মহাকালের পথে সাহিত্যলোকে স্থান-কালের ব্যবধানে দুইজন সাহিত্যিকের মাঝে ভাবগত সম্পর্ক ও সাযুজ্য তুলনামূলক সাহিত্য অধ্যয়নে (ঈড়সঢ়ধৎধঃরাব খরঃবৎধঃঁৎব ঝঃঁফু) অন্বেষার বিষয়। এই সম্পর্ক স্থাপিত হয় সাহিত্যের স্বভাবের কারণেই। কালোত্তীর্ণ একজন কবির সৃজন-সম্পদের মাঝে এমন চিরন্তন উপাদান থাকে যা বেঁচে থাকে কালান্তরের প্রবাহে। বিশেষভাবে ক্লাসিক সাহিত্যে চিরকালীন ও সর্বজনীন ভাবধারা সকল কালের পাঠকদের তৃষ্ণা নিবারণ করে। একই সূত্রে কালিক, ভাষিক ও ভৌগোলিক দূরত্বে দুইজন কবির ভাব-সম্মিলন ঘটে। মহাকালের যাত্রায় একই ভাবান্দোলনের দুইজন পথিক কবির মাঝে অজান্তেই সাক্ষাৎ হয়ে যায়। বিশ^সাহিত্যে এমন সাহিত্যিক আন্তঃসম্পর্ক প্রচুর পরিমাণে ঘটে। কারণ মানবসত্তার মধ্যে চিরস্থায়ী বৃত্তি বা প্রবণতা সৃজনশীল মাধ্যমে প্রকাশ পায় সব যুগেই এবং সব ভাষাতেই।
বিশ্বসাহিত্যে কাল-ভাষা-স্থানের দুরাগত পার্থক্য সত্ত্বেও ভাবগত সাদৃশ্য উপলব্ধি করা সাহিত্যের পাঠক মাত্রেরই আগ্রহের বিষয়। বিশেষভাবে বাংলা ভাষার কোনো কবির সঙ্গে অন্য ভাষার ভাবসম্পদের অন্তর্গত মিল-বিন্যাস আমাদের অনুসন্ধিৎসার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) অধ্যাত্মচেতনার সাথে ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক যুগের কবিদের সাযুজ্য আছে; অন্যদিকে ইরানের মহাকবি হাফিজের (১৩২৬-১৩৯০) সঙ্গেও একটি অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বিরাজমান। যেমন-আমেরিকান কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান (১৮১৯-১৮৯২) এবং কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬); আইরিশ কবি ডাব্লিউ বি ইয়েটস (১৮৬৫-১৯৩৯) এবং জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৬); আমেরিকান কবি টিএস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫) এবং বিষ্ণু দে (১৯০৯-১৯৮২); স্প্যানিশ কবি গার্সিয়া লোরকা (১৮৯৯-১৯৩৬) এবং আবদুল মান্নান সৈয়দ (১৯৪৩-২০১০) প্রমুখের পারস্পরিক চিন্তা-ভাব-চেতনার আন্তঃসম্পর্কের তুলনামূলক পাঠ সাহিত্যে অত্যন্ত রসাস্বাদনের উপজীব্য।
রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজ দুই ভাষার কালগত ব্যবধানের দুইজন মহৎ কবি। ভৌগোলিক সীমারেখা, ভাষা, জাতি, গোষ্ঠীর মাঝে যে কবিসত্তা, কবিপ্রভিতা সীমায়িত নয় তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজ। পারস্য থেকে সুদূর ভারতবর্ষে সুদীর্ঘকালের ব্যবধানেও হাফিজের চর্চার এতোটুকু ভাটা পড়েনি। মহাকবি হাফিজ প্রায় ছয়শত বছর আগে যে গজল গেয়েছিলেন মনের মাধুরীতে সে রসাস্বাদনের অনুভূতি আজো চির অম্লান। মহাকালের চক্রের বাঁকে হাফিজের গভীর অনুরাগের স্পর্শে ¯গ্ধ হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন হাফিজের একনিষ্ঠ ভক্ত। নিজে কবি না হলেও তার ন্যায় হাফিজের ভক্ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। হাফিজপ্রীতি ছিল তার হৃদয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর হাফিজের এতটাই অনুরাগী ছিলেন যে, কখনো কখনো গভীর রাতে শয্যাত্যাগ করে হৃদয়ের আবেগে হাফিজের গজল আবৃত্তি করতেন। হাফিজের গজলের যে পঙ্ক্তি দুটি তার অধিক প্রিয় ছিল তা হলো-
কখনো মন প্রাণ হ’তে মোর প্রেম তোমারি যাবে না,
