উৎকৃষ্ট কবিতা হচ্ছে নান্দনিক সৌন্দর্যমাখা উচ্চারণ। যে কথা আটপৌরে কথোপকথনে বা গদ্যের নীরস ভাষায় মনে কোনো আবেদন সৃষ্টি করে না, কোনো মুগ্ধতার জন্ম দেয় না, সে-কথাটিই যখন প্রকৃত কবিতার চরণে উচ্চারণ করা হয় তখন তা পাঠক শ্রোতার মনে আবেদননিবিড় সম্মোহনের সৃষ্টি করে। চরণটি পুনরায় পড়তে বা শুনতে ইচ্ছে করে। বারবার শোনার পরও তার আবেদন নিঃশেষ হয়ে যায় না। মাঝখানের বিরতি দিয়ে পুনরায় পড়লে তাকে পুরাতন চাঁদের মতো নতুন লাগে। তার নান্দনিকতার জোছনায় অবগাহনের বাসনা পুনঃজাগরিত হয়। কোনো কবিতার সবগুলো চরণই অমর আবেদনঘন ও সৌন্দর্যের সুধামাখা হয় না। কয়েকটি ম্যাজিক লাইন্স একটি কবিতাকে আবেদনের স্থায়িত্বে উন্নীত করে দিতে পারে, করে দেয়। যে-কবি যত শক্তিশালী, তার ম্যাজিক চরণ সৃজনের ক্ষমতা ততো বেশি। উপস্থাপনা কৌশলের অভিনবত্ব কোনো কবিতাকে আকর্ষণীয় করে তোলে; তবে একইসঙ্গে বক্তব্যের গভীরতাও থাকা প্রয়োজন। বক্তব্যহীন উপস্থাপনা সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে কিন্তু তার আবেদন স্থায়ী হয় না। কবিতা আবেগ বা ভাষার তরলে ভেসে গেলে হয় না। আবার কষ্টকল্পিত কোষ্ঠকাঠিন্যময় কবিতাও পাঠককে নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। কবিতা যত জীবনঘনিষ্ঠ হবে, শব্দের ব্যবহারে যত বেশি ব্যঞ্জনা ও সৌন্দর্য সৃষ্টি হবে, কবিতা ততোবেশি সম্মোহনী ক্ষমতা অর্জন করবে। সুতরাং উপস্থাপনা রীতির অভিনবত্ব, বিষয়ের জীবন ঘনিষ্ঠতা, তারল্য ও কষ্টকল্পনা পরিহার এবং প্রকাশের-অপ্রকাশের আলো-আঁধারি একটি কবিতার আবেদন সৃষ্টিতে এবং তার স্থায়িত্ব বৃদ্ধিকরণে মূল ভূমিকা পালন করে থাকে।
আল মাহমুদ যে কোনো অর্থেই একজন শক্তিমান কবি। তাঁর কাব্যভাবনা, শব্দের ব্যবহারে সচেতনতা, নান্দনিক বোধ, ভাবনার জীবনঘনিষ্ঠতা এবং গভীর অথচ সাবলীল উচ্চারণের স্বতঃস্ফূর্ততা প্রভৃতি গুণে তার কবিতা পাঠকের জন্য এক নান্দনিক আনন্দের বাগান। এই বাগানে ভালো লাগার অজস্র ফুল অজস্র বৃক্ষ অজস্র কলকাকলি, অফুরন্ত আলো-ছায়ার মায়াবী মিথস্ক্রিয়া। তার কবিতার ভাঁজে ভাঁজে অফুরন্ত জোছনা; তাঁর কবিতার অঙ্গে অভিনব সুন্দর অলংকার; তাঁর কবিতার প্রাণে অপরিমেয় প্রাণরস; তাঁর কবিতার শেকড়ে মৃত্তিকা ও মাতৃভূমি। তাঁর কবিতার উচ্চারণে বেজে ওঠে সুর, নেচে ওঠে ছন্দ, খেলে যায় তাল।
কবিতার পাঠক কবিতার কত সংজ্ঞাই পড়ে এসেছে। সেসব সংজ্ঞা পাণ্ডিত্যের ভারে অথবা বুদ্ধির কচকচানিতে আকীর্ণ। আল মাহমুদ তাঁর গভীর সৃজনক্ষমতা, নিবিড় অনুভবশক্তি ও গভীর স্বজ্ঞায় কবিতাকে চিহ্নিত করেছেন পরিচিত পরিবেশ ও প্রতিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকৃতির সচ্ছলতা ও জীবনের প্রাণময় সমাহারের প্রাঙ্গণে। তারা আকাশচারী নয়; উদ্ভট কষ্টকল্পনা নয়, তরল আবেগের চটুল উসকানি নয়। তাঁর কবিতা প্রকৃতির সচ্ছল প্রাণময় সাবলীল ও বৈচিত্র্যময়তার সৌন্দর্যে ভাস্বর। তিনি তাঁর ‘কবিতা এমন’ নামক কবিতায় কবিতার যে দৃষ্টান্তভিত্তিক সংজ্ঞা উপহার দিয়েছে, তা সঙ্গে সঙ্গে পাঠককে সম্মোহিত করেছে। পাঠক কবিতার পূর্বপঠিত সংজ্ঞাসমূহ ফেলে দিয়ে কবিতা এমন বচনসমূহ মুখস্থ করে নিয়েছে।
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের সুখ; নিমডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাই বোন
আব্বার ফিরে আসা সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া-
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট;
কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী
কুয়াশায় ঢাকা পথ, ভোরের আজান কিংবা নাড়ার দহন
পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ
মাছের আঁশটে গন্ধ উঠোনে ছড়ানো জাল আর
বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর।
… … …
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লানমুখ বউটির দড়িছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীলখামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার
(কবিতা এমন/সোনালি কাবিন)
উদ্ধৃত কবিতাংশের প্রতিটি চিত্রকল্প আমাদের অতি চেনাজানা প্রতিটি চরণে ব্যবহৃত শব্দের সরলার্থ সকলের নিকট সহজেই বোধগম্য। অথচ প্রতিটি উক্তির বা চরণের ভেতরে প্রবাহিত যে মমতা, ভালোবাসা ও সহজসরল অফুরন্ত লোকায়ত সৌন্দর্য, তা স্নিগ্ধ ও মায়াবী। এই স্নিগ্ধ মায়াবী আকর্ষণ কবিতাটির অনিঃশেষ নান্দনিক ঐশ্বর্য। ‘কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার’ এই উক্তিটি লোকায়ত বাংলার যে সহজ সরল অথচ সুগভীর সুনিবিড় সৌন্দর্য ও যাদুকরী শক্তি ধারণ করে তা কবিতার কোনো সংজ্ঞা ধারণ করতে সক্ষম নয়। এই চরণটি উচ্চারণের সাথে আমাদের মানসচোখে একটি কচিকিশোরীর নিষ্পাপ সহজসরল মুখসৌন্দর্য বাতাসে খেলতে থাকা খোলা কালো চুল এবং চোখে মধুর স্বপ্নের আনাগোনা ইত্যাদি চিত্রকল্প চোখের স্নিগ্ধ আলোকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে; মন বলে এ আয়েশা তো আমারই বোন, আমারই বাল্যের সাথী প্রতিবেশী মেয়ে, আমারই প্রথম ভালো লাগা ভালোবাসার গোপন নায়িকা!
