হ্যাঁ আমি, এই শতকের ‘ধ্রুপদি ও আধুনিক’ কবি আল মাহমুদের কাব্যভুবন সম্পর্কে আলোচনা করবো অথচ অতি সংক্ষিপ্ত।
কবিতা মহত্তম শক্তির আত্মিক-আধার। সেই আধারের কেলাসিত উৎসার। কাব্যের সেই উপাদান সংগ্রহ করে কবিরা সৃষ্টি করে যান। পরিশীলিত নিষঙ্গ-নিকষ নির্যাস। কবিতা দেশ থেকে দেশে- মহাদেশ থেকে মহাদেশে- ‘সময়রেখার দিকচিহ্ন’ সৃষ্টি করে যায়। কবিতার ধ্রুপদি মূলধারা আধুনিক মূলধারার উৎস-আকর। অনন্ত ও অসীম পরমাত্মার পরমানন্দ…। সংযত সংহত সন্নিবেশ ও সম্মীলন।
So gladly from the songs of modern speech men turn, and See the stars, and feel the face shill wind beyond the close of heavy flowers, And Through the music of then languid hours They Hear Like Ocean Beach The Surge and thunder of the odyssey. -Andrew Lang, The Odyssey
কবিরা সেই আনন্দ স্বরূপ-সৌন্দর্য ক্রমাগত অনুসরণ করে চলেন। সেখানে ব্যত্যয়-বিরতি নেই। সে যেন অন্তরাত্মায় জাগ্রত ছন্দস্পন্দন। চৈতন্যজাত সত্যের সাক্ষাৎ দর্শন ঘটে কবির ভেতরে। ইন্দ্রিয়গম্য ও অতীন্দ্রিয় সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ ঘটান কবি। কবির চক্ষু, ইন্দ্রিয়, হৃদয় এবং চেতনাগত মনজ অভিজ্ঞান কল্পনায় যে আলোড়ন ঘটায় আবেগ-আতিশয্য সৃষ্টি করে সেখানটাই কবিতার মাতৃগাভি। উৎস্য-মূল।
অতি সূক্ষ্ম মানবমনের স্বরূপ এবং অভিব্যক্তির নানা জাগতিক-আধ্যাত্মিক রূপের উৎসারণ থেকে কবিতার জন্ম- সৃষ্টি। সেই বিস্তারের মাত্রা থেকে বারবার জেগে উঠে একজন কবির আত্মভূমি। কবি তার অন্তর্দৃষ্টির অলিন্দে দাঁড়িয়ে যে জীবন-জগৎ, মানব সংসার দেখেন, সেটাই প্রতীকায়িত ও প্রতিবিম্বিত করেন।
চৈতন্য ও মননের সম্মীলনে যে বাক-প্রতিমা এবং অভিব্যক্তি- সেই বিভাব-বিভাজনের স্বতঃস্রােত প্রবাহন- সেই স্রােতস্বন ধারাকেই আমি কবিতা বলি। কবিরা একটি আধ্যাত্মিক সত্তা। সেই সত্তা ও অস্তিত্বের বিহারে অনন্তকে উপলব্ধি অনুভব করা যায়। কবিতা বলি, উপন্যাস বলি, মানব সংস্কৃতি বলি সমস্তটা মিলেই জীবন।
কবি-আত্মা এক স্বতঃপ্লাবী দিগন্ত-বিহারী সমুদ্রের বহুদূরগামী যাত্রী। এক উন্মাতাল ও রঙ্গরাজির বাঁধভাঙা ঢেউ যেন। সময়ের চলমানতার জীবনের মোহমুক্তি খোঁজে। কোনো শেকলেই বন্দী করে রাখা যায় না।