কখনো মোর স্মরণ হ’তে সে মাধুরী যাবে না।
প্রেম তোমারি এমনই মোর মন ও প্রাণে বিঁধেছে,
শির যাবে যাক, প্রাণ হ’তে মোর প্রেম তোমারি যাবে না।
(ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহঅনূদিত)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পিতৃদেবের হাফিজপ্রীতি সম্পর্কে বলেন, ‘বৈষ্ণব ধর্ম্মমত ও পদাবলী আমার পিতার হৃদয়কে অধিকার করে নাই সে আমি জানি। তাঁহার রসভোগের সখা ছিলেন হাফেজ। তিনি নিজে কাব্য রচনা করিতে পারেন নাই। তাঁহার সেই আকাক্সক্ষা মিটাইয়া ছিলেন হাফিজের গানে। উপনিষৎ তাঁহার ক্ষুধা মিটাইত আর হাফেজ তাঁহার তৃষ্ণা দূর করিয়াছিল।’
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সুফিদর্শন ও মহাকবি হাফিজের প্রতি ছিলেন গভীর অনুরাগী। হাফিজের গজল ছিল তার নিত্য সঙ্গী। এ ধরণী থেকে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বমুহূর্তেও হাফিজের গজল শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলে সুর-সমেত গজল তাকে শোনানো হয়। হাফিজের গজলের এ পঙ্ক্তিগুলো কর্ণকুহরে ঝংকৃত হবার মধ্য দিয়ে তিনি এ ধরণী থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করেন।
আমার সুখ্ মোর হারাম বিলকুল পথের মঞ্জিল্ পিয়ার মুল্কের
নকীব র্হদম হাঁকায়, হাম্দম্ পথিক! দূরপথ্ গাঁঠরী তুল্ ফের।
যদি ক’ন তোর সাগ্নিক ঐ র্পী মুসল্লায় র্ক শরাব-রঙ্গীন,
পথেই রথ্ যার অচিন্ নয় তার কোথায় পথ্-ঘাট খারাব সঙ্গীন্।
প্রসাদ চাস্? বাস্, গাফিল হোস্ নে’, হাফিজ র্হদম্ হাজির-মজলিস।
এ-সব তঞ্চ্ট ঝাক্কি-ঝঞ্ঝট্ ছোড়্ দে, তারপর পিয়ার খোঁজ নিস্।
(কাজী নজরুল ইসলাম অনূদিত)
পিতার প্রতি গভীর অনুরাগ ও পরিবারে হাফিজ চর্চা রবীন্দ্রনাথের শিশুমনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। মনের অজান্তেই পারসিক সুফিদর্শনের এক সুপ্ত বীজ অঙ্কুরিত হয় কবির হৃদয়ে। পরিণত বয়সে সে প্রভাবের ছাপ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে তার কাব্যচর্চায়। গীতাঞ্জলিতে এমনই ধারার কবিতার সন্ধান মিলে। খেয়া, গীতিমাল্য, গীতালিতে এর প্রভাব থাকলেও রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিই বক্ষ্যমাণ বিশ্লেষণের উপজীব্য। ১৯৩২ সালে পারস্য ভ্রমণকালে তার কবিমানসে এক ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। শৈশবে লালিত সুপ্ত অনুভূতি ঝংকৃত হয়ে ওঠে হৃদয়াঙ্গিনায়। আধ্যাত্মিক কল্পনায় যেন একাকার হয়ে যায় তার হৃদয়। আত্মিক সাক্ষাতে যেন হৃদয়ের অব্যক্ত কল্পনানুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ১৭ এপ্রিল পড়ন্ত বিকেলে শিরাজ নগরে মানবতার কবি শেখ সাদির সমাধিপ্রাঙ্গণে রবীন্দ্রনাথকে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ১৮ এপ্রিল প্রভাতে প্রেমের কবি হাফিজের মাজারে হাজির হলে সমাধিরক্ষক হাফিজের দিওয়ান এনে কবিকে খোলার অনুরোধ জানান। সুদীর্ঘকালব্যাপী মানুষের বিশ্বাস, হৃদয়ে যে কোনো ইচ্ছা পোষণ করে চোখ বুজে গ্রন্থটি খুললে যে গজলটি বের হবে তা থেকে ইচ্ছার সফলতা নির্ণয় হবে। কবি চোখ বুজে হাফিজের দিওয়ান খুলে একটি পাতায় হাত রাখেন। একটু আগে মাজারে প্রবেশের সময় গভর্নরের সাথে ধর্মান্ধতা নিয়ে কবির যে কথাবার্তা হচ্ছিল, মনে মনে সেটিই ভাবছিলেন তিনি। আর মনে মনে ইচ্ছা করলেন ধর্মনামধারী অন্ধতার প্রাণান্তিক ফাঁস থেকে ভারতবর্ষ যেন মুক্তি পায়। এসব ভাবতে ভাবতে রবীন্দ্রনাথ চোখ বুজে হাফিজের দিওয়ানে হাত রাখলে যে গজলটি বের হয় বাংলায় তার মর্মার্থ হলো:
