বিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকে বাংলা কাব্যের বিষয় বৈচিত্র্যে ভাব-ভাষা ও শৈল্পিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন সূচিত হতে থাকে। পাশ্চাত্য সাহিত্যের প্রভাব ও পরিবর্তনের ধারায় বাংলা কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত ঘটায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী হতাশা, নৈরাশ্য, বিচ্ছিন্নতাবোধ, ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও তার ক্রমাবনতি, মানবিক বিপর্যয়, ক্লেদাক্ততায় সংকটাপূর্ণ জীবনের বিপর্যয় ক্রমে ক্রমে প্রকটরূপ ধারণ করে। পরপর দু’টি দশকে মানব অস্তিত্বের সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। এই সংকট দূর অতিক্রম করে বাংলা কবিতায় প্রভাব ফেলে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী কবিগণের কাব্যভাবনা, বোধ ও বোধির সত্তায় মানব অস্তিত্বের টানাপড়েন ও নানা সংকট ও অসঙ্গতি ধরা পড়ে। এদের লেখনী স্পর্শে বাংলা কাব্যে আধুনিকতার যাত্রা সূচিত হয়।
রবীন্দ্র প্রভাববলয়মুক্ত, জীবন সম্পর্কে নব নব উপলব্ধি, প্রাচীন মূল্যবোধের প্রতি তীব্র সংশয়, প্রেম ও মৃত্যু সম্পর্কে বাস্তবানুগ চিন্তা-চেতনা, কাব্যের আঙ্গিক শৈল্পিপকতায় পরিবর্তন আধুনিকতার লক্ষণ বিবেচিত হলেও অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নাগরিক চেতনায় প্রকাশ।১ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মতো কবি-সাহিত্যিকগণের হৃদয়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। তাই তাঁদের কবিতায় ও চিন্তা-চৈতন্যে জীবনবোধের নতুনত্বে এক ধরনের বাঁকবদল প্রতিফলিত হয়- যা আধুনিকতার স্বরূপে বাংলাকাব্যে ব্যাপকভাবে অনুসৃত হতে থাকে। এ সময়ের কবিদের তিরিশোত্তর কবি অভিধায় অভিষিক্ত করা হয়ে থাকে।
তিরিশোত্তর কবিদের কাব্যভাবনার একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো নগর চেতনা। ‘বিশ্বসাহিত্যে টি. এস. এলিয়ট, বোদলেয়ার, র্যাবোঁ, লাফর্গ, করবিয়ের সাহিত্যকর্ম প্রবলভাবে নগর তাড়িত।’২ বাংলাসাহিত্যে যে সকল কবির কাব্য ভাবনায় প্রবলভাবে নগর ও নগর জীবনের প্রতিচ্ছবি উঠে এসেছে তাঁদের মধ্যে তিরিশের কবি খ্যাত জীবনানন্দ দাশ (১৮৯৯-১৯৫৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্ত (১৯০১-১৯৬০), প্রেমেন্দ্রমিত্র (১৯০৪-১৯৮৮), বিষ্ণুদে (১৯০৯-১৯৮১), অমিয় চক্রবর্তী (১৯০১-১৯৮৬), বুদ্ধদেব বসু (১৯০৮-১৯৭৩) প্রমুখ। পরবর্তীকালে শামসুর রাহমান (১৯২৩-২০০৬), শহীদ কাদরী (১৯৪২-২০১৬), আবুল হোসেন (জ. ১৯২২), আবুল হাসান (১৯৪৭-১৯৭৫), সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬), হাসান হাফিজুর রহমান (১৯৩২-১৯৮৩), ফজল শাহাবুদ্দীন (জ. ১৯৩৬), আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ (১৯৩৪-২০০১), কামাল চৌধুরী (জ. ১৯৫৭) প্রমুখের কবিতা নাগরিক চিন্তাচেতনায় ঋদ্ধ। উল্লিখিত কবিগণ নগর চেতনাকে ধারণ করে নিজস্ব বোধ ও বোধির সংশ্রবে আধুনিক বাংলা কাব্য সাহিত্যে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে আছেন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আবিদ আজাদের কবিতায় নাগরিক জীবনের প্রভাব বিষয়ে দৃক্পাত করার প্রয়াস পাব।
স্বাধীনতা-পরবর্তী কবিদের মধ্যে প্রাগ্রসর কবি আবিদ আজাদ (১৯৫২-২০০৫)। যুদ্ধোত্তর পটভূমিকায় সদ্য স্বাধীন দেশের নানা সংকট, দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তন, নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়, অসম প্রতিযোগিতা, ভুঁইফোঁড় নেতাদের আবির্ভাব ইত্যাদি বিষয় তাঁর কবিতার উপজীব্য হয়েছে। আবিদ আজাদ তাঁর সমকালীন জীবনচিত্রকে কাব্যে রূপায়িত করে তুলেছিলেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী পর্যায়ে জাতীয় জীবনের অবক্ষয় ও দুর্যোগকে নিরাসক্ত দৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করে তা তাঁর কাব্যে প্রতিফলিত করেছিলেন। একজন কবি হিসেবেই তিনি নিজের ভূমিকা পালন করেছেন, সংস্কারকের ভূমিকা পালনে তাঁর আগ্রহ ছিল না।’৩
সদ্য স্বাধীন হওয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যুদ্ধের ভয়াবহতা, ক্ষয়ক্ষতি ও মানবতার বিপর্যয় প্রত্যক্ষ করে মর্মাহত ও নির্বাকপ্রায় কবি তাঁর অসংখ্য কাব্য পঙ্ক্তিতে সে চিত্র তুলে ধরেছেন নিখুঁত তুলির আঁচড়ে। বিধ্বস্ত ঢাকা শহর প্রিয়জনের মতোই কবি হৃদয়ে শাশ্বত ও জাগ্রত কিন্তু যুদ্ধ শেষে তা ধ্বংসস্তূপ, বিরান, জনশূন্য, ভয়াবহ যুদ্ধের নির্মমতার জাজ্বল্যমান সাক্ষী। কবি হৃদয়ের ক্ষোভোক্তি তাঁর কাব্য পঙ্ক্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে :
যে শহরে আমি নেই আমি থাকব না সে শহরে যুদ্ধ শেষের
ভাঙ্গা পোড়ো একটা এয়ারপোর্টের মতো বেঁচে থাকবে তুমি
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে স্কাটপরা বুড়ি
বার্মিজ মহিলার মতো ভৌতিক নির্জনতা
তোমাকে ঘিরে সারাক্ষণ ঝুলে থাকবে নছতছ তারের জটিলতা।
[“যে শহরে আমি নেই আমি থাকবো না”, ‘বনতরুদের মর্ম’]
নগর প্রকৃতিতে বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ কর্মবিমুখতায় অবরুদ্ধ গৃহকোণে অন্তরে মুগ্ধতার পরশ ছড়ায় না। রাজপথের কালপিচের কংক্রিটে বৃষ্টি, ছাদে বৃষ্টি, জানালার শার্সিজুড়ে বৃষ্টি পড়ে টাপুরটুপুর শব্দে। কিন্তু গ্রামীণ প্রকৃতির বৃষ্টির মতো কখনো ভাবালোকের স্বাপ্নিক কল্পনার রাজ্যে আমাদের পৌঁছে দেয় না। কবি হৃদয়ের অনুভূতিতে বৃষ্টিস্নাত নাগরিক জীবনের চালচিত্র তাঁর নিখুঁত কবিতার আখরে মূর্ত হয়ে উঠেছে :
টাপুর টুপুর টাইপরাইটারের শব্দে বৃষ্টি নামলো সারা মতিঝিলে
বৃষ্টি নামল রিমঝিম রিমঝিম কমার্স বিল্ডিং এর ছাদে
বৃষ্টি নামল দোতলার তেতলার সারিসারি জান্লার শার্সিজুড়ে
আর দূর স্ট্রিটে ছত্রখান শিরিষের
পাতার ছায়ায় কাঁপে ব্যাংকিং আওয়ার।
[“বৃষ্টি”, ‘বন তরুদের মর্ম’]
শহরে নিয়ন বাতির আলোর উদ্ভাসনে প্রকৃতির বহুবর্ণিল বৈচিত্র্য এখানে অনুপস্থিত ও জৌলুসহীন। রাতের গভীর নিকষকালো অন্ধকার এবং পূর্ণিমার জ্যোৎস্না উদ্ভাসিত রাতের স্নিগ্ধতা কোনটিই শহরে দৃশ্যমান নয়, সবই সমান। প্রকৃতির ভিন্নতায় যাপিতজীবন ও অনুভবে ভিন্নতার পরশ ছুঁয়ে যায়। শহরে ইটপাথরের রাজপথে মিছিল মিটিং হয়। ভাঙচুর হয় গাড়ি, অফিসের দরজা জানালা। তবু প্রিয়জন সান্নিধ্য বঞ্চিত কবির সাথে হারিয়ে যাওয়া হৃদয়ে আসন পাতা তার সাথেই যেন বার বার প্রিয় শহরে দেখা হয়ে যায়:
এই শহরেই হয়তো কখনো কোন চাঁদহীন স্ন্যাকবারে, রেস্তোরাঁয়
ফাল্গুন শেষে চৈতালী এক বিকেলে
ঝরা পাতাদের মর্মর ভরা কোনো এভেনিউ পেরুতে
মিছিলের পরে ইট পাটকেল ছড়ানো বিদেশী দূতাবাসের
ভাঙাচোরা আর জানালার গ্রিল ছেঁড়া তছনছ দুপুরে
দেখা হয়ে যাবে আবার
তোমার আমার দেখা হবে বার বার।
[“দেখা হবে”, ‘বনতরুদের মর্ম’]
সভ্যতার ক্রমোন্নতির ধারার বহুবিধ সুযোগ সুবিধার কারণে শহরের দিকে ছুটছে মানুষ। গ্রামের শিক্ষিত মানুষের শেষতক ঠাঁই হয় শহর-নগরে। কিন্তু বর্তমানে শহর শান্তি-সুস্থিতির নিরাপদ স্থান নয়। চাঁদাবাজি, প্রতারণা, খুন-হত্যার মতো জঘন্য কাজ-কর্ম শহরে আজ নির্দ্বিধায় সংঘটিত হচ্ছে। দুর্বল নিরীহ মানুষ শোষিত হচ্ছে ক্ষমতাধর নেতা-মাস্তানের দৌরাত্ম্যে। কবির উপলব্ধিতে শহর আজ নানা অপরাধের স্বর্গভূমি:
অবশেষে জ্যোৎস্নানাম্বী গৃহবধূটির
সন্ধান পাওয়া গেছে গতকাল-
গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করেছে তাকে
শহরতলীর এক বিষন্ন পার্কের
লেক ঘেঁষা ঝোপের ভিতর থেকে।
[“ক্রাইম রিপোর্ট”, ‘বনতরুদের মর্ম’]
কবি হৃদয়ের অনুভবে নাগরিক জীবনের প্রতিচ্ছবি নানা চিত্রকল্পে উঠে এলেও বিশেষ কোন নগরের স্মৃতি ও ভালোবাসা কবির হৃদয়জুড়ে এখন ভাস্বর- আর সে নগর হলো রাজশাহী। এ শহর যে কখন কবি হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে তা কবিরই অজানা। এখানে পৌষ-মাঘের গভীর কুয়াশা, গ্রীষ্মকালে আমের প্রাচুর্যে মুগ্ধ কবিচিত্ত এ নগরের প্রতি তীব্র আকর্ষণ বোধ করেন। তাইতো কবি সকল কিছু তুচ্ছ করে আমগাছের সুশীতল ছায়াতলে রাজশাহী শহরে বার বার ছুটে আসতে চান:
রাজশাহী কে? কোথায় ছিলো? রাজশাহী কি মস্ত কোনো টিলা শহর?
ওখানে কি কুয়াসা খুব? ওখানো কি সারা গ্রীষ্ম আম্র কানন
গাছের ছায়া ধরে রাখে গাছের ছায়ায় আড়ালটুকু?
রাজশাহী কি ধূসর মাটির বুকের উপর অনেকগুলো বাংলোবাড়ি
রিজার্ভ করে রেখে দিয়েছে আমার জন্যে?
তাহলে যাই, মন বলছে রাজশাহী যাই, রাজশাহী যাই।
[“মন বলছে রাজশাহী যাই”, ‘রাজশাহী যাই’]
নাগরিক জীবন আরাম-আয়েশ ও স্বচ্ছন্দময়তার কেন্দ্রবিন্দু হলেও কোন কোন সময় বাসের অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। বহুলোকের সমাগম হওয়ায় ময়লা, নোংরা আবর্জনা জমে প্রচুর পরিমাণে। ঠিকমতো পরিষ্কারের অভাবে অনেক সময় ময়লা আবর্জনা পচে উৎকট গন্ধ ছড়ায় চারদিকে। নাগরিক জীবনের এ এক প্রাত্যহিক চালচিত্র কবির কাব্য পঙ্ক্তিতে ভাস্বর হয়ে উঠেছে:
উস্কো খুস্কো ধোঁয়া ওঠা চটপরা খুপরিঘর হাঁ-করা চারিদেকে
আর অন্ধকারের সমান খিরকি-জানালা সারি সারি
পৌর কর্পোরেশনের এই সব একহারা বাড়ি;
কোমরের পাশে উল্টানো ময়লার গাড়ি
বালতি।
[“চৌদ্দ টুলি”, ‘শীতের রচনাবলি’]
অতিরিক্ত মানুষের ভার, লক্ষ লক্ষ যানবাহন, রিকশা, গাড়ি নগরবাসীকে কোন কোন সময় অতিষ্ঠ করে তোলে। জরুরি মুহূর্তের চেকপোস্টে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকে গাড়ি। সবকিছু স্থবির হয়ে যায়। বাড়তে থাকে মানুষের ভোগান্তি। নগর জীবনের এ চিত্র এখন নিত্য নৈমিত্তিক। আবিদের কবিতায় সে কথারই সাদৃশ্য মেলে:
তার জন্যে এক্ষুনি রাস্তায় রাস্তায় বসে যাবে চেকপোস্ট
শাহবাগের মোড়ে
টিকাটুলির তেমাথায়
ফার্মগেটের সামনে থামিয়ে দেয়া হবে
সমস্ত চলন্ত বাস, কোচ আর কোস্টার
লাইন করে দাঁড় করিয়ে দেয়া হবে সারি সারি রিক্সা ও ঠেলাগাড়ি।
[“এখন যে কবিতাটি লিখবো আমি”, ‘আমার স্বপ্নের আগ্নেয়াস্ত্রগুলি’]
ইট-কাঠ পাথর ও কংক্রিটের শহরে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত কবি একটু শান্তি ও ভালোবাসার প্রত্যাশায় উদগ্রীব হয়ে থাকেন। প্রিয়জনের ক্লান্ত মুখশ্রী কবি হৃদয়ে স্বস্তির কবিতার মতো শান্তির সুবাতাস হয়ে দেহ মনকে সুশীতল করে তোলে প্রগাঢ় ভালোবাসার পরশ মেখে। কবি নগর জীবনের সকল অসঙ্গতি ও দীনতা স্বীকার করে কোন এক শীতল দীঘির মতো শহরে কাউকে খুঁজে ফেরেন হৃদয়ের গভীর অনুধ্যানে:
যখন এই শহরের কংক্রিট স্ট্রিটগুলো খুরে ঘষে ঘষে
তোমার কবিতা এসে হরিণের শিশুর মতো ক্লান্ত মুখ লুকোয় আমার কোলে
যখন ভিতরের তৃষ্ণার সবুজ তৃণ ছিঁড়ে ছিঁড়ে
তোমার কবিতা এসে ঠোঁটে ঘষে আমার কাঁধের চুলের ছায়ায়
আমার ঘামে ভেজা কনুইজোড়ায় খোঁজে এক ফোঁটা শীতল দীঘি
আমি তখন হয়ে যাই সেই কিশোরী।
[“এক মহিলার আত্মহনন”, ‘আমার কবিতা’]
নগর জীবন একদিকে যেমন মানবজীবনের জন্য অফুরন্ত সুখ ও আনন্দের আশ্রয়স্থল অন্যদিকে আবার তেমনি বিরক্তি ও বিড়ম্বনারও কেন্দ্রবিন্দু। বিদ্যুৎহীন নগরজীবন শত যন্ত্রণা ও কষ্টের আধার। এ সময়ে ফ্যান বন্ধ, সিঁড়ি বন্ধ, লাইট বন্ধ, এয়ারকন্ডিশন বন্ধ থাকে। আলোর অভাবে গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে যায় উঁচু উঁচু বিল্ডিংয়ের আবাসস্থল। নাগরিক জীবনের এ দুর্দশা ও দুর্ভোগ কবির অনুভূতিতে প্রোজ্জ্বল:
এই মাত্র- এই বিল্ডিংয়ের সবকিছু-
মানে সমস্ত কলকব্জা অকেজো হয়ে গেছে।
কোনো কিছুই আর ঠিক মতো কাজ করছে না
অর্থাৎ হয়ে গেছে বিকল … নষ্ট …
এইমাত্র বিদ্যুৎ চলে গেলো
এইমাত্র বন্ধ হয়ে গেলো লিফট
ক্রমশ সিঁড়িগুলো ডুবে যাচ্ছে অন্ধকারে।
[“লালচোখ”, ‘কবিতানাট্য’]
আবিদ আজাদের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো নৈঃসঙ্গ্যচেতনাবোধ। তাঁর এই বোধ ও ধারণা নগরকেন্দ্রিক। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ক্রমশ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিবার গঠিত হচ্ছে। ক্রমেই বাড়ছে হতাশা, ব্যর্থতা, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় কোন মানুষ আজকাল নিতে চায় না। এ কারণে শহরে নাগরিক জীবনে মানুষ ক্রমশ একাকিত্বে পরিণত হচ্ছে। নাগরিক জীবনবোধের এই বিচ্ছিন্নতাবোধ ক্রমেই মানুষকে মনুষ্যত্বহীন করে তুলছে। এ প্রসঙ্গে বলা যায়: Alienation is a social-psychological condition of the individual which involves his estrangement from certain aspects of his social existence?৪ নাগরিক জীবনবোধের অন্যতম অনুষঙ্গ বিচ্ছিন্নতাবোধ আবিদ আজাদের কবিতায় ভাস্বর হয়ে উঠেছে:
যে পথে যাই আমার আজ নিজের সাথে দেখা
যেখানে যাই আজকে আমি আমার সাথে একা।
জটলা ছায়া জটলা ছায়া মেঘলা ঘরবাড়ি
বুকের নিয়ে ঢালু হাওয়া ধরেছে তরবারি।
বালিশে মুখ গুঁজেই আছি উপুড় হয়ে পড়ে
ঘাস জাগেরে শেওলা লাগে মলিন অন্তরে।
[“অবেলা”, ‘ঘাসের ঘটান’]
আবিদ আজাদ কাল-সচেতন একজন নাগরিক কবি। সমকালীনতা তাঁর কাব্যের ঐশ্বর্য ও চেতনার ভূষণ। একাত্তর পরবর্তীকালে কবিতায় তাঁর ঋব্ধি ও সমৃদ্ধি ঈর্ষণীয়। তিনি পরিপূর্ণ শৈল্পিক সত্তার অধিকারী একজন আপাদমস্তক কবি। কবিতার বিষয় বৈচিত্র্যে বিচিত্রগামিতা, নান্দনিক সৌকর্যে, কবিতার উপস্থাপনা, কাব্যের আঙ্গিক বিনির্মাণ এবং ছন্দ ও অলঙ্কারের সুনিপুণ রসায়নে তাঁর কাব্য পাঠকনন্দিত নিঃসন্দেহে।
তথ্যসূত্র :
১. অশোক কুমার মিশ্র, ‘আধুনিক বাংলা কবিতার রূপরেখা,’ এস. ব্যানার্জি অ্যান্ড কোং, কলিকাতা, ১৯৯১, পৃষ্ঠা-৯৪।
২. গাউসুল আজম, ‘কবিতায় শামসুর রাহমান, অ্যার্ডন পাবলিকেশন, ঢাকা, ২০১০, পৃ. ৭৩।
৩. মাহবুবুল আলম (সম্পা:) ‘বাংলাদেশের সাহিত্য’, খান ব্রাদার্স অ্যান্ড কোম্পানি, ঢাকা, ২০১১, পৃ: ৭৫৩।
৪. DG, Mitchel (ed) `A Dictionary of Sociology’ London, 1988, p-৪.