কবি সম্ভাবনাকে বয়ে নিয়ে যায় দূরে-সুদূরে। শব্দের বিভাবে বিস্তার ঘটায় শুধু। ধ্বনি-সিম্ফনির মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। সমুদ্রের ধ্বনি তরঙ্গের কালমিতি সৃষ্টি করে চলে মুহূর্তে-মুহূর্তে। ধারাবাহিকতা ও পরম্পরা রক্ষা করে চলমানতা- কবিতার চিরন্তন প্রকৃতি। এই চিরন্তন স্বাদেশিক, সামাজিক, ঐতিহ্যিক ও বৈশি^ক আবহে অবগাহনসিক্ত শিল্প বা আর্টের মূলস্থিতি আবিশ^-বীক্ষণ।
শিল্প স্বদেশ-স্বজাতি সমকাল ভবিষৎ কালের কথা বলে। এটাই শিল্পের শেষ বিচারের দাবি। এ দাবির শূন্যতা ভরিয়ে তুলতে হয়। কবি আল মাহমুদ কখনও এ দাবির অর্থাৎ কিনা শিল্পের শূন্যতা শিল্পের কৌঠাটাকে খালি করে রাখেন নি। আল মাহমুদ একজন হৃদয়ের কৃষক। তিনি নিঃশ^াসের শব্দে-শব্দে বন্দনার বীজ বপন করে গিয়েছেন।
এ গুনপানা তার শৈল্পিক সততা ও সম্পন্নতার দিক চিহ্ন নির্দেশ করে। মৌলানা জালালুদ্দিন রুমি যেমন গেয়েছেন-
প্রতি নিশ^াসে আমি বপন করি প্রার্থনার বীজ
আমি তো হৃদয়ের কৃষক
দিন ও রাত্রি ব্যাপে দেখি পুনমির্লনের মুখ
আমি খোদার আরশি
আমি প্রতিটা মুহূর্তে গড়ি নিজেই নিয়তি
আমি নিজেই আমার আত্মার কাব্যমিস্ত্রি।
আমরা গভীরভাবে লক্ষ্য করবো বহুস্তরীয় নান্দনিক, কলাকৈবলীয়, শিখরীয় উচ্চতায় উত্তীর্ণ করতে পেয়েছেন তার কাব্যিক সত্তাকে- কবি মাহমুদ।
জীবনবাদী, মানবহিতবাদী কবিকূল জীবন-মৃত্যুর রহস্য বিস্ময় নিচয় উন্মোচনে আত্মমগ্ন থাকেন। আল মাহমুদ নিজের অলিন্দে, একেবারেই আপন অস্থির অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছিলেন- এই অনন্য পূর্ণতার কারণে আল মাহমুদ অনন্য, স্বতন্ত্র, বহুবর্ণী ব্যক্তিত্ব ও কথা কোবিদ-কাব্যকোবিদ। এ জীবনবাদিতায় অনিবার্যভাবে অতিসংশ্লিষ্ট করে তুলে ছিলেন নিজেকে কবি আল মাহমুদ। এই কথাটা নিঃশঙ্ক, নিঃসন্দেহ চিত্তে বলা যায়। জীবন সমুদ্রে, অপার জলধিতে নিমজ্জিত হয়ে যাওয়া মহানাবিক কবি আল মাহমুদ। তার তুলনা, তার প্রতিতুলনা তিনি নিজেই। শক্ত-সহিষ্ণু, মর্ত্যের মৃত্তিকা-ক্রন্দসীর অশ্রুকণার সঙ্গে কবি আল মাহমুদ স্থৈর্য্য ও স্থিরতার কালবেলায় কাল কাটাননি কখনো জীবনে। বরং অপার অস্থিরতা, প্রভূত চাঞ্চল্যেও জাগর ছিলেন সতত। বিদ্যাপতির ভাষায় বলা যাবে-
ন থির জীবন থির যইবন।
ন থির এ হে সংসার ॥