মুকুটধারী রাজারা তোমার মনোমোহন চক্ষুর দাস,
তোমার কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত সুধায় জ্ঞানী এবং বুদ্ধিমানেরা অভিভূত।
স্বর্গদ্বার যাবে খুলে, আর খুলবে মোদের জটিল সব রহস্য দ্বার,
অহংকৃত ধার্মিক নামধারীদের জন্যে রুদ্ধ হলেও অবশেষে তা হবে উন্মুক্ত।’
(পারস্য যাত্রী)
হাফিজের মাজার পরিদর্শনকালে ইরানের পণ্ডিতদের প্রতিনিধি হিসেবে রবীন্দ্রনাথের সফরসঙ্গী ছিলেন ড. মোকতাদেরি। সমাধিপ্রাঙ্গণে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথের আবেগপূর্ণ যে দৃশ্য তিনি অবলোকন করেন তার ভাষ্যমতে সেটি বিস্মৃত হবার মতো নয়। কবির হৃদয়াবেগের চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের সাধক পুরুষদের তীর্থস্থান হাফিজের মাজারের পাশে রবীন্দ্রনাথ সম্মানের সাথে দাঁড়ালেন। তাকে হাফিজের কবিতা থেকে ভাগ্য পরীক্ষা করার প্রস্তাব করা হলো। ঠাকুর সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। হাফিজের দিওয়ান আনা হলো। ঠাকুর তার সফরকালীন সময়ের নিরাপত্তা প্রধান পুলিশ অফিসারের হাত থেকে হাফিজের দিওয়ান নিয়ে তাতে চুমু খেয়ে এবং চুখে-মুখে লাগিয়ে সেটি খুললেন। এসময় রবীন্দ্রনাথের অবস্থা প্রত্যক্ষ করে মনে হচ্ছিল তিনি যেন তার নিজের ভেতরে নেই, অন্য কোনো ভুবনে পরিভ্রমণ করছেন।’
রবীন্দ্রনাথ হাফিজের মাজারপ্রাঙ্গণ থেকে বেরিয়ে খলিল আবাদ উদ্যানে ফিরে এসে হাফিজের কবিতা সুর-সমেত শোনার বাসনা পোষণ করেন। ভাগ্য পরীক্ষার উদ্দেশে রবীন্দ্রনাথের স্পর্শে হাফিজের দিওয়ানের যে গজলের পাতা উন্মোচিত হয়েছিল বিখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী মোজাব কামানচে সেই গজলটিই সুর করে গান গেয়ে শোনান এবং রেজা খান এতে বেহালার সুর দেন। তখন রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে যে অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছিল সে অবস্থার বর্ণনা দিয়ে ড. মোকতাদেরি বলেন, ‘ঠাকুর এমনভাবে কান পেতেছিলেন মনে হচ্ছিল যেন মোহগ্রস্ত হয়ে গেছেন। সিদ্ধি লাভকারী ধ্যানমগ্ন ঋষির মতো নিমগ্ন ঠাকুরের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। তার প্রভাবশালী চোখ বেয়ে সাদা দাড়ির ওপর দিয়ে বৃষ্টিধারার মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। গজল শেষে যখন রেজা খানের জাদুকরী হাত থামল এবং বেহালাটা মাটিতে রাখলেন, রবীন্দ্রনাথ তখনও বিলাপ করছিলেন। অনেকক্ষণ পর তিনি উঠে বেশ কটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেন। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন। তার ভেতর এমন এক আধ্যাত্মিক অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল যা বর্ণনাতীত।’ রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে খলিল আবাদ উদ্যানের মালিক খলিলিকে হৃদয়ে অনুভূতি তুলে ধরে বলেন, ‘আমার সারা জীবনের কবিতা রচনাকালের অবস্থা একদিকে আর সিরাজের এই কাব্যচিন্তার ক্ষুদ্্র মুহূর্তটি একদিকে। জানি না কী আধ্যাত্মিক মাদকতা রয়েছে এই মাটিতে, যা আমার অন্তরকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে।’
