আলোর চিকন রেখা চোখে পড়তেই ঘুম ভেঙে যায়। জানালার কাচের শাসি, ধবধবে নেটের পরদা, ঘরের আসবাব সব কিছুই অচেনা। এ আমি কোথায় রয়েছি? মগ্নচৈতন্যে মুহূর্তে ঝিলিক দিয়ে ওঠে গেল কালের ছবি। ঢাকা থেকে আমরা কাতার এয়ারওয়েজে যাত্রা শুরু করেছি। কখনও কাশফুলের মতো দুধেল মেঘ, কখনও ধূপছায়া রঙের মেঘের সিঁড়ি বেয়ে এগিয়েছে বিমান, সূর্যের আলো ফিনকি দিয়ে ঝড়ে বিভাময় করে তুলেছিল ভাসমান পথ। কয়েক ঘণ্টার যাত্রাবিরতি ছিল দোহাতে।
দিগন্ত ছোঁয়া প্রান্তরের দিকে অপর মুগ্ধতায় তাকিয়ে দেখছি, রানওয়তে প্লেনের ওঠানামা, মেরুন বসনা বিমান বালাদের ছন্দময় কর্মব্যস্ততা, সপ্রতিভ অফিসারদরে প্রয়োজনীয় পদচারণা। ট্রলি ব্যাগ আর ল্যাপটপ নিয়ে যাত্রীদের ঘোরাফেরা-আধুনিকতা ও কর্মচঞ্চলতার সমন্বয় দোহার তাপদগ্ধতাকে মধুর স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে দিয়েছে।
যাত্রাবিরতি শেষে বিমানের ফের ছুটে চলা। সোমা রঙ বিকেলে এসে নেমেছি ট্যাগেল এয়ারপোর্টে। পৌঁছেছি বার্লিন নগরে।
একটু একটু করে মিহিদানা আলো উজ্জ্বল হচ্ছে। সারারাতের গাঢ় ঘুমের পর মনে হলো- জেটল্যান্ডের ঘোর অনেকটা কেটে গেছে। বুঝতে পারি আমি এখন জার্মানির রাজধানী বার্লিন নগরীতে। বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ি। স্বামী ও ছেলে তখনও ঘুমে ডুবে আছেন। জানালা অল্প করে খুলে দিতেই হিলহিলে ঠাণ্ডা হাওয়া এসে ঝাপটা দেয়।
আগস্ট মাস, বাংলা মাসের হিসেবে ভাদ্র। ছেলে ফোনে বলেছিল, গরম জামা-কাপড় আমার তেমন দরকার নেই, এখন সামার চলছে।
হা ঈশ্বর! এই তাহলে সামার? হ্যাঁ মোটামুটি সহনীয় ঠাণ্ডা, তবে মাঝে মাঝে গায়ে আলপিন ফেলে মতো কনকনে ঠাণ্ডা এসে ঝাপটা দিয়ে গেল। বেশ একটু রসিকতার সুরে বলে গেল; হ্যাঁ গো ইউরোপের সামারটা এমনই।
গায়ে হালকা শাল জড়িয়ে হাতে কফির মগ নিয়ে জানালার পাশে বসি। এখানে থেকে ঘর-বাড়ি, রাস্তা অনেকটা, মানুষের আনাগোনা দেখা যায়। পাশেই নাম না জানা এক পাতাবাহারের কুষাসি গাছ। অপার্থিব এক ভালো লাগায় বুকের ভেতরটা ভরে ওঠে। বার্লিনের অপরূপ এই সোনালি সকাল আমাকে যেন সুপ্রভাত জানায়।
বই-এ পড়েছি- থ্রি ক্যাপিটালস্ ডমিনেটেড দ্য ওল্ড ওয়ার্ল্ড : লন্ডন, প্যারিস এবং বার্লিন।
এসব দেশে যাবার গোপন বাসনা ছিল। বার্লিনে যাবার সুযোগ এলে তাই ঈশ্বরকে প্রণাম জানায়ে ভোর থেকে ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলের সাইকেল চালিয়ে স্কুলের পথ ধরে। দেখ মাথায় হেলমেট পরা বাচ্চারা লাল রঙের মোটা রেখা টানা নির্দিষ্ট পথ ধরে ওরা এগিয়ে যায় বিকেলের আলো নিভে যাচ্ছে। এক্ষুণি সন্ধ্যা নামার সে সময় ঝটপট করে চালক সাইকেলের বাতি জ্বালিয়ে দেয়। কাউকে মনে করিয়ে দিতে হয় না এটা আইন। এভাবে তোমাদের পথ চলতে হবে। নিজেরাই উপলব্ধি করে এই নিয়মগুলো আমাদের মেনে চলা উচিত। সাইকেলে বসার দু’টি সিট থাকে। সামনে ও পেছনে দু’জন বসতে পারে।
এক মাসের ভিসা আমাদের হাতে। শুধু ব্রেকফাস্ট বাড়িতে করি। ব্রেড, আরবি রুটি, ডিম স্যাসেজ, ফ্রিজে রকমারি ফল-অ্যাডবেরেন (স্ট্রবেরি), হিনবেরেন, আফফেল (আপেল), শুকনো ফল কিংবা ফলের কিউব মেশানো ইয়োগার্টের (দই) কনটেইনার। ব্রেকফাস্ট করে আমরা বেরিয়ে গেছি। সঙ্গে ছেলের আরবি বন্ধু আব্বাস, জার্মানির ম্যামেথ, দানিয়েলা, বীণা ওরা কেউ না কেউ আমাদের গাইড হিসেবে কাজ করেছে।
রুডিয়ার্ড কিপলিং এর কথাটি মনে পড়ে- ‘যে একাকী ভ্রমণ করে সে-ই সবচেয়ে দ্রুত ভ্রমণ করে।’ দ্রুত নয়, ধীরে সুস্থে সব কিছু দেখতে ভাল লাগে আমার। আঠারো শতাব্দীর লক্ষ্য কারুকাজের স্মৃতিসৌধ, মনোমুগ্ধকর আধুনিক স্থাপত্য শিল্প, মূল্যবান ধাতু নির্মিত ঐতিহাসিক শিল্প সংগ্রহ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করার মতো ব্যাপার।
সুদীর্ঘ ৭৫০ বছরের ইতিহাস জড়িয়ে রয়েছে এই বার্লিন নগরীকে ঘিরে এসকানিয়ান (Ascanian) রাজবংশের সম্রাট লোথারিয়াসের শাসনামলে তেরো শতাব্দীতে ব্রানডেনবুর্গ (Brandenburg) অঞ্চলে স্প্রি নদীর তীরে বার্লিন নগরীর উত্থান ঘটে। এরপর বয়ে গেছে কত প্রহর, কত দিন-রাত, মাস-বছর-শতাব্দী। সভ্যতার দীপ্তিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জার্মান দেশ, বিভাময় হয়ে উঠেছে রাজধানী বার্লিন শহর।
সামারের সময় আমাদের দেশের সময়ের সঙ্গে জার্মান দেশের ৪ ঘণ্টার ফারাক, বার্লিনে সন্ধ্যা ৮টা মানে বাংলাদেশের রাত ১২টা। প্রথম যাবার পর জেটল্যাগের ঘোরটুকু কাটিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছি।
ঘর থেকে বেরোলেই কেক পেস্ট্রি আর কফি শপ, যাওয়া আমার পথে অল্পবয়সী মেয়ের সঙ্গে পরিচয় হওয়ায় এক পিস কেক ও এক মগ কফি নিয়মিত খেয়েছি। স্বামীর সাথে বনিবনা না হওয়ায় ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে মেয়েটি আলাদা থাকে। উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে কফি শপকে ও বেশ ভালোভাবেই দাঁড় করিয়েছে। নানা ধরনের কেক করতে পারঙ্গম ক্রিস্টিনা। ফুলের পাপড়ির মতো হালকা নারকেলের কুচি দেয়া কেক এর স্বাদ এখনও মুখে লেগে রয়েছে। রামধনুর মতো অপূর্ব এক রঙিন হাসি সারাক্ষণ ওর মুখে। একা একা পথ চলার কারণে চরিত্রের কোথাও যেন ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা।
