
‘বিদ্রোহী’ কবি কাজী নজরুল ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা। এই কবিতা শুধু বাংলা সাহিত্যেই নয় বরং বিশ্বসাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ। এ কবিতার মূল লক্ষ্য নির্যাতিত মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রামমুখর। এই কবিতাকে উপভোগ্য করার জন্য শুধু প্রকরণগত দিকই নয় বরং অন্যান্য অনুষঙ্গও আলঙ্করিক ও আধুনিক করা হয়েছে। এ কাজটি স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এ কবিতায় ঘটে গেছে- যে জন্য এটি এখনও পাঠক প্রিয় নন্দিত, অমর। মানব মুক্তির সংগ্রামকে বেগবান করার জন্য এ কবিতাটি স্বাভাবিকভাবেই তীব্র গতিশীল, বেগবান, বিজ্ঞান ব্যঞ্জনাময়। এ কবিতার শুরু হয়েছে বৈজ্ঞানিক তথ্য সমৃদ্ধ উপাদানে প্রথম স্তবকেই রয়েছে মহা বিশ্বকে অতিক্রম করার তীব্র গতিশীলতার দুঃসাহসিকতা। উদ্ধৃতি:
বল বীর-
বল উন্নত মম শির।
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির।
বল বীর-
বল মহা বিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রীর
দীর্ঘ এ কবিতায় বিভিন্ন বক্তব্যকে গতিশীল-চির আধুনিক করার জন্য কবি যেমন অলঙ্কার এবং চিত্রকল্পকে ব্যবহার করেছেন তদ্রুপ বিজ্ঞানময় চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক তথ্য সমৃদ্ধ পঙক্তি সৃষ্টি করেছেন। এই বৈজ্ঞানিক চিৎ-প্রকর্ষময় পঙক্তি রীতিমত বিস্ময়কর। এ কবিতায় ব্যবহৃত বিজ্ঞানময় পঙক্তিসমূহ নিম্নরূপ:
শির নেহারি আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
মহা প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন আমি ধ্বংস
আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষানে ওঙ্কার
আমি ইস্রফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার
আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব-নাদ প্রচণ্ড
আমি বসুধা বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি বাড়ব বহ্নি কালানল
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি পাথার কলরোল কল-কোলাহল
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া স্বর্গ-মর্ত করতলে
তাজি বোররাক আর উচ্চৈশ্রবা বাহন আমার হিম্মৎ হ্রেষা হেকে চলে
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল- বৈশাখীর
আমি ঝঞ্জা, আমি ঘূর্ণি,
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,
আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ
আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি ছমকি
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি
ফিং দিয়া দেই তিন দোল
আমি চপলা চপল হিন্দোল
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল
আমি উচ্ছল জল ছল ছল চল-উর্মির হিন্দোল দোল
আমি তরীয়ানন্দে ছুটে চলি, একি উন্মাদ, আমি উন্মাদ