রবীন্দ্রনাথের হৃদয়ে আবেগময় আবেশের মূলে রয়েছে হাফিজের সাথে তার দীর্ঘদিনের নিবিড় পরিচয়। হৃদয়াবেগের এক ঐশ্বরিক চেতনা। শৈশব থেকে যে অনুভূতিার ছাপ অঙ্কিত হয়েছিল হৃদয়ের গভীরে তারই যেন বাস্তব রূপায়ণ এ মাজারপ্রাঙ্গণ। এ পরিবেশের সাথে যেন আবেগমিশ্রিত রয়েছে যুগ যুগ ধরে। যুগ যুগান্তরে কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় হাফিজের মাজারপ্রাঙ্গণে এসে রবীন্দ্রনাথের মানসপটে যে আবেগানুভূতি সঞ্চারিত হয় কবিরপারস্যযাত্রী গ্রন্থে তা চিত্রায়িত হয় এভাবে-
এই সমাধির পাশে বসে আমার মনের মধ্যে একটা চমক এসে পৌঁছল, এখানকার এই বসন্তপ্রভাতে সূর্যের আলোতে দূরকালের বসন্তদিন থেকে কবির হাস্যোজ্জ্বল চোখের সংকেত। মনে হলো আমরা দুজনে একই পানশালার বন্ধু, অনেকবার নানা রসের অনেক পেয়ালা ভরতি করেছি। আমিও তো কতবার দেখেছি আচারনিষ্ঠ ধার্মিকদের কুটিল ভ্রƒকুটি। তাদের বচনজালে আমাকে বাঁধতে পারে নি; আমি পলাতক, ছুটি নিয়েছি অবাধপ্রবাহিত আনন্দের হাওয়ায়। নিশ্চিত মনে হল, আজ কত-শত বৎসর পরে জীবনমৃত্যুর ব্যবধান পেরিয়ে এই কবরের পাশে এমন একজন মুসাফির এসেছে যে মানুষ হাফিজের চিরকালের জানা লোক।
রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজের কবিতায়
অধ্যাত্মচেতনা
রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজের অধ্যাত্মচেতনা যেন অবিচ্ছেদ্য এক হৃদয়ানুভূতি। প্রেমের মূলসুরে রয়েছে গভীর আবেগের বহিঃপ্রকাশ। চিরন্তন প্রেমের চিত্র অঙ্কিত হয়ে ওঠে তাদের রচনায়। কবি হাফিজের দৃষ্টিতে প্রেমের মাঝে ডুবে যাওয়া হৃদয়ের কোনো মৃত্যু নেই, তা চিরন্তন। প্রেমের বন্ধনেই সৃজিত এ সৃষ্টিজগৎ। প্রকৃত প্রেমের সাগরে ডুবে যাওয়াই যেন সফলতার মাপকাঠি, স্থায়িত্বের নিদর্শন। প্রেমের তাগিদে জাগরিত হৃদয়ের কোনো মৃত্যু নেই। হাফিজের কাব্যে ঝংকৃত হয় এভাবে,
‘হিয়াটী যার প্রেম-জীবিত মরণ নাইকো তাহার
ভবের খাতায় অমর কোঠায় দেখ লিখন মোদের।’
(ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনূদিত)
রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে অধ্যাত্মপ্রেম এমন অনাদি এক জগৎ, যেখানে শুধুই হারিয়ে যাওয়া, নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। গভীর থেকে গভীরতর প্রেমাকুল আবেগ হৃদয়কে ব্যাকুল করে তোলে। পারস্য কবিদের সাথে যেন এ প্রেমানুভূতির গভীর সম্পর্ক। আত্তার, রুমি, হাফিজের অধ্যাত্মপ্রেমে হারিয়ে যাওয়ার মতো হৃদয়াবেগ যেন অনুরণিত হয় রবীন্দ্রনাথের কাব্যে। কবিতায় গভীর প্রেমের ভাবাবেগের এক ব্যঞ্জনাময় রূপের সন্ধান মিলে যে অনুভূতিতে ভাষিক, কালিক সীমা পরিসীমার কোনো স্থান খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেন,
‘আরো প্রেমে, আরো প্রেমে
মোর আমি ডুবে যাক নেমে।’
প্রেমের পথ কণ্টকাকীর্ণ। পুষ্প কানন নয়। প্রেমের পথে পরিভ্রমণ আনন্দময় হলেও পদে পদে রয়েছে বিড়ম্বনা, প্রতিকূলতা। প্রেমের তরে জীবন বিলিয়ে দিতে পিছপা হয় না প্রেমিক হৃদয়। পরমাত্মার সান্নিধ্যলাভের দুর্নিবার আকাক্সক্ষা মানুষকে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করতে উৎসাহী করে তোলে। পরমাত্মার আকর্ষণ এতটাই তীব্র ও প্রবল যে কোনো বাহ্যিক সঙ্কটমুহূর্ত এ যাত্রাপথে বাধার প্রাচীর হয়ে দাঁড়াতে পারে না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
