রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন- একটি নাম, একটি প্রতীক, আমাদের সমাজের নারী জাগরণের বিশেষ ‘আইকন’ স¦রূপ। কেননা বাংলার অবহেলিত মুসলিম নারী সমাজের সম্মানজনক অবস্থান নিয়ে তিনিই ভেবেছিলেন প্রথম। তাই তিনি নারী জাগরণের অগ্রদূত। এই জাগরণের পেছনের যে নিষ্ঠা, কর্মপ্রচেষ্টা বা সর্বাঙ্গীণ আত্মপ্রস্তুতি সে তাঁর কর্মিসত্তা, কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে তাঁর আরো এক বৃহৎ পরিচয়- সাহিত্যিক বা লেখক রোকেয়া। আজ থেকে দুশো বছরেরও আগেকার যে বাংলাদেশে তাঁর জন্ম, তখনকার পারিবারিক বা সামাজিক পরিবেশ একজন নারীর জন্য যে খুব একটা অনুকূল ছিল না সে আমরা সবাই জানি। প্রচলিত বহুবিধ নিষেধাজ্ঞার বেড়া ডিঙিয়েই নারীর শিক্ষা এবং নারীর জাগরণের বিশেষ জায়গাটিতে পৌঁছুতে হয়েছিল তাঁকে। সে অনেক তিক্ত, তীব্র বেদনা-বিধুর অভিজ্ঞতা, অনেক রক্তাক্ত অন্তর্দহন। সেই সকল অভিজ্ঞতা, দহন বা দর্শন থেকেই সৃষ্টি তাঁর লেখনী-সত্তার। ১৮৯৮ সালে ভাগলপুর নিবাসী সৈয়দ সাখাওয়াৎ হোসেনের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনের পরেই লেখক হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। অস্বীকার করার উপায় নেই রোকেয়ার জীবনে স্বামীর অনুপ্রেরণা বিশেষ অন্তর্শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। তবে সে ক্ষণিক সময়ের জন্য। দীর্ঘ রোগভোগের পর ১৯০৯ সালে স্বামীর মৃত্যুর পরবর্তী যে পথচলা, সেও কম বন্ধুর নয়। নারীশিক্ষা আন্দোলনে সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল মুসলিম গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠায় দুই দশক সময়কালব্যাপী তাঁর যে অক্লান্ত সাধনা ও নিঃস্বার্থ ত্যাগ সেও ইতিহাসের চিহ্নিত বিষয়। তাঁর স্বভাবসুলভ সরস গদ্যভঙ্গির আড়ালে সে বেদনার ছাপও ধরা পড়েছে ক্ষেত্রবিশেষে। রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেন, এই নামেই লিখতেন তিনি। তাঁর নামের আগের ‘বেগম’ শব্দটি অহেতুক জুড়ে দেয়া হয়েছে। যাই হোক, রোকেয়ার জীবন কিংবা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক-সামাজিক কর্মসাধনা এই প্রবন্ধের আলোচিত বিষয় নয়, প্রবন্ধের লক্ষ্য তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত, সরস, ব্যঙ্গাত্মক গদ্য এবং তাতে বিধৃত চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে ধরা। যেহেতু প্রবন্ধের শিরোনাম ‘প্রাবন্ধিক রোকেয়া’, তাই আলোচনা তাঁর রচিত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধাবলিতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
প্রাবন্ধিক রোকেয়াকে জানার আগে সাহিত্যিক রোকেয়ার একটি প্রাথমিক পরিচয় থাকা প্রয়োজন। কার্যত ১৯০১-১৯৩২ এই বত্রিশ বছর রোকেয়ার সাহিত্যসাধনার সময়কাল। একুশ বছর বয়সে লেখক হিসেবে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ। প্রথম প্রবন্ধ ‘পিপাসা’ প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত বিশেষ ‘মোহররম সংখ্যায়’। শেষ লেখাটি পাওয়া যায় মৃত্যুর পর তাঁর লেখার টেবিলে, শিরোনাম- ‘নারীর অধিকার’। ১৯০১-১৯০৮ এই আট