মাদের ভাবমূর্তি আমাদের আত্মানুসন্ধানে, আমাদেরই অন্তর্গত ভাষা-সামর্থ্যরে লিপিবদ্ধ অভিজ্ঞতায়- যা সমর্থিত উপন্যাসের রীতি-জ্ঞাপনেও। আমরা দেখেছি কিভাবে একটি উপন্যাসের গভীরে ঘটে চলে বিপুল বোধের সমাহার, একইসঙ্গে ঘটে গ্রহণযোগ্যতার রদ-বদলও, কেননা প্রতিটি কল্পকথাতেই রয়েছে পার্থিব-অপার্থিব গুণাগুণ। যান্ত্রিক সময় জায়গা দিয়েছে মনোগত সময়কে; মগ্নতায় এসেছে গতির অনুভব; তবে বাস্তব প্রকাশের ক্ষেত্রে কখনো-সখনো ভাবনার মন্থর গতি ভেতরে জাগাতে পারে স্বগতোক্তির মতো ক্ষীণধারা, অলক্ষিতে ধরা পড়ে যা চেতনার ঘরে। আবার ভাবনার রয়েছে যেমন এলোমেলো স্বভাব, একটার পর একটা গুছিয়ে আসে না মনোভ্যন্তরে- বিভিন্ন পাঠকের কাছে উপন্যাসের গ্রহণযোগ্যতারও রয়েছে তেমনি বিচ্ছিন্নতা, পাঠোদ্ধারেও। একজন অমনোযোগী পাঠক খেই হারাতে পারেন সহজেই, পাশাপাশি একজন মনোযোগী পাঠক যেভাবেই হোক গদ্যরচনাকেও কবিতার মতো ধরে নিয়ে তৎপর হতে পারেন মর্মোদ্ধারে। যেমন ডরোথি রিচার্ডসন বা ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাসের শ্রেণীকরণ করতে গিয়ে টি. এস. এলিয়ট বলেছেন, “Only sensibilities trained on poetry can wholly appreciates them.” যার মর্মার্থ দাঁড়ায়- একমাত্র কবিতাই পারে সংবেদনশীল শিল্পী-সত্তায় সম্পূর্ণ নাড়া দিতে। সাক্ষ্য হিসেবে তিনি তুলে ধরেছেন ডরোথি রিচার্ডসনের উপন্যাস নিয়ে দু’জন মহিলা কবির সদ্যোজাত অনুভূতিকে, সময়ের অনুক্রম আর প্রাসঙ্গিকতার বিচ্ছেদ মেনে নিয়েই যারা পাঠ করে গেছেন উপন্যাসটি, তাদের উপলব্ধক্ষম প্রজ্ঞায় সৃষ্টি হয়েছে এক নূতন ব্যঞ্জনাবোধের- যেখানে মুহূর্তের ঘন-সন্নিবেশতায় সমগ্র হয়ে উঠতে পেরেছে কবিতার আবেদন।
The Three Voices of Poetry শিরোনামের বক্তৃতায় টি. এস. এলিয়ট যেভাবে বর্ণনা করেছেন, কখনও কখনও একটি কবিতার অন্তর্স¦র কবির নিজের কণ্ঠ হয়ে যায়; সেই অন্তস্থ-সুর দ্বিতীয় স্বর হয়ে শ্রুতিতে আসে যখন পাঠকবৃন্দের অতঃপর চিহ্নিত হয়ে যায় তা তৃতীয় স্বর হিসেবে, এই তৃতীয় স্বর-ই কবিতার ভাষা; প্রমূর্ত এক চরিত্র যেন- কবির মননে-সৃজনে আর বিবিধ ভাবের দোলাচলে প্রতি মুহূর্তের নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ সেই শব্দসুর। এলিয়টের উক্তিতে æwhen he is saying, not what he would say in his own person, but only what he can say within the limits of one imaginary character addressing another imaginary character..” কবির অন্তর্গত ভাষা, তিনি যা বলেন তার থেকে হয়ত আলাদা; কিন্তু তাঁর কল্পনার ভাষা আবার তাঁর নিজেরই ভাষা আর তাঁর সেই নিজের ভাষাই কবিতায় প্রকাশিত তৃতীয় স্বর। একইভাবে কবির অন্তর্স্বর আর কবিতায় প্রকাশিত তৃতীয় স্বরের পার্থক্য ঘটতে দেখা যায় উদ্দিষ্ট উপন্যাসসমূহে, যেখানে লেখক চেষ্টা করেন তাঁর অগোচরের বাণীর ভিন্ন রূপময়তায়; এক্ষেত্রে তেমনটিই ঘটে থাকে, যেমনটি ঘটে মঞ্চে- আসীন একজন উঁচুদরের অভিনেতার ক্ষেত্রে, ভেতরের আমিত্বকে বজায় রেখেই যেভাবে চরিত্রানুযায়ী তিনি সম্পূর্ণ পাল্টে ফেলেন নিজেকে।
সংজ্ঞানুযায়ী এলিয়টের দ্বিতীয় স্বর নিয়মিত শোনা যায় পুরনো উপন্যাসগুলোতে: সেখানে লেখককে সর্বজ্ঞভাবে উপলব্ধি করা যায়। এভাবেও বলা যেতে পারে যে, পুরনো উপন্যাসে লেখক এবং পাঠকের অবস্থান থাকে মুখোমুখি; লেখক হয়ত জানালা দিয়ে বাইরে তাকান আর গল্প শোনান তাঁর দেখা দৃশ্যের। সেখানে পাঠক দেখেন লেখকের চোখ দিয়ে, এমনকি উপলব্ধিও করেন ঠিক ততটুকুই যতটুকু লেখক উপলব্ধি করান তাঁর বর্ণনা দিয়ে। পাঠক নিজেই হয়ত জানালার বাইরে তাকানোর যোগ্যতা রাখেন কিন্তু সেটা করেন না, কারণ সর্বজ্ঞ লেখক সে ক্ষমতা বা সুযোগ কোনোটাই দেন না। তবে তিনি কিন্তু বিস্ময়কর এক গল্প-কথক – তাঁর গল্প-বুননের জাদুতে মোহাবিষ্ট পাঠক লেখক-অস্তিত্ব ভুলে নিজেরাই হয়ে ওঠেন দর্শক, লেখকের চোখ দিয়ে তাকান জানালার ওপারের জগতের দিকে। সে জগতের কতটুকুই বা জানেন লেখক! অথচ তাঁর সর্বজ্ঞদৃষ্টি সঞ্চরণে সক্ষম প্রতিটি চরিত্রের অন্ধিসন্ধিতে- তাদের সেই মুহূর্তের ভাবনা, যাপিত জীবন, এমনকি আরোপিতভাবে হলেও তাদের জীবনের সারবার্তা একজন অভিজ্ঞ- বিচারিক-বিশ্লেষকের কায়দায় তুলে ধরেন তিনি পাঠকের সামনে।
মনোজাগতিক উপন্যাসে নিজেকে অদৃশ্য রাখেন লেখক। সেক্ষেত্রে হঠাৎ করেই জানালাটা পেয়ে যান পাঠক। অদৃশ্যমান লেখকের ভূমিকা সেখানে একজন ব্যস্ত মঞ্চব্যবস্থাপকের- জানালার বাইরের অপার-দৃশ্যাবলির খুঁটি-নাটি আয়োজনে এবং নিজেকে একজন অভিনেতা প্রমাণেও। সেখানে তাঁর অনবরত চেষ্টা চলতে থাকে জানালার বাইরের নিজকৃত সাজানো দৃশ্যাবলিতে পাঠককে মোহবদ্ধ করা; অর্থাৎ বাইরের ঘটমান জগৎ যেন সম্পূর্ণ বাস্তব উপলব্ধি থেকে গ্রহণ করতে পারেন পাঠক। এই পদ্ধতিতে পাঠক রাজি থাকেন যত অজানা-অচেনা-বিসদৃশ্য-অকল্পনীয়-অসম্ভব দৃশ্যাবলি অবলোকনে; যেন স্বপ্নরাজ্যে ঘটে চলেছে সবকিছু: বিশ^াস-অবিশ^াস্যতায় ঘুলিয়ে যাওয়া পরিপাশ্র্¦, অতীত ইতিহাস, জীবনের যাপিত ঘটনাংশ হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে ঘুরে ঘুরে-ফিরে ফিরে বি¯্রস্ত-অবিন্যস্ততায় জায়গা করে নিতে থাকে পাঠক- চেতনায়; মোহাবিষ্ট পাঠক নিমেষের তৎপরতায় জানালার চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে পড়েন লেখকের সাজানো মোহিনী ভুবন-ডাঙায়। এক্ষেত্রে একজন পাঠক শ্রোতা থেকে মুহূর্তেই রূপান্তরিত হন অভিনেতায়, জীবনের রঙ্গমঞ্চে লেখক সমভিপ্রায়ে পাঠকও পেয়ে যান সমান অংশীদারত্ব। আর লেখকের চোখ দিয়ে নয়, পাঠক নিজেই গড়ে নেন তার নিজস্বতার জগৎ। তবে পাঠকের এই উপলব্ধির স্থায়িত্ব ক্ষণিকের, মুহূর্তের বাস্তবতায় ফিরে আসতে পারে লেখক-প্রসঙ্গ, মনে হতে পারে একজন শিল্পদক্ষ কেউ আছেন আশপাশে, সকল আয়োজন তারই। এ কথা সত্য যে, একজন পাঠকের দেখার এবং উপলব্ধির ক্ষমতা নিজস্বতায় গ-িবদ্ধ। অর্থাৎ পাঠকের চোখ-জোড়া বদলে দেবার ক্ষমতা রাখেন না লেখক। হয়তো বা একজোড়া রঙিন চশমা পরিয়ে দিতে পারেন চোখে, কিন্তু দেখবেন পাঠক, বোধগম্যতাও তার। এক্ষেত্রে লেখকের অভিব্যক্তি পাঠকের ভাবাবেগকে সহায়তা দেবে, কৌতূহলও জাগাবে। তবে উল্টোটাও ঘটতে পারে, অনুচিত জেনেও পেয়ে বসতে পারেন লেখক একজন পাঠককে- পাঠকের স্বাচ্ছন্দ্য গুরুত্ব হারাবে তাতে। আবার একজন লেখককে অনুধাবনের যোগ্যতা রাখেন কি-না কোনো পাঠক, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। সেক্ষেত্রে দায়ভার দু’জনারই – একটি শিল্প-প্রচেষ্টা যেমন সহজেই অদক্ষ প্রমাণিত হয় না, তেমনি শিল্পের প্রতি অনুরাগও তাৎক্ষণিকভাবে দক্ষতা লাভ করে না। বাস্তবকথা এই যে, উপন্যাস মাত্রই সকল পাঠকের পাঠযোগ্য নয়।
মনোজাগতিক ঔপন্যাসিকের হাত ধরে ঢুকে পড়া অচেনা জগৎ পাঠকের মনঃপূত না-ও হতে পারে – সেক্ষেত্রে পাঠকের মনন ও রুচির বাইরে থাকে লেখকের অবস্থান। বাস্তব জীবনেও তাই; ঘর-ভর্তি অচেনা মানুষের ভিড়ে পছন্দের কাউকে খুঁজে পেতে সময় নিতে হয়, আবার না পেয়ে বেরিয়েও আসতে হয়। মনোজাগতিক উপন্যাসের পাঠক-সমালোচকও তেমনি মুহূর্তের নিরিখে পরিত্যাগ করতে পারেন সেই ঢুকে-পড়া অচেনা জগৎ, লেখককেও ফিরে চাইতে পারেন পুরনো রীতির অভ্যস্ততায়। তর্কের খাতিরে তাঁরা নাকচ করে দিতে চান লেখক প্রবর্তিত নূতন প্রচেষ্টাগুলো- নূতন ভাবনা, নূতন ধারা, নূতন রীতি কিছুই ন্যায্যতা পায় না তাঁদের কাছে; আঁকড়ে পড়ে থাকতে চান চিরকালীন প্রথায়, চিরযুগের আঙ্গিকে। এভাবেই তাঁদের স্বল্প উপলব্ধ-ক্ষম সংস্কার নিতান্ত তুচ্ছতায় নামিয়ে আনতে পারে নব্য-ধারার একজন লেখককে।
এই সকল সমালোচনার প্রবণতাই হচ্ছে মনোজাগতিক উপন্যাসকে একপেশে মানসিক-রোগ জর্জর হিসেবে দেখা। তাঁরা তর্কের খাতিরে বোঝাতে চান যে, এ ধারার উপন্যাসের কেন্দ্রমূলে রয়েছে শারীরিক এবং মানসিকভাবে অক্ষম কিছু মানুষ – যেমন প্রুস্ত ছিলেন হাঁপানির রোগী, জয়েস ছিলেন প্রায়ান্ধ আর ভার্জিনিয়া উল্ফ্? তিনি তো ছিলেন গভীরভাবে বিষাদাক্রান্ত একজন, অর্থাৎ বিষণœতা রোগে ভুগতেন তিনি। এঁদের কাছে থেকে জীবনের স্বাভাবিক রূপায়ণের প্রকাশ আশা করা যায় কিভাবে? বেশ তো, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিকের প্রসঙ্গটুকু না হয় থাক- জীবনটা তাঁদের কাছে হয়ত গতানুগতিক ধারায় প্রাণবন্ত ছিল না; তবুও নিদারুণ সেই অসুস্থতা আর বিষাদগ্রস্ততার ভেতর দিয়েই নিজেদের জীবনকে যাপন করেছেন