জরুলের সাহিত্য সাধনার ইতিহাস মাত্র তেইশ বছরকাল ব্যাপৃত। নজরুল তার সাহিত্য সাধনার শুরু থেকেই অবিশ্বাস্য খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা লাভ করেন। এক্ষেত্রে পরিচিত হন বিদ্রোহী কবি হিসেবে। অসংখ্য কবিতা, গান, বেশকিছু নাটিকা, প্রবন্ধ ও গল্প ছাড়াও তিনি, তিনটি উপন্যাস রচনা করেছিলেন। সেই তিনটি উপন্যাস হলো বাঁধনহারা (১৯২৭), কুহেলিকা (১৯৩১) ও মৃত্যুক্ষুধা (১৯৩১)। এই তিনটি উপন্যাসের মধ্যে সংগ্রামী চরিত্র রয়েছে যারা স্বদেশ প্রেমের জন্য জীবনে বড় ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতেও পিছপা হননি। বাঁধন-হারার নূরু, কুহেলিকার জাহাঙ্গীর ও মৃত্যুক্ষুধার আনসার চরিত্র।
নজরুল ছিলেন পরাধীন ভারতের নাগরিক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে উপলব্ধি করেছিলেন পরাধীনতার মর্মবেদনা। এই পরাধীনতার গ্লানি নজরুলকে মানসিকভাবে দমন করতে পারেনি বরং দিন দিন তাকে উদ্দীপ্ত করেছিলো। আর এ কারণে যে নির্যাতন-অত্যাচার সহ্য করতে হবে তাও তিনি ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন। আর তাইতো তিনি লিখতে পেরেছিলেন,
“শিকল পরে, শিকল তোদের করবো রে বিকল।”
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজ্উদ্দৌল্লার পরাজয়ে আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন সাধিত হয়। যার প্রভাব লক্ষ করা যায় উনিশ-বিশ শতকের সমাজসংস্কারক, রাজনীতিবিদ ও সাহিত্যিকদের জীবন ও কর্মে। উল্লেখ্য, হেমচন্দ্র (১৮৩৮-১৯০৩) স্বাধীনতাবোধ জাগিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) এবং দ্বিজেন্দ্রলাল (১৮৬৩-১৯১৩) এর কবিতা, গান ও নাটকেও স্বদেশপ্রেমের উপস্থিতি বিদ্যমান। আতাউর রহমান তাঁর “নজরুল: ঔপনিবেশিক সমাজে সংগ্রামী কবি” গ্রন্থ (পৃ. ১৮) উল্লেখ করেছেন এঁদের স্বাধীনতাবোধ ছিল দ্বিধান্বিত এবং স্বদেশপ্রেম ছিল খন্ডিত। সংকোচের বিহবলতায় আড়ষ্ট ছিল তাঁদের গতি। এর পেছনের কারণ উল্লেখ করে গ্রন্থকার লেখেন, প্রথমত. তখন ইংরেজ শাসনের অপকারিতা সম্পর্কেই ছিল অস্পষ্ট জ্ঞান ও চেতনা। অনেকের কাছে ভারতে ইংরেজ শাসন ভগবানের আশীর্বাদস্বরূপ বিবেচিত হয়েছিল। তাই পলাশীর আম্রকাননে সিরাজ-উদদৌলাহর পতন জাতির জন্য যে দুর্ভাগ্য এটি বুঝতে সময় লেগেছিল। পরবর্তীতে তাই কংগ্রেস কর্মীকে বলতে দেখি,
The English rule is better for security, education and railways. But for the wealth of India, the Muslim rule was better, for the Muslims became Indians and riches stayed in the country while English carried the wealth of the country away”. (১ পৃ. ৩৭)
দ্বিতীয়ত ইংরেজ শাসনের অপকারিতা বুঝলেও তার বিরোধিতা করার মতো অবস্থা তখনও সৃষ্টি হয়নি। উনিশ শতকে দীনবন্ধু মিত্রের (১৮২৯-১৮৭৩) নীল দর্পণ (১৮৬০, ঢাকা) একমাত্র বলিষ্ঠ প্রতিবাদী সাহিত্য। তৃতীয়ত. জীবিকা ও অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্তির হাতছানি অনেক সাহিত্যিককেই ইংরেজ সরকারের স্বপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বাধ্য করেছিলেন। সাম্প্রদায়িকতাও সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের আচার আচরণে ও কর্মে লক্ষ করা যায়। অনেকেই জাতীয়তা স্বধর্ম প্রীতির উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। তাইতো অরুণ চন্দ্র গুহ লিখেছেন-