বছর সময়কালে অবিরত লিখেছেন তিনি। লেখক হিসেবে তাঁর সুপরিচিতি এই সময়ের ভেতরেই। এই সময়ে তাঁর দুটি গ্রন্থও প্রকাশিত হয়- মতিচূর-১ম খণ্ড (১৯০৫) এবং Sultana`s Dream (১৯০৮)। তবে পরবর্তী ৬-৭ বছরে তাঁর লেখায় দীর্ঘ বিরতি লক্ষ্য করা যায়। এর কারণ হয়ত স্বামীর অসুস্থতা, পরপর দুই সন্তানের মৃত্যু এবং নানাবিধ সাংসারিক-সামাজিক বিপর্যয়। প্রকাশিত লেখা নিয়ে যথেষ্ট সমালোচনার মুখোমুখিও পড়তে হয়েছে তাঁকে, সেখানে উৎসাহব্যঞ্জক দৃষ্টিভঙ্গির অভাবটাই প্রকট। যেমন মতিচূর-১ম খণ্ড প্রকাশের পর ‘নবনূর’ পত্রিকার সম্পাদক, সেই সময়ের একজন প্রথম সারির সমাজসেবক এবং সাহিত্যিক সৈয়দ এমদাদ আলী তাঁর সমালোচনায় কৌতুক করে লিখেছিলেন, “আমরা সুগৃহিণী চাই সত্য কিন্তু আমরা এমন গৃহিণী চাই না, যাহারা কেবল সারাদিনের ‘হর্টিকালচার’, ‘কেমিস্ট্রি’ বা ‘ফিজিক্স’ নিয়া ব্যস্ত থাকিবেন। তাহা হইলে আমাদের ন্যায় মধ্যবিত্ত অবস্থার লোকদিগকে উপবাস করিয়াই থাকিতে হইবে।” একই পত্রিকায় এস. এ. আল্-মুসাভী লেখেন, “নারী কখনও সমস্ত বিষয়ে পুরুষের সমতুল্য হইতে পারে না- তাহা হইলে স্বভাবের বিরুদ্ধাচরণ করা হইবে।” যাইহোক দীর্ঘ বিরতির পর ১৯১৫ থেকে সাময়িক পত্র-পত্রিকায় আবার লেখা নিয়ে ফিরে আসেন তিনি এবং মৃত্যু পর্যন্ত অবিরাম চলতে থাকে লেখনী। দ্বিতীয় পর্যায়ে তাঁর প্রথম রচনা মওলানা আকরম খাঁ সম্পাদিত আল-ইসলাম পত্রিকার ‘নূর ইসলাম’ নামক একটি অনুবাদ প্রবন্ধ। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত সর্বশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম ‘বায়ুযানে পঞ্চাশ মাইল’, লেখাটি সৈয়দ আবদুর রব সম্পাদিত ‘মোয়াজ্জিন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ পর্যায়ে বিভিন্ন প্রবন্ধাদি ছাড়াও তাঁর আরও তিনটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়- মতিচূর-২য় খণ্ড (১৯২১), পদ্মরাগ (১৯২৪) ও অবরোধবাসিনী (১৯২৮)।
রোকেয়ার মূল আদর্শ ছিল নারীমুক্তি। বাঙলার পিছিয়ে পড়া মুসলমান সমাজে নারীর মুক্তি বা নারীর অগ্রগতিতে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে তিনি অনুভব করেছিলেন প্রবলভাবে। এক্ষেত্রে নারীর মুক্তি কেবল পুরুষের অধীনতার মুক্তি নয়, এ মুক্তি সমাজের চিরাচরিত নিয়মের বাঁধন কেটে নারীর আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধের মুক্তি। অর্থাৎ নারীর মনন তথা মানসিক মুক্তি। এ মুক্তির সঙ্গে নারীশিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শিক্ষা, একমাত্র শিক্ষাই নারীর ভেতরে জাগাতে পারে মুক্তি অর্থাৎ স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা, তার আপন অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা। মতিচূর প্রথম খণ্ডের সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধসমূহে আমরা তাঁর এই অভিব্যক্তিরই জোরালো প্রকাশ দেখতে পাই। বিশেষভাবে ‘স্ত্রীজাতির অবনতি’ প্রবন্ধটিতে। নামকরণ থেকেই একটি প্রশ্ন খুঁজে পাওয়া যায়- ‘কেন স্ত্রীজাতির অবনতি?’ তাহলে উন্নত অবস্থান কি কিছু ছিল? রোকেয়া যেভাবে বলেছেন:
আদিমকালের ইতিহাস কেহই জানে না বটে; তবু মনে হয় যে পুরাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল না। কোন অজ্ঞাত কারণবশত মানবজাতির এক অংশ (নর) যেমন ক্রমে নানাবিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পারিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিণী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল।
সভ্যতার সূচনা যদি কৃষিকাজ দিয়ে হয়, সেই কৃষিকাজের সূচনা কিন্তু নারীর হাতে। আদিমসমাজে ফলমূল আহরণের ভার ছিল নারীর ওপর। পুরুষেরা যেত শিকারের সন্ধানে। নারীরা ফলমূল সংগ্রহের পাশাপাশি নিয়ে আসত বুনোগম, বার্লি, মেটে আলু, কচুর কন্দ ইত্যাদি। সেইসব বাড়ির আশপাশে পড়ে গজিয়ে উঠত চারাগাছ। ক্রমে বেড়ে ওঠা চারাগাছে গজাতো শস্যদানা। এ ধরনের ঘটনা থেকেই বীজ ছিটিয়ে শস্য পাওয়ার ধারণার সৃষ্টি হয়। দিনে দিনে নারীরা এই কাজটিতে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠে। এভাবে পতিত জমিতে একটি লম্বা চোখা লাঠি বা পশুর শিং দিয়ে মাটি খুঁড়ে বীজ ফেলে শস্য উৎপাদনের বুদ্ধি কিন্তু নারীর মাথাতেই প্রথম আসে। এমনকি জানোয়ারের চোয়ালের হাড় দিয়ে ফসল কেটে ঘরে তোলাতেও কিন্তু অগ্রগামী নারীরাই। কিন্তু লৌহযুগে পৌঁছে যখন লাঙলের ব্যবহার এসে গেল, অধিক উৎপাদন আর পেশির গরীমায় নারীকে কৃষিকাজ থেকে হটিয়ে দিয়ে একেবারে গৃহবন্দী দাসীতে পরিণত করে ফেলল পুরুষ। পরবর্তী ইতিহাস তো সকলের জানা- কিভাবে মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা রূপান্তরিত হল পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়, কিভাবেই বা লোপ পেল নারীর ক্ষমতা আর সার্বভৌমত্ব! অবনতিটা হয়ত এ কারণেই। অবনতির স্বরূপটাও একটু জেনে নেয়া প্রয়োজন- সহচরী বা সহধর্মিণী নয়, একেবারে দাসী। এ দাসত্ব কেবল শারীরিক দাসত্ব নয়, মানসিক দাসত্বও বটে। একটি বিশেষ পর্যায়ে মুরগির ডানা কেটে তার ওড়বার শক্তিটিকে খর্ব করা হয়। মেয়েদেরকেও নানাভাবে কেটে-ছেঁটে, প্রয়োজনে দাবিয়ে-মুড়িয়ে পুরুষদের বিশেষ মনোমত একটি অবস্থানে নিয়ে আসা হয়েছে। চীনা উপজাতিতে একটি বিশেষ প্রথা প্রচলিত ছিল- একেবারে শিশুবস্থাতেই তাদের পায়ের পাতা এমনভাবে মুড়িয়ে বাঁধা হত যেন শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটলেও পায়ের পাতাটির কোনোরকম হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটত না। পাতাটিকে ছোট আকৃতিতে রাখার জন্যই এতসব ব্যবস্থা। মেয়েদের মানসিক দাসত্বটাও সেই গোছের। রোকেয়ার ভাষায়:
আমরা বহুকাল হইতে দাসীপনা করিতে করিতে দাসত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। এইরূপে আমাদের স্বাবলম্বন, সাহস প্রভৃতি মানসিক উচ্চবৃত্তিগুলি অনুশীলন অভাবে বারবার অঙ্কুরে বিনাশ হওয়ায় এখন আর বোধ হয় অঙ্কুরিতও হয় না। কাজেই পুরুষজাতি বলিতে সুবিধা পাইয়াছেন; `The five worst maladies that afflict the female mind are: indosility, discontent, slander, jealousy and silliness, … Such is the stupidity of her character, it is incumbent on her in every particular, to distrust herself and to obey her husband” (Japan, the Land of the Rising Sun.)