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত
উদ্ধৃতিসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কবি এখানে পর্বতারোহণের শ্রেষ্ঠত্ব, মহাকাশ ভ্রমণ ও মহাকাশ জয় তীব্র গতিশীলতা, পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ পর্যবেক্ষণ ও মহাপ্রলয়, মহাধ্বংস বা কেয়ামত প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।
ক. পর্বতারোহণের শ্রেষ্ঠত্ব:
শির নেহারি আমারি নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির। এ কাব্যময় পঙক্তিতে কবি একটি সত্য উচ্চারণ করেছেন। আর তা হলÑ নত-শির শিখর ঐ হিমাদ্রি হিমাচল, হিমালয় পর্বত, তার শির বা তার মাথাকেই কেবল তিনি দেখেছেন পর্বত শিখর দেশে। অর্থাৎ পর্বত শিখর হিমাদ্রি তার পদতলে। ১৯২০-২২ সালে লিখিত ও প্রকাশিত এই কবিতার পূর্বে কোন মানব সন্তান পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত শিখরে আরোহণ করেননি। কবির এ পঙক্তি রচনার অনেক পরেই অনেকেই পর্বত শিখরসমূহে পদপাত করেছেন। কবির এ ঘোষণাই পর্বতারোহণ পূর্ব ঘোষণা প্রথম ঘোষণা। তবে এ কথা ঠিক নজরুলের এ ঘোষণা মূলত ১৪০০ বছর পূর্বে মহা মানব হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর হেরা পর্বত গুহায় ধ্যান করার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কারণ হেরা গুহাটি মক্কার সুউচ্চ প্রায় সাড়ে ৩ কিলোমিটার উচ্চের হেরা পর্বত চূড়ায় অবস্থিত ছিল। মহানবী মহা মানব হজরত মুহম্মদ (সা.) প্রায় ১০ বছর যাবৎ ঐ পর্বত চূড়ায় বসে ধ্যান করেছেন। এখানেই কুরআনের প্রথম বাণী তাঁর ওপর নাজিল হয়। কোন মানুষের প্রথম পর্বত শিখর আরোহণ ঘটনা এটিই।

খ. মহাকাশ ভ্রমণ ও মহাকাশ জয়:
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাঁড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
উঠিয়াছি চির বিস্ময় আমি বিশ্ব বিধাত্রির।
এই স্তবকে কবি মহাবিশ্ব, মহাকাশ, চন্দ্র, সূর্য গ্রহ তারা, পৃথিবী, আকাশ সমূহ, যাবতীয় গোলকময় সৃষ্টি- যা এই মহা বিশ্বের অন্তর্গত এসবকে অতিক্রম করার কথা বলেছেন। মহা বিশ্বের এবং মহাকাশের যাবতীয় সৃষ্টিকে অতিক্রম করে মহা স্রষ্টা খোদার আরশ আজিমে উপস্থিত হওয়ার বিস্ময়কর তথ্য প্রদান করেছেন। এটা তার পক্ষে সম্ভব তা যতই বিস্ময়কর চির বিস্ময়ের হোক না কেন কারণ তিনি স্রষ্টার একান্ত আপনজন তিনি বিশ্ববিধাত্রীর নির্বাচিত সত্তা।
মহাবিশ্ব বা Universe, মহাকাশ বা আকাশসমূহ মহাবিজ্ঞানী স্রষ্টার বিজ্ঞানময় পরিকল্পনা বা ইচ্ছা শক্তিতে সৃষ্টি হয়েছে। মহাবিশ্ব বা ইউনিভার্স কেবল আমাদের পৃথিবী নয় বরং আরও অনেক পৃথিবী আরও অনেক গ্রহ নক্ষত্র ও উল্কাপিণ্ডের সমন্বয়ে আরও অনেক আকাশের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে।
