ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে (১৮২০-১৮৯১) আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করছি তাঁর দ্বিশততম জন্মবর্ষে। তাঁর কীর্তি মহান। বাংলাদেশে যে রুগ্ন বাস্তবতায় আজ আমরা আছি তাতে সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় উত্তরণের জন্য নানা অপরিহার্য কাজের সঙ্গে তাঁর কীর্তির শরণ নেওয়াও আমাদের জন্য অপরিহার্য। আনুষ্ঠানিকতা নয়, দরকার তথ্যনিষ্ঠ অনুসন্ধান, সত্যসন্ধ বিচার-বিবেচনা, সুদূরপ্রসারী ভবিষ্যতদৃষ্টি ও সৃষ্টিশীল অনুষ্ঠান। জাতীয় জীবনে ও বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রগতির প্রয়োজনে ও মহান নতুন সৃষ্টির জন্য অতীতের মনীষীদের মহান কীর্তি থেকে প্রেরণা লাভের দরকার হয়।
বিদ্যাসাগরের কাল আর আমাদের এই কাল নানা দিক দিয়ে একেবারেই ভিন্ন। বাংলার এক অংশে আমরা আছি, আর এক অংশ ভারতে। দুই বাংলার অবস্থা দুই রকম। ভাষা আছে। একালের অনেক কিছুই সেকালে ছিল না এবং সেকালের অনেক কিছুই আজ বিস্মৃত। এজন্য আজকের বাস্তবতায় বিদ্যাসাগরকে ও তাঁর কালকে বোঝা একটু কঠিন। সেকালের অভিজ্ঞতাকে একালের প্রয়োজনে কাজে লাগানো কঠিন হলেও এর প্রয়োজন খুব বেশি। বাংলা ভাষার দেশে আদিকাল থেকে চলমান জনপ্রবাহ আমাদের ঐতিহ্য চেতনায় আছে এবং তাকে রক্ষা করে চলতে হবে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ থেকে দুই স্বতন্ত্র চেতনা চলছে। আগে ঘটনাবলি যখন যেভাবে ঘটেছে সেইভাবে জানতে হবে।
বিদ্যাসাগরের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও তাঁর বিভিন্ন কর্ম নিয়ে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করা যায় এবং সে ধরনের আলোচনার দরকার আছে। অপরদিকে তাঁর সমগ্র জীবন ও সকল কর্মকে একসঙ্গে বিবেচনা করাও অপরিহার্য। অংশগুলোকে সমগ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত রূপে এবং সমগ্রকে বিভিন্ন অংশের সম্মিলন রূপে বিবেচনা করা সমীচীন। অংশ ও সমগ্র দুটোর কোনোটিকে বিবেচনার বাইরে রাখলে ভুল করা হয়।
ব্রিটিশ-শাসিত বাংলার ও ভারতের রাজধানী কলকাতায় দেখা দিয়েছিল এক নবচেতনা। তাতে বাংলায়, এবং ভারতেও, পর্যায়ক্রমে মানুষের চিন্তা ও কর্মের ধারায় আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। বাংলা ভাষার দেশে পলাশির যুদ্ধকালে, ১৭৫৭ সালে, হিন্দু-মুসলমানের চিন্তা-চেতনা ও অবস্থা কোথায় ছিল, আর ভারত ভাগ, বাংলা ভাগ ও পাঞ্জাব ভাগের কালে, ১৯৪৭ সালে, তাদের চিন্তা-চেতনা ও অবস্থা কোথায় উত্তীর্ণ হয়েছিল, তা স্মরণ করলে বোঝা যায়, ব্রিটিশ-শাসিত বাংলায় পরিবর্তন ছিল যথার্থই যুগান্তকারী। রবীন্দ্রনাথের ‘কালান্তর’ ও আরও কোনো কোনো প্রবন্ধে, কার্ল মার্কসের ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসন’ ও ‘ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ভবিষ্যত ফল’ প্রবন্ধ দুটোতে, সুশোভন সরকারের ‘বাংলার রেনেসাঁস’ ও কাজী আবদুল ওদুদের ‘বাংলার জাগরণ’ গ্রন্থে, অন্নদাশঙ্কর রায় ও শিবনারায়ণ রায়ের গ্রন্থাবলিতে এবং দেশী-বিদেশী আরও অনেকের অনেক লেখায় এই পরিবর্তনের ও পরিবর্তিত অবস্থার উজ্জ্বল সব বর্ণনা আছে। বাংলার রেনেসাঁস নিয়ে অনুসন্ধিৎসা ও অনুসন্ধান থেমে নেই। কিছু লোকে অস্বীকার করলেও এ-কথাটিকে ঠিক মনে করার বহু কারণ পাওয়া যায় যে, ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় ঘটেছিল এক অসাধারণ বৌদ্ধিক জাগরণ, যা অভিহিত হয়েছে বাংলার রেনেসাঁস বলে। ঈশ্বচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কর্মজীবন কেটেছে এই রেনেসাঁসের উত্তাপের মধ্যে। কর্মক্ষেত্রে তাঁর আত্মপ্রকাশের তিন দশক আগে রামমোহনের (১৭৭২- ১৮৩৩) চিন্তা ও কর্মের মধ্য দিয়ে এই রেনেসাঁসের সূচনা।
বিদ্যাসাগরের জীবন ও সৃষ্টিকে বুঝবার চেষ্টা নানাভাবে করা যায়। আজকের বাস্তবতায় যেটা দরকার তা হল, সেদিনের রেনেসাঁসের ধারায় তাঁকে বুঝবার চেষ্টা করা। বিগত রেনেসাঁসকে ফিরিয়ে আনা যাবে না; তবে নতুন রেনেসাঁসের সম্ভাবনা আছে। দরকার নতুন সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করা। নতুন বাস্তবতায় নতুন রেনেসাঁসের প্রকৃতি অবশ্যই ভিন্ন হবে। বিগত প্রায় চার দশকের মধ্যে ব্যক্তি, জাতি রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থা বদলে গেছে। দেখা দিয়েছে এক সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক অবস্থা। এই বদলে যাওয়া বাস্তবতার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন সভ্যতা সৃষ্টি করতে হবে।
বাংলায় উনিশ শতকে বিগত রেনেসাঁসের সূচনা ঘটেছিল ধর্মসংস্কার ও সমাজসংস্কার আন্দোলন এবং আধুনিক সাহিত্য সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। এসবের দ্বারা ক্রমে মানুষের জীবন ও পরিবেশ বদলে গিয়েছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের নাম একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। এঁদের সঙ্গে জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, মেঘনাধ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু – এ নামগুলোও অবশ্যস্মরণীয়। শিক্ষাচিন্তার, শিক্ষাব্যবস্থার পুনর্গঠনের ও নবচেতনা সৃষ্টির ক্ষেত্রে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নামও সামনে আসে। অক্ষয়কুমার দত্ত, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, মধুসূদন, দ্বিজেন্দ্রলাল, শরৎচন্দ্র ও নজরুলের সৃষ্টিসম্ভারও অবশ্য স্মরণীয়। বেগম রোকেয়া, এস. ওয়াজেদ আলি, মোহাম্মদ লুৎফর রহমান, হুমায়ুন কবির, রেজাউল করীম, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহের হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী প্রমুখের মধ্যেও রেনেসাঁসের স্পিরিটকেই কার্যকর দেখা যায়। বাংলায় মুসলমানসমাজ ও হিন্দুসমাজ বিকশিত হয়েছে স্বতন্ত্র চিন্তা-চেতনা নিয়ে। মুসলমান সমাজে নবচেতনা দেখা দিয়েছে হিন্দুসমাজের তুলনায় প্রায় শতবর্ষ পরে। রেনেসাঁসের ধারায় বিশ শতকের প্রথম দশকেই দেখা দিয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু ও এ কে ফজলুল হকের আত্মপ্রকাশও ঘটেছিল বৌদ্ধিক জাগরণের ও গণজাগরণের এই ধারা ধরেই। রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ, অরবিন্দের চিন্তাও রেনেসাঁসের প্রভাবে উদ্দীপ্ত। বিশ শতকের মধ্যকালে অবস্থান ঘটেছে ব্রিটিশ শাসনের ও জমিদারি ব্যবস্থার।
