ওলামিড অওনুবি আফ্রিকার নতুন প্রজন্মের একজন লেখিকা। তিনি সাউথ ম্যাগাজিনের সহকারী এডিটোরিয়াল এডিটর ছিলেন। এখন তিনি লন্ডনে একজন সেক্রেটারি হিসাবে কর্মরত আছেন। তিনি সাউথ ম্যাগাজিনে গল্প এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আর্টস এন্ড কালচারের উপর রিভিউ লিখেছেন। তাছাড়া দ্য নিউ নেশন ও ভয়েজ নিউজপেপারে তিনি অনেক আর্টিকেল লিখেছেন। সম্প্রতি তিনি ইংল্যান্ডে আফ্রিকান অভিজ্ঞতার উপর ছোটগল্প সংকনের উপর কাজ করছেন। ইংরেজি ভাষায় লেখা তাঁর মুভিং ফরোয়াড গল্পের বঙ্গানুবাদ করা হল ‘ফেরা’ নামে।
চিনউই তার চোখদুটো থেকে ঘাম মুছে বাচ্চাটিকে তার কোলে নিয়ে তার কান্না থামানোর জন্য আদর করতে থাকল। উঠোনে যে সব মহিলারা কাপড়চোপড় পরিষ্কার করছিল তাদের মাঝ থেকে একজন মহিলা এক নজর তার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ বাচ্চাটি খিদের জ্বালায় কাঁদছে- তুমি তাকে খাওয়াওনি?’
চিনউইয়ের মুখটায় রাগ ফুটে উঠলেও সে মহিলাটির দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে বলল, ‘ আমি ওকে আগেই খায়িয়েছি – এখন কিন্তু সে আর খেতে চাচ্ছে না।’
মহিলাটি তার মাথা ঝাঁকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ‘আমার কাছে কেক আর রুটি আছে – সে খেতে চাইলে তা তুমি ওকে খাওয়াতে পার।’
চিনউই তার হাত দুখানা তার কোমরে রেখে বলল, ‘তুমি কি বলতে চাচ্ছ আমার সন্তানকে কী খাওয়াতে হবে আমি জানি না।’
বয়স্ক মহিলাটি তার দিকে তাকিয়ে ঘাড় উঁচু করে বলল, ‘না, আমি শুধুমাত্র একটু সাহায্য করতে চাচ্ছিলাম।’
‘ছেলেকে আগেই খায়িয়েছি – এখন সে আর খেতে চাচ্ছে না।’
চিনউই তার দৃষ্টি নিচু করে তার সামনের কাপড়চোপড়ের স্তুপের দিকে তাকাল। তার প্রতিবেশিদের ময়লা কাপড়চোপড়ের গাদা। তাকে ওই সব কাপড়চোপড় কাচতে হবে এখন! মি. জনসনের জামা, পাজামা , তার বউয়ের ব্লাউজ ও স্কার্ট। ম্যামা ইজিনমার শার্ট, একজন অবিবাহিত পুরুষের শার্ট, বাড়িওয়ালার পাজামা। সে নিচু হয়ে একটা শার্টের কলার পরিষ্কার করতে লাগল। বাচ্চাটা আবার কান্না শুরু করল।
চিনউই তাকে ফিসফিস করে বলল, ‘আহা আমার বাছাধন – কাঁদে না কাঁদে না, বাছাধন! তোর বাবা আজই একটা কাজ পাবে, আর তা হলে আমরা আবার আগের মত চলতে পারবো।’
বাচ্চাটা একটানা কাঁদতে থাকলে ওর মা উঠে দাঁড়িয়ে তার পরনের মলিন কাপড়ে হাত মুছে তার প্রতিবেশী মহিলাদের দিকে একবার তাকিয়ে উঠোনটা পেরিয়ে তার ঘরের দিকে গেল। সে তার বাচ্চাটিকে বিছানার যে জায়গাটা ভাল সেখানে আস্তে করে শুইয়ে দিল। চিনউই বাতাস বিহীন রুমটিতে প্রচণ্ড গরম বোধ করতে লাগল। সে ভাবল শীঘ্রই হয়তো ঝড় উঠবে। আকাশটা মেঘে ঢেকে গেছে। মা ও বাচ্চা দুজনেই অস্বস্তিবোধ করছে।
এক সময় চিনউই লক্ষ করল তার ছেলেটা কান্না থমিয়ে ঘুমুঘুমু চোখে স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে খুঁজে পেতে একটা বাটি পেয়ে তাতে দুধ ভরে চামচে করে তা তার মুখে দিতে চেষ্টা করল। বাচ্চাটা দুধ থু থু করে ফেলে দিলে তার মা দুধ খাওয়ানো বাদ দিল। সে মনে মনে ভাবল, সে এমন একটা ছেলের জন্ম দিয়েছে যে সব সময়ই খাবার থু থু করে ফেলে দেয়!
