বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বাগেরহাট একটি সমৃদ্ধ জেলা। এই বাগেরহাট নানা কারণে আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত। অপরূপ রূপ মহিমায় সমুজ্জ্বল বাগেরহাট জেলাটি প্রকৃতির অপার দান বঙ্গোপসাগর বিধৌত নয়নাভিরাম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের সৌন্দর্য মুকুট শিরে ধারণ করে আজও দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায় স্বগৌরবে। যুগের বিবর্তনে কালের পরিবর্তনের পথ পরিক্রমায় এ দেশে ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছে। বিশ্বজনীন সার্বজনীন চিরন্তন শাশ্বত কালজয়ী মতাদর্শ ইসলামের যাদুর স্পর্শে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে যাদের অবদান উল্লেখ্যযোগ্য তাদের মধ্যে হযরত শাহজালাল, শাহ পরাণ, শাহ মখদুম, বায়েজিদ বোস্তামী, শাহ আমানাতুল্লা, খান জাহান আলী প্রমুখ সাধক পুরুষের নাম উল্লেখ করার মত। এরা বিভিন্ন জন বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার ব্রতী হন। বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চল খানজাহান আলীর পদধূলিতে হয়েছে ধন্য, হয়েছে পুণ্য। এ দেশে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সেবার ক্ষেত্রে তিনি এক যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে আল্লাহর ওলি ইসলাম প্রচারক, সেনানায়ক, সুশাসক, প্রকৌশলী, বিদ্যানুরাগী, সমাজসেবক, সাহসী বীর ও মহান সাধক। তিনি বাংলাদেশের বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করেন। এক কথায় তিনি দক্ষিণবঙ্গের সভ্যতা বিকাশে মূল ভূমিকা পালন করেন।
হযরত খানজাহান আলী (রহ) এর পরিচয় পরিক্রমা এই মহান কর্মবীরের কর্মময় জীবন, ইসলাম প্রচার, মানবকল্যাণ ও সমাজসেবায় তিনি যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন আমি তার যৎ সামান্য পর্যায়ক্রমে হযরত খানজাহান আলী (রহ) এর জীবন ও কর্ম শিরোনামে তুলে ধরছি মাত্র।
পরিচয় পরিক্রমা: হযরত খানজাহান আলী (রহ) এর পূর্ণ নাম উলুঘ খানুল আজম খান জাহান তার প্রকৃত নাম হলো খানজাহান উলুথ এবং খানুল আজম তার পদমর্যাদা জ্ঞাপক সম্মানসূচক উপাধি। খানুল আজম তুর্কি ও ফার্সি ভাষায় উলুঘ শব্দের সমার্থবোধক তিনি সাধারণ্যে খানজাহান আলী খাঞ্জালী পীর বা পীর খাঞ্জা, খানজাহান খান নামে পরিচিত। আলী তার নামের শেষে পরবর্তী কালে যুক্ত হয়েছে মূলত নামের সাথে মিলের কারণে।
জন্ম ও জন্মস্থান : খানজাহান আলীর প্রকৃত জন্ম তারিখ কবে তা কোন নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায় না। তার মাজারগাত্রে লেখা শিলালিপি থেকে যতদূর জানা যায় তিনি তুরস্কের খাওয়ারিজিমে জন্মগ্রহণ করেন। তবে ধারণা করা হয় যে, তিনি ৮০ বছরের মত জীবিত ছিলেন। তার মৃত্যু তারিখ ২২ মতান্তরে ২৩ অক্টোবর, ১৪৫৯ এ হিসেবে তার জন্মসাল হয় ১৩৭৯ খ্রিষ্টাব্দে।
তার পিতা-মাতা ও বাল্যজীবন : তার পিতার নাম ছিল আজর খান এবং মাতার নাম আঙিনা বিবি। ইখতিয়ার উদ্দীন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খিলজীর অভিযানের বেশ পরে চৌদ্দশতকের শেষের দিকে খান জাহান বাল্যাবস্থায় তার পিতা-মাতার সাথে গৌড়ে আগমন করেন। বাল্যকালে তার নাম ছিল কেশর খান বা কেশর খাঁ। তার পিতা খানজাহানকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য প্রখ্যাত ওলি হযরত নুর কুতুবুল আলমের মাদরাসায় পাঠান এবং এখানে অধ্যয়নরত অবস্থায় তার পিতা ইন্তিকাল করেন। তখন মাতা আঙিনা বিবি অনেক কষ্টে তাকে লালন পালন করতে থাকেন। পরবর্তীতে খানজাহান আলী (রহ) বাদশা হোসেন শাহের তত্ত্বাবধানে রাজ দরবারে প্রতিপালিত হন।