বেশ ক’দিন মহিলা চালকের ট্যাক্সিতে চড়েছি। নিপুণ হাতে ট্যাক্সি চালাতে চালাতে গল্প করেছেন মহিলা ড্রাইভার। বার্লিনের ম্যাপ সামনে রেখে গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়েছেন অনায়াস পটুতায়।
মধ্যবয়সী এক মহিলা ড্রাইভার ছেলের সঙ্গে জার্মান ভাষায় বলল, মাকে ওর বাবা বাইরে কাজে যাবার অনুমতি দেননি। তবে আমি এখন ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জন করতে পারছি।
মহিলার চেহারায় সেদিন দেখেছি মধুর আত্মতৃপ্তি। মহিলা বাসচালকের বাসে চড়ার অভিজ্ঞতাও হয়েছে। শুধু অভিজ্ঞতাই বা বলব কেন, এ আমার পরম সৌভাগ্য বলেও মনে হয়। কঠোর পরিশ্রমে মুখে আঁকিবুকি, স্টিয়ারিং আঁকড়ে ধরা সমর্থ হাতে পারদর্শিতার ছাপ। ঠিকঠাক সময়ে বাসস্টপে পৌঁছে যাত্রীদের তুলে নিতে হবে। ‘বারোটার গাড়ি ক’টায় ছাড়া মিলিয়ে ঠিকঠাক পথ চলতে হবে।
যাত্রী মা প্যারাম্বুলেটার গুটিয়ে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বসা। যাত্রীদের হয়তো পছন্দ হয়নি তাই কেঁদে উঠছে বাচ্চা। মহিলা বাস ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে মিষ্টি সুরে জিজ্ঞেস করছে বাচ্চাটি কাঁদছে কেন?
শুধু কর্মদক্ষতা নয়, ব্যবহারেও রয়েছে মায়া-মমতার মিশেল।
জার্মানির এক নায়ক অ্যাডলফ হিটলারের কথা কালের কপোল তলে যেন ফেরারি হয়ে গেছে হিটলার বলেছিলেন- “মেয়েদের বাইরের কাজে থাকিলে চালিবে না। আমাদের দেশের প্রত্যেক মেয়েকে গৃহিণী ও জননী হইতে হইবে।”
স্বৈরশাসকের এই ধারণাকে খড়কুটোর মত উড়িয়ে দিয়ে জার্মানিতে শেষ পর্যন্ত এঞ্জেলা মার্কেল দেশের প্রথম মহিলা চ্যান্সেলর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। মার্কেলকে সরকার গঠনে সহায়তা করার জন্য চ্যান্সেলর সেরহার্ড শ্রোয়াডার পদত্যাগ করেন। ১৯৯৮ সালে শ্রোয়েডার হেলমেট কোহলের রক্ষণশীল সরকারের পতন ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন। প্রায় সাত বছর তিনি দায়িত্ব পালন করেন চ্যান্সেলর হিসেবে।
বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর রাজনীতি শুরু করেন ১৯৯৮ সালের শেষ দিকে, তখন পর্ব জার্মানির সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বহুদলীয় গণতন্ত্রের শুভসূচনা ঘটেছিল।
চ্যান্সেলর এঞ্জেলা মার্কেল পড়াশুনা করেছিন পদার্থ বিজ্ঞানে একই বিষয়ে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৯০ সালের শেষের দিকে জাতীয় নির্বাচনে তিনি সাংসদ হন। মার্কেল সরকার গঠনের সহায়তা করার লক্ষ্যে তখনকার চ্যান্সেলর গেরহার্ড শ্রোয়েডার পদত্যাগ করেছিলেন।
প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শ্বাসরুদ্ধকর সময়, শাসক হিসেবে হিটলারের একনায়কতন্ত্র, নির্মম বোমাবর্ষণ এসবের ভয়াবহতা নিয়ে ছোটবেলা থেকেই আমার মনে দুঃসহ স্মৃতি জন্ম নিয়েছিল।
তবে এ সময়ের বার্লিন শহরের নয়ন ভোলানো অপরূপ সৌন্দর্য দেখে স্মৃতির কথামালা বহুদূর ফেরারি হয়ে যায়।
চেকপয়েন্ট চার্লি- এটি হলো শীতল যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু তথা রশ্মিকেন্দ্র। এক সময় পূর্ব বার্লিনে যাবার পথ এখান থেকেই নিয়ন্ত্রণ করা হতো। ১৯৬১ সালের আমেরিকার ট্যাংক এবং রাশিয়ার লাল বাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক ও ভয়ঙ্কর মুহূর্তে ট্যাংকের ইঞ্জিন চালু করা ছিল, কামান ছিল ঠিকঠাক তৈরি। ইস্ট-ওয়েস্ট বার্লিন বর্ডার ক্রসিং পয়েন্ট (১৯৬১-১৯৮৯) বার্লিনের এই বিভক্তিকে এক অন্ধকার যুগারম্ভ বলে মনে করা হয়।
অতিক্রম করার বিখ্যাত এই কেন্দ্রবিন্দুতে বিদেশী ও মিত্রদের জন্য লেখা প্রথম দিকের সেই সতর্কবাণী এখনও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রয়ে গেছে, ‘ইয়ু আর লিভিং দা আমেরিকান সেক্টর’।
আগের সীমানায় পাথর দিয়ে বাঁধানো বেদনা চিহ্ন এখনও রয়েছে, আমেরিকার ও রাশিয়ার সৈন্যের দু’টি বিশাল ছবি অহরহ মনে করিয়ে দেয় অতীতের সেই দিনগুলোকে।
‘ইয়ু আর লিভিং দা আমেরিকান সেক্টর’ কথাটি এমন হৃদয় ছুঁয়ে গেছে যে ওদেশের গেঞ্জির বুকের দিকে লেখটি প্রায়শই ছাপার অক্ষরে দেখতে পেয়েছি।
কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাস আপন মনেই চুপি চুপি কথা বলে যায়। মেরুন স্কার্ট পরা এক প্রিয়দর্শিনী চেকপয়েন্ট চালিতে আমেরিকা ও রাশিয়ার পতাকা নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে প্ল্যাকার্ড ওয়েলকাম টু বার্লিন।
রিনরিনে মিষ্টি সুরে মেয়েটি বলে- ওয়ান ইউরো প্লিজ। আইন অয়রো বিট্টে, ইউরো হাতে ধরিয়ে দিতেই মেয়েটি আমার পাশে দাঁড়িয়ে বর্ণিল হাসিতে ছবি তোলে।
‘চেকপয়েন্ট চার্লি’ দেখার পর ‘বার্লিন ওয়াল’ দেখার কথা রয়েছে। এ দেয়ালটি না দেখলে বার্লিন ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
