লালন শাহ (১৭৭২/১৭৭৪-১৮৯০) হিন্দু না মুসলিম এ নিয়ে বিবাদের অন্ত নেই। অন্ত নেই লালনের জন্মস্থান নিয়ে দ্বন্দ্বের। লালন বাউল না ফকির এ নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। চলছে লালনের সাম্প্রদায়িকতা আর অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে শোরগোল। শুধু কি তাই? লালনের ধর্মান্তরিত হওয়া নিয়েও নানা মত। লালন দর্শন নিয়ে তো রীতিমতো হট্টগোল পড়ে গেছে। একেক জন একেক ভাবে লালনকে ব্যাখ্যা করেছেন। তবে ব্যাখ্যাকারদের বেশির ভাগই লালনকে ধারণ করতে পারেননি। লালনকে ধারণ করার মতো উদারতা তাদের মাঝে তৈরি হয়নি বলেই এই বিপত্তি। অনেক বড় মাপের লালন গবেষকের বই পড়ে দেখলাম উনারা লালনকে নিজ চিন্তার আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন। লালনের আলোকে লালনকে ব্যাখ্যা করার মতো লালন গবেষক এখনো আমাদের নজরে আসেনি। আবার যারা সাঁই আছেন তাঁরা এসব নিয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। যদিও মানুষের ব্যক্তিজীবনের চেয়ে তার কর্মই বড় তবুও আমরা ব্যক্তিজীবন না হাতড়ে থাকতে পারি না। মানবের এই দুর্বলতা হয়তো থেকেই যাবে। আমরা বিষয়টি একটু বিশ্লেষণ করে দেখব। লালন আসলে কেমন ছিলেন? যেহেতু একজন ব্যক্তিকে জানার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট পন্থা তাঁর সৃষ্টিকর্ম, তাই আমরা লালনের সৃষ্টিকর্মের আলোকে তাঁকে খোঁজার চেষ্টা করবো।
লালনের জন্মসাল, জন্মস্থান এবং ধর্মমত নিয়ে সমস্যা বেশি। আমরা আলোচনার সুবিধার জন্য কয়েকজনের মতামত উল্লেখ করলাম:
অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর মতে ‘লালন সাঁই ১৭৭৪ সালে বর্তমান কুষ্টিয়া (তৎকালীন নদীয়া) জেলার অধীন কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গড়াই নদীর তীরবর্তী ভাঁড়ারা গ্রামে (চাপরা গ্রাম সংলগ্ন) জন্মগ্রহণ করেন। সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়স্ত পরিবারের সন্তান লালনের পিতা-মাতার নাম যথাক্রমে মাধব কর ও পদ্মাবতী।’
বসন্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘জন্মস্থান গৌর নদীর তীরে ভাঁড়ারায়-কুষ্টিয়া হইতে গৌর নদী বাহিয়া পূর্বদিকে অনুমান এক ঘন্টা চলিলে দক্ষিণ তীরে শ্যাম বট-বিটপী বিশোভিত গ্রাম ভাঁড়ারা, ভাণ্ডারিয়া শব্দের অপভ্রংশ: হইতেই এই ভাঁড়ারা শব্দের উৎপত্তি হইয়াছে। মহাত্মা লালন ফকিরের কর্মজীবনের সূচনা এই গ্রামে।’
উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘কুমারখালি থানার অধীন কুষ্টিয়া হইতে চার-পাঁচ মাইল দক্ষিণ-পূর্ব কোণে গোরাই নদীর তীরবর্তী ভাঁড়ারা গ্রামে লালনের জন্ম।’
অধ্যাপক মুহম্মদ আবু তালিব বলেন, ‘প্রচলিত ধারণা অনুসারে লালন হিন্দু-সন্তান, পরে মুসলমান হন।’ তাঁর মতে, লালনের জন্মস্থান যশোরের হরিশপুর গ্রাম।
খোন্দকার রিয়াজুল হকের মতে, ‘কবি লালন শাহ ১১৭৯ বঙ্গাব্দের (১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৭ অক্টোবর), ১ কার্তিক, ঝিনাইদহ জেলার হরিণাকুণ্ডু থানার হরিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দরীবুল্লাহ দেওয়ান, মাতার নাম আমিনা খাতুন এবং পিতামহের নাম গোলাম কাদির দেওয়ান। দরিবুল্লাহ ছিলেন তিন পুত্রের জনক। তাঁদের নাম যথাক্রমে আলিম, কলম ও লালন। বয়সে লালন ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ’।
