বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় সওগাত সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন কেবল একটি নাম নয়, তিনি নিজেই একটি যুগের স্রষ্টা, একটি ইতিহাস। তাঁর কর্ম, অপরিসীম সাহস, নিবেদিত নিরলস প্রচেষ্টা আমাদের কাছে এখনো বিস্ময় জাগানিয়া। সমাজের কুসংস্কার, অশিক্ষা, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে তাঁর লড়াই ছিল আমৃত্যু। প্রতিকূল স্রোতে চলতে গিয়ে সঙ্কীর্ণ মানুষদের বহু আক্রমণের শিকার হয়েছেন তিনি, জীবনের প্রতি হুমকিও এসেছে, সওগাতের পথচলাকে থামিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াসও কম ছিল না। কিন্তু এতসব প্রতিকূলতার মধ্যেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন পিছপা হননি। বরং তাঁর পর্বতসম সাহস এমন অন্ধকার ভেদ করে আমাদের জন্য নিয়ে এসেছিল সুন্দর ও শুদ্ধতার আলো।
মুসলিম জাগরণ, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, নারী শিক্ষা, সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা ও উপমহাদেশের সাংবাদিকতায় তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়। সাহিত্য-সম্পাদনায় তাঁর উদারতা, আন্তরিকতা ও পৃষ্ঠপোষকতার উদাহরণ তিনি নিজেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল থেকে শুরু করে ওই সময়ের এমন লেখক খুব কম ছিলেন, যাঁরা সওগাতে লিখেননি। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিভা বিকাশেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। সার্বিক অবদান বিবেচনায় আমাদের সমাজ ও সাহিত্য প্রকৃত অর্থেই তাঁর কাছে নানাভাবে ঋণী।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের জন্ম ১৮৮৮ সালো ৩ নভেম্বর, বর্তমান চাঁদপুর জেলার পাইকারদি গ্রামে। স্বাভাবিকভাবেই তখনকার সময়টা অগ্রসর নয়, বরং ভীষণ রকমের পশ্চাৎপদ। ওই সময়টায় সংস্কৃতির চর্চা ছিল অন্ধতার শেকলে মারাত্মকভাবে বন্দী। মুসলিম কেউ মঞ্চনাটক করলে বা দেখলে অথবা গান গাইলে গ্রামে সালিস ডেকে তার বিচার করা হতো। কেউ যদি আরবি বা ফার্সি ভাষা জানতেন তাকে ওইসময় শিক্ষিত ভাবা হতো। অন্যদিকে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অবজ্ঞা ছিল অসীম। অনেকে মনে করতেন, বাংলা হচ্ছে হিন্দুদের ভাষা। তাই মুসলমান হয়ে হিন্দুয়ানি চর্চা ঠিক নয়। মুসলমানের ভাষা বলতে তারা আরবি ও ফার্সিকেই বুঝতেন এবং বোঝানোর চেষ্টা করতেন। তৎকালের ছেলেমেয়েরা স্কুল পর্যন্ত যেত না; কেবল দু’ একজন ব্যতিক্রম ছাড়া। নাসিরউদ্দীন সেই ব্যতিক্রমদের পুরোধা ছিলেন। তিনি যখন চাঁদপুরের হরিনাথ হাইস্কুলে ভর্তি হলেন, দেখা গেল স্কুলের তিন শ’ ছাত্রের মধ্যে মুসলমান ছিল মাত্র তিন কি চারজন।