কর্মজীবন: হোসেন শাহের মৃত্যুর পর রাজ দরবারের লোকেরা হযরত খানজাহান আলীর সাথে বিদ্রƒপাত্মক আচরণ করতে থাকে। এমনকি তার মাতার জন্য রাজদরবার কর্তৃক বেতন ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই সব ঘটনা খানজাহান তার ওস্তাদ নুর কুতুবুল আলমের কাছে ব্যক্ত করেন। ওস্তাদ তার কষ্ট অনুধাবন করে তৎকালীন জৌনপুরের প্রতাপশালী সুলতান ইব্রাহীম শর্কির নিকট পত্রসহ খানজাহানকে প্রেরণ করেন। পত্রে তিনি খানজাহানের সৎ চরিত্র ও প্রতিভার কথা উল্লেখ করেন। এই কর্মবীরের কর্মময় জীবনকে কয়েকটি ভাগে তুলে ধরেছি।
সৈনিক জীবন: ইব্রাহীম শর্কি হযরত নুর কুতুবুল আলমকে খুব শ্রদ্ধা করতেন এবং তার কথার প্রতি গুরুত্ব দিতেন। ফলে চিঠি পাওয়া মাত্র তিনি খানজাহানকে একজন সাধারণ সৈনিক পদে নিয়োজিত করেন। শুরু হয় তার সৈনিক জীবন।
সেনাপতি পদে খানজাহান: সৈনিক খানজাহান অল্প সময়ের ব্যবধানে তার প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে একজন সাধারণ সৈনিক থেকে প্রধান সেনাপতি পদে অধিষ্ঠিত হন। খানজাহান যখন জৌনপুরের প্রধান সেনাপতি তখন গৌড়ের সামাজিক ও ধর্মীয় অবস্থা খুবই করুণ হয়ে পড়ে। এ সময় গৌড়ের শাসনকর্তা ছিলেন রাজা গনেশ। তিনি ক্ষমতায় এসে মুসলমানদের উপর অমানুষিক অত্যাচার নির্যাতন চালাতে থাকেন। অত্যাচারের মাত্রা যখন চরমে পৌঁছে তখন নুর কুতুবুল আলম ইব্রাহীম শর্কির কাছে ইসলাম রক্ষার্থে এবং গণেশকে দমনের আহ্বান জানিয়ে পত্র লেখেন। পত্র পেয়েই সুলতান ইব্রাহীম শর্কির প্রধান সেনাপতি খানজাহানের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক সৈন্য প্রেরণ করেন। এবং রাজা গণেশকে পরাজিত করেন। যুদ্ধ শেষে খানজাহান সুলতান শর্কির অনুমতি নিয়ে ওস্তাদ নুর কুতুবুল আলমের কাছে থেকে যান। ওস্তাদ নুর কুতুবুল আলম খানজাহানকে পেয়ে খুব খুশি হন এবং তাকে কামালিয়াতি ও বেলায়তি সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করেন। পরে ইব্রাহীম শর্কির বারবার আহ্বান সত্ত্বেও খানজাহানের আর কর্মস্থলে ফেরা সম্ভব হয়নি। ইস্তফা দেন চাকরি জীবন থেকে। এখানেই পরিসমাপ্তি ঘটে তার সৈনিক জীবনের।
বিবাহ: হযরত নুর কুতুবুল আলম খানজাহান আলীর সততা ও নিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে স্বীয় কন্যার সাথে খানজাহানের বিবাহ দেন। কিছু দিন দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেন। ইতোমধ্যে চারিদিকে ইসলামের দুঃসময় দেখে তার হৃদয় ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। স্বীয় স্ত্রীকে শ্বশুরের খেদমতে রেখে ইসলাম রক্ষা, সমাজসেবা ও ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।
ইসলাম প্রচার : এ দেশে ইসলাম প্রচারে খানজাহান আলী (রহ) যে অবদান রেখে গেছেন তা তুলনাহীন। বিশেষ করে যশোর ও খুলনাঞ্চলে ইসলাম প্রচারে ইসলামের ভাবধারার প্রচলন এবং ইসলামী সমাজব্যবস্থা প্রবর্তনে তার নাম সর্বাগ্রে স্মরণযোগ্য। ইসলামের ব্যাপক প্রচারের স্বার্থে তিনি তার শিষ্যদের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন। তার চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মাধুর্যতা এবং তার মাঝে ইসলামী বিধানের প্রতিফলন দেখে এতদঞ্চলের অমুসলিমগণও দলে দলে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এখন এ প্রবন্ধে হযরত খানজাহান আলী (রহ) এর নেতৃত্বে এতদাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ইসলাম প্রচার সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে চাই।
