একটি তীক্ষ্ণ টিল বিদ্ধ করে মনের অতলে
যদি কেউ ভেবে দেখে কি হয় সেখানে…
(বেদনার মন)
এই দুঃখের কারখানার কারিগর কবি ওমর আলী বাংলা সাহিত্যের একটি জ্বলজ্বলে নক্ষত্র, অন্ধকারের জ্যোতি। শব্দের কারিগর, কাব্য নির্মাতা। নির্ভেজাল, নিরহঙ্কার। সাদামাঠা, মাটির মানুষ। স্বল্পবাক নিভৃতচারী কবিতা প্রেমিক। তাঁর আত্মবিশ্বাসী অভিমানী মন, ধুলো মাটিতেই ছিল নিত্য বসবাস। ১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে আসার পর আর কখনো ওমুখো হননি। সব ফেলে, সব কোলাহল ছেড়ে ফিরে আসেন ঘরে। কি জানি, কি অভিমানে!
তিনি ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক। সবশেষে পাবনা সরকারি শহীদ বুলবুল কলেজ থেকে অধ্যাপনার সময় ১৯৯৯ সালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সে সময়েই বুলবুল কলেজের উত্তর পাশে এক কামরার একটি ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন। অবশ্য সেখানে তিনি রাত কাটাতেন না, দিনে এসে থাকতেন। ঘরের আসবাবপত্র বলতে চেয়ার টেবিল আর দু’খানা বেঞ্চ। সেগুলোও ছিলো বইয়ের দখলে। সারা ঘরময় ছিল বই আর বই। সেটা ছিলো ওমর আলীর বইয়ের সংসার। ওখানে তিনি পড়তেন, লিখতেন এবং পড়াতেন। সেখানে কেউ তার সাথে দেখা করতে গেলে বসতে দেওয়ার জায়গা পেতেন না। বই সরিয়ে বসতে দিতেন।
তিনি ছিলেন কবিতার প্রকৃত পাঠক। জীবনানন্দ দাশ, অমিয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র, সমর সেন প্রভৃতি কবির রচনা প্রচুর পড়তেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতা তাঁকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন এর আদলে লিখেছেন- ‘জিনিয়া হোসেন’-
‘এই যে শুনুন, আমি ভীষণ বিপদে পড়ে গেছি, বুঝলেন’-
জোনাকির মত দু’টি চোখ তুলে বললেন জিনিয়া হোসেন।
চুল তার সুচিকন কচুরিপানার কালো শিকড়ের মত
শ্যাম্পু করার ফলে ফুরফুরে বাতাসে উড়ছে অবিরত-
(শ্রেষ্ঠ কবিতা)
প্রেম ও নিসর্গের কবি ওমর আলী। তাঁর কবিতায় একদিকে যেমন মানবীয় প্রেম ফুটে উঠেছে অন্য দিকে নিসর্গের চিত্র ধরা দিয়েছে অনায়াসে- উন্মুক্ত সবুজ মাঠ, বুনো ঝাউ, শয্যার মতন ঘাস, অরণ্যের সাদা, লাল ফুল, শিয়াল কাঁটার বন, ঝুমকো লতা, উড়ন্ত কপোতের ডানায় রৌদ্রের সৌন্দর্য, তারপর বকুলের পাতা ঝরা মাঠে-
ওইখানে চলো শুয়ে থাকি সারাদিন সারারাত
যেখানে সুন্দর নদী। শিয়াল কাঁটার ঘনবন।
বকুলের পাতাঝরা মাঠ কিংবা হাওয়ার আঘাত
তৃণশীর্ষে। ঝুমকোলতার বুকে আনে শিহরণ-
(গ্রামে, শ্রেষ্ঠ কবিতা)
আমাদের কাব্যসম্পদের নির্দিষ্ট কোনো সীমারেখা নেই। শুধু আমাদের কেন পৃথিবীর কোনো জাতীর কোন ভাষার-ই বোধ হয় তা নেই। মাটি ও মানুষের রসে সিঞ্চিত হয়ে কবিতা ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে, প্রাণবন্ত হয়। কবির চতুর্দিকে ছড়িয়ে থাকে কবিতার উপকরণ। খোলা মাঠ, মাঠের কৃষক, সবুজ শস্যক্ষেত্রের উপর উড়ন্ত সাদা বক, স্বাস্থ্যবতী রমণী, গ্রামীণ যুবকের গান, মৌমাছি, পাখি, প্রজাপতি, পুকুরের ফুটন্ত শাপলা, এ সবই যেন এক স্বর্গীয় আবেশ, দেশকে সুখী ও সুন্দর করতে তিনি প্রবল আগ্রহী, উৎসাহী; এতে যত বাধাই আসুক। সমস্ত বাধা ডিঙোবার শক্তি সঞ্চিত রয়েছে তার হৃদয়ের একান্ত গোপন কোণে। তিনি কৃষকের হয়ে স্বপ্ন দেখেন-