স্কুল জীবনেই বই, ম্যাগাজিন পড়ার অভ্যেস ছিল তাঁর ছিল। একবার ম্যাগাজিন পড়তে গিয়ে তিনি তাঁর হিন্দু সহপাঠীর ভর্ৎসনার শিকার হয়েছিলেন। তাঁর সহপাঠী সুরেশ বলেছিল, ‘তোদের মোছলমানদের এরূপ তো কোনো পত্রিকা নেই। আমাদেরগুলি দেখবার এত শখ কেন? যা দেবো না।’ তখন কিশোর নাসিরউদ্দীনের মনে হলো সত্যিই তো, মুসলমানদের কোনো পত্রিকা নেই কেন! স্কুলে-লাইব্রেরিতে অনেক খুঁজেও তিনি মুসলমানদের লেখা বই বা কোনো পত্রিকা পেলেন না। তবে এ চিন্তা তাঁকে ভালোভাবে পেয়ে বসেছিল। এ চিন্তা বাংলার মুসলমান সমাজের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ নাসিরউদ্দীনের চিন্তার চূড়ান্ত বিকাশ ঘটলো ‘সওগাত’ প্রকাশের মাধ্যমে।
যৌবনে বীমার কাজ করে আর্থিক সচ্ছলতা পেয়েছিলেন নাসিরউদ্দীন। কিন্তু তাঁর মনে তখনো একটি পত্রিকার করার স্বপ্ন জাগ্রত ছিল। এরই মধ্যে তিনি চাঁদপুরে একটি লাইব্রেরি দেয়ার চিন্তা করেন। নাম ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরি। উদ্দেশ্য ভালো বই এনে বিক্রি করে চাঁদপুরে সাহিত্যের প্রসার ঘটানো। লাইব্রেরির জন্য মুসলিম লেখকের বই সংগ্রহ করতে তিনি প্রথমবার কোলকাতা যান। সেখানে গিয়ে দেখেন মুসলিম লেখকের লেখা তেমন কোনো বই নেই। কিছুটা হতোদ্যম হলেন স্বাভাবিকভাবেই। এর কিছুদিন পর পত্রিকা করার বাসনা তাঁর মনে আবারও উঁকি দিয়ে ওঠে। তাঁর মনে হলো, শক্তিশালী একটি পত্রিকার মাধ্যমেই সমাজের কুসংস্কার, অজ্ঞতা, অন্ধতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করা যাবে। পাশাপাশি সংস্কৃতির উন্নয়ন সাধনও সম্ভব হবে। ১৯১৭ সালে পত্রিকা করার উদ্দেশ্যে নাসিরউদ্দীন চাঁদপুর থেকে বীমা কোম্পানির কাজ বাদ দিয়ে কলকাতা যান। শত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হবে জেনেও নাসিরউদ্দীন পত্রিকা করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে দাঁড়াননি।
স্বভাবতই পত্রিকা কী হবে, কেমন হবে, কী আদর্শকে লালন ও ধারণ করবে তা নিয়ে নাসিরউদ্দীনের চিন্তার শেষ ছিল না। অনেক ভেবেচিন্তে তিনি পত্রিকার নাম দিলেন ‘সওগাত’। সওগাতের ধারাবাহিক প্রকাশনা যাতে অব্যাহত থাকে সে জন্য তিনি ক’জন পৃষ্ঠপোষক খুঁজছিলেন। প্রথমবার পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পেলেন তৎকালীন জাতীয়তাবাদী নেতা ব্যারিস্টার এ রসুলকে। ব্যারিস্টার এ রসুল নাসিরউদ্দীনকে উৎসাহিত করেন এবং পাশে থাকার আশ্বাস দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সওগাত প্রকাশের পূর্বেই তিনি মারা যান। তাঁর মৃত্যুতে কিছুটা হতাশ হলেও আবার নতুন করে পৃষ্ঠপোষক খুঁজে নেন নাসিরউদ্দীন।
নাসিরউদ্দীন সওগাত প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে সপ্তনীতি নির্ধারণ করেছিলেন। তিনি ঠিক করলেন সওগাতের উদ্দেশ্য হবে স্বাধীন মত প্রকাশের সুযোগ, মুক্তবুদ্ধি চর্চা, মানসম্মত লেখা প্রকাশ, মুসলিম লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা, কুসংস্কার দূরীকরণে আন্দোলন পরিচালনা, মুসলমানদের ঐতিহ্য উপস্থাপন, নারীসমাজের উৎকর্ষ সাধন, তরুণ লেখক সৃষ্টি করা ইত্যাদি। উদ্দেশ্যগুলো নির্ধারণ করা সহজ হলেও বাস্তবায়নের কাজ সহজ ছিল না। সওগাত প্রকাশ করতে গিয়ে ওই সময়ের মুসলমানদের চিন্তার দীনতা নাসিরউদ্দীনের কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নাসিরউদ্দীন চেয়েছিলেন সওগাতের প্রচ্ছদ, ছাপা থেকে শুরু করে সবকিছুই মুসলিমদের সংস্পর্শে হবে। কিন্তু বহু খুঁজেও তিনি সওগাতের প্রচ্ছদ করার জন্য কোনো মুসলিম শিল্পী পেলেন না! তবে এতে নাসিরউদ্দীন দমে যাননি। ছবি আঁকা বা প্রকাশ যখন মুসলিম সমাজে ‘নাজায়েজ’, নাসিরউদ্দীন তখন ঠিক করলেন সওগাত হবে সচিত্র! শুধু মাত্র এই একটি বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিলেও বুঝতে অসুবিধা হয় না মুসলিম সমাজে সওগাত প্রকাশের চিন্তা ছিল কতটা প্রকাশ্য বিদ্রোহ। আর বিদ্রোহী ছিলেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।
কেবল প্রচ্ছদ নয়, মানসম্মত লেখা পাওয়া নিয়েও নাসিরউদ্দীনকে অনিশ্চয়তায় ভুগতে হয়েছে। সওগাতের প্রথম সংখ্যার প্রচ্ছদ করলেন গণেশ ব্যানার্জি। লেখার জন্যে নাসিরউদ্দীন লেখকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। ধরতে গেলে কেউই তাঁকে বিরূপ করেনি। লেখা সংগ্রহ হয়ে গেলে সমস্যা দেখা দিল প্রেস নিয়ে। প্রেসের ক্ষেত্রেও মুসলমানদের প্রেস প্রথমে খোঁজা হলো। কিন্তু ছবি-কার্টুনসহ পত্রিকা ছাপানোর কোনো মুসলমানের প্রেস পাওয়া গেল না। সওগাত ছাপতে দেয়া হল কলকাতার জোড়াসাঁকোর রায় কালীপ্রসন্ন সিংহ বাহাদুরের ‘ফাইন আর্ট প্রিন্টিং সিন্ডিকেট’ প্রেসে। নাসিরউদ্দীনের শ্রম-ঘামে সওগাতের প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৯১৮ সালে। সওগাত প্রথম সংখ্যার প্রথম লেখাটি ছিল বেগম রোকেয়া সাখাওয়াৎ হোসেনের। লিখেছেন মানকুমারী বসু, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, শাহাদাত হোসেন, জলধর সেন, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, ভূজঙ্গধর রায় চৌধুরী, ও আলী প্রমুখ। সওগাত প্রথম সংখ্যায় ২৭টি রচনার মধ্যে ১৫টি লিখেছেন মুসলমান লেখক। সওগাত প্রথম সংখ্যাটি ছিল ঐতিহাসিক ও মাইলফলকে পরিপূর্ণ। সওগাতই ছিল প্রথম চিত্রবহুল মুসলমানদের পত্রিকা। কেবল তা-ই নয়, আধুনিককালে শিল্পের মান বিবেচনায় এটি বাংলার মুসলমানদের করা প্রথম সাহিত্য পত্রিকাও।
প্রথম সংখ্যা প্রকাশের পরপরই এটি সবার আলোচনায় চলে আসে। সওগাত প্রকাশের পক্ষে-বিপক্ষে নানা অভিমত ওঠে। ছবি ও কার্টুন প্রকাশের কারণে তারা বলতে শুরু করে, নাসিরউদ্দীন মুসলিম হয়ে মুসলমানদের ঐতিহ্যবিরোধী কাজ করছে। তাঁকে ইসলামবিরোধীও আখ্যা দিলেন কেউ কেউ। নাসিরউদ্দীন যথাসম্ভব মানুষের সমালোচনার জবাব দিতে চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন, সওগাত প্রকাশের পর ফরিদপুরের বিখ্যাত পীর বাদশা মিয়া তাঁকে চিঠি লিখেন। পীরসাহেব লিখেছেন, ‘সওগাত খুব ভাল পত্রিকা হইয়াছে। কিন্তু আপনার কাগজে পুরুষ ও নারীদের ছবি ছাপার দরুন ইহা ঘরে রাখিয়া নামাজ পড়া যায় না।’ তাঁর পত্রের জবাবে নাসিরউদ্দীন লিখেছেন, ‘আপনারা বিধর্মী রাজার ছবি অংকিত টাকার নোট ও রাজার মূর্তি খোদিত রুপার টাকা সংগে রেখে নামাজ আদায় করেন। নামাজের সময় এগুলি বাইরে রেখে আসেন না। আর আমি মুসলিম ইতিহাসের গৌরবব্যঞ্জক ছবি ছেপে কি অপরাধ করলাম। যা হোক, আপনি ‘সওগাত’ খানা নামাজের ঘরে না রেখে অন্যত্র সরিয়ে রাখলে আর কোনো অসুবিধা হবে না।’ নাসিরউদ্দীনের যুক্তিসঙ্গত জবাবে পীরসাহেব খুশি হয়ে বার্ষিক সওগাতের গ্রাহক হয়ে যান!
সকল সমালোচনা, তির্যক মন্তব্যের পরেও সওগাত যাঁদের প্রশংসা পেলো তা নাসিরউদ্দীনকে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করার প্রেরণা দিতে যথেষ্ট ছিল। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ সওগাত দেখে বলেছেন, ‘মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে যে এরূপ সুন্দর একখানা মাসিক পত্রিকা বের হতে পারে আমার ধারণা ছিল না। আজ পর্যন্ত তোমাদের এ ধরনের কোনো মাসিক পত্রিকা আমার হাতে আসেনি।’ প্রায়ই একই কথা বলেছেন আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ। তিনি সওগাত পড়ে মন্তব্য করেছেন : ‘সওগাতের পূর্বে মুসলমানদের এরূপ সুন্দর সুসজ্জিত মাসিক পত্রিকা আমি আর দেখিনি।’
সওগাত বাংলা সাহিত্যের যুগ সৃষ্টিকারী পত্রিকা। কিন্তু সওগাত প্রকাশনার পথ মসৃণ হয়নি। সওগাতের সমকালে অনেক পত্রিকা থাকলে সেগুলো নানা কারণে দীর্ঘায়ু পায়নি। অন্যদিকে সওগাতের যাত্রাও আর্থিক সঙ্কটমুক্ত ছিল না। সওগাত প্রথম তিন বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চলল। কিন্তু ততদিনে লোকসান দিতে দিতে নাসিরউদ্দীনের সঞ্চিত অর্থভাণ্ডার শেষ। উল্টো তিন বছরের কয়েক হাজার টাকা ঋণী হলেন। কেবল তাই নয়, ব্যবসায়ী ও অন্যদের টাকা দিতে না পারার কারণে তাঁর নামে আদালতে নালিশও করা হয়। অর্থের জোগান দিতে নাসিরউদ্দীন সওগাত প্রকাশনায় খানিক বিরতি দিয়ে আবার ফিরে গেলেন বীমা কোম্পানির কাজে। ফলে ১৯২১ সালে সওগাতের প্রকাশনা প্রথমবারের মত বন্ধ হয়। ১৯২৬ সালে আবার প্রকাশিত হলো সওগাত। প্রথম পর্যায়ের অভিজ্ঞতা থেকে নাসিরউদ্দীন বুঝতে পেরেছিলেন কুসংস্কার ও রক্ষণশীলতার গণ্ডি ভাঙতে হলে প্রয়োজন তারুণ্যের শক্তি। এ লক্ষ্য নিয়ে তিনি সওগাতের দ্বিতীয় পর্যায়ে গঠন করলেন ‘তরুণ দল’। এ দলে ছিলেন মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, আবুল মনসুর আহমদ, সৈয়দ আবুল হোসেন, আবুল কালাম মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খাঁ, ডা: মোহাম্মদ লুৎফর রহমান প্রমুখ। এ দল গড়ার উদ্দেশ্য হলো স্বাধীন মতপ্রকাশ, যুক্তির নিরিখে সমাজকে দেখা এবং সংকীর্ণতাকে পদদলিত করা। তরুণরা সওগাতে মুক্তভাবে তাঁদের মতামত লিখতেন ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অপব্যবহারের বিরুদ্ধে। এ সময় তরুণদের লেখা ‘মোল্লা-সমাজ’, ‘ধর্ম বাঁচবে কি?’, ‘বাংলায় পীর পূজা’, ‘ধর্ম-জীবনে অজ্ঞতা ও কুসংস্কার’, ‘মুসলিম সমাজে ভিক্ষুক সমস্যা’, ‘ইসলামে পরমতসহিষ্ণুতা’, ‘ইসলাম ও সভ্যতা’, ‘ঈশ্বর শব্দের ব্যবহার’সহ অসংখ্য প্রবন্ধ, নিবন্ধ সওগাতে প্রকাশিত হয়। প্রগতিশীলতার জন্য হত্যার হুমকিও দেয়া হয় নাসিরউদ্দীনকে। কিন্তু তিনি তাঁর চিন্তা ও লক্ষ্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বরাবর অনড় ছিলেন। নাসিরউদ্দীন ‘বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সেই যুগে প্রতিক্রিয়াশীল দলের লোকেরা ছবি ছাপার জন্য আমার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত-প্রায় হয়ে ওঠেন। এমনকি তারা আমাকে মুসলমান বলতেও নারাজ হলেন। মহিলাদের ছবি ছাপার জন্য আমার জীবনের ওপর হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। কুসংস্কারাচ্ছন্ন ও গোঁড়াদের দ্বারা আক্রান্ত হবার আশঙ্কায় আমি অনেক সময় সতর্ক হয়ে রাস্তায় চলাফেরা করতাম।’ ১৯৫০ সালে আবারও সওগাত প্রকাশনা বন্ধ হয়। ১৯৫২ সালে সওগাত প্রকাশিত হয় ঢাকা থেকে।
এটা উল্লেখ করা প্রয়োজন, সওগাত প্রকাশের পূর্বে ‘মোহাম্মদী’ ও ‘হানাফী’ প্রকাশিত হতো। এ দুটি পত্রিকা সাহিত্যের নয়, এতে কোনো গল্প-কবিতা ছাপা হতো না। যা ছাপা হতো তা নিরেট সাম্প্রদায়িক বিষয়-আশয়। ফলে প্রচলিত স্রোতের বিরুদ্ধে চলতে শুরু করা অসাম্প্রদায়িক নাসিরউদ্দীন সম্পাদিত সওগাত অনিবার্যভাবে ‘মোহাম্মদী’ ও ‘হানাফী’র আক্রমণের শিকার হয়। এ দুটি পত্রিকায় নিয়মিত সওগাত গোষ্ঠীকে আক্রমণ করে লেখা হতো। কখনো সেখানে বলা হতো সওগাতের কারণে ইসলাম বিপন্ন হতে চলেছে। কখনো ফতোয়া দিয়ে বলা হতো সওগাতের লেখকরা কাফের! মোহাম্মদী সম্পাদক মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এই অপপ্রচার ও বিষোদগারের অগ্রভাগে ছিলেন। তিনি ইসলাম বাঁচাতে ‘সওগাত গোষ্ঠী’কে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে মোহাম্মদীর মাধ্যমে আহ্বানও করেছিলেন। সওগাতকে নিয়ে মোহাম্মদীতে প্রকাশিত বিষোদগারমূলক লেখার যৌক্তিক জবাব দিতেন সওগাতের লেখকগোষ্ঠী। আকরম খাঁ কেবল লেখনীর মাধ্যমে নয়, ব্যক্তিগতভাবেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও সওগাতকে নানাভাবে হেনস্থা, অপদস্থ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। চক্রান্ত করে আদালতের মাধ্যমে সওগাত প্রেস ক্রোক করার চেষ্টা, সওগাতের সভা-সমিতির পণ্ড করার ঘটনাও ঘটিয়েছেন মওলানা আকরম খাঁ। নাসিরউদ্দীনের ভাষায়, মওলানা ‘হিতাহিত জ্ঞানশূন্য’ হয়ে নির্লজ্জ মিথ্যাচার ও প্রতিহিংসার আগুনে সওগাত-যাত্রাকে দমন করতে চেয়েছেন। অথচ পরবর্তীতে চিন্তার উৎকর্ষের সাথে সাথে মুসলমানরা বুঝতে পেরেছে যে, নাসিরউদ্দীন ও সওগাত মুসলমানদের শিল্পজাগরণে কতটা অর্থবহ ও যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছে।
