বীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’ গানটি বঙ্গভঙ্গের পটভূমিতে রচনা করেন। রবীন্দ্র গবেষকরা সবাই মোটামুটি একমত যে, গানটি বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক আবেগে রচিত হয়। গীত হয় এবং সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।১
উনিশ শতকের প্রথম দিকে বঙ্গভঙ্গের ঘটনাটা পুরো বাংলাভাষী জনসমাজকে নাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনার রাজনৈতিক-রাষ্ট্রনৈতিক অভিঘাত হয় সুদূরপ্রসারী। বঙ্গভঙ্গ ও বাঙালি হিন্দুর সশস্ত্র প্রতিক্রিয়া সেকালের রাজনীতিকে এমন এক খাতে প্রবাহিত করে, যার নিয়তি হয় একদিকে সাম্প্রদায়িকতা, অন্যদিকে ভারত বিভাগ। এই রাজনীতির মনস্তত্ত্ব শনাক্ত না করতে পারলে রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলাকেন্দ্রিক রাজনীতি-সংস্কৃতির অন্তর্গত স্বরূপকে বোঝা যাবে না।
পলাশির বিপর্যয়ের পর নতুন ঔপনিবেশিক প্রশাসনে বাঙালি হিন্দুর কদর বাড়ে। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ফলে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজি শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার প্রভূত সুযোগ পায়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এই শ্রেণিকে দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল সুযোগ এনে দেয়। এই দীর্ঘকাল প্রাপ্ত সুযোগের বদৌলতে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের নানা দিক থেকে শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। বিশেষ করে বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে তারা এক সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক উত্থান ঘটায়। যার পোশাকি নাম বাংলার রেনেসাঁ। কারও কারও ভাষায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। বাংলার রেনেসাঁ বলা হলেও কার্যত এটি বাংলাভাষী সকল মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এটি বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটা বাংলা ভাষাভাষী-নির্বিশেষে কোনো জাতীয় ঘটনা ছিল না। কেন বাংলার রেনেসাঁ বাংলাভাষীদের বড়ো অংশ বাঙালি মুসলমানকে কাছে টানতে পারল না?
ব্রিটিশরা ক্ষমতা নিয়েছিল মুসলমানদের হাত থেকে। তাই ঔপনিবেশিক প্রশাসনের প্রথম কাজ হয়ে দাঁড়াল মুসলমানের শক্তি ও ক্ষমতাকে খর্ব করা এবং হিন্দুর সহযোগিতায় ইংরেজ সেটাই করল। নতুন বন্দোবস্ত হিন্দুরা পেল ইংরেজের আশীর্বাদ, মুসলমানরা পেল ধিক্কার। স্বাভাবিকভাবে তখনকার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থায় বাঙালি মুসলমান কোনো বৌদ্ধিক অনুশীলনের সুযোগ পায়নি। নতুন কালে এসে ইংরেজের প্রবল অসূয়ার মুখে সমকালীন জীবনের সাথে তারা তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে সমন্বয় করতে পারল না। এর অব্যবহিত ফল হলো-তারা জীবনের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে চলে এলো। বাংলার রেনেসাঁর নায়করা ধর্ম সংস্কার করলেন, বিধবা বিবাহের কথা বললেন, নারীশিক্ষার প্রতি জোর দিলেন; কিন্তু সেসবই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের ভেতরে সীমাবদ্ধ। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্র গড়তে হলে যে দেশের সব মানুষের সমান বিকাশ ও অংশগ্রহণ দরকার, সেসব ব্যাপারে তারা গা করেননি। উলটো ধর্মীয় ভিত্তিতে তারা সবকিছু চিন্তা করেছেন এবং ‘ইংরেজের বিভাজন ও শাসন করো’ নীতির সুফল প্রায় দুইশ বছর ধরে প্রতিদ্বন্দ্বীহীনভাবে উপভোগ করেছেন। এ সুযোগ নিয়ে তারা গড়ে তুলেছেন নিজেদের জন্য আধুনিক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি, এর পরিপূরক অংশ জমিদার শ্রেণি আর নিজেদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি। বাংলায় ধর্মীয় রাজনীতির বাড়বাড়ন্ত হয় বাঙালি হিন্দুদের হাতে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাঙালি মুসলমান যখন ধর্মীয় খাত ধরে ঐক্যবদ্ধ হতে শুরু করে, তখন তাদেরকে সাম্প্রদায়িক বলে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। তখন বাংলার রেনেসাঁ মানে হিন্দু রেনেসাঁ। বাঙালির জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দুর জাতীয়তাবাদ। ইতিহাসের এই ছেদবিন্দুগুলোকে আমাদের ভুলে গেলে চলবে না। এ কারণেই পশ্চিমবঙ্গের প-িত পার্থ চ্যাটার্জী দেখিয়েছেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ।২
বঙ্গভঙ্গ বাঙালি হিন্দুর এই জাতীয়তাবাদের মুখে একটা কষে থাপ্পড় দেয়। এই জাতীয়তাবাদের ভিত্তি যে খুব দুর্বল, অল্প বাতাসেই যে এই জাতীয়তাবাদ নামক বৃক্ষ দুলে ওঠে, বঙ্গভঙ্গ তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
কলকাতার বাঙালি বাবুরা দেখতে পায়, তারা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার ননি একচ্ছত্র ভোগ করার দিন শেষ হয়ে আসছে। তারা দেখল, পূর্ববঙ্গ পৃথক হয়ে গেলে এখানকার হিন্দুরা মুসলমানদের চেয়ে সংখ্যাগত বিচারে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে ভাষাগত দিক দিয়ে বাঙালি হিন্দুরা অবাঙালির তুলনায় সংখ্যালঘু হয়ে যাবে। অর্থাৎ উভয় বাংলায় বাঙালি হিন্দুর অবস্থান বা গুরুত্ব হ্রাস পাবে।
দ্বিতীয়ত বাঙালি হিন্দুর শক্তির উৎস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বঙ্গভঙ্গের কারণে সংস্কার, সংশোধন ও বিলুপ্ত হওয়ার ভয়ে জমিদারকুল ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। বাংলা ভাগ মানে ছিল তাদের কাছে সুযোগ-সুবিধা হারানোর ভয়, কৃষকের শক্তি বৃদ্ধির ভয়। পেশাজীবীদের অধিকাংশ অংশই ছিল হিন্দু। তাদের কাছেও বঙ্গভঙ্গ ছিল অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ। তাই সেদিনের বাঙালি বাবুরা নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার জন্য প্রাণপণে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে। হিন্দু জমিদাররা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সাংগঠনিক ব্যয় কুলানোর জন্য অকাতরে অর্থ ঢালতে থাকেন। চরমপন্থিদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। বস্তত অস্তিত্বের সংকট থেকে তারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা শুরু করেন। সব রকমের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে, এমনকি চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে।
ঠিক একই সময়, একই কারণে জমিদার রবীন্দ্রনাথ এসে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে শরিক হন। তিনি যেহেতু একই সাথে কবি, গীতিকার ও সুরকার ছিলেন, তাই টাকা-পয়সার পাশাপাশি তিনি এ আন্দোলনকে গানে-কবিতায় মাতিয়ে তোলেন। এ আন্দোলনকে সামনে রেখে তিনি বাঙালিত্বের একটি সাংস্কৃতিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন।
সেকালে হিন্দু জমিদার ও মধ্যবিত্তের শ্রেণিস্বার্থের আন্দোলনকে রাজনৈতিক কৌশলের কারণে বলা হলো স্বদেশি আন্দোলন এবং রাজনীতির মাঠে বাংলা ভাষা ও ভৌগোলিক ঐক্যের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসা হলো। বাস্তবে এই অখ-তার দাবির ভেতরে হিন্দু নেতৃত্বের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার বা ক্ষমতা বজায় রাখার আকাক্সক্ষাই ছিল প্রধান। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতায় কিংবা হিন্দুদের স্বদেশি আন্দোলনের সমর্থনে বাঙালি মুসলমানদের তেমন কোনো সমর্থন ছিল না। কারণ, মুসলমানদের প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলা, বঞ্চনা ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণে তারা সেদিন তেমন কোনো আগ্রহ দেখায়নি। তা ছাড়া এ আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তেমন কোনো উপকারের সম্ভাবনাও তারা নিজেদের জন্য দেখতে পায়নি। বরং যে ভাষিক ঐক্যের দাবিতে হিন্দু নেতারা বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিল, সে দাবির সারবত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসনে বাংলা ভাষার একদিকে উন্নতি হয়েছে বটে, তবে এই উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের ভেতর দিয়ে হিন্দু সাহিত্যিকরা মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ, উপহাস ও উপলক্ষ্যের যথেষ্ট নজির রেখেছেন। মুসলমানি বাংলা চাষাভুষার বাংলা। বলেতো বাবুদের উপহাস নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গিয়েছিল। তাই ভৌগোলিক ও ভাষাগত ঐক্যের কথাটা শুনতে ভালো লাগলেও সমকালীন বাস্তবতায় এর ভিত্তি মোটেই ছিল না। ওপরের আলোচনা থেকে মনে করার সংগত কারণ আছে-কেন জমিদার রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন এবং কলকাতার হিন্দু বাবুরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লাগে, তখন তিনি একটি কথাও বলেননি।
শ্রেণিস্বার্থের বিবেচনায় জমিদার রবীন্দ্রনাথ কখনো তার শ্রেণির বাইরে যেতে চাননি। তারা সেদিন পূর্ববঙ্গের কৃষক-শ্রমিকদের শোষণ করে কলকাতার নাগরিক আরাম উপভোগ করতে চেয়েছে মাত্র। ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকে এই কারণে তাদের পক্ষে একজন ফজলুল হক, একজন নাজিমুদ্দিন, একজন সোহরাওয়ার্দীকে হজম করা কষ্টকর হয়ে উঠেছিল। শ্রেণিস্বার্থে কলকাতার বাঙালি বাবুরা যেমন বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তেমনই একই উদ্দেশ্যে ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে দ্বিতীয়বার উঠেপড়ে লাগে। কারণ, তাদের সংখ্যালঘুত্ব বরণ করার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে দেখা দেয়। শ্রেণিস্বার্থের এই নির্লজ্জ রাজনীতি বাঙালি হিন্দুরা বারবার করেছে। অথচ একে জাতীয় আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন বলে ডাকতে তাদের একটুও সংকোচ হয়নি।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়, ১৯০৫ ও ১৯৪৭-এর বঙ্গ বিভাগ না হলে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ সৃষ্টি সম্ভব ছিল না। সুতরাং যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে হাজির করেন, তারা যথাযথ তথ্য ও রেকর্ড ছাড়া ইতিহাসকে রোমান্টিক করে তোলেন মাত্র।
দুই.
