আসাদ চৌধুরী (১৯৪৩) বাংলা সাহিত্যে বহুমুখী প্রতিভার নাম। কবিতায় নিজস্ব ভাব ও ভঙ্গি, শিশুসাহিত্যে শিশুদের আনন্দময় জগৎ সৃষ্টি, অনুবাদে আপন ঘরানা তৈরি, সম্পদনায় বিচিত্রতা আনয়ন এবং আবৃত্তি-উপস্থাপনায় সাবলীল স্বরের কারুকাজ আসাদ চৌধুরীকে আপন মহিমায় উজ্জ্বল করেছে। তবে তিনি বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নিভৃতচারী এক স্বজ্জন। নান্দনিক কাব্যভাষা সৃজনে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন তিনি। তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙ্ক্তিতে রয়েছে বহুমাত্রিকতা; রয়েছে সচেতনতা ও সমকালীন ভাবনা। সদা হাস্যোজ্জ্বল একজন মানুষ তিনি। তাঁর জানা-অজানা ব্যক্তিজীবন আমাদের খুব সহজেই আকৃষ্ট করে তাঁর সম্পর্কে জানতে। সেই জিজ্ঞাসা নিয়ে ‘সপ্তাহের সাতদিন’ পত্রিকার সম্পাদক বাদল চৌধুরীর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় উঠে আসা কিছু কথা।
বাদল চৌধুরী : কবিতা লিখতে শুরু করলেন কবে?
আসাদ চৌধুরী : অল্প বয়সে শ্লেট-পেন্সিলে অনেক কবিতা লিখেছি। কাগজেও যে দু-একটি লিখিনি, তা নয়। ওগুলো খোয়া গেছে বলে আমার কোনো আফসোস নেই। ছাপার অক্ষরের কবিতার কথা যদি বলি, সেটি সম্ভবত নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ের ঘটনা। ঢাকার ‘চিত্রাকাশ’ পত্রিকায় কাজ করতেন আমার চাচাতো ভাই সালাহউদ্দিন চৌধুরী। একবার তাঁর পত্রিকায় অল্প একটু জায়গা ফাঁকা ছিল। আমাকে ছয় থেকে আট লাইনের একটি কবিতা লিখে দিতে বললেন। লিখে দিলাম। আমার কবিতা পড়ার আগ্রহ তিনি খেয়াল করেছিলেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আজাদ সুলতান আমাকে কবিতা লিখতে বললেন।
বাদল চৌধুরী : প্রথম প্রকাশিত লেখা ও পড়া নিয়ে বলুন?
আসাদ চৌধুরী : ১৯৬১ সালে সংবাদ পত্রিকায় ‘ইতিহাসের আর এক নায়ক’ শিরোনামে আমার প্রথম কবিতা প্রকাশ হয়। রণেশ দাশগুপ্ত ‘সংবাদ’ পত্রিকার সাহিত্য পাতায় নয়, এডিটোরিয়াল পাতায় এটা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আমার কাছ থেকে বিকেলে লেখা নিয়ে গিয়ে পরদিন সকালে সেটা প্রকাশ করেন। সম্ভবত দেরি করতে চাননি বলে এডিটোরিয়াল পাতায় আমার লেখাটি প্রকাশ করেছিলেন। আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির হলে থাকি। হলে ‘সংবাদ’ পত্রিকাটি আমরা রাখতাম। আমার লেখা প্রকাশ হওয়ার পর বন্ধুরা অনেক উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছিলেন। আমিও মনে মনে অনেক খুশি হয়েছিলাম। পত্রিকায় নিজের নাম বারবার দেখছিলাম।
সাহিত্য মহলে ওঠা-বসা বেড়ে গেল। এ সময়েই ‘খেলাঘর’-এ যুক্ত হলাম। ঘনিষ্ঠতা হলো রফিক আজাদের সঙ্গে। তাছাড়া আমার সহপাঠীরা ছিলেন একেকজন তুখোড় তরুণ-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ, জাহাঙ্গীর তারেক…। এঁদের তুলনা হয় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লেখা প্রকাশিত হলেও, আমার পড়ার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই ছিল। ‘আমাদের নবী’ গল্পটি ছোটবেলায় আমি প্রথম পড়েছিলাম। এরপর ‘জলে জঙ্গলে’ ও আরো অনেক অ্যাডভেঞ্চার ও অনুবাদ বই পড়েছি। স্কুলের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে আমি প্রথম হয়েছি। আর পুরস্কার হিসেবে বই পেতাম।
বাদল চৌধুরী : প্রথম কোন কবিতা পড়ে চমকে ছিলেন? আর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে বলুন?
আসাদ চৌধুরী : ১৩-১৪ বছর বয়সে কাজী নজরুল ইসলামের ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যটি পড়ে চমকে গিয়েছিলাম। এরপর এমন এক অভ্যাস হয়ে গেল-ওপরের ক্লাসের, এমনকি উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকের কবিতাও পড়তে থাকলাম। আমাদের এলাকায় তখন অনেক পত্রপত্রিকা পাওয়া যেত- ‘শিশির’, ‘সওগাত’, ‘মোহাম্মদী’, ‘প্রবাসী’। এগুলোতে ধারাবাহিক উপন্যাস ছাপা হতো। আমরা ভাগ করে চিহ্ন দিয়ে রাখতাম, তারপর ধারাবাহিকভাবে পড়তাম। পড়ার এই অভ্যাসটি খুব সুন্দর ছিল।
সংস্কৃতির দিক দিয়ে বরিশাল অনেক আগুয়ান ছিল। আমার মনে আছে, খুব ভালো বাঁশি বাজাতেন বাসু দা। পুরো নাম সম্ভবত বাসুদেব দাস। পঞ্চানন ঘোষ ছিলেন রাগসংগীতে পারদর্শী। অনেকেই আধুনিক গান গাইতেন। আলতাফ মাহমুদ তখন বরিশালে থাকতেন। এখানেই তিনি গাফ্ফার চৌধুরীর লেখা ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’র সুরটি করেন। যদিও সে সময় তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটেনি। তাঁকে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের সময় একবার দেখেছিলাম। গণসংগীতেরও কয়েকজন বড় শিল্পী ছিলেন বরিশালে। প্রচুর নাটকও হতো। দেখতে যেতাম। কবিতা পাঠের আসরে আমি শ্রোতা হিসেবে বহুবার গিয়েছি। তবে তখনো নিজে লিখিনি কিংবা মঞ্চে উঠে কবিতা পড়িনি।
বাদল চৌধুরী : লেখালেখিতে গতি পেলেন কখন?
আসাদ চৌধুরী : বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষে ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে চাকরি নিই। ছিলাম বাংলার শিক্ষক। তিতাস সাহিত্য সংসদসহ স্থানীয় বিভিন্ন শিল্প-সাহিত্য সংগঠনে জড়িয়ে পড়ি। লেখালেখিও চলতে থাকে। তবে সময় পেলেই দেশের নানা প্রান্তে ছুটে বেড়াতে আমার ভালো লাগত। রফিক আজাদের কল্যাণেই বলা চলে, আমাদের মধ্যে একটা প্রতিজ্ঞা ছিল, ঢাকার কোনো দৈনিক পত্রিকায় লেখা ছাপব না। এরই মধ্যে ১৯৭১ সালে যখন কলকাতা গেলাম, আমি তো অবাক! দেখি কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু দে-এঁরা আমাকে এক নামে চেনেন। তখনো আমার প্রথম বই বের হয়নি। কলকাতার কাগজে বড়জোর দু-তিনটি লেখা ছাপা হয়েছে। অথচ কথাসাহিত্যিক বনফুল আমাকে পরম স্নেহে পাশে বসালেন। লীলা মজুমদার এমন দরদ নিয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন-সেই স্পর্শ আমি কখনোই ভুলব না। এ সময়ই ভেতরে ভেতরে অনুভব করেছিলাম, আমি লিখব। তাই দেশে ফিরে রাতারাতি বন্ধুদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিটি ভঙ্গ করেছি! সমানে লিখতে শুরু করেছি। তবে নিজের বই করার প্রতি আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। বরং বন্ধুদের বই করেছি।
বাদল চৌধুরী : কাদের লেখার দ্বারা আপনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন?