গল্প-কবিতা লেখা যে সমাজে ধর্মীয় অপরাধ, সে-সমাজে লেখকগোষ্ঠী তৈরি করা দুঃসাধ্য কাজ। নাসিরউদ্দীন সওগাতের মাধ্যমে মুসলিম লেখক গোষ্ঠী তৈরি করলেন। লেখকদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে তাদের প্রতিষ্ঠার পথকে সহজ করেছেন। শুধু তাই নয়, লেখক-কবিদের সুখে-দুখে অভিভাবকের ভূমিকায়ও আমরা মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে দেখেছি। বিপদের সময় অনেকেই নাসিরউদ্দীনের পৃষ্ঠপোষকতা ও আর্থিক সাহায্য পেয়েছেন। স্বয়ং কাজী নজরুল ইসলামের প্রতিষ্ঠা সওগাতের হাত ধরে। নজরুলের জন্য নাসিরউদ্দীনকে কম সংগ্রাম করতে হয়নি। নজরুল তুমুল জনপ্রিয় ছিলেন, কিন্তু এও সত্য তাঁর নিন্দুকের সংখ্যা কম ছিল না। নাসিরউদ্দীন সবসময়ই নজরুলের পাশে ছিলেন এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। প্রাচীনপন্থীরা নজরুলকে কাফের ও তাঁর লেখাকে অনৈসলামিক প্রমাণ করতে অযৌক্তিক ভাষায় যেভাবে আক্রমণ করলো, নাসিরউদ্দীন তাঁকে পৃষ্ঠপোষকতা করার কারণে তিনিও প্রায় একই ধরনের আক্রমণের শিকার হলেন। সেসময় নজরুলের কারণে সওগাতের আসর জমে উঠেছিল এবং প্রগতিশীল তরুণদের ভিত শক্ত হয়েছিল। এ কারণে প্রাচীনপন্থীরা ভাবলো নজরুলকে জব্দ করা হলে সওগাত গোষ্ঠীও জব্দ হবে। নাসিরউদ্দীন লিখেছেন, ‘‘যাঁরা মুসলমানদের মধ্যে প্রাচীনপন্থী ধারার লেখক-কবি ছিলেন, তাঁরা ভেবে বসলেন যে, আমাদের গোষ্ঠীটা যদি দাঁড়িয়ে যায়, তাদের পায়ের নিচের মাটি যদি শক্ত হয়ে যায়, তাহলে তাদের অর্থাৎ রক্ষণশীল তথা প্রাচীনপন্থীদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না- আমাদের তাদের আক্রমণ করার এটাই ছিল মূল কারণ।’’ কিন্তু কারো কোন আক্রমণেই নাসিরউদ্দীন বিপন্ন বোধ করেননি।
নাসিরউদ্দীনের অন্যতম সাফল্য নারী জাগরণ, নারী লেখক সৃষ্টি এবং তাদেরকে সঙ্কীর্ণ পরিসর থেকে বের করে এনে বৃহৎ পরিসরের সন্ধান দেয়া। যে যুগে নারী শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, বাংলা ভাষা চর্চা পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল সে যুগে সওগাত প্রারম্ভ সংখ্যার লেখা শুরু হলো বেগম রোকেয়া সাখাওয়াতের কবিতা দিয়ে। প্রথম সংখ্যায় লিখেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভ্রাতুষ্পুত্রী মানকুমারী বসু। নারীদের লেখা নিয়ে ১৩৩৬ সনের ভাদ্র মাসে সওগাতের প্রথম মহিলা সংখ্যা প্রকাশিত হয়। কেবল সওগাতের নয়, এটি বাংলা সাহিত্য সাময়িকীর ক্ষেত্রে প্রথম কোনো নারীসংখ্যা। ওই সময়টায় নারীরা স্বামীর নাম পর্যন্ত মুখে নিতেন না। অন্যদিকে বিশ্বাস করতেন, স্বামী স্ত্রীর শরীরের যে স্থানে আঘাত করবে সে-স্থান বেহেশতে যাবে! এভাবেই নারী নির্যাতনকে সমাজব্যবস্থায় বৈধতা দেয়া হয়েছিল। নারীদের বিদ্যালয়ে গমন ছিল শরীয়তবিরোধী। শুরু