আল মাহমুদ এমন এক কবি যার হাতে শব্দ যে কোনো অর্থব্যঞ্জনা প্রকাশে, যে কোনো শিল্পিত সৌন্দর্য ধারণে প্রস্তুত হয়ে থাকে। তিনি লোকায়ত শব্দযোগে আলোকিত অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতিমা নির্মাণ করতে পারেন।
কষ্টকল্পিত রহস্যসৃষ্টির কৃত্রিম সাধনা আল মাহমুদের নয়। স্বাভাবিকতা ও সাবলীলতা তাঁর প্রধান দুই অস্ত্র। প্রচলিত শব্দে অভিনব ভাবনার রঙ মিশিয়ে কয়েকটি সহজ পোচেই তিনি অপরূপ সুন্দর প্রাণপ্রতিমা সৃষ্টি করতে পারেন। প্রয়োজন অনুপাতে যে প্রতিমার চোখে মুখে এক চিলতে রহস্যময় হাসি অথবা তার অধরে অংজ্ঞায়িত বেদনার হালকা মলিন লিপস্টিকের ছোঁয়া জুড়ে দেন। কখনোবা তার শরীরে স্প্রে করে দেন অজানা লোকের অলৌকিক বাগানের সৌরভ। সে রহস্যময় হাসি আমাদের আনন্দের অংশীদার করে, সে বেদনার মলিন রঙ আমাদের হৃদয় মনকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়; সে আলোকিত সৌরভ আমাদের মনকে মাতোয়ারা করে এলোমেলো বাতাসে ভাসমান শিমুল তুলার মতো কেন্দ্রহীন কল্পনার রাজ্যে উড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমরা কিছু বুঝি, কিছু বুঝি না, কিছু আঁচ করি, কিছু আঁচ করতেও ব্যর্থ হই; কিন্তু কবিতার সুরভিত সৌন্দর্য আমাদের পাঠকমনকে তৃপ্তি-অতৃপ্তির মাঝখানে সম্মোহিত করে রাখে। কবিতা পড়া শেষ হয়, কিন্তু পরিধেয় বস্ত্রে মিশে যাওয়া পারফিউমের মতো সুরভিত আনন্দের উপলব্ধি জড়িয়ে থাকে আমাদের অবশিষ্ট সময়।
হৃদয়ের অন্তঃস্থলে মোহময় সুগন্ধি লুকিয়ে
গন্ধের উৎস খোঁজে ক্লান্ত হয়ে যেমন হরিণী।
পর্বতের আশপাশে লতাগুল্মে পাথরে গুহায়
অনর্থক নাক ঘষে, যন্ত্রণায় তৃষ্ণায় অধীর
বাঘের হাতের নিচে অবহেলে যায় কতবার
কতবার ফাঁকি দিয়ে তীক্ষ্ণ তীর, শিকারির চোখ
অদৃষ্টের অদ্ভুত খেলায় এই চিত্রিত শরীর
কৌশলে বাঁচিয়ে রেখে সারাদিন ঘাসপাতা খায়।
তেমনি গন্ধের ফুল মনে হয় হৃদয়ে আমারো
মায়াবী সুরভি হানে রন্ধ্রে রন্ধ্রে হরিণীর মতো
আর আমি ঘ্রাণ শুঁকি অন্ধকারে আলোয় বাতাসে
ঘাসে ও মাটিতে ঠিক বিকারের রোগীর মতন।
আমার সমস্ত রক্তে যেন কোন হোমের আগুন
জ্বলে ওঠে দাউ দাউ সহ্য করি প্রবল দাহন।
(নেশার সুরভী যেন/লোক লোকান্তর)
উদ্ধৃত কবিতাটি কি বলতে চায় তা প্রথাপ্রিয় পণ্ডিতদের হাতে ছেড়ে দিয়ে কেবল যদি কবিতার চিত্রকল্প-কল্পচিত্রসমূহের সৌন্দর্যটুক উপভোগ করি, কবিতার শরীরে মিশে থাকা সুঘ্রাণটুকু শুঁকে দেখি, তাই কবিতাটির গভীর নিবিড় প্রেমে পড়ার জন্য যথেষ্ট হয়। নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং অলৌকিক খোশবু কবিতাটিকে শিল্পের ফুলবাগিচায় উন্নীত করেছে। এ বাগানে পাঠকমন বারবার উড়ে আসতে চাইবে সেটাই স্বাভাবিক, সেটাই শৈল্পিক বাস্তবতা।
আল মাহমুদ বলেছেন যে সুখ-দুঃখের অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের ব্যর্থতাই বেশি। ফুল যেমন করে তার সৌরভকে ছড়িয়ে দেয়, নদী যেভাবে ব্যথার তরীতে ফুটিয়ে তোলে তার ঢেউগুলো, মানুষ ততোটা অকৃত্রিম সফলতায় তার মনের ভাব অনুভূতি উপলব্ধিকে নিজ সৃষ্টিকর্মে তুলে ধরতে পারে না। তাঁর মতে মানুষের সকল সৃষ্টি মনের দিক হতে দ্বিতীয় শ্রেণীর এমনকি সেসব এতটাই কৃত্রিম ও নকল যে তাকে নির্বোধের কারিগরও বলা চলে। রুমালের আঁকা দাগে রঙিন সুতোয় ফুল তোলা, নির্বিষ কালো দড়ির মতো করে সাপের চিত্র অঙ্কন কিংবা কাদার মূর্তিতে পরচুলা এঁকে তাকে মানুষের প্রতিমূর্তি বানানো প্রতিটাই সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা ধারণ করে বেশি। বিষ ছাড়া তো সাপ হয় না, গন্ধ ছাড়া ফুল নয় এবং প্রাণ ছাড়া মানুষ হতে পারে না। অথচ উল্লিখিত তিনটি উদাহরণ যা মানবসৃষ্ট শিল্প বলে খ্যাত, তার কোনোটিতেই সেই মূল অকৃত্রিম ঘ্রাণ, বিষ ও প্রাণ নেই। তাই শিল্পী হিসেবে স্রষ্টা হিসেবে প্রকৃতির মতো কিংবা বিধাতার মতো মানুষের সাফল্যের অবকাশ নেই। তারপরও তারা সাধ্যমত সৃষ্টি করে, নির্মাণ করে রচনা করে। কবি-শিল্পী-ভাস্কর্য পটুয়া-কামার-কুমার এই নানাবিধ মানবশিল্পীর মধ্যে যার যেমন সাধ্য বা সৃজনক্ষমতা তার হাতে সেই ধরনের (আল মাহমুদের কথায়) দ্বিতীয় শ্রেণীর সৃষ্টি ততো বেশি সুন্দর ও সার্থক হয়ে ফুটে ওঠে। বাংলা কবিতায় যারা সার্থক স্রষ্টা তাদের মধ্যে আল মাহমুদের সাধ্য বা সৃজনক্ষমতা সবার চেয়ে বেশি বললে অযৌক্তিক হবে না।