১৯৬১ সালে ১২-১৩ আগস্টের রাতে দেয়ালটি তৈরি হয়েছিল। গোপনে ও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এর নকশাটি তখন তৈরি করা হয়েছিল যাতে এ সম্পর্কে কোন গুঞ্জন বাইরে জানাজানি না হতে পারে। সুউচ্চ এই দেয়ালটি চুনাপাথর বালি সুরকি ও লোহার রড দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। জীবন দেয়া অনেক মানুষের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এই দেয়ালটি দাঁড়িয়ে রয়েছে কলংকিত ‘বার্লিন ওয়াল’ সুদীর্ঘ ২৮ বছর দুটি নগরীকে বিভক্ত করে রেখেছিল। ৪০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য এই ওয়ালে ভগ্ন ও অসম্পূর্ণ অংশে দাঁড়িয়ে দেখতে থাকি কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাক ‘ইস্ট সাইড গ্যালরি।’
নানা স্লোগান ও ছবি আঁকা রয়েছে দেয়ালে। নানা রঙের আঁকিবুকিতে নৃত্যের ভঙ্গিমা, ওপারে লাল ও কালো রঙের কালিতে লেখা ডান্সিং টু ফ্রিডম। নিচে লেখা নো মোর ওয়ারস, নো মোর ওয়ালস। এ পিসফুল ওয়ার্ল্ড।
পড়তে পড়তে মনে হয় শান্তিকামী জনতা কখনো যুদ্ধ চায় না, কেননা বিভক্তি চায় না।
পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানির বিভক্তি হওয়ার ঘটনাবলীকে সেঁটে দেয়া হয়েছে বার্লিন দেয়ালে প্রত্যেক জাতির গড়ে ওঠার পেছনে বহু সংগ্রাম, বেদনা ও অশ্রু জলের কাহিনী মিশে থাকে বার্লিন ওয়াল এর রয়েছে তেমনই এক স্মৃতির কথকতা। দেয়ালে নানা রঙের মিশেলে রয়েছে শান্তিময় এক পৃথিবীর স্বপ্ন।
২.
সেদিন ছিল মেঘঢাকা এক ধূপছায়া রঙ দিন। কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া ও দেশীয় মানুষরা হালকা পাতলা জামা কাপড় পরে, ঠাণ্ডা বলে সেদিন অল্পস্বল্প গরম জামা চাপিয়েছে শরীরে। যদিও লাঞ্চ আমরা বাইরেই করি তবে ঠাণ্ডা বলে বাড়িতেই খেয়ে নেবো ভেবেছি। ফ্রিজে রয়েছে প্যাকেট ভরা খাবার, শুধু গরম করে নিলেই হলো।
আভেনে হজ্পজ্ (hodge-podge) লেখা প্যাকেটটি দারুণ লাগে। খিচুড়ির মিশলে উপকরণ। বাসমতী চালের সঙ্গে আলু গাজর ব্রোকোলি মটরশুঁটি ফুলকপি বিন ক্যাপসিকাম ছোট ছোট করে কাটা, বোনলেস চিকেনের টুকরোও রয়েছে এতে, রয়েছে প্রয়োজনীয় মশলা। পরিমাণ মতো ফুটন্ত জলে উপকরণটি ঢেলে দিলেই সুস্বাদু খিচুড়ি তৈরি হয়ে যায়।
বাড়িতে লাঞ্চ করা আর হলো না। হাসান এলে রোজকার মত বাইরে বেরিয়ে পড়ি। বেশির ভাগ সময় আমরা হোটেল আলরেদা’তে খেয়েছি। শুক্রবারে এ হোটেলে এত ভিড় হয় যে বসার জায়গা পাওয়া মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। এ দিনে ওদের বিশেষ মেন্যু থাকে জাফরান রাঙানো ভাত, গ্রিল করা টম্যাটো, সুগন্ধি মশলা দিয়ে ল্যাম্বস্যুপ তৈরি হয় শুক্রবারে। অনবরত সেদ্ধ হওয়া মাংস নরম তুলতুলে হয়ে যায়। সঙ্গে প্রচুর স্যালাড ও লেবু।
সেদিন খেলাম বাসমতী রাই, গ্রিল করা মুরগি, মেয়োনিজ, কনোব্লাউ অর্থাৎ রসুনের স্যস আর আখরান অর্থাৎ বোরহানি। ম্যামেথ এসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল।
বাড়ি ফেরা নয়, এবার চলো ‘ফেনজেয়া টুম্ব’ দেখতে। চলতি কথায় কেনজেয়া টুম্ব, এটি টেলিভিশন টাওয়ার।
বার্লিন নগরীতে এটি সবচেয়ে উঁচু স্থাপত্য। অপূর্ব সুন্দর গ্লোবের মত এটি নকশা অংকন করেছেন স্থপতি ফ্রিজ ডিয়েটার ও গুনটার ফ্রাংকে। অগুনতি টেলিফোন রেডিও ও টেলিভিশনের টাওয়ার এটি। অপূর্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে ৩৬৫ মিটার উচ্চতা নিয়ে দাঁড়ানো FERNSEHTURM গোলকের মতো চেহারা নিয়ে আলেকজান্দ্রার প্লাজের পশ্চিমে। রাজধানীর কেন্দ্রস্থলের এই টাওয়ারটি দৃষ্টিনন্দন বলে সবার নজর কাড়ে।
আকাশছোঁয়া এই টাওয়ারে উঠতে হবে? ওরেববাস তাহলেই হয়েছে, ভয়ে প্রায় সিঁটিয়ে যাই। আমাদের মতো প্রচুর দর্শক এখানে এসেছে বলে কিছুটা ভরসা পাই। এক সময় রুদ্ধশ্বাস হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মনে হয় আমরা উপরের দিকে যাচ্ছি।
‘ও মাই গড, ফ্যানটাসটিক’- এ সমস্ত কথাও শব্দের উচ্চারণ শুনে অবাক হয়ে দেখি গোটা শহরটিকে দেখতে পাচ্ছি। ভীষণ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিল সে সময়টি গ্লোবের সাত তলায় রয়েছে মনোরম ক্যাবের এটি ভিত্তি থেকে ২৫০ মিটার উঁচুতে। ব্ল্যাক কফি কিংবা ক্যাপুচিনোতে আয়েশি চুমুক দেয়া যায় চক্রাকারে আবর্তিত হওয়া এই ক্যাফেতে বসে, একই সংগে বিস্ময় ভরে উপভোগ করা যায় বার্লিন শহরের নয়নভোলানো সুন্দর ছবি।
পুরো বার্লিনকে আকাশের কাছাকাছি থেকে দেখা, সাত তলা ক্যাফেটেরিয়াতে দাঁড়িয়ে ফেনা উপচে পড়া ক্যাপুচিনো পান করার ঘোর তখনও কাটেনি। টাওয়ার থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে দেখি ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে মিহি দানার মতো। সবার হাতে রঙবেরঙের ছাতা। গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণের মত মেঘ ডাকছে, সোনালি ফিতের মতো বিদ্যুৎ ঝিকমিকিয়ে ওঠে। বৃষ্টির তেড়ে একটু একটু করে বাড়ছে।
