উপস্থিত সকলের প্রশ্নবাণে জর্জরিত তার বুকের ছাতিটা, হঠাৎ বিদ্রোহ করে উঠল। না! বলে একটা দীর্ঘশ্বাস, তবারক ছুড়ে দিল বয়ে চলা বাতাসের এ তীব্র স্রোতে। দীর্ঘশ্বাসটি ঘায়েল সিংহের হুংকারের মতো তাপ ছড়াচ্ছে কিন্তু অকেজো। বাড়ির ভেতরে আর দাঁড়ানোর উপায় নেই। তাই বারান্দার খুঁটিতে ঝুল দিয়ে সে যেন লাফিয়ে পেরিয়ে এলো বাড়ির উঠোন। তার বাড়ির পেছন দিয়ে চলে গেছে একটি কাঁচামাটির রাস্তা। রাস্তাটিতে উঠে তারপর সে স্থির হয়ে দাঁড়াল। হাতের বামদিকে ছদের আলীর চায়ের দোকান। সেখানেই যাবে- এমনটা ভেবে কয়েক ধাপ বাড়িয়ে আবার সে দাঁড়িয়ে গেল। ওদিকে আর গেল না। চায়ের দোকানটির তিন দিকেই বসানো তিনটি মাটির বেঞ্চ। আর বেঞ্চের উপর বিছানো পুরোনো চটের বস্তা। দোকানটি দিনের বেলায় খোলা থাকে না। খোলে সন্ধ্যার একটু আগে আগে। সকালে এখানকার কোন লোক এ দোকানের দিকে আসে না। সন্ধ্যার পর থেকে লোকজন আসতে শুরু করে। ডিস লাইনে সিনেমা-নাটক দেখে, গান শুনে তারা ঘরে ফেরে মাঝরাতে। তিনটি বেঞ্চের একটিও এখন খালি নেই। মাঝখানের চটের উপরও বসে আছে কয়েকজন। বিদ্যুৎ চলে গেছে। তাই নিচের চটে বসা লোকের সংখ্যা কম। তবে দোকানটিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। ক্যাশবাক্সের পাশে কেরোসিন তেলের একটা বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। কালির ভয়ে বাতিটির সলতে কমানো। সে কারণে সামান্য বাতাসেই উড়ে যাচ্ছে বাতির প্রাণ, যেতে যেতে আবার ফিরে আসছে। তবু ঐটুকু আলো ছাড়া আর সবই এখন দখল করে রেখেছে অঘন অন্ধকার। দোকানে উপস্থিত সবাই যে যার মতো চা-পান, বিড়ি-সিগারেট, বিস্কুট-কলা নিচ্ছে- খাচ্ছে। আর সমাজ, সংসার, রাষ্ট্রের নানা সমস্যা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করে- সেগুলোর আবার টেকসই সমাধানও দিচ্ছে। জৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম থেকে নিস্তার পেতে- ঘর পালানো এসব মানুষ এখন শুধু ছদের আলীর দোকানেই ভিড় করেনি। দোকানের সামনের ঐ রাস্তাটির যেখানে যেখানে জন্মেছে এক খাবলা ঘাস, সেখানেই বসে পড়েছে মানুষ। কেউ কেউ আবার খেজুরপাতার পাটি, কাঁথা-বালিশ এনে সে ঘাসের উপর বিছিয়েছে অস্থায়ী বিছানা। রাস্তাটির কোল ঘেঁষে বেশ কয়েকটি পুকুরের সারি। পুকুরের জলে ধোয়া বাতাস গায়ে লাগলে- গা একবারে জুড়িয়ে যাচ্ছে। এ বাতাস কাউকে কাউকে ঘুমের রাজ্যেও নিয়ে যেতে পারে- অসম্ভব নয়। দোকানের সামনের এই রাস্তাটুকু ছাড়াও নিজ নিজ বাড়ির আঙিনায়, হাজীর পুকুর-পচাপুকুরের পাড়ে, আম বাগানের টঙে- সবখানে এখন গিজগিজ করছে মানুষ। যার যার সমাজ বুঝে বসে পড়েছে সবাই। আর মেতেছে নিজেদের উপভোগ্য গল্পে। মনে মনে এক চিমটে নির্জনতা খুঁজে কোথাও মেলাতে পারছে না তবারক। এখন সে কোন দিকে যাবে, কিছুই ঠিক করতে পারছে না।
