সূচনা পর্ব
উপসংহারের আগে
পৃথিবীর পেটের ভেতর সিঁড়ির মতো একটা পথ নেমে গেছে নিচের দিকে, কেউ যেন আমাকে বললো-‘যাও’।
আমি অনুগত শিশুর মতো ধুরু ধুরু হৃৎপি- নিয়ে সিঁড়িতে পা রাখলাম। চারিদিকে পড়ে থাকা বিক্ষিপ্ত ইট-কাঠ, অট্টালিকার ধ্বংসের স্তূপ, মনে হলো কোনো অভিশপ্ত নগরীর নির্জন রাজপথে দাঁড়িয়ে আছি। ঘুমের ঘোরে, গভীর অন্ধকারে অবলুপ্ত নগরী ময়নামতির শালবন বিহারের অভ্যন্তরে আমি কি ঢুকে পড়েছি ?
ভয় পেয়ে আমি দৌড়াতে শুরু করলাম কিন্তু আমার পা এক চুলও সরলো না। আমার সামনে বিশাল দেয়ালে নৃত্যপর নারীর নাচের মুদ্রা, হরিণের বাঁকা মুখ, দারুচিত্রখচিত সিংহদরোজা। কানের কাছে শব্দ ধ্বনিত হলো-
‘আড়াই অক্ষর জ্ঞান
ময়নামতীর ধ্যান।’
‘কায়া সাধ্’
আওয়াজ শুনে আমি ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকলাম। কে যেন আমার হাত চেপে ধরে বন্দিখানার দিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকলো। গাম্ভীর নিনাদিত কণ্ঠে একজন জিজ্ঞাসা করলো ‘ও কে ?’
বিচলিত স্বরে আমি জবাব দিলাম-
‘আমি হত্যার অভিযোগে অভিযুক্তদের একজন!’
পাল্টা প্রশ্ন উচ্চারিত হলো-
‘কেবলই হত্যার অভিযোগ?’
নিখোঁজ গণতন্ত্র!
বাক্ স্বাধীনতা!
মানবাধিকার!
অর্থ পাচার!
গুম, খুন!
বিচারহীনতা!
বৈষম্য ও বিভাজন!
‘স্বাধীনতা’ শব্দটি এখন কোথায় ?…
অপরাধের বিশাল তালিকার দিকে তাকিয়ে আমার মাথা নিচু হতে হতে পায়ের নখের কাছে এসে গেলে আমি দেখলাম-
আমার চারপাশে কেউ নেই, কিছু নেই!
‘চেতনা’ কিংবা ‘উন্নয়ন’ জপিত মন্ত্রের কোনো অক্ষর আমার মনে পড়ছে না।
আমি মুহূর্ত মাত্র দেখলাম, দেশের পুরো মানচিত্র জুড়ে বিশালদেহী একজন মানুষ শুইয়ে আছে। যার হাত, পা, কান, চোখ সবই অবশ-অচল। নিশ্চল মানুষটার সব অঙ্গ বিকল, কেবল জিহ্বাটা সচল। তার দেহের সমস্ত রক্ত এসে জমাট হয়ে আছে মুখে।
‘ওহ্! কী বীভৎস-বিকট চেহারা! আমি আর সহ্য করতে পারছি না!’
এক অলৌকিক বাতাসে ইতিহাসের পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে শুরু করলো-১০, ১০০, ১০০০…
আমি ডান পাশে ফিরে তাকালাম, এমন অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের মখোমুখি হবো, জীবনে কখনো ভাবিনি।
শ্রাবণ গণহত্যার অজ¯্র লাশের স্তূপ, পুড়ে ফেলা বেওয়ারিশ লাশের আত্মা, নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ, নিরপরাধ মানুষের দেহহীন মাথার খুলি, অগ্নিশিখার মতো আমার দৃষ্টিকে দাহ করলো।
আমি কাউকে ধমক দিয়ে থামাতে পারলাম না।
অথচ একসময় আমি যদি বলতাম-‘আজ মধ্যরাতে বৃষ্টি হবে।’
সমস্ত মানচিত্র জুড়ে মু-হীন মানুষেরা সমস্বরে উচ্চারণ করতো-
‘বৃষ্টি হবে’-‘বৃষ্টি হবে’… মধ্যরাতে গুলির মতো বৃষ্টি হবে’
আমি দেখলাম, মানচিত্র জুড়ে শুইয়ে থাকা বিশালদেহী মানুষটা কোনো এক জাদুমন্ত্রের বলে ধীরে ধীরে একটা ক্ষুদ্র পোকায় পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্র পোকাটা চলতে চলতে কোনো এক ফাঁকে আমার মাথার ভেতরে ঢুকে পড়েছে!
আমার মগজে ঢুকে যাওয়া পোকাটা অবিকল মনুষ্য ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছে। পোকাটা স্পষ্ট করে বলে-
‘গণহত্যার অভিযোগে তোমার বিচার হবে। ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মুখপাত্র এবং স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে তোমাকে শাস্তি পেতেই হবে !’…
আমি চিৎকার করে বললাম-
‘না না না, আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট। পরাজিত শত্রুদের ষড়যন্ত্র ছাড়া এসব আর কিছুই নয়।’
পোকাটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তার বিকট হাসির শব্দে এই নির্জন পুরীর নীরবতা খান খান হয়ে ভেঙে পড়ে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে আমি তাকিয়ে দেখি, সামনের দৃশ্যপট দ্রুত বদলে গেছে। প্রায় একযুগ ধরে হত্যা, গুম হওয়া, আন্দোলনে নিহত হাজার হাজার মানুষের দেহহীন মাথার খুলিগুলো জড়ো হয়ে তাদের মাংসহীন বিদঘুটে মুখে নৃশংসভাবে খুন হওয়ার বর্ণনা দিচ্ছে।..