রেনেসাঁসে ভালোর সঙ্গে মন্দও ছিল। দেশে শিল্প প্রতিষ্ঠা ও শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ অল্পই হয়েছে। হিন্দু-মুসলমান বিরোধ রাজনীতিতে গিয়ে দাঙ্গায় রূপ নিয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনের অবসানের সময় ভারত ভাগ, পাঞ্জাব ভাগ ও বাংলা ভাগ হয়েছে। এই অপঘাত ও নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও রেনেসাঁসের মহান দিকটাকেই আমরা অনেক বড় মনে করি। ওই রেনেসাঁস আমাদের মনে আজকের পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টির আগ্রহ জাগায়। বর্তমানে আমরা এক সভ্যতার সঙ্কটের মধ্যে আছি। সঙ্কট থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সঙ্কটের সূচনা ও বিকাশ সম্পর্কে আমাদের অনুসন্ধিৎসা ও অনুসন্ধান দরকার।
কলকাতা ছিল বাংলার এবং সারা ভারতেরও রাজধানী। প্রতিভাবান ব্যক্তিদের এক মহামিছিল দেখা দিয়েছিল ব্রিটিশ-শাসিত বাংলায়। তাঁরা নানাভাবে একে অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং সামনে চলেছেন। নতুন সৃষ্টির তথা জীবন ও পরিবেশকে নবায়িত করার প্রবল তাগিদ ছিল তাঁদের অন্তরে। এই মহামিছিলে যাঁদেরকে আমরা পাই বিদ্যাসাগর তাঁদেরই একজন। তাঁর সামনে, পাশে, পেছনে রামমোহন ও ব্রাহ্মসমাজ, রাধাকান্ত দেব ও ধর্মসভা, হিন্দু কলেজ ও ডিরোজিও-ডেভিড হেয়ার, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তত্ত্ববোধিনী সভা, অক্ষয়কুমার দত্ত, হিন্দুমেলা, বঙ্কিমচন্দ্র, রামকৃষ্ণ পরমহংস ও বিবেকানন্দ না থাকলে – সর্বোপরি ব্রিটিশ শাসন না থাকলে – যে বিদ্যাসাগরকে আমরা পাই, তাঁকে পেতাম না। অন্যরকম পরিমণ্ডলে তিনি অন্যরকম হতেন। কারণ-করণীয়-করণ ও ফলাফলের সূত্র ধরে ঘটনাপ্রবাহকে বিবেচনা করলে এবং তার মধ্যে বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্মকে দেখলে আমরা তাঁর সৃষ্টি ও কর্মকে, তাঁর মহত্ত্ব ও সীমাবদ্ধতাকে এবং ত্রুটি-বিচ্যুতিকে বুঝতে পারব। রেনেসাঁসের উত্তাপকে বাদ দিয়ে কেবল তাঁর জীবন নিয়ে তাঁকে ভালো রকম বোঝা যায় না।
দেশ-কালের পটভূমিতে বিদ্যাসাগরের সুবিশাল ব্যক্তিত্ব, সৎসাহস, সুদৃঢ় আত্মমর্যাদাবোধ, লোকহিতব্রত, হৃদয়ের কোমলতা, পরদুঃখকাতরতা ও দানশীলতা ইত্যাদির কথা উল্লেখ করে মধুসূদন থেকে সত্যেন্দ্রনাথ পর্যন্ত বহু কবি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহবশে অসাধারণ সুন্দর সব কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ও রামেন্দ্রসুন্দর স্বল্প পরিসরে তাঁর চারিত্রের যে পরিচয় প্রকটিত করেছেন তা অবিস্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথ ‘বিদ্যাসাগরচরিত’ প্রবন্ধে স্বল্প পরিসরে বিদ্যাসাগরের ব্যক্তিত্ব ও কর্ম সম্পর্কে প্রয়োজনীয় প্রায় সব কথাই উল্লেখ করেছেন। আজ আমাদের অবস্থার কথা ভেবে, একটু দীর্ঘ হলেও, তাঁর অন্তিম মন্তব্যটি উল্লেখ করছি :
বিদ্যাসাগর এই বঙ্গদেশে একক ছিলেন। এখানে যেন তাঁহার স্বজাতি-সোদর কেহ ছিল না। এদেশে তিনি তাঁহার সমযোগ্য সহযোগীর অভাবে আমৃত্যুকাল নির্বাসন ভোগ করিয়া গিয়াছেন। তিনি সুখী ছিলেন না। তিনি নিজের মধ্যে যে এক অকৃত্রিম মনুষ্যত্ব সর্বদাই অনুভব করিতেন, চারিদিকে জনমণ্ডলীর মধ্যে তাহার আভাস দেখিতে পান নাই। তিনি উপকার করিয়া কৃতঘ্নতা পাইয়াছেন, কার্যকালে সহায়তা প্রাপ্ত হন নাই। তিনি প্রতিদিন দেখিয়াছেন – আমরা আরম্ভ করি, শেষ করি না; আড়ম্বর করি, কাজ করি না; যাহা অনুষ্ঠান করি, তাহা বিশ্বাস করি না; যাহা বিশ্বাস করি, তাহা পালন করি না; ভুরি পরিমাণ বাক্য রচনা করিতে পারি, তিল পরিমাণ আত্মত্যাগ করিতে পারি না; আমরা অহঙ্কার দেখাইয়া পরিতৃপ্ত থাকি, যোগ্যতা লাভের চেষ্টা করি না; আমরা সকল কাজেই পরের প্রত্যাশা করি, অথচ পরের ত্রুটি লইয়া আকাশ বিদীর্ণ করিয়া থাকি; পরের অনুকরণে আমাদের গর্ব, পরের অনুগ্রহে আমাদের সম্মান; পরের চক্ষে ধূলিনিক্ষেপ করিয়া আমাদের পলিটিক্স, এবং নিজের বাকচাতুর্যে নিজের প্রতি ভক্তিবিহ্বল হইয়া উঠাই আমাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য। এই দুর্বল, ক্ষুদ্র, হৃদয়হীন, কর্মহীন, দাম্ভিক, তার্কিক জাতির প্রতি বিদ্যাসাগরের এক সুগভীর ধিক্কার ছিল। কারণ তিনি সর্ববিষয়েই ইহাদের বিপরীত ছিলেন। ….. ক্ষুধিত পীড়িত অনাথ-অসহায়দের জন্য আজ তিনি বর্তমান নাই, কিন্তু তাঁহার মহৎ চরিত্রের যে অবক্ষয়বট তিনি বঙ্গভূমিতে রোপন করিয়া গিয়াছেন তাহার তলদেশ সমস্ত বাঙালিজাতির তীর্থস্থান হইয়াছে। আমরা সেইখানে আসিয়া আমাদের তুচ্ছতা, ক্ষুদ্রতা, নিষ্ফল আড়ম্বর ভুলিয়া সূক্ষ্মতম তর্কজাল ও স্থূলতম জড়ত্ব বিচ্ছিন্ন করিয়া, সরল সবল অটল মাহাত্ম্যের শিক্ষা লাভ করিয়া যাইব। আজ আমরা বিদ্যাসাগরকে কেবল বিদ্যার ও দয়ার আধার বলিয়া জানি-এই বৃহৎ পৃথিবীর সংস্রবে আসিয়া যতই আমরা মানুষ হইয়া উঠিব, ততই আমরা পুরুষের মতো দুর্গমবিস্তীর্ণ কর্মক্ষেত্রে অগ্রসর হইতে থাকিব, বিচিত্র সৌর্য-বীর্য-মহত্ত্বের সহিত যতই আমাদের প্রত্যক্ষ সন্নিহিতভাবে পরিচয় হইবে, ততই আমরা নিজের অন্তরের মধ্যে অনুভব করিতে থাকিব যে বিদ্যা নহে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের চরিত্রের প্রধান গৌরব তাঁহার অজেয় পৌরুষ, তাঁহার অক্ষয় মনুষ্যত্ব; এবং যতই তাহা অনুভব করিব ততই আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ ও বিধাতার উদ্দেশ্য সফল হইবে, এবং বিদ্যাসাগরের চরিত্র বাঙালির জাতীয় জীবনে চিরদিনের জন্য প্রতিষ্ঠিত হইয়া থাকিবে।