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে ভাষাভিত্তিক ঐক্যের আন্দোলন বলা হয়েছে এবং এই আন্দোলনের প্রয়োজনে সেদিনকার রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রূপ প্রতিষ্ঠার তোড়জোড় শুরু হয়। কার্যত এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি ছিল গীতা তথা হিন্দু জীবনাদর্শ। সে সময়কার সৃষ্টিশীলতা, রাজনৈতিক-সামাজিক কর্মকৌশলে ফুটে উঠেছে হিন্দুত্বের এক বোধ। বাইরে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের কথা বলা হলেও এবং আপাতদৃষ্টিতে এটি ধর্মনিরপেক্ষ মনে হলেও এর ভেতরে প্রতিফলিত হয়েছে হিন্দুর ধর্মীয় ভাব; যার প্রাণশক্তি তৈরি হয়েছিল শক্তিরূপিণী কালি ও গীতার মূল্যবোধ থেকে। এই কারণে বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন শেষ পর্যন্ত হিন্দু রিভাইভাল আন্দোলনে পরিণত হয়। স্বদেশি আন্দোলনকারীদের ভেতরে অনেক আধুনিক শিক্ষিত মানুষ ছিলেন বটে, কিন্তু তারা ধর্মীয় ভাবকেই গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের আবেগ-অনুভূতিকে তেমন কোনো পাত্তা দেননি। আগেই বলেছি, সেই কালে বাঙালি বলতে হিন্দুকেই বোঝানো হতো। বাঙালি মুসলমানকে কখনো বাঙালি পরিচয়ের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
স্বদেশি আন্দোলনের কার্যক্রমে তাই দেখা গেল-বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছাড়া বা রাজনৈতিক কৌশলের অংশ ব্যতীত বাঙালি মুসলমানের কোনো জায়গা ছিল না। উনিশ শতকের বাংলার রেনেসাঁর প্রধান উপাদানই ছিল হিন্দু ধর্মীয় চেতনার পুনরুত্থান। পুনরুত্থানের মাধ্যমে হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রসার ঘটানো হয়। বাঙালি হিন্দু বুদ্ধিজীবীরা এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তত্ত্বায়ন করেন তাদের তৈরি সাহিত্য, সমাজ ও ধর্ম দর্শনের ভেতর দিয়ে। এই তত্ত্বায়নের পেছনে সব রকমের অবকাঠামোগত সুবিধা দিয়েছে ইংরেজ পালিত হিন্দু জমিদার ও পেশাজীবী মধ্যবিত্ত শ্রেণি। রামমোহন, ঈশ্বরচন্দ্র, রাজনারায়ণ বসু, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ প্রমুখ সবাই কমবেশি এই তত্ত্বায়নের সাথে জড়িত। উনিশ শতকের এই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ভাবধারা বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপটে স্বদেশি আন্দোলনের ভেতরে ফলে-ফুলে তাজা হয়ে ওঠে। বাইরে হিন্দু মুসলমানের রাজনৈতিক ঐক্যের কথা বলা হলেও অন্তরে হিন্দু ভাবটাই প্রধান হয়ে থাকে।
সেদিন স্বদেশি আন্দোলনে বাংলার মাটি, বাংলার জলকে আহ্বান করা হলেও বাস্তবে হিন্দু নেতারা বাংলা ও ভারতকে কখনো দুটি পৃথক সত্তা মনে করেননি। হিন্দু নেতাদের অবচেতনে ভারতের আত্মাই ক্রমশ জাগ্রত হয়ে উঠতে দেখা গেছে। রবীন্দ্রনাথের ভারতবর্ষের আধারে স্বদেশে ভাবনার কথা বলেছেন।
তিনি একই সাথে আমার সোনার বাংলার পাশে ‘জনগণ মন অধিনায়ক’ রচনা করেছেন। এদের কাছে যাহা ভারতীয়ত্ব, তাহাই বাঙালিত্ব। নিজেদের কর্তৃত্ব হারানোর ভয় থেকে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করলেও আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বললেও শেষ পর্যন্ত হিন্দু জাতীয়তাবাদ বা ভারতীয় জাতীয়তাবাদের প্রতি তাদের পক্ষপাত বেশি ছিল।
এদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতি দায়বদ্ধতা ছিল সাময়িক ও বৈষয়িক প্রয়োজন হেতু। হিন্দু জাতীয়তাবাদ এদের অভীষ্ট লক্ষ্য হওয়া সত্ত্বেও জনপরিসরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলে এরা এক রাজনৈতিক প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল মাত্র।
ইতিহাসের নিরিখে বলা যায়, বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন একই সাথে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, হিন্দু পুনরুজ্জীবনবাদী আন্দোলন ও মুসলিম স্বার্থবিরোধী আন্দোলন। এসব চিন্তা করে মুসলিম এলিটদের পাশাপাশি মুসলিম কৃষক-শ্রমিকরাও সেদিন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের মোকাবিলায় মাঠে নামে। ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায় রীতিমতো দাঙ্গা বেধে যায়।
নীরদ সি. চৌধুরী তার বিখ্যাত আত্মস্মৃতিতে স্বদেশি আন্দোলনের এই সাম্প্রদায়িক দিকটি নিয়ে বিস্তারিত আলাপ করেছেন। বিশেষ করে তিনি সেদিনের হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্ব নিয়ে যে গভীর পর্যালোচনা করেছেন এবং যার পরিণতিতে ভারত ভাগের দরজা উন্মোচিত হয়, তা ঐতিহাসিক গবেষক ও ভাবুকদের জন্য বিশেষভাবে নজর দেওয়ার মতো বিষয়।
সুমিত সরকারের The Swadeshi Movement in Bengal ১৯০৩-১৯০৮ কিতাবটি স্বদেশি আন্দোলনের প্রচলিত ইতিহাসের বাইরে একটি নতুন ধরনের পর্যালোচনা। এখানে তিনি স্বদেশি আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি হিন্দু মধ্যবিত্তের রাজনীতির একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ঔপনিবেশিক বাংলায় অগ্রসর হিন্দু শ্রেণি কেন স্বদেশি আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তার একটি বয়ান আছে এ গ্রন্থে। এ বয়ানের ভেতরে হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি রেখাচিত্র আঁকার তিনি চেষ্টা করেছেন।
রমেশচন্দ্র মজুমদার, অমলেশ ত্রিপাঠী-এরা হলেন স্বদেশি আন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাখ্যাতা। বাংলাদেশ একটা তাদের কাছে বঙ্কিমের আনন্দমঠ-এর মতো এক স্বপ্নভূমি। ফলে বঙ্কিম, বিবেকানন্দ ও অরবিন্দের চোখ দিয়ে তারা এ আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এটা যে একটা সাম্প্রদায়িক ব্যাপার, এটাও যে একটা স্বাতন্ত্র্যধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি, এটা তারা মেনে নিতে পারেননি। রমেশচন্দ্রের বাংলাদেশের ইতিহাস ৪র্থ খ- ও অমলেশ ত্রিপাঠীর ভারতের মুক্তি সংগ্রামে চরমপন্থি পর্ব স্বদেশি আন্দোলনের সাম্প্রদায়িক দিকটা উপেক্ষা করার এক বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল।
এ পার বাংলায় বঙ্গভঙ্গের ওপরে মূল্যবান আলোচনা করেছেন অধ্যায়ক এম. কে. ইউ. মোল্লা তার কৃত The New Province of Eastern Bengal and Assam-এ তিনি দেখিয়েছেন, বঙ্গভঙ্গের ফলে নতুন প্রদেশে কী কী উন্নতি হয়েছিল এবং বাঙালি মুসলমানদের বৌদ্ধিক উন্নয়নে ঔপনিবেশিক সরকার তখন কী ভূমিকা রেখেছিলেন। মোল্লা এই সাফল্যের জন্য কৃতিত্ব দিয়েছেন নতুন প্রদেশের গভর্নর বামফিল্ড ফুলারকে। এই কৃতিত্ব তার প্রাপ্য হলেও রমেশচন্দ্র ও অমলেশ ত্রিপাঠীর মূল্যায়নে ফুলার হয়ে উঠেছেন ¯্রফে হিন্দুবিদ্বেষী অত্যাচারী এক খলনায়ক। অন্যদিকে মোল্লার চোখে ফুলার একজন উদ্যমী কর্মযোগী এবং নতুন প্রদেশের উন্নয়নে নিবেদিতপ্রাণ এক ইংরেজ আমলা। দুটি ভিন্ন জাতীয়তাবাদের কারণে একই জিনিসকে দেখার এই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছিল। সেকালের মতো একালেও বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলে কিছু নেই। যা আছে-তা হলো দুটি ভিন্ন জাতীয়তাবাদ, হিন্দু ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ।
তিন.
বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনকে হিন্দুরা বলত স্বদেশি আন্দোলন আর ইংরেজরা বলত সন্ত্রাসাবাদী আন্দোলন। এই আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী ভ্যানগার্ড ছিল যুগান্তর ও অনুশীলন নামের দুটি দল। কিন্তু হিন্দু জমিদাররা টাকা-পয়সা দিয়ে এ দুটি দল তৈরি করে। এদের উদ্দেশ্য ছিল শক্তি প্রয়োগ করে ইংরেজ শাসনকে উৎখাত করা। এ আন্দোলনের ওপর বঙ্কিমচন্দ্রের চিন্তাভাবনার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছিল। বঙ্কিমের প্রভাবের ফলে এ আন্দোলন রেডিকাল হয়ে ওঠে এবং বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধে আন্দোলনকারীদের সশস্ত্র জাতীয়তাবাদকে বাঙালি হিন্দু স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও আকাক্সক্ষা পূরণের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে যুগান্তর ও অনুশীলন গোষ্ঠীর রেডিকাল কর্মীরা বাঙালি হিন্দু মানসে দ্রুততার সাথে স্থান করে নেয়।
বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এর ভাবনাচিন্তা ও তত্ত্বকে স্বদেশি রেডিকালরা গ্রহণ করে। আনন্দমঠ ছিল সেকলে এই রেডিকালদের কাছে বাইবেলতুল্য। আনন্দমঠ-এর কর্মপদ্ধতি ও ভাবাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সেকালের অসংখ্য হিন্দু তরুণ বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন, যা একসময় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়-তার সাথে জড়িয়ে পড়ে। আনন্দমঠ-এর রণধ্বনি বন্দে মাতরম এদেরও রণধ্বনি হয়ে ওঠে।
আনন্দমঠ বঙ্কিমচন্দ্রের একটি বিখ্যাত উপন্যাস। এটা মূলত একটা তত্ত্বধর্মী ও প্রচারমূলক উপন্যাস। এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে তিনি হিন্দু পুনরুজ্জীবনের একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন এবং হিন্দু ধর্মকে আশ্রয় করে দেশপূজার একটি নতুন ধর্ম আবিষ্কার করেন। দেশ তার কাছে মাটি নয়, ঈশ্বর। দেশ হলো জাতির যুগযুগান্তের সাধনার জমাট বিগ্রহ। দেশের মধ্যে অনন্ত সত্তা বিদ্যমান। দেশ ঈশ্বর। দেশ দেবী। দেশ মা। এভাবে বঙ্কিম পৌত্তলিক হিন্দুর মানসস্বর্গে এক নতুন দেবী প্রতিমা সৃষ্টি করলেন। হিন্দুর হৃদয়ের ভক্তিকে এক নতুন পথে চালিত করেন। যারা তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর পূজা-অর্চনায় অভ্যস্ত, তাদের জন্য এই নতুন দেবী কোনো বিস্ময়কর ঘটনা হলো না। এভাবে ইউরোপের দেশপ্রীতিকে তিনি হিন্দুর পূজার উপকরণের সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করলেন এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের অর্গল খুলে দিলেন। আজকে ভারতজুড়ে যে হিন্দুত্বের রমরমা, তার আদি পিতা হলেন বঙ্কিমচন্দ্র। আর এভাবে স্বদেশি আন্দোলনের ভাবকল্পে একদিকে প্রতিষ্ঠিত হলো পৌত্তলিকতা, অন্যদিকে মুসলমানবিদ্বেষ। আনন্দমঠ-এ দেখা যায়, সন্ন্যাসীরা মুসলমানদের যুদ্ধ করে তাড়িয়ে দিচ্ছে।
বঙ্গভঙ্গবিরোধী সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের মূল ভাবই ছিল আনন্দমঠ-এ উল্লিখিত হিন্দু ধর্মের আদর্শ। আনন্দমঠ-এ যেভাবে পূজার উপকরণের সাহায্যে দেশাত্মবোধ শেখানো হয়েছে, পরবর্তীকালে সন্ত্রাসী বিপ্লবীরা তার হুবহু অনুকরণ করেছিল। নলিনী কিশোর গুহ আনন্দমঠ-এর পরিবেশকে বিপ্লবীরা কীভাবে আত্মস্থ করেছিল, তার এক বর্ণনা দিয়েছেন :
‘বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠে যে জমকালো প্রতিজ্ঞার নতুনা দেখাইয়াছেন, বিপ্লববাদীরাও যে প্রতিজ্ঞা ব্যাপারে তাহারই কতকটা অনুকরণ করিয়াছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই।
এখানে অনুশীলনের গোড়াকার প্রতিজ্ঞা গ্রহণের নমুনা দিতেছি, এখানে পুলিনবাবু স্বীয় দীক্ষণ বা প্রতিজ্ঞা গ্রহণের বর্ণনা করিতেছেন-
পি. মিত্রের আদেশ মতে একদিন (কলিকাতায়) একবেলা হবিষ্যান্ন আহার করিয়া সংযমী থাকিয়া পরের দিন গঙ্গা¯œান করিয়া পি. মিত্রের বাড়ীতে তাঁহার নিকট হইছে দীক্ষা লইলাম। ধূপ দীপ নৈবদ্য পুষ্প চন্দনাদি সাজাইয়া ছান্দোগ্যোপনিষদ হইতে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করিয়া পি. মিত্র যজ্ঞ করিলেন, পরে আমি আলীয়াসনে বসিলাম-আমার মস্তকে গীতা স্থাপিত হইল। তদুপরি অসি রাখিয়া উহা ধরিয়া পি. মিত্র আমার দক্ষিণে দ-ায়মান হইলেন-উভয় হস্তে ধারণ করিয়া যজ্ঞগ্নির সম্মুখে কাগজে লিখিত প্রতিজ্ঞাপত্র পাঠ করিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইলাম। পরে যজ্ঞাগ্নিকে ও পি. মিত্রকে নমস্কার করিলাম।
পুলিশ বাবু বলেন: পি. মিত্র যে পদ্ধতিতে আমাকে দীক্ষা দিয়াছেন গুপ্তচক্রের মধ্যে গ্রহণ করিবার পূর্বে আমিও অনুরূপ পদ্ধতিতে আমার বাসায় দীক্ষা দিতাম। একসঙ্গে অনেককে দীক্ষা দিতে হইলো-ঢাকা নগরের উপকণ্ঠে পুরাতন ও নির্জন সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে যাইয়া একটু জাঁকজমক করিয়াই দীক্ষা দিতাম। অর্থাৎ সংযম উপবাস হবিষ্যান্ন গ্রহণ করিয়া শুদ্ধ চিত্তে কালি মূর্তির নিকট আলীঢ়াসনে বসিয়া মস্তকে গীতা ও অসি ধারণ করিয়া প্রতিজ্ঞা করাইতাম। পুলিশ বাবু দীক্ষান্তে প্রত্যেক সত্যকে পর্যাপ্তরূপে বিশুদ্ধ ঘৃত ও চিনি সংযুক্ত কাচা দুগ্ধ সেবন করিতে দিতেন। এই সকল প্রতিজ্ঞা বা দীক্ষা গ্রহণ পদ্ধতিতে বঙ্কিমের আনন্দমঠের অনুকরণ লক্ষ্য করিবার।’৩
আনন্দমঠ একটা রাজনৈতিক উপন্যাসও বটে। এ রকম আর একটা উপন্যাস হচ্ছে শরৎচন্দ্রের পথের দাবি। তবে আনন্দমঠ-এর সন্ন্যাসীরা হিন্দু জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা ছিলেন। পথের দাবিতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ বঙ্কিমের মতো প্রবল নয়। আনন্দমঠ-এ মুসলিম শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখি। পথের দাবি-তে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা যায়। তবে দুজন ঔপন্যাসিক উগ্র-জাতীয়তাবাদের সমর্থক ছিলেন। আর এর সূচনা করেন বঙ্কিমচন্দ্র। বঙ্কিমের বিপ্লবী রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত হয়েই শরৎচন্দ্র পথের দাবি রচনা করেন। পথের দাবিও ছিল বিপ্লবীদের একটা পছন্দের বই। এ কারণে ব্রিটিশ সরকার এটাকে বাজেয়াপ্ত করেছিল। শরৎচন্দ্র নিজেও ছিলেন বিপ্লবীদের সমর্থক।
আনন্দমঠ-এ দেশ আর ধর্ম একাকার হয়ে গিয়েছিল হিন্দু ধর্ম থেকে প্রেরণা পেয়ে আনন্দমঠ-এর সন্ন্যাসীরা যে দেশাত্মবোধক গানটি গাইতেন, তার নাম বন্দে মাতরম। এই গানের ভেতরেও বিধৃত আছে পৌত্তলিকতা, দেশকে দেবী মনে করে পূজার আহ্বান। বঙ্কিমের গানটি তুলে ধরি:
বন্দে মাতরম্
সুজলাং সুফলাং
মলয়জশীতলাম্
শস্যশ্যামলাং
মাতরম্॥
শুভ-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম্
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম্
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম্
সুখদাং বরদাং মাতরম্॥
সপ্তকোটীকণ্ঠ-কল-কল-নিনাদকরালে
দ্বিসপ্তকোটীভুজৈধৃত-খরকরবালে
অবলা কেন মা এত বলে!
বহুবলধারিণীং
নমামি তরিণীং
রিপুদলবারিণীং
মাতরম্॥
তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম্ম
তুমি হৃদি তুমি মর্ম্ম
ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।
বাহুতে তুমি মা শক্তি
হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি
তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে!
ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী
কমলা কমল-দলবিহারিণী
বাণী বিদ্যাদায়িণী
নমামি ত্বাং
নমামি কমলাম্
অমলাং অতুলাম্
সুজলাং সুফলাং
মাতরম্॥
বন্দে মাতরম্
শ্যামলাং সরলাং
সুস্মিতাং ভূষিতাম্
ধরণীং ভরণীম্
মাতরম্॥
এই গান যে মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, এটা খুব স্বাভাবিক। গানটিও লেখা হয়েছিল প্রধানত হিন্দুর ধর্মীয় ভাষা-সংস্কৃতি। এটা গ্রহণ হলে সেটাই হতো অস্বাভাবিক। প্রথম কারণ, এটা আনন্দমঠ-এর সাথে সংশ্লিষ্ট গান। দ্বিতীয় কারণ, মাতৃভূমিকে দেবী হিসেবে বন্দনা করা পৌত্তলিকতা। গানটিতে বঙ্কিম যে মাতৃভূমির বন্দনা করেন, সেখানে তো সপ্তকোটি কণ্ঠ ও দ্বি-সপ্তকোটি বাহুর উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সাত কোটি তখন বাংলার জনসংখ্যা হলেও এর বেশি অংশ ছিল মুসলমান। তিনি এখানে হিন্দু-মুসলমানের কথা না বলে বললেন হিন্দুর কথা। শুধু তা-ই নয়, তিনি মুসলমানকে হিন্দুর সাথে মাতৃদেবীর পূজা করত বললেন। মন্দিরে প্রতিমা গড়ার কথাও বললেন। সেক্ষেত্রে মুসলমান পাঠক তাকে সাম্প্রদায়িক বলতেই পারেন। কোনো সন্দেহ নেই, এই গান সেদিন ভারতে হিন্দু-মুসলমানকে তফাত করে দেয়। এই গান ভারতে হিন্দু-মুসলমান মিলে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই পৌত্তলিক বন্দে মাতরম দ্বারা রবীন্দ্রনাথও প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের ভাগিনী সরলাদেবী তার আত্মস্মৃতি জীবনের ঝরা পাতায় লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথই প্রথম বন্দে মাতরম গানে সুর দেন:
‘বন্দে মাতরাম’-এর প্রথম দুটি পদে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) সুর দিয়েছিল নিজে। তখনকার দিনে শুধু সেই দুটি পদই গাওয়া হতো। একদিন আমার ওপর ভার দিলেন-বাকি কথাগুলোতে তুই সুর বসা।’৪
অতঃপর জগদীশ ভট্টচার্য লিখেছেন:
‘কংগ্রেস-ম-পে প্রথম বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গান করেন তাঁর সর্বোত্তম উত্তরসূরি রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ বন্দে মাতরম গান নিজেই সুর দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্মুখে গেয়েছিলেন। সেই সুরেই তিনি ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের কলিকাতা অধিবেশনে গানটি গেয়ে সবাইকে মুগ্ধ করেন।’৫
বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা রেখেছিলেন তার গান দিয়ে। গানে গানে তিনি সেকালের হিন্দু মনকে নাড়িয়ে দেন এবং তাদের উজ্জীবিত করেন সংগ্রামের আদর্শে। তিনি হয়ে ওঠেন নতুন জাতীয়তাবাদের কবি। কিন্তু এসব গানে বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ ও বন্দে মাতরম গানের ছায়া ভালোমতোই দেখা যায়। দেশকে দেবী বলে পূজা করার যে রীতি বঙ্কিমচন্দ্র আবিষ্কার করেছিলেন, সেটি রবীন্দ্রনাথের এসব গানে নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এসব গানের ভেতরে মা ও জননী বলে যাকে বন্দনা করা হয়েছে, তিনি দেশমাতৃকা। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় যথার্থ লিখেছেন :
‘বাঙালির কাছে সেদিন দেশ সত্যই মাতৃরূপে প্রকাশিত হইয়াছিল। এবং রবীন্দ্রনাথ যে সেই মহাযজ্ঞে শক্তিমন্দ্রোচ্চার দ্বারা দেশ মাতৃকার বন্দনা করিয়াছিলেন। এ কথা কবির অস্বীকৃতি বা দেশবাসীর বিস্মৃতির দ্বারা অপমানিত হইচে না।’৬
বঙ্গভঙ্গের পটভূমিতে স্বদেশি যুগে রবীন্দ্রনাথ যেসব গান লিখেছিলেন, তার অধিকাংশই বাউল সুরে বাধা। জমিদারি দেখাশোনা করতে গিয়ে তিনি কুষ্টিয়ার বাউলদের সাথে পরিচিতি হয়েছিলেন এবং তাদের লেখা গানের সুরে তার মন বাধা পড়েছিল। তিনি অকাতরে এসব সুর ব্যবহার করেছিলেন। অনেকটা তাদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়াই। এসব গানের সুর বাউলদের হলেও এর ভাবসম্পদ তিনি নিয়েছিলেন বঙ্কিমের চিন্তাধারা থেকে। যেন এসব গানের পেছনে অলক্ষে এসে বঙ্কিমচন্দ্র দাঁড়িয়েছেন। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ যেসব গান লেখেন, তার অনেকগুলো এ রকম :
১. যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে
তবে একলা চলো রে।
একলা চলো একলা চলো
একলা চলো রে ॥…
২. বাংলার মাটি, বাঙলার জল,
বাঙলার বায়ু, বাংলার ফল
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক।
পুণ্য হউক হে ভগবান ॥
৩. অয়ি ভূবন মন মোহিনী
৪. ও আমার দেশের মাটি
তোমার ‘পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর,
তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।
৫. আজি বাঙলা দেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী।
৬. আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি।
৭. সার্থক জন্ম আমার জন্মেছি এ দেশে
সার্থক জনম, মা গো তোমায় ভালোবেসে॥
৮. তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে
তা বলে ভাবনা করা চলবে না।
৯. এবার তোর মরা গাঙে বান এসেছে,
‘জয় মা’ বলে ভাসা তরী।
১০. আমি ভয় করব না, ভয় করব না।
দুবেলা মরার আগে মরব না, ভাই, মরব না॥
১১. যে তোমারে ছাড়ে ছাড়–ক,
আমি তোমায় ছাড়ব না মা!