বারোবাজার : হযরত খানজাহান আলী (রহ) ইসলাম প্রচারার্থে সর্ব প্রথম বারো বাজারে এসে উপনীত হন। যশোর শহর হতে ১৫ কিলোমিটার উত্তরে যশোর ঝিনাইদহ সড়কের ওপরে মরা ভৈরব নদীর বাম তীরে অবস্থিত বারো বাজার। এটি অতি প্রাচীন একটি নগরী। খানজাহান আলীসহ আরো ১১ জন আউলিয়া এখানে এসেছিলেন বলে একে বারো বাজার বলা হয়। তিনি এখানে এসে এলাকার উন্নতি সাধন করেন। তার অমায়িক ব্যবহার ও সুমিষ্ট ভাষায় ধর্মের কথা শুনে বিভিন্ন স্থান থেকে লোকেরা বারবাজারে এসে ভিড় করতে থাকে। তিনি তাওহিদের বাণী দরদভরে প্রচার করায় অতি দ্রুত দলে দলে লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে তার শিষ্য ভক্ত আর অনুরক্তরা। তিনি মুসলমানদের নামাজ আদায়কল্পে একটি এক গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। বারো বাজারের ইতিহাসে এটাই হলো প্রথম মসজিদ। তার অনাড়ম্বর জীবন আর অমায়িক ব্যবহারে লোকেরা মুগ্ধ হয়ে অনেকেই বারো বাজারে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে। খানজাহান আলী (রহ) এর অবস্থানের ফলে স্থানটি মুসলমানদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এখানকার গ্রামগুলোর নামকরণ লক্ষ করলে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন সাদিকপুর, দৌলতপুর, রহমতপুর, এনায়েতপুর, মুরাদগড়, হাসিলপুর ইত্যাদি। মূলত খানজাহান আলী (রহ) এর জনহিতকর কার্যাবলি দেখে ও ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াতে মুগ্ধ হয়ে এতদঞ্চলের লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে। এভাবে বারো বাজারে ইসলাম প্রচার সম্পন্ন করে খানজাহান আলী দ্বীন প্রচারের তাগিদে বারো বাজার ত্যাগ করে মুরলীর উদ্দেশে যাত্রা করেন।
মুরলী ও কসবা : মুরলী অতি প্রাচীন স্থান। খানজাহান আলী এসে এর নাম রাখেন মুরলী কসবা। কসবা শব্দের অর্থ শহর। এটা ফার্সি শব্দ। খানজাহান আলী মুরলীতে বেশিদিন অবস্থান করেননি। এখানে তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য একটা কেন্দ্র স্থাপন করেন। যশোর জেলা তখন ব্রাহ্মণ ও হিন্দুদের দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তাদের জুলুম অত্যাচারের সীমা এতটা অতিক্রম করে গিয়েছিল যে, মানবতা তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছিল। ঠিক এমনি সময় খানজাহান আলী (রহ) মানবকল্যাণে ইসলামের মহান বাণী সাম্য ও মৈত্রীর মহান বারতা নিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। তার দুই সহচর বোরহান শাহ ও গরীব শাহকে ইসলামের সুমহান বাণী মানুষের কাছে প্রচার করার কাজে নিয়োজিত করেন। ধর্ম প্রচারে ও মানবসেবা ছিল খানজাহান আলীর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। স্বধর্মের প্রতি গভীর আস্থা ও পরধর্মের প্রতি সহনশীলতা ছিল তার অপর বৈশিষ্ট্য। হযরত খানজাহান আলী মুরলীতে হযরত বোরহান শাহ্্ ও গরীব শাহকে রেখে ইসলামী দাওয়াতের সম্প্রসারণ কল্পে অন্যত্র গমন করেন। এতে