রবীন্দ্রনাথ সেদিনের কলকাতার বৌদ্ধিক সমাজ সম্পর্কে যে কটু কথাগুলো লিখেছেন, ঢাকার আজকের বৌদ্ধিক সমাজ সম্পর্কে সেগুলো কতটা খাটে? ঢাকার বৌদ্ধিক সমাজ এখন কেমন? রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী উল্লেখ করেছেন, বাল্মীকি যেমন মরা মরা বলতে বলতে ‘রাম’ উচ্চারণে সমর্থ হয়েছিলেন, পতনশীল বাঙালি জাতি তেমনি বিদ্যাসাগরের মহত্ত্বের স্পর্শ নিজ নিজ সত্তায় অনুভব করতে করতে উত্থানশীল অবস্থায় উত্তীর্ণ হতে পারবে। আজকের ঢাকার বৌদ্ধিক সমাজের দিকে তাকিয়ে ত্রিবেদীর এ-কথাটার অর্থও আমাদের বুঝবার চেষ্টা করা কর্তব্য।
সকলেই জানেন, বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে, মৃত্যু ১৮৯১ সালে কলকাতায়। কলকাতা তখন সব দিক দিয়েই ছিল দ্রুত-বর্ধিষ্ণু। কলকাতায়ই কেটেছে তাঁর কর্মজীবন। তবে শেষ দিকটায় তিনি কলকাতার পরিবেশে বিরক্ত হয়ে, নিজের পরিবার-পরিজনদের প্রতিও বিরক্ত হয়ে, কলকাতা ছেড়ে ছোট নাগপুরের কর্মাটাড়ে সাঁওতাল পরগণায় স্বেচ্ছানির্বাসিত জীবন যাপন করেন।
অসাধারণ কৃতী ছাত্র ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। সংস্কৃত কলেজ থেকে শিক্ষা সমাপনের সময় কলেজ তাঁকে বিদ্যাসাগর উপাধি দিয়েছিল। পরে বিদ্যাসাগর নামেই তিনি অভিহিত হয়েছেন। সংস্কৃত কলেজ থেকে বিদ্যাসাগর উপাধি আরও কেউ কেউ লাভ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা কেউই বিদ্যাসাগর নামে পরিচিত হননি। সংস্কৃত কলেজে শিক্ষালাভ করলেও যে-মন-মানসিকতা তিনি অর্জন করেছিলেন তা হিন্দু কলেজের অগ্রসর চিন্তার শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতার মতো। ইয়ং বেঙ্গলদের স্বাধীন চিন্তাশীলতা ও যুক্তিপরায়ণতাকে তিনি গ্রহণ করেছিলেন। ইউরোপীয় জ্ঞান ও শিক্ষার প্রতি তাঁর ছিল অপরিসীম অনুরাগ ও সন্ধিৎসা। তবে তিনি স্বদেশী ঐতিহ্যে স্থিত থেকে ইউরোপীয় উন্নত ভাবধারাকে গ্রহণ করার নীতি অবলম্বন করেছিলেন। তিনি মনে করতেন বাঙালি ইংরেজ হতে পারবে না, তবে ইংরেজি শিখে বাঙালি উন্নত বাঙালি হতে পারবে। দেশবাসীর মধ্যে তিনি উন্নত বাঙালি হওয়ার চেষ্টা দেখতে চাইতেন। তাঁর নৈতিক চেতনা ও বিচারক্ষমতা প্রখর ছিল। সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে তিনি ইউরোপীয় শিক্ষার আদলে কলেজের শিক্ষানীতির যথাসম্ভব সংস্কার করেছিলেন। ধর্মীয় বিদ্যার সঙ্গে তিনি পার্থিব বিদ্যা যুক্ত করেছিলেন। তিনি চেষ্টা করেছিলেন পার্থিব দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারের জন্য। তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষাকে কেবল ব্রাহ্মণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কায়স্থদের জন্যও উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এর জন্য অনেক বাধা তাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছিল। তিনি কলকাতার বাইরে গ্রামাঞ্চলে বিশটি আদর্শ বিদ্যালয় ও পঁয়ত্রিশটি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাছাড়া প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কয়েকটি কলেজ। যথার্থ শিক্ষানুরাগী ছিলেন তিনি। তিনি অনেক উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক রচনা করেছিলেন। তাঁর পাঠ্যপুস্তক রচনার মর্মেও ছিল ধর্মসংস্কার ও সমাজসংস্কারের মানসিকতা। উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক অক্ষয়কুমার দত্তও রচনা করেছিলেন। বিদ্যাসাগর নিজের মালিকানায় মুদ্রণযন্ত্র ও প্রকাশনালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ছাত্রদের কল্যাণসাধন, শিক্ষাবিস্তার, জ্ঞানানুশীলন ও সাহিত্যচর্চা ছিল তাঁর লক্ষ্য। তবে মুদ্রণযন্ত্র ও প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে তাঁর প্রচুর আয় হত। তিনি বিত্তবান হয়েছিলেন। পাঠ্যপুস্তক রচনার বাইরেও বিদ্যাসাগর বই লিখেছেন; সংস্কৃত, হিন্দি ও ইংরেজি থেকে কিছু বই বাংলায় অনুবাদ করেছেন। এগুলো সাহিত্যমূলক। তাঁর অনুবাদ উৎকৃষ্ট। তিনি উন্নত সাহিত্যরুচি গড়ে তোলার ও উন্নত সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তাঁর রচনাবলি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, উন্নত সাহিত্যবোধের অধিকারী ছিলেন তিনি।
বিদ্যাসাগরকে বলা হয় বাংলা গদ্যের জনক। রামমোহন, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার ও ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতবর্গের গদ্য রচনাবলির মধ্য দিয়ে বাংলা গদ্যের যে বিকাশ ঘটে চলছিল তাতে বিদ্যাসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গতি সঞ্চার করেছিলেন। তিনি একদিকে গ্রাম্য বর্বরতা থেকে এবং অপরদিকে সংস্কৃতবাহুল্য ও সমাসাড়ম্বর থেকে গদ্যকে মুক্ত করেন। বাংলা বর্ণগুলোকে শৃঙ্খলার মধ্যে স্থাপন করে তিনি বাংলা বর্ণমালার যে রূপ দিয়ে যান তা আজও অনুসৃত হচ্ছে। বাংলা গদ্য রচনায় যে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছিল, বাক্যে সুশৃঙ্খল পদবিন্যাসের মাধ্যমে তাতে তিনি শৃঙ্খলা প্রবর্তন করেন। তাঁর গদ্যে ধ্বনিগত সৌন্দর্য লক্ষণীয়। বাংলায় যতিচিহ্নের ব্যবহারও তাঁর রচনাবলির মাধ্যমে পরিচ্ছন্ন রূপ লাভ করে। সর্বোপরি তিনি বাংলা গদ্যকে সাহিত্যোপযোগী শিল্পিত রূপ দান করেন। জাতীয় উন্নতির জন্য উৎকৃষ্ট সাহিত্য সৃষ্টির অপরিহার্যতা তিনি উপলব্ধি করেন এবং নিজের সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সে উদ্দেশ্যে তিনি ভাষাকে উন্নত করেন। বাংলা ভাষাকে উন্নত করার তাগিদ তখন শিক্ষিত সমাজে ছিল।