চিনউই বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল আকাশের মেঘ কেটে গিয়ে নীলবর্ণ ধারণ করেছে। সে দ্রুত পায়ে বাইরে এসে অপরিষ্কার কাপড়ের স্তুপের কাছে গিয়ে কাপড় কাচতে শুরু করল।
সে মাথা নিচু করে কাপড় কাচার সময় তার স্বামী ঘরে ফিরে এসেছে তা সে লক্ষই করেনি। কাপড় কাচা শেষ করে সে রুমে ফিরে এসে স্বামীকে দেখে বলল, ‘ল্যানরে – তুমি ফিরেছো।’ চিনউই ঠোঁট দুটোয় হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে স্বামীকে অভ্যর্থনা জানাল।
‘এখানে একা একা বসে থেকে আমি হাঁপিয়ে উঠেছি।’ তার স্বামী হেসে উঠে বলল। চিনউই তার হাত দু’খানা এক করে তার দিকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘যে কাজে গিয়েছিলে তার কী হল?’
‘আমি অফিসে সাক্ষাৎকার দিয়ে এলাম – সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর তারা আমার সঙ্গে করমর্দন করে ধন্যবাদ জানালেন।’
‘তাহলে তুমি কি কাজ পাচ্ছো?’
বউয়ের কথা শুনে সে আবার হেসে উঠে যেন বোমা ফাটানোর ভঙ্গিতে নিজেই ঘোষণা করল, ‘তারা সোমবারে আমাকে ম্যানেজিং ডিরেক্টর বানাবে। তুমি সেদিন দেখতে পাবে আমি কেমন নাচানাচি আর লাফালাফি করি।’ সে তার চোখ দুটো বন্ধ করে বলতে শুরু করল, ‘আমার খুবই আশা আছে যে আমি এই চাকুরিটা পেয়ে যাব। আমি পরীক্ষায় বসেছি, তাদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছি। আমি মন্ত্রণালয়ে কয়েক বছর কেরাণীর চাকুরী করেছি। এই চাকুরী আমি ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও সামলাতে পারবো। আমার ভাল শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে, ছয় বছরের প্রচুর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। আজকালকার দিনে একটা সরকারী চাকুরি পাওয়া জন্য এগুলোই যথেষ্ট। তারা বলল যে ব্রিটিশরা আমাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে যাওয়ার পর চাকুরী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’
‘এখন আমি উপলব্ধি করছি কেন – ’ সে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে আবার বলল, ‘আমি যা করতে যাচ্ছি আমাদের ভাল উদ্দেশে কি নয়?’
চিনউই সরে এসে তার স্বামীর পাশে বসে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘ঈশ্বর আমাদের সঙ্গে আছেন। তিনি আমাদেরকে সাহায্য করবেন। আমি উপবাস করে আজ রাতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো।’
তার স্বামী কাঁধ নেড়ে বলল, ‘আমাদের খাবার কেনার টাকা নেই। আর কত উপবাস দেবে প্রিয়তমা।’
‘আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে।’
‘কিসে বিশ্বাস?’