মূলত মহাবিশ্ব অসংখ্য গ্যালাক্সি সমৃদ্ধ মহাজগৎ। মহাবিশ্বের আকার আয়তন সীমা পরিসীমা এখনও অনেক অজানা রয়েছে। ধারণা করা হয় গ্যালাক্সিসমূহ মহাবিশ্বে সমভাবে বিন্যস্ত রয়েছে অর্থাৎ গ্যালাক্সিসমূহ সর্বদিকে সমভাবে বিন্যস্ত যার কোন প্রান্ত সীমা নেই- নেই কোন সমকেন্দ্র। আমাদের নিকট মহাকাশে প্রায় শতকোটি গ্যালাক্সি রয়েছে। এসব গ্যালাক্সির প্রত্যেকটিতে গ্রহ, নক্ষত্র, উপগ্রহ, সূর্য, চন্দ্র, ধূমকেতু, গ্রহাণু, সুপার নোভাসহ আরও অসংখ্য বস্তুময় সৃষ্টি রয়েছে। বিশ শতকের গবেষণায় দেখা যায় এই মহাবিশ্ব সেই প্রথম থেকে সৃষ্টি হয়ে এখনও ক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। পৃথিবীর কোন নির্দিষ্ট স্থান থেকে কোন নির্দিষ্ট সময়ে দৃশ্যমান মহাবিশ্বের প্রান্তসীমার দূরত্ব ৪৬ বিলিয়ন আলোকবর্ষ। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের আলো ১৩ড়৮ বিলিয়ন আলোকবর্ষ গতিতে পৃথিবীতে আগমন করছে কিন্তু দৃশ্যমান মহাবিশ্ব ও পৃথিবী পরস্পর দ্রুতবেগে দূরে সরে যাচ্ছে ফলে আলো আর পৃথিবীকে স্পর্শ করতে পারে না।
একটি গ্যালাক্সির ডায়ামিটার ৩০,০০০ আলোকবর্ষ বা লাইট ইয়ার এবং দুটি নিটকম গ্যালাক্সির দূরত্ব ৩ মিলিয়ন আলোকবর্ষ। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের কোন স্পেস বা স্থান আমাদের কাছে দৃশ্যমান হয় না। এজন্য যে মহাবিশ্ব ক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। এরা স্থির নয়- দূরে সরে যাচ্ছে।
অত্যন্ত বিস্ময়কর এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি বৈচিত্র্য। মহাবিশ্ব ডার্ক মেটার ডার্ক এনার্জি ও সাধারণ বস্তু সমন্বয়ে গঠিত। মহাবিশ্বের ৮৪.৫% ডার্ক মেটার যার ঘনত্ব ২৬.৮%। মহাবিশ্বের অন্য বস্তুসমূহ ১৫.৫%- যার মধ্যে অণু-পরমাণু, গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সিসমূহ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পাওয়া যায় ৪.৯%- যার মধ্যে দৃশ্যমান বস্তুসমূহে রয়েছে। ডার্ক মেটারের অর্থাৎ মহাবিশ্বের ৮৪.৫% অজানা রযেছে কারণ এর মাত্র ২৬.৮% এর প্রকৃতি জানা সম্ভব হয়।
ডার্ক এনার্জি হচ্ছে এক আশ্চর্যজনক শক্তি যা শূন্য স্থানের বা মহাবিশ্বের ক্রম সম্প্রসারণে বিরাট ভূমিকা রাখে।
মহাবিশ্বের এই বস্তুসমূহ, ডার্ক মেটার, ডার্ক এনার্জি একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব স্কেলে সজ্জিত রয়েছে। এই দূরত্ব স্কেল হচ্ছে ৩০০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ বা তার ঊর্ধ্বের।
দৃশ্যযোগ্য মহাবিশ্বে আনুমানিক ৩০০ সেক্সটিলিয়ন (3×1023), stars নক্ষত্র এবং ১০০ বিলিয়ন (১০১১) এর অধিক গ্যালাক্সি রয়েছে।