এস এম লুৎফর রহমান মনে করেন, ‘লালন মুসলিম বংশোদ্ভূত ছিলেন’। তাঁর মতে, লালনের জন্ম হরিশপুরে।
দুদ্দু শাহ, তাঁর লালন জীবনীতে লেখেন…
এগারোশো ঊনআশি কার্তিকের পহেলা।
হরিশপুর গ্রামে সাঁইর আগমন হইলা।।
যশোহর জেলাধীন ঝিনাইদহ কয়।
উক্ত মহকুমাধীন হরিশপুর হয় ।।
গোলাম কাদির হন দাদাজি তাহার
বংশপরম্পরা বাস হরিশপুর মাঝার।।
দরিবুল্লাহ দেওয়ান তার আব্বাজির নাম।
আমিনা খাতুন মাতা এবে প্রকাশিলাম।
লালন শাহ ১৭৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন এই মত যারা প্রদান করেছেন তারা ভিত্তি ধরেছেন লালনের মৃত্যু সালকে। লালন ১৮৯০ সালে মৃত্যুবরণ করেছেন এই তথ্য আমরা জানি পাক্ষিক ‘হিতকরী’ পত্রিকা থেকে। হিতকরী ১৮৯০ সালের ৩০ শে অক্টোবর সংখ্যাতে লালনের মৃত্যু সংবাদ প্রকাশিত হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘ইনি ১১৬ বৎসর বয়সে গত ১৭ই অক্টোবর শুক্রবার প্রাতে মানবলীলা সংবরণ করিয়াছেন।’ এই পত্রিকায় ১৮৯০ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন এই তথ্য থেকে আমরা লালনের জন্মসাল বের করে নিয়েছি। কিন্তু লালন ১১৬ বছর বেঁচে ছিলেন এই বিষয়ে ‘হিতকরী’ পত্রিকা কোনো তথ্য বা প্রমাণ দিতে পারেনি। এ ছাড়া অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণও আমরা পাই না। সে হিসেবে ১৭৭৪ সালেই তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন এই তথ্য আমরা অনায়াসে মেনে নিতে দ্বিধায় পড়ি। আবার লালনের শিষ্য দুদ্দু শাহ এর মতে, ১১৭৯ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক লালন জন্মগ্রহণ করেন। দুদ্দু শাহ ছিলেন লালনের খুব প্রিয় শিষ্য। দুদ্দু শাহ প্রখর যুক্তিবান, বিচক্ষণ এবং জ্ঞানী মানুষ ছিলেন। লালনের গানের যে বিশ্লেষণ তিনি দিতেন তাতে লালন তাঁর প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন এটা আমরা জানতে পারি। কিন্তু লালন নিজের জন্ম সম্পর্কে কোনোদিন তাঁর সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন কিনা তা আমাদের অজানাই রয়ে গেছে। তিনি কিভাবে জানলেন লালন ১১৭৯ বঙ্গাব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন? ১১৭৯ বঙ্গাব্দ মানে ইংরেজি ১৭৭২ সাল। লালনের অন্যান্য শিষ্যদের কাছ থেকেও আমরা তেমন কোনো তথ্য পাই না। সুতরাং লালন ১৭৭২ সালে নাকি ১৭৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন তা এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেলো।
লালনের জন্মস্থান নিয়ে একই সমস্যা বিরাজমান। কুষ্টিয়ার কুমারখালির ভাঁড়ারায় লালনের জন্ম, এই মত যারা প্রকাশ করেছেন, তাদের মতকে সঠিক বলে নিশ্চিন্ত হওয়ার মতো কোনো শক্তিশালী যুক্তি তাঁরা দিতে পারেননি। আবার যেসব গবেষক লালনের বাড়ি ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডের হরিশপুরে বলেছেন তারা দুদ্দু শাহের লেখা লালন জীবনীকে অবলম্বন করেই এই মত প্রদান করেছেন। ধারণা করা হয় লালনের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে ১৮৯৬ সালে দুদ্দু শাহ লালনের জীবনী রচনা করেন। ১৪৮ পঙক্তিতে পয়ার