বিদ্যাসাগর ব্রিটিশ শাসনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতা নিয়ে কাজ করেছেন। রামমোহন থেকে সেকালের সকল মনীষীই এরকম করেছেন। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কাজ করার মতো বাস্তবতা ছিল না। ব্রিটিশ শাসন বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের কালেও ব্রিটিশ সরকারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বাস্তবসম্মত কাজ করার উপায় তখন ছিল না। পরে বিশ শতকের বিপ্লববাদী গুপ্ত সমিতিগুলোর এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মপদ্ধতি ও সাফল্য-অসাফল্যের ব্যাপারটি বিবেচনা করে অবস্থাটাকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে।
বিদ্যাসাগর আর্ত ও পীড়িতের প্রতি সবসময় সহানুভূতিশীল ছিলেন। মানুষের দুঃখ দেখলে অনেক সময়ই তাঁর চোখে অশ্রু দেখা দিত। তিনি দানশীল ছিলেন। তবে দানের ব্যাপারে তাঁর বিচার-বিবেচনা ছিল। তিনি অভিহিত হয়েছেন দয়ার সাগর বলে। বিদ্যাসাগর ও দয়ার সাগর দুটো কথাই চালু ছিল।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় গঠিত তত্ত্ববোধিনী সভার ও তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকে তিনি কাজ করেছেন। তাঁর চেষ্টা ছিল সামাজিক সমস্যাবলির সমাধান ও সমাজপ্রগতি। দেবেন্দ্রনাথ যখন আধ্যাত্মিকতার দিকে বেশি ঝুঁকে যেতে থাকেন তখন তিনি তা থেকে সরে যান। অক্ষয়কুমার দত্ত তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সম্পাদক ও তত্ত্ববোধিনী পাঠশালার শিক্ষক ছিলেন। নিজের মত নিয়ে তিনি দৃঢ় ছিলেন। ফলে দেবেন্দ্রনাথ, অক্ষয়কুমারের এই দৃঢ়তা পছন্দ করতেন না। অসুস্থতার কারণে তিনি তত্ত্ববোধিনী থেকে সরে যেতে হয়। যাঁরা জীবনী লিখেছেন, তাঁদের অনেকে বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমারকে নিরীশ্বর বলে অভিহিত করেছেন। অনেকে অক্ষয়কুমারকে অজ্ঞেয়বাদী (ধমহড়ংঃরপ) বলেছেন।
বিদ্যাসাগর গভীর মর্মবেদনার সঙ্গে তাঁর সমাজের মেয়েদের দুরাবস্থা লক্ষ করেছিলেন। তিনি বিধবাদের অবস্থা ও হিন্দু বিবাহপ্রথা এবং সমাজের কাম-ব্যবস্থাপনা দেখে বিচলিত হয়েছিলেন। বিধবাদের কেন্দ্র করে যৌন অনাচারের জাজ্জ্বল্যমান বিবরণ তিনি ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কি-না এতদ্বিষয়ক বিচারে’ বর্ণনা করেছেন। তিনি সমাজের জন্য সুস্থ স্বাভাবিক উন্নততর কাম-ব্যবস্থাপনার কথা ভেবেছেন। তিনি বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ বন্ধ করার অভিপ্রায়ে লিখেছেন এবং বিধবাবিবাহ প্রচলনের জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এর জন্য সমাজের শক্তিশালী সব মহল তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়। তীব্র প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা করে অগ্রসর হতে হয়েছিল তাঁকে। প্রতিক্রিয়াশীলরা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে সীমাহীন অপপ্রচার চালিয়েছিল। স্মরণীয় যে, ১৮২০ ও ’৩০-এর দশকে সতীদাহ প্রথা রক্ষা করার জন্য প্রবল আন্দোলন হয়েছিল। বিধবা বিবাহ প্রচলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন তার চেয়ে বেশি হয়েছিল। পুরুষদের লক্ষ করে বিদ্যাসাগর লিখেছিলেন :
তোমরা মনে কর পতিবিয়োগ হইলেই, স্ত্রীজাতির শরীর পাষাণময় হইয়া যায়; দুঃখ আর দুঃখ বলিয়া বোধ হয় না, যন্ত্রণা আর যন্ত্রণা বলিয়া বোধ হয় না, দুর্জয় রিপুবর্গ এককালে নির্মূল হইয়া যায়। কিন্তু তোমাদের এই সিদ্ধান্ত যে ভ্রান্তিমূলক, পদে পদে তাহার উদাহরণ প্রাপ্ত হইতেছে। ভাবিয়া দেখ, এই অনবধান-দোষে সংসারতরু কি বিষময় ফল ভোগ করিতেছ। হায় কি পরিতাপের বিষয়! যে দেশে পরুষজাতির দয়া নই, ধর্ম নাই, ন্যায়-অন্যায় বিচার নাই, হিতাহিত বোধ নাই, সদসদ্বিবেচনা নাই, কেবল লৌকিক রক্ষাই প্রধান কর্ম ও পরম ধর্ম; আর যেন সেদেশে অবলা জাতি জন্মগ্রহণ না করে। হা অবলাগণ! তোমরা কি পাপে ভারতবর্ষে আসিয়া জন্মগ্রহণ কর, বলিতে পারি না।
বিদ্যাসাগরের বক্তব্য প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। মূল্যবোধ, যুক্তি ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর আক্রমণের জবাব দিয়েছেন। এসব লেখার মধ্য দিয়েও তিনি বাংলা গদ্যকে বিকশিত হয়েছে।
বিদ্যাসাগর উদ্যোগী হয়ে বিধবাবিবাহ প্রদানের জন্য বিস্তর টাকা খরচ করেন। বেশ কিছু বাল্যবিধবার বিবাহ তাঁর উদ্যোগে ও প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়। সেকালে হিন্দু সমাজে সাত/আট বছর বয়সের মধ্যে সকলেরই বিয়ে হয়ে যেত। এ-অবস্থায় বাল্যবিধবাদের সংখ্যা অনেক ছিল। বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ও কৌলিন্য প্রথাকে বিদ্যাসাগর অকাল-বৈধব্যের প্রধান কারণ বলে নির্দেশ করেন। প্রবল বিরুদ্ধ পক্ষকে তিনি হিন্দুশাস্ত্র অবলম্বনে যুক্তি প্রদর্শন করে বিধবা বিবাহের পক্ষে আনার চেষ্টা করেন। তাঁর লেখায় আছে :
“অস্মদ্দেশীয় অসদ্ব্যবহার বিষয়ে যদ্যপি সর্বদাই লিখন-পঠন ও পর্যালোচনা হয়, অবশ্যই তন্নিরাকরণের কোনো সদুপায় স্থির হইবেক, সন্দেহ নাই। অনবরত মৃত্তিকা খনন করিলে কতদিন বারি নির্গত না হইয়া রহিতে পারে? কাষ্ঠে কাষ্ঠে অনবরত সংঘর্ষণ করিলে কতক্ষণ হুতাশন বিনিঃসৃত না হইয়া থাকিতে পারে? এবং অনবরত সত্যের অনুসন্ধান করিলে কত দিনই-বা তাহা প্রকাশিত না হইয়া মিথ্যাজালে প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে?”