‘আমি কোনো রাজনৈতিক দল করিনা। ফেইসবুকে একজনের স্ট্যাটাসের মন্তব্যে লিখেছিলাম,
‘দেশের কোর্টকাচারিতে কোনো বিচার নেই। দেশ চলেছে একব্যক্তির ইচ্ছায়।’
দেশদ্রোহী, সরকারবিরোধী বলে অফিসে যাওয়ার পথে সাদা পোশাকের একদল লোক মাইক্রোবাসে চোখ বেঁধে কোথায় নিয়ে আসে আমি জানি না। আয়নাঘরের টর্চারে আমার মৃত্যু হয়। আমি মরে গেছি না বেঁচে আছি, আমার পরিবার জানে না। আমার নিখোঁজ হওয়ার মামলাও থানা পুলিশ নেয়নি। আমার জন্য প্রতিদিন আমার স্ত্রী-সন্তান কাঁদে। এই দেখুন, রডের আঘাতে আমার মাথা থেকে মগজ বেরিয়ে গেছে..
আরেকটা দেহহীন মাথার খুলি তার নৃশংস মৃত্যুর কথা বলে-
‘আমি সাংবাদিক, মন্ত্রীর অনিয়ম, দুর্নীতি, বিদেশে অর্থ পাচারের ওপর অনুসন্ধানী রিপোর্ট লেখার কারণে আমাকে পুলিশ পরিচয়ে বাসা থেকে তুলে আনা হয়েছে। পিছমোড়া করে হাত-পা বেঁধে প্রথমে ধারালো ছুরি দিয়ে জিহ্বা কাটা হয়, তারপর গরুর মতো জবাই করে হত্যার পর লাশ কেটে টুকরো টুকরো করে হাড্ডি থেকে মাংস আলাদা করে বস্তায় পুরে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। আমিই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। আমার স্ত্রী এখন মানুষের বাসায় বাসায় কাজ করে, মেয়েটা ফুটপাথে ভিক্ষা করে..’
অজ¯্র মাথার খুলি একসাথে কথা বলতে শুরু করলে, আমি কারো কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম না। একজনের কথার সঙ্গে আরেকজনের কথার আওয়াজ মিশে গিয়ে শুধু ক্রন্দনরত ধ্বনি প্রতিধ্বনি হতে থাকে। চারিদিকে বিষাদ ছড়িয়ে আছে আর আমি যেন এক কান্নার পৃথিবীতে এসে উপস্থিত হয়েছি।
লেডি ম্যাকবেথ কী এরকম একটি যন্ত্রণার মধ্যে ছিলো?
ঘুমের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে বিড় বিড় করে বলে ছিলো-‘বুড়ো মানুষ, তার গায়ে এতো রক্ত ছিল, কে জানতো। হাত ধুইয়ে ফেলুন। যা হওয়ার হয়ে গেছে।’
আশ্চর্য ! আমার হাত এতো রক্তাক্ত কেন?
মোমবাতি হাতে ওয়াশরুমে গিয়ে ঘষে ঘষে নিজের হাত আমি নিজেই বারবার ধুতে থাকি কিন্তু কিছুতেই হাত থেকে রক্তের দাগ মুছে না। রক্তের গন্ধ এসে নাকে লাগে। জগৎ বিখ্যাত সুগন্ধি মেখেও রক্তের গন্ধ থেকে নিষ্কৃতি মেলে না?
কখনো ঘটেনি, এমন অবিশ^াস্য ঘটনা অতিপ্রাকৃতিক উপায়ে যদি কখনো ঘটে যায়!
যা দেখে সারা দুনিয়ার মানুষ বিস্ময়ে অবাক!
এক.
চুলার পাতিলে টগ্বগ্ করে ফুটতে ছিল ভাত।
কাঠির আগায় তুলে একটা ভাত দু’আঙ্গুলে টিপে জাহানারা গ্যাসের আগুনটা একটু কমিয়ে দিল।
হামিদের চোখ টিভির পর্দায়। পুলিশ ছাত্রদের বেদম পেটাচ্ছে। প্রচ- হৈ চৈ, চিৎকার, চেঁচামেচির শব্দ হচ্ছে।
‘সাউন্ডটা একটু কমিয়ে দাও না।’ জাহানারার কণ্ঠে ঝাঁঝ।
স্ত্রীর অনুরোধ হামিদের কানে পৌঁছায় না। টানটান উত্তেজনায় সে ধনুকের সিলার মতো বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে সে সহ্য করতে পারছে না। ছাত্রদের ওপর এমন নির্মম অত্যাচার!
জাহানারা এবার কিচেন থেকে এসে হামিদের হাত থেকে রিমোটটা কেড়ে নিয়ে নিজেই টিভির সাউন্ডটা কমিয়ে দেয়।
‘তোমার কান একেবারে গেছে! দিন দিন বহেরা হয়ে যাচ্ছ, সেদিকে খেয়াল আছে ?’