কবি মহাবিশ্ব এবং মহাকাশ ভেদ করেছেন অর্থাৎ মহাবিশ্ব এবং মহাকাশের বস্তুনিচয় অতিক্রম করে আরও ঊর্ধ্বে মহা মহাবিশ্ব বা Multivess এর উপরে স্রষ্টার আসনে উপনীত হয়েছেন- এ কথা প্রকাশ করেছেন। মানুষ মাত্র চন্দপৃষ্ঠে অবতরণ করেছে- মঙ্গলে অভিযাত্রা শুরু করেছে কিন্তু তার পক্ষে মহাবিশ্ব কি অতিক্রম করা সম্ভব? এর উত্তরে বলা যায় আজ না হলেও কাল বা অনাগত মহাকালে কোন মানুষ, মহাবৈজ্ঞানিকের উদ্ভাবিত তত্ত্বের প্রয়োগে নভোযানের মাধ্যমে হয়তো মহাবিশ্বের ওপারে উপনীত হওয়া যাবে।
মহা স্রষ্টা তিনি সর্বত্র বিরাজমান- তার আসল সর্বত্র তবে মহাবিশ্বের ওপরে তার আরশ বা নির্দিষ্ট অবস্থান রয়েছে- যেখানে মহামানব, মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) মিরাজের মাধ্যমে গমন করেছেন এবং স্রষ্টার সাথে তার অবস্থান ঘটেছে। মহানবী, মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা.) যে মুহূর্তে খোদার আরশে হাজির হয়েছেন সে মুহূর্তেই মানবতার মহাবিজয় ঘটেছে। আর কারও পক্ষে খোদার আরশে উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলেও আমাদের কবি মহানবী মহামানব হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর খাঁটি উম্মত হিসাবে খোদার দিদারে অভিষিক্ত হয়েই এ কথা বলেছেন।
গ. তীব্র গতিশীলতা বা গতিময়তা:
এ কবিতার আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সংগ্রামকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য আন্দোলনের তীব্রতা গতিশীলতা ও ভয়ঙ্করতা দান করা। এ লক্ষ্যে যে সব চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন তাতে গতিবিদ্যার বিভিন্ন গতিময়তার উল্লেখ করেছেন এ ক্ষেত্রে, গতি বা Speed ত্বরণ বা Acceleration মন্দন বা Retardation, ঘূর্ণন গতি, চক্রগতি, তরঙ্গগতি প্রভৃতির উল্লেখ করা যায়।
উদ্ধৃতি সমূহ:
আমি তড়িতে চড়িয়া উড়ে চলি জোর তুড়ি দিয়া দিয়া লম্ফ
ছুটি ঝড়ের মতন করতালি দিয়া স্বর্গ মর্ত্য করতলে
তাজি বোররাক আর উচ্চৈশ্রবা বাহন আমার হিম্মত হেষ্রা হেঁকে চলে
আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল বৈশাখীর
আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি
আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চূর্ণি
আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ
আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ!
আমি চল চঞ্চল, ঠমকি ছমকি
পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি
ফিং দিয়া দেই তিনদোল।
আমি প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস, আমি বারিধির মহা কল্লোল
আমি উচ্ছল জল ছল ছল চল উর্মির হিন্দোল দোল
আমি তুরীয়ানন্দে ছুটে চলি, একি উন্মাদ, আমি উন্মাদ
আমি তাথিয়া তাথিয়া মথিয়া ফিরি এ স্বর্গ পাতাল মর্ত
উপরের ১ নং উদ্ধৃতিতে তীব্র গতিশীলতা, ২ নং উদ্ধৃতিতে জটিল গতিময়তা যা ঝড়ের উপমা এবং তীব্র গতিশীলতা যা বিদ্যুৎ গতিসম বোররাক বা বিদ্যুৎ যান ও উচ্চৈশ্রবার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