ইংরেজি উদ্ধৃতাংশটুকুর ভাবার্থ করেছেন তিনি এভাবে, “স্ত্রীজাতির অন্তঃকরণের পাঁচটি দুরারোগ্য ব্যাধি এই- (কোন বিষয় শিক্ষার) অযোগ্যতা, অসন্তোষ, পরনিন্দা, হিংসা এবং মূর্খতা। … নির্বোধ স্ত্রীলোকের কর্তব্য যে প্রত্যেক বিষয়ে নিজেকে অবিশ্বাস করিয়া স্বামীর আদেশ পালন করে।” শুধু এইটুকুই নয়, আরও অপবাদ বরাদ্দ মেয়েদের জন্য, “কেহ বলেন “অতিরঞ্জন ও মিথ্যাবচন রমণী-জিহ্বার অলঙ্কার!” আমাদিগকে কেহ “নাকেস-উল্-আকেল” (বেআক্কল) এবং কেহ “যুক্তিজ্ঞানহীন” (unreasonable) বলিয়া থাকেন।” অর্থাৎ যুগের পর যুগ এমনভাবে নারীর বুদ্ধিকে দমিয়ে রাখা হয়েছে যে, সাধারণ যুক্তি-জ্ঞান দিয়ে সংসারে-সমাজে নিজেদের অবস্থানটুকু যাচাই করার ক্ষমতাও আর নারীর অবশিষ্ট ছিল না। নারীর অবনতির স্বরূপ-অন্বেষণে তিনি দোষী সাব্যস্ত করেছেন পুরুষ অর্থাৎ সমাজপতিদেরকেই- সংসারে নারী যদি ‘দাসী’ হয়, পুরুষ হচ্ছে ‘স্বামী’ অর্থাৎ প্রভু। তাই ব্যঙ্গ করে বলেছেন:
“দাসী” শব্দে অনেক শ্রীমতি আপত্তি করিতে পারেন। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, “স্বামী” শব্দের অর্থ কি? দানকর্তাকে “দাতা” বলিলে যেমন গ্রহণকর্তাকে “গ্রহীতা” বলিতেই হয়, সেইরূপ একজনকে “স্বামী, প্রভু, ঈশ্বর” বলিলে অপরকে “দাসী” না বলিয়া আর কি বলিতে পারেন? যদি বলেন স্ত্রী পতি-প্রেম-পাশে আবদ্ধ হওয়ায় তাঁহার সেবিকা হইয়াছেন, তবে ওরূপ সেবাব্রত গ্রহণে অবশ্য কাহারও আপত্তি হইতে পারে না। কিন্তু পুরুষও কি ঐরূপ পারিবারিক প্রেমে আবদ্ধ হইয়া তাহাদের প্রতিপালনরূপ সেবাব্রত গ্রহণ করেন নাই? … সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে “প্রেম-দাস” না বলিয়া স্বামী বলে কেন?
নারীর অবনতির স্বরূপ ব্যাখ্যায় তাদের দেহের “অলঙ্কার” নিয়েও কটাক্ষ করেছেন রোকেয়া। যদিও অলঙ্কার সৌন্দর্যের প্রতীক, একইসঙ্গে ঐশ্বর্যের তো বটেই। তবে সৌন্দর্য বর্ধন বা ঐশ্বর্যের ঘটা যাই বলা হোক না কেন অলঙ্কার কিন্তু নারীর দাসত্বেরও নিদর্শন। যেমন, পায়ের মল- বেড়ি; গলার হার- শেকল; চিক/গলাবন্ধ- ফড়মপড়ষষধৎ; নথ- নাকদড়ি ইত্যাদি। তাঁর ভাষায়:
বাস্তবিক অলঙ্কার দাসত্বের নিদর্শন ভিন্ন আর কিছুই নহে। যদি অলঙ্কারকে দাসত্বের নিদর্শন না ভাবিয়া সৌন্দর্য বর্ধনের উপায় মনে করা যায়, তাহাই কি কম নিন্দনীয়? সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টাও কি মানসিক দুর্বলতা নহে? পুরুষেরা ইহা পরাজয়ের নিদর্শন ভাবেন। তাঁহারা কোন বিষয়ে তর্ক করিতে গেলে বলেন, “আমার কথা প্রমাণিত করিতে না পারিলে আমি চুড়ি পরিব!”