ছদের আলীর দোকানের সামনে বসার সিদ্ধান্ত বাতিল। যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেখান থেকে সে সোজা ডান দিকে হাঁটা আরম্ভ করল। কয়েক ধাপ সামনে যেতেই- তার মুখোমুখি দেখা হলো মিন্টুর সাথে। মিন্টু তাকে মুখ ভেঙচিয়ে জিজ্ঞাসা করল, কি রে তবারক, কিরুম আছিস? খবরাখবর কী? ভালো। তবারক মিন্টুর প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর দিল না। মুখ তুলে শুধু একবার তার দিকে তাকিয়ে আবার মাথা নিচু করে সে হাঁটতে লাগল। এই মিন্টু তার সাথে কথা বলে না, ভোটের পর থেকে আজ প্রায় দুই বছর। অথচ কেন আজ সে কথা বলল- তবারক তাও উপলব্ধি করতে পারছে। আর একদিন আগে হলেও মিন্টুর সবগুলো প্রশ্নের জবাব তবারকের কাছে ছিল। তাকে চুপ করে থাকা লাগত না। অথবা তার সাথে দেখা হলেও মিন্টু কথা বলত না। মাথা নিচু করে পার হয়ে যেত। এতোদিন মিন্টু তাই করেছে।
বাড়ির ভেতরে কারো মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। তার মায়ের মুখে কোন কথা নেই। মাঝে মাঝে একটা করে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। তবে তা তার হাতে-পায়ে ব্যথার কারণে নয়- এটা পরিষ্কার। ছেলে কাজলের মুখেও জমেছে আক্রোশের নিপাট কালো মেঘ। পরপর দুটি মরা মেয়ের পর সে এই কাজলের তাজা মুখ দেখেছে। কাজলকে মাথায় করে মানুষ করেছে তবারক। চোখের সামনে সে কখনো কাজলকে মাটিতে নামতে দেয়নি। সে ছেলের বিচারেও আজ যেন সে ফাঁসির দড়িতে ঝোলার মতোন অপরাধী। সে এখন কী করবে, না করবে- কোনকিছুই ভেবে পাচ্ছে না। আবারও সে পেছনে ফিরল। এবার আর ছদের আলীর দোকানের সামনে নয়, পেছনে গিয়ে ঘাপটি মেরে দাঁড়াল। অন্ধকারের ঘনত্ব বেড়েছে। তবারক মনে মনে কাউকে খুঁজছে, যাকে ডেকে পেছনে আনা যাবে। তবে এমন ঘনিষ্ঠ কেউ এ মুহূর্তে তার চোখে পড়ছে না। ছোটো ছোটো কয়েকটি বাচ্চা দোকানের সামনে থেকে পেছনে, আবার পেছন থেকে সামনে এভাবে দৌড়াদৌড়ি করছে। তাদের মধ্য থেকে একজনের হাতে ধরে টান দিতেই ছেলেটি জিজ্ঞাসা করল, কি গো চাচা? তুমি এখিনে দাঁড়ায় আছ ক্যা? তবারক ছেলেটির প্রশ্নোগুলোর কোন উত্তর দিল না। তার হাতে দশ টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, শুন হাবীব, চুপ করি এ্যাক প্যাকেট সিগারেট আনত। ছেলেটি ধাপ তুলতেই তবারক আবারও তার হাত ধরে টান দিল। এবং তার হাতে দুই টাকার আরো একটা নোট ধরিয়ে দিয়ে বলল, এ দু’ট্যাকা তোর। আর শোন সিগারেটের দাম নয় ট্যাকা। ঐ এক ট্যাকার একটা ম্যাচ লিস। এ মুহূর্তে দোকানের সামনে যাওয়ার মতো সাহস তার নেই। তাই দোকানের পেছনেই সে দাঁড়িয়ে আছে। তার চারপাশে এখন অন্ধকারের চীনা দেয়াল। দোকানে এখনও অনেক মানুষের ভিড়। তারা নানান ব্যাপারে আলোচনা করছে। সে আলোচনার মধ্যে তবারক নিয়েও কথা হচ্ছে। তবারক, ঐ অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে তার সম্পর্কে আজ যা শুনলো, তা সে কখনো শুনেনি। তার যে এতো দোষ ছিল তাও সে জানত না। সিগারেটের প্যাকেট হাতে পেয়ে আর সে ওখানে দাঁড়াল না। আবার হাঁটতে লাগল সরু একটা রাস্তা ধরে। এ রাস্তাটি মূলত মাঠের দিকে গেছে। তাই রাতে এ রাস্তায় মানুষের খুব একটা চলাচল দেখা যায় না। আবার একেবারে যে কেউ যায় না, তা কিন্তু নয়। মাঝে মাঝে একজন-দু’জন মানুষ যাচ্ছে-আসছে। তবারক রাস্তার দিক থেকে বেমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিগারেট একটা শেষ হলে তার আগুনে আবার সে জ্বালিয়ে নিচ্ছে আরেকটা সিগারেট। তার পেছন দিয়ে কে যাচ্ছে- না যাচ্ছে, ওদিকে তার খেয়াল নেই। তবে দু’জন পথচারী এর মধ্যে তার পরিচয় জানতে চেয়েছে।
পরিচিত একজোড়া স্যান্ডেলের আওয়াজ তার কানে আসছে। মুহম্মদ আলী। প্রতিদিন মুহম্মদ আলী তার জানালার পাশ দিয়ে ফজরের নামাজে যায়। এতে তার স্যান্ডেলের আওয়াজ তবারকের কানে সেভ হয়ে গেছে। মুহম্মদ আলীর সাথে তবারকের বাবার খুব খাতির ছিল। তবারক তাকে কোনদিন অসম্মান করেনি। তবুও আজ হাতের জ্বলন্ত সিগারেটটি ফেলতে ইচ্ছে হচ্ছিল না তার। বেশ কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে মুহম্মদ আলী বলল, ব্যাটা, তুমি এহিনে? যাক ব্যাটা, শেষমেশ তুমাক পানু তাহালে। আমি তুমাক খুঁজতে তুমারে আম বাগানে গেছুন, ছদের আলীর দুকানেও গেছুনু …। তবারকের হাতটি ধরে সে তাকে বসার ইঙ্গিত করলে, তবারক তার পাশাপাশি বসল। মাঝে খানিক দূরত্ব রেখে বসেছে তবারক। মুহম্মদ আলী যেন সিগারেটের গন্ধ না পায়। ব্যাটা শুনো, সরাসরি কামের কথাতিই আসি- তুমি তো দেহিছো, তুমার বাপ আর আমার সম্পর্কডা কি রুকুম ছিল। ছুটুবেলাতে তুমার দাদা মরাতে- তুমার বাপ খুবই কষ্ট পাছে গো। ছুটুবেলা থাকি ম্যালা কষ্ট করি, গা-গতরে খাটি জমি-জাতিগিন করি থুই গেছ। কুনু কিছুই তুমাক বুলার নাই। এগলির কুনু কিছুই তুমার কাছ লতুন না। এহুন তুমার মা দুনিয়াতে আছে। আল্লা হায়াত দিস। তারও বয়স হছ- অসুখ আলা মানুষ। আল্লা তুমাক একটা ছেলি দিস। সবদিকই চিন্তা করতে হবে। আর এরুকুম বয়সে- এরুকুম ভুল ম্যালা মানুষেরই হয়। আর উসব চিন্তা কর না। আল্লাহুর কাছে মাফ চাও। আল্লা তুমাক ভাল রাখিছে, আল্লাহুর ঘরে কিছু দানধীন কর- তাহালেই হল। ওর বিয়া হয় যাছে, যাতে দেও। তুমি খালি ইকটু মাজা শক্ত করি দাঁড়াও- সগ ঠিক হয় যাবে। তারপর আমরা তো আছি। এখুনও মরিনি বাহ্। শুনো পাড়ার কারু কুনু কথাত কান দিও না, সগলাই তুমারে ভাল চায় না। অনেকখানি বয়স হছ, এগিন তো আর বুলতে হবে না। বুঝতেই পারছ। এতোক্ষণ তবারক মাথা নিচু করে-চুপচাপ সবই শুনল। একটা কথাও সে এখনো বলে নি। কি যেন একটা বলতে যাচ্ছিল। সে মুহূর্তে তার লুঙ্গির ভাঁজে রাখা মোবাইলটি গর্জন করে উঠল। মোবাইল ফোনটি কানে ধরলে- অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসল, আমরা পচার ব্যাকা ভূঁইয়ের কাছ- আসছি, বলে তবারক মুহম্মদ আলীর দিকে তাকাল। সেও অবস্থা বুঝে শুধু বলল, ব্যাটা যাইহোক, আর বাড়াইওনা, যাও। পরের কথাগুলো শুনে তবারকও বুঝতে পারল তার ব্যবহারে মুহম্মদ আলী খুশি নয়। মুহম্মদ আলীর পরে এ সমাজে আর কেউ কথা বলার নেই। কোন ব্যাপারে সে সবার আগে জানলেও কথা বলে সবার পরে।