The somities and organizations which developed in the first decade of this century (Nineteenth-Twentieth) were basically patterned on the Hindu conception of life… Though except in the Dhaka Anushilan Samiti, there was no definite bar on the recruitment of the Muslim young men; there was a psychological barrier (The First Spark of Revolution)”. (১: ২৭)
কাজী নজরুল ইসলাম ঐ সময়ের সাম্প্রদায়িকতার সঙ্কট চিত্রিত করেছেন তাঁর ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে ‘জাহাঙ্গীর’ চরিত্রের মাধ্যমে। জাহাঙ্গীর বিপ্লবী দলে যোগদান করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বিপ্লবী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। কাজী নজরুল ইসলাম ‘প্রমত্ত’ চরিত্রের মাধ্যমে আসল দেশপ্রেম কি তা ব্যাখ্যা করেন। হিন্দু মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার উপস্থিতি থাকলে আর যাই-ই হোক দেশ স্বাধীন হবে না এ ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত ছিলেন নজরুল। আর তাই-তো তাঁর বক্তব্য প্রমত্ত চরিত্রের মাধ্যমে ব্যক্ত করেন নিম্নোক্তভাবে:
“যে মাটি ওদের ফুল ফলে শস্যে জলে জননীর অধিক স্নেহে লালন-পালন করছে, সেই সর্বসহা ধরিত্রীর, মূক মাটির ঋণের কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে হবে। তাদের রক্তে এই মন্ত্র জ্বালা করে ফিরবে যে, জননীর স্তন্যপানের যদি কোনো ঋণ থাকে, তবে তারও চেয়ে বড় ঋণ আমাদের দেশজননীর কাছে যার জলবায়ু ও রসধারায় আমাদের প্রাণ-মন-দেহ অনুক্ষণ সঞ্জীবিত হয়ে উঠছে যে দেশ আমার পিতার জননী, আমার জননীর জননী। … ওদের রক্তে এ-মন্ত্র ইঞ্জেক্ট করতে পারবি তোরা কেউ সমরেশ? সে-দিন ভারতের যে রাজরাজশ্বরী মূর্তি আমি দেখব, তা আমি আজও দেখছি-আজো দেখছি আমার মানস-নেত্রে! গা’ দেখি সমরেশ, অনিমেষ! শোনা আমায় সেই সঞ্জীবনী-মন্ত্র! শোনা সেই গান্
‘দেবী আমার, সাধন আমার স্বর্গ আমার,
আমার দেশ’।
প্রমত্ত চক্ষু বুজিল। তাহার মুদিত চক্ষু দিয়া বিগলিত ধারে অশ্রু ঝরিয়া পড়িতে লাগিল। ছেলেরা তাহার পায়ের ধুলায় ললটা ছোঁয়াইয়া গাহিতে লাগিল-
‘দেবী আমার, সাধন আমার স্বর্গ আমার,
আমার দেশ’।
অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয়, কাজী নজরুল ইসলামের পূর্বসূরিরা জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, (১৮৩৮-১৮৯৪) বাঙালি জাতি ছিল হিন্দু বাঙালি। রবীন্দ্রনাথ হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের কথা চিন্তা করেও সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সমন্বয় সাধন করতে পারেননি। মহাত্মা গান্ধীও যে অহিংস আন্দোলনকে সম্বল করে চলছিলেন সেটাও ফলপ্রসূ হবে বলে কাজী নজরুল ইসলাম কখনও মনে প্রাণে বিশ্বাস করেননি। তার এই বিশ্বাসের প্রতিফলই ঘটেছে মৃত্যুক্ষুধার বিপ্লবী চরিত্র আনসারের উক্তির মাধ্যমে-
“আনসার- বললেন,” সত্যিই তাই। আমি আজ মনে করি যে, আর সব দেশ মাথা কেটে স্বাধীন হতে পারছে না, আর এ দেশ
কি সুতা কেটে স্বাধীন হবে?”