ছন্দে লেখা সংক্ষিপ্ত জীবনী এটি। তবে এ জীবনী নিয়ে বর্তমান যুগের বেশ কিছু গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের ধারণা এ লেখা দুদ্দু শাহের নয়। অবশ্য দুদ্দু শাহের নয় বলে তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা অত্যন্ত দুর্বল। আর যদি এ লেখা দুদ্দু শাহের হয়ে থাকে তাহলে লালনের জন্ম, জন্মস্থান, এবং ধর্মমত নিয়ে একটা জটিল সমস্যার সমাধান আমরা পেতে পারি। কারণ দুদ্দু শাহের কথাকে বিশ্বাস করার মতো অনেক যুক্তি আছে। প্রথমত তিনি লালনের শিষ্য এবং বিশ্বাসভাজন শিষ্য। দ্বিতীয়ত লালনের গানের যে ব্যাখ্যা তিনি দিতেন তাতে লালনের সায় ছিলো এবং এজন্য লালন তাকে অনেক বেশি ভালোবাসতেন। শুধু তাই নয়, দুদ্দু শাহের দেয়া ব্যাখ্যায় লালন মুগ্ধ হতেন। যেহেতু লালন তাঁকে বিশ্বাস করতেন তাই কোনো সময় লালন দুদ্দু শাহকে নিজের জন্ম সম্পর্কে বলতেও পারেন (এটা নিছক অনুমান)। তৃতীয়ত, দুদ্দু শাহ লালন সম্পর্কে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর মতো ব্যক্তিত্ব নন। তিনি একান্তই লালন সাধক। এবং নিজেও সেই ধারায় গান রচনা করে গিয়েছেন। যদি দ্দ্দুু শাহকে বিশ্বাস করি তাহলে লালনের জন্ম ১৭৭২ সালে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডের অন্তর্গত হরিশপুর গ্রামে। তিনি জাতে মুসলমান। এবং তিনি ১১৮ বছর বেঁচেছিলেন। তাঁর পিতার নাম দরিবুল্লাহ দেওয়ান এবং মাতার নাম আমিনা খাতুন। এ ছাড়াও কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়াতে যে জমি লালনের নামে আছে সেই জমিনের দলিলে তাঁর পিতার নাম দেয়া আছে দরিবুল্লাহ দেওয়ান। সে হিসেবে দুদ্দু শাহের বক্তব্য অনেকটা যৌক্তিক। আর যদি আবুল আহসান চৌধুরী, বসন্ত কুমার পাল প্রমুখদের বিশ্বাস করি তাহলে লালনের জন্ম ১৭৭৪ সালে কুষ্টিয়ার কুমারখালির অন্তর্গত ভাঁড়ারা গ্রামে। তিনি জাতিতে হিন্দু এবং তাঁর পিতার নাম মাধব কর, মাতার নাম পদ্মাবতী।
দুদ্দু শাহের মতকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় কিছুটা অমিল এখানে উল্লেখযোগ্য। যেমন লালনের পিতা যদি দেওয়ান হন তাহলে লালন নিজেকে ফকির বলে বার বার উল্লেখ করেছেন কেন? একজন দেওয়ানের ছেলে কিভাবে ফকির হতে পারে? আবার লালন নিজেকে দীন বা দরিদ্র বলেও পরিচয় দিয়েছেন। সেটা কিভাবে সম্ভব? তখনকার দেওয়ানদের যে প্রতিপত্তি ছিলো তার সঙ্গে মেলালে লালনের দীন বা দরিদ্র কিংবা অধীন অথবা ফকির হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর দেওয়ানের ছেলে কিভাবে একজন পালকি বাহককে গুরু মেনে সারা জীবন তার আদর্শ মেনে চলতে পারেন বা মানতে পারেন? এটা প্রায় অবিশ্বাস্য। আবার যদি সুফিবাদের আলোকে চিন্তা করি তাহলে সব কিছুই সম্ভব। কারণ যিনি আল্লাহর রঙে রঙিন হবেন তিনি পালকি বাহক কেন ডোমের কাছেও দীক্ষা নিতে পারেন। যার প্রমাণ আমরা পাই হাবসি গোলাম বেলালকে ধরে এনে ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন বানানোর মধ্যে। আর যিনি আল্লাহর কাছে নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছেন তিনি ফকির বা দীন কিংবা দরিদ্র সবই হতে পারেন। কারণ ইসলাম অনুসারে আল্লাহর কাছে সবাই গরিব, সবাই ফকির, সবাই দীন। সুফিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করলে আসলে আমরা সবাই দরিদ্র। আবার আমরা সবাই ধনী। যিনি মহান রবের কাছে নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে পারেন তার কাছে প্রতিপত্তি কোনো কিছুই নয়। প্রতিপত্তির মোহ এবং লিপ্সা যিনি ত্যাগ করতে পারেন তিনিই সুফি হতে পারবেন।