তাঁরা। স্বাভাবিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেই চিরঞ্জীব মনের অধিকারী হওয়া সম্ভব। সেক্ষেত্রে দৃষ্টির ক্ষীণতা হয়ত শারীরিক দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে, কিন্তু দৃষ্টির প্রাখর্য কিংবা দৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য একজনের মনেরই অর্জন- সেই মন কখনই অসুস্থ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। সুস্থ-স্বাস্থ্যের জন্য যেমন সূর্যালোকের প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি গভীরতর মন্ময়তার জন্য প্রয়োজন রয়েছে রাতের নিñিদ্র অন্ধকারের। দিনের আলোয় পরিপুষ্ট একজন লেখক রাতের সেই কোণঠাসা নিভৃত অন্ধকার উপলব্ধির ক্ষমতা কি রাখেন? তিনি হয়ত চমৎকারভাবে রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে নির্বিঘœ ঘুমে রাত পার করে দিতে পারেন, কিন্তু একজন মার্সেল প্রুস্ত হাঁপানির কষ্টে জেগে থাকেন সারারাত আর ঘুমহীন প্রহরগুলো ভরিয়ে তুলতে থাকেন অনির্বচনীয় শব্দ-বাণীর অপরূপতায়। তাঁর অবরুদ্ধ অনুভূতিগুলো এভাবেই সামনে আসে পাঠকের। কাজেই রুগ্ণতাটুকু মূল্যবান নয়, মূল্যবান তাঁর লেখনী। বিষণœতা একটি রোগ হতে পারে, কিন্তু বিষণœতায় ক্লিষ্ট অন্তর্দৃষ্টি থেকেই জন্ম হতে পারে কোনো সৃষ্টিশীল প্রজ্ঞার, প্রসন্ন শিল্পবোধের।
এ কথা ঠিক যে, আত্মকথনমূলক উপন্যাসগুলিতে একটি ঐতিহাসিক পরম্পরা রয়েছে- সেখানে রোমান্টিকতাও হয়ত আছে কিন্তু মূল চরিত্রকে ‘রোমান্টিক হিরো’ হিসেবে প্রতিপন্নের প্রচেষ্টাটি নেই। মার্সেল যেভাবে নিজেকে উন্মুক্ত করেছেন কমব্রের জীবনধারায়, স্টেফেনের অ্যাশপ্লান্টে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে চলা, একস্লেস স্ট্রিটে বœুমের কিডনি খাওয়া, মলির যৌন-নিমগ্ন স্মৃতিচারণা- এ সব দৃশ্য প্রচলিত ধারার উচ্চমার্গীয় উপন্যাসগুলিতে খুঁজে পাওয়া ভার। আবার যদি চোখ সরানো যায় ওয়াটার লু-র মুক্ত বাতাসে আর নেপোলিয়নের মস্কোর পথে যুদ্ধযাত্রায়, মার্টেলো টাওয়ারের চিলেকোঠায় এমন কি একস্লেস স্ট্রিটের ধারের নোংরা পায়খানার দিকেও; মোদ্দা কথা সে যত তুচ্ছ বিষয়ই হোক না কেন, লেখকের পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল। অনেকটা মঞ্চে উপস্থিত সেই অভিনেত্রীর মতো যার চকিত সৌন্দর্যে মোহিত সবাই, অথচ শরীরে পিছলে পড়া মঞ্চ-সঞ্চালিত কৃত্রিম আলোর দ্যুতিতে তৈরি তার সেই ক্ষণিকের মাধুর্য। সে যখন সাজঘরে মঞ্চের নেপথ্যে ফিরে আসে, ধরা পড়ে তার মুখের এক ইঞ্চি পুরু মেকাপ আর বয়সের বলিরেখা। ছিঁড়ে যায় মুহূর্তেক আগের তৈরি করা রোমান্সময় মাধুর্যের মোহজাল। যাবতীয় সুগন্ধি বোতল আর পাউডারের কৌটার জঞ্জালে আটকে থাকা অভিনেত্রীকে দেখে অস্বীকার করার উপায় নেই যে