এভাবে একদিকে যেমন নারীর অবনতিগুলোকে চিহ্নিত করেছেন তিনি, তেমনি তাদের উন্নতির প্রচেষ্টার কথাও বলেছেন। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা এবং সে শিক্ষাও হয় যেন প্রকৃত শিক্ষা। প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে তাই যা মানসিক শক্তি অর্জনে সাহায্য করে। শিক্ষা চিন্তার সূক্ষ¥তাকে বাড়ায়, সেই সূক্ষ্মতা দিয়েই নারী উপলব্ধি করতে পারবে যে, উন্নতির প্রচেষ্টা করাটা তাদের কর্তব্য। প্রবন্ধের শেষে নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার দিকটিও ব্যক্ত হয়েছে অত্যন্ত সুস্পষ্টতায়:
আবশ্যক হইলে আমরা লেডী-কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডী-ম্যাজিস্ট্রেট, লেডী-ব্যারিস্টার, লেডী-জজ- সবই হইব। … উপার্জন করিব না কেন? আমাদের কি হাত নাই, না পা নাই, না বুদ্ধি নাই? কি নাই? যে পরিশ্রম আমরা “স্বামী”র গৃহকার্যে ব্যয় করি, সেই পরিশ্রম দ্বারা কি স্বাধীন ব্যবসায় করিতে পারিব না?
শুধু এইটুকুই নয়, আজ থেকে শতশত বছর আগে এই “বঙ্গীয় মোসলেম সমাজে স্ত্রী-কবি, স্ত্রী-দার্শনিক, স্ত্রী-ঐতিহাসিক, স্ত্রী-বৈজ্ঞানিক, স্ত্রী-বক্তা, স্ত্রী-চিকিৎসক, স্ত্রী-রাজনীতিবিদ” প্রভৃতি “রমণীরতেœর” স্বপ্ন দেখে গেছেন তিনি। তাঁর সেই স্বপ্ন আজও অমর হয়ে আছে।
কেবল নারী-সমাজই নয় সমসাময়িক দেশ, মানুষ, সমস্যা, সংস্কার, ধর্ম, রাজনীতি সবকিছুই তাঁর লেখনীর অঙ্গীভূত করে নিয়েছিলেন রোকেয়া। সরাসরি অংশগ্রহণ না করলেও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, স্বাধীনতা আন্দোলন, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলন, চরকা আন্দোলন দেশের ওপর আছড়ে পড়া প্রভৃতি আন্দোলনের জোয়ার গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল তাঁকে। এ সব সম্পর্কে তিনি নিজে যেমন সচেতন ছিলেন, একইভাবে সচেতন করতে চেয়েছেন বাঙলার অবহেলিত মুসলমান নারী-সমাজকেও। মতিচূর প্রথম খণ্ডের অন্তর্ভুক্ত ‘সুগৃহিণী’ প্রবন্ধে তার বহিঃপ্রকাশ মেলে। সংসারে একজন গৃহিণীর নানাবিধ কর্তব্যের কথা লিখতে গিয়ে তিনি আরও লিখলেন:
আদর্শ গৃহিণীর প্রতিবেশিনীর বিপদকে নিজের বিপদ বলিয়া মনে করা উচিত। আর প্রতিবেশীর পরিধি বৃহৎ হওয়া চাই- অর্থাৎ প্রতিবেশী বলিলে যেন কেবল আমাদের দ্বারস্থিত গৃহস্থ না বুঝায়। বঙ্গদেশের প্রতিবেশী বলিতে পাঞ্জাব, অযোধ্যা, উড়িষ্যা- এ সবই যেন বুঝায়। হইতে পারে পাঞ্জাবের একজন ভদ্রলোক কোন কারখানায় কাজ করেন, সেই কারখানার কর্তৃপক্ষকে তাঁহারা বিশেষ কোন অভাবের বিষয় জানাইতে বারবার চেষ্টা করিয়া অকৃতকার্য হওয়ায় ধর্মঘট করিতে বাধ্য হইলেন। ঐ ধর্মঘটকে যেন উড়িষ্যা বা মাদ্রাজের লোকে নিজেদের কর্মপ্রাপ্তির সুযোগ ভাবিয়া আহ্লাদিত না হন। সুগৃহিণী আপন পতিপুত্রকে তাদৃশ ধর্মঘট স্থলে কার্যগ্রহণে বাধা দিবেন। আর স্মরণ রাখিতে হইবে, আমরা শুধু হিন্দু বা মুসলমান কিংবা পারসী বা খ্রিষ্টিয়ান অথবা বাঙ্গালী, মাদ্র্রাজী, মাড়ওয়ারী বা পাঞ্জাবী নহি- আমরা ভারতবাসী। আমরা সর্বপ্রথমে ভারতবাসী- তারপর মুসলমান, শিখ বা আর কিছু। সুগৃহিণী এই সত্য আপন পরিবার মধ্যে প্রচার করিবেন।