বিদ্যাসাগর শাস্ত্রের কিংবা ধর্মের বিরুদ্ধে না গিয়ে বরং শাস্ত্রের আশ্রয় নিয়ে বিধবাবিবাহের পক্ষে শিক্ষিত লোকদের মত গঠনের চেষ্টা করেন। তিনি বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, বিধবা বিবাহ শাস্ত্র-বিরোধী নয় – শাস্ত্রসম্মত। তা সত্ত্বেও প্রতিক্রিয়াশীলরা বিদ্যাসাগরকে ধর্মাদ্রোহী বলে অভিহিত করে, এবং তাঁকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। ঘটনাক্রমে তিনি প্রাণে বেঁচে যান এবং বেঁচে থাকার উপায় করেন। বিদ্যাসাগর নিজে বিধবা বিবাহ প্রচলনকে তাঁর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ সৎকর্ম বলে উল্লেখ করেন। বিদ্যাসাগরের মরণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও সেকালে বিধবাবিবাহের প্রচলন অল্পই হয়েছিল। বঙ্কিম বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিলেন না; তবে তিনি বিধবা বিবাহ প্রচলনের আন্দোলনকে অপ্রয়োজনীয় বলে মত প্রকাশ করেছিলেন এবং উল্লেখ করেছিলেন যে, একদিন এটা আপনিতেই চালু হবে। “যে বিধবা বিবাহের ব্যবস্থা দেয় সে যদি পণ্ডিত, মূর্খ কে?” বিষবৃক্ষ উপন্যাসে এ উক্তি সূর্যমুখীর, বঙ্কিমের নয়। সূর্যমুখীর স্বামী বিধবা বিবাহে আকৃষ্ট; তার ফলে তার জীবনে যে কষ্ট, তার জন্য সে বিদ্যাসাগরের প্রতি রুষ্ট। সূর্যমুখীর অভিযোগ, বিদ্যাসাগর তাঁর কষ্ট বুঝতে চাননি। সেজন্যই বিদ্যাসাগরের প্রতি তার কটুক্তি। সূর্যমুখীর সাংস্কৃতিক মান উন্নত নয়।
বিদ্যাসাগরের অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, অপরাজেয় পৌরুষ, সুগভীর আত্মমর্যাদাবোধ, অনন্য সাহস ও প্রখর উপস্থিতবুদ্ধি সম্পর্কে বহু জনশ্রুতি দেশব্যাপী প্রচলিত ছিল, এখনও হয়তো কোথাও কোথাও আছে। এখানে দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি।
কথিত আছে ঘটনাক্রমে বিদ্যাসাগরকে এক ইংরেজ বিচারকের এজলাসে সাক্ষ্য দিতে যেতে হয়েছিল। বিচারক অবজ্ঞাপূর্ণ কণ্ঠে বিদ্যাসাগরকে তাঁর পরিচয় জিজ্ঞেস করেন। বিদ্যাসাগর ধীর অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, উত্তরে হিমালয় পর্বত, দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা, পশ্চিমে কারাকোরাম পর্বতমালা, পূর্বে ব্রহ্মদেশ-মাঝখানের ভূভাগে সকলেই আমাকে চেনে, আমি ঈশ্বরচন্দ্র শর্মা। বলা হয়, উত্তর শুনে বিচারক ঘাবড়ে যান এবং বিদ্যাসাগরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে কথা বলেন। কথিত আছে, সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল থাকা কালে বিদ্যাসাগর একবার ইংরেজ কলেজ ইন্সপেক্টরের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর অফিসে গিয়েছিলেন। ইন্সপেক্টরের কক্ষে ঢুকে দেখতে পান ইন্সপেক্টর সাহেব টেবিলের ওপর জুতাপরা পা তুলে চেয়ারে হেলান দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছেন। বিদ্যাসাগরকে তিনি বসতেও বলেননি। বিদ্যাসাগর দাঁড়িয়েই টেবিলের ওপর পা তোলা সাহেবের সঙ্গে দরকারি কথা বলে এবং প্রাসঙ্গিক ফাইল রেখে চলে আসেন। এই আচরণে বিদ্যাসাগর অপমানিত বোধ করেন এবং কষ্ট পান। মাস তিনেক পরে ঐ ইন্সপেক্টর সংস্কৃত কলেজ পরিদর্শনে আসেন। বিদ্যাসাগর দারোয়ানকে বলে রেখেছিলেন, গেটের কাছে ইন্সপেক্টর সাহেব আসার সঙ্গে সঙ্গে যেন তাঁকে খবর দেয়। সেই মতো দারোয়ান বিদ্যাসাগরকে খবর দিলে বিদ্যাসাগর তাঁর নিজের কক্ষে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় টেবিলের ওপর চটিজুতা পরা পা রেখে খবরের কাগজ পড়তে থাকেন। ইন্সপেক্টর সাহেব ঘরে ঢোকার পরেও বিদ্যাসাগর ঐ অবস্থায়ই থাকেন। ইন্সপেক্টর সাহেব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিদ্যাসাগরের আচরণকে অভদ্রজনোচিত বলে চিৎকার করে ওঠেন। তখন বিদ্যাসাগর উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতি ইন্সপেক্টর সাহেবের পূর্ববর্তী আচরণের কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, এটাকেই তিনি ইংরেজ জাতির ভদ্র আচরণ মনে করে এমন করছেন। বিদ্যাসাগরের কথায় ইন্সপেক্টর সাহেব দুঃখ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, অসতর্ক অবস্থায় সে রকম আচরণ করে তিনি ভুল করেছিলেন।
এমনি আরও বেশকিছু জনশ্রুতি আছে যেগুলোতে বিদ্যাসাগরকে নিয়ে দেশবাসীর গৌরববোধের প্রকাশ আছে। ছোট বড় নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে বিদ্যাসাগর তাঁর বিশাল ব্যক্তিত্ব, দুর্দম সাহস ও প্রখর উপস্থিত বুদ্ধির পরিচয় দেন। বুঝতে হবে যে, সাহসের উৎস সততা। বিদ্যাসাগরকে কেউ কেউ এযাবৎকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বলে অভিহিত করেছেন।
বিদ্যাসাগর যতটা ভাবুক ছিলেন, ততটাই ছিলেন কর্মী। রেনেসাঁসকালের ভাবুকদের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য এই যে, তাঁদের চিন্তা কর্মমুখী, অনেকেই কর্মীও। জীবনকে এবং সামাজিক পরিবেশকে তাঁরা উন্নত করতে চান। জ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যকে তাঁরা সর্বজনীন কল্যাণের ও উন্নত ভবিষ্যতের গঠনকর উপাদান রূপে উপলব্ধি করেন।