৩ নং ও ৪ নং উদ্ধৃতিতে গতিশীলতাকে ঝড়ের মত সুতীব্র, জটিল ভাঙচুরময় চিত্রকল্পে সজ্জিত করেছেন। ৫ ও ৬ নং উদ্ধৃতিতে গতিশীলতাকে আনন্দময়তার উচ্ছল, চঞ্চল, পাখির আনন্দ উড্ডয়নের সাথে সাজুয্যময় করা হয়েছে। ৭ ও ৮ নং উদ্ধৃতিতে পূর্ণতা ও প্রাপ্তির রূপ কল্প বাতাসের উচ্ছ্বাস, সমুদ্রের পূর্ণতার কল্লোল, উচ্ছল জল তরঙ্গের হিন্দোল দোলার সাথে তুলনা করা হয়েছে।
৯ ও ১০ নং উদ্ধৃতিতে চিত্তজয়ের আনন্দময়তার গতিকে তুরীয়ানন্দ বা পাগলের মত নিরেট একমুখী পূর্ণতার প্রকাশ এবং স্বর্গ-মর্ত ব্যাপী সর্বত্রগামী আনন্দময় বন্ধনহীন নির্বিরোধ নন্দন গমনের সাথে তুলনা করেছেন।
উপরোল্লিখিত, তড়িতে চড়ার এবং বোররাক বা উচ্চৈশ্রবা আরোহণ গতি মূলত বৈদ্যুতিক গতিময়তা যা সুতীব্র ও সরল রৈখিক রূপ লাভের প্রতিচিত্র। ঝড়ের গতি, ধূর্জটি রূপ এলোকেশি বৈশাখী ঝড়, ঝঞ্ঝা, ঘূর্ণির গতিময়তা, চক্রাকার, ঘূর্ণনময়, জটিল গতির রূপ পরিগ্রহ করেছে।
নৃত্যের গতিময়তা, চল-চঞ্চল ঠমকি-ছমকি রূপ নৃত্য, পাখির ফিং দেয়া তিন দোল মূলত আনন্দময়তা মৃদু-মন্দন গতিরূপ ধীর চঞ্চলা গতির বহিঃপ্রকাশ বাতাস বা প্রভঞ্জনের উচ্ছ্বাস রূপ মৃদুমন্দ বায়ু প্রবাহ, পূর্ণ সমুদ্রের মহাকল্লোল, জল ছল ছল, চল উর্মির হিন্দোল দোল রূপ মূলত তরঙ্গ গতি যা ত্বরণ ও মন্দনময় মিশ্র গতিময় চিত্রের আনন্দময় চিৎপ্রোকর্ষ রূপ পরিস্ফুট করে।
ঘ. পৃথিবীর অভ্যন্তর ভাগ পর্যবেক্ষণ:
আমি বসুধা বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি বাড়ব বহ্নি কালানল
আমি পাতালে মাতাল অগ্নি পাথার কলরোল কল কোলাহল
কবি নজরুল এখানে বসুধা বক্ষে আগ্নেয়াদ্রি অর্থাৎ পৃথিবীর অভ্যন্তরে, কেন্দ্রে আগুনের পর্বত এবং বাড়ব বহ্নি কালানল বলতে কৃষ্ণ অগ্নিময় ঘোড়ার মত আগুনের দ্রুত ধাবমান ঢেউয়ের কথা বলেছেন। পাতালে মাতাল অগ্নি পাথার বলতে পৃথিবীর অভ্যন্তরে আগুনের সমুদ্রের কথা বলেছেন। এ বিষয়গুলো বৈজ্ঞানিক সত্য ও তথ্যময়।
বসুধা বা আমাদের পৃথিবীর কেন্দ্রে রহহবৎ পড়ৎব রয়েছে গলিত লোহা ও নিকেলের মিশ্রণ। এদের তাপমাত্রা ৬০০০০প। কেন্দ্রের এই মিশ্র অগ্নি তরলের মধ্যে ৮৮.৮% লোহা, ৫.৮% নিকেল, ৪.৫% সালফার, এবং ১% এর নিচে অন্যান্য উপাদান রয়েছে।
পৃথিবী কেন্দ্রের এই অগ্নি অগ্নি পাথারের গভীরতা বা ব্যাসার্ধ হচ্ছে ১২৭৪.২ কিলোমিটার।
কেন্দ্রের এই উপাদানসমূহ প্রজ্বলনে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের পাথর (Rock) জ্বালানি। এই জ্বালানির মাধ্যমে এর উৎস হচ্ছে কেন্দ্রের ভারী পদার্থের বিভিন্ন আইসোটোপ প্রজ্বলন যথা- K-40, U- 238, th- 232 বর্তমান গবেষণায় দেখা যায় পৃথিবী কেন্দ্রে Ko matrics নামক এক বিরল জাতের জ্বলন্ত Rock জ্বালানি হিসেবে ক্রিয়াশীল। পৃথিবী কেন্দ্রের অগ্নি পাথার বা আগুনের সমুদ্র যার মধ্যে গলিত লোহা, নিকেলসহ এই Komath জাতীয় আরও কঠিন পাথর পরস্পর কম্পন ও ঝাঁকির মাধ্যমে প্রচণ্ড শব্দে ঢেউ তুলে কোলাহল করছে এবং এর পরবর্তী কঠিন লোহার বৃত্তবৎ প্রাচীরে আঘাত করছে।