‘শুধু এইটুকু জানি, তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে
চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর-পানে
ঝড়ঝঞ্ঝা-বজ্রপাতে জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে
অন্তর-প্রদীপখানি।’
হাফিজের দিওয়ানের প্রথম গজলের মূলসুর কাঁটাযুক্ত প্রেমময় অনুভূতির ব্যঞ্জনাময় অবতারণা। প্রেমের পথে নানা বাধাবিপত্তি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কেউ তা উপেক্ষা করতে পারে না। অধ্যাত্মপ্রেমের আত্মিক শক্তি অনেক প্রবল, অপ্রতিরোধ্য। কোনো বাধা তা গতিরুদ্ধ করতে পারে না। চিরন্তন প্রেমের টানে শত প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিবেশ অতিক্রম করে পৌঁছে যায় পরম সত্তার সান্নিধ্যে। এ লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার ক্ষেত্রে শত বাধাবিপত্তি অতিক্রমের চিত্র কাব্যিক ব্যঞ্জনা ও রূপকের মাধ্যমে ফুটে ওঠে। হাফিজের কবিতায় এ দুর্গম, বিপদসঙ্কুল পথের বর্ণনা রয়েছে এভাবে,
‘অন্ধকার রাত, ঊর্মি-সংঘাত, ঘূর্ণাবর্তও তুমুল গর্জে,
বেলায় বাস্ যার বুঝ্বে ছাই তার পথের ক্লেশ মোর সমুন্দর যে।
তামাম মোর কাম্ শুধুই বদ্নাম, নিজের দোষ্ ভাই নিজের দোষ্ সে,
গোপন্ র্দু ছাই রয় কি নাম্ তার রাজ-সভায় যার চর্চা জোর-সে।’
(কাজী নজরুল ইসলাম অনূদিত)
গীতাঞ্জলিতে কবির আধ্যাত্মিক সাধনার বৈচিত্র্যময় অনুভূতির সন্ধান মিলে। অহংকার, আত্মপ্রচার ও স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে দুঃখের অনলে দগ্ধীভূত হবার চিত্র ফুটে ওঠে। মানবাত্মাকে পরমাত্মার দিকে ধাবিত করার তীব্র বাসনার সার্থক প্রয়াস রয়েছে কবিতার ছন্দে ছন্দে। এ জাতীয় কবিতার মধ্যে উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘আমার মাথা নত করে দাও’, ‘আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই’, ‘বিপদের মোরে রক্ষা করো’, অন্তর মম বিকশিত করো’, ‘ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়’, ‘দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও’, ‘এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে’, ‘নামাও নামাও আমায় তোমার চরণতলে’, ‘মেনেছি, হার মেনেছি’, ‘তোমার প্রেম যে বইতে পারি’, ‘দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন ধুতে’, ‘ধায় যেন মোর সকল ভালোবাসা’, ‘তারা তোমার নামে বাটের মাঝে মাশুল লয় যে ধরি’, ‘ছিন্ন করে লও হে মোরে’, ‘একা আমি ফিরব না আর এমন করে’, ইত্যাকার কবিতায় প্রকৃত কাব্যরসের চেয়ে আধ্যাত্মচেতনার অনুভূতি চিরঅম্লান।
রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলিতে অসীম ও সসীমের, মানব ও পরমাত্মার মিলনের দুর্নিবার ভাবনা চলমান, গতিশীল। মানব ও প্রকৃতির নান্দনিকতায় কাক্সিক্ষত প্রেমাস্পদের মিলনের অভিসার সূচিত হয়েছে যুগ যুগ ধরে। সৃষ্টির সাথে ¯্রষ্টার অনন্ত প্রেমশক্তি অবিচ্ছেদ্য। সৃষ্টির মধ্য দিয়েই ¯্রষ্টার রূপসৌন্দর্য অঙ্কিত হয়েছে। সমীম ও অসীমের এ মিলন ও প্রেমানুভূতি কোনো বিশ্লেষণে সীমায়িত করা সম্ভব নয়। যা শুধুই উপলব্ধির, অনুভবের হৃদয়কে উৎসর্গ করে দেওয়ার। বাইরে থেকে তা সহজেই অনুমেয় নয়। ফারসি সুফিকবি জালাল উদ্দিন রুমির