বিদ্যাসাগরের মতামত ছিল স্পষ্ট। তাঁর পছন্দ ও অপছন্দও ছিল খুব স্পষ্ট। অতুলনীয় স্বাতন্ত্র্যের কারণে তিনি নিজের পরিবারে এবং কলকাতার বৌদ্ধিক সমাজে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। তিনি অনেকের উপকার করেছেন এবং তাঁদের অনেকের দ্বারা অপকৃত হয়েছেন। ঈর্ষার শিকার হয়েছেন পদে পদে। প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করতে করতে এক সময় তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাঁর শেষ জীবনের একটি উক্তি : “এদেশের উদ্ধার হইতে বহু বিলম্ব আছে। পুরাতন প্রকৃতি ও প্রবৃত্তিবিশিষ্ট মানুষের চাষ উঠাইয়া দিয়া সাতপুরু মাটি তুলিয়া নূতন মানুষের চাষ করিতে পারিলে তবে এদেশে ভালো হয়।” এই উক্তিকে অনেকে হতাশার প্রকাশ মনে করেছেন, আবার কেউ কেউ বিপ্লবাত্মকও বলছেন।
কলকাতায় বিদ্যাসাগরের জীবন সব সময়ই ছিল কর্মময়। শিক্ষা বিষয়ক বহু সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিদ্যাসাগরের শিক্ষাচিন্তা গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায়, পঞ্চাশ বছর বয়সে পৌঁছার আগেই তিনি সকল কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং তাঁর মধ্যে দেখা দেয় বৈরাগ্যভাব। তিনি নিজেই কি নিজেকে নিঃসঙ্গ করে ফেলেছিলেন? ১২৭৬ সালের ১২ অগ্রহায়ণ এক চিঠিতে তিনি মাকে লেখেন :
নানা কারণে আমার মনে বৈরাগ্য জন্মিয়াছে, আর আমার ক্ষণকালের জন্যও সাংসারিক কোনো বিষয়ে লিপ্ত থাকিতে বা কাহারও সহিত কোনো সংস্রব রাখিতে ইচ্ছা নাই। বিশেষত ইদানীং আমার মনের ও শরীরের যেরূপ অবস্থা ঘটিয়াছে তাহাতে পূর্বের মতো নানা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থাকিলে অধিক দিন বাঁচিব এরূপ বোধ হয় না। এ জন্য স্থির করিয়াছি যতদূর পারি নিশ্চিন্ত হইয়া জীবনের অবশিষ্ট ভাগ নিভৃতভাবে অতিবাহিত করিব। এক্ষণে আপনার চরণে এ জন্মের মত বিদায় লইতেছি। মাতার নিকট পুত্রের পদে পদে অপরাধ ঘটিবার সম্ভাবনা। সুতরাং আপনকার শ্রীচরণে কতবার কত বিষয়ে অপরাধী হইয়াছি তা বলা যায় না। এ জন্য কৃতাঞ্জলিপুটে বিনীত বচনে প্রার্থনা করিতেছি, কৃপা করিয়া এ অধম সন্তানের সমস্ত অপরাধ মার্জনা করিবেন। আপনার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যয় নির্বাহের নিমিত্ত মাস মাস যে ত্রিশ টাকা পাঠাইয়া থাকি, আপনি যতদিন শরীর ধারণ করিবেন কোন কারণে তাহার ব্যতিক্রম ঘটিবে না। তদ্ব্যতিরিক্ত আপনার পিতৃকৃত্য ও মাতৃকৃত্যের ব্যয় নির্বাহার্থে বার্ষিক দুইশত টাকা প্রেরিত হইবে। যদি কখনো কোনো বিষয়ে আমায় কিছু বলা আবশ্যক বোধ করেন, পত্র দ্বারা লিখিয়া পাঠাইবেন। আমি অনেকবার আপনকার শ্রীচরণে নিবেদন করিয়াছি এবং পুনরায় শ্রীচরণে নিবেদন করিতেছি, যদি আমার নিকট থাকা অভিমত হয়, তাহা হইলে আমি আপনাকে কৃতার্থ বোধ করিব এবং আপনকার চরণসেবা করিয়া চরিতার্থ হইব।
ঠিক একই ধরনের আরো একটি দীর্ঘ চিঠি ১২৭৬ সালের ২৫ অগ্রহায়ণ তিনি পিতাকে লেখেন। তাতে একথাও তিনি উল্লেখ করেন :
সাংসারিক বিষয়ে আমার মত হতভাগ্য আর দেখিতে পাওয়া যায় না। সকলকে সন্তুষ্ট করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যতœ করিয়াছি, কিন্তু অবশেষে বুঝিতে পারিয়াছি যে সে বিষয়ে কোনো অংশে কৃতকার্য হইতে পারি নাই। “যে সকলকে সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা পায়, সে কাহাকেও সন্তুষ্ট করিতে পারে না।” এই প্রাচীন কথা কোনক্রমেই অযথা নহে, সংসারি লোকে যে-সকল ব্যক্তির কাছে দয়া ও স্নেহের আকাঙ্ক্ষা করে, তাহাদের একজনেরও অন্তকরণে যে আমার উপর দয়া ও স্নেহের লেশমাত্র নাই সে বিষয়ে আমার অণুমাত্র সংশয় নাই। এরূপ অবস্থায় সাংসারিক বিষয়ে লিপ্ত থাকিয়া ক্লেশ ভোগ করা নিরবচ্ছিন্ন মূর্খতার কর্ম। যে সমস্ত কারণে আমার মনে এরূপ সংস্কার জন্মিয়াছে, আর তাহার উল্লেখ করা অনাবশ্যক।
একই ধরনের চিঠি তিনি স্ত্রীকে, পুত্রবধূকে এবং একে একে পরিবারের সকলকে দেন। চিঠির মাধ্যমে পরিবারের সকলের সঙ্গে তিনি সম্পর্ক ছেদ করেন। তবে তাঁদের প্রত্যেকের ভরণ-পোষণের ব্যয়ভার বহন করার প্রতিশ্রুতি তিনি প্রত্যেককে দেন ও প্রতিশ্রুতি মতো কাজ করেন। পুত্রের সঙ্গে তিনি আগেই সম্পর্ক ছেদ করেছিলেন।
এই ঘটনার পরে তিনি আরও প্রায় বাইশ বছর বেঁচেছিলেন। এর মধ্যে তিনি ছোট নাগপুরের কর্মাটাড়ে সাঁওতাল পরগণায় নির্জনবাসের জন্য চলে যান। সেখানে তাঁর কিছু জমি ও বাড়ি ছিল। প্রয়োজনে কলকাতায় আসতেন।
বিদ্যাসাগরের জীবনের এইসব ঘটনা এক মর্মান্তিক ট্রাজেডির পরিচয়বাহী। এই ট্রাজেডির রহস্য বোঝার জন্য অনুসন্ধিৎসা ও অনুসন্ধান দরকার। বিদ্যাসাগরকে, তাঁর দেশ-কালকে, এবং তাঁর অবদানকে বোঝার জন্য এটা একান্ত দরকার। লিখিত জীবনী থেকে মানুষকে কতটাই-বা বোঝা যায়!