প্রবোদচন্দ্র সেন এসব গানের সাংস্কৃতিক তাৎপর্য পর্যালোচনা করে লিখেছেন বঙ্কিমের ভাবধারা রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে এক নান্দনিক রূপ পরিগ্রহ করেছে। প্রবোধের ভাষ্য উদ্ধার করছি:
এ কথা সকলেই জানেন যে, রবীন্দ্রনাথের দেশভক্তি তার ঈশ্বরভক্তিরই একটা বিশেষ রূপমাত্র। স্বদেশ সাধনাকে তিনি ধর্ম-সাধনারই অন্যতম প্রধান অঙ্গ বলে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তার কয়েকটি রচনা থেকে তার প্রমাণ উদ্ধৃত করছি-
হে বিশ্বদেব, মোর কাছে তুমি
দেখা দিলে আজ কী বেশে!
দেখিনু তোমার পূর্বগগণে
দেখিনু তোমারে স্বদেশে।
দেখা যাচ্ছে, এখানে বিশ্বদেবকেই স্বদেশের অধিদেবতা বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। এই অধিদেবতার মাতৃরূপ স্বীকৃত হয়নি; কিন্তু অন্যত্র এই বিশ্বদেবই দেখা দিয়েছেন বিশ্বময়ী ও বিশ্বজননীরূপে-
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ীর
তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা॥
তুমি যে সকল সহা
সকল বহা, মাতার মাতা॥
এখানে কিন্তু বিশ্বজননীই রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে স্বদেশজননীরূপে স্বীকৃত হয়েছেন। ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানটি প্রকাশিত হয়েছিল বঙ্গদর্শন পত্রিকায় আশ্বিন সংখ্যায়। মনে রাখতে হবে, মাসটা ছিল আশ্বিন, মাতৃবন্দনার মাস। রবীন্দ্রনাথ তাই বিশ্বময়ী তথা বিশ্বমাতাকেই দেশমাতৃকারূপে বন্দনা করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম গানের ভাবকল্পনাটিরই সহজ-সরল ও স্বাভাবিক প্রকাশ ঘটেছে এই গানটিতে। বস্তুত সমগ্রভাবে বিচার করলে এই গানটিকে বন্দে মাতরম গানের রবীন্দ্র ভাষা বলে মনে করা যায়।
ওই সময়েই ভান্ডার পত্রিকায় আর একটি গান প্রকাশিত হয় মাতৃভূমি নামে। বন্দে মাতরম গানে দেশমাতৃকার যে রূপকল্পনা প্রকাশ পেয়েছে, রবীন্দ্রনাথের এই মাতৃমূর্তি গানটিতে সেই রূপকল্পনা উদ্ভাসিত হয়েছে এক অপূর্ব আভাময়তার মধ্যে। গানটির প্রথমাংশ এই-
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
ওগো মা তোমায় দেখে আঁখি না ফিরে
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে॥
ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে, বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ
দুই নয়নে ¯েœহের হাসি, লালটনেত্র আগুনবরণ
ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজ দেখি রে।
তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।
এই অংশটুকুর মধ্যে শারদীয়া দেবীমূর্তিটি যেন নবদেহ পরিগ্রহ করছে স্বদেশের মাতৃমূর্তিরূপে। বঙ্কিমচন্দ্রের ত্বং হি দুর্গা প্রহরণ ধারিণী কিংবা তোমারি প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে ইত্যাদি কল্পনার ভাবসত্তাটুকু নতুন প্রভায় দীপ্যমান হয়ে উঠেছে এই মাতৃমূর্তি কল্পনার মধ্যে। বস্তুত এই গানটি যেন বন্দে মাতরম গানের শেষাংশের রবীন্দ্রভাষ্য। তফাত এই যে, রবীন্দ্রনাথ তার বস্তুগত স্থূলতাকে বাদ দিয়ে শুধু ভাবসত্তাটুকুকেই গ্রহণ করেছেন।৭
বলা বাহুল্য, ডান হাতে খড়গ, বাঁ হাতে বরাভয়, অগ্নিবর্ণ ললাটনেত্র মা-ই হয়েছে রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা-স্বদেশি যুগের প্রসিদ্ধ গান। এই গানটি বাংলাদেশের জন্মের পর আমাদের জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়েছে। ওপরে উল্লিখিত বর্ণনা থেকে ধারণা করা হয়, সংগত এসব গান একই সাথে বঙ্গভঙ্গবিরোধী হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু জাতীয়তাবাদের গানও বটে। আমাদের জাতীয় সংগীত এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। এ গানেও রবীন্দ্রনাথ বাংলাকে মা হিসেবে বন্দনা করেছেন। এ মা সাধারণ অর্থে মা নয়। দেশকে দেবী অর্থে মা ডাকা হয়েছে। অধ্যাপক সুগত বসু তার ঘধঃরড়হ ধং গড়ঃযবৎ ধহফ ড়ঃযবৎ ারংরড়হং ড়ভ হধঃরড়হযড়ড়ফ কিতাবে এসব নিয়ে কিছুটা পর্যালোচনামূলক আলাপ করেছেন। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা কবিতায়, গানে, চিত্রকলায় যে মায়ের আরাধনা করেছেন, তাকে তারা কখনো ভারতমাতা, কখনো বঙ্গমাতা বলেছেন। তিনি শুধু মানবী নন, দেবীও বটে।
ছাত্রজীবনে কমিউনিস্ট পার্টি করা বাংলাদেশের এক সাবেক আমলা আকবর আলি খান দুর্ভাবনা ও ভাবনা রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নামে ২০১৯ সালে একটি বই লেখেন। এখানে তিনি আমার সোনার বাংলাকে নিয়ে পৌত্তলিকতার অভিযোগকে অস্বীকার করে বলেন, রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মণ ছিলেন না। ব্রাহ্মণরা একেশ্বরবাদী। উপনিষদের মর্মবাণী দ্বারা লালিত। এসব গানে তাই পৌত্তলিকতার প্রতিফলন ঘটেনি। রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তি জীবনে যা-ই থাকুক না কেন, তিনি বঙ্গভঙ্গবিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শরিক হন। এ আন্দোলনে প্রাণশক্তি ছিল আনন্দমঠ বর্ণিত দেশমাতৃকার পূজার ধারণা। সেকালে রবীন্দ্রনাথ সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের রাজনৈতিক পৌত্তলিকতার পালে যথেষ্ট হাওয়া দিয়েছিলেন।
আকবর আলী খান আরও লেখেন, তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম গানের সেই অংশটুকুতে সুর দিয়েছেন, যেখানে নাকি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনা আছে। যেখানে বঙ্কিমচন্দ্র মাকে দুর্গা হিসেবে বিশ্বাস করেছেন, সে অংশের সুর তিনি দেননি। এটা খান সাহেবের অভিনব আবিষ্কার, একটা গানকে সামগ্রিকভাবে বিচার করা হয়; দু-একটি স্তবককে দিয়ে বিচ্ছিনভাবে নয়। পুরো গানটি যে পৌত্তলিকতার ভাবসত্তা ও মর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেবী-দুর্গার সৌন্দর্যেরই একটা প্রকাশ, সেটাও কারও অজানা থাকার কথা নয়।
আকবর আলী খান আমার সোনার বাংলা গানটিকে দায়মুক্তি দিতে লেখেন, অনেক মুসলমান কবি সাহিত্যিক দেশ অর্থে মা শব্দটা ব্যবহার করেছেন। পৌত্তলিকতা পৌত্তলিকতাই। রাজনীতির প্রয়োজন হলেও পৌত্তলিকতা। এটা যেন আমরা ভুলে না যাই।
এ দেশের বামপন্থিদের একটা গভীর অসুখ সামন্তবাদ সা¤্রাজ্যবাদের বিরূদ্ধে অষ্টপ্রহর নিন্দামন্দ করার পরও সামন্ত জমিদার রবীন্দ্রনাথ নিয়ে তাদের থরো থরো আবেগের শেষ নেই। এ কারণেই এ দেশের বামপন্থিরা দু-একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম ছাড়া কোনো কালেও সর্বহারার আন্তর্জাতিকবাদী হতে পারেননি। হয়েছেন কলকাতার সংজ্ঞায়িত বাঙালি জাতীয়তাবাদী।
এটা সত্য, বঙ্গভঙ্গের রাজনীতি শেষ হয়ে যাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কিছুটা পরিবর্তন আসে। তিনি এ সময় স্বদেশি আন্দোলনের সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক দিকটি নিয়ে কিছুটা সমালোচনা করেন এবং এই রাজনীতির নিন্দা করে লেখেন তার বিখ্যাত ঘরে বাইরে উপন্যাস।
পরবর্তীকালে ১৯৩৭ সালে যখন ভারতীয় কংগ্রেস বন্দে মাতরমকে জাতীয় সংগীত করার উদ্যোগ নেয়, তখন থেকেই বিতর্কে দেখা দেয়। মুসলমানরা পৌত্তলিকতা অভিযোগে জাতীয় সংগীত হিসেবে এ গানটিকে গ্রহণ করতে অসম্মতি জানায়। তখন কংগ্রেস নেতারা রবীন্দ্রনাথের মতামত জানতে চান। রবীন্দ্রনাথ এ গানের পৌত্তলিকতার সারবত্তা যে মুসলমান মনে আঘাত হানতে পারে, তা স্বীকার করে নেন এবং এটির অন্তর্গত সরাসরি পৌত্তলিক অংশটুকু কাটছাঁট করে গ্রহণ করার প্রস্তাব দেন। অন্যত্র বুদ্ধদেব বসুর কাছে লেখা এক চিঠিতে এই গানের পৌত্তলিক চরিত্র নিয়ে তার মতামত দেন এবং এ গান যে জাতীয় সংগীত হওয়ার অনুপযুক্ত, তাও বলেন।৮
কিন্তু এসব অনেক পরের ঘটনা। আমার সোনার বাংলা গানটি লেখার পটভূমিও হিন্দু জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক পৌত্তলিকতাবাদ। কবির ভাব পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু গানটি আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে তার পটভূমিসহ কবি এটি নিয়ে আর আলাপ করেননি, তবে উরংড়হি-ও করেননি। এই পটভূমিতে বিচার করলে এ গানটিকে বড়ো জোর একটা হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত করা যেতে পারে; অন্য কিছু নয়।
চার.