আসাদ চৌধুরী : জসীমউদ্দীন, বন্দে আলী মিয়া, সুকুমার রায়, কাজী নজরুল ইসলাম আমার অনেক প্রিয় লেখক ছিলেন। তাঁদের লেখা আমাকে অনুপ্রাণিত করত। ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের গান আমার ভালো লাগত। কিন্তু তাঁর বই আমি অনেক পরে পড়েছি।
বাদল চৌধুরী : কৈশোরের পঠন কতটুকু আপনার লেখাকে ঋদ্ধ করেছে?
আসাদ চৌধুরী : আমি তখন পঞ্চম কি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ি। রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’ কবিতাটি পড়ে মনে গেঁথে যায়। সম্ভবত, মুক্ত জীবনের একটা স্বাদ পেয়েছিলাম কবিতাটি পড়ে। কারণ, এরপর আমার জীবনে অনেক পরিবর্তন আসে। আমি বইমুখী হয়ে পড়ি। বাড়িতে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল। ছেলেবেলায় সুকুমার রায়ের ‘আবোল তাবোল’, নজরুলের ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘বিষের বাঁশী’ পড়া হয়ে যায়। প্রথম বইটা বাড়িতেই ছিল। নজরুলের বই দুটি দিয়েছিলেন আমার বাবার এক কমিউনিস্ট বন্ধু। তিনি খবরের কাগজে মুড়ে দিয়েছিলেন; কারণ আমি ছিলাম মাদ্রাসার ছাত্র। সময়টাও ছিল উত্তাল। এরপর আরও অনেক বই হুড়মুড়িয়ে পড়ে ফেলি, সুকান্তের ‘ছাড়পত্র’, সুভাষের কবিতা। যদিও সেসব কবিতার মানে তখন সেভাবে বুঝিনি। তবে মনের ভিতর একটা আলোড়ন তৈরি হয়েছিল।
বাদল চৌধুরী : লেখালেখিতে কীভাবে এলেন?
আসাদ চৌধুরী : আসলে লেখালেখিতে আসা কোনো আগ্রহ থেকে নয়। আমাদের সময় বই ছিল বিনোদনের একটা মাধ্যম। আমাদের গ্রামের বাড়িতে রেডিও ছিল, আর ছিল বই ও পত্র-পত্রিকা। যার ফলে পড়াশোনাটা হতো ছেলেবেলা থেকেই। ১৯৬০ সালের দিকে, ‘আজাদ সুলতান’ নামে আমার এক মুরব্বি ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, প্যাট্রিস লুমুম্বা মারা গেছে তুমি আমাকে কবিতা দাও। বরিশালে তার ইমদাদীয়া লাইব্রেরি ছিল। ওই দোকান থেকে আমি কবিতার বই কিনতাম। তিনি ভাবতেন, যেহেতু আমি কবিতার বই পড়ি, হয়তো আমি কবিতা লিখতে পারব। তখন প্যাট্রিস লুমুম্বাকে নিয়ে একটি কবিতা লিখি। এমন সময় এক ভদ্রলোক এলেন পাজামা, শার্ট আর চাদর গায়ে দেওয়া। তাকে কবিতাটা দিলেন। তিনি কবিতাটা পড়ে কোনো মন্তব্য না করে পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে চলে গেলেন। লোকটির পরিচয় জানতে চাইলে সুলতান সাহেব বললেন, উনি রণেশ দাশগুপ্ত। আমার বুক কেঁপে উঠল।
আমি ইতোমধ্যে তাঁর লেখা পড়েছি। পরদিনই দৈনিক সংবাদের সম্পাদকীয় পাতায় কবিতাটি ছাপা হয়ে গেল। তারপর, কবিতার মান যাই হোক না কেন, আমি প্রচুর অভিনন্দন পেলাম। এমনকি জেলখানা থেকে কয়েকজন কমিউনিস্ট কর্মী আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সত্যিকার অর্থে লেখালেখি শুরু করেছি মুক্তিযুদ্ধের পর, বুড়ো বয়সে। আমি যখন দেখলাম কবি বিষ্ণু দে, সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাকে নামে চেনেন। তখন সিদ্ধান্ত নিলাম লেখালেখি করব।
বাদল চৌধুরী : আচ্ছা… আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের সময়টা কেমন ছিল?