বিদ্যাসাগরের জীবনের মাত্র কিছু ঘটনার কথাই এখানে বিক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করলাম। গভীর অধ্যয়ন ও অনুসন্ধান ছাড়া তাঁর জীবন ও কর্মের পরিচয় প্রকটিত করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আশা করি-দ্বিশততম জন্মবর্ষের অনুষ্ঠানাদি বাংলাভাষার দেশে অনেককে তাঁর সম্পর্কে জানতে উৎসুক ও অনুসন্ধিৎসু করবে-সেদিনের রেনেসাঁস পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন রেনেসাঁস সৃষ্টির প্রেরণা হবে।
অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে প্রায় সকল দেশে শাসক শ্রেণিতে যে জীবনযাত্রানীতি কার্যকর আছে, আজকের ইউরোপ-আমেরিকায় তাকে অনেকে বলেন ‘opportunism and hypocrisy’-বাংলায় বলতে পারি সুবিধাবাদ ও মুনাফেকি। নৈতিক চেতনা ঘুমন্ত। সংযম অনভিপ্রেত। কেবল সম্পত্তিলিপ্সা, ক্ষমতালিপ্সা ও ভোগলিপ্সা এখন ব্যক্তি, জাতি, রাষ্ট্র ও বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি। সাধারণ মানুষ, সমাজের নিচের স্তরের নব্বই শতাংশ মানুষ দুর্বল, অসহায়, নিষ্পৃহ, ঘুমন্ত। এই অবস্থা থেকে উজ্জ্বল উদ্ধারের জন্য অপরিহার্য নানা কাজের মধ্যে কালজয়ী মনীষীদের (classic) শরণ নেওয়াও অবশ্যই আছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই মানবজাতি এক সভ্যতার সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছে। মাঝখানে রুশ বিপ্লব (১৯১৭), চিন বিপ্লব (১৯৪৯), আরও কয়েকটি দেশের বিপ্লব, মার্কসবাদের প্রসার এবং উপনিবেশ দেশসমূহের স্বাধীনতা সংগ্রাম ইত্যাদির ফলে ধারণা সৃষ্টি হয়েছিল যে, সঙ্কট কেটে যাচ্ছে, – মানবজাতি বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে প্রগতির ধারা ধরে চলবে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও জীবপ্রযুক্তির বিপ্লব এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবিতপূর্ব অগ্রগতির দ্বারা সৃষ্ট বাস্তবতায় নৈতিক চেতনার নি¤œগামিতার কারণে সৃজ্যমান মহান সবকিছু লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। নতুন প্রযুক্তি নিয়ে জীবনপদ্ধতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার যে পুনর্গঠন দরকার, তা না করার ফলেই এই অবস্থা দেখা দিয়েছে। ক্রমেই মানুষ প্রযুক্তির প্রভু না হয়ে দাস হয়ে চলেছে।
এর মধ্যে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যায়ে সাহিত্য ও শিল্পকলার জগতে কাউন্টার-রেনেসাঁস রূপে দেখা দেয় আধুনিকতাবাদ (modernism), এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পরে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সাহিত্যের সকল ক্ষেত্রে কাউন্টার-রেনেসাঁস রূপে দেখা দেয় উত্তরাধুনিকতাবাদ (post-modernism)। দুটো মতবাদেরই উদ্ভব ফ্রান্সে, এবং সেখান থেকে এগুলোকে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সকল রাষ্ট্রে। আধুনিকতাবাদের মর্মে আছে নৈরাশ্যবাদ (pessimism) ও কলাকৈবল্যবাদ, আর উত্তরাধুনিকতাবাদের মর্মে আছে শূন্যবাদ (nihilism) ও পদ্ধতিসর্বস্বতা (methodology)। বাংলাভাষার দেশে ‘কল্লোল’ ও ‘কবিতা’ পত্রিকার মাধ্যমে যে সাহিত্যান্দোলন পরিচালিত হয়, তা ছিল রেনেসাঁসের পরিপন্থী। ১৯৮০-র দশক থেকে কলকাতায় ও ঢাকায় অনুসৃত হচ্ছে রেনেসাঁসের পরিপন্থী উত্তরাধুনিকতাবাদ। বিশ্বায়ন নামে যে ব্যাপারটি নিয়ে বিশ্বব্যবস্থা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করা হচ্ছে তা আসলে সাম্রাজ্যবাদেরই উচ্চতর স্তর। ১৯৮০-র দশক থেকে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদিকে ব্যর্থ করে যে মৌলবাদ-বিরোধী আন্দোলন, নারীবাদী আন্দোলন ও দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলন চালানো হচ্ছে তার প্রতিক্রিয়ায় পুরাতন সব সংস্কার-বিশ্বাস ও ধর্মের পুনরুজ্জীবন ঘটছে। এসব নিয়ে যাঁরা সন্তুষ্ট, তাঁরা চলমান ধারায় চলুন, তাঁদের উদ্দেশে আমাদের বলার কিছু নেই। আমরা মনে করি, অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তি নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থার পুনর্গঠন ও উন্নত জীবনের জন্য দরকার ভিন্ন অনুসন্ধিৎসা, ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভিন্ন আদর্শ। সে দৃষ্টিভঙ্গি আমরা আয়ত্ত করতে পারব এবং সে আদর্শ আমরা উদ্ভাবন করতে পারব যদি আমরা ইতালির সিনকুয়েসেন্টু, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের রেনেসাঁস, ফ্রান্সের এনলাইটেনমেন্ট এবং জার্মানির রিফর্মেশনের ভাবধারাকে সম্মুখদৃষ্টি নিয়ে, বিশ্লেষণমূলক ও বিচারমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে, নতুন করে বুঝতে চেষ্টা করি। সেই সঙ্গে বাংলার রেনেসাঁসকেও বুঝতে হবে। রুশ বিপ্লব, চিন বিপ্লব এবং উপনিবেশবাদ-বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকেও শিক্ষা নিতে হবে।
আগেকার রেনেসাঁসকে ফিরিয়ে আনা যাবে না, নতুন বাস্তবতায় নতুন রেনেসাঁসের সম্ভাবনা আছে, এই সম্ভাবনাকে উপলব্ধি করতে হবে – বাস্তবায়িত করতে হবে। এ কাজে আগেকার রেনেসাঁসের জ্ঞান আমাদের খুব সহায়ক হবে। আগেকার রেনেসাঁস ছিল মধ্যযুগের গর্ভ থেকে আধুনিক যুগকে মুক্ত করার এবং সকল ক্ষেত্রে নতুন সৃষ্টির প্রয়াস। নতুন রেনেসাঁস হবে আধুনিক যুগের অনাচার, অন্যায়-অবিচার, ভ্রান্তি ও মিথ্যাচার থেকে মুক্তির ও সকল ক্ষেত্রে নবসৃষ্টির প্রয়াস। গণতন্ত্রের নামে কী চলছে? সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে গেল কেন? সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর কী চলছে? আধুনিক যুগের অনাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে মহান সব অর্জনের প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধা রক্ষা করে নতুন রেনেসাঁসের দিকে যাত্রা করতে হবে।
বাংলাভাষায় অধিকাংশ মার্কসবাদী ইউরোপের রেনেসাঁসকে অভিহিত করেছেন বুর্জোয়া ব্যাপার বলে, এবং বাংলার রেনেসাঁসকে তাঁরা অস্বীকার করেছেন। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ এবং ব্রিটিশ শাসিত বাংলার মনীষীদের ভূমিকাকে তাঁরা নিতান্তই ব্রিটিশ সরকারের সহায়ক মনে করেছেন। ইতিহাসের দীর্ঘ পরিসরে বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁরা রেনেসাঁস ও প্রগতির স্বরূপ বুঝতে চেষ্টা করেননি।