বোঝা যায় আল্লাহর দ্বীনের এই নিবেদিতপ্রাণ মুজাহিদ তার জীবনকে শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার জন্যই উৎসর্গ করেছিলেন। মুরলী কসবা হতে খানজাহান আলী তার বাহিনীকে দু’ভাগে বিভক্ত করে যাত্রা শুরু করেন। এক দল কপোতাক্ষ নদী বেয়ে সুদূর সুন্দরবন অঞ্চলে কয়রা থানার বেতকাশী গ্রাম পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। অন্যদল যার নেতৃত্বে তিনি নিজেই। সে দল ভৈরব কুল দিয়ে পায়গ্রাম কসবায় গিয়ে উপনীত হয়। এখানে আগমনকালে তিনি রামনগর গ্রামে একটি বিরাট দীঘি খনন করেন। পায়গাম ফার্সি শব্দ। যার অর্থ সুসংবাদ। আর পায়গাম হতে পরিবর্তিত উচ্চারণ প্রবাহে পায়গ্রামে রূপান্তরিত হয়েছে। এই পায়গ্রাম কসবায় হযরত খানজাহান আলীর কতিপয় শিষ্য স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। পায়গ্রাম কসবায় পীরালি সম্প্রদায়ের উৎপত্তি হয়। পায়গ্রামে খানজাহান আলী কিছুদিন অবস্থান করে ইসলাম প্রচারের প্রবল বাসনা নিয়ে তিনি বাগেরহাটের পথে রওয়ানা হন। বাগেরহাটে যাত্রাপথে তিনি পায়গ্রাম কসবা হতে পূর্ব দিকে বাসুড়ী গ্রামে আস্তানা গাড়েন। তিনি এখানে ৭০ বিঘা জমি নিয়ে একটি দীঘি খনন করেন। এখানে ইসলাম প্রচারার্থে একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করেন। এখান হতে খানজাহান আলী রানাগাতি গোপিনাথপুর এবং নাউলী হয়ে ধুলগ্রামে আগমন করেন। ধুলগ্রাম হতে ভৈরব তীর ধরে তিনি সিদ্ধিপাশা হয়ে বারাকপুর আসেন। ব্যারাক অর্থ শিবির। খানজাহান এখানে ছাউনি ফেলেছিলেন বলে এ স্থানের নাম হয় বারাকপুর। বারাকপুর হতে তিনি সদলবলে নদীতীর হয়ে ঘোষগাতী ও দীঘলিয়ার মধ্য দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করে বর্তমান দৌলতপুরের কাছে উপস্থিত হন। খানজাহান আলী সেখান থেকে সেনহাটি ও চন্দনীমহল দিয়ে সোলপুরের পথে সেনের বাজারে উপনীত হন। সেখান থেকে তিনি এক পর্যায়ে বাগেরহাটের সন্নিকটে সুন্দরঘোনা মৌজায় এসে উপস্থিত হন। পথিমধ্যে সকল স্থানে তিনি ইসলামের দাওয়াত প্রদান করেন। অনেক কষ্ট ক্লেশ ও প্রতিকূলতার সাথে সংগ্রাম করে খানজাহান আলী তার জীবনের দিনগুলোকে অতিবাহিত করেছেন।
বাগেরহাট : খানজাহান আলীর আগমন কালে বাগেরহাটের কী নাম ছিল তা জানা যায় না। তবে সুন্দরঘোনা গ্রাম ও তার আশপাশের অঞ্চল নিয়ে বর্তমান বাগেরহাট অবস্থিত। খানজাহানের ইসলাম প্রচারের মূলকেন্দ্র ছিল এই বাগেরহাট। উল্লেখ্য, নবী-রসূল, পীর আউলিয়াগণ মূলত তিনটি নীতির উপর ভিত্তি করে এ পৃথিবীতে তাদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছেন। তাহল তাবলিগে দ্বীন/বা দাওয়াতি ইলাল্লাহ, আদল ইনসাফ তথা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজসেবা। সাধক খানজাহান আলীর জীবনেও এ তিনটি নীতির প্রতিফলন পুরোপুরি দেখা যায়। খানজাহান তার সুমধুর ভাষায় দ্বীনের দাওয়াত দিতে থাকেন। সাম্প্রদায়িতকার ঊর্ধ্বে থেকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন। ইসলাম প্রচারের এই পথটি কখনই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। নবী-রাসূল ও সম্মানিত সাহাবীদের জীবন তার উজ্জ্বল উদাহরণ। খানজাহান আলীর বেলায়ও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বাগেরহাটে আগমনের পর তখনকার প্রভাবশালী হিন্দুরা সংঘবদ্ধ হয়ে খানজাহান আলীকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করে। তারা খানজাহানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। রণবিজয়পুর, রণভূমি, ফতেহপুর, পিলজংগ প্রভৃতি স্থানে খানজাহান আলী যুদ্ধের সম্মুখীন হন। অল্প সময়ের ব্যবধানে খানজাহান আলী তাদের পর্যুদস্ত করেন। সকল প্রকার প্রতিকূলতা মাড়িয়ে বাগেরহাটকে তিনি ইসলাম প্রচারের মূল কেন্দ্র রূপে বিবেচনা করে তার জীবনের সর্বশেষ অবস্থানস্থল হিসাবে গ্রহণ করে আমরণ থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। সাধনা ও সংগ্রামের মাধ্যমে খানজাহান আলী সুষ্ঠুভাবে শাসনকার্য পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি রাজ্যের উন্নয়নের জন্য নানাবিধ কর্মসূচি গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে অসংখ্য দীঘি মসজিদ সেনানিবাস প্রভৃতি নির্মাণ করেন যা সবই ছিল ইসলাম ও জনকল্যাণের জন্য নিবেদিত। খানজাহান তার নগরীকে সুন্দর ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। এর নামকরণ করেন খলিফাতাবাদ। এভাবে খানজাহান আলী খুলনা যশোরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করে এতদাঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করেন। দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম প্রচারে খানজাহান আলীর এই অবদান এই অঞ্চলের মানুষেরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্মরণ রাখবে।
খানজাহান আলী ও তার মসজিদ : হযরত খানজাহান আলী (রহ) আল্লাহর দ্বীনের প্রচারকার্যে তার কর্মকাণ্ডকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং আল্লাহর দ্বীনে দাওয়াতের সাথে সাথে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে নিয়োজিত করেন এবং এ কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) যেমন তার নবুয়তি জীবনের একটা বিরাট অধ্যায় (মাক্কী জীবন) নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের অবিচল ছিলেন। পরবর্তী পর্যায়ে তিনি আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে মাদানী জীবনে মসজিদে নববীকে মুসলমানদের প্রশাসনিক ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে পরিণত করেছিলেন। তেমনিভাবে হযরত খানজাহান আলী (রহ) ইসলাম প্রচারের সুবিধার্থে অসংখ্য মসজিদ নির্মাণ করে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। প্রবন্ধের এ-পর্যায়ে আমি খানজাহান আলী (রহ) এর নির্মিত বিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদের বিবরণ দিতে চাই।
ষাটগম্বুজ মসজিদ ও বিশ্ব ঐতিহ্য : অপূর্ব কারুকার্য খচিত পাঁচ শতাব্দীরও অধিক কালের বিশালায়তন ষাটগম্বুজ মসজিদটি খানজাহান আলীর দরগাহ হতে প্রায় দেড় কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। স্থাপত্য কৌশলে ও লাল পোড়া মাটির উপর লতা পাতার অলংকরণে মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শিল্পে এই মসজিদ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। যদিও এটা ষাট গম্বুজ নামে পরিচিত কিন্তু প্রকৃতপক্ষে চতুষ্কোণের বরুজের উপর চারটি গম্বুজসহ এতে মোট ৭৪টি গম্বুজ আছে। এবং মধ্যসারির বাংলাচালের অনুরূপ ৭টি চৌচালা গম্বুজসহ মোট ৮১টি গম্বুজ আছে। এর চৌচালা ছাদ ও গম্বুজগুলো ইট ও পাথরের ষাটটি খাম্বার দ্বারা সমর্থিত খিলানের উপর নির্মিত। মসজিদটি গঠন বৈচিত্র্যে তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। মসজিদটি উত্তর দক্ষিণে ১৫৯ ফুট ৮ ইঞ্চি ও পূর্ব পশ্চিমে ১০৪ ফুট ৬ ইঞ্চি, উচ্চতা ২২ ফুট। চার পাশের ইটের দেওয়ালের প্রত্যেক পাশের দেওয়াল ৮ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের সম্মুখ ভাগের মধ্যস্থলে একটি বড় খিলান এবং তার দুই পাশে ৫টি করে ছোট খিলান আছে। মসজিদের পশ্চিম পাশে প্রধান মেহবারের কাছে একটি দরজা মোট ২৬টি দরজা আছে। ষাটগম্বুজ মসজিদটি নিঃসন্দেহে খানজাহান আলী (রহ) এর কীর্তিরাজির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি বিধায় এটি আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে।
সরকারের প্রত্নতত্ত্ব ও যাদুঘর বিভাগ এই মসজিদের সংরক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে। ইউনেস্কো এই মসজিদটি বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
মসজিদটিতে ৮১টি গম্বুজ থাকা সত্ত্বেও ষাট গম্বুজ নাম হলো কেন? এ নিয়ে মতভেদ আছে। তবে ৬০টি খাম্বার বা পিলারের উপর মসজিদটি নির্মিত বলেই ৬০ গম্বুজ নাম হয়েছে বলে অনুমিত হয়। এটি নির্মাণে খানজাহান আলী অসংখ্য দেশী-বিদেশী রাজমিস্ত্রি নিয়োজিত করেছিলেন।
শিক্ষানুরাগী খানজাহান ও শিক্ষাকেন্দ্র : এটি যেমন খানজাহান আলী মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হতো তেমনি এটা ছিল তার দরবারগৃহ। শাসনকার্য পরিচালনার জন্য এখানে দরবার বসত। এখানে নামাজ ও সাধারণ দরবার ব্যতীত মাদ্রাসার কার্য পরিচালিত হতো। এ-থেকে শিক্ষার প্রতি খানজাহান আলী আগ্রহ পরিলক্ষিত হয়। অসংখ্য ছাত্র এখানে ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ করে। খানজাহান আলী নিঃসন্দেহে একজন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ছিলেন। এমনিভাবে ষাটগম্বুজ যেমন স্থাপত্য শিল্পে অনন্য অনুরূপ অন্যদিকে এটা খানজাহানের ইসলাম প্রচারের মূল কেন্দ্র রূপে পরিগণিত হয় এবং শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও গণ্য হয়।
কীর্তিমান খানজাহানের অন্যান্য মসজিদ : এই মহান কীর্তিমান হযরত খানজাহান আলী শুধুমাত্র ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মাণের জন্য কীর্তিমান খ্যাতি পাননি বরং তার কীর্তিরাজির মধ্যে রয়েছে সুন্দর ঘোনা গ্রামে শ্বেতপাথর দ্বারা নির্মিত কড়ে মসজিদ, খলিফাতাবাদে সোনা মসজিদ। বারো বাজারেও খানজাহান আলী অনেকগুলো মসজিদ নির্মাণ করেন। খাঞ্জেলী দীঘির পশ্চিম পাড়ে খানজাহান আলীর ৯ গম্বুজবিশিষ্ট একটি মসজিদ রয়েছে। খানজাহান আলী নির্মিত আরেকটি মসজিদের নাম সিংগার মসজিদ, যা এক গম্বুজবিশিষ্ট। এ-ছাড়া খানজাহান আলী (রহ) এর নির্মিত আরো অসংখ্য মসজিদ রয়েছে। যেগুলোর বেশির ভাগের অস্তিত্ব আজ বিলীন। তবে উল্লিখিত মসজিদগুলো এই কীর্তিমানের কীর্তিরাজির স্মৃতি চিহ্ন হয়ে রয়েছে। এই কীর্তিমানের মসজিদ নির্মাণের বিবরণ সংক্ষেপে এই পর্যন্তই।
প্রকৌশলী খানজাহান : বহুবিধ গুণের অধিকারী খানজাহান নিজেকে একজন প্রকৌশলী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার শিল্পে নৈপুণ্য ছিল অসাধারণ। খানজাহান আলী তার স্থাপত্য কাজের জন্য চট্টগ্রাম রাজমহল ও উড়িষ্যা থেকে পাথর সংগ্রহ করেন। তার নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকার ইট তার শিল্প কৌশলের পরিচায়ক। দীঘি খনন ও রাস্তা নির্মাণেও তার কৌশলী ভূমিকার প্রমাণ মেলে। সর্বদিক বিবেচনায় প্রমাণিত হয় যে, তিনি প্রকৌশল কাজে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন।