থেকেই সওগাতের মাধ্যমে নাসিরউদ্দীন বাংলার নিগৃহীত, অবহেলিত নারীদের জাগ্রত করতে চেষ্টা করেছেন। সওগাতের একসময়ের স্লোগান ছিল ‘নারী না জাগলে জাতি জাগবে না’। তিনি সওগাতে ইসলামে নারীর সম্মান, অধিকার, ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারী, গৌরবের যুগে মুসলিম নারী প্রভৃতি প্রবন্ধ প্রকাশ করে নারীদের সচেতন করার প্রয়াস চালান। একদিকে সওগাতে যেমন নারীদের শিক্ষা, অধিকার, সংস্কৃতি চর্চার আন্দোলন চলতো, তেমনি অন্যদিকে ধর্মের নামে নির্যাতন, পর্দার নামে অবরোধ, সংস্কারের নামে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল সওগাত। বেগম রোকেয়া সে জন্যে সবসময়ই মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে অভিনন্দন জানাতেন। নাসিরউদ্দীন সওগাতে নারীদের রচনা গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করতেন। কবি সুফিয়া কামালের সৃষ্টি ও প্রতিভা বিকশিত হতে পেরেছিল সওগাতের কারণেই। সওগাত প্রকাশিত না হলে হয়তো আমরা সুফিয়া কামালকে কবি হিসেবে পেতাম না। তিনি ও তাঁর কর্ম থেকে যেতো গোপনে, অযত্ন ও অবহেলায়। কেবল সুফিয়া কামাল নন, সওগাতের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন এমন নারী লেখকের সংখ্যা কম নয়। নারীদের কথা বিবেচনা করেই নাসিরউদ্দীন সচিত্র মহিলা সওগাত প্রকাশের উদ্যোগ নেন। এ ছাড়াও নারীদের উৎকর্ষের জন্য মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ঐতিহাসিক সংযোজন ছিল ‘বেগম’। এ পত্রিকাটি উপমহাদেশের নারীদের প্রগতিশীল করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। আজকে শিল্প-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে নারীদের যে অগ্রগতি তার পেছনে নাসিরউদ্দীন, সওগাত ও বেগম পত্রিকার অবদান অস্বীকারের সুযোগ নেই।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন সওগাতের মাধ্যমে একা কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে সেসময় অটল পর্বত হয়ে যে সাহস প্রদর্শন করেছেন তা বিস্ময়কর। তাঁকে নিয়ে সওগাত অফিসে মজা করে লেখকরা গাইতেন, ‘মরি হায় কলিকাতা কেবল ভুলে ভরা,/ঘাড়ের উপর এতবড় শির,/নাম রেখেছে তার নাসির।/মরি হায় কলিকাতা কেবল ভুলে ভরা।’ তাঁরা মিথ্যে গাইতেন না, নাসিরউদ্দীনের শির এত বড় না হলে তিনি অসংখ্য প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে এভাবে মাথা উঁচু করে থাকতে পারতেন না। এ উপমহাদেশে আধুনিককালে মুসলমানদের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশ, নারী শিক্ষা এবং কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা দূরীকরণে তাঁর ভূমিকা কিংবদন্তিতুল্য। কাজী নজরুল ইসলামের হৃদয়হীন সমালোচকরা যেমন একটা সময় মেনে নিয়েছিলেন তাঁর মাহাত্ম্য, তেমনি নাসিরউদ্দীনের অনেক নির্দয় সমালোচকও শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রশংসা