমাদের সত্যিকারের বড় একটি পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতি।