বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে বাংলা কাব্যাঙ্গনে প্রবেশ করেন। গদ্য রচনা এবং ছোটগল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবন শুরু হয়। ১৯৫৫ সালে বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকায় তাঁর তিনটি কবিতা প্রকাশিত হয়। কবি হিসেবে এতে তাঁর আত্মবিশ্বাস দৃঢ় হয়। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক লোকান্তর প্রকাশিত হয় এর আট বছর পর ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে। লোক লোকান্তর থেকে এপর্যন্ত (২০১৭) প্রকাশিত হয় তাঁর মোট ছাব্বিশটি কাব্যগ্রন্থ। আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁকে মনে করেন ১৯৪৭ সাল পরবর্তী বাংলাদেশের অন্যতম প্রথম আধুনিক কবি হিসেবে। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, আল মাহমুদ তাঁর সমকালের একজন ‘খাঁটি কবি’। আর আবু রুশদ্ তাঁকে মনে করেন বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের একজন বলে। কাব্যচর্চার পাশাপাশি আল মাহমুদ উপন্যাস ও ছোটগল্প রচনায়ও দক্ষতার পরিচয় দেন। দীর্ঘ সময়ব্যাপী সাহিত্যচর্চায় পরিবর্তনের বিবিধ বাঁকে তিনি উপস্থিত হয়েছেন। তারপরও তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তু হিসাবে ঘুরেফিরে আসে স্বদেশ, সমাজ ও সংস্কৃতির নানাবিধ অনুষঙ্গ এবং বাংলাদেশের নিসর্গচিত্র। এগুলোই আল মাহমুদের সাহিত্যের মূল বিষয়।
আল মাহমুদের সাহিত্যে বাংলাদেশের সমাজ
আল মাহমুদের সাহিত্যে বাংলাদেশের সমাজ, কবির সমকাল ও তার অস্থিরতা, সমকালের বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির নানা অনুষঙ্গ এবং বিস্তৃত গ্রাম ও আধুনিক নাগরিক জীবনের বিবিধ বিষয় নিপুণভাবে উঠে এসেছে। আল মাহমুদের প্রথম পর্বের কবিতায় – পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের কবিতায় – বন্ধ্যা, মরুময়, শুষ্ক ও পোড়োভূমির বাংলাদেশের চিত্র উঠে আসে ব্যাপকভাবে। এই নাগরিক নিসর্গ থেকে তাঁর যাত্রা।
এই বিষয়ের কবিতাগুলো লক্ষ করলে দৃষ্ট হবে যে, তাঁর প্রথম পর্বের কবিতায় অর্থাৎ ‘লোক লোকান্তর,’ ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’ গ্রন্থে অশান্ত সময়চিত্র যে তীব্রতায় উপস্থাপিত হয়েছে পরবর্তীতে তার প্রশমন ঘটেছে। কবিতাগুলো পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। ‘লোক লোকান্তরে’র প্রথম কবিতা ‘বিষয়ী দর্পণে আমি’তে কবির মানস প্রবণতার সূত্র অনুসন্ধানে পাওয়া যাবে তৎকালীন সময় ও সমাজ। এই সময়ের আর্শিতে তিনি নিজের যে প্রতিবিম্ব দেখেন সেটি ভয়ানক। নিজেকে দেখেন পশুর মূর্তিতে। ‘অরণ্যে ক্লান্তির দিন’ কবিতায় প্রাত্যহিক ও প্রাকৃতিক স্বাভাবিকতার মাঝেও কবির মনে হয়, ‘এখানে ঘটে না কিছু, শুধু এক আশার পাষাণ/বুকে নিয়ে জেগে থাকা’। ‘অরণ্যে অসুখী’তে মনে হয় : ‘একাকী আমিই শুধু, আমি যেন কেমন অলস/বনে কারো দুঃখ নেই আমি ছাড়া, আমারই অসুখ-/রক্ত, ঘাম, ব্যথা, তৃষ্ণা অবিরল বমি ও হতাশা/একটু বৃষ্টিতে সর্দি, কার্তিকেই কেঁপে ওঠে হাড়।’ এই ব্যক্তিক শূন্যতা সামষ্টিক রূপ নেয় এবং তীব্রতা পায় ‘বৃষ্টির অভাবে,’ ‘আশ্রয়,’ ‘অবুঝের সমীকরণ,’ ‘অকথ্য অলীক,’ ‘জল দেখলে ভয় লাগে’ এবং ‘জলছবি’ কবিতায়। ‘বৃষ্টির অভাবে’ কবিতায় ভয়ানক সময়ের বর্ণনা দেন :
কেন যে আসতে চাও, এ যে বড় ভয়ানক দিন
চালের লতানো ফুল মরে যাবে বৃষ্টির অভাবে
দুঃখের চৌকাঠ ভেঙে যদি আসো, দাঁড়াবে কীভাবে?
এখানে যৌবন দ্যাখো কাঁটা-ঘাসে, এমন মলিন!
বাতাসে বিশ্বাস নেই, আঙিনার ধবল পাথরে
আগুন ঠিকরে ওঠে, বুঝি এ-ই দুঃসহ দোযখ
(‘বৃষ্টির অভাবে,’ লোক লোকান্তর)
১. ভাষা ও দেশপ্রেম এবং ভাষা আন্দোলন
বাংলাদেশের রাজনীতিক ঘটনাপ্রবাহে আল মাহমুদ নিছক দর্শক ছিলেন না। এই সব ঘটনাপ্রবাহে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিলো। ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর বয়স ছিলো ষোলো বছর। তিনি তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের সাথে তিনি জড়িয়ে পড়েন। ভাষা আন্দোলনের লিফলেটে ছাপানো কবিতার কারণে তিনি বাড়িছাড়া হন। ভাষা আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ আছে তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’তে। এখানে ভাষা আন্দোলনে তাঁর এবং তাঁর বন্ধুদের সংশ্লিষ্টতার বিবরণ আছে। আর নিচের কবিতাগুলোতে ভাষা আন্দোলন ও বাংলা ভাষা প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। কবিতাগুলো হলো : ‘নিদ্রিতা মায়ের নাম’ (কালের কলস); ‘কবিতা এমন’ (সোনালি কাবিন); ‘কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁকে’ (আমি দূরগামী); এবং ‘একুশের কবিতা’ (পাখির কাছে ফুলের কাছে)। কবির কাছে মাতা আর মাতৃভাষা সমান অর্থ বহন করে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতায় আছে : ‘ফেব্রুয়রির একুশ তারিখ/দুপুরবেলার অক্ত/বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়? বরকতের রক্ত।/ … প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী/আমায় নেবে সঙ্গে,/বাংলা আমার বচন, আমি/জন্মেছি এই বঙ্গে।’ (‘একুশের কবিতা,’ পাখির কাছে ফুলের কাছে)।
২. সাম্যচিন্তা, বাম রাজনীতি ও কমিউনিস্ট আন্দোলন
কবি আল মাহমুদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের আকাঙ্ক্ষা তাঁর সমগ্র কাব্যজীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। তাঁর চিন্তায় এই আকাক্সক্ষার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কিন্তু সাম্য প্রতিষ্ঠার ধরন নিয়ে তাঁর ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এই বিষয়টি নিয়ে অনেক সমালোচক কথা বলেছেন। এই পর্বের কবিতায় সাম্যের আকাক্সক্ষা এবং তীব্রতা অক্ষুণ্ন থাকলেও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে তাঁর মতের বা ধারণার পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তনের কারণ খানিকটা ধরা পড়ে মিথ্যাবাদৗ রাখাল-এর ‘লোকে যাকে প্রেম নাম কহে’ কবিতায়। যদিও কবি তাঁর মনোভাব পরিবর্তনের বিষয়টি গদ্যে ব্যাখ্যা করেন ভিন্নভাবে। কিন্তু আল মাহমুদের এই পর্বের গদ্য রচনায় সাম্যবাদী ও সমাজতন্ত্রীদের যে ছবি পাওয়া যায় সেটি সম্পূর্ণ নেতিবাচক। যেমন : ‘কবি ও কোলাহল,’ ‘নিশিন্দা নারী,’ সৌরভের কাছে পরাজিত,’ ‘হলুদ বাড়ির আগন্তুক’। মুক্তিযুদ্ধে বামরাজনীতি ও রাজনীতিকদের ভূমিকা ও বক্তব্য পাওয়া যাবে ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে। ‘কাবিলের বোনে’ ছয় দফার আন্দোলনের সময় শেখ মুজিবুর রহমান ও বামপন্থীদের মধ্যকার পার্থক্য নিয়ে কাবিলের মন্তব্যকে লেখকের বক্তব্য হিসেবে ধরে নেওয়া যায়।
বাম রাজনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ ব্যতীত আল মাহমুদের কথাসাহিত্যে রাজনৈতিক আর যে সকল প্রসঙ্গ পাওয়া যায় সেগুলো হলো: ভাষা আন্দোলন, দেশভাগ (১৯৪৭) ও পাকিস্তান সৃষ্টি, দেশভাগের (১৯৪৭) যন্ত্রণা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ছাত্র আন্দোলন, ছয় দফা (১৯৬৬), ছাত্রলীগের রাজনীতি, ‘৬৯ এর অভ্যুত্থান, বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা, বাঙালি-বিহারি দ্বন্দ্ব এবং প্রাসঙ্গিকভাবে চরিত্র হিসেবে রাজনীতিকদের – হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেখ মুজিবর রহমান, জিয়াউর রহমান এর স্বল্পতম উপস্থিতি প্রসঙ্গ। ভাষা আন্দোলন, দেশভাগ (১৯৪৭) ও পাকিস্তান সৃষ্টি প্রসঙ্গ আছে ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ এবং ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে।
৩. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ
আল মাহমুদের যে কবিতাগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতির ধারণা পাওয়া যায় সেগুলো হলো : ‘এমন তৃপ্তির,’ ‘নূহের প্রার্থনা’ (লোক লোকান্তর); ‘ফেরার পিপাসা,’ ‘মাংসের গোলাপ,’ ‘কালের কলস,’ ‘বুকের কাছে,’ ‘গ্রামে’ (কালের কলস); ‘এই সম্মোহনে,’ ‘নতুন অব্দে,’ ‘জাতিস্মর,’ ‘সোনালি কাবিন,’ ‘ভাগ্যরেখা,’ ‘নদী তুমি,’ ‘বোধের উৎস কই, কোনদিকে?’ (সোনালি কাবিন); ‘হযরত মোহাম্মদ,’ ‘দ্বিধা’ (অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না); ‘ভারতবর্ষ,’ ‘ডানাঅলা মানুষ,’ ‘বাতাসের ঋতু,’ ‘খোলস ছাড়ার আগে’ (বখতিয়ারের ঘোড়া); ‘খরা সনেটগুচ্ছ’-৪ (দোয়েল ও দয়িতা); ‘ঝালের পিঠা’ (পাখির কাছে ফুলের কাছে); ‘স্বপ্নের ভেতর দর্জি মেয়েটি’ (না কোনো শূন্যতা মানি না)। পূর্বেই বলা হয়েছে, দারিদ্র্যের সরলপাঠ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্যের আকাঙ্ক্ষা তাঁর আর্থ-সামাজিক ও রাজনীতিক চিন্তার মূল বিষয়। বাঙালি জীবনের দারিদ্র্যের বিষয়টি বিভিন্নভাবে এসেছে তাঁর চিন্তায়। আল মাহমুদের চিন্তায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দারিদ্র্যের প্রসঙ্গটি বেশিমাত্রায় স্থান পেয়েছে। এখানে ‘গরিব,’ ‘অভাব,’ ‘দীন,’ ‘দরিদ্র,’ ‘দরিদ্রতম,’ ‘দুর্দিন’ – শব্দগুলো ঘুরেফিরে আসে। দেশ এবং দেশের মানুষ উভয় প্রসঙ্গেই কথাটি সত্য। একগুচ্ছ উদাহরণ :
ক. তুমি কি জননী সেই, অভাবের আভায় দলিত/বাঙলার মানচিত্র এ ঘরের পেরেকে রয়েছো?’ (‘ফেরার পিপাসা,’ কালের কলস)
খ. ‘একটি মুখ গরিবকালো চোখ/দেখবে মাটি ঢেউয়ের দাঁতে দাঁতে/ভাঙে, কেবল ভাঙে পানির রোখ্/ধানের মাথা ধরবে ডান হাতে।’ (‘গ্রামে,’ কালের কলস)
গ. ‘তোমার জন্যে লোকালয়/হেঁটে এসে আজো কড়া নাড়ি,/তোমার জন্যে করি জয়/অভাবের ক্ষিপ্ত তরবারি।’ (‘এই সম্মোহনে,’ সোনালি কাবিন)।
৪. মুক্তিযুদ্ধ – স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রত্যক্ষ যুদ্ধবিবরণ
মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদের কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গ প্রধান হয়ে আসেনি। তুলনামূলকভাবে তাঁর কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা প্রসঙ্গ প্রাধান্য পেয়েছে। তালিকা করলে তাঁর মুক্তিয্দ্ধু প্রাসঙ্গিক কবিতাগুলো হবে : ‘উল্টানো চোখ,’ ‘ক্যামোফ্লোজ,’ ‘আমার অনুপস্থিতি,’ ‘স্তব্ধতার মধ্যে তার ঠোঁট নড়ে,’ (সোনালি কাবিন); ‘বুদ্ধদেব বসুুর সঙ্গে সাক্ষাৎকার’ (মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো); ‘ঘটনা’ (বখতিয়ারের ঘোড়া); ‘উনসত্তরের ছড়া -১,’ ‘উনসত্তরের ছড়া -২’ (পাখির কাছে ফুলের কাছে); ‘কালচক্র ঘুরছে’ (বিরামপুরের যাত্রী); ‘পথের কথা’ (নদীর ভিতরে নদী); ‘আমি ইচ্ছে পূরণের মাটি নই,’ ‘এই পতাকার সূর্য সাক্ষী,’ ‘এ কেমন দুলুনি?’ (না কোনো শূন্যতা মানি না); এবং ‘মেঘদূত’ (বারুদগন্ধী মানুষের দেশ)।তবে এই অল্প সংখ্যক কবিতায় কবি মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘটনাবৈচিত্র্য ও গভীরতাকে নিখুঁতভাবে ধরতে পেরেছেন। উনসত্তরের গণ আন্দোলন, পঁচিশে মার্চের রাত, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ যুদ্ধবিবরণ, যুদ্ধপরবর্তী অপ্রাপ্তি ও হতাশা এই সকল বিষয় তাঁর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কবিতায় স্থান পেয়েছে।
৫. নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবন
কবিতাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে আল মাহমুদের গ্রামজীবন গড়ে উঠে নদীকে কেন্দ্র করে। নদীকেন্দ্রিক জনজীবন বা গ্রামের ছবি থাকে আল মাহমুদের ছোটগল্প এবং উপন্যাসেও। আল মাহমুদের মানসগঠনে নদীর অবদান বিস্ময়কর। তাঁর গ্রামীণ জনজীবনের কেন্দ্রে থাকে নদী। তেমনি তাঁর নদীকেন্দ্রিক চিন্তার কেন্দ্রে থাকে তাঁর ‘শৈশবের নদী’ তিতাস। ‘তিতাস’ প্রসঙ্গ পাওয়া যাবে ‘করতলে,’ ‘নৌকোয়’ (লোক লোকান্তর); ‘বেহায়া সুর’ (কালের কলস); ‘কালের স্রোত’ (পাখির কথায় পাখা মেললাম); ‘খরা সনেটগুচ্ছ’-৬’ (দোয়েল ও দয়িতা); ‘ভরদুপুরে,’ ‘নোলক’ (পাখির কাছে ফুলের কাছে); ‘নদীর ভিতরে নদী’ (নদীর ভিতরে নদী) কবিতা এবং ‘চেহারার চতুরঙ্গ’ উপন্যাসে। তবে তিতাস নিয়ে কবির সবচেয়ে সুন্দর এবং বিখ্যাত কবিতা হলো ‘লোক লোকান্তর’ কাব্যগ্রন্থের ‘তিতাস’ কবিতা। এই কবিতায় তিতাসের এবং তিতাসপাড়ের জনজীবনের সুন্দর বিবরণ উপস্থাপন করেন কবি এবং নগরজীবনের ক্লান্তি থেকে ফিরে আসতে চান তাঁর ‘শৈশবের নদী’র কাছে। এছাড়াও পাওয়া যাবে পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, কর্তফুলি, করতোয়া, তিস্তা, কুমারনদী প্রভৃতি বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর বিবরণ। তবে এই নদীগুলো এবং তিতাসের বিবরণের মধ্যে কোনো পার্থক্য চোখে পড়ে না। সব নদীই শেষপর্যন্ত একই আকার ধারণ করে। একই নদীর ভিন্ন বিবরণ হয়ে দাঁড়ায়।
৬. নদীকেন্দ্রিক পেশাজীজী শ্রেণী
নদী ও নৌকাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে বেদে, জেলে প্রভৃতি পেশাজীবী শ্রেণী গড়ে ওঠে। এই পেশাজীবীদের নিয়ে বাংলা সাহিত্যে সমৃদ্ধ সাহিত্যশাখা গড়ে উঠেছে।আল মাহমুদের সাহিত্যেও বিষয়টি লক্ষ করা যায়। তাঁর রচনায় বেদে জীবনের প্রসঙ্গ পাওয়া যায় ‘তরঙ্গিত প্রলোভন’ (সোনালি কাবিন) কবিতা, ‘মাহবুবার মানচিত্র’ উপন্যাস এবং ‘জলবেশ্যা’ ছোটগল্পে। জেলেজীবনের প্রসঙ্গ আছে ‘পলাতক’ (সোনালি কাবিন) কবিতা এবং ‘জলবেশ্যা’ ও ‘কালোনৌকা’ ছোটগল্পে। এছাড়াও কুমোর এবং তাঁতিদের প্রসঙ্গ আছে ‘ছিন্নভিন্ন স্মৃতিসূত্র’ (প্রহরান্তের পাশফেরা), এবং ‘মনপবনের নাও’ (পাখির কাছে ফুলের কাছে) কবিতায়। বাংলাদেশের নদীকেন্দ্রিক গ্রামীণ সমাজের অন্যতম এবং বলা যায় প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা এবং কৃষির উপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা। নদী, চর, এবং গ্রামের মানুষের পেশাভিত্তিক প্রধান পরিচয় হলো, এরা কৃষক। এরা ফসল উৎপাদন করে। এরা শস্যের শিল্পী। আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় অনন্য দক্ষতায় বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজের ছবি আঁকেন। তাঁর এই সমাজে দারিদ্র্য এবং নারী-পুরুষের সমতা পাশাপাশি থাকে। নারী-পুরুষ উভয়ই শ্রমভিত্তিক সমাজে অবদান রাখে। কারণ, এটা তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন।
৭. বাংলাদেশের সাধারণ গ্রামজীবনের দৃশ্য
আল মাহমুদের কবিতায় বাংলাদেশের সাধারণ গ্রামজীবনের দৃশ্যে সম্মুখভাগে থাকে নদীতীরবর্তী মানুষের জীবনচিত্র। তাঁর কবিতায় বা সাহিত্যে নদীকেন্দ্রিক গ্রামীণ জনজীবনের দৃশ্যগুলোতে পাওয়া যাবে : মানুষের ঘরবাড়ি, চাষা, কিষাণ, কিষাণী, হালবলদ, লাউয়ের মাচায় ঝোলা ভেজা লাল শাড়ি, শূটকির গন্ধ, ধানক্ষেত, পাহাড়, খাল-বিল, জয়নুলের ছবির মত ঘরবাড়ি, উঠোনে ধানঝাড়ারত নারী, উঠোনে ধানঝাড়ারত নারীর শরীরে পেঁচানো ম্লান শাড়ি, হাতে লেপা মাটির চত্বর, লাউমাচা, কুয়াশায় ঢাকা গ্রামের পথ, মাটির কলসে জল ভরে কোনো বউ-এর ঘরে ফেরার দৃশ্য, ভোরের আজান, নাড়া দিয়ে আগুন জ্বালানো, তিলের পিঠা, মাছের আঁশটে গন্ধ. উঠোনে ছড়ানো জাল, বাঁশঝাড়, বাঁশঝাড়ে দাদার কবর, হাঁসের কুড়ানো ডিম, হারানো বাছুরের জন্য কোনো গ্রামের বউয়ের ম্লানমুখ, গ্রামের মক্তবের কোনো ছোট বালিকা, মুরগির খোয়াড়, ‘বাতাসে ধানের গন্ধ,’ নরম মাটি বা কাদায় ধান রোপনের দৃশ্য, পাটচাষীদের পরিশ্রম, নারীদের নিয়ে অশ্লীল কথাবার্তা, বিয়ে বাড়ির সানাই, হেঁসেলের খোয়া, শিশুদের কলরব, গরীব চাষী, ফলবান মাটি, বৃষ্টি, সীমাহীন মাঠ, উঠানে কর্মচঞ্চল পূর্ণস্তনী ঘর্মাক্ত যুবতী, কোনো কৃষকের অগণন পুত্রসন্তানের কামনা যারা আগামী দিনের কিষাণ হবে, বাংলাদেশের কোনো একটা স্টেশন বিশেষভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, ধাবমান গাড়ির জানালায় বসে বাইরের দৃশ্য দেখা – গ্রাম, চষা জমি, কুয়াশার ভেতর মানুষের নড়াচড়া বা চলাফেরা, ভোরে মসজিদ থেকে নামাজীদের বেরিয়ে আসার দৃশ্য, আখমাড়াইয়ের কল, জেলে পাড়ায় জাল শুকানোর দৃশ্য, সর্ষে ক্ষেত, মটর শুঁটির ঝোপ, গাঁয়ের হিজলতলা, বৌ-ঝিদের গল্প করার দৃশ্য, সন্ধ্যায় রাখালদের ঘরেফেরা ও হাঁকডাক, পাখির ঝাঁক, তাঁত বোনা, মাকুর শব্দ, গরুর পাল, রাখাল, কুমোর, বিন্নির আঠালো সাদা ভাত, ভাজা কই মাছ, দিগন্তবিস্তৃত তামাকফুল, নর্থবেঙ্গল ট্রেন, আখখেত, মাড়াইকল, ড্রেজার, পাওয়ার ট্রিলার, খড়ের ঘর, মাটির দেয়াল, ঝুড়িতে সবজি নিয়ে চাকমা কিশোরীর হেঁটে আসার দৃশ্য, গ্রামের কোনো বৃদ্ধের হুঁকো টানা ও কাশির খক খক শব্দ, কলতলায় মেয়েদের শাড়ি পাল্টানোর দৃশ্য, কোনো একটা মফস্বল শহরের (বাহ্মণবাড়িয়া) বাজার : পেঁয়াজ, রসুন চালের আড়ত, তরকারির হাট, মসজিদের গম্বুজ, ডিম ব্যাপারীদের ঝুড়ি, বাজারের খারাপ মেয়ে মানুষ, ফোঁপড় দালালদের হল্লা ইত্যাদি।
কবিতায় গ্রামজীবনের সাধারণ যে ছবি বা দৃশ্যগুলোর ইঙ্গিত মেলে কথাসাহিত্যে সেগুলোর বিস্তারিত ও সরাসরি বিবরণ পাওয়া যায়। তাঁর উপন্যাস ‘ডাহুকী,’ ‘যেভাবে বেড়ে উঠি,’ ‘যে পারো ভুলিয়ে দাও’ এবং ছোটগল্প ‘মীরবাড়ির কুরসিনামা’ ও ‘নীল নাকফুল’-এবাংলাদেশের সাধারণ গ্রামজীবনের বিভন্ন পরিচিত ও খুঁটিনাটি দৃশ্যের পরিচয় মিলবে।
৮. স্থান নাম : আল মাহমুদের কবিতার ভূগোল
আরেকটি লক্ষযোগ্য বিষয় হলো : আল মাহমুদের কবিতায় বাংলাদেশের গ্রামজীবনের যে ছবি ধরা পড়ে সেটি নামধাম পরিচয়হীন কোনো জনজীবনের ছবি নয়। তাঁর চিত্রিত জনজীবনের সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক পরিচয় রয়েছে। কবিকল্পনার সাথে বাস্তববোধের অন্তরঙ্গ সম্মিলন ঘটেছে তাঁর কবিতায়। আল মাহমুদের কবিতায় সাধারণভাবে দেশের যে সকল স্থান নামের উল্লেখ এবং বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলো হলো : কাউতলী রেলব্রিজ, পাহাড়পুর, কুরুলিয়া, ভোলা, সন্দ্বীপ, মহাস্থানগড়, পুণ্ড্রবর্ধন, ভৈরবের ব্রিজ, মেঘনা, বীরগাঁও , সদরঘাট, ঢাকা মহানগরী, লালপুর, দর্শনা জংশন, ফুলতলী, মেঘনার খেয়াঘাট, কোনো সুদূর সীমান্তের কাস্টম কলোনি, কুমার নদী, শৈলকূপা, ফয়েস লেক, পদ্মা, কীর্তিনাশা, বিক্রমপুর, ঢাকা যাদুঘর, পালযুগ, করতোয়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুন্দরবন, রামসাগর, রাজা মহীপালের দিঘি, তিতাস, যমুনা, রাইখালী, পুলিন, ঢাকা, নর্থবেঙ্গল, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নিঝুম দ্বীপ, যমুনা, করতোয়া, তিস্তা, তিতাস, হরিণবেড়ের বাঁক, কর্তফুলী, পাথরঘাটার গীর্জে, দরগাতলা, লালদিঘির পার, জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দেবীদ্বার, গোমতী নদী, বন্দর নগরী, ভৈরব ব্রিজ, যমুনা সেতু, চন্দ্রনাথ পাহাড়, শিমরাইল বাজার, মনতলা স্টেশন, বামটিয়া বাজার, কুমিল্লা, কুষ্টিয়া, কুষ্টিয়ার কাস্টম কলোনি, লালপুর গাঁ, বুড়িচং, গোমতী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, সীতাকুণ্ড। অন্যদিকে তাঁর কথাসাহিত্যে প্রাপ্ত স্থান নামের তালিকা করলে সেখানে পাওয়া যাবে : পুরাতন ও বর্তমান ঢাকা : ফুলবাড়িয়া স্টেশেন (পঞ্চাশ-ষাটের দশকের ঢাকার মূল রেলস্টেশন), র্যাঙ্কিন স্ট্রিট, ১০ নং বনগ্রাম লেন, নবাবপুর, ঠাঁটারি বাজার, মগবাজার। চট্টগ্রাম : ফিরিঙ্গিবাজার, বুদ্ধিস্ট টেম্পল রোড, চাগতাই ঘাট, ফৌজদারহাট সৈকত। ব্রাহ্মণবাড়িয়া : ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলস্টেশন, তিতাস, সালদা। কুমিল্লা : কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ। রংপুর।
৯. প্রাচীন বাংলা, চর্যাপদের সমাজ ও তার ঐতিহ্য
স্বদেশের বা স্বদেশের গ্রামজীবনের ছবি আঁকতে গিয়ে আল মাহমুদ কখনো অতীতে ফিরে যান। ফিরে যান চর্যাযুগে। চর্যাযুগের আর্থ-সামাজিক বিষয়কে চিত্রায়িত করেন কবিতায়। এই সমৃদ্ধ অতীতে ফিরে যাওয়া কবির ঐতিহ্য অনুসন্ধানের অংশ। বাঙালি ঐতিহ্য থেকে কবি তাঁর কবিতার বিষয় পছন্দ করেন। প্রাচীন বাংলা, চর্যাপদের ও মধ্যযুগের বাঙালি সমাজ ও তার ঐতিহ্যকে পাওয়া যাবে যে সকল কবিতায়, সেগুলো হলো : ‘সোনালি কাবিন,’ ‘তরঙ্গিত প্রলোভন’ (সোনালি কাবিন); ‘কৃষ্ণকীর্তন’ (মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো) এবং ‘ভারতবর্ষ’ (বখতিয়ারের ঘোড়া) কবিতা। এগুলোর মধ্যে “সোনালি কাবিন”-এর নাম কবিতায় প্রাচীন বাংলা ও তার ঐতিহ্য উঠে আসে বহুবর্ণিলভাবে। এখানে প্রাচীন অনার্য জাতি বা বাঙালি কৌমের শ্রেষ্ঠত্বের বিভিন্ন দিক থেকে শুরু করে প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাঙালি ঐতিহ্যের বিভিন্ন নিদর্শন আশ্চর্য দক্ষতায় স্থান পায়।
১০. প্রাকৃতিক বিপর্যয়
তবে আল মাহমুদের কবিতায় সমুদ্রকেন্দ্রিক বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়গুলো উপস্থাপিত হয়েছে। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, চট্টগ্রামের তুফান, ঝড়ের তাণ্ডব এবং এর ফলে মানুষের মৃত্যু, উপকূলে নারী ও শিশর শব, লণ্ডভণ্ড প্রকৃতি ও মানুষের আবাস এসবের বিবরণ আছে তাঁর কবিতায়। নিচের কবিতাগুলোতে এই সকল প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরিচয় পাওয়া যাবে। কবিতাগুলো হলো : ‘বাতাসের ফেনা,’ ‘আমার প্রাতরাশে’ (সোনালি কাবিন); ‘নোনা উপকূলে’ (মিথ্যাবাদী রাখাল); এবং ‘বিজলিলাগা দশটি আঙুল’ (বারুদগন্ধী মানুষের দেশ)।
১১. নগরসভ্যতার যন্ত্রণা ও হাহাকার
আল মাহমুদের নাগরিক যন্ত্রণার শুরু এভাবে : ‘বত্রিশ সায়েদাবাদ ঢাকা – এই বিষণ্ন দালানে/তেমন জানালা কই? যাতে বাঁকা নদী দেখা যায়’। এই পর্বের কবিতায় তিনি নিজেকে চিত্রিত করেন আধুনিক নগরসভ্যতার কোন নাগরিক হিসেবে। যে কারণে সমালোচক এই পর্বের কবিতায় পোড়োভূমির মিল খুঁজে পান। তাঁর নগরের ভূগোল একটি ভূমিতে এসে দাঁড়ায়। মধ্যপর্বে তাঁর নগর আর ঢাকা শহর এক হয়ে যায়। মধ্য ও শেষপর্বে তাঁর কবিতায় ঢাকা নগরের যাবতীয় খুঁটিনাটি উঠে আসে। সামগ্রিক বিবেচনায় আল মাহমুদের নাগরিকচিন্তায় মুখ্যত প্রাধান্য পায় নগরসভ্যতার যন্ত্রণা ও হাহাকার, নগর থেকে পলায়ন ও গ্রামে ফেরার আকাক্সক্ষা, এবং ঢাকা মহানগরের নানাবিধ অসঙ্গতিচিত্র যা কবির মানসযন্ত্রণার কারণ।
১২. নগর থেকে পলায়ন ও গ্রামে ফেরার আকাঙ্ক্ষা
এই যন্ত্রণা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে বাঁচার জন্য কবিকে পলায়নবৃত্তি গ্রহণ করতে হয়। শহর থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিতে হয় গ্রাম-নিসর্গের কাছে। গ্রাম-নিসর্গের কাছে আশ্রয় এবং অতীতমগ্নতা কবির কাছে শান্তনার বিষয় হিসেবে আসে। আল মাহমুদের এই পর্বের কবিতায় নগর থেকে পলায়ন ও গ্রামে ফেরার আকাক্সক্ষার বিষয়টি এই বোধের উৎসজাত। তিনি নাগরিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে পালিয়ে গ্রামে ফিরতে চান ‘ফেরার পিপাসা’ (কালের কলস) কবিতায়। ‘খড়ের গম্বুজ’-এ এক যুবককে আধুনিক নাগরিক জীবন ও সংস্কৃতি তার প্রিয়জনদের সহচর্র্য থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। আধুনিক সংবেদনশীল কোনো নাগরিক কবিকে নাগরিক যন্ত্রণা ও বিচ্ছিন্নতাবোধের হতাশা থেকে উত্তরণের জন্য চোখ ফেরাতে হয় দূর বা দূরঅতীতের গ্রামের দিকে। অতীতচারিতা ও গ্রামে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তখন তীব্রতা পায়। কবির ‘তোমার হাতে,’ ‘এক নদী’ (সোনালি কাবিন); ‘আমি একা হাঁটি’ (বারুদগন্ধী মানুষের দেশ) কবিতাগুলোতে নগর থেকে পলায়ন ও গ্রামে ফেরার আকাক্সক্ষা তীব্রতা পেয়েছে। ‘ডাহুকী’ উপন্যাসে মানসিক ও নাগরিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য আতেকা বারবার গ্রামে ফিরে আসে এবং শৈশবের ফেলে আসা গ্রাম ও প্রকৃতির মধ্যে সুখ সন্ধান করে। প্রাচুর্য ও উন্নত জীবন তার সুখ নিশ্চিত করে না।
১৩. ঢাকা মহানগরের নানাবিধ অসঙ্গতিচিত্র
মধ্যপর্ব থেকে আল মাহমুদের নগরভাবনায় নৈর্ব্যক্তিকতা ঘুচে যায়। তাঁর নগরের পরিচয় স্পষ্ট হয়। ঢাকা শহরই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার শহর। আর শহর বা নগর প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগরের খুঁটিনাটি বিষয় উঠে আসে তাঁর কবিতায়। কবি ঢাকা শহরকে অনুপুঙ্খ দেখেন ও অনুভব করেন। সেখানে সদরঘাটের উপচেপড়া ভিড়ের ভেতর ঘোমটা দেওয়া কোনো বধূ থেকে কসাইটুলির মাংসের দোকান অথবা ঢাকনাহীন ম্যানহোলের ছবি কেনোটিই তাঁর চোখ এড়ায় না। পুরাতন ঢাকার উপস্থাপনে কবির স্মৃতি ও অতীতমগ্নতা নিবিড়ভাবে কাজ করে। যেমন, ‘ডাহুকী’ উপন্যাসে শাহেদের শৈশবস্মৃতি প্রসঙ্গে ‘পুরান ঢাকার’ অনুপুঙ্খ বিবরণ থাকে। এবং ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাসে ষাটের দশকের ঢাকা শহরকে পাওয়া যায়। সেই সময়ের সদরঘাট, ইসলামপুর মার্কেট, মুকুল সিনেমা হল, গুলিস্তান রেস্তোঁরা, ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের পরিচয় উপন্যাসে পাওয়া যায়। ঢাকার নাগরিক জীবনে নানা বিড়ম্বনার মধ্যে অন্যতম হলো রাজনীতির বিড়ম্বনা। সাধারণ মানুষকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনীতিক দলগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হরতাল কর্মসূচি। হরতালে নাগরিক জীবনের বিড়ম্বনার বিষয়টি আল মাহমুদের কবিতায় পাওয়া যায়, বিশেষত তাঁর ছড়াজাতীয় কবিতায়। আর্থিক ও রাজনীতিক নানা অসঙ্গতির সাথে যোগ হয় বিবিধ সামাজিক অসঙ্গতি। আল মাহমুদের সামাজিক সচেতনতায় বিষয়গুলো স্পর্শ করে। ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধের বিষয়গুলো থেকে শুরু করে শহরের ট্রাফিক সমস্যার মতো বিষয়গুলো আল মাহমুদের রচনায় স্থান পায়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশেষভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানাবিধ অবক্ষয়চিত্র কবিকে কতোটা হতাশ করে ‘কদর রাত্রির প্রার্থনা’ (একচক্ষু হরিণ) কবিতা তার প্রমাণ। যেখানে বেশ্যা, লম্পট, হিরোইনসেবী ও ছিনতাইকারীর সাথে তাঁকে এক কাতারে দাঁড় করাতে হয় ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান পণ্ডিতদের’। এবং প্রশ্ন করতে হয় : ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি ডাকাতদের গ্রাম?’।
কবি আল মাহমুদ তাঁর কবিতা, ছোটগল্প ও উপন্যাসে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনীতিক যে সকল চিত্র ও বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন সেগুলো বাংলাদেশের সমাজকাঠামো ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে বিবেচিত হবে। ব্যক্তিগতভাবে ও চিন্তাধারায় ‘ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী রোমান্টিক’ ঘরানার কবি হয়েও আল মাহমুদ তাঁর রচনায় সামাজিক বাস্তবতা ও উপযোগবাদকে অস্বীকার করেন না। যে কারণে সামাজিক, রাজনীতিক, অর্থনৈতিক ইস্যুতে তাঁর সরব উপস্থিতি থাকে। বিষয়গুলোর উপস্থাপন বা ব্যাখ্যা যে আল মাহমুদ সবসময় সচেতনভাবে করেন, তাও নয়। তাঁর মানসপ্রবণতার সাথে এর নিবিড় সম্পর্ক আছে।
আল মাহমুদের সাহিত্যে বাংলাদেশের সংস্কৃতি
সমাজের সদস্য হিসেবে মানুষের আচরণ প্রক্রিয়া বা বিচিত্র নর-নারী সম্পর্ক ও তাদের পারিবারিক জীবন, গড়ে ওঠা ঐতিহ্য, বিশ্বাসের ধরন, এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত উপাদান – যেগুলো আল মাহমুদের সাহিত্যে বহুবিধ বৈচিত্র্যে উপস্থাপিত হয়েছে, নিম্নে সেগুলো পর্যালোচনা করা হলো।
১. নর-নারী সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবন
সংস্কৃতি ও ‘আচরণ’ পরস্পরের পরিপূরক এবং প্রভাবক। সংস্কৃতিতে মানবিক আচরণ দৃশ্যমান হয়। অন্যদিকে মানবিক আচরণ প্রভাবিত হয় সংস্কৃতি এবং অন্য সকল উপাদান দ্বারা। হোমোজেনিয়াস এবং হেটেরোজিনিয়াস এই বিন্যাসের ভিত্তিতে বাংলাদেশের কালচারের বৈশিষ্ট্য হলো হোমোজিনিয়াস এবং সে কারণে কলেকটিভিস্ট। যেখানে পারিবারিক বন্ধন বা সম্মিলিত চিন্তা প্রাধান্য পায়। প্রথম পর্বের – লোক লোকান্তর, কালের কলস ও সোনালি কাবিন – কবিতায় নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সরল এবং তীব্র। এই পর্বে তিনি কোনো নারীকে প্রেমের প্রস্তাব করেন এভাবে : ‘ভালোবাসা দাও যদি আমি দেব আমার চুম্বন,/ছলনা জানি না বলে আর কোন ব্যবসা শিখিনি;/দেহ দিলে দেহ পাবে, দেহের অধিক মূলধন/আমার তো নেই সখি, যেই পণ্যে অলঙ্কার কিনি।’ (‘সোনালি কাবিন,’ সোনালি কাবিন) এই প্রস্তাবকে ভিক্টোরীয় বা রাবীন্দ্রিক রোমান্টিকতার কাছে নেয়া যায় না। বরং এটাকে সরাসরি বলা যায় একটি চুক্তিপ্রস্তাব। যেখানে দুটি পক্ষ থাকবে, চুক্তিতে কোন পক্ষের কী ভূমিকা বা অবস্থান থাকবে সেটি পরিস্কার করে বলা হচ্ছে এখানে। এবং এই পর্বে তাঁর বিশ্বাস হলো : ‘প্রেম কবে নিয়েছিলো ধর্ম কিংবা সংঘের শরণ?/মরনের পরে ফিরে আসে শুধু কবরের ঘাস।’ (‘সোনালি কাবিন,’ সোনালি কাবিন); ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’তে এসে আল মাহমুদের বিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটে। লক্ষযোগ্য বিষয়, এই বিশ্বাসের পরিবর্তন তাঁর কবিতার বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনে না – কবিতার বিষয়বস্তুতে নারী থাকে, কিন্তু নারীকে উপস্থাপনের ভঙ্গি বা ধরনে পরিবর্তন আসে। কেউ কেউ তাঁর এই পরিবর্তিত মানসিকতার সমালোচনা করলেও লক্ষ করার বিষয়, কবির মানসিকতার পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু কবিশক্তির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কবিতার তীব্রতা ও সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন আছে প্রথম পর্বের মতোই। আল মাহমুদ নারীর প্রশংসাসূচক বহু শব্দ ব্যবহার করেন, তৈরি করেন বহু বাক্য এবং প্রিয় নারীর স্তূতি করতে গিয়ে তৈরি করেন প্রচুর উপমা। তাঁর কাছে নারীর পরিচয় মুখ্যত প্রেয়সী, স্ত্রী এবং তাঁর সন্তানের মাতা হিসেবে। এছাড়াও নারী তাঁর মাতা ও বোন, নারী তাঁর কাছে দয়া, ভালোবাসা ও স্নেহের আধার এবং তাঁর প্রিয় ‘শস্যক্ষেত্র’ (‘নগরীর কথা নয় চাষবাসের গল্প,’ নগরীর কথা নয় চাষবাসের গল্প)।
২. যৌথ জীবনের ছবি
আল মাহমুদের সাহিত্যে নর-নারীর আচরণ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে খুব সহজেই দৃশ্যমান হয় তাঁর কৈশোর জীবনের সাথে বিশেষ সংযুক্ত পিতা-মাতা-ভাই-বোন নিয়ে একটি পারিবারিক এবং যৌথজীবনের ছবি যেমন, কবিতা বিষয়ে বলতে গিয়ে ‘ত্যাগে দুঃখে’ (কালের কলস) কবিতায় একটি সুন্দর পারিবারিক জীবনের গল্প পাই আমরা। যেখানে আছে কবির শৈশব এবং মাতা, বোন ও স্ত্রীর উপস্থিতি। ‘ত্যাগে দুঃখে ভরে আছে সামান্য পড়ার ঘর/সন্তানসহ দুঃখী সঙ্গিনীর মুখ।/অবোধ বাল্যেও নাকি একটা ছোট কাপও ভাঙিনি-/আমার আম্মা প্রায়ই আমার বোনের কাছে শৈশব শোনান।’ (‘ত্যাগে দুঃখে,’ কালের কলস); ‘কবিতা এমন’-এ (সোনালি কাবিন) আছে পারিবারিক জীবনের ছবি। যে ছবি অকেটা নস্টালজিক, এবং যে কাউকে শৈশব ও কৈশোরে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো আবেগঘন ও বাস্তব। ‘কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান/আমার মায়ের মুখ; নিমডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি/পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই-বোন/আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি – রাবেয়া রাবেয়া – /আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট।’ (‘কবিতা এমন,’ সোনলি কাবিন)।
৩. মায়ের ভূমিকা
পরিবারের বা যৌথজীবনের এই ছবির পাশে আলাদাভাবে আল মাহমুদের কবিতায় মায়ের একটা ভূমিকা লক্ষ করা যায়। আল মাহমুদের কবিতায় স্বতন্ত্রভাবে মায়ের উপস্থিতি বাঙালি জীবন বা সংস্কৃতির মাতৃপ্রেমের বিষয়টির প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন, ‘অবগাহনের শব্দ’ (সোনালি কাবিন) কবিতায় শৈশবের নানা ঘটনার মাঝেও আলাদাভাবে তাঁর ‘নাকে লাগে মায়ের আদর।’ ‘আমার মাথা’ (মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো) কবিতায় কবির জীবনের চরমতম দুঃসময়ের কথা আছে। স্বাধীনতার পর তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন, ক্ষমতাসীন দলের সাথে তাঁর রাজনীতিক মতপার্থক্য এবং সেই কারণে জেলে যাওয়া (১৯৭৪) ও জীবনের ঝুঁকির মাঝে মায়ের স্নেহ, শঙ্কা ও প্রার্থনার বর্ণনা আছে এই কবিতায়। কিন্তু এর বিপরীত চিত্রও আছে কবির রচনায়। তাঁর ‘পুত্র’ উপন্যাসে আধুনিক জীবনজটিলতার দ্বন্দ্ব বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে তার বিবরণ আছে।
৪. পারিবারিক জীবন বা স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আল মাহমুদের গার্হস্থ্য প্রেম
নর-নারীর সম্পর্ক বুননে আল মাহমুদের কবিতায় মুখ্যত প্রাধান্য পায় দাম্পত্য সম্পর্ক। সমালোচকের ভাষায় ‘গার্হস্থ্য প্রেমের’ সম্পর্ক। দাম্পত্য সম্পর্কহীন প্রেম ও যৌনতা তাঁর কবিতায় সুলভ নয়। এরকম দুর্লভ সম্পর্কচিত্র বা নারীর প্রতি আহবান পাওয়া যাবে তাঁর অল্প কিছু কবিতায়। এগুলোর বাইরে আল মাহমুদের প্রেমের কবিতায় দাম্পত্য সম্পর্কচিত্র নির্মাণের দক্ষতা প্রকাশিত হয় বিভিন্নভাবে। ‘লোক লোকান্তর’ এবং ‘কালের কলস’-এ বিষয়টি সেভাবে ধরা দেয় না। ‘সোনালি কাবিন’-এ এসে আল মাহমুদ তাঁর প্রেমের প্রকৃতিকে আবিষ্কার করেন। এবং ‘সোনালি কাবিন’ পরবর্তী রচনায় এ ধারণার বিকশিত রূপ প্রকাশিত হয়। মধ্য ও শেষ পর্যায়ের কবিতায় কবি পারিবারিক বন্ধনকে আঁকড়ে ধরেন আরও বেশি মাত্রায়। আল মাহমুদের প্রেমের কবিতাগুলোর শরীরে লক্ষ করলে দৃশ্যমান হবে যে, তাঁর কবিতায় সুনির্দিষ্ট নাম নিয়ে কোনো নারীর উপস্থিতি পাওয়া যায় না। অন্যকথায় তাঁর কোনো প্রেমিকার নাম পাঠক পান না। ‘তুমি’ বা ‘তোমার’ সম্বোধন দিয়ে কবিতা পাওয়া যায়। এই ‘তুমি’ কখনো কোনো প্রণয়িনীর ধারণা দেয় বটে, তবে সেটি স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত হয় অনেক সময়। আবার কখনো পাঠক দ্বিধায় পড়েন উভয়ের পার্থক্য করতে। প্রণয়-পরিণয়ের এই স্বাভাবিক চারিত্র্যের বাহিরে আল মাহমুদ পা বাড়ান না। আল মাহমুদের প্রেমের কবিতায় মুখ্যত প্রাধান্য পায় স্ত্রী-সন্তান এবং ঘর-গৃহস্থালির খুঁটিনাটি বিবিধ বিষয়। তাঁর স্নেহ ও ভালোবাসা আবর্তিত হয় স্ত্রী-সন্তানকে ঘিরে।
কথাসাহিত্যে চরিত্র সৃষ্টি বা নর-নারীর সম্পর্ক নির্মাণে আল মাহমুদের দক্ষতা উল্লেখ করার মতো। নর-নারীর আচরণ প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ এবং প্রস্ফূটনে কথাসাহিত্যে তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন ধরনের চরিত্র সৃষ্টি করেন। তবে আল মাহমুদের চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক খুব জটিল রূপ ধারণ না করলেও সেগুলো কবিতার ‘গার্হস্থ্য প্রেমের’ নির্ভেজাল সম্পর্ককে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়। যেমন : ‘ডাহুকী,’ ‘উপমহাদেশ,’ ‘নিশিন্দা নারী’ ও ‘অর্ধেক মানবী’ – এই উপন্যাসগুলোর মূল কাহিনি দাম্পত্য সম্পর্ককেন্দ্রিক হলেও কবিতাতে যেভাবে তিনি বলেন: ‘নারী বলতে আমি একটি মুখই স্মরণ করতে পারি;/শান্তি বলতে একটি মুখ, সহবাস বলতে সেও তো/একটিমাত্র মুখ।’ – এই নির্ভেজাল সম্পর্কচিত্র উপন্যাসগুলোর কাহিনিতে পাওয়া যাবে না। এখানে প্রিয় নারী বা প্রিয় পুরুষের পাশে অন্য কেউ সহ-অবস্থান করেন। আতেকা বানু ও শাহেদ চৌধুরী, কবি সৈয়দ হাদী মীর এবং হামিদা, নিশিন্দা ও আবদুল্লা মাঝি, ফোয়ারা ও ফয়েজ এঁদের দাম্পত্য সম্পর্কের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন তৃতীয় কোনো ব্যক্তি। ‘অর্ধেক মানবী’তে ফোয়ারার তীব্র স্বাতন্ত্র্য ব্যতীত অন্য চরিত্রগুলোতে বিষয়ের বা ঘটনার সাথে মানিয়ে নেয়ার প্রবণতাই প্রকাশিত হয় বেশি। এবং ঘটনার মধুর সমাপ্তি ঘটে উপন্যাসগুলোতে।
৫. শারীরিক সংসর্গ
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে নর-নারীর প্রণয় ও যৌনতা নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা না ঘটলেও আল মাহমুদের কবিতায় নর-নারী সম্পর্কে শারীরিক সংসর্গ প্রধানতম স্থান দখল করে রাখে। নানাবিধ অসঙ্গতি ও অশান্তি থেকে শান্তির প্রান্তরে উপনীত হওয়ার তাঁর মাধ্যম হলো বাস্তব নারীসত্তা ও প্রেম। নারীর স্নেহ, ভালোবাসা, অনুগ্রহ এবং সর্বোপরি শারীরিক উষ্ণতা। তাঁর কবিতার সর্বপর্যায়ে এই বিষয়টি প্রযোজ্য। সমালোচকের বক্তব্য হলো : ‘আল মাহমুদ যখনই কবিতা লিখতে বসেন, তখনই তাঁর মধ্যে নিঃশব্দে বিকশিত ও মুঞ্জরিত হয় তাঁর নিহিত নারীসত্তা। বিনতি, সমর্পণ, পেলবতা, নম্রতা, চারুতা – এসবেই তৈরি হয়েছে তাঁর শাশ্বত মৌচাক।’ তবে ‘আল মাহমুদের কবিতায় অবৈধ সংগমের সুখ সম্পচারিত হয়নি, কিন্তু তাঁর কবিতায় আছে সরল বলিণ্ঠ যৌনতা। লক্ষণীয় আল মাহমুদের প্রেমের কবিতায় প্রায় সব সময়ই আছে কামের মিশেল।’ আল মাহমুদের কাছে নারীশরীর ও নারীরূপ তুল্যমূল্য। প্রিয়নারীর রূপ ও শরীরের বর্ণনায় তাঁর দক্ষতা প্রবাদপ্রতিম। কল্পিত রূপের চেয়ে বাস্তব শারীরিক বর্ণনা তাঁর এই সকল কবিতার প্রাণ। এমনকি পুরুষের শরীরের বর্ণনায়ও তাঁর কুশলতা অনিবার্য। ‘পুরুষ সুন্দর’ উপন্যাসে আছে নর-নারী সম্পর্কের এক নতুন গল্প। বাংলাদেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে অনালোচিত একটি বিষয়। এ উপন্যাসে নর-নারী সম্পর্কের নতুন এক মাত্রা – সমকাম ও যৌনতার বয়ান আছে। ছোটগল্পে যৌনতাকে অবলম্বন করে লিখেছেন ‘পানকৌড়ির রক্ত,’ ‘কালোনৌকা,’ ‘জলবেশ্যা,’ ‘খনন’ – এর মতো গল্প।
৬. সংস্কৃতিতে ইতিহাস-ভূগোল-পুরাণ ও ঐতিহ্যের অনুসন্ধান
আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় সচেতন এবং স্বতস্ফূর্তভাবে বাংলাদেশের ইতিহাস, ভূগোল ও পুরাণের ব্যবহার করেছেন। যে কোনো দেশের সংস্কৃতিতে সে দেশের ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও পৌরাণিক প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ভূমিকা রাখে। আল মাহমুদের কবিতায় এই সকল উপাদানের ব্যবহার কীভাবে হয়েছে সেটি পর্যালোচনার বিষয়। তাঁর ব্যবহৃত ইতিহাস-ভূগোল ও পুরাণের একটি সাধারণ তালিকা তৈরি করলে সামগ্রিকভাবে তাঁর মানসিকতা ও চিন্তার ছবিটি স্পষ্টভাবে পাঠকের চোখে ধরা পড়বে। তাঁর ব্যবহৃত ইতিহাস-ভূগোল ও পুরাণ প্রসঙ্গের পর্যালোচনায় দেখা যাবে তিনি গ্রেকো-রোমান পুরাণের চেয়ে ভারতীয় ও সেমেটিক পুরাণের ব্যবহারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য। এর পাশাপাশি থাকে ভারতীয় লৌকিক পুরাণ এবং ইসলামি বিষয়ের পৌরাণিক উপস্থাপন। ইতিহাসের পাশে কল্পইতিহাস সৃষ্টি এবং লৌকিক পুরাণের নবতর অর্থপ্রদান ও নবতর উপস্থাপন তাঁর ইতিহাস-ভূগোল ও পুরাণ ভাবনার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
৭. দৃশ্যমান সাংস্কৃতিক উপাদান
আচরণ, ঐতিহ্য, জীবনদৃষ্টি ও বিশ্বাসের মতো বিষয়গুলোর পাশে আল মাহমুদের সাহিত্যে – প্রধানত কবিতায় – সাধারণভাবে ও স্বাভাবিকভাবে স্থান পায় সংস্কৃতির দৃশ্যমান বিষয়গুলো, যেমন- পোশাক-আশাক, সাজসজ্জা, খাদ্যাভ্যাস, শিল্প, কবি-কবিতা, সংগীত ইত্যাদি বিবিধ বিষয় এবং মানুষের ব্যবহার্য বিবিধ বস্তুগত উপাদান। আল মাহমুদের সাহিত্যে এই উপাদানগুলোর আত্মীকরণের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বস্তুগত বা দৃশ্যমান অবস্থার সামগ্রিক চিত্রটি উদ্ভাসিত হয়। এভাবে আল মাহমুদের চিন্তায় এবং কবিতায় বাংলাদেশের সংস্কৃতির উপাদানগুলো মৌলিক বিষয় হিসেবে স্থান পায়।
৮. সাজসজ্জা ও পোশাক আশাক
পুরুষদের পোশাক ও সাজসজ্জার ব্যাপারে আল মাহমুদের কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। তবে নারীদের পোশাকের বিষয়ে আল মাহমুদের পছন্দ হলো শাড়ি। সেটি বিভিন্ন রকম : হতে পারে সাধারণ কোনো শাড়ি অথবা জরির শাড়ি, সবুজ সুন্দর শাড়ি, জামদানি, কনকের কাজ করা মসলিন বা গাঢ় লাল নয়নসুক শাড়ি। আবার কোনো কিশোরীর জন্য তাঁর পসন্দ হলো কামিজ, দোপাট্টা, পাচাপা সালোয়ার এসব। (‘ঘটনা,’ বখতিয়রের ঘোড়া)। আর অলংকার ও সাজসজ্জার বিষয়ে তাঁর নারীরা সাধারণ গোত্রের মধ্যেই থাকেন। তারা রং মাখেন, সুর্মা লাগান, চুল আঁচড়ান, টুং টাং চুড়ি পরেন, তাদের পায়ে মল বাজে এবং খোঁপায় ফুল গোঁজেন (‘চারজনের প্রেম,’ লোক লোকান্তর; ‘কলস ভাসিয়ে,’ কালের কলস)। বিশ্বাসের বিষয় হিসেবে তাবিজ-কবজের অলংকার ব্যবহারও তাঁর চরিত্রে দেখা যায় (‘আত্মার কুহুধ্বনি,’ সেলাই করা মুখ)।
৯. খাদ্যাভ্যাস
আল মাহমুদের সাহিত্যে মুখ্যত কবিতায় উপস্থাপিত খাদ্যাভ্যাসে বাঙালির চিরকালীন ঐতিহ্যগত খাদ্যাভ্যাসের প্রাধান্য দেখা যায়। তাঁর উপস্থাপিত খাদ্যতালিকায় পাওয়া যায় : ফল, মহুয়ার মাটির বোতল, তিলবর্ণ ধান, মাছ-মাংস, দুগ্ধবতী হালাল পশু (‘সোনালি কাবিন,’ সোনালি কাবিন); ‘দুধের ওপরে ভাসা সর’ (‘আমি আর আসবোনা বলে,’ সোনালি কাবিন); ‘রুহু আফজার শরবতে, ছেঁচা আদার গন্ধ’ (‘ঘটনা,’ বখতিয়ারের ঘোড়া); শিংমাছ, মাষের বড়ি, তেতো শাক, বেনসনের প্যাকেট, ইলিশ মাছ, আখের গুড়, জিনের খালি শিশি, (‘ফেরার গাড়ি,’ বখতিয়ারের ঘোড়া); ‘ফ্রিজের ঠাণ্ডা সবজি,’ ‘রাঁধা সালুনের ঝোল’ ‘মাগুর মাছের বাসি টুকরো’ (‘অচেনা নদী,’ মিথ্যাবাদী রাখাল); ‘বনকচুর ছড়া বাঘা তেঁতুল মিশিয়ে শুঁটকি সহযোগে তৈরি ঘট,’ বুনো ওল, বাঘা তেঁতুল, শিদলের স্বাদ, টাকি মাছের মাথা ভেঙে তৈরি অদ্ভুত ঘেট (‘জন্মদিনের কবিতা,’ বারুদগন্ধী মানুষের দেশ); ‘মাছের ভর্তা, কাঁচা লঙ্কার বাঁটি, নূন, পানি আর কলমী শাঁকের তরকারী’ (‘স্বাধীনতার কবিতা,’ প্রেম পত্রপল্লবে); ‘বিন্নির আঠালো সাদা ভাত’ ‘ভাজা কই মাছ’ (‘বেলা শেষে কে বালক,’ বিরামপুরের যাত্রী)। খাদ্যতালিকার সাথে বাঙালির অভ্যাসের সংযুক্তি ঘটে ‘ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা’ কবিতায়। যেখানে স্বামীর পিরিচে ঢেলে চা পান করাকে গ্রাম্য স্বভাব বলে তিরস্কার করেন স্ত্রী : ‘ফুঁ দিয়ে কিংবা পিরিচে ঢেলে/চা গিলো নাতো! তোমার গ্রাম্য স্বভাব আর গেলো না।’ (‘ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা,’ আমি দূরগামী)।
১০. শিল্প-কবি-কবিতা-সংগীত ও ভাষা প্রসঙ্গ
শিল্প-সাহিত্য নিয়ে আল মাহমুদ প্রচুর বাহাস করেন। কবিতা নিয়ে অজস্র কথা বলেন তিনি। গদ্যে বলেন, কবিতায় বলেন। লেখায় এবং কক্তৃতায় বলেন। কবি ও কবিতাকে যখন তিনি তাঁর কবিতার বিষয় করেন, তখন সেখানে থাকে কাব্যতত্ত্ব, বাংলাদেশের কবিতার বর্তমান অবস্থা, বাংলা কবিতার আধুনিকতা প্রসঙ্গ, ব্যক্তিগত বিশ্বাস-অবিশ্বাস, বন্ধুত্ব-কাব্যহিংসা এবং প্রচুর আত্মকথন। এই সূত্রে কবি ও কবিতার বিস্তৃত ভূমি অবলোকনের সুযোগ ঘটে পাঠকের। এটি পাঠকের জন্য আল মাহমুদের কবিতা পাঠের সুন্দর অভিজ্ঞতা। কবিদের নাম পাওয়া যায়।