আল মাহমুদের জাঁকজমকময় কবিতাকর্মে জীবনকে কল্পনা করা যায়, মুহূর্তে-মূহূর্তে ভাবা যায়, অনুভব করা যায়, কবির গন্তব্যে দুর্দান্ত দাঁড়ানো যায়- আবার সেই গন্তব্য ছাড়িয়েছে আরেক গন্তব্যে যাওয়া- কোনো বাধ্যবাদকতা সেখানে। নিজের জীবনটাকে অবারিত রাখা যায়। এই বৈচিত্রে, সাবলীলতাও আছে ঢের। জীবনের সহ¯্র স্বপ্নকে ভেঙ্গে চুরে নতুন, চিরনতুন স্বপ্ন সৃষ্টি করা যায়। আরেক অপার অনবদ্য জগৎ রচনা করা যায়। সেই স্বপ্নচূর্ণের আর্ণব, অণুকণা দিয়ে নবতর ঘরবাড়ি বসতভিটে বেঁধে তোলা যায়। মানবত্মার ভবিষৎ-কে মানবিক অলংকারে অলংকৃত করতে সক্ষম হবে। কাব্যের আত্মার ক্রমাগত রূপান্তর, পরিবর্তন, প্রত্যাবর্তন ঘটে যেতে থাকে- এবং তাতে করে রূপবন্ধের, সমাবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। কাব্যের ভাবসত্তাও বর্হিসত্তার মধ্যে অনুযোগ আর আনুগত্য ঘটে।
এতে করে গতি-প্রবাহের ভেতরেও অন্তঃস্রােত হয়। সম্মোহিত হয়। চমৎকারিত্বের সুকোমল কমলাটি প্রস্ফুটিত হয়। এরই পাপড়িদল মেলে ধরে কাব্য প্রেরণার এষণার আবিষ্কার অনাবিল অমোঘ অঙ্গনটিতে।
আমি এখানে কবি আল মাহমুদের কবিতার সমগ্রতা নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে প্রয়াস করবোনা। তাঁর সবচাইতে অধিক আলোচিত কাব্যগ্রন্থ ‘সোনালি কাবিন’ নিয়েই সীমিত সময়ের স্বল্পদৈর্ঘ্যরে আওতায় যতোটুকু কিনা বলা যায়- সেটুকুই উল্লেখ করবো।
পণ্ডিত শ্রীঅরবিন্দ তাঁর ‘ভবিষ্যতের কবিতা’ গ্রন্থে “রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তু” প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন: স্পষ্টত ছন্দঃস্পন্দন হল কাব্যিক প্রকাশভঙ্গির চাহিদা, কারণ ধ্বনিপ্রবাহই তার তরঙ্গদোলায় চিন্তাপ্রবাহকে ভাষার মধ্যে বহন করে আনে। সংগীতময় ধ্বনিচিত্রই তো আমাদের চিন্তা, আবেগ ও প্রাণের রেখাচিত্রে রং ভরে দিতে, তাকে পল্লবিত করে ধরতে, সূক্ষ্ম ও গভীর করে তুলতে সবচেয়ে সাহায্য করে। সঙ্গীতের এই ধ্বনিচিত্রই অর্থের হাত ধরে নিয়ে যায় তার নিজের সীমার বাইরে-বুদ্ধি যার কাছ থেকে নিবর্তিত হয় অপ্রকাশের ব্যর্থতা নিয়ে তাকেই প্রকাশ করার দিকে। এই হল চিরকালের সঙ্গীতের নিজস্ব বিশিষ্ট শক্তি। প্রাচীনেরা এই সত্যকে যত সার্থকভাবে সামগ্রিকভাবে বোধগম্য করেছিলেন, কিংবা অন্তত যত সঙ্গতির সঙ্গে উপলব্ধি করেছিলেন, আধুনিক মন ও শ্রুতি ততটা পারেনি। আর কারণ বোধ হয় এই যে, তাঁরা তাদের কাব্যকে গান করতে, আবৃত্তি করতে এবং তাতে স্বর-সংযোগ করতেই বেশি অভ্যস্ত ছিলেন। আর আমরা আমাদের কাব্যকে পাঠ করেই তৃপ্ত। আমাদের এই পাঠ করার যে অভ্যাস তা কাব্যের বুদ্ধিগত এবং আবেগগত উপাদানটুকুই উদঘাটিত করে, কিন্তু