মানব-শিল্পীর হাতে সৃষ্ট শিল্প প্রকৃতির হাতে সৃজিত শিল্পের মতো হুবহু প্রাণপূর্ণ, রসনিবিড় রঙদার বৈচিত্র্যে ভরপুর ও সচ্ছল হয় না সত্য, তবু কোনো কোনো কবি শিল্পী তার সৃষ্টিকে প্রাণবন্ত ও সৌন্দর্য সুষমামণ্ডিত করে তুলতে পারেন। আল মাহমুদ সেই বিরল কবি শিল্পীদের একজন। কোনো কবিতা গভীরভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে বিষয়বস্তুর অনন্যতায় কিংবা নিবিড়ভাবে চিত্তাকর্ষক হয়ে ওঠে উপস্থাপন কৌশলের কারুকাজের ঐশ্বর্যে। শব্দই হচ্ছে কবির হাতে সৃষ্টির সরঞ্জাম ও উপকরণ। আল মাহমুদ শব্দ নির্বাচনে ও তার ব্যবহারে অতুলনীয় প্রতিভা ও অনন্য নৈপুণ্যের অধিকারী। তাঁর হাতে শব্দ বেজে ওঠে, রেঙে ওঠে, নেচে ওঠে। ঝর্ণার হাতে যেমন জল, আল মাহমুদের হাতে তেমনি শব্দ। তিনি ব্যবহৃত শব্দের মধ্যে এমন অর্থ ব্যঞ্জনা, আলোর আভাস, মুত্তিকার রস এবং রক্তপ্রবাহের ন্যায় উন্মাদনাভরা গতি সঞ্চার করেন যে শব্দ যোগ সৃষ্টি কবিতা প্রাণপ্রবাহে কল্লোলিত হয়ে ওঠে, গতিময়তায় ঝর্ণার মতো ঝংকৃত হয়ে ওঠে, আনন্দে উঠতে চায় এবং নিবিড় সৌন্দর্যে স্মিতহাস্যে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সে জন্যই তাঁর কবিতা এত জীবন্ত, এত মৃত্তিকালগ্ন। এতটা শোণিতের তরঙ্গ ছুঁয়ে যাওয়া।
ভেবেই তো অন্ধকারে আমি হবো রাতের পুরুত
আদিম মন্দিরে একা তুমি এসো নগ্নতার দেবী
মগ্নতার অন্ধকারে আমি যার একমাত্র সেবী
ধূপের গন্ধের স্বাদ এনে দেবে এমন যে দূত
সে তো শুধু গন্ধবহ পৃথিবীর পুষ্পময় মাস
পুরানো মদের গন্ধে ভরা যার রাতের বাতাস
অসহ্য আনন্দ হেনে তোমাকেই করে সে নিখুঁত
অথবা হৃদয়ে ঢালে যন্ত্রণার করুণ নির্যাস
(সিম্ফনি / লোক লোকান্তর)
‘আদিম মন্দির’ চিত্রকল্পটি নর-নারীর মিলনের শাশ্বতরূপ ও পবিত্রতাকে প্রতিভাসিত করেছে। মদের গন্ধ, ধূপের ঘ্রাণ, পুষ্পময় মাসের হাওয়া যৌবনের দুর্দান্ত আকাক্সক্ষাকে মদির ও বর্ণিল ব্যঞ্জনায় ভরে তুলেছে। এ প্রস্তাবনা মোহনীয়তা ও মোহময়তায় রঙিন রেশমি জাল বিছিয়েছে যে জালে ধরা না দিয়ে পারে না দেহমনের কামনা বাসনায় কল্লোলিত যৌবনদীপ্ত নর-নারী। এ কবিতা জীবন্ত; এ কবিতা হৃদয়ের পিপাসা, রক্তের নেশা, মনের ক্ষুধা, শরীরের আহবান সবকিছুকেই ধারণ করেছে শিল্পসম্মত প্রাণবন্ততায়। আবার শব্দে ধারণকৃত ছন্দ, সুর, তাল ও ঝংকার কবিতাটিকে পুনঃপুন শ্রবণের অফুরন্ত মাধুর্যে ভরে তুলেছে। এমন জীবন্ত কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা ও আনন্দ বাংলা কবিতা পাঠকের পূর্বে কখনো ছিল না।
মানুষের অন্যান্য প্রাণীর মতো মৃত্তিকারই সন্তান। প্রকৃতি তার খেলার উঠোন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির চলমান রথ মানুষকে ভাবনায় ও কল্পনায়, মননে ও রুচিতে যতই তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে; তার মনের সাথে মৃত্তিকার ও প্রকৃতির জন্মগত ও স্বভাবগত সম্পর্কের সূত্র অন্তরঙ্গ আড়ালে অচ্ছেদ্য রেখে গেছে। চাঁদকে জয় করেছে মানুষ কিন্তু বসবাসের জন্য বেছে নেয়নি; মাটির পৃথিবীই তার চূড়ান্ত পছন্দের ঠিকানা। মাটির মানুষের ভাবনা ও চিন্তা সুখের কল্পনা ও দুঃখের অনুভূতি সবকিছুই প্রধানত মৃন্ময় প্রকৃতির। মানুষ কবিতায় চিত্রশিল্পে ভাস্কর্যে অর্থাৎ সকল সৃজনশীল শিল্পে তার মনের ছাপ, অনুভবের প্রতিফলন এবং পরিচিত অঙ্গনের প্রতিচ্ছবি দেখতে ভালোবাসে। কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সিক্ত যাদের সারা দেহমন মাটির মমতারসে/এই ধরণীর তরণীর হাল রবে তাহাদেরি বশে।’ এই আপ্ত বাক্যটি কবি এবং কবিতার ক্ষেত্রেও সামান্যভাবে প্রযোজ্য। তিরিশের পঞ্চপাণ্ডবের ইউরোপীয় আধুনিকতার ট্রেন ধরে মানসিকভাবে ও মননগতভাবে দেশান্তরী হওয়ার যাত্রায় সহযাত্রী না হয়ে আল মাহমুদ বাঙালির কিংবা বলা যায় এশিয়াবাসীর প্রত্নগন্ধে ভরা সবুজ শ্যামল উঠোনে বসে প্রকৃতিলগ্ন কবিতা রচনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাঁর সে সিদ্ধান্ত ছিল যথার্থ ও দূরদর্শিতাপূর্ণ। দেশত্যাগী বাঙালি কবির হৃদয় অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে মাছ পাখি নাও নদী পুতুল আর বহমান মানুষের অনিবার্য প্রতীকের ভিড়ে। অন্যান্য মানুষ সামনের দিকে যতই দূরে যাক, আল মাহমুদ ঘোরলালা বর্ষণের মাঝে উবু হয়ে রয়ে যান নিজ নিজভূমির ওপর এবং মৃত্তিকাকেই নিজের কিষাণী, আপন প্রেয়সী জ্ঞান করে তাকে নিয়ে করে গেছেন কবিতার ঘর-গেরস্থালি। সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক ভারসাম্য, শিকারের পেশা ও নেশা, ভেদাভেদহীন লোকায়েত জীবন, নদীকেন্দ্রিক জীবন ও জীবিকা, মাৎস্যন্যায়ের বিপরীতে সরল সাম্যনির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থা, জ্ঞানান্বেষণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, পুন্ড্রনগর, পাট্টিকেরা প্রভৃতি নগর সভ্যতার প্রতিষ্ঠা, ন্যায়ভিত্তিক কৃষিজীবন, নারী পুরুষের অধিকারের সমতা, নর-নারীর প্রকৃতিলগ্ন সৌন্দর্যচর্চা, দেবদেবীর অন্যায় প্রভুত্বের কাছে হার না মানা মন ও সাহস ইত্যাদি বাঙালি জাতির উদ্ভব, বিকাশ ও প্রতিষ্ঠার পশ্চাদভূমি। বাঙালি যখনই আপনদর্পণে নিজমুখ দেখে তখন তার মুখের পেছনে এই পটভূমি দৃশ্যমান হয়ে উঠতে চায়। আল মাহমুদ ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, ভূগোল ও প্রকৃতির পৃষ্ঠা উল্টিয়ে বাঙালির অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে গভীর ও নিবিড় জ্ঞানার্জন করেন। তারপর সেই জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে যুৎসই শব্দ, অর্থবহ উপমা, সৌন্দর্যমণ্ডিত চিত্রকল্প, মোলায়েম ছন্দ সহযোগে নির্মাণ করেন বাংলা কবিতার রাজ্যের সোনার প্রাসাদ ‘সোনালি কাবিন’। চৌদ্দটি সনেট সমন্বয়ে রচিত ‘সোনালি কাবিন’ প্রথম চরণ থেকে শেষ চরণ পর্যন্ত অভূতপূর্ব নান্দনিক রস, শৈল্পিক সৌন্দর্য, কাব্যিক অর্থব্যঞ্জনা এবং জীবনঘনিষ্ঠতা অনুভব ও অভিজ্ঞতার ধারণ করে অনিঃশেষ ঐশ্বর্যের অধিকারী হয়ে উঠেছে। পরিচিত ভূগোলের মৃত্তিকার রস, প্রকৃতির সচ্ছলতা এবং নারী-পুরুষের কামনা-বাসনা, রঙ-রূপ আনন্দানুভূতি কবিতাটিকে প্রাণপ্রাচুর্যে জীবন্ত চারিত্র্য দান করেছে। তার সাথে লোকায়ত, তৎসম, আরবি, ফার্সি, ইংরেজি শব্দের ব্যঞ্জনাগর্ভ ছন্দিত ব্যবহার, উপমার অভিনবত্ব, চিত্রকল্পের অনন্য মনোহারিত্ব সোনালি কাবিনকে সোনালি সৃষ্টিতে উন্নীত করেছে। সর্বোপরি, উত্তম পুরুষের আকর্ষণীয় উচ্চারণভঙ্গি কবিতাটিকে অতুলনীয়ভাবে পাঠযোগ্য, মুখস্থযোগ্য, আবৃত্তিযোগ্য, স্মরণযোগ্য মহিমা দান করেছে। চৌদ্দটি সনেট মিলে আসলে একটি কবিতা। দীর্ঘাকৃতি। প্রতিটি সনেটে বিষয়ান্তর ঘটায় এবং একইসাথে বিষয়সমূহের মধ্যে অন্তরের দিক হতে অন্তরঙ্গতার সম্পর্ক অচ্ছেদ্য থাকায় কবিতাটি বিচিত্র রূপৈশ্বর্য নিয়ে একটি অখণ্ড সৌন্দর্য প্রতিমায় গড়ে উঠেছে। এই একটি কবিতা পাঠেই পাঠক ইতিহাস, ঐতিহ্য, নৃতত্ত্ব, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান, রাজনীতি, ধর্ম, লোকধর্ম, প্রথা, আচার, বিশ্বাস প্রভৃতি সম্পর্কে অবহিত হতে হতে সচেতন আনন্দের অনুভূতির সমুদ্রে নিরুদ্দেশ যাত্রা চালিয়ে যেতে পারেন। বিষয়ভাবনার অভিনবত্ব, উপস্থাপনা কৌশলের যুৎসইত্ব আল মাহমুদের কবিতার সম্মোহন শক্তির মূল উৎস। সোনালি কাবিন তার প্রকৃষ্টতম উদাহরণ।
অঘোর ঘুমের মধ্যে ছুঁয়ে গেছে মনসার কাল
লোহার বাসরে সতী কোন ফাঁকে ঢুকেছে নাগিনী,
আর কোনদিন বলো দেখবো কি নতুন সকাল?