১১. ভাষা ও বাংলা ভাষার শব্দরাজি
আল মাহমুদ ভাষার সক্ষমতার জন্য আঞ্চলিক শব্দরাজির সন্ধান করেন এবং তার সফল প্রয়োগ করেন তাঁর কবিতায়। মাহমুদের এই বক্তব্যের প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর নিজের কবিতায়। তাঁর নিজের ভাষাভঙ্গি গড়ে উঠেছে এর আলোকে। কবিতায় আঞ্চলিক শব্দরাজির নিপুণ ব্যবহার করেছেন তিনি। ‘লোক লোকান্তর,’ ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’ থেকে তাঁর ব্যবহৃত কিছু আঞ্চলিক শব্দ : লোক লোকান্তর : নুন, পিলসুজ, তেল, চেঁচানি, পানখ সাপ, বউ, কাছিম, নিমকের ছিটা, শানকি, ব্যথার হিক্কা, মাচা। কালের কলস : আর্শি, সোয়ারি, নায়রী, লেবাস, তালাশ। সোনালি কাবিন : কাউয়া, বইচা মাছ, গতর, মরদ, উবু, জলডোরা সাপ, আইল, বানের জল, খোয়াড়, পাকালের প্রান্তে, শিকার পাইলা, কইরে হারামজাদা, পুংটামি, বে-তমিজ বান্দির পুতেরা, পানোথী, ছেঁদুর, খোরাকি, ছতর, বাপ, সড়কি, নুন, চোরের চোদানী, জাড়।
১২. নানাবিধ ব্যবহার্য উপাদান
প্রাত্যহিক জীবনযাপনের সঙ্গে যুক্ত নানাবিধ ব্যবহার্য উপাদান বা বস্তুগত উপাদান আল মাহমুদের কবিতায় বিভিন্নভাবে এসেছে। কবিতায় এ সকল উপাদানের ব্যবহার সাধারণ বিষয়। কবিরা তাঁদের রচনায় বা কবিতায় এ সকল উপাদানের ব্যবহার করে থাকেন। বিষয় বিবরণে, উপমায়, তুলনা-প্রতিতুলনায় অর্থাৎ আধার ও আধেয় উভয়ভাবেই বিষয়গুলো এসেছে। আল মাহমুদের কবিতায় ব্যবহৃত বাংলাদেশের সংস্কৃতির এই উপাদানগুলোর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা করা যায় এভাবে :
ব্যবহার্য উপাদান : সিগ্রেটের অগ্নিমুখ, পেন্সিল, কানিয়াকের ছিপি, পাত্র, মাটির ভাঁড়, পূর্বপুরুষের/তাড়ির আসর, পিতলের ঘড়া, হুঁকোর আগুন, করোগেট, ছন, মাটির দেয়াল, পলেস্তরা, পাড়ার মসজিদ, বইয়ের মলাট, ঘর, ঘড়া, কলসী, গরুর গোয়াল, ফুল তোলা পুরোনো বালিশ, মোজা, হাতার বোতাম, ব্রাশ, গ্লাসকীড, মসজিদ, জায়নামাজের বুটিতোলা পবিত্র নকশা, রুপোর গেলাস, জিনের খালি শিশি, নীল টাই, বই, তারের বাতি, বোরখা, জিন, ফেরেস্তা, আদমের পুত্র, পিরিচ, দেরাজ, বইপত্র, ক্যালেন্ডার, ল্যান্ডস্কেপ, সিডি, কাশ্মীরী শাল, চায়ের কাপ ইজিচেয়ারটার হাতলে, সংস্কৃতিতে ধর্মভাবনাকে যুক্ত করেন। ধর্মীয় বিষয়তো সংস্কৃতি হিসেবে গন্য। তসবীমালা, চকচকে উডল্যান্ড সু, গান্ধীজীর খটখটে খড়ম, বাংলাদেশের গ্রামীণ বা লোকজ সংস্কৃতির চিত্রায়ন : ব্যাগভরা মেলার তৈজস, পুতুল, মাটির নাও, করতাল, বাঁশি, ঢোল, কাঠের বড় ঘোড়া, হাতি, লালবাতি, মাটির সানকি, খড়োঘর, .মাটির দেয়াল, জামদানি শাড়ি, রাঙা খাদি। নাগরিক সংস্কৃতির বিবিধ বিষয় : ইমারত, ফ্ল্যাট, গ্রন্থনিচয়, পুরস্কারের ক্রেস্ট, মানপত্র।
ধর্মীয় জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িত উপকরণ : রেহেল, বাতিদান, ময়ূরপুচ্ছ, বোরকা, আল্লার আরশ, গোলাব জল, আতরদানি, তসবিহ, স্ফটিকের দানা, বোস্তামির পুকুর, ঘোলা-ময়লা জলের কাছিম, দরগাহের সিঁড়ি, তসবি, মিকাইল, ই¯্রাফিল, জিন,আজান মসজিদ, মিনার, ঈদ, ঈদের চাঁদ, হযরত আলী, খঞ্জর, মে’রাজের ঘোড়া, নূহের নৌকা, ফেরেস্তা, হাওয়ার কন্যা, পিতা আদম, লায়লা, কাবিলের বোন, সিজদা, নিজামুদ্দীনের দরগা, লায়লাতুল কদরের জিকির, ঊষার প্রার্থনা, আল্লার আশিস, শাহাদাত বা শহীদ, ইবলিশ, ইউসুফ, ঈদের পোলাও, কবজ।
১৩. জীবনদৃষ্টি ও বিশ্ববীক্ষা
কবির বিশ্বাস-অবিশ্বাস প্রসঙ্গে আল মাহমুদ বলেন : ‘আমি মনে করি লেখকের কোনো একটি মহৎ আদর্শ থাকা উচিত। অন্তত আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্ন সমদৃষ্টি কিংবা কোনো বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পিত নিরপেক্ষতা।’ আল মাহমুদের এই বক্তব্যই তাঁর জীবনদৃষ্টি বা কবিতায় বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সারাৎসার। পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে এই বক্তব্যের তিনটি অংশ।
প্রথম অংশে তিনি লেখকের কোনো ‘মহৎ আদর্শে’র কথা বলছেন, যে ‘মহৎ আদর্শ’ প্রথম থেকে শেষ অবধি তাঁর কবিতা ধারণ করে। হ্যাঁ, এই আদর্শের দিক পাল্টেছে, এক আদর্শ থেকে আরেক আদর্শে কবির উত্তরণ ঘটেছে। কিন্তু তিনি আদর্শচ্যুত হননি। ‘লোক লোকান্তর’ থেকে ‘সোনালি কাবিন’ পর্যন্ত তাঁর একধরনের আদর্শে বিশ্বাস ছিলো। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’তে এসে তাঁর এই বিশ্বাস বাঁক নেয় অন্য ভূমিতে। আরেক ধরনের বিশ্বাসে তিনি উপনীত হন এখানে।
উদ্ধৃতির দ্বিতীয় অংশে তিনি বলেন ‘আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্ন সমদৃষ্টি’র কথা। কবিতার বিশ্লেষণে দেখা যাবে ‘লোক লোকান্তর’ থেকে ‘সোনালি কাবিন’ পর্যন্ত সময়ে এই ‘আধ্যাত্মিক ধ্যানমগ্ন দৃষ্টি’ বা তার অনুসন্ধান তাঁর বর্তমান ছিলো।
আর তৃতীয় অংশে তিনি ‘কোনো বিশ্বাসের কাছে আত্মসমর্পিত নিরপেক্ষতা’র কথা বলেন। যে বিশ্বাস তিনি খুঁজে পেয়েছেন ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’তে এসে।
১৪. ঈশ্বরের সন্ধান
‘লোক লোকান্তর’ ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিন’ কাব্যগ্রন্থত্রয়ে দেখা যায়, কবি ‘ঈশ্বর’ শব্দ ব্যবহার করেন ঘুরেফিরে। কিন্তু কোনো স্থির বিশ্বাসে উপনীত হতে পারেন না। বিশ্বাস-অবিশ্বাস, সংশয় ও অনুসন্ধান এই দোলাচলে দুলেন তিনি। একই সময়ে পাশাপাশি অবস্থানে থেকে বিশ্বাস-অবিশ্বাস আর সংশয়-অনুসন্ধান সমানভাবে চলে তাঁর মনোভুবনে।
একদিকে এই সময়ে কবি তীব্রভাবে কল্পনা করেন ঈশ্বরের মুখ। হৃদয়ে ধারণ করতে চান ঈশ্বরের মুখ এবং ছবি। কিন্তু সেটি সহজে কবির কাছে ধরা দেয় না। অন্যদিকে এই বিশ্বাস এবং ঈশ্বরের মুখ অন্বেষণের পাশে পাশাপাশি থাকে তাঁর অবিশ্বাস ও দ্বিধা। ধর্ম ও ঈশ্বর নিয়ে তাঁর অবিশ্বাস ও সংশয় আছে ‘পিপাসার মুখ,’ ‘আমি,’ ‘রক্তের দিকে,’ ‘ভয় থেকে,’ ‘সোনালি কাবিন,’ ‘উল্টানো চোখ’ ও ‘নদী তুমি’ কবিতায়। পরবর্তী পর্বে অর্থাৎ ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’তে এসে তাঁর কাঙ্ক্ষিত বিশ্বাসের সন্ধান তিনি পান। সেই বিশ্বাসের আলোকে তিনি ‘ইসলামকেই ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ’ করেন। কাব্যচর্চায় এর প্রমাণ মিলবে অজস্র।
১৫. ইসলাম প্রশস্তি
এই পর্বে আল মাহমুদ বিপুল পরিমাণে ইসলাম ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় যেমন – ইসলাম ধর্ম, আল্লাহ, নবি মোহাম্মদ (সা.), সাহাবি, ধর্মীয় বীর এবং শহিদদের প্রশংসাসূচক কবিতা লেখেন। প্রশংসায় যেমন, প্রার্থনায়ও তেমন বলিষ্ঠ তাঁর ভাষা। ‘ঈশ্বর’ শব্দ ব্যবহার থেকে তিনি যেন মুক্তি পেয়েছেন এই পর্বে। তার বদলে ‘প্রভু’ বা ‘আল্লাহ’ শব্দের ব্যবহারে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য এখন। ‘প্রভু’র নিকট প্রার্থনার জন্য আহবান জানান সবাইকে। আল্লাহর প্রশংসার পাশে ইসলাম ধর্মের নবি হযরত মোহাম্মদ সা. এবং তাঁর সাহাবিদের প্রশংসাসূচক কবিতা রচনা করেন কবি।ইসলাম ধর্মে ধর্মযোদ্ধা, বীর ও শহিদদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। ইসলাম ধর্মের এবং ধর্মীয় বীরদের স্তুতি করেন ‘সাহসের উপমা’ (আরব্য রজনীর রাজহাঁস) কবিতায়। এই বিষয়গুলো ছাড়াও কবিতায় আল মাহমুদ ইসলাম ধর্মে – বিশেষভাবে পবিত্র কোরআনে – বর্ণিত মহাপ্রলয় ও হাশর, মানুষের অন্তিম পরিণতি, বেহেস্ত, দোজখ, ফেরেস্তা- ইস্রাফিল, হারুত, মারুত- আখিরাত, পুনরুজ্জীবন প্রভৃতি প্রসঙ্গ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। এই পর্যায়ে তাঁর স্বস্পাচ্ছন্নতার মাঝেও ইসলাম ধর্মীয় বিষয়গুলো প্রাধান্য পায়।