একটি দেশের উন্নতি কেবলমাত্র তার মাথার উন্নতি নয়, দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নতি। কলকারখানা স্থাপনে হয়ত শহরের উন্নতি ঘটেছে, কিন্তু কাঁচামাল সরবরাহ করে যে চাষি তাদের দুঃখ-কষ্ট-বঞ্চনা-দুর্দশার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে তাঁর প্রবন্ধে- ‘আল্লাহতালা এত অবিচার কিরূপে সহ্য করিতেছেন?’ ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে গভীর আক্ষেপের সঙ্গে এমন প্রশ্ন করেছেন রোকেয়া। যেখানে চাষিই সমাজের মেরুদণ্ড, সেখানে চাষির দৈন্য-দশা অতীতে যেমন ছিল বর্তমানেও রয়েছে। এখনও তাদের পান্তাভাতের সাথে লবণও ঠিকমত জোটে না, অর্ধানশনে থাকে, শীতে পাটখড়ি জ্বেলে আগুন পোহায়, বিচালী বিছিয়ে শয্যায় শয়ন করে, অশিক্ষা-কুসংস্কার তাদের নিত্যসঙ্গী। উন্নত সভ্যতার ফেরে চাষির সর্বস্বহারা হওয়ারও বর্ণনা দিয়েছেন তিনি, “বিলাসিতা ওরফে সভ্যতার সঙ্গে সঙ্গে ‘অনুকরণপ্রিয়তা’ নামক আর একটা ভূত তাহাদের স্কন্ধে চাপিয়া আছে। তাহাদের আর্থিক অবস্থা সামান্য একটু সচ্ছল হইলেই তাহারা প্রতিবেশী বড়লোকদের অনুকরণ করিয়া থাকে। তখন চাষার বৌ-ঝির যাতায়াতের জন্য সওয়ারী চাই; ধান ভানিবার জন্য ভারানী চাই ইত্যাদি।” বঙ্গীয় মুসলমান-সাহিত্য-পত্রিকা (বৈশাখ, ১৩২৮) সংখ্যায় প্রকাশিত হয় প্রবন্ধটি। একই পত্রিকায় প্রকাশিত তাঁর আরেকটি প্রবন্ধ ‘এন্ডি শিল্প’- এন্ডি গুটি আবাদের বর্ণনা করেছেন তিনি সেখানে, অনেক কম মূলধনে একসময় চাষিরা এই আবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। প্রধানত আসাম অঞ্চলে এবং রংপুর জেলায় এন্ডি আবাদের প্রচলন ছিল। রোকেয়ার আক্ষেপ “একসময় দরিদ্র চাষির স্ত্রীলোকেরাই এন্ডি পোকা পোষণ করিত, এন্ডি সুতা কাটিত এবং ইহার কাপড় ব্যবহার করিত।” অথচ সভ্যতা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই শিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। কেননা, “এখন আসাম হইতে গুটি বিদেশে রপ্তানি হয়, তথা হইতে কলে সুতা প্রস্তুত হইয়া পুনরায় আসামে আইসে। স্থানীয় তন্তুবায়গণ সেই সূত্রে বস্ত্র প্রস্তুত করে, পরে সেই “আসাম সিল্ক” কলিকাতার কোন কোন দোকানে বিক্রীত হয়।” অর্থাৎ আমরা হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলেছি। তিনি এই বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে, “দেশী শিল্প- বিশেষত নারী শিল্পসমূহের পুনরুদ্ধার প্রয়োজন। আসাম এবং রংপুরবাসিনী ললনাগণ এন্ডি পোকা প্রতিপালনে তৎপর হইলে সমগ্র বঙ্গদেশের