মঞ্চাসীন এবং মঞ্চের নেপথ্য দু’টি ক্ষেত্রই তার জীবনের অভিন্ন অংশ, দুটি ক্ষেত্রেই সে একই রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ। যেমন মায়া এবং বাস্তবতা, শিল্প এবং জীবন। যেভাবেই বলা হোক না কেন, যে যার মতো করে হয়ে উঠতে পারে ‘রোমান্টিক হিরো’। কেননা প্রত্যেকেরই ক্ষমতা রয়েছে নিজস্ব অন্তঃস্থতায় নিমগ্ন হওয়ার। যে-কেউ বয়সের গাছ-পাথর না মেনেই ভরে উঠতে পারে নিজস্ব অবলোকন আর উপলব্ধিতে- সে স্টেফেন হোক বা মার্র্সেল, একজনের ক্ষমতা রয়েছে বিবেকদংশন উত্তরণের আর অপরজনের দুর্বিষহ স্মৃতির অকপট পুনরুদ্ধারের; দুই-ই উচ্চমানের চেতনা-অতল অভিযাত্রা।
১৮৮৯ সালে লিখিত একটি প্রবন্ধে অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে উপন্যাসের সমৃদ্ধি এবং দীর্ঘ যাত্রাপথ নিয়ে যেভাবে ভেবেছিলেন হেনরি জেমস:
Man rejoices in an incomparable faculty for presently mutilating and disfiguring any plaything that has helped create for him the illusion of leisure; nevertheless, so long as life retains its power of projecting itself upon his imagination, he will find the novel work off the impression better than anything he knows. Anything better for the purpose has assuredly yet to be discovered. He will give it up only when life itself too thoroughly disagrees with him. Even then, indeed, may fiction not find a second wind, or a fiftieth, in the very portrayal off that collapse? Till the world is an unpeopled void there will be an image in the mirror. What need more immediately concern us, therefore, is the care of seeing that the image shall continue various and vivid…. so long as there is a subject treated, so long will it depend wholly on the treatment to rekindle the fire. উদ্বৃতিটির ভাবার্থ করলে দাঁড়ায়- মানুষ আনন্দে থাকে তার মনের ভেতরের খেলাঘর নিয়ে, সেখানে ভাঙা-গড়া যাই চলুক না কেন জীবনেরই বিমূর্ত রূপায়ণ ঘটে চলে অনবরত। উপন্যাসেও তাই, সৃষ্টির আনন্দ নির্বিশেষ, নিরুদ্দিষ্ট। মানুষের পথচলা শেষ হতে পারে হঠাৎ-ই কিন্তু উপন্যাসে নয়, সৃষ্টি কখনও হঠাৎ স্তব্ধ হতে পারে না। যেমন পৃথিবী মানবশূন্য না হওয়া পর্যন্ত আয়না থেকেও তার প্রতিবিম্ব ঘুচবে না। যেটা প্রয়োজন, যথাসচেতনতায় সৃষ্টির অব্যবহিতকে ধরে রাখা এবং যথার্থ বিবেচনায় নিজেকে নূতন করে প্রজ্বলিত করা।