পলকে বুকের মাঝে ভেসে ওঠে বাংলাদেশের ছবি। ভাদ্র মাসে বিদেশে চলতে চলতে শুনি গুরু গুরু মেঘের গর্জন, জুঁইফুলি বৃষ্টি, বিদ্যুতের চমক সব মিলিয়ে মনে বিদ্যাপতির অমর পঙক্তি জেগে ওঠে।
সখি হে, হমর দুখক নাহি ওর রে
ঈ ভরা বাদর মাহ ভাদর
শূন্য মন্দির মোর রে।
বৃষ্টি ঝরা এই রাতে আমরা রেস্টুরেন্টের পথ ধরেছি। ঠিক আমার পাশ দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মধ্যবয়সী এক মহিলা ছাতা হাতে যাচ্ছেন। স্টেপ করে কাটা চুল, ছাই রঙা স্কার্ট, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। আমার পাশ দিয়ে হাঁটছেন মহিলা, তার কান্নার আওয়াজ বৃষ্টি ধারার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। অসহায়ের মতো আমি তার ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার আওয়াজ শুনতে থাকি। হয়তো তার স্বামী অসুস্থ, বিয়ের পর মেয়ে সুখে নেই, ছেলে অবাধ্য হয়ে উঠেছে কিংবা স্বামীর পরকীয়ায় অঝোরে কাঁদছেন। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের মানুষের সঙ্গে হৃদয় বেদনার যেন মিল রয়েছে আমাদের।
কিছুক্ষণ আগে টেলিভিশন টাওয়ারের গ্লোব এ বসে আকাশের দিকে পাড়ি জমানো, গোটা বার্লিন শহরকে দেখার উত্তেজনা অচেনা মহিলাটির কান্নায় কেমন যেন স্তিমিত হয়ে এলো।
‘লা বানডিটা’ (La Bandita)-তে বসে আছি। রেস্টুরেন্টে কাচঘেরা জানালা দিয়ে দেখছি বৃষ্টিধারা। কাচের টেবিলে টুনা ফিসের বার্গার, ডোনাট আর মিল্ক ক্যাফের পেয়ালা ঠাণ্ডা হতে থাকে।
একটি কবিতার পঙক্তি বার বার ছুঁয়ে যেতে থাকে।
বৃষ্টি বৃষ্টি এখানে সেখানে
পৃথিবীর সর্বত্র
শিকাগো শহরে নিউইয়র্কে, প্যারিসে
কোথাও আলো ছুঁয়ে, কোথাও
জানালার কাচে
কোথাও মসৃণ ঐশ্বর্যের গাড়ি, বর্ষাতি
ছাতা
আমার পৃথিবীর বৃষ্টি মাটির
গন্ধ ধান ক্ষেত ভেসে যাওয়া
আম গাছের ডাল ভেঙে পড়া
হঠাৎ গরুর ডাক, ভিজে যাওয়া
পাখির ডানা ঝাপটানো
আবার পুকুরে নদীতে
ডোবায় লাবণ্যের সাড়া
ম্যামেথ জিজ্ঞেস করে, হোয়াই ইয়ু আর সোগ্লুমি ম্যাম?
জবাবে কিছুই বলতে পারিনি ওকে তবে অনুভব করি, অচেনা মহিলার সেই উচ্চকিত কান্না আর ভাদ্রের এই বৃষ্টিধারা যুগলবন্দী হয়ে বুকের ভেতরে বেদনাবিধুর করে তুলেছে।
৩.
বার্লিন শহরের মজাটা এখানেই, রাস্তায় বেরোলেই এখানে ওখানে মোড়ে রঙবেরঙের ভালুক, নীল হলুদ সবুজ ছাই রঙের ভালুক সামনের দুটি পা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যেন জিজ্ঞেস করছে গুড মরগেন সুপ্রভাত, কখনও যেন বলে, ডি গেট এস দিয়া, ঝর্না, তুমি কেমন আছ?
এমনই আলাভোলা বোকা বোকা মুখ ওদের। জার্মানরা খুব ভালুকপ্রিয় জাতি। পান্ডা ভালুক ওরা খুব পছন্দ করে। চারপাশে তাই খেলনা ভালুকের ছড়াছড়ি।
এখানে ওখানে ভালুকদের দেখতে দেখতে এক বিকেলে পৌঁছে গেলাম ‘ব্র্যানডেনবুর্গ গেট’ এ (Brandenburg Gate)।
দানিয়েলা বলল, ব্র্যানডেনবুর্গ গেট আমাদের জাতীয় প্রতীক। ইউরো কয়েনের উল্টোদিকে এর ছবি রয়েছে, এই দ্যাখো।
হ্যাঁ এটি সত্যি জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, ২০০ বছরের পুরনো এটি সবচেয়ে বিখ্যাত স্মৃতিচিহ্ন। এই স্মৃতিস্তম্ভটি ১৭৮৯ সালে নির্মাণ করা হয়। নির্মাণকারীর নাম কার্ল গোথার্ড ল্যাংহ্যান্স। এথেন্সের নগর দুর্গের প্রবেশপথটি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে স্থপতি ব্রানডেনবুর্গার টর বা ব্র্যানডেনবুর্গ গেট এর নকশা অংকন করেছেন।
জোহান গটফ্রাইড স্কেডো এর গেট এর শুধু বহির্ভাগকে সুন্দরভাবে অলংকৃত করেছেনÑ তাই নয়, চারটি ঘোড়ায় টানা প্রাচীন রথের মত এই স্থাপত্যটি যাকে ‘কোয়াড্রিগা’ (Quadriga), ব্র্যানডেনবুরগার টর বলা হয়ে থাকে তার নকশার পরিকল্পনাও তিনিই করেছেন। চারটি ঘোড়ায় টানা এই শকটটির উচ্চতা ২৪ মিটার, ৬৫.৫ মিটার প্রস্থ ও ১১ মিটার গভীর।
চক্রযুক্ত এই যানের দুটি চাকার ওপর দাঁড়িয়ে আছেন শান্তি ও জয়ের অধিষ্ঠাত্রী দেবী ভিক্টোরিয়া। দু’টিকে পাখির মতো ডানাযুক্ত এই দেবী। এটির নকশাকার ফ্রিয়েড্রিক স্কিনকেল।
অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালে যখন জার্মানির চ্যান্সেলর হন তখন আলো নিয়ে যে আনন্দ মিছিল হয়েছিল ব্র্যানডেনবুর্গ গেটএর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই স্মৃতি স্তম্ভটি সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। চারটি ঘোড়ায় টানা এই শকটটি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৫৬ সালে এর কাঠামোটি ঠিকঠাক করে আগের মত করে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী বারাক ওবামা এখানে দাঁড়িয়েই বলেছিলেন, ইটস টাইম ফর আস টু চেঞ্জ অ্যামেরিকা।
বার্লিন ওয়াল এর পতন ও পুনর্মিলনকে ঘিরে ১৯৯০ সালে যে জাঁকজমকপূর্ণ মিল উৎসব হয় ঘোড়ায় টানা চার চক্রযানের বিশিষ্ট শকটটিকে মধ্যমণি করে তা উদযাপিত হয়।
সামারের এই সোনা রঙ গোধূলিতে বহুযুগব্যাপী দাঁড়িয়ে থাকা তাম্রধাতু দিয়ে তৈরি করা। কোয়াড্রিকা, শান্তি ও বিজয়ের দেবী ভিক্টোরিয়ার অপূর্ব কারু কাজের দিকে বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকি।
৪.