অন্যায়ভাবে চাপা দিয়ে দেয় তার ছন্দঃস্পন্দনের মূল্যকে। অন্যদিকে, আধুনিক কাব্য অর্জন করেছে প্রাচীনের চেয়ে অনেক বেশি সূক্ষতা, অনুপুঙ্খ চারুতা এবং ভাব ও ভঙ্গিতে ব্যঞ্জনার বিস্ময়কর গভীরতা। তার সঙ্গে হয়তো তাকে হারাতে হয়েছে শক্তি, উচ্চতা এবং ঋজু বিরাটত্ব। ছন্দশক্তি দীন যে ¯্রষ্টা, প্রাচীনেরা তাকে আধুনিকদের মতো এতো সহজে মহাকবির সম্মান দিতে পারতেন না, কিংবা প্রকৃতই মহাকবি যিনি তার মধ্যে ছন্দের পতন, পরিপাটের অভাব এবং রুঢ়তাকে তাদের বিষয়বস্তু ও রচনাশৈলীর স্বার্থে ক্ষমা কিংবা উপেক্ষা করতেন না; প্রশংসা তো নয়ই।
আমাদের উদ্দেশ্য হল কাব্যের মধ্যে মন্ত্রের সূচনা করা। এই উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য কাব্যের রচনাশৈলীর প্রসঙ্গেও আমাদের সেই পার্থক্যটি বুঝে নিতে হবে যা আমরা বুঝে নিয়েছি কাব্যের ছন্দঃস্পন্দন প্রসঙ্গে। কারণ এখানেও আমরা দেখি, যেকোন লেখারই কিছু শক্তি আছে এবং যাকেই কোন রকমের একটা ছন্দের রূপ দেওয়া হয়েছে, কার্যত তাকেই কাব্য বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- কি রকমের শক্তি রয়েছে তার এবং তার সিদ্ধিতে গভীরতাই বা কতখানি। সাময়িক সুখ্যাতি বা সাময়িক সুনামের অধিকারী কবিদের স্বাক্ষরিত অনেক কবিতা আছে যাদের আধা-কাব্যের প্রত্যন্তদেশেই ফেলে রাখতে আমরা বাধ্য হই কেননা তাদের প্রকাশরীতি গদ্যের প্রকাশরীতি থেকে খুব পৃথক নয়। (শ্রী অরবিন্দ, ভবিষ্যতের কবিতা; পৃ.-২৯-৩০)। আল মাহমুদের ভাষ্যে:
নিসর্গের গ্রন্থ থেকে, আশৈশব শিখেছি এ-পড়া
প্রেমকেও ভেদ করে সর্বভেদী সবুজের মূল,
চিরস্থায়ী লোকালয় কোনো যুগে হয়নি তো গড়া
পারেনি ঈজিপ্ট, গ্রীস, সেরাসিন শিল্পীর আঙুল।
কালের রেঁদার টানে সর্বশিল্প করে থরথর
কষ্টকর তার চেয়ে নয় মেয়ে কবির অধর।
[‘সোনালি কাবিন: ৫’]
তাই আমরা বলতে পারি আল মাহমুদের ‘সোনালি কাবিন’ মহাকবির সেই গুণাগুণ অর্জন করেছে যা অর্জনে একজন কবিকে মহাকালের স্বাক্ষরে স্বীকৃতি দেয়া যায়। মহাকাব্যিক এক ব্যঞ্জনায় কবি বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য, প্রেম-বিপ্লব, প্রকৃতি-সংস্কৃতি, নৃতত্ত্ব-জ্ঞানকে বিরল এক সিম্ফনিতে ধরেছেন ও প্রকাশ করেছেন। একদিকে সমকালের সঙ্গে অতীতের যোগসূত্র, অন্যদিকে আঙ্গিকের সাবলীল গঠনে চৌদ্দটি সনেট হয়ে উঠেছে কাল ও কালান্তরের মহাকাব্য- ‘ওডিসি’। একান্ত বাংলার লোকায়ত জীবনের মহাকাব্য।