মুকুটহীন সম্রাট খানজাহান : হযরত খানজাহান আলী (রহ) বাগেরহাটের সন্নিকটে ভৈরব নদীর তীর সুন্দর ঘোনা শহরের পত্তন করেন। আর এই শহরই ছিল তার প্রশাসনিক কেন্দ্র ও রাজধানী। এখানে বসেই তিনি তার শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। পূর্ববর্তী সকল স্থানেই তিনি তার প্রতিনিধিদের রেখে আসেন। খানজাহান আলী (রহ) এর সর্বশেষ অবস্থান হলো এই দক্ষিণাঞ্চলে আসার পর এখানকার নামকরণ করেন খলিফাতাবাদ। যার বর্তমান নাম বাগেরহাট। দক্ষিণবঙ্গে আগমনের প্রথম হতেই খানজাহান আলী স্বাধীনভাবে রাজকার্য পরিচালনা করতেন। রাজস্ব সংগ্রহ ও নানা রকম অভিযোগের তদন্ত করে তিনি বিচারকার্য সমাধা করতেন। তৎকালীন গৌড়ের সুলতান তাকে কোনরূপ বাধা দেন নাই। পরবর্তীতে তিনি সুলতান নাসিরুদ্দীনের আমলে তারই সনদ নিয়ে দক্ষিণবঙ্গ শাসন করেন। তিনি স্বাধীন রাজা বাদশাহের ন্যায় বর্ণিল জীবন যাপন করতেন না। এমনকি তিনি নিজের নামে কোনো মুদ্রার প্রচলন করেননি। তিনি অতি স্বাভাবিক এবং অনাড়ম্বর জীবন যাপন পছন্দ করতেন। খানজাহান আলী তার শাসনামলে এই অঞ্চলের ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। প্রায় ২০-২৫টি গ্রাম নিয়ে তার রাজধানী খলিফাতাবাদ নাগরী গড়ে ওঠে। এখানে খানজাহান আলী নিজের বাসভবন প্রশাসনিক কেন্দ্র সেনানিবাস বা ব্যারাক ও অস্ত্রাগার নির্মাণ করেন। তার প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যে ছিল থানা নির্মাণ চৌকি নির্মাণ বিভিন্ন সরকারি দফতর কোট-কাছারি ইত্যাদি। প্রশাসন চালানোর সুবিধার্থে তিনি তার আওতাধীন দক্ষিণবঙ্গকে কয়েকটি এলাকায় বিভক্ত করেন। তিনি মানুষের ঘরে ঘরে সুশাসন পৌঁছে দেন। তিনি খলিফাতাবাদকে এমনভাবে সুসজ্জিত ও শৃংখলিত করেন যে, সুলতানি আমলে এটি একটি বিরল উপমা হয়ে আছে। হযরত খানজাহান আলী (রহ) মৃত্যু পর্যন্ত প্রায় চল্লিশ বছর এই অঞ্চল শাসন করেন। আমরা তার এই অঞ্চলকে একটি ছোটখাটো রাজ্য হিসেবে ধরতে পারি। সমগ্র রাজ্যে তিনি ইসলামী হুকুমাত কায়েম করতে সক্ষম হন। আমরা দেখতে পাই তিনি শুধু ইসলাম প্রচারকই নন বরং তিনি একজন সুশাসক হিসেবে জনগণের কাছে খ্যাতি লাভ করেন। খানজাহান আলী (রহ) এর জীবন ও কর্মবিষয়ক প্রবন্ধে এ-পর্যায়ে দৃষ্টি ফেরাতে চাই তার সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের দিকে
খানজাহান আলীর সমাজসেবা : সমাজসেবার ক্ষেত্রে খানজাহান আলী এক অসামান্য বিপ্লব সাধন করেন। দক্ষিণ অঞ্চলের দুর্গম জঙ্গলাকীর্ণ জনপদ ও এর জনগণের কল্যাণের জন্য তার আত্মদান চিরস্মরণীয়। মানবকল্যাণের জন্য তিনি এই অঞ্চলে অসংখ্য দীঘি, রাস্তা, সেনানিবাস, সরাইখানা, বিদ্যাচর্চাকেন্দ্র প্রভৃতি নির্মাণ করেছিলেন। সমাজসেবার জন্য তিনি তার সর্বস্ব দান করে গেছেন। সমাজসেবা তার অবদানের কথা সামান্য আলোকপাত করতে চাই: খানজাহান আলী ছিলেন একজন মানবদরদি ব্যক্তি। খানজাহান আলী বারোবাজার হতে বাগেরহাটে আসার পথে বেশ কিছু জায়গায় কিছুদিনের জন্য অবস্থান করেন এবং প্রত্যেক জায়গায় দীঘি, মসজিদ ও রাস্তা নির্মাণ করে সমাজ সেবামূলক কর্মকাণ্ডের নজির স্থাপন করেন। জনগণ খানজাহান আলীর সমাজসেবায় মুগ্ধ হতে থাকে। খানজাহান আলীর সমাজসেবা ও জনহিতকর কাজে যারা তাকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দান করেছিলেন সঙ্গত কারণেই তার সেই সব সহচরদের কয়েক জনের নাম এখানে উল্লেখ করছি : যেমন, মোহাম্মদ তাহির, গরীব শাহ, বাহরাম শাহ, বুড়োখাঁ, ফতেখাঁ, খালাস খাঁ, বদর খাঁ, দিদার খাঁ, এখতিয়ার খাঁ, বড় আজম খাঁ, ছোট আজম খাঁ, আনোয়ার খাঁ, শাহাদাৎ খাঁ, রেজাই খাঁ, আহমদ খাঁ প্রমুখ।