বাঁশরি ও হাফিজের কাব্যদর্শনে সুরও যেন ঝংকৃত হয়ে ওঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্মে। মানবের সীমাবদ্ধ জীবনের মধ্যে অসীম তাঁর ব্যাকুল বাঁশরী বাজিয়েছেন। বিচিত্র বর্ণ, গন্ধ, গানে সেই অপরূপের সংস্পর্শে মানবজীবন হয়ে উঠেছে ধন্য। মানবজীবনের ভাব, চিন্তা, অনুভূতি, কার্যের এক বিস্তৃত অংশ জড়ে রয়েছে অসীম ও সসীমের মিলনের বিচিত্র রূপ। ¯্রষ্টার অব্যক্ত আশা-আকাক্সক্ষা, সুপ্ত বাসনা যেন মানবের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে রূপায়িত হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
‘সীমার মাঝে, অসীম, তুমি বাজাও আপন সুর-
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ তাই এত মধুর॥
কত বর্ণে কত গন্ধে কত গানে কত ছন্দে,
অপরূপ, তোমার রূপের লীলায় জাগে হৃদয়পুর।
আমার মধ্যে তোমার শোভা এমন সুমধুর।’
কবি হাফিজের কবিতায়ও যেন পরম সত্তার প্রেমের ফল্গুধারা ঝড়ে পড়ে। কবির দৃষ্টিতে প্রেম-ভালোবাসা এমন এক ঐশ্বরিক চেতনা যা মানুষকে তার প্রেমের মূলে তথা পরমাত্মার দিকে ধাবিত করে। সে আকর্ষণ তাকে প্রতিনিয়ত টেনে নিয়ে যায় পরম এক অনুভূতিতে। সৃষ্টিজগতের সবই তার কাছে হয়ে ওঠে মধুর, আনন্দময়। হাফিজের কবিতা দেশ, কাল, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ওঠে এক অনাবিল প্রেমের আবহ সৃষ্টি করে। কাব্যের ছন্দের তালে তালে যেন আকাশ থেকে তারকারাজি নিক্ষিপ্ত হয়। বাংলা, শিরাজ ও সমরকন্দের প্রেমপিয়াসী হৃদয়ের তরে ঝংকৃত হয় হাফিজের কবিতার সুর অপরূপ মহিমায়। কবি হাফিজের ভাষায়:
আজকে পাঠাই বাংলায় যে ইরানের এই ইক্ষু-শাখা
এতেই হবে ভারতের সব তোতার ”ঞ্চু মিষ্টিমাখা। *
অন্যত্র কবি বলেন,
শিরাজি হাফিজের কবিতার ছন্দের তালে গাইছে ও নৃত্য করছে
কাশ্মীরের কৃষ্ণনয়না এবং সমরকন্দের তুর্কি নারীরা। *
একেশ্বরবাদী চিন্তা-দর্শনে বিশ্বাসী কবি রবীন্দ্রনাথ নিজেকে ঐশ্বরিক ক্ষমতার পদতলে নিজেকে সঁপে দেন একান্তভাবে। বৈষয়িক অহমিকা, পার্থিব চাওয়া পাওয়া থেকে মুক্ত থাকতে চান বারবার। শত সংকট, প্রতিকূলতা যেন পরমসত্তার যোগ্য করে গড়ে তোলে। পরম সত্তার সৃষ্টি রহস্যের প্রেমময় স্বরূপ চিত্রিত হয় তার কাব্যের ব্যঞ্জনায়। এ সুপ্ত বাসনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে কবিতার ছন্দে ছন্দে। কবির ভাষায়,
‘আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধুলার তলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
নিজেকে করিতে গৌরব দান নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া ঘুরে মরি পলে পলে।
সকল অহঙ্কার হে আমার ডুবাও চোখের জলে॥
আমারে না যেন করি প্রচার আমার আপন কাজে
তোমারি ইচ্ছা করো হে পূর্ণ আমার জীবনমাঝে।’
কবি হাফিজও নিজেকে ¯্রষ্টার সমীপে সঁপে দেন নিবিড়ভাবে। নিজেকে পরম সত্তার একান্ত অনুগত হিসেবে তুলে ধরেন। সব অহঙ্কার, লোভ-লালসা ও পার্থিব ঐশ্বর্য জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি। এমনকি তার দাসত্বের অনুভূতিতে জীবনের সার্থকতা খুঁজে পান। একই ধারায় চিন্তাদর্শনের চিত্র অঙ্কিত হয় হাফিজের গজলে। কবি বলেন,
‘ধর্মের মেঘ হ’তে প্রভু! বৃষ্টিধারা দাও আমায়,
ঘুরব না আর ধূলির মত ইতস্তত ঝড় হাওয়ায়।
তোমার প্রেমের শপথ যদি ডাক’ বারেক দাস ব’লে,