রেলওয়ের সুবিধাসহ ইউরোপীয় নগরী লন্ডন বুদাপেস্ট গ্লাসগো এবং প্যারিসের পর আন্ডারগ্রাউন্ড রেলওয়ের সুবিধাসহ পঞ্চম স্থানে রয়েছে বিশাল নগরী বার্লিন।
বার্লিনের মনোরম সকাল অর্থাৎ সানিডে বাড়িতে ঢুকে জ্যাকলিন বলল, গুড মরগেন।
বললাম জেটসেন বসো।
জ্যাকলিন বলে, আজ আমরা ‘অলিম্পিক স্টেডিয়াম’ এ যাচ্ছি, দেন লা বটেগা, ট্রেটোরিয়া, পিজেরিয়া, আলরেদা নয়তো লা বেনডিটা-তে লাঞ্চ সেরে নেব।
যো হুকুম ম্যাডাম, তুমি যা বলবে তাই হবে।
বিশাল এই অলিম্পিক স্টেডিয়ামের সামনে দাঁড়িয়ে সত্যি মুগ্ধ হলাম।
১৯৩৬ সালে স্টেডিয়ামটি প্রাথমিকভাবে বিশ্বকাপ অলিম্পিক খেলার জন্য এটি তৈরি করা হয়। স্থপতি ছিলেন ওয়ার্জার মার্চ। ১৯৩৪-৩৬ সালের মাঝামাঝি আগের স্টেডিয়ামটির পাশে এটি নির্মাণ করা হয়।
একই স্থপতির নকশা অনুযায়ী মল্লভূমির জন্য ঋজুভাবে উপযুক্ত স্থান তৈরি করা হয়।
২০০৬ সালের ৯ জুলাই ফুটবল বিশ্বকাপের জন্য স্টেডিয়ামটিকে সম্পূর্ণভাবে আধুনিকীকরণ করা হয়। প্রভূত অর্থ ব্যয় করে যুগোপযোগী করে তোলা এ স্টেডিয়ামে ৭৫,০০০ দর্শক একসাথে খেলা উপভোগ করতে পারে। স্থপতি ভর্ন গারকেন, মার্গ ও সহযোগীরা এটিকে সম্প্রসারিত করে নতুন ছাদ তৈরি করে এটিকে বিভক্ত করেন এবং এখানে মোহনীয় আলোকসজ্জার ব্যবস্থা করা হয়। ঢোকার পথে প্রদীপ্ত আলোর তীব্রতা কমানোর জন্য স্নিগ্ধ নীল রঙের কোমল ছোঁয়ায় স্টেডিয়ামটিকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে।
শুধু এই নয় রক ও ক্ল্যাসিকাল সংগীতের জন্য রয়েছে উন্মুক্ত মঞ্চ, লিফট সংযুক্ত একটি ঘণ্টা ঘর (Bell Tower)রয়েছে, প্রাকৃতিক দৃশ্যের মনোরম ছবি দিয়ে এটিকে মনোরম করা হয়েছে। কনসার্ট পরিবেশন এই মঞ্চটি ৩০ মিটার গভীর শূন্যগর্ভ এক মঞ্চ, সঙ্গীত উপভোগ করার জন্য এটি দর্শকদের অত্যন্ত প্রিয় জায়গা।
অলিম্পিক স্টেডিয়ামের পরেই রয়েছে সাঁতার দেয়া ও হকি খেলার সুব্যবস্থা, রয়েছে ঘোড়ায় চড়ে পরিভ্রমণ করার মাঠ।
১৯৩৬ সালে অ্যাডলফ হিটলার এই স্টেডিয়ামে এসেছিলেন।
সত্যি হিটলার ছিলেন বিচিত্র চরিত্রের মানুষ তিনি নাকি ক্রিকেট খেলতেন, শিল্পকলার চর্চাও করতেন। জন সিম্পমনের লেখা বইয়ে পাওয়া যায় এসব তথ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সৈন্যদের কাছ থেকে অনেক নিয়ম-কানুন শিখেছিলেন তিনি। আরও মজার খবর এই যে ১৯২০ সালে যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে একটি প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচেও অংশ নিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ক্রিকেট খেলার মাধ্যমে জার্মান সৈন্যদের ট্রেনিং দিতে এমনই ছিল তার ক্রিকেটপ্রীতি। তবে তার নিজস্ব স্বভাব অনুযায়ী ক্রিকেট কিছু বদলে দিতেও চেয়েছিলেন। যেমন, বল আরও বড় ও শক্ত হবে। ক্রিকেটের প্যাড ব্যবহারও তিনি তুলে দিতে চেয়েছিলেন।
জ্যাকুলিন বলল, খুব ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার।
হ্যাঁ।
ফেরার পথে ‘ডানকিল ডোনাট’ রেস্টুরেন্টে এসে বসি। কফি আর স্যান্ডউইচ খেতে খেতে দেখি মনকাড়া এক দৃশ। আট-দশ জন জার্মান কিশোর রেস্টুরেন্টের রেলিং এর ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে, সেখানে থেকে লাফিয়ে রাস্তায় পড়ছে। আবার ছুটে দৌড়ে কোথায় উধাও হয়ে যাচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। মিনিটে মিনিটে নতুন খেলার উদ্ভাবন হচ্ছে। এরা সবাই যেন ‘ছুটি’ গল্পের ফটিক। ‘ফটিক চক্রবর্তীর মাথায় চট করিয়া নতুন ভাবোদয় হইল।’ সত্যি শিশু-কিশোরদের দুষ্টুমি সবখানেই এক রকম।
বার্লিন টাউন হলের সামনে বসে চমৎকার সময় কাটিয়েছি। এখানে এলে মন ভালো হয়ে যায়। লাল ইটের সুদৃশ্য অফিস বাড়িটি ১৮৬১-৬৯ সালের মধ্যে তৈরি হয়েছে। এটি বার্লিনের মেয়রের অফিস, টিভি টাওয়ারের খুব কাছে।
একে বলে ROTES RATHAUS.