রবীন্দ্রনাথ তার ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি লেখেন কুষ্টিয়ার বাউল শিল্পী ও গীতিকার গগন হরকরার লেখা ‘আমি কোথায় পাব তারে’ গানটির অনুকরণে। শুধু তা-ই নয়, তিনি আমার সোনার বাংলা গানটিতে হুবহু গগন হরকরার গানটির সুর বসিয়ে দেন। বলা চলে রবীন্দ্রনাথ সোনার বাংলা গানটি গগন হরকরার সৃষ্ট গানের কাঠামো ও সুর নিয়ে তৈরি করেন।
গগন হরকরার বাড়ি ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহের আড়াপাড়া গ্রামে। তিনি কাজ করতেন ডাক বিভাগের ডাক হরকরা হিসেবে। লালনের সামসাময়িক এক বাউল তিনি। তার গলায় ছিল সুর। তিনি নিজেই গান লিখতেন। সুর দিতেন ও গলা ছেড়ে গান গাইতেন। তাকে একজন স্বভাবকবিও বলা যায়।
গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে’র গীতটা এখানে তুলে দিই। সেইসাথে আমার সোনার বাংলার গীতটাও। তাহলে মিলিয়ে দেখা সহজ হবে। ইউটিউবে এখন দুটি গানই পাওয়া যায়। সেটাও মিলিয়ে দেখা সহজ। তাহলে বোঝা যাবে, দুটি গানের সাদৃশ্য; কথা ও সুরের মিলের জায়গাটা।
রবীন্দ্রনাথের গানটির পূর্ণপাঠ:
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস,
আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি॥
ও মা, ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে,
মরি হায়, হায় রে-
ও মা, অঘ্রানে তোর ভরা ক্ষেতে আমি কী দেখেছি মধুর হাসি॥
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী ¯েœহ, কী মায়া গো-
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।
মা তোর মুখের বাণী আমার কানে লাগে সুধার মতো,
মরি হায়, হায় রে-
মা তোর বদনখানি মলিন হলে, ও মা আমি নয়নজলে ভাসি॥
তোমার এই খেলাঘরে শিশুকাল কাটিল রে,
তোমারি ধুলামাটি অঙ্গে মাখি ধন্য জীবন মানি।
তুই দিন ফুরালে সন্ধ্যাকালে কী দীপ জ্বালিস ঘরে,
মরি হায় হায় রে-
তখন খেলাধুলা সকল ফেলে, ও মা, তোমার কোলে ছুটে আসি॥
ধেনু-চরা তোমার মাঠে, পারে যাবার খেয়াঘাটে,
সারাদিন পাখি-ডাকা, ছায়ায়-ঢাকা তোমার পল্লীবটে
তোমার ধানে ভরা আঙিনাতে জীবনের দিন কাটে,
মরি হায়, হায় রে-
ও মা, আমার যে ভাই তারা সবাই, ও মা, তোমার রাখাল তোমার চাষি॥
ও মা, তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে-
দে গো তোর পায়ের ধূলা, সে যে আমার মাথার মানিক হবে।
ও মা, গরিবের ধন যা আছে তাই দিব চরণতলে,
মরি হায়, হায় রে-
আমি পরের ঘরে কিনব না আর, মা, তোর ভূষণ ব’লে গলার ফাঁসি॥
গগন হরকরার গানটির পূর্ণপাঠ:
আমি কোথায় পাব তারে আমার মানুষ যে রে
হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশে দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে
লাগি সেই হৃদয়শশী সদা প্রাণ হয় উদাসী
পেলে মন হত খুশি দেখতাম নয়ন ভরে॥
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই অনল কেমন করে
মরি হায়, হায় রে
ও তোর বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
ওরে দেখনা তোমরা হৃদয় চিরে॥
দিব তার তুলনায় কি যার প্রেমে জগৎ সুখী
হেরিলে জুড়ায় আঁখি সামান্যে কি দেখিতে পারে
তারে যে দেখেছে সেই মজেজে ছাই দিয়ে সংসারে
মরি হায়, হায় রে
ও সে না জানি কি কুহক জানে
অলক্ষ্যে মন চুরি করে॥
কুল-মান সব গেল রে তবু না পেলাম তারে
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে॥
ও তার বসত কোথায়, না জেনে তায় গগন ভেবে মরে
মরি হায়, হায় রে
ও সে মানুষের উদ্দিশ যদি জানুস কৃপা করে
আমার সুহৃদ হয়ে ব্যথায় ব্যথিত॥
গগন গানটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আগে। রবীন্দ্রনাথ গগনের সুরটা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় যখন রবীন্দ্রনাথ আমার সোনার বাংলা গানটি লেখেন, তখন তিনি এ কাজটি করেন। যতদূর জানা যায়, গগন হরকরা সে সময় জীবিত থাকার পরও তার কাছ থেকে রবীন্দ্রনাথ কোনো অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। এত বড়ো মাপের একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও গ্রামের একজন দরিদ্র ব্যক্তির মেধাপ্রসূত সম্পদকে রবীন্দ্রনাথ আত্মসাৎ করেন। বলা চলে অজগরের মতো অনেকটা। গিলে ফেলেন। এ যেন তার নিজের লিখিত দুই বিঘা জমির জমিদারের মতো-‘রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি’।
রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে যখন জমিদারি দেখাশোনা করতে আসতেন, তখন তিনি বাউলদের সংস্পর্শে আসেন। সে সময় গগনের সাথে তার পরিচয় হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রায়ই গগনকে তার কাছারিতে ডেকে নিয়ে আসতেন। গান শোনার জন্য। গগনও উৎসাহের সাথে গান শোনাতেন তাদের জমিদার বাবুকে। গ্রামের এই সহজ-সরল বাউল তখনও বুঝে উঠতে পারেননি-কী আছে জমিদার বাবুর মনে।
সেকালে এখনকার মতো তথ্য প্রবাহের সুবিধা ছিল না। তাই রবীন্দ্রনাথের পক্ষে এত বড়ো একটা ঘটনা সহজে গুম করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। জমিদারির দাপটের কারণেও সেটা সহজ হয়েছে। বঙ্গভঙ্গের সময় রবীন্দ্রনাথ যেসব গান লিখেছিলেন, তার অনেকগুলোর সুরই বাউল সুর থেকে নেওয়া।
লালন ফকিরের শিষ্যদের মধ্যে একটা বিশ্বাস ছিল, রবীন্দ্রনাথের হাতে পড়ে লালনের গানের খাতা সুকৌশলে গীতাঞ্জলি-তে পরিণত হয়। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের নোবেল পাওয়া ও বিশ্বখ্যাতির মূলে আছে বাংলার বাউলরা। শোনা যায়, রবীন্দ্রনাথ নোবেল পাওয়ার পর লালনের শিষ্যরা তার কাছে সেই খাতাটি ফেরত চায়। কিন্তু কোনো উত্তর পায় না। তখন তারা বলাবলি করতে থাকে, রবি তো পুরস্কার পেয়েই গেছে। এখন আমাদের খাতাটা ফেরত দিলে অসুবিধা কী। বাউলদের ভেতরে প্রচলিত এ রকম গল্পের কথা কুষ্টিয়ার একসময়কার এসডিও সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়ও লিখেছেন।৯
রবীন্দ্রনাথ বাইশ শ’র মতো গান লিখেছিলেন। তার ভক্ত, স্তাবকরা এসব গান প্রায় ধর্মীয় সংগীতের মতো ভক্তি ভরে শুনে থাকে। কিন্তু এসব গানের অনেকগুলোই বিশুদ্ধ নয়। মৌলিক গান নয়। অন্য গানের সুর থেকে সরাসরি নকল করা কিংবা ভেঙেচুরে তিনি নিজের মতো করে নিয়েছেন। তিনি তার বিভিন্ন গানে বিদেশি সুর ব্যবহার করেছেন। লোকসংগীতের সুর, বাউলদের সুর নিয়েছেন। পৃথিবীর বহু কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, সুর¯্রষ্টা অন্যের সৃষ্টি দিয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। এতে দোষের কিছু নেই। তবে রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গানের ক্ষেত্রে অনুপ্রাণিত না বলে অনুকরণ বলাই সংগত। বিশেষ করে আমার সোনার বাংলা গানটি নিয়ে রবীন্দ্রনাথ গগন হরকরার সাথে যা করেছেন, তাকে কুম্ভলীলকবৃত্তি বলা যায়। ইংরেজিতে একেই বলে প্লেইজারিজম। রবীন্দ্রনাথের আরও কিছু লেখালিখি নিয়ে এ ধরনের প্লেইজারিজমের অভিযোগ রয়েছে।
২০০৬ সালে বিবিসির এক জরিপে আমার সোনার বাংলা গানটি সর্বকালের সেরা বাংলা গান হিসেবে নির্বাচিত হয়। এই সর্বকালের সেরা গানটির সুর¯্রষ্টা গগনকে আমরা চিনি না। চিনি কুম্ভিলক রবীন্দ্রনাথকে। আরও কষ্টের ব্যাপার হলো-এটি এখন আমাদের জাতীয় সংগীত। অথচ এই সংগীতের পেছনে যে বঞ্চনা, রাহাজানি ও চৌর্যবৃত্তির ইতিহাস দেখি, তা ঢাকা পড়ে গেছে রবীন্দ্রপূজারিদের পরম মিথ্যা ও অসংগত আবেগে। আর গগন বুঝতেই পারেননি, তার গান চুরি হয়ে গেছে। নিজের অজান্তেই তিনি সর্বকালের সেরা বাংলার গানের সুর সৃষ্টি করেছেন। রবীন্দ্রনাথ অনেক দিন গত হয়েছেন। তাকে নিয়ে যে যুক্তিহীন আবেগের তুফান তৈরি হয়েছিল, তা অতিক্রম করার জন্য এটা যথেষ্ট সময়। এটা সত্য রবীন্দ্র ভক্তের সংখ্যা যথেষ্ট কমেছে। কালে কালে সেটাও থাকবে না। তখন রবীন্দ্রনাথকে নির্মোহভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে। সেই মূল্যায়ন হবে ভাবলেশহীন নিরপেক্ষতার চাদরে তৈরি। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যে সত্য, অর্ধ সত্য, অসত্য ও মিথের একটা খিচুড়ি তৈরি হয়েছে, তার নিরসন হওয়া জরুরি। কেবল তখনই রবীন্দ্রনাথ নিজের আলোয় আলোকিত হবেন।
পাঁচ.