করতে বাধ্য হয়েছেন। নাসিরউদ্দীন ছাত্রাবস্থায় পড়ার জন্য মুসলমানদের কোনো পত্রিকা-ম্যাগাজিন পাননি, অথচ তাঁর আজীবন সাধনায়, অকুতোভয় প্রচেষ্টায় তিনি মুসলমানদের জাগরণ, সাংস্কৃতিক উত্তরণ, সাহিত্যে উৎকর্ষ সাধনে সক্ষম হয়েছেন। ২০১৮ সালে সওগাত শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। তিনি সওগাতের মাধ্যমে যে বীজ বপন করেছিলেন তা আজ শত-সহস্র ফুলে-ফলে বিকশিত হয়ে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতাকে সমৃদ্ধ করে চলছে।
মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন বেঁচে ছিলেন দীর্ঘ এক শতাব্দী। ‘বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ’ গ্রন্থে তিনি তাঁর জীবন, কর্ম ও সাধনা নিয়ে লিখেছেন। অন্যদিকে নজরুল ইনস্টিটিউট ১৯৯৫ সালে ‘নজরুল ও নাসিরউদ্দীন স্মারকগ্রন্থ’ প্রকাশ করে। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সাথে আমাদের অনেক বরেণ্য লেখক জীবনের দীর্ঘসময় ব্যয় করলেও একমাত্র আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী তাঁকে নিয়ে ‘মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও সওগাত যুগ’ শিরোনামে একটি স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ লিখেন। কাদের পলাশ ও মুহাম্মদ ফরিদ হাসানের সম্পাদনায় ‘বিরুদ্ধ স্রোতের নাসিরউদ্দীন’ শিরোনামের একটি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। এ গ্রন্থটি সামগ্রিক নাসিরউদ্দীনকে তুলে ধরা এবং তাঁর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে পাঠককে একটি পরিচ্ছন্ন ধারণা দেয়ার প্রয়াস। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনকে নিয়ে প্রচুর গবেষণার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে সওগাত পত্রিকা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে।
শতবর্ষী কর্মবীর মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ১৯৯৪ সালের ২১ মে পরলোকে পাড়ি জমান। তিনি আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর স্বর্ণোজ্জ্বল কর্ম ও যুগান্তরের ইতিহাস। কীর্তিমান এ মানুষের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।
তথ্যসূত্র :
১. বাংলা সাহিত্যে সওগাত যুগ : মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।
২. সওগাত প্রকাশের নেপথ্যে স্মৃতিকথা : মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন।
৩. মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন ও সওগাত যুগ : আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী।
৪. নজরুল ও নাসিরউদ্দীন স্মারক-গ্রন্থ।
৫. মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সাক্ষাৎকার : প্রতিচিন্তা, এপ্রিল ২০১৭।
৬. শতবর্ষ পরও সমান প্রাসঙ্গিক : নাসিম-এ-আলম : আনন্দবাজার, ২৯ আগস্ট ২০১৮।