উষ্ণতার অধীশ্বর যে গোলক ওঠে প্রতিদিনই।
বিষের আতপে নীল প্রাণাধার করে থরো থরো
আমারে উঠিয়ে নাও হে বেহুলা, শরীরে তোমার,
প্রবল বাহুতে বেঁধে এ-গতর ধরো, সতী ধরো,
তোমার ভাসানে শোবে দেবদ্রোহী ভাটির কুমার।
কুটিল কালের বিষে প্রাণ যদি শেষ হয়ে আসে,
কুন্তল এলিয়ে কন্যা শুরু করো রোদন পরম।
মৃত্যুর পিঞ্জর ভেঙে প্রাণপাখি ফিরুক তরাসে
জীবনের স্পর্ধা দেখে নত হোক প্রাণহারী যম
বসন বিদার করে নেচে ওঠো মরণের পাশে
নিটোল তোমার মুদ্রা পাল্টে দিক বাঁচার নিয়ম।
আর মাহমুদের কবিতার সম্মোহন শক্তির অন্যতম প্রধান কারণ, তাঁর কবিতা জোছনার মত সুন্দর। তাঁর কবিতা নগ্নতার মতো খোলামেলা নয়। জানালা-দরজায় খিঁলআটা ঘরের মতো অগম্যও নয়। সহজ সরল শব্দে নির্মিত উপমা ও চিত্রকল্পের সাহায্যে গভীর অর্থ্যব্যঞ্জনা সৃষ্টি তাঁর সৃজন কৌশলের মূল বৈশিষ্ট্য। অগভীর তরলের ঢলঢালানী নয়, কষ্টকল্পনার কোষ্ঠোকাঠিন্যও নয়, সমুদ্রের মতো স্বচ্ছ ও সুগভীর তাঁর কবিতা। যতদূর চোখ যায়- দেখা যায় কিন্তু নিপুণ ডুবুরির অতলদর্শী পিপাসা নিয়ে ডুব না দিতে পারলে তার গভীরতার আন্দাজ মেলে না। জসীমউদদীনের একরৈখিক সরলতা নয়, সুধীন্দ্রনাথ দত্তের অভিধানঘাঁটা কঠিন শব্দের নীরস সমাহার নয়, তাঁর সৃজন-সরঞ্জাম হচ্ছে সহজ অথচ আলোগর্ভ শব্দাবলী যা মায়াবী সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে ও জোছনা ছড়াতে পারে। আল মাহমুদের কবিতায় ব্যবহৃত শব্দ আক্ষরিক অর্থ ধারণ করে বটে, তবে তাদের মূল কাজ হচ্ছে ভিন্ন অর্থ, যাকে বলে ব্যঞ্জনা, তা সৃষ্টি করা। আক্ষরিক অর্থ জানা যায় সহজেই, ফুরিয়ে যায় জানার প্রায় সাথে সাথেই। কিন্তু ব্যঞ্জনা বুঝতে সময় লাগে, দক্ষতার প্রয়োজন হয় এবং ব্যঞ্জনার আবেদন নিঃশেষে ফুরিয়ে যায় না। ব্যঞ্জনাই সৃষ্টি করে অপরূপ সৌন্দর্য এবং আলো-আঁধারিময় রহস্যময়তা। আল মাহমুদের কবিতায় ব্যঞ্জনার ব্যাপ্তি ও ব্যাপকতা তাঁর কবিতার অফুরন্ত সম্মোহন ক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ।
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে প্রতিবারই পেয়েছি নদীকে
প্রতিবারই স্রোত ছুঁই; ছুঁতে গিয়ে শাড়ির আঁচল
তোমার আবাস খুঁজে হাঁটিনি কি দিগন্তের দিকে
এখন অসীম শূন্যে তারা জ্বলে। পদতলে অনিঃশেষ জল,
লোটা ও কম্বলে আর কাজ নেই। রেখে দিই সূফীর পোশাক
তবে আর নদী নয়। বুক ভাঙে সমুদ্রের টানে
হাঙর কামট এসে এ শরীর ছিঁড়ে খুঁড়ে খাক;
ঢেউ হোক জপমালা, এক নাম, নামের আহবানে
তোমার চুম্বন টানে সবখানে, বলো কোথা কূল ও কিনার?
শেষহীন নীলিমায় মিশে আছো, কেন খুঁজি উষ্ণ পদতল?
লোভের চুমকি হয়ে জ্বলে ওঠে মহাকাশে সহস্র দিনার
নিজের চোখের জলে ডুবে যাওয়া আমি এক শুভ্র শতদল।
আমার অন্তিমে আমি, চেয়ে দ্যাখো, চোখ মেলে আছি
পদ্ম ডুবে গেলে পরে থাকে নাকি পদ্মের মৌমাছি?