হিন্দু জাতীয়তাবাদের পটভূমিতে লেখা রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের জাতীয় সংগীত। এটা কী করে সম্ভব হলো? ১৯৬০-এর দশকে পূর্ব বাংলার মধ্যশ্রেণির একটি প্রবল অংশ রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে। সে সময় তারা পাকিস্তানের মুসলিম জাতীয়তাবাদী ভাবাদর্শকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে। তাহলে কি বলতে হবে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন দেশ গড়বার লক্ষ্যের মধ্যে রবীন্দ্রনাথও একটা লক্ষ্য হিসেবে হাজির ছিল? অন্তত সে সময়কার ইতিহাস তো তা-ই বলে।
রবীন্দ্রনাথ তো ¯্রফে একজন কবি নন। তার একটা রাজনীতি ছিল। ছিল রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শন। সেই চিন্তাভাবনার মধ্যে একটা প্রবল হিন্দুত্ববাদী প্রবণতাও ছিল। শিল্প, সাহিত্যও সংস্কৃতির দিক দিয়ে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা বিস্তর সুযোগ আছে। রাজনৈতিকভাবে তাকে পর্যালোচনার জায়গা আছে। এমনকি আমাদের এ অঞ্চলের মানুষের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মূল্যবোধের জায়গা থেকেও রবীন্দ্রনাথকে যাচাই করার প্রয়োজন আছে। পূর্ব বাংলার কৃষক মুসলমানদের জায়গা থেকেও রবীন্দ্রনাথের রাজনীতি কোন কালেই তেমন একটা উপকারী ছিল না। রবীন্দ্রনাথের জমিদারি ছিল পূর্ব বাংলায়। তার অধিকাংশ প্রজা ছিল মুসলমান। এদের খাজনার টাকায় তার সংসার চলত। ধারণা করি, এই মুসলমান কৃষক প্রজারা তাদের খেতের আনাজ, বাড়ির মুরগি, পুকুরের মাছ হিন্দু প্রজাদের মতোই জমিদারের কাছারিতে নজরানা হিসেবে জমা দিত। রবীন্দ্রনাথ সেসব খেয়েছেন, ভোগ করেছেন। এগুলো তার শরীরের স্বাস্থ্য ও লাবণ্য উভয়ই বৃদ্ধি করেছে।
এটা অবাক করার মতো কা-, এত কিছুর পরও এই মুসলমান প্রজাদের নিয়ে তার কলম থেকে কিছুই বের হয়নি। তার ভাবজগতে কত রকম মেঘ বৃষ্টি, ঝড়ের খেলা চলেছে; কিন্তু এই মুসলমান কৃষকরা তার ভাবজগতে কোনো ঢেউ সৃষ্টি করতে পারেনি। অথচ এরা ছিল বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়। এত বড়ো একটা বিশাল জনগোষ্ঠী-যাদেরকে রবীন্দ্রনাথ খুব কাছে থেকে দেখেছেন, তাদের জীবনযাপন, চলাফেরা, ধর্ম সংস্কৃতি, বিয়ে-শাদি কোনো কিছু নিয়েই তার ঔৎসুক্য জাগল না? এই যে মুসলমান সমাজ নিয়ে তার উদাসীনতা, নীরবে, অবচেতনে ভারতবর্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের অস্তিত্ব অস্বীকার করে যাওয়া, সেটা রবীন্দ্রনাথ তার পরিবার ও সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মনোগঠন থেকে অর্জন করেছিলেন। এসব ক্ষেত্রে জমিদার রবীন্দ্রনাথের একটা ভূমিকা ছিল।
মুসলমান কৃষকদের সাথে, রায়তদের সাথে, প্রজাদের সাথে জমিদাররা ভালো ব্যবহার করেনি। ইতিহাসে জমিদার রবীন্দ্রনাথ সেই ইতিহাসের বাইরের কেউ নন। তিনি বিশ্বকবি বলে, নোবেল লরিয়েট কবি বলে ইতিহাসের বাইরে তো যেতে পারেন না। বাংলাদেশের মুসলমানরা এই জমিদারকে অত্যাচার থেকে বাঁচবার জন্য পাকিস্তান চেয়েছিল। ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে অত্যাচার থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিল।
রবীন্দ্রনাথ নিয়ে এসব কথা উঠেছে, কারণ তিনি বড়ো মাপের মানুষ ছিলেন। তার রাজনীতি ও সংস্কৃতির যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। ছোটোখাটো মানুষ হলে তাকে নিয়ে এসব কথা উঠত না। পাকিস্তান আমলে রবীন্দ্র বর্জনের কথা উঠেছিল এই রাজনীতির কারণে। পাকিস্তানের মুসলিম ভাবাদর্শের সাথে রবীন্দ্রনাথের হিন্দুত্ববাদী ভাবধারা ও রাজনীতির একটা বিরোধিতা ছিলই। পাকিস্তান রাষ্ট্র রবীন্দ্রনাথের এই রাজনীতিকে মোকাবিলা করতে চেয়েছে। রাজনীতির জায়গা থেকে সেটা অসংগত কিছু হয়নি।
বাঙালি জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পাকিস্তানি চিন্তাভাবনা একটি নিপীড়ক মতাদর্শ। কিন্তু কথা হলো-পাকিস্তানি নিপীড়নের চেয়ে জমিদারদের নিপীড়ন কি ভালো কিছু ছিল? অ্যাকাডেমিয়াতে এ রকম জরিপ ও পরিসংখ্যান হয়েছে কি?
পাকিস্তান তো বাঙালি মুসলমানদের জমিদারদের অত্যাচার থেকে রেহাই দিয়েছিল। পাকিস্তান সৃষ্টির ফলে পূর্ববঙ্গে একটি মধ্যবিত্ত সমাজ তৈরি হয়। এখানে রাষ্ট্রীক ও সামাজিক আধুনিকায়নের একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ইতিহাস তো অস্বীকার করা যাবে না। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের সাথে তুলনা করলে এটা বোঝা যায়।
এ দেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা পাকিস্তানি মতাদর্শকে মোকাবিলার জন্য রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে এবং সেই সূত্রে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সামগ্রিক ঐতিহ্য নিজের বলে গ্রহণ করেছে। শুধু তা-ই নয়, ঊনিবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত নবজাগরণসহ যা কিছু বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে তৈরি করেছে, তার সবটাই বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা নিজেদের ঐতিহ্য হিসেবে দাবি করে। কিন্তু বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এমন যে, বাংলা ভূখ- তাও কি কোনো একাট্টা বিষয়। বাংলা ভাষাও সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত অনেক কিছুই অসাম্প্রদায়িক তো নয়ই; বরং হাড়ে-মজ্জায় সাম্প্রদায়িক। এই সংস্কৃতির ভেতরে বঙ্কিমচন্দ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন। রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দরা হিন্দুত্ববাদের ভিত তৈরি করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতায় শিবাজীর রাজনীতির জয়গান গেয়েছেন। শরৎচন্দ্র ১৯২৬ সালে দেওয়া এক বক্তৃতায় ভারতের স্বার্থে মুসলমানদের দেশ থেকে বহিষ্কারের কথা বলেছিলেন। তথাকথিত বাংলার রেনেসাঁর নায়করা নিজেদের সম্প্রদায়গত পরিচয়, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ধর্মের বাইরে অন্য কাউকে জায়গা দিতে চাননি। এই বাঙালি সংস্কৃতি এত পরিমাণ সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষী যে, বাঙালি নামক পরিচয়ে মুসলমানদের একটা অধিকার আছে, সেটা স্বীকার করেনি। মুসলমান তো মুসলমান, সে বাঙালি হয় কী করে। রাষ্ট্রগতভাবেও বাঙালি হিন্দুরা বাঙালিদের জন্য কোনো রাষ্ট্র চায়নি। বাঙালি মুসলমান চেয়েছে। এসব বিচার করলে বাঙালির সামগ্রিক ঐতিহ্য বলে কিছু নেই। এ কারণেই আবুল মনসুর আহমদ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন ও সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের মতো প-িতরা ১৯৪০-এর দশকে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় বাঙালি মুসলমানরে রাজনৈতিক আজাদির পাশাপাশি তামুদ্দুনিক আজাদির কথা বলেছিলেন। শুধু তা-ই নয়, তারা তখন বাঙালি মুসলমানের পৃথক জবান ও তমুদ্দুন প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দিয়েছিলেন।
অধ্যাপক তাজ হাশমী দেখানোর চেষ্টা করেছেন, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একই সাথে কতকটা মুসলমানবিদ্বেষী, পূর্ববঙ্গবিদ্বেষী, কৃষকবিদ্বেষী, কমিউনিস্টবিদ্বেষী এবং জমিদার ও মহাজনদের স্বার্থ রক্ষাকারী।১০
তাই পাকিস্তানকে রোখার জন্য রবীন্দ্রনাথের গানকে প্রতিষ্ঠা করে নতুন এক সাম্প্রদায়িকতা উৎপাদন করা হয়েছে। কারণ, এই বাঙালি জাতীয়তাবাদ পূর্ববঙ্গের কোনো অর্গানিক বাঙালি জাতীয়তাবাদ নয়; এটা পূর্ব বাংলার মানুষের ধর্ম, সংস্কৃতি ও ইতিহাস মিলিয়ে তৈরি হয়নি। এটি তৈরি হয়েছে কলকাতার সংজ্ঞা ধরে। এ কারণেই এখনকার বাঙালি জাতীয়তাবাদ কোনো জাতীয় ঐক্য তৈরি করতে পারেনি। আমাদের জাতি ও সংস্কৃতির পরিচয়ের যে সংকট, তা এভাবেই শুরু হয়েছে।
ছয়.