রেড টাউন হলের ঠিক উল্টোদিকে সেন্টমেরিস চার্চ (১২৯২)। এটিই একমাত্র মধ্যযুগের যাজনিক বিভাগসহ নিজস্ব গির্জা। বার্লিনের এই গির্জায় এখনও শ্রদ্ধাভরে উপাসনা অর্চনা করা হয়।
এখানে রয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর একটি পার্ক। সমুদ্রদেবতা নেপচুনকে উৎসর্গ করা পার্কটিকে সাজানো হয়েছে চমৎকার ঝর্ণাধার দিয়ে। ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি করা বিশাল এই ভাস্কর্যে রয়েছে সূক্ষ্ম কারুকাজ। বিশালদেহী সুষ্ঠু সবল দেবদূতের মত পুরুষ শরীর, হাতে ত্রিশূল পায়ের কাছে খেলা করছে শিশুরা। চারপাশ ঘেরা কচ্ছপ, সাপ, কুমির ও ডলফিনের মুখ থেকে ফোয়ারার জল ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ঝরছে। একটু সামনে আয়েশি ভঙ্গিতে আলুলায়িত বসনে নারীমূর্তি। স্নিগ্ধ রূপের মাধুরীতে মাখা নারীদের হাতে কলসি, এগুলো থেকে জলের ধারা অবিরত ঝরছে। সে এক নয়নভোলানো দৃশ্য।
পাশেই গোলাপ বাগান। আবির রাঙা গোলাপ ফুটে জায়গাটিকে মোহনীয় করে তুলেছে। এর পেছনে ‘ফেইজিং টুম্ব’ টিভি টাওয়ার।
পার্কটিতে বসার চমৎকার সুব্যবস্থা রয়েছে। সব সময়ই এখানে লোকজনের আনাগোনা। চিপস, আইসক্রিম খেয়ে, গল্প করে মানুষ আনন্দময় সময় কাটায়। দেবদূতের মতে সৌন্দর্য বিকিরণ করা এই ‘নেপচুন ফাউন্টেন’ পর্যটকদের পরম আকাক্সিক্ষত গন্তব্যস্থল।
ডিপার্টমেন্টাল স্টোর KADEWE ক্যাডেভে-তে যাওয়া মানে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা। ইউরোপের সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এটি। সব জিনিসের প্রচুর মজুদ থাকে এখানে। এক কথায় কেনাকাটার নন্দনকাননও বলা যায়। সব পেয়েছির দেশ যেন এটি।
নিচের ফ্লোর থেকে চাল-ডাল-তেল-নুন অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে অবশ্যই এর সর্বোচ্চ ফ্লোরে যাবেন, সেখানে পাওয়া যায় রান্না করা বৈচিত্র্যময় সুস্বাদু খাবার, যা খেয়ে পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ পরমানন্দ লাভ করবেন, এটিই কেডেভের বৈশিষ্ট্য।
শ্যাম্পেন থেকে শুরু করে সমুদ্রের তলদেশের ঝিনুক শুক্তিও এখানে পাওয়া যায়। ১৯০৭ সালে এটি তৈরি হয়। এ স্টোরটি ৬০,০০০ মিটার জুড়ে ও এর ভবনটি ৮ তলাবিশিষ্ট। ব্যাপারটি অভাবনীয় ও অকল্পনীয় হলেও সত্যি যে খাদ্য বিভাগে ৫,০০০ উৎপাদিত পণ্যের মাঝে বাছাই করে ও পছন্দ করে এখানে কেনাকাটা করা যায়।
ছাদের ওপর শীতকালীন সবজি বাগান রয়েছে। শেষ রাত পর্যন্ত এই স্টোরটি রঙিন আলোর মালায় সাজানো থাকে। কেতাদোরস্ত তরুণ, হালফ্যাশনের অনুবর্তী, সুরুচিশীল বয়োবৃদ্ধ, সচ্ছল বিলাসী রক্ষণশীল কিংবা অভিজাত সবারই আকর্ষণস্থল এটি। ধীরে সুস্থে খুঁটিয়ে, খুঁটিয়ে না দেখা করোরই বার্লিন ভ্রমণ সম্পূর্ণ হয় না।
এর শোরুম এত আকর্ষণীয় যে বিমুগ্ধ হয়ে শুধু তাকিয়ে থাকতে হয়। আমিও তাই ছিলাম।
হ্যালো, হ্যালো- ডু ইয়ু হিয়ার মি?
জ্যাকুলিন আমার বিমুগ্ধভাব কাটিয়ে দেয়।
দেখার কি শেষ আছে? ঘরের পাশে ঘাসের ওপর মুক্তোর মতো শিশির বিন্দুও তো আমরা দেখতে পাই না, তাই শুধুমাত্র ঘুরে বেড়াবার জন্য যখন এলাম তখন যা দেখি সবই ভালো লাগে।
কেনাকাটা বিশাল কেন্দ্রস্থল ইউরোপা সেন্টার কে. এইচ. পিপারের ডিজাইনে ১৯৬৩-১৯৬৫ সালে তৈরি করা হয়েছে। ওখানে প্রায়ই আমরা টুকিটাকি কেনাকাটা করি। বিশাল এই সেন্টারে রয়েছে ২২টি ফ্লোর। রয়েছে অগুনতি দোকান, বুটিক, মুভি থিয়েটার, হোটেল, ক্যাবারে। সেন্টারের সামনে লাল রঙের গ্র্যানিট শিলা দিয়ে তৈরি ওয়ার্ল্ড গ্লোব ফাউন্ডেন। সামারে মানুষ এখানকার স্নিগ্ধ আবহাওয়ায় সময় কাটায়।
ইউরোপা সেন্টারে ‘ওয়াটার ক্লক’ অর্থাৎ জলের ঘড়ি। বানার্ড গিটনের কৌতূহলোদ্দীপক এই ঘড়িটি এক অপূর্ব উদ্ভাবন।
আমাদের দেশে চালা ঘর যেমন থাকে, ঘড়িটি তেমনই লম্বাটে এক কাচে ঘেরাটোপ রয়েছে। অবিরত বহমান জলের ধারার মাঝে সময়ের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছে ঘড়িটি। অবাক হয়ে ভাবি এমনও কি হয়? ম্যামেথ, স্টোফিনি, দানিয়েল, বীণা ওয়াও ওয়াও বলে ওঠে। আমি যেন মূক ও বধির হয়ে গেছি, কিছুই শুনছি না, শুধুই দেখছি।
সেন্টারের সামনে ‘মভেন পিক’ রেস্টুরেন্টে বসি। টেবিলে আইসক্রিম। পাশেই ফোয়ারা। শনিবার বলে মানুষের ঢল নেমেছে।
প্রাণশক্তিতে ভরপুর তরুণরা একের পর এক জাগলারি দেখিয়ে অবাক করে দিচ্ছে দর্শকদের নানা ধরনের খেলা দেখাচ্ছে, ক্যাসেটে বাজছে গান, মাঝে মাঝে দর্শকদের বলছে, বিট্টে আপস্টান হালটেন- অনুগ্রহ করে আমার আপনার দূরত্ব বজায় রাখুন।
ভালো লাগে একথা ভেবে যে বার্লিনে কাউকে ভিক্ষে করতে দেখিনি। পাতাল রেলে, মর্গান পোস্টের সামনে বা বিভিন্ন রাস্তায় ওরা ভায়োলিন, হরেক রকম বাদ্যযন্ত, মর্ডান ইনস্ট্রুমেন্ট বাজায় বা আপন মনে গান গায়। দাঁড়িয়ে উপভোগ করে, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে যার যার সাধ্যমতো ইউরো দিয়ে যায়।
বেলুন দিয়ে নানা রকম জাগলারি করতে দেখেছি। খেলুড়ে মানুষটির সাথে বাঁশি বাজায় দু-তিন জন। চমৎকার সাঙ্গিতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে পথের মানুষকে ওরা মোহগ্রস্ত করে রাখে। এমন সুরের লহরির মাঝে আমার পা আর চলতে চায় না, মনে হয় আর একটু সময় উপভোগ করি।
সংখ্যায় অতি নগণ্য হলেও বার্লিনে দু’চারটে রিকশা চোখে পড়েছে। তবে আমাদের দেশে রিকশার মতো নয়, এতে ইনডিকেটর রয়েছে, গড়নটাও অন্য রকম। মোটামুটি যান্ত্রিক রিকশা দেখে তবু ভালো লাগল। জার্মান রিকশাওয়ালা আমার সংগে ছবি তুলে দারুণ খুশি।
জুলোগিসার গার্ডেন এ আজকে নিয়ে যাব মাকে। যাবার আগে এখানকার চিড়িয়াখানা তো দেখে যাবে।
এত তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল দিন? বুকের ভেতর রাত জাগা কোনো পথিক যেন বেহালার করুণ সুর বাজিয়ে যায়।
আমাদের সঙ্গী হলো হাসান ও ওর ছেলে জাওয়াদ। চিড়িয়াখানার গেট এর দু’পাশে দুটি হাতির মূর্তি, চুপটি করে বসে আছে। দারুণ লাগে দেখতে। ভেতরে গিয়ে অবাক হতে হয়। ১৫০০ প্রজাতির ১৪,০০০ জীবজন্তু এখানে রয়েছে। প্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ করার জন্য সমৃদ্ধ অ্যাকুরিয়াম রয়েছে, স্থলচর জীব-জন্তুর বাস ও তাদের বংশবৃদ্ধির জন্য ঘেরাও দেয়া জায়গা রয়েছে।
বিশাল জায়গা নেয়া এই চিড়িয়াখানা কিছুটা দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়ি, হাত-মুখ ধোয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকতে যাবার মুখে মধ্য বয়সী এক জার্মান মহিলাকে নজরে পড়ে। সাদা ট্রাউজার, সাদা শার্ট, মাথায় সাদা স্কার্ফ। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলেন, মাকে নিয়ে চিড়িয়াখানা দেখতে এসেছে?