আসাদ চৌধুরী : আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র ছিলাম। আমার শিক্ষক ছিলেন অধ্যাপক কাজী দীন মুহম্মদ, মুনীর চৌধুরী, মুহাম্মদ আবদুল হাই, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহীম, আহমদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রমুখ। একেকজন ছিলেন দিকপাল। আমি ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর বিভিন্ন বক্তৃতা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আবদুল মান্নান সৈয়দ আমার সহপাঠী ছিলেন। ছাত্র জীবনেই আমরা অসাম্প্রদায়িক চিন্তা করতে শিখেছি। আমরা সাম্প্রদায়িকতা দেখেছি, গণতন্ত্র দেখেছি, বুট ও বেয়নেটের শাসনও দেখেছি। এভাবে শৈশব-কৈশোরের এক বহুমুখী ধারা আমাদের জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।
বাদল চৌধুরী : এত মানুষের ভালোবাসা-সম্মান কেমন লাগে আপনার?
আসাদ চৌধুরী : মানুষ মনে করে এই লোকটাকে সম্মান আমি দিলাম অথবা মানুষ মনে করে এই মানুষটাকে অপমান আমি করলাম, আসলে এটা আল্লাহর ইচ্ছা। আল্লাহ যাকে খুশি সম্মান দেন, যাকে খুশি সম্মান কেড়ে নেন। আলহাম্দুলিল্লাহ, আল্লাহর রহমত মানুষ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে, পছন্দ করে। আমি যা লিখেছি, তার থেকে অনেক বেশি সম্মান আমি পাচ্ছি বলে আমার ধারণা। আমি লিখি, আমি যতটা লিখি তারচেয়ে অনেক বেশি পড়ি।
বাদল চৌধুরী : কি ভাবছেন এখন?
আসাদ চৌধুরী : দীর্ঘদিনের একটা জিজ্ঞাসা আমি কে, অর্থাৎ নিজের সম্পর্কে বোঝার, জানার চেষ্টা করা ।
বাদল চৌধুরী : একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?
আসাদ চৌধুরী : সরাসরি বলি, আমি নিজে খুব ধর্ম নিরপেক্ষ মানুষ। আমি মোটেও নিরপেক্ষ না। আমার দুর্বলতা আছে আমার ধর্মের প্রতি। ইসলামের প্রতি। কাজেই এই অর্থে আমি নিরপেক্ষ নই। কিন্তু আমি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক। আমি সাম্প্রদায়িকতাকে অন্তর থেকে ঘৃণা করি।
বাদল চৌধুরী : আপনি সাংবাদিকতা ও শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে কাজ করেছেন বাংলা একাডেমিতে। সে অভিজ্ঞতা শুনতে চাই।
আসাদ চৌধুরী : আমরা যখন ঢাকায় চলে আসি তখন আমাদের জমিদারি চলে গেছে। পিতামহ খাসজমি অপছন্দ করতেন না বলে উলানিয়ার বড় হিস্যার, অর্থাৎ আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ। আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী তখন আজাদ পত্রিকায় কাজ করেন। তিনিই মাসিক মোহাম্মদীর প্রুফ রিডার হিসেবে আমার চাকরির ব্যবস্থা করলেন। বেতন ষাট টাকা। আমি বোধহয় দুদিন প্রুফ দেখেছি, তিনিই আমার কাজ করে দিতেন, আমার কাজ ছিল বাড়ির গল্প করা, আর চা-পুরি এসব গেলা। এরপর জয়বাংলা পত্রিকায় কিছুদিন কাজ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এমএ পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার আগেই আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে যোগ দেই। সেখানে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭২ পর্যন্ত শিক্ষকতা করি। আবার দৈনিক জনপদে সাংবাদিকতা। ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ আমি জার্মানিতে ডয়েচে ভেলেতে কাজ করি। কর্মজীবনে দারুণ সব অভিজ্ঞতা আমার।
বাদল চৌধুরী : আপনার প্রথম বই প্রকাশ হয় কখন?