রবীন্দ্রনাথের গান আমাদের জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ের ফল। এর ফলে আমরা যে অনেকটা অবচেতনেই কলকাতকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কবলে পড়ে গেছি, তার হুঁশ অনেকেরই নেই। রবীন্দ্রনাথের ভেতর দিয়ে এমন একটা সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সেতু তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কলকাতার সাংস্কৃতিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার বিপুল সুযোগ ও বৈধতা তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে এবনে গোলাম সামাদের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য:
বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করা হয়েছে আমার সোনার বাংলা গানটিকে। ১৯০৫ সালে রবীন্দ্রনাথ এটি রচনা করেছিলেন বঙ্গভঙ্গ রদের আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করার লক্ষ্যে। এটাকে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয় শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর চাপে। না হলে প্রস্তাব উঠেছিল দ্বীজেন্দ্রলাল রায়ের ধনধান্যে পুষ্পে ভরা গানটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত করার। কিন্তু সেটা হতে পারেনি প্রধানত ইন্দিরা গান্ধীর কারণে। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৩৪ সালে এক বছর শান্তি নিকেতনে পড়েছিলেন। তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভক্ত। এ ছাড়া তিনি মনে করেছিলেন, ভারতের জাতীয় সংগীত আর বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রবীন্দ্রনাথের লেখা হলে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদে রবীন্দ্র-প্রভাব অনেক সহজে পড়তে পারবে। আর এর ফলে ভারত যথেষ্ট সহজে পারবে বাংলাদেশকে তার নিয়ন্ত্রণে রাখতে। এ ছিল একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।১১
আগেই বলেছি, রবীন্দ্রনাথের কাছে বাঙালি ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ কখনো দুটি পৃথক সত্তা হিসেবে হাজির হয়নি। তার কাছে যা ছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, তা-ই ভিন্ন মাত্রায় হয়ে উঠেছে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ। তিনিও দুটি পরিচয় কখনো পরিচিত হতে চাননি এবং সেটা সম্ভবও ছিল না; বরং ক্ষেত্রেবিশেষে, বিশেষ করে রাষ্ট্র ও জাতি পরিচয়ের জায়গায় তার ভারতীয় পরিচয় বাঙালি পরিচয়কে ছাপিয়ে গেছে। আবার এই ভারতীয় পরিচয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার হিন্দু পরিচয়ের সাথে সংলগ্ন হয়ে আছে। তাই রবীন্দ্রনাথের গানকে জাতীয় সংগীত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভারতীয় রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাববলয়ের মধ্যে নিয়ে আসাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য।
বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ ভারতীয় জাতীয়তাবাদের পরিপূরক বস্তু। বাঙালি জাতীয়তাবাদকে ভারতীয় জাতীয়তবাদের প্রক্সিও বলা যায়। এই দুই জাতীয়তাবাদপন্থিদের চিন্তাগত ও মতাদর্শিক অভিন্নতা দেখবার মতো এরা কেউ দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করে না বা ভারতীয় ইতিহাসের ভেতর থেকে উঠে আসা মুসলিম জাতীয়তাবাদ উভয়ই ‘অপর’ বানায়। এদের আস্থা সেকুলাজিরমে। আর সেকুলারিজমকে ব্যবহার করে ইসলামোফোবিয়া চর্চায় খুবই দক্ষতার সাথে। আন্ত মুসলিম সংস্কৃতি ও তার বিভিন্ন প্রতীকগুলোকে ডোমিনাইজ করা, অপর করা এদের একটা বৈশিষ্ট্য। এ কারণে দেখা যায়, ১৯৬০-এর দশকে এ দেশে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের রমরমা হয়, তার অনেক কিছুই এখানে ভারত ডিমে তা দেওয়ার মতো করে ফুটিয়ে তুলেছে।
রবীন্দ্রনাথের গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করার পেছনে একটা বড়ো ভূমিকা রাখে সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগের একটা উগ্রবাদী অংশ। এরা নিজেদের নিউক্লিয়াস নামে গোপনে সংগঠিত করেছিল। এরা বাংলাদেশের জন্য জাতীয় পতাকার ডিজাইন করে এবং ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের জন্ম দেয়। এখন ৭১-এর যুদ্ধ ও তার প্রেক্ষপট নিয়ে প্রচুর বইপত্র রচিত হয়েছে। এমনকি যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত লোকজনও বইপত্র লিখেছেন। এসব তথ্য ও সূত্র ঘেঁটে দেখা যায়, সিরাজুল আলম খান পাকিস্তানে বিশ্বাস করতেন না। তিনি পূর্ববঙ্গের ভারতের সাথে অন্তত দুই বাংলার একত্রীকরণের চিন্তাভাবনা করতেন। এভাবে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার সাথে তার একটা নির্ভরযোগ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং ভারতীয় ডিজাইনে পাকিস্তান ভাঙার সাথে শরিক হন। এসব তথ্য থেকে দেখা যায়, সিরাজুল কিছুটা ভারতীয় গোয়েন্দ এজেন্সির নির্দেশনামতো কাজও করেন।
সিরাজ রুশ বিপ্লবের মতাদর্শের সাথে কলকাতার হিন্দু এলিটদের তৈরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের একটি খিচুড়ি তৈরি করেছিলেন। এর নাম দিয়েছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্র। এটিই ছিল তার রাজনৈতিক মতাদর্শ। সিরাজের রাজনৈতিক চিন্তার একজন আইডল ছিলেন সূর্যসেন। সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা যেভাবে শপথ নিত, তার অনেক কিছু সিরাজ তার নিউক্লিয়াসে অংশগ্রহণেচ্ছু যুবকদের জন্য আবশ্যকীয় করেছিলেন। সূর্যসেন তার বিশ্বাসের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগটি স্বীকার করেছিলেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরিকল্পিত রাষ্ট্রের বনেদ গড়ে উঠেছিল হিন্দুত্ববাদী ভাবধারার ওপর। যেখানে মুসলমানদের কোনো স্পেস ছিল না। এ রকম একটি ব্যক্তিকে সিরাজ কেন আইডল বানাতে গেলেন? পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করে সিরাজের পরিকল্পিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির ভিত্তি হওয়ার কথা হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র প্রভৃতি নীতি। আদতে তা-ই হয়েছিল। তাত্ত্বিকভাবে এসব নীতির সাথে সূর্যসেনের চিন্তাভাবনাকে মেলানো কঠিন। বাস্তবে যেটা ঘটেছিল, সিরাজ ও তার মতো লোকজন তথাকথিত বিপ্লবী স্লোগানের অন্তরালে উপমহাদেশের হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক শক্তির সাথে মিত্রতা স্থাপনা করে পাকিস্তান ভাঙে এবং এই অঞ্চলে ওই রাজনীতির সুপ্রিমেসিকে প্রতিষ্ঠা করে।
সিরাজের হাতে গড়া নিউক্লিয়াসের লোকজন ৭১ সালে ভারতে গিয়ে মুজিব বাহিনী তৈরি করে। এখান থেকেই পরবর্তীকালে তৈরি হয় গণবাহিনী, রক্ষীবাহিনী, জাসদ, একাংশ মুজিব সরকারে যোগ দেয়। সিরাজের রাজনৈতিক চিন্তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো গঠনমূলক অবদান রাখতে পারেনি। সন্ত্রাস, হানাহানি, শ্রেণিঘৃণা, গৃহদাহ ও জাতীয় অনৈক্য ছাড়া বলবার মতো কিছুই এরা দেয়নি। ইতিহাস সিরাজকে শ্রেফ একজন Anarchist-নৈরাজ্যবাদী ও ভারতপন্থি হিসেবে শনাক্ত করবে।১২
সিরাজ তার বুদ্ধিমতা ও সংগঠনিক শক্তির জোরে সেই সময়ের আওয়ামী লীগের একটা বড়ো অংশকে বশীভূত করে ফেলেন এবং এদের পাল্লায় পড়ে বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধে নামে। পৃথিবীর বিভিন্ন জনগোষ্ঠী যুদ্ধ করে জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তির জন্য। ভাবতেই কষ্ট হয় বাংলাদেশের মানুষ যুদ্ধ করে নিজের অজান্তে দিল্লির অধীনতা কায়েম করেছে। অথচ তাকেই স্বাধীনতার গৌরব দান করা হয়েছে। সিরাজের মতো মানুষরা একটা জনগোষ্ঠীর সাথে কী নিদারুণ প্রতারণা করেছে, তা ভাবলে চোখ দিয়ে পানির বদলে রক্ত ঝরে। ৭১ উত্তরকালে মুজিবের শাসন ও পরবর্তী সময়ে তার কন্যা শেখ হাসিনার শাসনকে ভারতীয় উপনিবেশ ছাড়া অন্য কোনোভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না। এ কারণেই ২০২৪ সালের রক্তাক্ত পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় স্বাধীনতার কথাটা উঠেছে। বাংলাদেশের বিগত কয়েক দশকের ইতিহাস রক্ত, গাদ্দারি ও ভাঙনের ভেতরে ওঠানামা করেছে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাই এ ইতিহাসকে বলেছেন ‘লিগেসি অব ব্লাড’।
৭১ সালের যুদ্ধের ভেতরেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র কেমন হবে, ভারত সেক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা দিয়ে দেয়। বিশেষ করে সেকুলারিজমকে নতুন শাসনতন্ত্রে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শর্ত আরোপ করা হয়। বাংলাদেশের জন্মের পর এই নির্দেশনা অনুসারে আমাদের দেশের শাসনতন্ত্র মুসাবিদা করা হয়। এবনে গোলাম সামাদের আলাপ থেকে বোঝা যায়, আমাদের জাতীয় সংগীতের ভাগ্যেও একই রকম ঘটনা ঘটেছিল এবং এটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভারতীয় প্রভাব ছিল।
আমি এখন প্রাক্তন ভারতীয় কূটনীতিক, একই সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সাথে সম্পৃক্ত একজনের লেখা একটা বই থেকে উদ্ধৃতি দিতে চাই। এই কূটনীতিকের নাম শশাঙ্ক ব্যানার্জী। ইনি ১৯৬২ সালে ঢাকার ভারতীয় ডেপুটি হাইকমিশনে চাকরি করতেন। তার বর্ণনা অনুসারে, সে সময় থেকেই তার শেখ মুজিবের সাথে সম্বন্ধ গড়ে ওঠে। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরি জন্য শেখ মুজিব এই ব্যক্তির মাধ্যমে ভারত সরকারের এজেন্সিগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখতেন। শেখ মুজিব যখন পাকিস্তান থেকে মুক্তির পর লন্ডন হয়ে ঢাকা আসেন, তখন তার বিমানের পাশের সিটে বসেছিলেন এই শশাঙ্ক। পুরোনো পরিচয়ের সূত্রে পুরো বিমানযাত্রার সময় শশাঙ্কের সাথে শেখ মুজিবের দীর্ঘ আলাপচারিতা হয়। এই আলাপের একফাঁকে শেখ মুজিব রবীন্দ্রনাথের আমার সোনার বাংলা গানটিকে জাতীয় সংগীত করার সিদ্ধান্ত নেন। যে ব্যক্তিটি একটি নতুন দেশের কর্ণধার হবেন, তিনি তার দেশের জাতীয় সংগীত নির্ধারণ করেছেন ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সির প্রেরিত ব্যক্তির সাথে আলোচনা করে। শশাঙ্ক লিখেছেন:
It had never happened before in history that the natinal anthems of tow nations were written by. one and the same person. it was also typical of mujibs emotional exuberance when he told me that although there would be no written record in history, he wanted me to know at the presonal level that the decission to adopt the Ôamaar shonar bangla, aami tomaye BhalobashiÕ as the national anthem of Bangladesh was taken between two old friends, in his words you and me on board a Raf Flight from london to Dhaka. it was now my turn to be emotional.১৩
এভাবে বাংলাদেশের বাঙালি জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠেছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার খুঁটি। রবীন্দ্রনাথের গানটি এখন শুধু গান নয়; এটি এ দেশে ভারতীয় আধিপত্যবাদের সবচেয়ে বড় প্রতীক। জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার স্বার্থে এ প্রতীক বিনাশ ছাড়া উপায় নেই।
সাত.