জাহানারার কথায় উষ্মা। চোখে ক্রোধের আগুন। চোখে চোখ পড়তেই হামিদ দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।
তার চোখের দৃশ্যপট এখন শাহবাগে। রক্তে সমুদ্র ঢেউ। পুলিশের নির্মম লাঠির বাড়ি, টিয়ারশেলের ধোঁয়া, সাউন্ড গ্রেনেডের আওয়াজ, রাবার গুলি, র্ছরা গুলিতে ঝাঁঝরা ছাত্রদের বুক। হামিদের মনে হয় তার বুকই ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। ফিন্কি দিয়ে বেরুচ্ছে রক্ত। অজান্তে হাতটা বুকের ওপর চলে যায়। গায়ের লাল জামাটা যেন রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেছে। শরীরটা তার বাসায়, সে মনে মনে হাজির হয়ে আছে ছাত্রদের জমাটবাঁধা আন্দোলনে।
আব্দুল হামিদের মনে পড়ে যায়, নাৎসি বিরোধী ‘হোয়াইট রোজ’ মুভমেন্টের কথা। মিউনিখ বিশ^বিদ্যালয়ের একদল ছাত্র অ্যাডলফ হিটলারের বর্বরতার বিরুদ্ধে জেগে উঠেছিল। খুনি নাৎসি সরকারের বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণের দায়ে ছয় ছাত্রকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ইতিহাসের খলনায়ক হিটলারকে ফ্যাসিস্ট হিসেবে সাব্যস্ত করেছে।
১৯৭৬ সালে জোহানেসবার্গের সোয়েতোর এক কৃষ্ণাঙ্গ বিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল বান্টুনীতির বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের ভাষা এবং শিক্ষার ভাষা কী হবে? ১৬ থেকে ১৮ জুন, মাত্র তিন দিনে নিহত হয়েছিল ১৭৬ জন। থেমে থেমে এই আন্দোলন জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ আন্দোলনে রূপ নেয়। দক্ষিণ আফ্রিকার এই আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। স্মৃতি হাতড়ে হামিদ চলে আসে ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। সেই সময়ও ছাত্ররা ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ সেøাগান নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে বুক পেতে দিয়েছিল। ফ্যাসিস্ট পাকিস্তানি সরকারের লেলিয়ে দেয়া পুলিশের গুলিতে বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছিল রফিক, শফিক, বরকত, সালাম, জাব্বার- বাঙালির সূর্য সন্তানেরা। ইতিহাসে অমর চরিত্র হয়ে আছে তারা।
ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্ররা রাজপথে নেমেছিল ‘পদ্ম মেঘনা যমুনা/ তোমার আমার ঠিকানা’-‘জেলের তালা ভাঙবো’.. এই স্লোগান, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে। কারফিউ ভেঙে রাস্তায় নেমে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছিল আসাদ, মতিয়ুর। নব্বইয়ে স্বৈরাচারকে হটানোর জন্য সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের আন্দোলনের মুখে রাজপথ প্রকম্পিত স্লোগান ছিল- ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক’। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের টিএসসি মোড়ে পুলিশের গুলিতে মুহূর্তে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিলেন ডাক্তার মিলন। জিরো পয়েন্টে নূর হোসেন দ্রোহে জ¦লে উঠে উদোম গায়ের পিঠে-বুকে- ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক/ স্বৈরাচার নিপাত যাক’ লিখে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল রাজপথে। ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ নূর হোসেনের রক্ত বৃথা যায়নি। স্বৈরাচার মুক্ত হয়েছিল দেশ।
‘এবারের ছাত্রদের কোটা বিরোধী আন্দোলন কি ব্যর্থ হবে?’
জাহানারার একথার উত্তর দেয় হামিদ-
‘ছাত্র-যুবকদের আন্দোলন কখনো বৃথা যায়নি। ইতিহাস তো সে কথা বলে না।’
রান্নাঘরের আগুনের তাপে ঘর্মাক্ত হয়ে জাহানারা ওড়নায় হাত-মুখ মুছতে মুছতে স্বামীর পাশে বসে। টিভির স্ক্রিনে চোখ রাখে। রিমোটটা হাতে নিয়ে এক চ্যানেল থেকে অন্য চ্যানেলে যায়। বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে শান্তিমত টিভি দেখার জো নেই। চেহারায় বিরক্তিভাব নিয়ে আবার ফিরে আসে খবরের লাইফ শো’তে। মিরপুর ১০ নম্বর থেকে রাশেদ নিজাম বলছে-
‘দর্শক, আপনারা দেখছেন, কোটাবিরোধী বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা এগিয়ে আসছে। বিপরীত দিক থেকে আসছে হেলমেট পরা বাহিনী, তাদের হাতে আছে লাঠি। পুলিশ তাদের সাথে আছে। এইমাত্র পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলো। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন রাস্তা। কোটা আন্দোলনকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হেলমেট বাহিনী আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে ধরে পেটাচ্ছে। উভয়পক্ষের সংঘাত চলছে। ঠি-ঠি-ঠি ঠাস ..
দর্শক, আপনারা দেখছেন। এই মাত্র পুলিশ গুলি ছুড়েছে। কেউ আহত-নিহত হয়েছে কি-না, আমরা এখনো কিছু বলতে পারছি না। জনতার ঢল মেট্রোরেল স্টেশনের দিকে যাচ্ছে। কু-লী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে..
খবর পাঠক বলছেন-রাশেদ, আপনি থাকেন আমাদের সঙ্গে, খবর সংগ্রহ করেন। আমরা এবার যাচ্ছি যাত্রাবাড়ীর তাহমিনা মাহমুদের কাছে..’
জাহানারার ভাত রান্না হয়ে গেছে আগেই। চুলায় তরকারির পাতিল বসিয়ে এসেছিল। টেলিভিশনে তুমুল উত্তেজনাকর লাইফ্দৃশ্য দেখতে গিয়ে চুলায় তরকারির কথা ভুলে যায়। সময় কতক্ষণ পেরিয়ে গেছে বলতে পারে না। তরকারি পাতিলের পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘরে। সে ছুটে কিচেনের দিকে গেলো। পোড়া পাতিলটা দ্রুত খালি হাতে নামাতে গিয়ে তার হাতে লেগে যায়। ছেঁকা লাগা হাত জ¦লে উঠতেই জাহানারা ‘ওহ্, মা-রে..’ চিৎকার করে ওঠে।
হামিদ দৌড়ে এসে দেখে স্ত্রী হাত ধরে বসে পড়েছে। সে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে সোফাতে বসায়। পোড়াস্থানে বার্ন মলম লাগাতে চেষ্টা করে। জাহানারা তখন হাতের তীব্র জ¦লুনির ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে।
টিভিতে এখন যাত্রাবাড়ীর দৃশ্য দেখাচ্ছে। মেয়র হানিফ সেতুর গোড়ায় হেলমেট বাহিনী, হাতে লাঠি ছাড়াও অন্যান্য জিনিস আছে। শনির আখড়া থেকে সাইনবোর্ড, চিটাগাংরোড কোটা বিরোধী আন্দোলনকারীদের দখলে। টোলপ্লাজা পর্যন্ত জমায়েত ছাত্র-জনতার ওপর হঠাৎ চড়াও হয় পুলিশ। তুমুল সংঘর্ষ চলছে।
পুলিশ, বিজেপি, হেলমেট পার্টি, ডা-া বাহিনী একসাথে নেমেছে অস্ত্র হাতে। অন্যদিকে নিরস্ত্র বৈষম্যবিরোধী ছাত্রছাত্রী, সাধারণ জনতা।
এক অসম লড়াই চলছে দেশে। ঢাকার বিভিন্ন রাজপথে নেমেছে ছাত্র-জনতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ফেইসবুক, টিভি নিউজের সচিত্র দৃশ্য দেখে ক্রমেই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে প্রথমে দেশের সবগুলো বিশ^বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। তারপর সরকারি-বেসরকারি স্কুল-কলেজসহ সবগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলমান কোটাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা জেগে ওঠে। সরকারি চাকরিতে ৫৪% কোটা বলবৎ ছিলো। ছাত্রদের প্রচ- আন্দোলনের মুখে সরকার প্রধান কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে ২০১৮ সালে। সেই প্রজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করলে কোর্ট প্রজ্ঞাপন বাতিল করে কোটা পুনর্বহালের রায় প্রদান করে। ২০২৪ শে পয়লা জুলাই ছাত্ররা ন্যায্য অধিকার নিয়ে আবার নামে রাজ পথে। সরকারের একজন মন্ত্রী বললেন-
‘বিষয়টা সাবজুডিশিয়াল ম্যাটার, আমি এই নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করছে। কোর্টের রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
ছাত্র আন্দোলনের এক সমন্বয়ক রবিউল আলম বলল-
‘এটা তো কোর্টের বিষয় না। এটা স্টেট পলিসি ম্যাটার। অহেতুক আমাদেরকে হাইকোর্ট দেখানো হচ্ছে কেন?’