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলন অনেক দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবীদেরই বিপদের কারণ হয়েছিল। উল্লেখ্য ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে মাওলানা হযরত মোহিনী আহমেদাবাদ কংগ্রেসে ভারতে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবির প্রস্তাব দেন। কিন্তু গান্ধীজী মোহিনীর এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং প্রস্তাবটি পরিত্যক্ত হয়। তবে ব্রিটিশদের বিপক্ষে পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব উত্থাপনের জন্য মাওলানা মোহানীকে ভোগ করতে হয়েছিল কারাদ-। যতটুকু জানা যায়, কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে মাওলানা মোহানীই প্রথম যে, ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চেয়েছিলেন। কবি, সাহিত্যিকদের পক্ষ থেকে মাওলানা মোহানীর কারাভোগের ঠিক এক বছর পর ১৯২২ সালে নজরুল ধূমকেতুর মাধ্যমে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রবক্তা ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। বিপ্লবী আন্দোলনের পূর্ণ সমর্থক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। সেই জন্য সৃষ্টি করেছেন মৃত্যুক্ষুধার আনসার চরিত্র, কুহেলিকার জাহাঙ্গীর, প্রমত্ত ও বজ্রপাণি চরিত্রের। বাঁধনহারার নূরু চরিত্র অন্যান্য বিপ্লবী চরিত্রের সাথে মিল না থাকলেও স্বদেশপ্রেম মিশে আছে নূরুল হুদার রক্তে। কাজী নজরুল ইসলামের প্রথম কাব্যগ্রন্থ অগ্নিবীণা সেই অগ্নিবীণা কাব্যগ্রন্থ যাকে উৎসর্গ করেন তিনি আর কেউ নয় শ্রী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ। শ্রী বারিন্দ্র কুমার ঘোষ একজন মনে, প্রাণে ও কর্মে বিপ্লবী ছিলেন। নজরুল বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত না হলে কখনও একজন বিপ্লবীকে তাঁর প্রথম সৃষ্টি অগ্নিবীণা উৎসর্গ করতেন না। উৎসর্গ নামাটিতেও ছিল বিপ্লব ও বিদ্রোহীর সুর যেমন –
অগ্নি ঋষি। অগ্নি-বীনা
তোমায় শুধু সাজে,
তাই তো তোমার বহ্নি রাগেও
বেদন বেহাগ বাজে।
দহন বনের গহনচারী
হায় ঋষি, কোন বংশীধারী
নিঙলে আগুন আনলে বারি
অগ্নি মরুর মাঝে।
সর্বনাশা কোন বাঁশী সে বুঝতে পারি না যে॥
দুর্বাসা হে। রুদ্রতড়িৎ
হানছিলে বৈশাখে,
হঠাৎ সে কার শুনলে বেণু
কদম্বের ঐ শাখে
বজ্রে তোমার বাজল বাঁশী,
বহ্নি হ’ল কান্না হাসি,
সুরের ব্যথায় প্রাণ উদাসী-
মন সরে না কাজে
তোমার নয়ন ঝরা অগ্নিসুরেও রক্ত শিখা বাজে॥
“বারীন্দ্র কুমারের নাম ও খ্যাতি জড়িয়ে আছে ১৯০৮ সালের আলোড়ন সৃষ্টিকারী আলীপুর বোমা মামলার সঙ্গে। ১৯০৮ সালের ৩০ শে এপ্রিল মজঃফরপুরে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্লচাকী ভুল করে বোমা নিক্ষেপ করেন মিসেস কেনেডি ও মিস কেনেডির গাড়িতে। অতঃপর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে প্রফুল্লচাকী আত্মঘাতী হন (মে ১, ১৯০৮)। অপর ব্যক্তি ধৃত ক্ষুদিরামের কাছে গোপন আন্দোলনের তথ্যাদি উদ্ধার করে। পুলিশ ২রা মে কলকাতার মানিকতলার একটি বাড়িতে হানা দিয়ে অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক দ্রব্যসহ বারীন্দ্রকুমার এবং তার সহকর্মীদের গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্বীকারোক্তি করেন এবং বিপ্লব প্রচেষ্টার সমস্ত কথা প্রকাশ করে বলেন – My mission is over. বিচারে প্রথমে তার প্রাণ দণ্ডাদেশ ঘোষিত হয়। পরে আপিলে যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ হয়। ১৯০৯ থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি আন্দামানে কারারুদ্ধ ছিলেন (১ পৃষ্ঠা ২৩)।” আর যার জন্যই কাজী নজরুল তাঁকে “ভাঙ্গা-বাঙ্গলার, রাঙ্গা যুগের আদি পুরোহিত সাগ্রিক বীর” বলে আখ্যায়িত করেছেন (প্রাত্তক্ত, পৃ. ২২)।