ঙ. মহাপ্রলয় বা কেয়ামত:
মহাপ্রলয় বা কেয়ামত বিভিন্ন উপায়ে হতে পারে। বিজ্ঞানের আলোকে পৃথিবী বা মহাবিশ্বের কোন অংশ ধ্বংসের সম্ভাব্য কারণ সমূহ:
সূর্য তেজ হারিয়ে সংকুচিত হয়ে ধ্বংস হওয়া
ধূমকেতুর পতন
বড় বড় গ্রহাণু পতন
সুপারনোভা বিস্ফোরণ
ব্ল্যাক হোলের আগ্রাসী থাবা
নক্ষত্র সমূহের পারস্পরিক সংঘর্ষ
একাধিক গ্যালাক্সির সংঘর্ষ
সমগ্র গ্যালাক্সি শূন্যের কোঠা Singlarily পর্যবসিত হওয়া
উপরোক্ত কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি হবে এবং পৃথিবীতে মহা প্রলয় শুরু হবে। আমাদের মধ্যে প্রচলিত বিশ্বাস কেয়ামতের পূর্বে আকাশে মহাশব্দ সৃষ্টি হবে এবং এতে পৃথিবীর প্রাণিকুল মূর্ছিত হয়ে ধ্বংস প্রাপ্ত হবে। এ সম্পর্কে কুরআন ও বিজ্ঞানে সুস্পষ্ট তথ্য ও বর্ণনা রয়েছে।
বিদ্রোহী কবিতায় কেয়ামতের পূর্বক্ষণে হযরত ইস্রাফিলের শিঙ্গার শব্দের কথা উল্লেখ হয়েছে ‘আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার’ ধ্বংসের ফেরেস্তা ইস্রাফিলের শিঙ্গা-ফুৎকারের মাধ্যমে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হবে। শব্দ ভয়াবহতার মাধ্যমে কেয়ামত সৃষ্টির কথা কুরআনে বলা হয়েছে এভাবে-
যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং একটি মাত্র ফুৎকার (৬৯: ১৩১)
এটাতো কেবল একটি মাত্র বিস্ফোরণের শব্দ (৭৯: ১৩)
যখন কর্ণবিদারী মহা নিনাদ উপস্থিত হবে (৮০: ৩০)
এবং সিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে, ফলে যাদের আল্লাহ ইচ্ছা করবেন তারা ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সকলে মূর্ছিত হয়ে পড়বে। (৩৯: ৬৮)
সেই দিন প্রথম শিঙ্গাধ্বনি প্রকম্পিত হবে এবং উহাতে অনুসরণ করবে পরবর্তী শিঙ্গাধ্বনি (৭৯:৬৭)
ইহারাতো অপেক্ষা করিতেছে একটি মাত্র নিনাদের যাতে কোন বিরাম থাকবে না।
শব্দ সৃষ্টির বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় সৃষ্টির বিভিন্ন আচরণে দ্বারা।
উর্ধ্বাকাশে সুপারনোভা বিস্ফোরণে প্রচণ্ড শব্দের মাধ্যমে দুই বা ততোধিক নক্ষত্রের ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হয়। সুপারনোভা বা নক্ষত্রের মৃত্যুকালীন বিস্ফোরণ পর্যায়ে পাথরময় অগ্নিকণার মহা সন্তরণ সৃষ্টি হয় আকাশে। এই সুপারনোভার ধ্বংস বস্তু পৃথিবীর দিকে ছুটে আসলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অগ্নি বিদ্যুৎবৎ মহা শব্দ সৃষ্টি হবে।
নক্ষত্র বা সূর্যের চক্রপথে অসংখ্য গ্রহাণু বা অ্যাস্টোরয়েড রয়েছে। এরা প্রচণ্ড গতিতে পরস্পর ঠোকাঠুকি করে ভয়ঙ্কর সৃষ্টি করে আবর্তিত হচ্ছে। কোন কারণে এরা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করলে প্রচণ্ড শব্দসহ অগ্নিময় পরিবেশ সৃষ্টি করবে এবং পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে।