১৬. বিশ্বাসের আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল
বিশ্বাসের প্রশ্নে এসে আল মাহমুদ যতটা না স্থানিক, তার চেয়ে অনেক বেশি আন্তর্জাতিক। এই আন্তর্জাতিক চেতনার একটা ধর্মীয় ও রাজনীতিক দিক আছে। সেটি হলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ। আর ভৌগোলিক দিক দিয়ে ইউরোপ ও আমেরিকার চেয়ে এশিয়া ও আফ্রিকা প্রসঙ্গে কবির আগ্রহ বেশি। এশিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, ভারতের কাশ্মীর, আফ্রিকার আলজেরিয়া ও মিশরের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মানসপ্রবণতা ও কবিতাকে প্রভাবিত করেছে। সামগ্রিকভাবে তাঁর ‘আন্তর্জাতিক চেতনামণ্ডিত’ কবিতাগুলোর পর্যালোচনা করলে অখণ্ডভাবে যে মৌল বিষয়গুলো পাওয়া যায় সেগুলো হলো : স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, বর্ণবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধিতা, মানবতার জন্য শ্রদ্ধাবোধ এবং ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ। পরাধীনতার যন্ত্রণা ও স্বাধীনতার আকাক্সক্ষার বিষয়টি আল মাহমুদ ভালোভাবে বুঝেন।
১৭. মার্কসবাদের দুই পর্ব
আল মাহমুদের বিশ্বাসের জগতে মার্কসবাদ, বিশেষত শ্রেণীসাম্যের ধারণাটি গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের আকাক্সক্ষা তাঁর চিন্তায় এবং সাহিত্যে সব সময়ই প্রবলভাবে উপস্থাপিত হয়। সাম্যের আকাক্সক্ষায় প্রথম জীবনে মার্কসবাদকে তাঁর সমাধান বলে মনে হয়েছিলো। কিন্তু তাঁর পরিবর্তিত মানসিকতায় মার্কসবাদ সেই গুরুত্ব হারিয়েছে। সাম্যের মন্ত্রে ইসলামি ধারণাই এখন তাঁর সমাধান। পরিবর্তিত চিন্তায় মার্কসবাদের তীব্র সমালোচক তিনি। তাঁর মনে হয় : ‘সাম্প্রতিক কালের সমাজতাত্ত্বিক ও দার্শনিক বিচারে মার্কসবাদ পৃথিবীতে কোথাও এখন বিপ্লবী শক্তি নয়। অন্তত কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর নেতৃত্বে বিশ্বের কোনো দেশে আর বিপ্লব হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ তাঁর দ্বিতীয় পর্যায়ের রচনায় মার্কসবাদ সম্পর্কিত এই ধারণাই বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
আলোচনার প্রান্তিকে এসে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, আল মাহমুদ তাঁর সাহিত্যে বিশেষভাবে কবিতায় বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য, গভীরতা এবং ব্যাপকতাকে অনুভব করতে সক্ষম হয়েছেন। এবং সাহিত্যে তার উপস্থাপনও করেছেন গভীর সহৃদয়তায়। তবে এই সাংস্কৃতিক জীবনে লক্ষ্যযোগ্য বিষয় হলো, এখানে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবন ও সংস্কৃতিকে যতোটা পাওয়া যাবে উচ্চবিত্তের জীবন ততোটাই অনুপস্থিত। লোকজীবন ও লোকসংস্কৃতির প্রতি কবির আগ্রহের কারণেই বিষয়টি ঘটেছে।
আল মাহমুদের সাহিত্যে উপস্থাপিত বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও নিসর্গের বিশ্লেষণে মৌলিক যে বিষয়গুলো পাওয়া যায়, সেগুলো হলো : আল মাহমুদ নিজেকে মনে করেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী রোমান্টিক ধারার কবি। কিন্তু তাঁর কবিতায় সামাজিক উপযোগবাদের লক্ষণ সুস্পষ্ট। সমকালীন ঘটনাবলি আল মাহমুদের কবি মানসে সুস্পষ্ট প্রভাব রেখেছে। যেকারণে সমকালের – পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের – অশান্ত ও দুঃসহ সময়কে এলিয়টের পোড়োভূমির আদলে কবিতায় চিত্রিত করেছেন।
রাজনীতিক বিষয় এবং রাজনীতির প্রতি তাঁর আগ্রহ চাপা থাকে না কোনো সময়। বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক ঘটনাবলির আলোড়ন পাওয়া যায় তাঁর চিন্তায় ও কবিতায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত বাঙালি জাতির সন্ধিক্ষণগুলোতে আল মাহমুদ সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন এবং এই ঘটনাপ্রবাহ তাঁর সাহিত্যের উপকরণ হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। রাজনীতিক ঘটনাপ্রবাহে ও বিশ্বাসের জগতে আল মাহমুদ জঙ্গম ও স্থির নন। পরিবর্তনকে তিনি জীবনের ধর্ম বলে মানেন। যে কারণে প্রথম জীবনের মার্কসবাদী আল মাহমুদ জীবনের মধ্যপর্বে (আনুমানিক আটত্রিশ বছর বয়সে) এসে মার্কসবাদে আস্থা হারান এবং ইসলামি সাম্যবাদে শান্তি খোঁজেন। জীবনদৃষ্টির এই পরিবর্তন তাঁর সাহিত্যচর্চায় প্রভাববিস্তারী বিষয় হিসেবে কাজ করেছে।
বাংলাদেশের সামাজিক স্তরবিন্যাসে বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশাজীবী, গ্রাম-নগরের বৈপরীত্য ও দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো নিয়ে আল মাহমুদ ওয়াকিবহাল ছিলেন। নাগরিক যন্ত্রণার চেয়ে গ্রামীণ সরল জীবনই তাঁর কাম্য। তাঁর অঙ্কিত গ্রাম সরল, প্রাণবন্ত এবং বাংলাদেশের প্রতিনিধিস্থানীয়।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক জীবনেতিহাসে দারিদ্র্যের বিষয়টি কবিকে আনন্দ দেয় না। দারিদ্র্যকে তিনি উপভোগ করেন না, কিন্তু বাঙালিজীবনে দারিদ্র্যের বাস্তবচিত্রকে সাহিত্যে উপস্থাপন করেন। এবং দারিদ্র্যকে এড়াতে না পেরে আধুনিক জটিল জীবনে যৌনতার আশ্রয় নেন। যৌনতার উন্মোচন জীবনের উন্মোচনের নামান্তর হয়ে দাঁড়ায় তাঁর কাছে। তবে এই যৌনতায় তিনি ‘অবৈধ সংগমের সুখ’ প্রচার করেন না। তাঁর বৈধ স্ত্রীকে নিয়ে তাঁর যত উল্লাস। গার্হস্থ্য প্রেমে আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকেন তিনি।
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনপ্রসঙ্গে অতীতচারিতা তাঁর কাছে গুরুত্ব পায়। ইতিহাস-ভূগোল-পুরাণ ও ঐতিহ্যকে তিনি নতুনভাবে উপস্থাপন করেন। মিথের নতুন অর্থ দেন। তবে সংস্কৃতির বাহ্যিক বা উপরিস্তরের বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। সেখানে সাম্প্রতিক বিষয়ের প্রাধান্য লক্ষ করা যায়।
সাংস্কৃতিক চিন্তায় নর-নারীর আন্তসম্পর্কের ক্ষেত্রে পারিবারিক সুখকে তিনি প্রাধান্য দেন। স্ত্রী-সন্তানের জন্য ভালোবাসা তাঁর রচনায় আলাদা গুরুত্ব পায়। আর বিশ্বাসের ক্ষেত্রে আল মাহমুদ স্থানীয় চেতনাকে ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত হন। ইসলামের বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধে তাঁর আস্থা স্থাপিত হয়। সমাজ-সংস্কৃতির বিষয়গুলোর পাশে আল মাহমুদের স্বকীয়তা হলো বাংলাদেশের নিসর্গজীবনের উপস্থাপন। বাংলাদেশের প্রকৃতি বা নিসর্গ আল মাহমুদের মনোভুবনের প্যাটার্নকে স্বকীয়তা দিয়েছে।