‘ঈশ্বর জানেন যে আমরা কী অবস্থায় আছি।’
স্বামী বেচারা বাচ্চাটিকে নিচে শুয়িয়ে দিয়ে সে তার বউয়ের দিকে তাকিয়ে আবার হেসে বলল, ‘আমি আর ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি না।’ সে তার চোখদুটো বন্ধ করে কিছু সময় ভেবে আবার বলল, ‘ যদিও আমি এখনও ভালবাসায় বিশ্বাস করি – এ বিষয়ে তুমি কি বলো?।’
স্বামীটি কিছু সময় ভেবে বলল, ‘এসো আমরা আর একটা বাচ্চা নেই, এখনই। আমার মাঝে যে ঝড় উঠেছে, এসো তাকে শান্ত করি।’ তার চোখ দুটোতে এক ধরনের মতিচ্ছন্ন ভাবের উদয় হল।
এতে চিনউই মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হল। ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেলে?’ সে তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করে- ‘এখন আমরা একটা বাচ্চাকেই সামলাতে পারছিনা!’
সে মাথা নেড়ে বলল, ‘আমরা বিয়ে করতে চাইলে আমাদের পিতামাতা কি সে কথা বলেছিল না।’
স্বামীটি তার বউকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে হাসতে লাগল।
‘এটা একটা ভুল কাজ হবে।’ বউটা স্বামীর কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে বলল।
‘আগে তুমি যে ভালবাসার কথা বলতে এটা কি সেই ভালবাসার নমুনা?’
বাচ্চাটি আবার কান্না করতে শুরু করল।
আবার আকাশ কালো করে বৃষ্টি শুরু হলে চিনউইর স্বামী মাথা ঝাঁকিয়ে বিছানা থেকে নেমে জানালার পাশে গিয়ে উঠোনের শান বাঁধানো চত্বরটার উপর বিন্দু বিন্দু বৃষ্টির পড়া দেখতে লাগল। এদিকে বউটি রুমের সিলিং এর দিকে তাকিয়ে থেকে এক সময় বাচ্চাটির কান্না থামানোর জন্য বাচ্চাটির উদ্দেশে বলল, ‘আমি তোর শত্রু নই, তা তো তুই জানিস।’
চিনউই এর স্বামী ল্যানরে মাথা উঁচু করে বলল, ‘তোমার মা বলেছিলেন যে আমি কখনোই কোন কিছুরই হিসাব রাখতে পারবো না। তিনি এখন মনে করেন যে আমি আমার বউকে প্রতিবেশির ময়লা কাপড়চোপড় পরিষ্কার করার কাজ করিয়ে সেই আয়ে সংসার চালাচ্ছি। আমি এ পর্যন্ত অনেক ইন্টারভিউ দিয়েছি, কিন্তু ফল কিছুই হয়নি। আমাদের মধ্যে দুষ্ট বুদ্ধি কাজ করে তোমার বাবা আমাদের বিয়ের সময় বলেছিলেন।’
চিনউই মনে পড়ল তার বাবা মা তাদের বিয়েকে মেনে নিতে না পারায় তারা রেজিস্টারি বিয়ে করেছিল। ল্যানরের বিধাব মা ও তার একজন চাচা শুধুমাত্র সাক্ষী হয়েছিলেন। ‘সেলাই শিক্ষা শেষ না করে আমি বিয়ে করে ফেলায় আমার বাবা মা ভেঙে পড়েছিলেন। বিয়ের পর আমি গর্ভবতী হলে তারা আরো হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।’
‘তারা কি চিন্তা করেছিলেন তাদের এক মাত্র মেয়ের জীবনে একটা স্বপ্ন ছিল। সে তোমার মত সরকারের সামান্য একজন কেরানীর সঙ্গে আমার বিয়ের কথা ভাবতে পারেননি। তুমিও কিন্তু সে সময় বলনি শিক্ষানবিশ হিসাবে তুমি কেরানীর কাজ করছিলে। সেই সব দিনগুলোতে তুমি বেশই সুখী ছিলে। তুমি আমার রুমে আমার বিছানায় ঘুমুতে। ন্ইাজার নদীর ওপারের মেয়ে বলে আমি কিছু মনে করিনি।’
বউটি বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়ে বলল, ‘ল্যানরে, তুমি আমাকে অপমান করো না। আমার বাপ মায়ের পরিবার আমার কোন খোঁজ খবর রাখে না। তবুও আমি এখনও তোমার সঙ্গে মানিয়ে চলার চেষ্টা করে যাচ্ছি। প্রতিবেশিদের ময়লা কাপড়চোপড় পরিষ্কার করে যে অর্থ পাই তা দিয়ে সংসার চালিয়ে। আমার এ কাজের জন্য আমাকে রাস্তাঘাটে ঠাট্টা তামাশা সইতে হয়।’
ল্যানরে তার বউয়ের কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি নিজেও তাদের হাসাহাসি শুনেছি, চিনউই ’। সে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে কথাটা বলে নীরবে জানালার পাশে দাঁড়াল।
তারপর সে তার বউ চিনউই কে বলল, ‘কোন কিছু কি খাবার মত আছে?