(আমার অন্তিমে আমি/নদীর ভিতরে নদী)
প্রতিদিনের ব্যবহৃত শব্দ এবং লোকায়েত চিত্রকল্প সহযোগে নির্মিত কবিতাটির প্রতিটি শব্দের আক্ষরিক অর্থ প্রায় সকলেরই জানা। চরণসমূহে উদ্ভাসিত চিত্রকল্পের সৌন্দর্য মনোমুগ্ধকর। কিন্তু কবিতার উদ্দিষ্ট কে- কবির হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তমা, নাকি অধরা ঈশ্বর, তা পরিষ্কার নয়। নদীর সাথে নারীর তুলনা বহুদিনের। উদ্দিষ্ট নারীর ঘর দিগন্তের নির্জনতায় হতে যাবে কেন? কেন কবির পায়ের নিচে রোজ কেয়ামতের মতো অনিঃশেষ জলের প্লাবন? আর যদি উদ্দিষ্ট ঈশ্বর হয়ে থাকেন, তবে কেন কবি সূফীর পোশাক রেখে দিতে চান? কেন তাকে কামড়ায়ে ক্ষতবিক্ষত করবে সমুদ্রের হাঙর কামট? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা পাঠকের জন্য জরুরি নয়। বুঝা- না-বুঝার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কবিতার রসে আপ্লুত হওয়া, তার সৌন্দর্যের আভাসে অন্তরের দিক থেকে রেঙে ওঠা প্রভৃতি হচ্ছে পাঠকের আসল প্রাপ্তি। প্রেমভাবনা ও ঈশ্বরভাবনার মিশেলে আলো-আঁধারির মতো মোহনীয় রহস্য সৃষ্টি হয়েছে কবিতায়। অভাবিত সুন্দর চিত্রকল্প উৎপ্রেক্ষা (‘লোভের চুমকি হয়ে জ্বলে ওঠে মহাকাশে সহস্র দিনার’ কিংবা ‘নিজের চোখের জলে ডুবে যাওয়া আমি এক শুভ্র শতদল’) কবিতার সম্মোহন শক্তিকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। এ কবিতা পুনঃপুন পাঠেও ফুরিয়ে যায় না; পাঠের আগ্রহ কখনো শূন্যের কোঠায় নেমে আসে না।
আকর্ষণীয় কবিতা কোমল পেলব মেজাজের হতে পারে; তেমনি তা হতে পারে বীর রসে উজ্জীবিত অগ্নিগর্ভ উচ্চারণের শিল্পও। অগ্নিগর্ভ কবিতার সফলতম ও মহত্তম উদাহরণ কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’। এ ধরনের কবিতার বক্তব্য অত্যন্ত জোরালো হয় যার মধ্যে থাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং স্বদেশপ্রেম ও মানবতার পক্ষাবলম্বন। বীরত্বব্যঞ্জক, ঘৃণা উদ্রেকী, উদ্দীপনা জাগানিয়া শব্দ, উক্তি, উপমা ও চিত্রকল্পের সমাহার ঘটে এ ধরনের কবিতায়। উপযুক্ত শব্দ নির্বাচন, মিথের ব্যবহার এবং বিস্ময়জাগানো প্রেক্ষাপট, উচ্চারণভঙ্গির সাবলীলতা ও নাটকীয়তা, ছন্দবৈচিত্র্য বীর রসের কবিতায় প্রবল আকর্ষণ সৃষ্টির এবং তা ধরে রাখার প্রধান টেকনিক। কবিতা প্রতিবাদের অথচ শব্দ ও ভাষা শান্ত কোমল প্রকৃতির হলে পাঠককে গভীরভাবে আকৃষ্ট করার সম্মোহন সৃষ্টি হয় না কবিতায়। আমাদের কবিতাভুবনে এমন উদাহরণ অজস্র আছে। আল মাহমুদ সোনালি কাবিন-উত্তর সময়ে বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছেন যেসবের বিষয়বস্তু প্রতিবাদ, ক্ষোভ ও অন্যায় সমাজ কাঠামোকে ভেঙে ফেলার দীপ্ত তেজে উজ্জীবিত শপথ। উদাহরণ স্বরূপ তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’ শিরোনামের দীর্ঘকায় কবিতাটির কথা বলা যায়। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অনিয়ম, গরিবদের শোষণ, দুর্বলদের ওপর নিপীড়ন, ভেঙে পড়া বিচার ব্যবস্থা এবং বাকস্বাধীনতার অভাব মানে দুঃশাসনের রাজত্ব। এমন সমাজ ও রাষ্ট্রের ধ্বংস সাধন এবং সেই ধ্বংসস্তূপের ওপর সকল মানুষের মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি, ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তাযুক্ত ও সাম্যভিত্তিক নতুন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার কামনায় রচিত কবিতাটির শুরু জেলখানায় অন্যায়ভাবে বন্দী মানুষের স্বপ্ন থেকে। জেলখানায় কবিকে বন্দি রাখা দুঃশাসনভরা রাষ্ট্রের নিদর্শন। ভূমিকম্পের ভয়ঙ্কর শিহরণ, পুরাতন দালানকোঠাসহ নগরীর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এবং পুরাতন কামানের ব্যারেলে বারুদের গোলা ভরে তাতে অগ্নি সংযোজন যাতে করে দুঃশাসনের কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে এমনতরসব ভয়ঙ্কর চিত্রকল্পে কবিতাটি রচিত। আল মাহমুদ কবিতায় প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ রচনার জন্য ঘুমের মধ্যে স্বপ্নের দৃশ্য বিন্যস্তকরণ, শহর ধ্বংসের ভয়াবহ চিত্র, পারমাণবিক বোমা, হাইড্রোজেন বোমা, হিরোশিমা-নাগাসাকির প্রসঙ্গ আনয়ন, কোরআনের আয়াতের উদ্ধৃতি, প্রমোদ ভবনের পাশে থাকা কালে খাঁর কামান, শিবলিঙ্গ পূজা, বিচারকের কাত হয়ে পড়া, সুপ্রিম কোর্ট ভবনের হেলে পড়া, আদি বাঙালিদের প্রতিশোধপরায়ণ প্রাগৈতিহাসিক রক্ত, নচিকেতা, অগ্নি, ঋত্বিক প্রভৃতি অনুষঙ্গ যোগে চিত্রকল্প ও কল্পচিত্র নির্মাণ করেছেন যা কবিতাটির শরীরে-প্রাণে-মেজাজে মহাকাব্যিক গভীরতা ও নাটকীয় ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে সর্বোচ্চ মাত্রায় সফলভাবে সহায়ক হয়েছে। দীর্ঘ কবিতাটির শেষের অংশটি পাঠ করা যায়।