আসাদ চৌধুরী : প্রথম বই ‘সংগ্রামী নায়ক বঙ্গবন্ধু’। প্রবন্ধের এই বইটি বাংলা একাডেমি থেকে বের হয়েছিল ১৯৭৫ সালের মার্চে। বইটি বঙ্গবন্ধু অনেকক্ষণ ধরে নেড়েচেড়ে দেখেছিলেন। প্রথম কবিতার বইও একই বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত হয়-‘তবক দেওয়া পান’।
বাদল চৌধুরী : আপনার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘তবক দেওয়া পান’ বইটি বেশ প্রশংসিত হয়।
আসাদ চৌধুরী : ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছর বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতা থেকে নির্বাচিত কবিতার সংকলন ‘তবক দেওয়া পান’। রফিক আজাদ, শহীদ কাদরী-এঁদের জন্যই বইটি আলোর মুখ দেখেছে। রফিক তখন বাংলা একাডেমিতে আমার সহকর্মী। বাংলা একাডেমি সিদ্ধান্ত নিল, ২০টি করে কবিতা নিয়ে তরুণ কবিদের বই প্রকাশ করা হবে। তালিকায় আমিও পড়ে গেলাম। কিন্তু ২০টি কবিতা কোথায় পাব? কবিতা গুছিয়ে রাখার অভ্যাস আমার নেই! তখনকার দিনে ফটোকপি করার সুযোগও ছিল না। তবে আমার বন্ধুভাগ্য ভালো। ১৯৭০-এর দশকে যাঁরা লেখালেখি করতেন, সেই অনুজ বন্ধুরা বিভিন্ন জায়গায় ছাপা হওয়া আমার লেখাগুলো কপি করে এনে দিলেন। এভাবে কিছু কবিতা জড়ো করা গেল। আমার নিজের একটি টাইপরাইটার ছিল। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ছিলেন বানানে দক্ষ। কবিতাগুলো তাই তাঁকে দিয়েই টাইপ করিয়েছিলাম।
লেখাগুলো নির্বাচন করে দিয়েছিলেন কবি রফিক আজাদ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অরুণাভ সরকার ও আবদুল মান্নান সৈয়দ। কাজেই খারাপ হওয়ার কথা ছিল না। খারাপ যদি হয়ে থাকে সে আমার লেখার দোষে। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর অনেক শুভাশিস যেমন পেয়েছি, ঠিক বিপরীতে সমান সমালোচনাও পেয়েছি।
বাদল চৌধুরী : আপনার তো অনেক বই, এর মধ্যে কোনটি বেশি পছন্দের?
আসাদ চৌধুরী : হুম, অনেক বই…।
তবে ‘তবক দেওয়া পান’ বইটি আমি দীর্ঘদিন বালিশের কাছে রেখে ঘুমিয়েছি। এই বইয়ের গোটা তিনেক কবিতায় আমার গ্রামীণ জীবনকে পাওয়া যায়। লোকসংগীতের অনেক অনুষঙ্গও রয়েছে এখানে। প্রকৃত অর্থে বইটির বেশ কিছু কবিতা, বিশেষত ‘আয়না’র প্রথম দুটি লাইন আমাদের বাসায় কাজ করা এক নারীর কাছ থেকে ধার নেওয়া। তিনি মরিচ বাটার সময় যে বুলি আওড়াতেন, আমি হুবহু সেই পঙ্ক্তি রেখে দিয়েছি। এগুলো কতটুকু কবিতা হয়েছে- ঠিক জানি না।
বাদল চৌধুরী : আপনি প্রচুর অনুবাদ করেছেন।
আসাদ চৌধুরী : অনুবাদ আমাকে স্বস্তি দেয়। এখনো সময় পেলে আমি অনুবাদ করার চেষ্টা করি। লেখার ফাঁকে এই অনুবাদ আমার একটা খেলার মতো। অন্য ভাষার প্রতি আমার আগ্রহ বরাবর একটু বেশি। ইংরেজি কিংবা উর্দু থেকে অনুবাদের চেষ্টা করেছি। বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, কবীর চৌধুরীসহ অনেকের অনুবাদ আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছে। হাতে সময় ও সামর্থ্য থাকলে হয়তো আরও ভাষা শিখতাম। আরও অনুবাদ করতাম। তা ছাড়া আমি বিশ্বাস করি, প্রত্যেক লেখকের একাধিক ভাষা জানা থাকা ভালো।
বাদল চৌধুরী : আপনি তো সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন, এ নিয়ে কিছু বলুন?