উভয় লোকের শাহী খেয়াল শির হ’তে মোর যায় চ’লে।’
(ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনূদিত)
আধ্যাত্মিক পথচলা যেন শেষ হবার নয়। নব নব আঙ্গিক, রূপ, অবয়বে তা এগিয়ে যায় সম্মুখপানে। ফারসি সুফিকবি আত্তারের মানতেকুত তায়েরে (পাখির ভাষ্য) আধ্যাত্মিক সাধনা, রুমির মসনবির অন্তহীন বাসনা, হাফিজের দিওয়ানে ¯্রষ্টার সান্নিধ্যে উপনীত হবার লক্ষ্যে দুর্নিবার সংগ্রামের পরিচয় মেলে। রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মচেতনাসমৃদ্ধ কবিতায়ও ভিন্ন মাত্রায় সে সাধনার চিত্র দৃশ্যমান। ভাষা, অনুভূতি ভিন্নতর হলেও চিন্তাদর্শনে এক গভীর সাযুজ্যতা পরিচয় মিলে। নব নব পথে-প্রান্তরে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে পরিভ্রমণের বাসনা হৃদয়কে আন্দোলিত করে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়,
‘তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর,
যবে আমার জনম হবে ভোর।
চলে যাব নবজীবনলোকে,
নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে,
নবীন হয়ে নতুন সে আলোকে
পরব তখন নবমিলন-ডোর।
তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মোর।’
সৃষ্টিজগতের প্রকৃত রহস্য অনুসন্ধান এক আধ্যাত্মিক বাসনা। ¯্রষ্টাকে খোঁজা, সৃষ্টির রহস্য উদ্ঘাটনের প্রচেষ্টা অনাদিকাল থেকে চলে আসছে। যুগে যুগে কবিসাহিত্যিকের রচনায় তা চিত্রিত হয় নব নব আঙ্গিকে, অবয়বে, অনুভূতিতে। কবি হাফিজের কবিতায়ও এ পৃথিবীতে মানুষের আগমনের রহস্য, সৃষ্টিজগতের অন্তর্নিহিত রহস্য অনুসন্ধানের দুর্নিবার আকাক্সক্ষা বিরাজমান। পাখির ন্যায় উড্ডয়নের তীব্র বাসনা হৃদয়ে ধারণ করে এগিয়ে যান সামনের দিকে দিগন্ত পানে। সে অনুভূতিই ব্যক্ত হয় হাফিজের কবিতায়:
গায়ক পাখী আমার খাঁচা নয় কখনও আবাস,
উড়্ব স্বরগ- ফুল বাগানে মোর যেখানে আগার।
কেন এলে, কোথা ছিলেম, খুল্ল না কো এ ভেদ,
নিজের কাজে রইনু অলস, জীবন গেল বেকার।
(ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনূদিত)
তেহরানে রবীন্দ্রনাথের সংবর্ধনা
মহাকবি হাফিজের জন্মভূমি শিরাজ নগরে রবীন্দ্রনাথের সাতদিন অতিবাহিত হয়। ১৯৩২ সালে ২ মে কবি পারস্য-শাহর সাক্ষাতে মিলিত হন। পারস্যস¤্রাট রেজা শাহ্ পাহলভির রাজপ্রাসাদের খাসকামরায় কবি প্রায় একঘণ্টা অন্তরঙ্গ আলাপ করেন। কবির ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে ২ মে পারস্য স¤্রাটের আদেশে বাগ-এ-নিরুদ্দৌলায় দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়। কবিকে হাজার হাজার লোকের অভিবাদন, অভিনন্দন, টেলিগ্রাম, পুষ্পস্তবক ও উপহার এবং পারস্যরাজের পক্ষ থেকে বিজ্ঞান-সাহিত্যের প্রথম শ্রেণির রাজকীয় পদক ও সনদ প্রদান করা হয়। পারস্যের বিখ্যাত কবি আল্লামা আলী আকবর দেহখোদা এবং শাহ্র সভাকবি মালিকুশ শোআরা বাহার কবিকে শ্রদ্ধা জানিয়ে কবিতা রচনা করেন। বাহার হাদিয়ে তাগুর (ঠাকুরের প্রতি উপহার) শিরোনামে যে কবিতা নিবেদন করেন তার কয়েকটি পঙ্ক্তির ভাবার্থ নিম্নরূপ:
অনন্ত এক খোদার হাত
আদিকালেই সৃষ্টি করেছে এক বীণা
হুরের অলকে তৈরি তার রেশমি বুনন
তার গায়ে দিয়েছে আলোর ছন্দময় আবরণ
তার সঙ্গীত পথহারাদের পথের দিশা
অসহায়দের উপায়, শোকগাঁথা অমানিশা
বলা হয়, যদি এই বীণা বাজাত কেউ সঠিক