বললেন, আমার ছেলে আমার সঙ্গে থাকে না তাইতো এ বয়সে টয়লেট ধোয়া মোছার কাজ করে সংসার চালাই।
সন্ধ্যার মুখে আমরা জুলোগিসার গার্ডেন থেকে বের হই। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত টয়লেট পরিষ্কার করা সান্দ্রার চোখ থেকে ঝরে দু ফোঁটা চোখের জল আজও ভুলতে পারিনি। ধবধবে গালে ঝরে পড়া সান্দ্রার দু ফোঁটা অশ্রুজল আজও আমাকে হন্ট করে ফিরে।
ওর কান্নার ছোঁয়াতেই বুঝি সন্ধ্যায় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামে। আমরা গিয়ে আইরিশ পাব রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসি। আমাদের ঠিক পাশের টেবিলে বসে আছেন পাঁচজন মধ্যবয়সী মহিলা। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। উজ্জ্বল রঙের স্কার্ট ট্রাউজার। যতেœর প্রসাধনীতে চোখ দুটি উজ্জ্বল। সামনে কফির পেয়ালা নিয়ে হৈ হৈ করে গল্প করছে। এখানে পুরুষ কিংবা মহিলা বয়স নিয়ে একেবারেই ভাবে না, গল্প করে হৈ চৈ করে কাটিয়ে দিচ্ছে ওরা বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যারাত। ডিনার সেরে তবেই ওরা বাড়ি ফিরবে।
পাব রেস্টুরেন্টের উল্টোদিকে দেখা যাচ্ছে ফুট বার। কাচের জানালা দিয়ে আমি দেখতে থাকি ফলের পাহাড়, ডাই করা হরেক রকমের ফল।
বাড়ি ফেরার পথে ‘মেমোরিয়াল চার্চ’ দেখতে যাই। আমাদের সঙ্গে জয়েন করে স্টেফিনিও দানিয়েলা যুদ্ধ যে কী ভয়াবহ স্বাক্ষর রেখে যায় তা গির্জাটি কিছুটা হয়ত অনুমান করা যায়। চার্চটি তৈরি হয়েছিল ১৮৯১-১৮৯৫ সালের মধ্যে। নকশা তৈরি করা ও পরিকল্পনায় ছিলেন ফ্রেঞ্জ স্কিউচটেন (Franz Schwechten)। এর ভেতরটা পুরো মোজাইক দিয়ে সাজানো এই চার্চে ১১৩ মিটার সর্পিল ডিজার রয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চার্চটি এমনভাবে বিধ্বস্ত হয়ে ছিল যে ১৯৫৬ সালে বার্লিন সিনেট গির্জাটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়। মানুষের ঝড়ো প্রতিবাদের মুখে সিদ্ধান্তটি বাতিল হয়ে যায়। পরে চার্চটির অপরিহার্য অংশগুলো রেখে নতুন কিছু সংযোজন করেন স্থপতি ইগন ইয়ারম্যান এটি পুনর্নির্মাণ করেন। গির্জাটি সম্পূর্ণ হয় ১৯৬৩ সালে। গ্যাব্রিয়েল জুলরিসের গ্লাস পেইন্টিং ও গাঢ় নীল চার্চটি অপরূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত। তবু যুদ্ধে বিধ্বস্ত চার্চের বহিরাঙ্গ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে তেমনই সংরক্ষিত রয়েছে।
যুদ্ধ যে শুধু ধ্বংস করে। যুদ্ধ যে শুধু হাহাকার আনে, যুদ্ধ যে শুধু অশ্রুজল ঝরায় এগুলো স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য, যুদ্ধকে ঘৃণা করার জন্য ‘মেমোরিয়াল চার্চ’-এর কলঙ্ক চিহ্নগুলো যুদ্ধের বিরুদ্ধে নীরব এক বিদ্রোহ ঘোষণা।
আমাকে কেউ যখন জিজ্ঞেস করত, কোথায় যাবে ম্যাম? আমার তাৎক্ষণিক জবাব ছিল, ট্যাগল নদীর পারে, নয়তো আলেজান্ডার প্লাজ এ যাবো।
কারণ আলেকজান্ডার প্লাজ বার্লিনবাসীর কাছে চক্রনাভির মত। প্লাজার চূড়ায় রয়েছে, ‘ওয়ার্ল্ড টাইম ক্লক।’
১৯৬৯ সালে তৈরি এই প্লাজা দেখা সাক্ষাতের চমৎকার একটি জায়গা। বার্লিনবাসী সহজ শব্দে ‘আলেক্স’ বলে। এখানে গেলে কোন কারণ ছাড়াই আমার ভালো লাগত। তবে সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল ট্যাগেল নদীর পাড়ে বসে থাকা। ট্যুরিস্টরা এসে উপভোগ করে নদীর বৈকালিক সৌন্দর্য শিকলে বাঁধা কুকুর নিয়ে ঘুরতে আসেন পেট-লাভাররা; নদীতে রাজহাঁস, পাতিহাঁস কিছু নদীতে কিছু ডাঙায় ঘোরাফেরা করে। মানুষকে ওরা মোটেও ভয় পায় না, ছোট বাচ্চারা কাছে গেলে বরং রাজহাঁসগুলোই তেড়ে আসে। নদীর পার ধরে হাঁটতে হাঁটতে সূর্য কখন ডুবে যায়, কখন গোধূলি নেমে আসে কিছুই বোঝা যায় না। বসারও চমৎকার হেলান দেয়া বেঞ্চ রয়েছে। নদীতে রয়েছে বোট, ছোট ছেলেমেয়েরা, তরুণরা হুল্লোড় করে বোট নিয়ে মাঝ নদীতে চলে যায়। নদীর পাড়ের ঢালু জায়গা থেকে ওপরের দিকে উঠলেই দেখা যায় সারিবদ্ধ রেস্টুরেন্ট।
তিরিতিরি নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে থেকেছি আমি, সূর্যের স্তিমিত হয়ে আসা আলোর কী অপরূপ বর্ণালি খেলা তা শুধু উপলব্ধি করার ব্যাপার।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কপালকুণ্ডলা’র নবকুমারের মতো শুধু বলতে ইচ্ছে করে আহা কী দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না।