লালন যদিও জাতের ফাতা সাত বাজারে বিকিয়ে দিয়েছেন তবুও আমরা লালনকে জাতে ফেলতে ব্যস্ত। কেউ তাঁকে কায়স্ত প্রমাণ করতে চান কেউ মুসলমান। তবে পুরো লালন সঙ্গীত বিশ্লেষণ করলে তাঁকে বৌদ্ধও বলা যায় এমনকি জৈনও বলা যায়। আসলে ভারতবর্ষে বিদ্যমান সকল ধর্মের আধ্যাত্মিক রূপটি লালন আপন অন্তরে ধারণ করেছিলেন। যদিও আমরা লালনকে শুধু হিন্দু বা মুসলমান হিসেবে প্রমাণ করতে চেষ্টা করি। মুুসলমান হিসেবে যারা প্রমাণ করতে চান তাদের কাছে তথ্যের অভাব নেই। নিম্নে লালনের কয়েকটি গানের অংশ বিশেষ তুলে দেয় হলো :
১
অজান খবর না জানিলে
কীসের ফকিরী
যে নূরে নূরনবী আমার
তাঁহে আরশ বারী।।
বলব কি সেই নূরের ধারা
নূরেতে নূর আছে ঘেরা
ধরতে গেলে না যায় ধরা
যৈছরে বিজরী।।
২
জানা উচিত বটে দুটি নূরের ভেদ বিচার
নবীজী আর নিরূপ খোদা
কীরূপে তার নূর প্রচার।।
৩
আদমেরে পয়দা করে
খোদ সুরতে পরওয়ারে
মুরাদ বিনে সুরত কিসের
হইল হঠাৎকার।।
৪
যে নূরে মোহাম্মদ হয়
খাতুনে জান্নাত কি সেই নূরে নয়
সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার
কোথায় নূরের বসত ছিল।।
৫
অপারের কাণ্ডারি নবীজী আমার
ভজন সাধন বৃথা গেল দ্বীনের নবী না চিনে
আউয়াল আখের জাহের বাতেন
কখন কোন রূপ ধারণ করেন কোনখানে।।
আসমান জমিন জলাদি পবন
যে নবীর নূরেতে সৃজন
কোথায় ছিলো নবীজীর আসন
নবী পুরুষ কি প্রকৃতি আকার তখনে।।
৬
আলিফ লাম মিমেতে
কোরান তামাম শোধ লিখেছে
আলিফে আল্লাহজি
মিম মানে নবী
লামের হয় দুই মানে
এক মানে হয় শরায় প্রচার
আরেক মানে মারফতে।।
৭
কী আইন আনিলেন নবী
সকলের শেষে
রেজাবন্দি সালাত জাকাত
পূর্বেও তো জাহের আছে।।
৮
নবী দ্বীনের রসুল
নবী খোদার মকবুল
ঐ নাম ভুল করিলে
পড়বি ফ্যারে
হারাবি দুই কুল।।
৯
‘লা কুম দ্বীনু কুম’
এ কথা বলে কোরানে
কোন নবীর কেমন আইন
জানবি তার মানে ।।
কোন নবীর হলো ওফাত
কোন নবী হয় বান্দার হায়াত
কোন নবী হলো
কাণ্ডারি দেখ দেলমদিনে।।
১০
লা-ইলাহা কলেমা পড়
ইল্লাল্লাহু দম শুমারে ধর
দম থাকিতে আগে মর
বোরাক বসিয়ে বামে
এরকম আরো অসংখ্য গান লালনের আছে। ইসলাম ধর্মের মৌল ভিত্তিগুলোর একবারে ভেতরে প্রবেশ করতে পেরেছিলেন লালন। সৃষ্টির সূচনা থেকে অর্থাৎ আদম (আ.) থেকে মোহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত নবীদের আগমনের ধারা এবং তাদের মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার যে চেষ্টা বা আল্লাাহর বাণী প্রচারের যে চেষ্টা তা লালন তার গানে ইসলামিক ব্যাখ্যা অটুট রেখেই বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি যদি মুসলিম ঘরে জন্মগ্রহণ না করেন তাহলে তিনি ইসলামের এতসব গূঢ় তত্ত্ব জানলেন কিভাবে? ইসলামি চিন্তাবিদ তথা ইসলামের ওপর যারা গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন তাদের চেয়েও লালন ইসলামের সর্বাধুনিক ব্যাখ্যা প্রদান করলেন কী করে? তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার খবর আমাদের কাছে প্রায় অজানাই রয়ে গেছে। তবে তিনি যে স্বশিক্ষিত ছিলেন এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। খোদার নূরে রাসুল সৃষ্টির ইতিহাস কিংবা রাসুলের নূর আর খাতুনে জান্নাতের নূরের মধ্যে সাদৃশ্য কল্পনা সাধারণ ইসলামি চিন্তাবিদরাও করতে পারে না। ইসলাম অনুসারে হযরত মোহাম্মদ (সা.) কে সৃষ্টি করার কারণেই যাবতীয় সৃষ্টি। তাকে সৃষ্টি না করলে কোনো কিছুই সৃষ্টি করা হতো না। লালন চমৎকারভাবে তার গানে ইসলামের এই মর্মবাণীকে প্রচার করেছেন। আলিফ লাম মিমের ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনার ঝড়। ইসলামি গবেষকরা কোরানের এই তিনটি বর্ণের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে যেখানে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানে লালন অনায়াসে তার ব্যাখ্যা প্রদান করছেন। এখনো এই তিন বর্ণ নিয়ে মাওলানাদের মধ্যে বিতর্ক বিরাজমান। তারা যদি লালন পড়তেন হয়তো এই বিতর্কের একটা সমাধানে আসতে পারতেন। তাছাড়া ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের প্রতি লালনের আনুগত্যও লক্ষ্য করা যায়। তিনি তার গানে কালেমা ও নামাজ পড়ার জন্য বলেছেন, বলেছেন হজ করার জন্য, রোজা রাখার জন্য এবং যাকাত দেয়ার জন্য। একজন মানুষ যদি মুসলিম না হন তাহলে তিনি কিভাবে এসব করার নির্দেশ প্রদান করতে পারেন? ইসলাম বলেছে মোহাম্মদ (সা.) হলেন কাণ্ডারি। তিনি যার জন্য সুপারিশ করবেন তার আখেরাতে কোনো বিচার হবে না। সে বেহিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কোরআন বলেছে, ‘তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসুলের জীবনেই রয়েছে সর্বোৎকৃষ্ট আদর্শ।’ লালন তাই রাসুলের মতো করে জীবন গঠন করতে বলেছেন। রাসুলের প্রেমে দেওয়ানা হতে বলেছেন। রাসুলকে ভালোবাসতে বলেছেন। নবীকে না পেলে মানুষ বিপদে পড়বে- এ একান্তই ইসলামের বাণী। লালন তার গানে এই বাণীকে ফেরি করে বেড়িয়েছেন। রাসুল তার বিদায় হজের ভাষণে প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীদের ধর্মমতকে শ্রদ্ধা জানাতে বলেছেন। আবার কোরআন বলেছে, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন’। লালন তার পুরো জীবনব্যাপী এই বাণীই মূলত প্রচার করেছেন। ইসলামের যারা শরিয়তপন্থী তারা সব সময় লালনকে কাফের ফতোয়া দিয়ে আসছে। লালন মারেফাতে পৌঁছেছেন এটা তারা মেনে নিতে পারেনি। লালন বলেছেন যদি শরিয়ত দিয়ে সব হতো তাহলে রাসুল (সা.) কেন হেরাগুহায় গিয়ে ধ্যানে মগ্ন হলেন? কেনইবা হেরাগুহাতেই তার ওপর কোরআন নাজেল হলো। লালন বলেছেন, যারা নবীকে চিনবে না, নবীর জীবন জানবে না তারা আসলে দিনকানা হয়েই থাকবে। এবং বর্তমানে তাই হচ্ছে। যারা লালনকে মুসলমান বলে দাবি করছেন তারা মোটামুটি এই যুক্তিগুলো উপস্থাপন করেছেন। আর তাদের বক্তব্যের সমর্থনে প্রাসঙ্গিক গানের উদ্ধৃতিগুলোও দেয়া হলো।
লালনকে যারা হিন্দু বলে সাব্যস্ত করতে চাইছেন তারা লালনের কৃষ্ণলীলা, গোষ্ঠলীলা, নিমাইলীলা, গৌরলীলা কিংবা নিতাইলীলা সংক্রান্ত গানগুলোর ওপর অবলম্বন করছেন। লালন রাধা-কৃষ্ণের লীলা সংক্রান্ত যে গানগুলো রচনা করেছেন তা ভজন সঙ্গীত হিসেবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মন জয় করেই চলছে। জীবাত্মা-পরমাত্মার প্রতীকে তিনি রাধা-কৃষ্ণের লীলাকে এমন জীবন্ত করে উপস্থাপন করেছেন তাতে তাকে হিন্দু না ভাবার কোনো কারণ দেখি না। লালনের এই সংক্রান্ত কিছু গানের নমুনা :