হৃদ্যতার হত বৃদ্ধি আর অত্যাচার পেত হ্রাস
এই ঠাকুর, তোমার হাতে যেই বীণা
শুরুতে অন্যদের হাতেও ছিল এই বীণার বাঁশরি
কেউই সেই বীণা বাজায়নি ঠিক-সঠিক
সবাই বাজিয়েছে তা তাদেরই সম্প্রদায়ের পছন্দে
কিন্তু তুমিই বাজিয়েছ ভালো এই বীণা
খোদায়ী সেই সুর তুলেছ তাতে
যার অন্তরে খোদার আলোর বিচ্ছুরণ
সেই পায় দুই ভুবনের ক্ষমতা অনন্ত
এই, তোমার বাণী ঈশ্বরের দরবার
বাহারের কাছ থেকে নাও তুমি ইরানের উপহার।
(আব্দুস সবুর খান অনূদিত)
কবি হাফিজকে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ্ বাংলায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দীর্ঘ সফরে আসতে না পারলেও তিনি জবাবে মিষ্টিগজল পাঠিয়েছিলেন। কবিগুরুকে বার্ধক্যসহ কোনো প্রতিকূলতা পারস্য সফরবিমুখ করতে পারেনি। কবি পারস্যবাসীর অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ইংরেজি অনুবাদ সমেত একটি কবিতা তাদের উপহার দেন। কবির কণ্ঠে ঝংকৃত হয়:
ইরান, তোমার যত বুলবুল,
তোমার কাননে যত আছে ফুল
বিদেশী কবির জন্মদিনের মানি
শুনালো তাহারে অভিনন্দনবাণী।
ইরান, তোমার বীর সন্তান
প্রণয়-অর্ঘ্য করিয়াছে দান
আজি এ বিদেশী কবির জন্মদিনে,
আপনার বলি নিয়েছে তাহারে চিনে।
ইরান, তোমার সম্মানমালে
নবগৌরব বহি নিজ ভালে
সার্থক হল কবির জন্মদিন।
চিরকাল তারি স্বীকার করিয়া ঋণ
তোমার ললাটে পরানু এ মোর শ্লোক-
ইরানের জয় হোক।
(পারস্য যাত্রী)
রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজ যুগ যুগান্তর ব্যবধানে দুই মহান কবিমানস। কালিক, ভাষিক ও ভৌগোলিক রেখা পেরিয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায়। চিরন্তন প্রেমের এক অপরূপ মিলন ঘটেছে তাদের কবিতায়। আধ্যাত্মিকতার এক নিবিড় সম্পর্ক একাকার করে দিয়েছে। পরমাত্মার সান্নিধ্যে উপনীত হবার দুুর্নিবার আকাক্সক্ষা ব্যাকুল করে তোলে হৃদয়-মনকে। ¯্রষ্টার রূপের যেন বিচ্ছুরণ ঘটেছে কবিদের সৃষ্টিকর্মে। বাংলা ও ফারসি ভাষার দুই মহান কবি অমর হয়ে আছেন তাদের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মে। মহাকালের ব্যবধানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাকবি হাফিজের সমাধিপ্রাঙ্গণে উপনীত হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন কোনো এক ঐশ্বরিক বন্ধনে। কবিরা যেন কোনো কালে একই সঙ্গে পানপাত্র হাতে নিয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। শৈশবে লালিত চিন্তার এক বাস্তব রূপায়ণ ছিল হাফিজের সমাধিপ্রাঙ্গণ। হাফিজের দিওয়ান থেকেও হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতির সন্ধান লাভে অভিভূত হয়ে পড়েন কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবির জন্মদিনকে ঘিরে তেহরানে আয়োজিত রাজকীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও কবিহৃদয়কে আন্দোলিত করে। বাংলার সুলতান শুধু কবি হাফিজকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন কিন্তু কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ইরানি জাতিকে স্বীয় কবিতার পরশে সিক্ত করে তোলেন। রবীন্দ্রনাথ ও হাফিজের এ আত্মিক সম্পর্ক যেন অবিচ্ছেদ্য, অনাদিকালের এক অনুরাগের মিলন। চিরন্তন প্রেমের এ ফল্গুধারায় যুগ যুগ ধরে আলোড়িত হয়ে আসছে সাহিত্যপিয়াসী মানুষের হৃদয়, মনন ও চেতনা।