রবীন্দ্রনাথ আমার সোনার বাংলা গানটিকে লেখেন দুই বাংলাকে একত্র করার জন্য। সেই সময় বাংলা অনেক বড় প্রদেশ ছিল। অবিভক্ত বাংলা অবিভক্ত আসাম, বিহার ও উড়িষ্যা মিলে এই বিশাল ভূখ-। ব্রিটিশরা এই বিশাল ভূখ-কে দু-ভাগ করে। তাদের ভাষায় প্রশাসনিক সুবিধা ও উন্নতি ঘটানোর জন্য। কলকাতার হিন্দুরা মনে করত, ব্রিটিশরা বাঙালি হিন্দুর প্রভাবকে খর্ব করতে এ কাজ করে। অন্যদিকে মুসলমানরা মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো নতুন সৃষ্ট বাংলা-আসাম প্রদেশে নিজেদের বৈষয়িক সম্ভাবনা দেখে উল্লসিত হয়।
আগেই বলেছি, শ্রেণিস্বার্থে হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেয়। রবীন্দ্রনাথও তা-ই করেন এবং বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে সোনার বাংলাসহ অনেক গান লেখেন। রবীন্দ্রনাথের এই গান লেখার পটভূমি আর একাত্তর সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরির পটভূমি মোটেও এক নয়। রবীন্দ্রনাথ তার গানটিতে বাংলা শব্দটি ব্যবহার করেন। আর আমরা একাত্তরের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র তৈরি করি। এই বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দটি এখন আর এক নয়। এ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্যও অনেক বদলে গেছে। বাংলা শব্দটি নিয়ে তৈরি রবীন্দ্রনাথের গানটিকে এখন আর আমাদের বর্তমান বাংলাদেশকে ধারণ করে না। তা ছাড়া বঙ্গভঙ্গ ও একাত্তরের ঘটনার মধ্যবর্তী সময়ে অনেক কিছু ঘটে গেছে। হিন্দু-মুসলিম বিরোধ, কংগ্রেস-মুসলিম লীগ মোকাবিলা। পাকিস্তান কায়েম। আবার পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরি হওয়া-এই বিচিত্র ইতিহাসকে পাড়ি দিয়ে আমাদের জাতীয়তাবাদকে দাঁড়াতে হয়েছে। এই পরম্পরাই হচ্ছে আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল সুর। তাই বঙ্গভঙ্গ থেকে এক লাফে একাত্তরে এসে আমাদের ইতিহাস তৈরি করা যাবে না।
সূর্যসেনের ভাবশিষ্য সিরাজুল আলম খানরা হিন্দু জমিদারদের তৈরি বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞা ধরে দুই বাংলাকে একত্র করার স্বপ্ন দেখছিলেন। সেই সূত্রেই তারা রবীন্দ্রনাথের গানটিকে জাতীয় সংগীত হিসেবে নির্বাচিত করেন। বাস্তবে সেভাবে ইতিহাস এগোয়নি। এখন এ গানকে জাতীয় সংগীত করতে হলে দুই বাংলাকে একত্র করতে হবে। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা কি তাতে রাজি হবেন? একাত্তর সালের পর যখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রমরমা চলছে, তখন কিন্তু দুই বাংলা একত্র করার একটা কথা প্রচার হয়েছিল। বাঙালি জাতীয়তাবাদের থরোথরো আবেগে এখন আমরা এ ধরনের ভাবনাচিন্তা ও তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে পর্যালোচনা করে দেখিনি। ওপার বাংলা থেকে আগত বুদ্ধিজীবী অন্নদাশঙ্কর রায়ও নতুন দেশে এ ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে উত্তর দিয়েছিলেন-আমরা শুধু বাঙালি নই, সাথে ভারতীয়ও বটে। সুতরাং ইতিহাসের এ ছেদবিন্দুগুলোকে পর্যালোচনা না করে যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেন, তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটা অনৈতিহাসিকতা প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন। সিরাজরা এ কাজটিই করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের গানটি কোনো অসাধারণ গান নয়। রাজনৈতিক কারণে বিবিসি এ গানটিকে সেরা গানের মর্যাদা দিয়েছে। ভারতের সাহায্যে পাকিস্তান ভাঙার জন্য রবীন্দ্রনাথকে রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন ছিল। তার গানটিকে জাতীয় সংগীত করে তাকে সেই মর্যাদা ও সম্মান দেওয়া হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের এ গানটিকে জাতীয় সংগীত না করে কোনো বাংলাদেশিকে দিয়ে অথবা বাংলাদেশের মানুষের আকাক্সক্ষা ও স্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধ কাউকে দিয়ে এটি রচনা করলে ভালো হবে। কারণ, রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের মানুষের জন্য কিছু লেখেননি বা তাদের কোনো উপকার করেননি। যে জনগোষ্ঠীর তিনি মিত্র হতে পারেননি, তার লেখা গান সেই জনগোষ্ঠীর দ্বারা তৈরি দেশের জাতীয় সংগীত বানানো দৃষ্টিকটু বইকি। তা ছাড়া যে ধর্ম ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ে তিনি বেড় উঠেছেন, যে ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে তার মনোগঠন সম্পন্ন হয়েছে, তার যোগ ইসলামের সাথে ছিল না; ছিল হিন্দু ধর্মের সাথে। বাংলাদেশ প্রধানত বাঙালি মুসলমানের সংগ্রামের ফসল। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের গানটিকে জাতীয় সংগীত করা এখানকার মানুষের আকাক্সক্ষার সাথে সংগতিপূর্ণ হয়নি।
রবীন্দ্রনাথের গানটিতে জাতীয় সংগীত হিসেবে বিস্তর অসম্পূর্ণতা ও অসংগতি রয়ে গেছে। এগুলো কিছু আলোচনা আমরা করেছি। এগুলোকে আমরা এখন সারাংশ আকারে হাজির করছি।
১. গানটি হিন্দু জাতীয়তাবাদের পটভূমিতে রচিত।
২. গানটি প্লেজারিজমের দোষে দুষ্ট।
৩. গানটি ভারতীয় প্রভাবে গৃহীত হয়েছে।
৪. গানটিতে উল্লিখিত বাংলা শব্দটি রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক অর্থে বর্তমান বাংলাদেশকে ধারণ করে না।
৫. গানটির রচয়িতা বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের জন্য তেমন কিছু লেখেননি বা তাদের কোনো উপকার করেননি।
রবীন্দ্রনাথকে তাই শুধু শিল্প সাহিত্য কবিতার আকারে বুঝলে চলবে না। তার রাজনীতি বা তাকে ঘিরে চলা রাজনীতির ভেতর দিয়েও তাকে পাঠ করা শিখতে হবে। আমাদের ইতিহাস ও সংস্কৃতির মানদ- দিয়েও তাকে আমাদের পর্যালোচনা করতে হবে। এতে হয়তো তার সাথে আমাদের কিছু অস্বস্তি তৈরি হবে। এতে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। এটাই ইতিহাসের রায়।
হদিস
১. প্রশান্ত কুমার পাল, রবি জীবনী, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৩৫।
২. Partha Chatterji, The Nation and its fragments : Colonial and post- colonial histories, princeton, Nj: Princeton University press, 1994/
৩. নলিনী কিশোর গুহ, বাংলায় বিপ্লববাদ, কলিকাতা ও মুখাজী, ১৯৫৪।
৪. সরলাদেবী, জীবনের ঝরাপতা, কলকাতা : রূপা অ্যান্ড কোম্পানি, ১৯৫০।
৫. জগদীশ ভট্টচার্য, বন্দে মাতরম, কলকাতা : দেজ পাবলিশিং, ২০০৬।
৬. প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্র সাহিত্য প্রবেশক, দ্বিতীয় খ-, কলকাতা : বিশ্বভারতী, ১৪২০।
৭. প্রবোধচন্দ্র সেন, ভোরের পাখি ও অন্যান্য প্রবন্ধ, কলকাতা : আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, ১৯৯৮।
৮. রবীন্দ্রনাথের চিঠি বুদ্ধদেব বসুকে, দেশ সাহিত্য সংখ্যা, ১৩৮১।
৯. অন্নদাশশঙ্কর রায়, লালন ও তার গান, প্রবন্ধ সমগ্র, চতুর্থ খ-, কলকাতা: মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি. ১৪০৪।
১০. Taj Hashmi, The Tagore, Mania : Identity Crisis and Auti Bangladesh Syndrome. gold. mukto-mona.com.
১১. এবনে গোলাম সামাদ, রবীন্দ্রনাথ ও বাঙলাভাষী মুসলমান সমাজ, বিবিধবিষয়ক নির্বাচিত কলাম, ঢাকা: বুকমাস্টার, ২০১৮।
১২. বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন:
ক. আলতাফ পারভেজ, মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ।
খ. মহিউদ্দিন আহমদ, জাসদের উত্থান পতন : অস্থির সময়ের রাজনীতি।
গ. শামসুদ্দিন পেয়ারা, আমি সিরাজুল আলম খান একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য।
ঘ. মহিউদ্দিন আহমদ, প্রতিনায়ক সিরাজুল আলম খান নিউক্লিয়াস-মুজিব বাহিনী জাসদ ।
ঙ. ডা. কালিদাস বৈদ্য, বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে অন্তরালের শেখ মুজিব।
চ. Taj Hashmi Fifty Years of Bangladesh, 1971-2021, Crisisof Culture, Development, Government, and Identity :
ছ. Sashanka S Babberheem India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation and Pakistan
13. Sashanka S. Bannerjee, India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation and Pakistan south carolina, USA : Create Space – amazon.com, 2011.
13. Sashanka S. Bannerjee, India, Mujibur Rahman, Bangladesh Liberation and Pakistan south carolina, USA : Create Space – amazon.com, 2011.