আমি হেলে পড়া সে মহান গম্বুজের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে
মনে মনে বললাম, নৈশব্দ এই মহামান্য আদালতকে
যে অবমাননা করেছে, ইত্তর লর্ডশীপ
একজন ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিক হিসেবে
আমি এর প্রতিকারার্থ সুবিচার প্রার্থনা করি।
ধ্বংসস্তূপের ইটের উপর আমি ব্রহ্মাণ্ডের ন্যায়-অন্যায় বিধানকারী
আমার ধর্মপুস্তক চুম্বনের সাথে স্থাপন করে
আবার কামানের কাছে ফিরে এলাম; তারপর ঢাকা নগরীর
অন্তিম সিগারেট, যা আমার পকেটে ছিল, ধরিয়ে নিয়ে
কাঠিটা কামানের তৈলসিক্ত পলতের উপর নিক্ষেপ করলাম।
আগুন উদ্দীপিত হলো। আমি বললাম
হে নচিকেতা অগ্নি, তুমি যে ঋত্বিকার নামে
জগতের যাবতীয় বিষয়কে দাহ্য বলে প্রতিপন্ন করো
সেই উদ্দালকপুত্র নচিকেতার শপথ, তিনি যেমন
জমের প্রলোভনকে অতিক্রম করেছিলেন, তুমিও তেমনি
আমার সম্মুখস্থ মহালিঙ্গের লৌহ আচ্ছাদন ভেদ করে
বারুদের উদরে প্রবেশ করো।
আমার কথায় আর বাতাসের আলোড়নে পলতের আগুন
‘তথাস্তু’ বলে কামানের আগুন কামানের নাভি স্পর্শ করলে
আমি কানে আঙুল দিলাম। মনে হলো বারুদ আর গন্ধকের
মহা হুঙ্কার ধ্বনিতে পৃথিবী বিদীর্ণ হলো যেন।
আমি কুণ্ডলীকৃত কালো ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে
ধ্বংসের উপর রেখে আসা আল্লার আদেশ
বুক তুলে নিলাম। মৃতের দুর্গন্ধ ওঠার আগেই
আমাকে কোথাও পালাতে হবে।
(মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো)
অন্যায়, অবিচার ও দুঃশাসনের অবসান এবং তদস্থলে ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আর্তকামনায় প্রবলের প্রতাপের কাছে অসহায় হয়ে পড়া মানুষের স্বপ্নটুকু তুলে ধরতে কবি কোরআন-পুরাণ-ইতিহাস-কিংবদন্তি সহযোগে পরাক্রান্ত অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। প্রার্থিত ধ্বংসের ছবি বিশ্বাসযোগ্য রূপে ফুটিয়ে তুলতে পুনরুজ্জীবিত অতীতের উপকরণ দিয়ে দৃশ্য ও শব্দের ভয়ঙ্কর সুন্দর চিত্রকল্প এঁকেছেন। ‘ইওর লর্ডশীপ’, ‘হে নাচিকেতা অগ্নি’, ইত্যাদি সম্মোধন এবং ‘যাবতীয় বিষয়কে দাহ্য প্রতিপন্ন করো সেই উদ্দালক পুত্র নচিকেতার শপথ’ এই অগ্নিগর্ভ প্ররোচনাদায়ী শপথ কবিতাটিকে সাবলাইম সৌন্দর্যে ভাস্বর করে তুলেছে। বলিষ্ঠ শব্দের ব্যবহার, অগ্নিগর্ভ উচ্চারণ এবং অভিনব চিত্রকল্পের দুর্দান্ত প্রয়োগ কবিতায় এত বেশি বেগ, ব্যঞ্জনা, বলিষ্ঠতা, আবেদন ও আকর্ষণ সৃষ্টি করেছে যে পাঠক গভীরভাবে সম্মোহিত না হয়ে পারে না। এমনকি যে পাঠক কবিতার বিষয় বা লক্ষ্যের সাথে একমত পোষণ করেন না, কবিতার অভিনবত্ব ও বলিষ্ঠতা তাদেরকেও সম্মোহিত করবে।
কবিরা সাধারণ মানুষের মতো রক্তমাংসেরই মানুষ। আসলে তারাও আর দশজন মানুষের মতোই। পার্থক্য এই যে শক্তিমান কবিদের তৃতীয় নয়নটি অত্যন্ত শক্তিশালী। যে নয়নের দৃষ্টি চর্মচক্ষুর দৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করে ঢুকে যায় অদেখা লোকে- দূরকল্পনার রাজ্যে। সাধারণ মানুষ গাছকে গাছই দেখে, কবি দেখেন তার বেশি অনেকখানি, অনেক কিছু। সেই দেখা এবং সেই অনুভবকে যে-কবি যত বেশি আকর্ষণীয় উচ্চারণে প্রকাশ করতে পারেন, সূক্ষ্ম বিষয়টিকে যত বেশি দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তুলতে পারেন, সে-কবির কবিতার আবেদন ততো বেশি হয়। আল মাহমুদ সেই বিরল শক্তিমান কবিদের একজন। আকাশের নক্ষত্রকে আমরা নক্ষত্রই দেখি, সাধারণ কবিরা খুব বেশি হলে নক্ষত্রের সাথে প্রিয়ার চোখের তুলনা খুঁজে পান, আর আল মাহমুদ সবাইকে ছাড়িয়ে দেখেন ‘লোভের চুমকি হয়ে জ্বলে ওঠে মহাকাশে সহস্র দিনার’। কী অদ্ভুত অবলোকন এবং কী অভিনব সুন্দর তার প্রকাশ। প্রিয়জনের মুখ চেনাজানা গেরস্থালি উপকরণ, পূর্ব হতে জানাশোনা গল্প-কাহিনী প্রবাদ কিংবদন্তি ইত্যাদি নিয়ে সৃষ্টি কবিতা