একাধিক গ্যালাক্সির পারস্পরিক সংঘর্ষের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অসংখ্য গ্রহাণু, পাথর, ধূমকেতু আগমন করবে। এদের পতন গতি হবে সেকেন্ডে কয়েকশত কিলোমিটার যার ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে এদের বাধা সৃষ্টি হয়ে প্রচণ্ড শব্দ নিনাদের সৃষ্টি করবে।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ মুহূর্তেই মনে হবে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ শব্দ ঐ ভয়াবহ শব্দ ও অগ্নিময় পরিবেশে পৃথিবীর মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় ও মূর্ছিত হয়ে পড়বে।
-‘আমি চক্র ও মহাশঙ্খ, আমি প্রণব নাদ প্রচণ্ড’ এখানে কবি ধ্বংসের চিত্রকল্প এঁকেছেন হিন্দু মিথ ‘প্রণব-নাদ’-এর কথা উল্লেখ করে। প্রণব নাদ হচ্ছে বিষ্ণুর আদি ধ্বনি বা ওঙ্কার শব্দ।
সৃষ্টির এই আদি ধ্বনি হলো Big Bang মাত্র 10-43Sau এর সূক্ষ্ম সময়ে Big Bang এর মহা বিস্ফোরণ শব্দে মহাসূক্ষ্ম বিন্দু 10-32cm এর সূক্ষ্ম কণিকা বিন্দু, মহা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ১০০ কোটি গ্যালাক্সি সমৃদ্ধ আয়তন যা ২০,০০০ বিলিয়ন আলোকবর্ষ ব্যাপী মহা বিস্তৃত আমাদের এই মহা বিশ্বে ক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে।
সৃষ্টির এই আদি মহাবিস্ফোরণই মহাধমক বা প্রণব নাদ বা মহা স্রষ্টার ‘কুন-ফা-ইয়াকুন’ জাতীয় হুকুমের মহাধ্বনি।
প্রচণ্ড ধমক মহাসূক্ষ্ম বিন্দুতে মহাপ্রচণ্ড তাপ সৃষ্টি হয়ে ছিল যার পরিমাণ 1032k বা ১০,০০০ কোটি হল Prinmordialfire fall যা মহা সম্প্রসারণের মাধ্যমে ক্রম বিস্তৃত হচ্ছে এবং গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহসমূহ সৃষ্টি করেছে। উল্লেখ্য, মহাসূক্ষ্ম বিন্দুর এই মহাবিস্ফোরণ ক্ষণই হলো শূন্য সময় বা Time Zero.
সূক্ষ্মতম সময়ে সৃষ্টির এই সূত্রটি কুরআনে বলছে এভাবে-
তিনি যখন কিছু করতে ইচ্ছে করেন তখন তিনি বলেন- ‘হও’। আর তা হয়ে যায়। সূরা ইয়াছিন-৩৬ (৮১-৮৩)
আর যখন তিনি কিছু করবেন বলে স্থির করেন তখন তিনি শুধু বলেন- ‘হও’। আর তা হয়ে যায়। (সূরা মুমিন ৪০: ৬৮)
আমিতো প্রত্যেক বস্তুকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছি। আমার আদেশ তো এক কথায়, চোখের পলকের মত। (সূরা কামার ৫৪ : ৪৯-৫০)
মহাসূক্ষ্ম সময়ে মহাসূক্ষ্ম বিন্দু প্রচণ্ড হুকুমের ধমকে যে প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে এই মহা বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল তা আবার ঐ মহাশক্তির হুকুমে আবার সঙ্কুচিত হয়ে মহা সূক্ষ্ম বিন্দুতে পরিণত হবে। মহাবিস্তৃত এই মহা বিশ্বের মহা সঙ্কোচন প্রহরে যে তাণ্ডবলীলা তাই মূলত মহাপ্রলয়Ñ ই¯্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুঙ্কার।