আসাদ চৌধুরী : আমার লক্ষ্য তরুণ সমাজ। এদের জন্য প্রচুর লিখছি। বিজ্ঞানভিত্তিক বই লিখেছি। পৃথিবীর বহু ফোকলোরের লেখা অনুবাদ করেছি। পেইন্টিংয়ের ওপর লিখেছি, যেন নতুন প্রজন্ম উৎসাহিত হয়। চলচ্চিত্র নিয়েও অল্প-বিস্তর লেখালেখি করেছি। কাজ করার ক্ষেত্রে আরেকটি প্রিয় বিষয় আছে আমার, সেটির কথা এই-ই প্রথম কাউকে বলছি : বাঙালি মুসলমান। এ বিষয়টি আমি আহমদ ছফার কাছ থেকে ধার করেছি। তিনি ধার করেছিলেন অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কাছ থেকে। ধার করেও নিজে থেকে কিছুদিন অনুশীলনের খুব চেষ্টা করেছিলাম। তারপর আর হয়ে ওঠেনি! কিন্তু একেবারেই যে হাল ছেড়ে দিয়েছি, তা নয়। এখনো মাঝেমধ্যে চর্চা করি। বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়াই আমার অনুসন্ধানের লক্ষ্য। নিজের চিন্তাগুলো তরুণদের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। অসাম্প্রদায়িকতার ভাবনা আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে ভাবতে শিখেছি। আমার যে অসাম্প্রদায়িকতা, সেটির সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের অসাম্প্রদায়িকতার মিল নেই। মিল হোক-সেটা চাইও না। আমার অসাম্প্রদায়িকতা হবে একজন বাঙালি ও বাংলাদেশি মুসলমানের প্রেক্ষাপট থেকে। ধর্মীয় কারণে কোনো মানুষকে অন্য কোনো ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্র ও সমাজের কাছ থেকে যেন বিন্দুমাত্রও মর্যাদাহানির শিকার হতে না হয়-এটি নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব। তরুণদের আমি বিজ্ঞানমনস্ক হিসেবে দেখতে চাই। তবে বাংলাদেশে যে লাখ লাখ শিক্ষার্থী মাদরাসায় পড়াশোনা করে-এ বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। স্রেফ ঢাকায় বসে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে যাওয়া-এটি মোটেও বাংলাদেশের প্রকৃত চেহারা নয়। গ্রামের উন্নয়ন হচ্ছে ঠিকই, অবনতিও হচ্ছে। তারপরও, আমার শৈশব-কৈশোরের মতো এখনো সেই লালিত্য, মাহাত্ম্য, লাবণ্য, মাধুর্যভরা গ্রাম কিন্তু গ্রামই রয়ে গেছে। আমি সেটি উপলব্ধি করি।
বাদল চৌধুরী : তরুণ কবিদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?
আসাদ চৌধুরী : তরুণ কবিরা এখন ভালো করছেন। তাঁরা অনেক শিক্ষিতও। কবিতায় তাঁরা ফরাসি ও স্প্যানিশ শব্দও ব্যবহার করছেন। তাঁরা অনেক বেশি জীবন সন্ধানী।
বাদল চৌধুরী : আপনি তো প্রকাশকও ছিলেন?
আসাদ চৌধুরী : সেই অর্থে প্রকাশক বলা যাবে না। তবে লেখালেখি করে, রেডিও-টেলিভিশনে কবিতা পড়ে যে টাকা পেতাম, সেগুলো নষ্ট করতাম না। বরং জমিয়ে রেখে বন্ধুদের বই ছাপতাম। ১৯৬৫ সালে আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ প্রকাশ করেছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাহবুব সাদিক, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, মিলন মাহমুদসহ আরো অনেকের বই করেছি। এসব করে কিন্তু একটা টাকাও ফেরত আসেনি; তবু তৃপ্তি নিয়ে করেছি।
বাদল চৌধুরী : বন্ধুদের সঙ্গ কেমন ছিল?