শিল্প ছবি আমাদের আকৃষ্ট করে বেশি। কারণ, সেসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আামাদের পূর্বাভিজ্ঞতা, অভ্যাস ও ভালোবাসা। সে জন্য যে-সব কবিতার মধ্যে স্মৃতির উপকরণ কিংবা পূর্বাভিজ্ঞতার ছোঁয়া পাওয়া যায় সেসব কবিতা আমাদের বেশি টানে। এ সময়ের মানুষ পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও হিসাবদক্ষ। তারা খোঁজেন সূক্ষ্ম কারুকাজ, শিল্পের অভিনবত্ব। আল মাহমুদ চেনাজানা ছোটখাটো বিষয়কে অভিনব শিল্পকলায় ও কারুকাজের সূক্ষ্মতায় ফুটিয়ে তোলার অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্পী। তাঁর হাতে পরিচিত বিষয়াদি নতুন রূপে রসে প্রাণে নবজীবনের স্বাতন্ত্র্যে অভিনব সৃষ্টি হয়ে ওঠে। তাঁর হাতে দেশী-বিদেশী কিংবদন্তি, ইউসুফের গল্প, খনার বচন, গণিকা নারী, বেহুলা লখিন্দরের কাহিনী এবং সংসারজীবনের বহু ছোটখাটো বিষয় অভিনব ব্যঞ্জনায় নতুন সৃষ্টি হয়ে উঠেছে। তাঁর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘খনার বচন’, ‘সনেট পঞ্চক’, ‘সম্রাটের স্বর্ণমুদ্রা’, ‘প্রবোধ’, ‘শিল্পের ফলক’, ‘প্রত্যাবর্তনের লজ্জা’, ‘কবি ও কালো বিড়ালিনী’, ‘ সক্রেটিসের মোরগ’, ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’, ‘তোমার সহ্যের ক্ষত’ প্রভৃতি কবিতায় পুরনো ঘর- গেরস্থালি সংশ্লিষ্ট প্রত্যয়, খনার বচন, ইউসুফের বাণী, দেশী-বিদেশী মিথ ও লোককাহিনী অভিনব ব্যবহারে নতুন অর্থব্যঞ্জনা ও দুর্বার শৈল্পিক সম্মোহন সৃষ্টি করেছে।
আল মাহমুদ সেই কবি চোখ দু’টি বন্ধ হলে যার মানস চোখে ফিরে আসে অনিঃশেষ চিত্রকল্প, আলোর মৃত্যু হলে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে রাত্রি, বিন্দু বিন্দু স্বপ্নের কতায় মূর্ত হয়ে ওঠে হারানো মুখ, আর তার কানে বাজে ছন্দ, ধ্বনি, উপমার অদৃশ্য নূপুর, যার অন্ধচোখে অন্ধকার হয়ে যায় কস্তুরি সুবাস, হাজারো সুখ। স্মৃতি ও শব্দগন্ধ তাঁকে নিবিড়ভাবে স্পর্শ করে যায়। আর তিনি এসব অপরূপ অভিজ্ঞতা নিয়ে রচনা করেন অনিঃশেষ জোছনাময়ী একাধিক সুরভিত কবিতা। পাঠকমন ছুটে যায় সেসব কবিতার চন্দ্রালোকিত বাগানে।
দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে প্রিয়। আর বুঝি দেখি না তোমাকে
অন্ধত্বের মাছি এসে কখন যে ঢেকেছে নয়ন;
কিছুটা আন্দাজে দেখা, বাকি দেখা ছায়ার বিপাকে
বর্ণাঢ্য শাড়ির পাড়ে তাঁতীদের সযতœ বয়ন।
সচল মাছের ছবি, নক্সাকোটা নদীর কিনার
একদা যা ছিল দেহে পুলকের পলকের শোভা
এরি মাঝে ভেসে থাকা মুখখানি। যেন কোনো রাজার দিনার
অকস্মাৎ পেয়ে যাওয়া, অকস্মাৎ সেই মনোলোভা
সম্রাটের স্বর্ণমুদ্রা করতলে বাজাতে বাজাতে
যাদুর বাজারে এসে থেমে যাওয়া, অমরতা কি মূল্য তোমার?
অধোমুখ দোকানিরা একটি কস্তুরি দিয়ে হাতে
নগদ বিদায় দেয়। হেসে বলে, যাও হে আঁধার।
সেই থেকে অন্ধকার সূর্যাস্তের শব্দ শুধু ঢেউ আর রাতের ক্রন্দন
অন্ধত্বের মাছি এসে দু’নয়নে বসেছে এমন।
(সম্রাটের স্বর্ণমুদ্রা-১/নদীর ভিতরে নদী)
যাদু বাস্তবতার আলো-আঁধারি, স্পর্শ-গন্ধ-দৃষ্টি-স্মৃতির রেখায় অতীতের মুখের পুনরুজ্জীবন, আলোর অধিক অন্ধত্ব-অন্ধকারের উজ্জ্বল উদ্ভাসন কবিতাটিকে মৃগনাভির ন্যায় সুরভিত ও চন্দ্রকরোজ্জ্বল সৃষ্টিতে উন্নীত করেছে। এ কবিতা রাজার দিনারের চেয়ে মূল্যবান, যাদুর বাজারের দোকানির দেয়া কস্তুরির চেয়েও সুরভিত। চর্মচক্ষু বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন হয়ে ভাবলেই কেবল এ কবিতার নান্দনিক সৌন্দর্য কিছুটা দেখা যেতে পারে। বেশিটাই দেখতে হবে কবির মতো ‘কিছুটা আন্দাজে’ বাকিটা ‘ছায়ার বিপাকে’।
ভাস্কর্য, স্থাপত্য, অলং তৈরি কিংবা বাগান রচনার মতো কবিতা রচনাও দাবি করে নিপুণ কারুকাজ এবং নিবিড় সৌন্দর্য চেতনা। সরঞ্জামাদি সে একই; কারিগরিপনা বা শৈল্পিক নিপুণতা শিল্পীভেদে ভিন্ন। দামি পাথর ও ধাতব সরঞ্জামাদি থাকলেই তাজমহল নির্মাণ করা যায় না। জীবনের জন্য গভীর ভালোবাসা, রুচির নান্দনিকতা, নিবিড় জীবনদৃষ্টি এবং সূক্ষ্ম সৃজনশৈলী কোনো কবিকে মৌলিক মহৎ কবি-শিল্পী-স্রষ্টায় পরিণত করে। সেই পরিণত স্রষ্টার হাতে সৃষ্টি হয় নান্দনিক আনন্দের সৌন্দর্যের সম্মোহনের অনন্য সৃষ্টি। আল মাহমুদ সেই পরিণত কবি, তাঁর কবিতা সেই নান্দনিক সম্মোহনের তাজমহল।