আমার দেশকে আমি কি দিতে পেরেছি, দিতে পারি,
শষ্যক্ষেত্রে বলিষ্ঠ কৃষক,
গ্রামের জলার ধারে সাদা সাদা বক,
নদী থেকে জল নিয়ে ফিরে যায় স্বাস্থ্যবতী নারী-
সাগর পাড়ের এই দেশে মুখ ফেরালেই চোখে পড়ে হাসি মাখা অবলা নারীর মুখ। তার সরলতা আইভি লতার মত। সদ্যোস্নাত সে রমণী ভিজা চুল রোদ্রে শুকায়। তার এই সরলতার কারণ কী? কবি মনে করেন, সে এদেশের মাটি দিয়ে গড়া- তাই। এই শ্যামল রঙা রমণী হরিণীর মত অবাক চোখে চেয়ে থাকে, তার সমস্ত শরীরে এদেশের নদীর মতোই বাঁধভাঙা জোয়ার, হালকা লতার মত শাড়ি নারীর যৌবনকে ডেকে রাখে। বাঙালি রমণী শাড়িতেই মানায়, অন্য কিছুতে নয়। সংসারপ্রিয় বাঙালি নারীর এক হাতে কোলের শিশু অন্য হাতে রান্নার উনুন। তার মরদের মন্দ আশঙ্কায় সর্বদা চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তার সাজানো- গোছানো সংসারকে সে কখনো ভাঙে না, ভাঙতে চায় না। কবি ওমর আলীর কবিতা পড়ে আরেক খ্যাতিমান কবি আল মাহমুদ জানিয়েছেন, “তোমার কবিতায় বাংলাদেশের প্রকৃতির যে গন্ধ পাওয়া যায় তাতে আমার মত মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি।” কারণ, কবি আল মাহমুদ কবি ওমর আলীর এদেশের শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছেন-
এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি,
আইভি লতার মত সে নাকি সরল, হাসি মাখা;
সে নাকি স্নানের পরে ভিজেচুল শুকায় রোদ্দুরে
রূপ তার এদেশের মাটি দিয়ে যেন পটে আঁকা-
(এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি)
বাঙালি হার না মানার জাতি, বীরের জাতি। ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশ বিভাগের পর বাঙালি জাতি ও জাতীয়তাবাদের উপর নেমে আসে অসুরের খড়গ। কোটি প্রাণের প্রাণ প্রবাহকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য চলতে থাকে গোপন চক্রান্ত। নেমে আসে মাতৃভাষার উপর তুমুল আঘাত। মাতৃভাষাকে রক্ষার জন্য বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয় রাজপথে এদেশের সাহসী সন্তানেরা। থেমে থাকেননি কবি-সাহিত্যিকগণও। কবি ওমর আলী প্রচণ্ড ঘৃণায় ফেটে পড়েন-
প্রচন্ড বজ্রের মতো আমার কণ্ঠ-যদি হতো
আর ফেটে পড়তো ঢাকার মেডিকেল কলেজের
রাস্তার মিছিলে অগ্নিগিরির উত্তাপ লাভার মতো
ঊনিশশো বায়ান্নোর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন-
(বুলেটবিদ্ধ হয়ে বাংলাভাষা : স্বাধীনতার কবিতা)
১৯৭১ সালে আমাদের অস্তিত্বের প্রশ্নে কবি ওমর আলীর কাটে নির্ঘুম উদ্বেগের রাত্রি। তাঁর ব্যথিত হৃদয় আর্তি জানায়-
কি নিষ্ঠুর পরিহাস আমাকে দিয়েই
খোঁড়া হলো আমার কবর
আমাকে জীবিত তাতে চাপা দেয়া হলো
কিংবা তার আগে আমি দাঁড়িয়ে আমার কাঠস্বর-
স্তব্ধ আর বারংবার গুলিবিদ্ধ আমি-
(বাংলাদেশ : ১৯৭১)
ভাগ্যবিড়ম্বিত কবি ওমর আলী। সারা জীবন কাব্য সাধনায় মগ্ন হয়ে অর্থবিত্তকে পায়ে ঠেলেছেন। অর্থের প্রতি তার কোনো মোহ ছিল না। হয়ত একারণেই সৎভাবে সহজ সরল জীবন যাপন করতে পেরেছেন। কবি-সাহিত্যিকগণ কখনো প্রাপ্তির প্রত্যাশা করেন না। তবু এক সময় তা আপনিতেই এসে ধরা দেয়। কবি ওমর আলী ‘এ দেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্য গ্রন্থের জন্য ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন।
কবি ওমর আলী শেষ বয়সে এসে হঠাৎ (২৩ মার্চ ২০১২ ইং) অসুস্থ হয়ে পড়েন। চলাচলের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন, এমনকি তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। ঢাকা ল্যাব এইড হাসপাতাল তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। কিন্তু শারীরিক অবস্থার আর তেমন উন্নতি হয়নি। অসহায় এ কবির পাশে পাবনার বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকগণ তাঁর নিয়মিত খোঁজ খবর নেন। তাঁদের মধ্যে ড. আশরাফ পিন্টু, কবি মানিক মজুমদার, দেওয়ান বাদল, আজাদ এহতেশাম প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
ড. আশরাফ পিন্টু ছিলেন কবির অত্যন্ত স্লেহাস্পদ। আশরাফ পিন্টু কবির সাহিত্যকর্মের উপর একটি গবেষণাগ্রন্থ রচনার তাগিদ অনেকদিন ধরেই অনুভব করে আসছেন। যখন তাঁর সাহিত্যকর্মের কাজ শুরু করেন (২০ জুলাই ২০১৫ ইং) তখন কবি অসুস্থ নির্বাক, জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। ড. আশরাফ পিন্টু এবং আজাদ এহতেশাম দুই মাসব্যাপী নিরলস পরিশ্রম করে ‘ওমর আলী জীবন ও সাহিত্যকর্ম’ নামক একটি চমকপ্রদ গবেষণাগ্রন্থ রচনা করেন। কবি ওমর আলী সম্পর্কে এটিই সম্ভবত প্রথম গবেষণাগ্রন্থ।
বাংলাদেশ কবিতা সংসদ পাবনা এর সভাপতি, কবি ও প্রাবন্ধিক মানিক মজুমদার কবির অকৃত্রিম সহচর ছিলেন। কবি ওমর আলী তাঁকে ভাইয়ের আদরে স্নেহ করতেন।
কবি মানিক মজুমদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় কবি ওমর আলীর জীবন ও সাহিত্য কর্মের উপর গ্রন্থ ‘নিভৃতচারী কবি ওমর আলী’।
এ ছাড়া দেওয়ান বাদল ও মাসুদ মোস্তফা কবির জীবন ও সাহিত্যকর্মের উপর নির্মাণ করেন ‘নিঃশব্দ বাড়ি’ নামক এক প্রামাণ্যচিত্র।
কবি ওমর আলী পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবিদের একজন হয়ে ঊঠেছিলেন তাঁর স্বকীয়তায়। তার এই নিজেস্ব ভঙ্গীমার কারণে একালের তরুণ কবিদের জন্য তিনি অবশ্যই পাঠ্য। কবি ওমর আলীর কবিতা দিয়েই এ প্রবন্ধের ইতি টানতে চাই-
আমার ভেতরে সেই চৌচির তৃষ্ণা কেঁদে ওঠে।
শীতল পাত্রভরা এখন তোমাকে চাই চাই-
(আমার ভেতরে তৃষ্ণা কাঁদে : যে তুমি আড়ালে)
সহায়ক:
এদেশে শ্যামলরঙ রমণীর সুনাম শুনেছি : ওমর আলী (ত্রয়ী ১ম সংস্করণ, জানুয়ারি-১৯৯৫)।
ওমর আলী জীবন ও সাহিত্যকর্ম : ড. আশরাফ পিন্টু ও আজাদ এহতেশাম (গতিধারা প্রকাশনী, ঢাকা- ২০১৬ ইং)।
শ্রেষ্ঠ কবিতা : ওমর আলী (গতিধারা প্রকাশনী- ঢাকা, ২০০২ ইং)।
আধুনিক কবি ও কবিতা : হাসান হাফিজুর রহমান (সময় প্রকাশনী, ঢাকা ২০০০ ইং)।
নিভৃতচারী কবি ওমর আলী : মানিক মজুমদার সম্পাদিত (রুপম প্রকাশনী- পাবনা, ২০১৬ ইং)।
দৈনিক যুগান্তর (১২ অক্টোবর ২০১৮ ইং)।