পর্যবেক্ষণে গেলে দেখা যায়, মার্কস-এঙ্গেলস ছিলেন ইউরোপের রেনেসাঁসেরই সন্তান। রেনেসাঁসের ভাবধারাকে তাঁরা বিকশিত করতে চেয়েছিলেন দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন ও তার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার কাজে। মার্কস-এঙ্গেলস রেনেসাঁস সম্পর্কে সব সময় অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। রেনেসাঁসের মনীষীদের তাঁরা বুর্জোয়া মনে করেননি, মনে করেছেন কোনো শ্রেণিতে অবস্থান না নিয়ে তাঁরা নিবেদিত ছিলেন সত্যের সন্ধানে ও সর্বজনীন কল্যাণে। মার্কস-এঙ্গেলস মনে করেছেন রেনেসাঁসের মনীষীদের ভাবধারাকে পরবর্তীকালে বুর্জোয়া শ্রেণি নিজের শ্রেণিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছে।
India in Transition গ্রন্থে এম এন রায় রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখের ভূমিকাকে গুরুত্ব দেননি। ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে মধ্যযুগের অবসান-পর্যায়ে এক ক্রান্তিকালে আছে মনে করে তিনি ভারতে এক নতুন দার্শনিক বিপ্লব আশা করেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে, রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের মধ্য দিয়ে বাংলায় ও ভারতে এক ভাববিপ্লব ঘটে চলছিল। তাঁর একটি উক্তি, A philosophical revolution must presede a political revolution in India. এম এন রায়ের এই কথাটিকে তাঁর অনুসারীরা ও মার্ক্সবাদীরা মান্য করেছেন এবং যত্রতত্র উদ্ধৃত করেছেন। ইতিহাসের দিক দিয়ে কথাটি কি ঠিক? ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় ও ভারতে চলমান ভাববিপ্লবকে অস্বীকার করে philosophical revolution কি কোনো সম্ভাবনা ছিল? এম এন রায় ১৯২০-এর দশকে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অবস্থানে ছিলেন, পরে তিনি কমিউনিজম ছেড়ে র্যাডিকেল হিউম্যানিজম প্রচার করেছেন। প্রবাসে অবস্থানকালে ১৯২১ সালে তিনিই ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলাভাষার দেশে কমিউনিস্টদের মধ্যে রেনেসাঁস-বিরোধী মনোভাব আজো আছে। কমিউনিজমের প্রতি যাঁদের বিশ্বাস যত দৃঢ়, রেনেসাঁসের প্রতি তাঁদের বিরোধিতা তত উগ্র। বিশ্বাসের দৃঢ়তা দিয়ে কি সত্য প্রমাণিত হয়? বাংলার রেনেসাঁসকে স্বীকার করে নিয়ে ইংরেজ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জন, জমিদারি ব্যবস্থার বিলোপ সাধন ও তার পরে সমাজতন্ত্র অভিমুখী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হলে মার্কসবাদের অনুশীলন সাফল্যের দিকে যেত।
রেনেসাঁসের ধারণা, ইউরোপে রেনেসাঁস চলাকালে, ইতিহাসের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের মধ্যে দেখা দিয়েছে। রেনেসাঁসের স্রষ্টারা জানতেন না যে তাঁরা রেনেসাঁস ঘটিয়ে চলছেন। এ ধারার পরবর্তী স্রষ্টারাও পূর্বধারণা না নিয়েই চিন্তা ও কাজ করেছেন। ইতিহাসের গভীর জ্ঞান থাকলেই রেনেসাঁসের রূপ ও প্রকৃতিকে বোঝা সম্ভব। কলকাতা থেকে প্রকাশিত Samsad English-Bengali Dictionary-তে renaissance শব্দের বাংলা করা হয়েছে নবজন্ম (new birth), নবজীবন লাভের মতো ব্যাপার (to be born again)। ইতিহাসের কোনো কোনো পর্যায়ে প্রত্যেক জাতির জীবনেই নবজন্ম বা নবজীবন লাভ দেখা যায়। প্রত্যেক জাতির ইতিহাসেই স্বর্ণযুগ ও অন্ধকার যুগ আছে। রেনেসাঁসের ধারণার নানামুখী বিকাশ আছে। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্কও আছে। আমরা বিষয়টিকে সদর্থে দেখার পক্ষপাতী।
ইউরোপের এই নবজন্ম বা নবজীবন লাভের সূচনায় আরবদের থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সভ্যতার জ্ঞান খুব সহায়ক। ইউরোপে চতুর্দশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিভিন্ন জাতির মধ্যে নানা নামে নানাভাবে রেনেসাঁসের ভাবধারা বিকশিত হয়েছিল। বাংলার রেনেসাঁসের সূচনায় ইউরোপের রেনেসাঁসের প্রভাব কাজ করেছিল। ইউরোপে এবং ভারত উপমহাদেশেও রেনেসাঁস বিকশিত হয়েছে প্রত্যেক জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী – নবসৃষ্টির ধারা ধরে। অষ্টাদশ শতাব্দীর বাংলার বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ড ও সৃষ্টির সঙ্গে ব্রিটিশ শাসিত বাংলার বৌদ্ধিক কর্মকাণ্ড ও সৃষ্টির পার্থক্য বুঝতে চেষ্টা করলে বাংলার রেনেসাঁসের রূপ ও প্রকৃতি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়। রামমোহন ও তাঁর উত্তরসাধকদের (১৭৭২-১৮৩৩) এবং বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩১) ও তাঁর উত্তরসাধকদের ধর্মসংস্কার ও সমাজসংস্কার আন্দোলন ও সাহিত্যসৃষ্টির মধ্য দিয়ে বাংলার হিন্দুসমাজ ও মুসলমানসমাজ ক্রমে যে অবস্থা লাভ করেছিল তা নবজন্ম নয় তো কী? আন্দোলন নানা ধারা ধরে বিকশিত হয়েছে এবং এসবের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির ও জাতির নবজীবন লাভ হয়েছে।
রেনেসাঁসের মধ্য দিয়ে ইউরোপে মানুষ ঈশ্বরকেন্দ্রিক, বাইবেলকেন্দ্রিক, গির্জাকেন্দ্রিক, রাজতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণাকে পেছনে ফেলে মানুষকেন্দ্রিক, দর্শন-বিজ্ঞান-সাহিত্যকেন্দ্রিক, জাতীয়-আইনসভাকেন্দ্রিক ধ্যান-ধারণাকে অবলম্বন করেছে। ইউরোপীয়দের ভারতে আসার সমুদ্রপথ আবিষ্কার, কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, উত্তরমেরু ও দক্ষিণমেরু আবিষ্কার, অন্ধকারাচ্ছন্ন আফ্রিকার রহস্যউদ্ঘাটন ইত্যাদির মর্মেও কাজ করেছে রেনেসাঁসের স্পিরিট। শোষণ-পীড়ন-প্রতারণা থেকে মুক্তির উপায় রেনেসাঁসের মনীষীরা সন্ধান করেছেন। তবে তাঁরা কৃষক-শ্রমিকদের রাজনৈতিক শক্তিতে আস্থাশীল হতে পারেননি। রেনেসাঁসের মর্মে ছিল জিজ্ঞাসা, অনুসন্ধিৎসা ও নবসৃষ্টির তাড়না। বাংলার রেনেসাঁসের মনীষীদের চেতনায়ও এসব ছিল। রেনেসাঁসের মধ্যে পৃথিবীকেই স্বর্গে উন্নীত করার আকাক্সক্ষা দেখা দিয়েছিল। দুই বিশ্বযুদ্ধের ধারায় মানবজাতি যে সঙ্কটে পড়েছে, তাতে রেনেসাঁস ক্ষীণপ্রাণ হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে দেখা দিয়েছে আধুনিকতাবাদ, উত্তরাধুনিকতাবাদ, নারীবাদী আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন ইত্যাদি। গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ ইত্যাদিকে করে দেখা হয়েছে অর্থহীন। এই অবস্থাতেই আমরা নতুন রেনেসাঁসের সম্ভাবনা দেখি এবং নতুন রেনেসাঁস আকাঙ্ক্ষা করি। নতুন রেনেসাঁস সূচিত না হওয়া পর্যন্ত পুরাতন সংস্কার-বিশ্বাসের সাময়িক পুনরুজ্জীবন চলতে থাকবে। নতুন রেনেসাঁস প্রত্যেক জাতির ভেতরে এবং গোটা মানবজাতির মধ্যে দেখা দিক- এটাই কাম্য।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর দ্বিশততম জন্মবর্ষে এসব প্রশ্ন যদি বাংলাদেশ এবং পশ্চিম বাংলায় বৌদ্ধিক সমাজের বিবেচনায় আসে এবং এ-ধারায় চিন্তার অগ্রগতি চলে, তা হলে তা অশেষ কল্যাণের কারণ হবে। এই ধারার চিন্তায় প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে সকল মহাদেশে সকল জাতির মধ্যে।