১
অনাদির আদি
শ্রীকৃষ্ণনিধি
তার কি আছে কভু গোষ্ঠখেলা
ব্রহ্মরূপে সে
অটলে বসে
লীলাকারী তার অংশকলা।।
২
কোথা রাধে কোথা কৃষ্ণধন
কোথারে তার সব সখীগণ
আর কতদিন
চলিলে সে চরণ পাই ।।
৩
আমার মনের মানুষ নাই যে দেশে
সেদেশে আর কেমনে থাকি
সখী এ জন্যে মোর ঝরে আঁখি।।
দেশের লোকের মন ভালো না
কৃষ্ণের কথা কইতে দেয় না
সদাই আমার মন উতলা
ঘরে কেমনে রাখি ।।
৪
কালার রূপে নয়ন দিয়ে
প্রেমানলে ম’লাম জ্বলে
বিধি এ কী হলো
আমার কাঁদতে কাঁদতে জনম গেলো।।
৫
এখন কেন কাঁদছ রাধে বসে নির্জনে
ও রাধে সেকালে মান করেছিলে
সে কথা তোর নাই মনে।।
৬
এ গোকুলে শ্যামের প্রেমে
কেবা না মজেছে সখী
কারও কথা কেউ বলে না
আমি একা হই কলঙ্কী।।
৭
ওগো বৃন্দে ললিতে
আমি কৃষ্ণহারা হলাম জগতে ।।
ও সখীরে চল চল বনে যাই
বৃন্দাবন আছে কত দূরে
বন্ধুর দেখা নাই
ছাড়িয়া ভবের মায়া
দেহ করিলাম পদছায়া
ললিতে তার পায়ের ধ্বনি শুনিতে।।
৮
একদিন গিয়েছিলাম সেই যমুনার ঘাটে
কত কথা মনে প’লো গো পথে
আমি রাধে সারানিশি কাঁদিয়া বেড়াই
তবু তো দেখা দিলে না।।
৯
সে কালা তো জন্মলয় না
দেবকীর ঘরে
ষোলোশ গোপিনীলীলা নাহি করে
থাকে সে একলা ।।
১০
কালার ঘরে বাতি জ¦লে
অন্ধকার হয় উজালা
ফকির লালন বলে সে কালার নাম
আসলে লা শরিকালা।।
হিন্দু ধর্মানুসারে কৃষ্ণই অনাদির আদি। তিনি বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। কৃষ্ণই মানবরূপে এসে জীবাত্মার সঙ্গে মিশে যান। কৃষ্ণের বিচিত্র রূপ। কখনো যোদ্ধা, কখনো প্রেমিক, কখনো প্রভাবক, কখনোবা গোপবালক। হিন্দু ধর্মানুসারে চারটি যুগের অস্তিত্ব আমরা দেখতে পাই। এগুলো হলো সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি। প্রত্যেক যুগেই কৃষ্ণের জন্ম হয়। কৃষ্ণ এক একযুগে এক এক রূপে রাধাকে পান। রাধাকে পাওয়ার জন্য কৃষ্ণের চেষ্টার অন্ত থাকে না। কৃষ্ণের পাঁচজন প্রধানা স্ত্রী ছাড়াও ষোলোশ গোপিনী আছে। প্রচলিত আছে কৃষ্ণ এদের সবার সঙ্গে রঙ্গ করে বেড়ায়। কিন্তু লালন কৃষ্ণ চরিত্রের সঠিক ব্যাখ্যাই উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে কৃষ্ণ একলা থাকে। কৃষ্ণের জন্মের আগ থেকেই তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। জন্মের পরে কৃষ্ণকে তার বাবা-মা নিজ ঘরে রাখতে পারে না। কারণ দৈববাণী হয় দেবকির অষ্টম সন্তান কংস কে হত্যা করবে তাই কংস দেবকীর সব সন্তানদের হত্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু দৈব ভাবে কৃষ্ণ বেঁচে যায়। তারপর কংস মথুরার সব শিশুকে হত্যা করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু দৈবভাবে আবারো কৃষ্ণ বেঁচে যায়। কিন্তু লালনের মতে কৃষ্ণ দেবকির ঘরে জন্ম নেয় না। কারণ শ্রীমদ্ভগবদগীতায় কৃষ্ণ বলেছেন, ‘যখন ধর্মের গ্লানি এবং অধর্মের অভ্যুত্থান হয় তখন আমি নিজেকে সৃষ্টি করি’। লালন গীতার এই মহাবাণী অনুসারেই কৃষ্ণ চরিত্রের ব্যাখ্যা করেছেন। এখানেই শেষ নয়। আমাদের কাছে সাধরণভাবে কৃষ্ণ এক প্রেমিক পুরুষ। কারণ আমাদের মধ্যযুগের কাব্যগ্রন্থগুলো কৃষ্ণকে সেভাবেই উপস্থাপন করেছে, বিশেষ করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যে। আর মধ্যযুগের গীতি কবিতায় এই প্রেমিক কৃষ্ণই শেষে পরমাত্মায় রূপান্তরিত হয়েছে। প্রথমে রাধা কৃষ্ণকে অবজ্ঞা করলেও মিলনের পর রাধা কৃষ্ণকে চিনতে পারে। কিন্তু ততক্ষণে কৃষ্ণ তাকে ছেড়ে বৃন্দাবনে চলে যায়। রাধা তার সখীদের নিয়ে বৃন্দাবনে যায় কিন্তু কৃষ্ণকে ধরা তার জন্য অসাধ্য হয়ে ওঠে। তখন জীবাত্মা পরমাত্মা এক হওয়ার আকুতিটা বড় হয়ে দেখা দেয়। তাছাড়া রাধা এবং তার সখীরা যখন ¯œান করতে যায় তখন কৃষ্ণ তাদের বস্ত্র চুরি করে। তারা বস্ত্র চাইলে কৃষ্ণ তাদের জানায়, তারা যদি লজ্জাস্থানকে অনাবৃত করে আসেন তাহলে তিনি বস্ত্র ফেরত দেবেন। অর্থাৎ স্রষ্টা এবং সৃষ্টি একই সত্তা। স্রষ্টা এবং সৃষ্টির মাঝে তিনি কোনো তফাৎ রাখেননি। সেখানে কোনো পর্দা থাকবে না। একে অপরের সঙ্গে লীন হয়ে যাবে। লজ্জার কোনো কারণ সেখানে থাকতে পারে না। লালন তার গানে ধর্মের এই বিষয়গুলোকে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করেছেন। তারও আগে আমরা দেখি রাধা যখন রান্না করতে যায় তখনি কৃষ্ণ তার মোহন বাঁশিতে সুর তোলে। তখন রাধা আর ঘরে বসে থাকতে পারে না। ধর্ম কাহিনী-কাব্যকাহিনী এবং প্রচলিত কৃষ্ণ চরিত্রের সম্মিলনে প্রকৃত কৃষ্ণকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন লালন। তাঁর দৃষ্টিতে প্রকৃত কৃষ্ণ আসলে লা শরিকালা। কৃষ্ণ এক এবং অবিনশ^র। হিন্দু ধর্মের এমন গভীরে লালন প্রবেশ করেছেন তা দেখে তাকে হিন্দু মনে হওয়ার যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। কারণ তখনকার যুগে এক ধর্মাবলম্বী অন্য ধর্ম সম্পর্কে অধ্যয়নকে ভালো দৃষ্টিতে দেখতো না।
লালন হিন্দু না মুসলিম এই সমস্যার সমাধান লালন দিয়েছেন। তারপরেও আমরা অযথা বিতর্ক করে চলছি। লালন বলেছেন :
১
সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে
লালন কয় জেতের কী রূপ
দেখলাম না এই নজরে
২
সবে বলে লালন ফকির
কোন্ জাতের ছেলে
কারে বা কি বলি আমি
দিশে না মেলে।।
৩
সব বলে লালন ফকির
হিন্দু কি যবন
লালন বলে আমার আমি
না জানি সন্ধান।।
৪
বিবিদের নাই মুসলমানী
পৈতে নাই যার সেও তো বামনী
বোঝরে ভাই দিব্যজ্ঞানী
লালন তেমনই জাত একখান।।
লালন যখন তাঁর চোখে কোনো ধর্মের রূপ দেখেননি। তখন আমরা তাঁর ধর্মমত নিয়ে টানাটানি করছি কেন? লালন নিজেকে চিনতে পেরেছিলেন। আত্মআলোয় উদ্ভাসিত ছিলো তাঁর মনন। তিনি নিজেকে পরম ঈশ^রের সঙ্গে বিলিয়ে দিয়েছেন। তাই তাঁর কাছে মানুষেই সব। মানুষেই সর্বেস্বর্বা। মানুষই সৃষ্টি, মানুষই বিলয়। তাই লালনের অভিমত-মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি। তাঁর ধর্ম মানবধর্ম। মানুষের ভেতরে যে মানুষ আছে সে মানুষের সাধনাই তাঁর ধর্ম। মানুষের সুপ্ত শক্তির গুপ্তরূপকে বাঙময় করাই লালনের অভিপ্রায়। তিনি নিজেই ভজেন, নিজেই মজেন আবার নিজেই বাজেন, নিজেই বাজান। দেহের ভেতরে যে অদৃশ্য শক্তি আমাদের চালিত করে, আমাদের জাগ্রত করে লালন সেই শক্তির উপাসক। তিনি সেই শক্তিকে ধরার জন্য ব্যাকুল। যদি তাকে ধরতে পারেন তাহলে মনবেড়ি দিয়ে তাকে আটকাতে চেয়েছেন। সেই অচিন