শফি, রান্টু আর হোসেন এরা তবারকের ঘনিষ্ঠজন। তবারকের পরিবারের কোন উৎসব-আয়োজন হোক আর কোন বিপদ-আপদ যাইহোক এরাই সব সামাল দেয়। ওদের কাছে পৌঁছে তবারক আবার একটা সিগারেট জ্বালাল। একটা সিগারেট বের করে শফির হাতে দিল তবারক। কিন্তু শফি আবার ওটা হোসেনের হাতে দিল। তবারকের সিগারেটের আগুনেই নিজের সিগারেটটি জ্বালিয়ে নিলো হোসেন। হোসেনের সিগারেটের অর্ধেকের একটু বেশি শেষ হয়েছে। হোসেন বাকিটুকু শফিকে ধরিয়ে দিল। শফি প্রথম ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করল, বাড়ির অবস্থা কী? তবারক একবার ডানে, আরেকবার বামে মাথা নাড়াল। তারপর আবার অনেকক্ষণ সবাই চুপচাপ। রান্টুও তার সামনে পড়ে থাকা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালিয়েছে। তার জিজ্ঞাসা, কি করবি তাহালে- বিয়া কি তুই করবিই? তবারক কোনো কথা বলছে না। অনেকক্ষণ পর হোসেন বলল, চুপ করি থাকি লাভ কী? কিছু একটা তো বুলতে হবে! তোরে কি মত? খুবই ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল তবারক। শফি বলল, কাল সানজের বেলা সগলাই মিলি যে সিদ্ধান্ত হইছে, ওডিই আমারে সবলার মত। দুই বৌয়ের সংসার! খুব মশকিলের কথা। সেকান্দার বক্সের কী হাল দেকছিসনি?
কাজলের জন্মের পর থেকেই জহুরা অসুস্থ। একটানা দুই-তিন মাস ভালো থাকার রেকর্ড গত কয়েক বছরে তার নেই। তবু সংসারের যত কাজকাম খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হলেও সে-ই সামাল দিত। ফসল ওঠার সময় সেন্টু আর তার বৌ সাথে থাকত। আকাশের আচার-ব্যবহার খুবই খারাপ হলে পাড়ার অন্যান্য মেয়েরাও আসত তাকে সাহায্য করতে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু বছর খানেক থেকে সে একেবারে বিছানাগত। নিজের দরকারি কাজগুলো ছাড়া অন্যান্য কোন কাজই এখন আর সে করতে পারে না। আবার সেন্টুর নিজেরও একটা সংসার আছে। একটা গরুর বাছুর-একটা খাশির বাচ্চা-একটা পাটির বাচ্চা-হাঁস-মুরগি, ছেলে-মেয়ে সব ফেলে তার বৌটাও রোজ রোজ এখানে আসতে পারে না। অ্যালোপ্যাথিক, হোমিও, কবিরাজি, পানিপড়া, ঝাড়ফুক যে যখন যার কথা তার কানের কাছে বলেছে, তার কাছেই জহুরাকে নিয়ে গেছে তবারক। কিন্তু দিনদিন জহুরার শারীরিক অবস্থার কোন উন্নতি তো হচ্ছিল না, বরং আরো খারাপের দিকে যাচ্ছিল। তবারকের মাও অসুস্থ। অথচ ফসল কাটা-তোলা, নতুন ফসল বোনা-লাগানো এ রকম নানান কাজে তার লোক লাগে রোজ। এমন একটা দিন নেই- যে দিন তার কাজের লোক মাঠে থাকে না। তাদেরও খাবারের ব্যবস্থা হয় না। তবারক তাদের মুড়ি-চানাচুর কিনে দেয়। এতে কাজের লোকগুলো তার মুখের উপর কোন কিছু না বললেও তবারক তাদের ভেতরের ভাষা বুঝে। এদের সে ছোটো বেলা থেকে দেখছে। একটা গেরস্থ ঘর এভাবে চলে না। জহুরাও বিছানায় শুয়ে শুয়ে শুধু কাঁদে। তার চোখের জলের যতটুকু দেখা যায়- তারও অনেক বেশি জল হয়তো সে গোপনে মুছে ফেলে দিত। কিন্তু কে দেবে তার গোপন-অগোপন সেই চোখের জলের দাম? দেখে দেখে তবারকের সবকিছু সহ্য হয়ে গিয়েছিল। জহুরা একদিন নিজেই তার চাচাতো বোন রিতাকে এখানে নিয়ে এলো। জহুরার একটি কথা- তুই খালি দুই বেলা দুডি করি চাল ফুটায় দিবি। ব্যাস। রিতারা ভাই-বোন মিলে মোট নয়জন। রিতা পাঁচ নম্বর। তার বাবার অভাবের সংসার। তাই আর কেউ আপত্তি করেনি। তাছাড়া জহুরা তো আর পর কেউ না। তার আপন চাচাতো বোন। তার কাছে রিতা ভালই থাকবে। রিতা এখানে ভালোই ছিল। সংসারের কাজকাম সে তার বাবার বাড়িতে ছাড়া ছাড়া যেটুকু শিখেছিল, ওগুলোকে পুঁজি করে এখানে সে কাজ শুরু করে আস্তে আস্তে হাত পাকা হয়ে উঠে। সংসারের সবকিছু সে গুছিয়ে নিতে থাকে। ক্লান্তশ্রান্ত তবারক মাঠ থেকে ফিরে এসে দেখেছে- রিতা তার জন্য খাবার সাজিয়ে রেখেছে। আবার মাঠে কাজের লোকগুলোর কাছে রুটি-ভাজি, হালুয়া পৌঁছে গেছে একেবারে ঠিক সময়ে। আনন্দে-উৎসাহে কাজ করেছে লোকগুলো। কাজের লোকের হাত ধরা খুব মুশকিল- তবারক এটা জানে। ধমকে কখনো কাজ ভাল হয় না। তাদেরকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে পারলে- আবার দশ লোককে দিয়ে এগারজনের কাজ করিয়ে নেয়া যায়। তবারকের জমিজমাগুলো আবারও প্রাণ ফিরে পায়। ফল-ফসলে আবারও ভরে ওঠে তার বাড়ির আঙিনা। চারদিকের এ পূর্ণতা এবার তবারকের জলশূন্য নদীর জীবনকে তিরস্কার করতে লাগল প্রতিদিন। এতো এতো শূন্যতার তলে যা এতোদিন চাপা পড়েছিল। তা যেন জেগে উঠেছে। আর ওদিকে নতুন পাতার মতো রিতার শুদ্ধ মুখ। তার ভরাট বুক- ঐ বুক যেন আর কোন বাঁধন মানতে চায় না। ঐ বুকের আগুনে সে যেন এ পুড়িয়ে দিতে চায় পুরো পৃথিবী। সে দখলে নিতে চায় এ পৃথিবী-মহাপৃথিবীর সবকিছু। অসাবধানতায় কখনো রিতার বুকের উপর থেকে কাপড় সরে গেলে, অমনি তবারকের ভেতরে শূন্যতার আগুন ফস্ করে জ্বলে উঠেছে। রিতার ভরাট বুকের আগুনে পুড়ে তা হয়ে উঠে আরো লাল-গনগনে। এক-দুইদিন রিতা তবারককে পাত্তা না দিলেও যৌবনের বান এক সময় ভেঙে দিয়েছে বাধার বাঁধ। প্রবল স্রোত ভাসিয়ে নিয়ে গেছে সবকিছু। বেলা গড়াতে গড়াতে রিতা আর তবারক হয়ে গেছে এক ও একাকার।
তবারকের বাড়ির চারদিক মাটির পুরো দেয়ালে ঘেরা। তবে কোনকিছুই জহুরার চোখের আড়ালে ঘটেনি। জহুরা নিজেও তবারককে বারবার রিতাকে বিয়ের কথা বলত। তবারক নিজেই নানা অজুহাতে এড়িয়ে গেছে। ছেলে বড় হয়েছে, আত্মীয়-স্বজন, সমাজের লোকজন- এরকম নানা অজুহাত দেখাত তবারক। কিন্তু একটা সময় তাদের মেলামেশাটা যেন সংসারের অঙ্গ হয়ে উঠল। আর ওদের সাথে যেন পাল্লা দিয়ে সুস্থ হতে লাগল জহুরা। তার শরীরেও যেন