পত্রিকার নিউজে, টিভির খবরে সরকারপন্থী সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। তারা বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চায়, সরকারের অবস্থানই সঠিক।
শুরু থেকেই কোটা আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। আন্দোলনকারীরা দাবি নিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মরকলিপি প্রদান করে।
১ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা তাদের দাবি নিয়ে শাহবাগ, রাজুভাস্কর্য, শহীদ মিনার ইত্যাদি স্থানে সমাবেশ ও মিছিল করে।
একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী কা-উদ্দিন বলেন-
‘কোটা আন্দোলন মোকাবেলার জন্য আমাদের ছাত্রসংগঠনই যথেষ্ট।’
সরকারপ্রধান বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করলে এক সাংবাদিক চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন সম্পর্কে প্রশ্ন করেন।
সাংবাদিক : মাননীয় মন্ত্রী, ছাত্ররা কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। আগামীকাল আন্দোলনকারীরা ‘বাংলা ব্লকেড’-এর ডাক দিয়েছে। ৫৪% কোটা আর মেধা কোটা সম্পর্কে আপনার অভিমত কী ?
সরকারপ্রধান : কোটা আন্দোলনকারীরা কোর্টের আইন মানবে না, সংবিধান মানবে না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের এতো ক্ষোভ কেন?
মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা পাবে না, রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? আমার প্রশ্ন দেশবাসীর কাছে?
রাজাকারের নাতি-পুতিরা চাকরি পাবে, মুক্তিযোদ্ধরা পাবে না? অপরাধটা কী ?’
সরকার প্রধানের এই মন্তব্য শিক্ষার্থীরা মানতে পারেনি। রাজাকারের ইতিহাস তারা জানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে যারা সহযোগিতা করেছিল, তাদেরকে ‘রাজাকার’ বলে। তারা দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে কাজ করেছিল। সেই থেকে ‘রাজাকার’ শব্দটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নেতিবাচক অর্থ ধারণ করেছে।
‘রাজাকার’ বলতে এখন দেশবিরোধী, বিশ^াসঘাতক একটি চরিত্র বোঝায়। এই মিনিং থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী গল্প, উপন্যাস, কবিতা, নাটকে রাজাকার চরিত্রের ভিন্ন এক ন্যারেটিভ নির্মাণ আছে। জনপ্রিয় কথাসাত্যিক হুমায়ূন আহমেদের একটি নাটকে টিয়ে পাখির মুখ দিয়ে বলানো হয়- ‘তুই রাজাকার!’
একটি মাত্র সংলাপ, কী-যে জনপ্রিয়তা পেলো!
রাস্তায়- রেস্তোঁরায়, ক্যাম্পাসে ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে ছিলো এই সংলাপ-‘তুই রাজাকার!’
তখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এমন ছিল যে, ‘হানাদার বহিনী’ ‘রাজাকার’ এসব শব্দ ব্যবহার এক প্রকার নিষিদ্ধ ছিল। বাঙালি জীবনে মুক্তিযুদ্ধের মতো ভয়াবহ নৃশংসতার কোনো ঘটনা যেন ঘটেইনি!
বিভিন্ন সভা-মঞ্চ থেকে নেতারা তখন ছাত্রদেরকে উপদেশের চ্ছলে বলতেন-
‘তোমরা দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। তোমাদের ওপর নির্ভর করছে দেশের উন্নতি-অগ্রগতি। তোমরাই দেশের ভবিষ্যৎ।’
বুদ্ধিজীবীরা নেতাদের সমালোচনা করে বলতেন-
‘বর্তমানটা নেতারা এখন লুটেপুটে খাচ্ছেন। ছাত্রদের দেখিয়ে দিচ্ছেন, তোমরা আগামীতে চেটেপুটে খাবে কিন্তু অতীত ইতিহাসের দিকে ভুলেও তাকাবে না।’ তাই কি হয়?
যারা ক্ষমতায় থাকে, তাদের কাজই হচ্ছে, বর্তমানকে গুরুত্ব দেয়া আর অতীতকে ভুলিয়ে রাখা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণ, এক কোটি লোকের শরণার্থী হওয়া, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতহানি, যাদের জীবনের ওপর দিয়ে সময়টা বয়ে গেছে, চাইলেও তাদের মন থেকে ইতিহাস মুছে দেয়া যায় না।
রাজনৈতিক পালাবদলে, এই সরকার আমলে ‘রাজাকার’ শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই সরকারের বিপক্ষে-বিরুদ্ধে সমালোচনা করলেই যাকে তাকে ‘রাজাকার’ ট্যাগ লাগিয়ে দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রচারমাধ্যমে, সমাজের সব জায়গায়, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী লোকজনকেও এই ট্যাগ লাগিয়ে শারীরিক-মানসিকভাবে হয়রানি করছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অনেকেই। একশ্রেণির দলদাস লোক এই ট্যাগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন দল ‘আমরা’ আর অন্যরা ‘তোমরা’ (অপর) হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এতে সমাজ ও রাষ্ট্রে এক ধরনের বিভাজন-বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।
সরকার প্রধানের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সেইদিন মধ্যরাতে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বেরিয়ে আসে। মিছিলের স্লোগান-
‘তুমি কে? আমি কে?