জেমস যখন কথাগুলো লিখলেন Stendhalian*-Gi Òimage in the mirror” তখনও সাহিত্যের জন্য পোশাকি মাত্র, সে-ও আবার ‘ফটোগ্রাফি’ এবং তার সন্তানেরা টেলিভিশন কিংবা সিনেমারও পূর্বাবস্থা, সেখান থেকে জীবনের অনুপুঙ্খ তথা বাস্তবধর্মী প্রকাশে সাহিত্যকে মাধ্যম করাটা একজন ঔপন্যাসিকের জন্য যথেষ্ট অগ্রগণ্য পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বর্তমানে জেমসের লেখনীর সময় থেকে আরও অর্ধশত যুগ এগিয়ে এটাও স্পষ্ট যে উপন্যাসের গুরুত্ব এতটুকু কমেনি, বরঞ্চ মনস্তাত্ত্বিক ধারার ঔপন্যাসিকদের প্রবেশের কারণে ঘটেছে আঙ্গিকগত বিবর্তন। যদিও মনোজগতের গভীরতর স্তরে প্রবেশের কারণে তাঁরা পাশ কাটিয়ে সরে এসেছেন কল্পকথার চলতি রচনা-রীতি থেকে, আর তরুণতর যাঁরা এগিয়ে গেছেন আরও নূতন ধরন আর গড়ন “চেতনাপ্রবাহরীতি”র দিকে- সবমিলে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে উপন্যাস। বর্তমানের একজন ঔপন্যাসিক জানেন কিভাবে মনের অর্গল মেলে ধরা যায়, সাহিত্য-শিল্পে একসময় যা ছিল অসম্ভব প্রুস্তের আত্মকেন্দ্রিক ভাবনা, জয়েসের শব্দ-কল্পনার পরিভাষা নির্মাণ, ভার্জিনিয়া উলফের মননের চিত্রায়ণ, ফকনারের একজন জড়বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের অতলচেতনার বর্ণনা- এসব কিছু জীবনের আপাত দুর্বিষহ-ভার নামিয়ে সাহিত্যকে বিজয়ী করেছে, করেছে অর্থবহ। শিল্পরীতির মৌলতত্ত্বগুলি কাজে লাগিয়েই বলা চলে যে, শিল্পকে সর্বদা শোধন-বিশোধন কিংবা সংযোজন-পরিমার্জনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলতে হয়, তবেই সম্ভব হয় শৈল্পিক দূরদৃষ্টি অর্জনের। অভিজ্ঞতা এবং অবিরত সত্য-সুন্দরের সন্ধানেই পাওয়া যায় শিল্পের অভীষ্ট রুচি, এভাবেই অতীত থেকে বৃদ্ধি পেয়ে আসছে শিল্পের বৈচিত্র্য এবং সমৃদ্ধি। শিল্প কখনই স্থির থাকে না, অনুকরণে বা অনুসরণে তো নয়ই, পুনরাবৃত্তিতেও এই রীতি বিশ^াসী নয়। শিল্পের মৃত্যু ঘটে তখনই, যখন প্রচার বা জনপ্রিয়তার মাপকাঠিতে শিল্পরূপ বিচার করা হয়। জীবন-বৈচিত্র্যের অনুসন্ধানে নিরীক্ষিত শিল্পকলার নিপুণ প্রয়োগকৌশলে নিহিত শিল্পের শ্রেষ্ঠত্ব। এই নিরীক্ষাই পুনর্জাগরিত বিন্যাসে এনে দেয় জীবনের নূতন অর্থময়তা। এভাবে শিল্পই পারে পরাবাস্তবতা-দাদাবাস্তবতার সকল কোলাহল, সকল অন্ধত্ব আর কট্টর সমালোচনা কাটিয়ে নূতনভাবে সুস্থির-সুষমায় ফিরে আসতে। সবশেষে বলা যায় যে, বিশশতকীয় উপন্যাস এমন কোনো হেয়কর পরিস্থিতিতে এসে ঠেকে নি; বরঞ্চ প্রুস্ত কিংবা জয়েসের মতো লেখকেরা বাকি শতাব্দী তো বটেই, টিকে থাকবেন শিল্পযাত্রার একেবারে শেষধাপ অবধি।