ফিরে আসতে থাকল এতোদিনে হারিয়ে যাওয়া সবকিছু। পুরোনো দিনের সবই যেন সে ফিরে ফিরে পাচ্ছে, আবারও নতুন রূপে। কিছুদিন থেকে সে তবারককে শারীরিক সঙ্গও দিচ্ছে। অথচ তার চেনা সেই তবারক আর নেই! তার শরীরের ঘ্রাণ বদলে গেছে। একদিন এই তবারক, তার শরীরের ভেতর জংলি শুয়োরের মতো কি যেন একটা খুঁজতো- আজ সে অনেকটাই শীতল। জানা সব কৌশলেও আজ সে তাকে জাগাতে পারছে না। দিনে দিনে বেড়ে যাচ্ছিল জহুরার অতৃপ্তির মাত্রা।
গত সন্ধ্যায় ঘরের দরজা আলগায় ছিল। জহুরা বাড়ির ভেতরে আছে তবারক তা খেয়াল করেনি। ইদানীং তারা জহুরাকে লুকাতে চাচ্ছে। রিতার আপত্তি ছিল কিন্তু তবরাক শুনল না। জহুরাও সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঢুকে তবারকের বুক থেকে ছিনিয়ে নিল রিতাকে। তবারক নির্বাক। চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে একেবারে বাড়ির বাইরে এনে ছাড়ল। পাড়ার অন্যান্য মেয়েরা এ ব্যাপারটা একেবারে জানত না- তা না। তবে তারা জহুরার আগে কেউ মুখ খুলেনি। জহুরার কথা, রিতা আর এ বাড়িতে থাকতে পারবে না। আর তার বাড়ির লোকজন অন্য কোথাও তার বিয়ের ব্যবস্থা করুক। বিয়ের জন্য যত টাকা লাগুক, তবরাক দিবে। এমনিতে তবারক এখন পর্যন্ত তার পরিবারকে কম টানেনি। দরকার পড়লে আরো দিবে। রিতার ছোটো যে দুই বোন তাদেরও বিয়ের বয়স হয়েছে-বিয়ে ঠিক হোক। জহুরা প্রয়োজনে তার নিজের গহনা দিয়ে তাদের বিয়ে উঠিয়ে দিবে।
জহুরার এই আশ্বাসে- রিতার পরিবার রাজি হলেও রিতা রাজি না। তার এক কথা, আমি এক শরীর দু’জনাক দেখাব না। আর একজন কেউ আমার শরীর দেখলে- দেখফে কব্বরের মাটি! আমি দুনিয়ার কিছু আর বুঝতে চাইনিখো। পুরা দুনিয়া আমার বুঝা শ্যাস। তবারকও তাকে বিয়ে করতে রাজি। এখন শফি, রান্টু আর হোসেনকে ডেকে ডেকে জহুরা একটা কথা বারবার বলছে, তাহালে আমি বিষ খাবো। উঁই কবুলও বুলবে, আমি বিষও খাবো!
শফির হাতের ওপর হাত রাখল তবারক। শফিও শক্ত করে চেপে ধরল তবারকের হাত। অল্পক্ষণ পরেই তবারক তার হাত ছাড়িয়ে নিল। আর কেউ কোন কথা বলছে না। চাঁদের আলো বেড়ে চলেছে। বিষাক্ত সে আলোয় ভিজছে সবাই। তবারক উঠে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে হাঁটতে লাগল। তবু কেউ কিছু বলল না। বিদ্যুৎ এসেছে। ছদের আলীর দোকানটিও বন্ধ হয়ে গেছে। কাঁচামাটির রাস্তাটির দু’পাশে কেউ আর শুয়ে নেই এখন। আম বাগানের টংগে শুয়ে থাকা মানুষগুলোও হয়তো এতোক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। তবারক ওদের পেছনে ফেলে চলে এসেছে অনেক দূর। একবার পেছনে ফিরে দেখল, ওরা কেউ তার সাথে আসেনি। কেউ আসছে না তার পেছন পেছন। সবগুলো সরু রাস্তা ছেড়ে সে উঠে এলো প্রশস্ত বড় একটি রাস্তায়। সে হাঁটছে- তার সামনে বিশ্বরোড মোড়। লুঙ্গির ভাঁজ থেকে তার মোবাইল ফোনটি বের করে চার্জ আছে কিনা দেখে নিল। অর্ধেকেরও বেশি চার্জ আছে।