রাজাকার, রাজাকার
কে বলেছে? কে বলেছে ?
স্বৈরাচার, স্বৈরাচার।’
এবং
‘চাইতে গেলাম অধিকার
হয়ে গেলাম রাজাকার।’
‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ যে ন্যারেটিভ দিয়ে ক্ষমতাসীন দল এতদিন টিকে ছিলো, মধ্যরাতের একটি স্লোগানে তা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যায়। কারণ ইতিহাস একতরফা কোনো ন্যারেটিভ গ্রহণ করে না। ‘তুই রাজাকার’ এই ট্যাগ ইস্যুটিকে সেদিন পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হয়। শিক্ষার্থীদের ‘রাজাকার’ ট্যাগ দিয়ে আন্দোলনকে নিষ্ঠুরভাবে দমনের বৈধতা তৈরি করে সরকার। তার বিপরীতে দীর্ঘ দেড় দশকের নীরবতাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে, হাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্লোগান দিতে দিতে অজস্র শিক্ষার্থী জড়ো হয় টিএসসি রাজুভাস্কার্যের পাদদেশে।
আন্দোলনের অগ্নি জ্বলে উঠতে থাকে। এই আন্দোলন ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের সবকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, পরে স্কুল, কলেজসহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীরা ক্রমে সংগঠিত একটা শক্তি হিসেবে একই সরল রেখায় এসে দাঁড়িয়ে যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন-
‘গত রাতে আমরা বিক্ষোভ করে সরকার প্রধানকে তার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে ছিলাম। প্রত্যাহার না হওয়ায় আমরা রাস্তায় নেমেছি। সরকারপ্রধান আমাদের অপমান করেছেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের বাইরে সবাইকে রাজাকার বলেছেন।’
আন্দোলনে ফুঁসে ওঠে পুরো দেশের ছাত্রসমাজ। দেশের জেলা-উপজেলা মফস্বল শহরগুলোতে ছাত্ররা জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে-
‘চেয়ে ছিলাম অধিকার
হয়ে গেলাম রাজাকার’
স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে রাজপথ। এখন আর ছাত্রছাত্রীদের ঘরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। তারা নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে। সারা দেশে আন্দোলনের মশাল জ্বলে ওঠে। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো দুলছে দেশ। যদিও এ পর্যন্ত কোনো সহিংস ঘটনা ঘটেনি।
১৫ জুলাই ক্ষমতাসীন ছত্রসংগঠনের সভাপতি আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য করে বলেন-
‘মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হবে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে আঘাত করেছে।’
দায়িত্ব প্রাপ্ত একমন্ত্রী বললেন-
‘যারা নিজেদের রাজাকার বলে পরিচয় দেয়, তাদের লাল-সবুজের পতাকা নিয়ে মিছিল করার কোনো অধিকার থাকতে পারে না।’
এইসব তর্কবিতর্কে আন্দোলনের ঘৃতাগ্নি প্রবলভাবে জ¦লে ওঠে। দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে বিজয় একাত্তর হল, সূর্যসেন হল ও ক্যাম্পাসের বেশ কয়েকটি জায়গায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। বিকেল তিনটা থেকে শহীদুল্লাহ হল ও মেডিক্যাল কলেজের মধ্যবর্তী স্থানে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বন্ধ করে দেয় ঢাকা-আরিচা রোড, চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্ররা মুরাদপুর, দুই নম্বর গেইট এলাকা দ্বিমুখী লড়াইয়ে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয় বেসরকারি ব্র্যাক, নর্থসাউথসহ মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ১৫ জুলাই সকালে বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাঈদ ফেইসবুক পোস্টে লেখেন-
‘স্যার! (শামসুজ্জোহা, ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ) এই মুহূর্তে আপনাকে আমাদের খুবই প্রয়োজন স্যার! আপনার সমসাময়িক সবাই মারা গেছেন। তবুও মৃত্যুতে তুমি অমর হয়ে থাকো। আপনার কবর আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা আপনার আত্মায় উদ্দীপ্ত হয়েছি।
আপনিও প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছ আত্মসমর্পণ করবেন। তবে যতদিন বেঁচে থাকবেন, মেরুদ- নিয়ে বেঁচে থাকবেন। ন্যায়সঙ্গত দাবিকে সমর্থন করুন, রাস্তায় নামুন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ান। আপনি প্রকৃত সম্মান এবং মর্যাদা পাবেন, আপনার মৃত্যুর পরে আপনি সময়ের ইতিহাসে বিবর্ণ হবেন না। শামসুজ্জোহা হয়ে বেঁচে থাকবেন আজীবন। ‘শামসুজ্জোহা’ হিসেবে মৃত্যু অনেক বেশি আনন্দের, সম্মানজনক ও গৌরবের।’
১৬ জুলাই, দুপুর আড়াইটা। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। জমাটবদ্ধ ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করার জন্য পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে। অধিকাংশ ছাত্র পেছনে সরে আসে। কিন্তু আবু সাঈদ অকোতুভয়, সড়কের মাঝখানে বুক চেতিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। হাতে একটা ছড়ি, গায়ে কালো গেঞ্জি, যেন শোকের পোশাক আগেই পরে নিয়েছে। বার বার হাত দুটো দুদিকে মেলে ধরে বুক টান করে ধনুকের সিলার মতো দাঁড়ালো সে। পেছনে কেউ তার সঙ্গে আছে কি-না, সে দেখেনি। একাই বুক পেতে বিপ্লবকে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে যায়। পুলিশ উল্টো দিক থেকে গুলি ছুঁড়েছিল। ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে লুটিয়ে পড়ে চব্বিশ বিপ্লবে সূর্যসন্তান, বিজয়ী বীর আবু সাঈদ।
মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগে প্রিয় মাতৃভূমির কী রূপ কল্পনা করেছিল আবু সাঈদ?