বউটি তার স্বামীর দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকাল যেন আঠারো মাস আগে একটা উজ্জ্বল নক্ষত্র তার সামনে হাজির। খাকি ট্রাউজার পরা সুদর্শন, চালাক চতুর একটা ছেলে! তাদের এলাকার ইংরেজি লিখতে ও পড়তে পারা কয়েকজনের মধ্যে সেও ছিল। তারপর সে একটা চাকুরী পেয়েছিল আর তার সঙ্গে একটা চকচকে বাই সাইকেলও তাকে সরকার দিয়েছিল। সব সরকারী কেরানীদেরকেই তা দেওয়া হয়। সে একদিন তার বউকে বলেছিল যে সে একদিন একজন বড় মাপের মানুষ হবে। তার বউ চিনউই স্বামীর কথায় বিশ্বাস তখন করেছিল।
একদিন বড় মাপের মানুষ হবে।
প্রথম দিকে একটা দিনে তারা উভয়েই রাস্তার জলের ট্যাপের কাছের একটা আম গাছের নিচে মিলিত হয়েছিল। উভয়ে কথা বলতে বলতে তাদের সময়ের কথা মনেই ছিল না। এদিকে মেয়ে ফিরে না আসায় বাবা মা দুঃচিন্তায় পড়েছিল সেদিন।
চিনউই ছেলেটির চোখ দুটোর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘ঘরে কিছু নুডুলস ও গ্রাউন্ডনাট আছে।’ তার স্বামী বেচারা মাথা নেড়ে বলল, ‘তাতেই হবে।’ সে হাত বাড়িয়ে বউয়ের কাছ থেকে ছেলেটিকে কোলে নিল। তার মনের মধ্যে যে ঝড় উঠেছিল তা যেন স্তিমিত গেছে, চিনউই তার স্বামীকে দেখে ভাবল।
চিনউই একটা প্লালাস্টিকের বাটিতে নুডুল পুরে পানি ভরতে ভরতে সে মনে মনে ঈশ্বরের উদ্দেশে প্রার্থনা সঙ্গীতের গাইতে লাগল।
‘চিনউই-’
‘হ্যাঁ’
চিনউই তার স্বামীর মিষ্টি হাসির রেখার ছায়া যেন দেখতে পেল। সে তার ছেলেকে নিয়ে খেলা করতে দেখে চিনউই এর মনটা স্বস্তিতে ভরে উঠল। সে নুডুলস রান্না করে স্বামী পরিবেশন করল।
‘দেখ চিনউই, আমাদের ছেলেটা হামাগুড়ি দিচ্ছে।’
বাচ্চাটি হাসছে আর তার বাবার হাতে থাবা দিচ্ছে।
তারা স্বামী স্ত্রী পাশাপাশি বসল। তারপর এক সময় ল্যানরে ভাবল, জরুরী ভিত্তিতে তার একটা চাকুরীর দরকার। সে তার বউকে বলল, ‘আগামীকাল হেডমাস্টারের সঙ্গে আমার দেখা হবে। আমি সরকারী চাকুরী না পাওয়া পর্যন্ত তার ওখানে একটা চাকুরী পেতে পারি কিনা অনুরোধ করে দেখবো।’
‘অবশ্যই দেখবে।’
চিনউই মাথা নাড়িয়ে বলল। সে দেখতে পেল বাচ্চাটাকে তার বাবা নিজের কোল থেকে তার কোলে দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসছে। ল্যানরে হাতে তালি দিলে তার ছেলেটি হেসে উঠলো। চিনউইয়েরও ইচ্ছে হল হাতেতালি দিতে।