বস্ত্র-ক্লেশ লাঘব হইবে।” গান্ধীজির স্বদেশী বা চরকা আন্দোলনে কিছুটা ভিন্নভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি, উপর্যুক্ত প্রবন্ধ দুটি তারই প্রমাণ। ধর্ম সম্পর্কে উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী ছিলেন রোকেয়া। তিনি ছিলেন সকল অর্থেই অসাম্প্রদায়িক। নিজ ধর্মের ওপরেও অসীম শ্রদ্ধা ছিল তাঁর। তবে ধর্মের নামে নারীর প্রতি অন্যায়াচরণের তীব্র প্রতিবাদ করেছেন তিনি, সে যে ধর্মই হোক না কেন। ‘মুনিদের বিধানে যে-কথা শুনিতে পান, কোন স্ত্রী-মুনির বিধানে হয়ত তাহার বিপরীত নিয়ম দেখিতে পাইতেন’- ধর্মীয় বিধান নিয়ে এমন নিষ্ঠুর সত্যের প্রকাশে বরাবরই অকুন্ঠ ছিলেন রোকেয়া।
জীবনের শেষদিন পর্যন্ত বিরুদ্ধ সময় ও প্রতিকূল পরিবেশের সাথে যুদ্ধ করে চলতে হয়েছে রোকেয়াকে। কেননা এক অবরুদ্ধ সমাজে নারীর সুযোগ্য স্থান নির্বাচনে তাঁর কলমে কম ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ আর কশাঘাতের বাণী ফোটাতে হয়নি। তাই সমালোচকেরাও ছেড়ে কথা বলেন নি তাঁকে। পাশাপাশি ছিল অসহযোগিতা। সাখাওয়াৎ মেমোরিয়াল গার্লস স্কুলের প্রতিষ্ঠা এবং একটি আদর্শ পূর্ণাঙ্গ বিদ্যালয় হিসেবে দাঁড় করানোটাই ছিল তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ের ব্রত। স্কুলটিতে বাংলা শাখা খোলা নিয়েও তাঁর প্রচেষ্টা ছিল সীমাহীন। সাহায্যের হাত-ও বাড়িয়ে দিয়েছিলেন কেউ-কেউ, কিন্তু তাঁর নিজের ত্যাগ আর পরিশ্রমের কাছে হয়ত কিছুই নয়। প্রখ্যাত নারী আন্দোলনকারী, কবি সরোজিনী নাইডু তাঁকে একটি পত্রে উৎসাহিত করে লিখেছিলেন, “মুসলমান বালিকাদের শিক্ষা দেবার জন্য প্রতিষ্ঠান গড়ে এবং তাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে-চলার কাজে আপনার নিষ্ঠা আপনার আত্মদানকে আমি কী গভীরভাবেই না শ্রদ্ধা করি।” এভাবেই নীরব আত্মদানে নিজেকে তিলতিল করে ক্ষয় করেছেন তিনি। রোকেয়ার ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে পাওয়া যায় তাঁর অসুস্থতা, একাকিত্ব, আত্মীয়দের কৃতঘœতা, ও প্রতারণার কথা। তবুও জীবনের শেষরাত্রিটি পর্যন্ত কলম থামান নি তিনি, স্কুলের ফাইল দেখেছেন আর টেবিলের ওপর রেখে গেছেন তাঁর সর্বশেষ অসমাপ্ত লেখাখানি। ‘নারীর অধিকার’ শিরোনামের সে লেখায় সমাজপতিদের প্রতি তাঁর সর্বশেষ প্রশ্ন ছিল, “আমাদের ধর্মমতে বিবাহ সম্পূর্ণ হয় পাত্র-পাত্রীর সম্মতি দ্বারা। তাই খোদা না করুক, বিচ্ছেদ যদি আসে, তবে সেটা আসবে উভয়ের সম্মতিক্রমে। কিন্তু এটা কেন হয় এক-তরফা, অর্থাৎ শুধু স্বামী দ্বারা?”
কাজেই নারীর প্রতি বৈষম্য-নির্যাতনের শেষ কোথায়? ১৯৩২ এর ৯ ডিসেম্বর মাত্র একান্ন বছর বয়সে চিরবিদায় নিয়েছেন তিনি, তবুও দাঁড়িয়ে আছেন অভঙ্গুর, আলোর প্রদীপ হাতে- আমাদের আত্মপ্রেরণার, আত্মশক্তির, আত্মনির্ভরশীলতার উৎস হিসেবে এখনও।