বৈষম্যহীন, শোষণ-নিপীড়নহীন একটা রাষ্ট্র!
সাম্য ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ !
দূর গ্রামের দিগন্ত রেখায় সূর্য ডুবে যায়, যেখানে আকাশ এসে মাটিতে মিশে গেছে। সবুজ-শ্যামল জমিনে উদিত হচ্ছে রক্তলাল সূর্যটা। স্বপ্নময় এই দৃশ্য দেখতে দেখতে কী আবু সাঈদ মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল?
এই তার শেষ শয্যা। মায়ের স্নেহমাখা কোল। চোখের পাতা বন্ধ হওয়ার আগে সে দেখেছিলো মায়ের অশ্রুভেজা চোখ!
‘মাগো ধন্য স্বদেশভূমি
মাগো ধন্য যে আজ তুমি
কত কথা বলবো আমি আসি বাড়িতে
মাগো আসি বড়িতে
এমন সোনার ছেলে যেন বাংলাদেশের ঘরে
একটা করে প্রতি ঘরে জন্মগ্রহণ করে।’
দুই.
আমি ঠিক বুঝতে পারছিনা, আমি কি মরে গেছি?
একটা সায়েন্স ফিক্শনে পড়ে ছিলাম। মৃতের শরীর থেকে ঝাপসা হয়ে থ্রিডি আত্মা বের হয়ে আসে। আত্মাটা বের হয়ে নিজেই শরীরের দিকে নিজেই একবার তাকিয়ে দেখে। ফিক্শনটা পড়তে গিয়ে আমার গা শিউরে উঠেছিল। শরীরের লোম খাড়া হয়ে গিয়েছিল।
এখনো আমি বুঝতে পারছি না, আমি কি আমাকে দেখছি ? না আমার আত্মা !
আমি তো বুক টান করে দাঁড়িয়ে ছিলাম সড়কে। পাখির মতন হাত দুটো দুই দিকে সোজা মেলে ধরে। আমার চোখের সামনে ছিল মুক্ত নীল আকাশ। বুকের ওপর তাক্করা ছিল বন্দুক। আমি ভেবেছি, পুলিশ আমাকে গুলি করবে না। আমি তো পুলিশকে কোনো আক্রমণ করিনি। আমি মনে করেছি, পুলিশ ফাঁকা আওয়াজ করে ভয় দেখাবে। রাবার বুলেটের গুলিতে কিছু হবে না। পুলিশ যে সত্যি গুলি করবে, আমি বিশ্বাস করিনি।
পুলিশ নিশানা ঠিক করে গুলি ছুঁড়েছিল। প্রথম গুলিটা লাগে বুকের বাম পাশে। আমি একটু বাঁকা হয়ে যাই। কিছু বোঝার আগে একগুচ্ছ র্ছরা গুলিতে বুকটা ঝাঁঝরা হয়ে গেলো। টলতে টলতে পড়ে যাচ্ছিলাম, কে যেন দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি, আমার অবস্থা এমন হবে। কেন আমার এমন পরিণতি হলো, আমি ঠিক জানি না। জানার চেষ্টাও করবো না কোনো দিন। কত মানুষ গুম হয়েছে। লাশ হয়ে পড়ে থেকেছে সড়কের পাশে। একবার হয়েছে কি, পীরগঞ্জ সড়কে ভ্যানে চড়ে যাচ্ছিলাম। আমার পাশে আরো তিনজন যাত্রী ছিল। কতটুকু যাওয়ার পর ভ্যানওয়ালা হঠাৎ ব্রেককষে দাঁড়িয়ে গেলো।
আমি বললাম ‘কী হইছে মন্তু ?’
‘দেখেন ভাই, জঙ্গলের মধ্যে একটা লাশ পড়ে আছে।’
মন্তু কথাটা বলেই গামছা দিয়ে নাক ঢাকছে। ততক্ষণে অর্ধগলিত লাশের দুর্গন্ধটা আমার নাকেও পৌঁছে গেছে। চারিদিকে মাছি ভনভন করছে। পরে কেউ হয়তো থানায় খবর দিয়েছে। পুলিশ এসে লাশটা নিয়ে গেছে। সেই দুর্ভাগা লোকটার কথা ভেবে কতদিন আমার মন খারাপ হয়েছে। কী যে বিষণ্ন বিকেল কেটেছে। সেই বেওয়ারিশ লাশের কথা ভেবে অজান্তেই গড়িয়ে পড়েছে চোখের পানি।
আমাদের হলের আকবর ভাইয়ের কথা বলবো কি না ভাবছি। আজকাল তো ভেবেচিন্তে কথা বলতে হয়। না হলে পদে পদে বিপদ। আকবর আমাদের হলের বড় ভাই। বিখ্যাত (কুখ্যাত বলাই সঙ্গত) নেতা। চেহারাটাও গুণ্ডা টাইপের, হলের অন্যরা তাকে বেশ তোয়াজ করে চলে। আমি তো অতকিছু জানতাম না। এক সকালে হলের সামনে ছাপরা দোকানে নাস্তা করতে গেছি। দেখলাম প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে আছেন আকবর ভাই, তার সামনে একটা ছাত্র হাত কচলিয়ে বেশ নরম হয়ে কথা বলছে। এর আগে তার নাম শুনেছি। তিনি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রনেতা কিন্তু ইনিই যে সেই আকবর ভাই, আমি চিনতে পারিনি। আমি আমার মতো করে সোজা হেঁটে ভেতরে কাঠের লম্বা টেবিলে বসে বললাম-
‘ভাই আমাকে দুইটা পরোটা আর ডাল দিন।’
হলে উঠেছি নতুন। কারো সঙ্গে চিন-পরিচয় এখনো হয়নি। আমার পাশে বসা একটা ছেলে কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস্ফিস্ করে বলল-
‘এই আকবর ভাই, আস্তে কথা বল। আকবর ভাই মাইন্ড করলে তোমার খবর করে দেবে।’
আমি ছেলেটার কথা শুনে হকচকিত হয়ে গেলাম। আকবর ভাই সম্ভবত বারকয়েক আমার চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন। আমার চোখে চোখ পড়তেই আমি অন্যদিকে দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছি। আকবর ভাই তখনই সম্ভবত আমার চেহারা ভালো করে চিনে নিয়েছিলেন।
ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি দেড় বছর হয়েছে। এখনো হলে সিট পাইনি। স্বভাবিক প্রক্রিয়ায় সিট পাওয়া সম্ভাবনা নেই। ভার্সিটির হলগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে নেই। হল চলে-চালায় ক্ষমতাসীন দলের বড়ভাই বা নেতারা। রংপুর আদালতপাড়ায় মেসে থেকে আসা যাওয়া করছি। মেসে নানান সমস্যা, বুয়া ঠিকমত আসে না, পানির অভাবে গোসল ঠিকমত করতে পারিনা। থাকা-খাওয়ায় বড় কষ্ট। শেষে হলে ওঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ৩৩ নম্বর রুমে উঠেছি মাত্র তিন দিন হলো। তা-ও আমার নিজের নামে বরাদ্দ না। আমি এই হলের অ্যাটাচ্ড ছাত্র নই। মতিয়ুরের সিট, মতিয়ুরের বাড়ি সুন্দরগঞ্জে। অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে, বাংলায়। হলে সিট পাওয়ার নানা তরিকা আছে। নেতারাও একেবারে হলে উঠাতে পারে না। প্রথমে ডাবলিংয়ে অন্য একজনের সাথে থাকতে দেয়া হয়। তারপর আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করে। বড়ভাইয়ের বাড়ি যে অঞ্চলে, সেই এলাকার হলে এক্সট্রা সুবিধা পাওয়া যায়। আকবর ভাইয়ের বাড়ি সুন্দরগঞ্জে, সেই সূত্রে মতিয়ুর সিট পেয়েছিল। হলে ওঠে আমি দেখতে পাই, হলের গেস্টরুমটা গণরুম নামে পরিচিত। রাতে সেখানে ঠাসাঠাসি করে অনেক ছাত্র ঘুমায়। পাশের বারান্দায় জানালাবিহীন একটা রুম আছে। দরজায় সবসময় তালামারা থাকে, সেটা না কি টর্চার সেল।
আমার সঙ্গে মতিয়ুরের পরিচয় হয় ফাহমিদার সূত্রে। মতিয়ুর ফাহমিদার মামাতো ভাই হয়। রংপুর সরকারি কলেজে ইন্টার পড়ার সময় ফাহমিদা আমার ব্যাচমেট ছিল। আমরা দু’জনই ভার্সিটির গুচ্ছতে পরীক্ষা দিয়ে ছিলাম। আমি বেগম রোকেয়াতে চান্স পেয়ে ভর্তি হলাম ইংরেজিতে। ফাহমিদা টিকলো না। সে এখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রংপুর সরকারি কলেজে অর্থনীতিতে পড়ে।
ফাহমিদার সঙ্গে মতিয়ুরের কী কোনো রিলেশন আছে ? আমি ঠিক জানি না। মতিয়ুরকে একথা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার নেই। বেরোবিতে (বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়) মতিয়ুরের সঙ্গে ফাহমিদাকে মাঝে মাঝে ঘুরতে দেখা যায়। তা না হলে আমাকে দেখলে দু’জনেই কথা বলা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে নীরব হয়ে যায় কেন? ফাহমিদার মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলে, সে মাথাটা নিচু করে ফেলে। ওদের দু’জনের কথা ভাবলে আমার কেন জানি হাসি পায়।
রংপুর শহরে আমি দুই জায়গায় টিউশনি করি। শাহনাজদের বাসা হাউজিং স্টেটে। তার মা শাহানাখালা আদর করে মেয়েকে নাজু নামেই ডাকে। নাজু সামনে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেবে। সপ্তাহে তিনদিন ফিজিকস্, ক্যামেস্ট্রি, ম্যাথ পড়াই। নাজু ছাত্রী হিসেবে মেধাবী। নিজেই সবকিছু পড়ে নেয়, কেবল অঙ্ক কষতে বসলে বোকা বোকা চোখে আমার দিকে তাকায়। তখন তার কালো দুটি চোখের গভীর মায়া আমাকে আচ্ছন্ন করে দেয়। আমি বুঝি, মেয়েদের চোখেরও একটা নিজস্ব ভাষা আছে। সেই অব্যক্ত নীরব ভাষা সব পুরুষ পড়তে পারে না। নাজুর টিকলো নাক, লাবণ্যে ভরা চিবুক, অধরে লেপ্টে থাকা মধু, শিশির ভেজা সাদা শাপলার মতো হাসি, ভিন্ন এক মাদকতা ছড়িয়ে দেয়। তার নিবিড় চোখের চাহনি হয়তো বয়সেরই দোষ। হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে এধরনের মেয়েদের ‘মায়াবতী’ বলেছেন। আমি তাই দৃষ্টিটা অন্যদিকে সরিয়ে নিই। শনি, সোম, বুধ, তিনদিন পড়াতে যাই কামারপাড়ার অষ্টম শ্রেণির ছাত্র মাসুদকে। গত একবছর যাবৎ আমার পড়ালেখা, মেসের খরচ নিয়ে ভাবতে হয়নি। টিউশনির টাকা দিয়ে চলছে। নাজু পরীক্ষা দিয়ে ফেললে হয়তো আমার এই টিউশনিটা থাকবে না।
মতিয়ুর রুমে এসে একদিন আমাকে হঠাৎ বললো-
‘সাঈদ, তুই কি অন্য কোনো রাজনৈতিক দল করিস্?’
‘কী যে বলিস্?
‘কারো সাথে তো কোনো ঝামেলা হয়েছে?
‘কই মনে পড়ছে না তো।’
‘তোকে আকবর ভাই সন্ধ্যায় গণরুমে দেখা করতে বলেছে।’
কথাটা বলেই মতিয়ুর কঠিন চোখে আমার দিকে তাকালো। আমার বুকে মোচড় দিয়ে উঠলো। মতিয়ুর তো এমন সুরে আমার সাথে কথা বলে না!