[প্রবন্ধটি Leon Edel রচিত গ্রন্থ Psychological Novel এর একটি অনুচ্ছেদের ভাবানুবাদ। ব্রিটিশ এই সমালোচক গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশ করেন ১৯৫৫ সালে, পরবর্তীতে ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় পরিমার্জিত দ্বিতীয় সংস্করণ- প্রবন্ধটি সেখান থেকেই গৃহীত। তাঁর এই গ্রন্থে লেখকের তথা পাঠকের মন, অন্তর্সত্তা, অন্তর্গত দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু করে মনের গতি, মনের ভাষা, স্বগত কথন, অনুচ্চ সংলাপ, প্রতীকময়তা, কাব্যিকতা, অবশেষে চেতন-অবচেতনের অবগঠন এবং প্রতিচ্ছায়া নিয়ে আলোচনা সমগ্র করা হয়েছে। সর্বমোট এগারোটি অনুচ্ছেদে বিভক্ত গ্রন্থটি, প্রতিটি অনুচ্ছেদই তথ্য-সঞ্চালনায়, বিষয়-ভাবনায়, সৃজনশীলতায় সমুদ্ভুত এবং সম্পূর্ণ। লেখক ভূমিকাংশেই গ্রন্থটি রচনার উদ্দেশ্য জানিয়ে রেখেছেন, তাঁর ভাষায়:
In this essay I have sought to define what seems to me the most characteristic aspect of twentieth-century fiction : its inward-turning to convey the flow of mental experience, what has been loosely called the æstream of consciousnes.
অর্থাৎ ‘বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে আমি খুঁজতে সচেষ্ট হয়েছি ঊনিশ-শতকীয় কথাসাহিত্যের সবচাইতে লক্ষ্যযোগ্য বৈশিষ্ট্য: মানস-অভিযাত্রিক অভিজ্ঞতায় যার মাত্র-বিবেচিত শিরোনাম “চেতনাপ্রবাহরীতি”।’ তিনি অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন এই ধারার নির্মাণকারীদের দিকে : জেমস জয়েস, ভার্জিনিয়া উলফ, ডরোথি রিচার্ডসন, মার্সেল প্রুস্ত, উইলিয়াম ফকনার প্রমুখ কিভাবে আবিষ্কার করেছেন অন্তশ্চেতনার অস্তিত্ব, কেমন নিবিড়তায় ছায়াপাত ঘটিয়েছেন নৈঃশব্দের রূপকল্পে, গর্ভোৎসারিত আলোধ্বনিতে সুস্পষ্ট করে তুলেছেন মুহূর্তের উপস্থিতি, নূতন শব্দবিভায় তৈরি করেছেন নূতনমাত্রার রূপককথা। একইসঙ্গে পাঠককেও জাগ্রত হতে হয়েছে নূতন পরিপাঠে, পাল্টাতে হয়েছে এতদিনের চর্চিত বোধসমূহকে।
ফরাসি লেখক স্তাঁদাল (১৭৮৩- ১৮৪২), পুরো নাম মারি হেনরি বেইল (Marie Henri Beyle) – উনিশ শতকীয় এই লেখক বিশেষভাবে পরিচিত তাঁর উপন্যাস Le Rouge et le Noir (The Red and the Black,1830),১৮৩০) এবং La Chartereuse de Parme (The Charterhouse of Parma, 1839, ১৮৩৯) নিয়ে; তাঁর সাহিত্যচর্চার মূল প্রবণতাই ছিল Realism তথা বাস্তববাদ। প্রথম উপন্যাস The Red and The Black-তে image in the mirror প্রসঙ্গে realism সম্পর্কিত যে কথাগুলো তিনি লিখেছিলেন : Ah, Sir, a novel is a mirror carried along a high road. At one moment it reflects to you vision the azure skies, at another the mire of the puddles at your feet. And the man who carries this mirror in his pack will be accused by you of being immoral! His mirror shrews the mire, and you blame the mirror! Rather blame the high road upon which the puddle lies, still more the inspector of roads who allows the water to gather and the puddle to form.]