আমরা যদি কাজী নজরুল ইসলামের উপন্যাসগুলোর বিপ্লবী চরিত্রগুলো বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করি, তাহলে দেখতে পাবে ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসের আনসার চরিত্রে বিপ্লব ঘটানোর ইচ্ছা শক্তি, সাহস ও জনগণকে বিপ্লবী বানাবার স্পৃহা রয়েছে কিন্তু বিপ্লব সংঘটিত করার সুষ্ঠু সুন্দর কোন পরিকল্পনা নেই। যা রয়েছে ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসের বিপ্লবী চরিত্রগুলোতে। জাহাঙ্গীর, প্রমত্ত এবং বজ্রপাণি তারা চেয়েছে সূক্ষ্ম ও সুচারুভাবে বিপ্লবী কর্মকা- পরিচালনা করতে। যা শেষে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এখানে বাস্তব প্রেক্ষাপটে বারীন্দ্র কুমার ঘোষ-এর প্রচেষ্টার সাথে প্রমত্ত ও বজ্রপাণির প্রচেষ্টার মিল রয়েছে। এবং বারীন্দ্র ঘোষের ন্যায় তাদেরও হয়েছে দ্বীপ্তান্তর। ১৯০৮ সালের ঐ ঘটনার সময় কাজী নজরুলের বয়স ছিল ৯ বছর কিন্তু পরবর্তীতে মজঃফরপুরের বোমা হামলা কাজী নজরুল ইসলামকে উজ্জীবিত ও উদ্দীপ্ত করতে পেরেছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ড. রকিবুল হাসানের মন্তব্য অনুযায়ী ‘সিয়ারসোল স্কুলে পড়ার সময় সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী’ ‘যুগান্তর’ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক নিবারণ চন্দ্র ঘটক বিপ্লববাদে নজরুলকে প্রভাবিত করেন। পরবর্তী জীবনে বিপ্লববাদীদের প্রতি নজরুলের যে আকর্ষণ তার সূত্রপাত এখান থেকেই। নজরুলের ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসের বিপ্লবী শিক্ষক প্রমত্ত চরিত্রে নিবারণ চন্দ্র ঘটকের ছায়া পড়েছে।’ এ মন্তব্যের পক্ষে জোরালো সমর্থনও পাওয়া যায় ‘কুহেলিকা’ উপন্যাসে। যেমন-
“এমনি দিনে ‘জননী’ জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী’ মন্ত্রে এই কল্পনা-প্রবণ কিশোরকে দীক্ষা দিলেন তাহার-ই এক তরুণ স্কুল-মাস্টার প্রমত্ত। প্রমত্ত যে বিপ্লববাদী।” আরো অনেক নজরুল গবেষকই প্রমত্ত চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে নিবারণ ঘটকের কথা বলেছেন। তবে ড. রকিবুল হাসান ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন-
“নিবারণ ঘটক একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি দেশের প্রয়োজনে একাধিক দেশে গিয়েছেন কিনা, অসংখ্য ভাষায় কথা বলতে পারতেন কিনা, বিভিন্ন দেশে গিয়ে নিজের দেশের বিপ্লবের প্রতি সমর্থন ও সংগঠিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনে একবারে সে দেশের মতো নিজের লেবাস তৈরি করে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অবস্থান করার মতো অসংখ্য ঘটনার নায়ক তিনি ছিলেন কিনা- এরকম তো অনেক প্রশ্নই উঠতে পারে। জার্মান ষড়যন্ত্রের যে কথা বলা হয়েছে, সেখানেতো নিবারণ ঘটক নেই। তাহলে প্রমত্ত চরিত্রটি নিবারণ ঘটকের কিভাবে হয়! চুলচেরা বিচার-বিশ্লেষণ করলে সেটি তো এম.এন. রায়ের চরিত্র অবলম্বনে নির্মিত বলেই ধারণা হয়। ভারতীয় বিপ্লবীদের সবচেয়ে সংগঠিত বিপ্লব-প্রচেষ্টা ছিল ‘জার্মান-ষড়যন্ত্র’। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ শাসকদের বিপদের সময় জার্মানদের সহায়তায় ভারতের বড় অংশ জুড়ে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়েছিল। এর অন্যতম নেতা ছিলেন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, ওরফে বাঘা যতীন এবং তাঁর প্রধান শিষ্য এম.এন. রায়। উপন্যাসে বজ্রপাণিকে কখনো সামনে আনা হয় নি, কিন্তু তিনিই দলের সর্বোচ্চ নেতা-বাস্তবে বাঘা যতীনও তাই ছিলেন। উপন্যাসের একপর্যায়ে দেখি, নায়ক জাহাঙ্গীর তার দীক্ষাগুরু বিপ্লবী নেতা প্রমত্তকে সংকোচের সঙ্গে জানায়, সে হয়তো বিয়ে করতে চলেছে। প্রমত্ত সান্ত¡না দিয়ে বলেন, ‘সত্যিকারের দেশপ্রেম থাকলে বিবাহিত জীবনও বিপ্লবীর কাজের প্রতিবন্ধক নয়: আমাদের বজ্রপাণিও তো বিবাহিত। শুধু বিবাহিতই নন, ছেলে-পিলে ঘর সংসার আছে”
এ কথা বাঘা যতীনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাঘা যতীন তিন পুত্র এবং এক কন্যা সন্তানের জনক ছিলেন। তিনি স্ত্রী-সন্তান-সংসারকে দেশের স্বার্থে সবসময়ই ক্ষুদ্রস্বার্থ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তিনি বিপ্লবের নামে মরণযুদ্ধকেই বেছে নিয়েছিলেন, তিনি বলেছিলেন, বৃহৎ স্বার্থে ক্ষুদ্র-স্বার্থ ত্যাগ করতে হয়।’ অনুমান করা বোধ হয় অযৌক্তিক হবে না বাঘা যতীনই নজরুলের বজ্রপাণি, আর বজ্রপাণির শিষ্য প্রমত্তই হচ্ছে এম. এন. রায়। আরো একটি প্রসঙ্গ উল্ল্যেখ করা যেতে পারে, পিনাকীর ফাঁসির ঠিক আগ-মুহূর্তে ম্যাজিস্ট্রেট তৎক্ষণাৎ মাথার টুপি খুলে তাকে যে অভিবাদন জানিয়ে বলেছিলেন, ‘আমি তোমায় প্রণাম করি বালক! মৃত্যু-মঞ্চই তোমার মতো বীরের মৃত্যুঞ্জয়ী সম্মান। তোমার মত বীরের বন্দনা করবার সম্মান জীবনের নেই।’ বাস্তবে তা পরিলক্ষিত হয় বাঘা যতীনের ক্ষেত্রে। বাঘা যতীনের মৃত্যুর আগ-মুহূর্তে চার্লস টেগার্ট তাঁকে বিচলিত কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘Tell me Mukherjee, what can I do for you?’ বাঘা যতীনের মৃত্যুর পর চার্লস টেগার্ট বলেছিল, ‘ও I have high regard for him. I have met the bravest Indian, but I had to perform my duty’.
বাঘা যতীনের বিপ্লব-পন্থা ও মৃত্যু এ উপন্যাসে নানাভাবে পরিগৃহীত হয়েছে তা অনুমান করা যেতে পারে। অগ্নিযুগের মহানায়কদের প্রতি নজরুলের প্রশ্নাতীত সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল। তাঁর উপন্যাস-গল্প-কবিতা-প্রবন্ধে লক্ষণীয়।
‘বাঁধন হারা’ উপন্যাসে আমরা ‘নূরুল হুদা’ চরিত্রে বিপ্লবী চরিত্র আবিষ্কার করতে না পারলেও দেশ সেবায় বিসর্জন দিয়েছে নিজের প্রেয়সী মাহবুবা কে। বিপ্লবী হওয়ার পূর্বশর্ত দেশপ্রেম। যা নজরুলের প্রত্যেকটি উপন্যাসের মূলমন্ত্র। কুহেলিকার প্রমত্ত এর মতে সঞ্জীবনী মন্ত্র-
“দেবী আমার, সাধনা আমার স্বর্গ আমার
আমার দেশ”।
কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি প্রত্যেকটি বিপ্লবী চরিত্রই অত্যন্ত প্রাঞ্জল, সংশয়হীন, দৃঢ়চেতা, উদ্যমী ও অসীম সাহসী।
গ্রন্থসূত্র:
১. আতাউর রহমান (১৯৯৩): নজরুল : ঔপনিবেশিক সমাজে সংগ্রামী কবি: নজরুল ইনস্টিটিউট, ঢাকা।
২. মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম (২০২৪); নজরুল চেতনা-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ; নীলঘুড়ি, সংখ্যা-২, জুন-২০২৪, পৃ. ১৩-১৪।
৩. মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম (২০২৪); নজরুল চিন্তার মূল্যায়ন; বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি, চট্টগ্রাম-ঢাকা।
৪. মোহাম্মদ একরামুল ইসলাম (২০২৪); প্রসঙ্গ নজরুলের মৃত্যুক্ষুধা ও কুহেলিকা; ঢাকা ট্রিবিউন, মে ২৪।