‘কি জন্য ডেকেছে তুমি কি কিছু জানো?’
মতিয়ুর কিছুক্ষণ দম ধরে থাকে। তারপর বলে-
‘গণরুমে ডাকার অর্থ তুই কি কিছু বোঝস্ না?’
মতিয়ুরের কথায় আমি আতঙ্কিত হই। একটা অজানা ভয় মনের ভেতর কাজ করছে। যদিও আমি যথেষ্ট সাহসী। আমার জানা মতে আমি কোনো অপরাধ করিনি। সারাটা দিন দুশ্চিন্তায় কাটলো।
টিউশনি থেকে ফিরে রাত নয়টায় বুকের ভেতর যথেষ্ট পরিমাণ সাহস সঞ্চয় করে আমি গণরুমে গেলাম। রুমে ঢুকেই দেখলাম তিনজন কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে। দেয়াল ঘেঁষে একটা চেয়ারে বসে আছে আকবর ভাই। তার ছায়াসঙ্গীর (সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়, বহিরাগত) হাতে মজবুত একটা লাঠি। আমি আসার আগে সম্ভবত তিনজনকে একদফা পেটানো হয়েছে। তিজনের চেহারায় আঘাতের চিহ্ন। একজনের ঠোঁট বেয়ে রক্ত ঝরছে।
চোখের ইশারায় আমাকে নিয়ে যাওয়া হলো একদরজার সেই রুমটায়। আকবরের ছায়াসঙ্গী তালা খুলে স্যুইচ অন করলে গুহার মতো ঘরের ভেতরটা একচিলতে আলোয় স্পষ্ট হয়। আমার মনে হলো রুমটার দৈর্ঘতা অনুযায়ী আলোটা পর্যাপ্ত নয়। থমথমে গলায় ছায়াসঙ্গীটা বললো-
‘তুমি এখানে দাঁড়াও। আকবর ভাই এসে তোমার সাথে কথা বলবে।’
গণরুমে কী ঘটছে, আমি বুঝতে পারছি না। নিজের কথা ভেবেই গায়ে শীতল হাওয়া বইছে।
আকবর ভাই একা নয়, সঙ্গে আরো চারজনকে নিয়ে ঢুকলেন। সময়ের অভাবে অনেকদিন সেলুনে যাওয়া হয় না। ফলে মাথার চুল লম্বা হয়ে গেছে। সেই সাথে মুখের দাড়ি। প্রতি ওয়াক্ত নামাজ আমি মসজিদে গিয়েই পড়তাম। ছোটবেলায় গ্রামে থাকতেই বাবাই আমাকে সঙ্গে করে মসজিদে নিয়ে যেতেন। সেই থেকে অভ্যাস, ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর নামাজটা অনিয়মিত হয়ে গেছে। তবে একবেলা নামাজ বাদ পড়লে মনের ভেতর কেমন জানি খচখচ করে। আমাদের ভার্সিটি মসজিদে আসরের নামাজের পর তাবলিগের লোকেরা গোল হয়ে বসে দ্বীনের কথা বলে। নামাজ শেষ হওয়ার পরই একজন উঠে দাঁড়িয়ে বলেন-
‘মোহতারাম ভাইয়েরা, মুনাজাতের পর দ্বীন ও দুনিয়া সম্পর্কে বয়ান হবে। আপনারা যারা দ্বীনের পথে মেহনত করতে চান, তারা অংশগ্রহণ করবেন। আল্লাতালা বহুত বহুত সোয়াব দান করবেন।’
আমি কখনো তাবলিগ জমাতে বসতাম না। পরে দেখি ভার্সিটির বেশ কিছু ছাত্র এদের জমায়েতে শরিক হচ্ছে। একদিন দেখলাম ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের নামকরা এক অধ্যাপক মৌলভীদের মতো লম্বা জুব্বা পরে তাবলিগ জমাতে বয়ান দিচ্ছে। আমি কৌতূহল বশত একদিন বসলাম, ফিজিক্সের প্রফেসর আখলাক (চরিত্র) সম্পর্কে কোরান ও হাদিসের আরবি আয়াত উল্লেখ করে ইহকাল-পরকাল নিয়ে চমৎকার বক্তব্য দিলেন। মাওলানাদের ওয়াজের চাইতে স্যারের কথা আমার খুব ভালো লাগলো। তারপর থেকে সময় পেলে আমি আসরের নামাজের পর তাবলিগে বসতাম।
আকবর ভাইয়ের সাথে আসা চারজনের একজন হঠাৎ
‘এই শুয়রের বাচ্চা! শিবির! বল, তোর সাথে আর কে কে শিবির করে, তোরা কয়জন?’
আমার মাথার চুল টেনে ধরে একজন প্রচন্ড জোরে একটা ঘুষি দিয়ে বলে-
‘শালা, রাজাকারের বাচ্চা! বাড়ি কই?’
নাক-ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। প্রথম জন কোমর বরাবর দিলো এক লাথি। আমি ফুটবলের মতো দড়াম করে দূরে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে পড়ে গেলাম। মাথায় দেয়ালে আঘাত লাগায় চোখে অন্ধকার তারা তারা দেখছি। ছায়াসঙ্গীর হাতে থাকা মজবুত লাঠি দিয়ে বিরতিহীন পেটাতে থাকলে আমি মেঝেতে পড়ে ‘ও মারে ও মারে’ বলে কোঁকড়াতে লাগলাম। সাপকে যেমন মানুষ লাঠি দিয়ে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত পেটায়, তেমনি নির্বিষ সাপের মতো মাটিতে শোয়ায়ে পেটাতে লাগলো।
আমি যে শিবির করি না, শিবির কারা করে, সেটাও আমার জানা নেই। একথা বলার মতো কোনো ফুরসতই পেলাম না। লাঠির নির্মম আঘাতে একসময় আমি জ্ঞান হারাই। আমাকে মৃত ভেবেই হয়তো ফেলে গেছে ওরা। ফ্লোর ভেসে গেছে রক্তে। একটা মানুষের গায়ে আর কতটুকু রক্ত থাকে ?
[চলবে…]