বিকেল হলেই প্রাণটা টানত ‘ট্যাগলার জে’র জন্য, আসছে কাল এ সময়ে আমরা ট্যাগেল এয়ারপোর্ট এলাকা থাকব। রিপোটিংয়ের কারণে কিছুটা আগে আগেই যেতে হবে। মিক্সড ফলের জুস হাতে নিয়ে মনটা উদাস হয়ে যায়।
কাল থেকে আর এ পথে আসা হবে না। ট্যাগেল নদীর নীরব স্রোতধারা দু’চোখ ভরে আর দেখব না। পরিচিত জনরা একে একে এসে দেখা করে বিদায় নিয়ে গেছে। ডালের বড়া অর্থাৎ পিঁয়াজুকে ওরা ‘ফালাফাল’ বলে তা নিয়ে কেউ কেউ রসিকতা করেছে ফালাফাল খাবে? পর মুহূর্তে টলটলে জলভার চোখে বলেছে, গুড বাই। পুরকায়স্থ বলেছেন, ডোন্ট সে গুড বাই, সি ইয়ু এগেন। ডোন্ট শেড টিয়ারস।
ভেজা চোখ মুছে মনে মনে রবীন্দ্রনাথের পঙক্তি উচ্চারণ করি, ‘উৎকণ্ঠে আমার লাগি কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে, সেই ধন্য করিবে আমাকে’।
সময় কী তাড়াতাড়িই না ফুরিয়ে যায়। মনে হয়, এই তো সেদিন এসে নেমেছি ট্যাগেল এয়ারপোর্টে- এর মাঝে এক মাস চলে গেল?
এখানে আসার পর ভেবেছি কি করে সময় কাটবে? জার্মান ভাষা জানি না, যারা আমাদের পাশে সন্তানসম হয়ে থেকেছে ওরা কেউ জার্মান, কেউ ফ্রাঞ্চের, কেউ আরবের, তিরিশটা দিন কিভাবে কাটবে?
দুদিন যেতে না যেতে হুসেন লুবনা স্টেফিনি দানিয়েলা ম্যামেথ বীণা ওরা আমাদের সাথে নিয়ে বার্লিনের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জায়গাগুলো দেখিয়েছে, ঐতিহাসিক জায়গাগুলোও যেন কথা বলে গেছে অবিরত। বিমল ভালোবাসা একে অন্যকে কী যে মায়াডোরে বাঁধতে পারে দেশে ফিরে আসার আগে নতুন করে উপলব্ধি করলাম।
শাড়ি ব্লাউজ টিপ ও হাতে শাঁখা পলার কারণে মানুষের মনোযোগ পেয়েছি ভীষণভাবে। এক বিকেলে রেস্টুরেন্টে ঢুকে দেখি দারুণ ভিড়, বসার জায়গা নেই মোটেও। মধ্য বয়সী জার্মান মহিলা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে বসার জায়গা করে দিলেন। আমি অল্প শেখা জার্মান ভাষায় বললাম দাংকে। ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, দুবিস জের নেট- তুমি খুব ভালো।
আনন্দের যেন ঝড় বয়ে যায় এ কথাটিতে। আপেলের জুস শেষ করে বোরোবার সময় বললাম, ইস লিবে দিস- তোমাকে আমি ভালোবাসি।
খুশিতে মহিলাটি আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলেন- সেই কবোষ্ণ ছোঁয়া সুখস্মৃতি হয়ে এখনও জড়িয়ে রেখেছে। পাতাল রেল এ জার্মান এক মহিলা বলেছেন, আমাদের মহিলা পুরুষ সবার জামা কাপড় এক। তোমাদের মেয়েদের ড্রেসে একেবারেই অন্যরকম ভীষণ সুন্দর, চমৎকার।
ছেলে ও আমার সার্বক্ষণিক সঙ্গীরা কথাগুলো বুঝিয়ে দিয়েছে আমাকে।
এমনই অগুনতি আনন্দময় স্মৃতি আমাকে তাড়িত করছে। হীরের দ্যুতির মতো বার্লিনের আলোকময় পথ দিয়ে ছুটছে আমাদের কার। যাচ্ছি এয়ারপোর্টে। মাটির মায়া এমনই, চেনা ঘর ছেড়ে যখন দূরদেশে যাই কিংবা পরদেশ থেকে নিজের ঘরে ফেরার সময় হৃদয় বেদনায় রক্তক্ষরণ হতে থাকে বুকের ভেতরে।
আলো ঝলোমলো টেগেল এয়ারপোর্টে চেক ইনকাউন্টারে দাঁড়াই। ট্রলিতে জিনিসপত্র নিয়ে বোর্ডি কার্ড সংগ্রহ করি। পাশে দাঁড়িয়ে ছেলে ও ওর বন্ধু হাসান। ইমিগ্রেশন কাউন্টারে যাবার সময় ছেলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। কান্না থামছেই না।
ইমিগ্রেশন অফিসার কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন, তুমি কাঁদছ কেন?
কান্না-ভাঙা গলায় ছেলে বলে, মা-বাবা চলে যাচ্ছেন। ইমিগ্রেশন অফিসার পিঠে হাত বুলিয়ে বলেন, যাচ্ছেন তাতে কী? তোমার সঙ্গে তো আবার দেখা হবে। আমার যে মা-বাবা কেউ নেই।
বুকের ভেতর বেহাগ সুরে যেন কেঁদে যায়। এক সময় ডিপারটার লাউঞ্জে গিয়ে বসি। অ্যানাউন্সমেন্ট হলে কাতার এয়ারলাইনসের বিমানে রানওয়েতে পাক খেয়ে এক সময় আকাশে ডানা মেলে বিমান বর্ণালি আলোতে রাতের বার্লিন মোহময়ী হয়ে উঠেছে। জানালা দিয়ে তাকাই অবুঝ ছেলেটির মুখ দেখার জন্য। ঝাপসা চোখে কিছুই দেখতে পাই না। আলোর ঝালরে হারিয়ে যাচ্ছে বিভাময়ী বার্লিন। মহাশূন্যের পথ ধরে ভাসতে থাকি। সঙ্গী শুধু মেঘের গুচ্ছ আর চাঁদ। আললে গুটে- ভালো থেকো হে বার্লিনবাসি! শুভ রাত্রি জানাই, বিদায় চাও-গুডে-নাক্ত- শুভ রাত্রি।