আসাদ চৌধুরী : ব্যক্তিজীবনে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। রফিক আজাদও খুব কাছের ছিলেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের সঙ্গে একই সঙ্গে দূরত্ব ও ঘনিষ্ঠতার একটি মধুর সম্পর্ক ছিল। অন্যদিকে আমাদের আক্ষরিক অর্থেই সবচেয়ে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। আমরা ছিলাম তুমুল আড্ডাবাজ। আড্ডার মূল জায়গা ছিল মধুর ক্যান্টিন। তা ছাড়া বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন, বিউটি বোর্ডিং-এসব জায়গায়ও প্রচুর আড্ডা দিয়েছি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া থাকার সময়, ছুটির দিন আড্ডার টানে, ট্রেনে চেপে ঢাকা চলে আসতাম। বাংলাদেশে সিনেমা তখনো তত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তবু আমরা ছিলাম সিনেমার পোকা। ‘নাজ’ সিনেমা হলে আমি, ইলিয়াস, মোহাম্মদ মোজাদ্দেদ, ওয়াজেদ মাহমুদ এবং আরো বন্ধুরা প্রচুর ইংরেজি সিনেমা দেখেছি। ১৯৬৫ সালের দিকে ভারতীয় বই, সিনেমা ইত্যাদি আসা বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় রাজ্জাক, কবরী, শাবানা আমাদের কাছে আস্তে আস্তে প্রিয় হতে থাকেন। ‘সুতরাং’ সিনেমাটি আমি আর রফিক আজাদ বেশ কয়েকবার দেখেছি। একদিন ঢাকা হলের পুকুরপারের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রফিক হুট করেই কবরীর মতো লাফাতে আর গাইতে শুরু করলেন-পরানে দোলা দিলো এ কোন ভোমরায়/সে যে ফুলের বনে গুঞ্জরিয়া যায়/হায় কী করি উপায়/বলিতে শরম লাগে…!’ রফিকের সেই চেহারা এখনো আমার চোখে ভাসে।
বাদল চৌধুরী : বিখ্যাত বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কোনো স্মৃতি যদি বলতেন-
আসাদ চৌধুরী : আমি দেখেছি সৈয়দ শামসুল হক বিউটি বোর্ডিংয়ের রুমে বসে অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য করেছেন। বাংলা নাটকের প্রথম মিউজিক ডিরেক্টর সমর দাস তিনি প্রায় প্রতিদিন সেখানে যেতেন। শহীদ কাদরী, বেলাল চৌধুরীও যেতেন। শুধু লেখকরা নন, অনেক নায়কও সেখানে যেতেন। তবে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদের মতো কবিরা সেখানে বসে থাকলে আমি খুব একটা যেতাম না। দূর থেকে তাঁদের দেখতাম।
বাদল চৌধুরী : আপনার ভাবনাগুলো আমাদের পাঠকদের সাথে শেয়ার করেন।
আসাদ চৌধুরী : আমাদের দেশে কিছু অতিরিক্ত মিথ্যাচার হয়, সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও হচ্ছে, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মিথ্যাচার হয়। বাড়িয়ে বলার চেষ্টা হয়। তোমার সামনে বলতে আমার লজ্জাও হচ্ছে তবু বলছি জানানোর জন্য, আমেরিকাতে প্রতিদিন কি পরিমাণ নারী ধর্ষণ হয় সেগুলো নিয়ে কিন্তু খবরের কাগজে একটা লাইন বের হবে না। প্রতি শনিবার কানাডাতে হাইওয়ে গাড়ি পিঁপড়ার মতো যাচ্ছে, এক্সিডেন্ট হচ্ছে কিন্তু এগুলো কোনোদিন টেলিভেশনেও আসে না। খবরের কাগজেও আসে না। অপরাধীকে প্রশ্রয় দিতে দিতে সমাজ এমন এক জায়গায় এসে পৌঁছেছে যে, অপরাধীদের হাত এখন অনেক বেশি শক্তিশালী এবং তারা এখন আইন-টাইন কিছু পরওয়া করে না। এটর্নি জেনারেলকে হুমকি দিচ্ছে, ওমুককে হুমকি দিচ্ছে, ফেইসবুক আরেকজনের নামে চালাচ্ছে। আমার মনে হয়, যত টেকনোলজি হচ্ছে, অপরাধের পরিমাণ ততই বাড়ছে। এগুলো এখন আমার ভাবনার প্রধান বিষয়।