দীঘি খনন ও পানি কষ্ট নিবারণ : খানজাহান আলী আগমনকালে এতদঞ্চলে বিশুদ্ধ পানির অভাব ছিল প্রকট। জনগণের এই পানির সমস্যা সমাধানকল্পে খানজাহান আলী যে, স্থানেই পদার্পণ করেছেন প্রায় সবখানেই ছোট বড় অসংখ্য দীঘি খনন করেছেন। শত শত বছরব্যাপী এই দীঘিগুলি মানুষের পানি কষ্ট নিবারণ করে আসছে। যেমন- ঘোড়াদীঘি, খাঞ্জেলী দীঘি, কোদাল ধোয়া দীঘি, পচা দীঘি ও এখতেয়ার খার দীঘি ইত্যাদি। এ ছাড়া অন্য জায়গায় সরল গ্রামের দীঘি, লস্করের গ্রামের দীঘি, বাসুড়ী গ্রামের দীঘি, ব্রাহ্মণগাতী গ্রামের দীঘিসহ জানা অজানা আরো অসংখ্য দীঘি খানজাহান আলী (রহ) এর সমাজ সেবার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মানবকল্যাণে এই দীঘিগুলো শত শত বছর ধরে জনগণের উপকার সাধন করে চলেছে।
রাস্তা নির্মাণ : রাস্তা নির্মাণের ক্ষেত্রে খানজাহান আলী ব্যাপক অবদান জনগণের দৃষ্টি আকৃষ্ট করে। দক্ষিণাঞ্চল তখন নদী-নালা জঙ্গলে পূর্ণ ছিল। খানজাহান আলী দেখলেন এলাকার উন্নতিকল্পে রাস্তা ঘাট নির্মাণ খুবই প্রয়োজন। এ জন্য তিনি যে স্থানে পদধূলি ফেলেছেন, প্রায় সব স্থানে রাস্তা নির্মাণ করেছেন। খানজাহান আলীর সময়ে বারোবাজার থেকে খলিফাতাবাদ পর্যন্ত দীর্ঘ রাস্তা নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া খানজাহান আলী (রহ) আরো অসংখ্য রাস্তা নির্মাণ করেছেন। যা বিভিন্ন স্থান হতে খলিফাতাবাদ এসে মিলিত হয়েছে।
ইন্তেকাল : আল্লাহর প্রেমে পাগলপারা এই মহান সাধক হযরত খানজাহান আলী (রহ) হিজরির ২৬ জিলহাজ, ইংরেজি ১৪৫৯ খ্রি:, ২২ মতান্তর ২৩ অক্টোবর আল্লাহর সান্নিধ্যে ইহজগৎ ত্যাগ করেন।
পরিশেষে : হযরত খানজাহান আলী (রহ) এর জীবন ও কর্মবিষয়ক প্রবন্ধের সবশেষে বলতে চাই তিনি আজ নেই। আছে তার স্মৃতি, ত্যাগ ও মহান আদর্শ। যা আমাদের জন্য চলার পথের পাথেয় ও অনুকরণীয়। আমরা তার জীবন ও কর্ম থেকে যদি মহানুভবতার কিছুটা গ্রহণ করি তাহলে আমাদের জীবনও হবে সুন্দর সার্থক।
এই মুকুটহীন সম্রাট তার সমগ্র জীবনকেই মানবতার কল্যাণার্থে ব্যয় করে গেছেন। ইসলাম প্রচারক সুশাসক, সমাজসেবক, সংস্কারক, ন্যায়বিচারক, সেনানায়ক, মানবদরদি হিসেবে তার যুগান্তকারী অবদানের জন্য মানুষ তাকে চিরদিন স্মরণ রাখবে।
গ্রন্থপঞ্জি ও তথ্যসূত্র
এ. এফ. এম আব্দুল জলিল, সুন্দরবনের ইতিহাস।
ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ সম্পাদিত ইসলামী বিশ্বকোষ (নবম খণ্ড)।
শাহ মাহমুদ বখত চিশতি, বাংলাদেশে সুফীবাদের দিশারী যারা।
গোলাম সাকলায়েন, পূর্ব পাকিস্তানে সুফী সাধক (বাংলা একাডেমি)।
গোলাম মোস্তফা সিন্দাইন, খুলনা জেলায় ইসলাম।
ড. হাবিবা খাতনু, বাগেরহাটের খানজাহান (দৈনিক খবর ঢাকা ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৯)।
অধ্যাপক মোঃ আবু তালেব, যশোর জেলায় ইসলাম।
আ. ন. ম. বজলুর রশিদ, আমাদের সুফী সাধক।
মোঃ আব্দুর রহিম, হযরত খানজাহান আলী।
সৈয়দ ওমর ফারুক হোসেন, খানে আজম হযরত খানজাহান আলী।
আব্দুল মান্নান তালিব, বাংলাদেশে ইসলাম।
মো: মাসুম আলীম, হযরত খানজাহান আলী (জীবন ও কর্ম)।