পাখির জন্য তিনি অপার হয়ে বসে থাকেন। কবে সেই অচিন পাখির সঙ্গে মিলন হবে, তার ধ্যানে মগ্ন থাকেন। সুতরাং লালনের ধর্ম মননের ধর্ম। লালনের ধর্ম সাধন ধর্ম, লালনের ধর্ম মানবধর্ম। লালন নিজেকে অলখ সাঁই হিসেবে দেখতে চেয়েছেন, দেখতে চেয়েছেন আসল মানুষ হিসেবে, অটল মানুষ হিসেবে, সোনার মানুষ হিসেবে, মনের মানুষ হিসেবে। যেহেতু লালন এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করতে অপছন্দ করতেন তাই আমরা তাঁর প্রতি সম্মান দেখিয়ে এসব আলোচনা থেকে সরে আসতে পারি এবং লালনের সৃষ্টিকর্ম থেকে মানুষ চেনার পদ্ধতি নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পারি। তাহলে লালনের জন্ম ও ধর্ম পরিচয় নিয়ে আমাদের লালন গবেষক এবং অধ্যাপকদের কালো চুল সাদা হওয়ার হাত থেকে রেহায় পেতে পারে।
লালন শাহ বাউল না ফকির এ সংশয়ও দীর্ঘ দিনের। বাউলদের যে জীবনাচার তার সঙ্গে পুরোপুরি লালনের জীবনে যায় না। বাউলের সাধনপদ্ধতি আর লালনের সাধনপদ্ধতিও পুরোপুরি এক নয়। কিছুটা বৌদ্ধধর্মের সহজিয়া ধারার সঙ্গে লালনের সাধন প্রণালির মিল পাওয়া যায়। আবার জৈন ধর্মের আলোকেও লালনকে ব্যাখ্যা করা যায়। বেশি মিল পাওয়া যায় সুফিবাদের সঙ্গে। একটা বিষয় লক্ষণীয় আমাদের বাউলরা তাদের পদের ভণিতায় কোনো না কোনো ভাবে নিজেকে বাউল বলে পরিচয় দিয়ে থাকে। ‘বাউল আব্দুল করিম বলে’ কিংবা ‘বাউল বশির উদ্দিন বলে’ অথবা ‘বাউল আস্কর আলী কয়’ এভাবে তারা নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন। অথচ লালন তার গানে নিজেকে বাউল বলে উল্লেখ করেননি। বারবার তিনি নিজেকে ফকির বলেছেন। কখনো অধীন বলেছেন বা দীন বলেছেন কিন্তু বাউল বলেননি। এর কারণ কী? তাহলে লালন কি বাউল ছিলেন না? অনেকে লালনকে সাধক বলতে চাইছেন। তাহলেও প্রশ্ন জাগে তিনি কিসের সাধক? আত্মতত্ত্বের, বাউলতত্ত্বের নাকি ধর্মীয়? লালনের যে সমাজ ভাবনা বা সামাজিক চিন্তা তাতে তাঁকে ধার্মিক বলা যায় না, যদিও ধর্ম নিয়ে তাঁর অনেক মহৎ বাণী রয়েছে। লালন নিজেকে বাউল না বললেও তাঁর সৃষ্টিকর্ম দিয়ে তাঁকে বাউল হিসেবে প্রমাণ করা যায়। একই ভাবে তিনি বাউল নন তাও তাঁর সৃষ্টিকর্ম দিয়ে প্রমাণ করা যায়। এও প্রমাণ করা যায় তিনি একজন সুফি। আরো প্রমাণ করা যায় তিনি একজন বৈষ্ণব। প্রমাণ করা যায় বৌদ্ধ সহজিয়া ধারার সাধকরূপে। তাঁকে ভারতের একজন তান্ত্রিক হিসেবে ব্যাখ্যা করে প্রমাণ করতেও বেগ পেতে হবে না। বাউল সাধনার যে চার স্তর- স্থুল, প্রবর্ত, সাধক এবং সিদ্ধি। লালনের গানে ধারাবাহিকভাকে এই চার স্তরের বিন্যাস আছে। বিন্যাস আছে প্রেম-কাম-মতি-যতি ধারারও।
সাধক বা সাঁইরা সাধারণত সন্তান নেন না। আগে তারা সন্তান নিলেও সাঁই হওয়ার পর আর সন্তান নেন না। লালন নিজেও সন্তান নেননি। কারণ তাঁদের বিশ^াস সন্তানের মাধ্যমে আত্মা বাহ্যজগতে ঘুরপাক খেতে থাকে; আত্মার মুক্তি মিলে না। তাই আত্মার মুক্তির জন্য তাঁরা সন্তান জন্ম দেয়া থেকে বিরত থাকেন। তবে নারী সাধনা বা যৌনসঙ্গম তারা করে থাকেন। যৌনসঙ্গমের সময় তারা রতিকে নিয়ন্ত্রণ করে পুনরায় দেহে প্রবেশ করান। তাঁদের মতে রতি সাধনার সর্বোচ্চ পর্যায়ে সহজ মানুষ এসে উপস্থিত হয় তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করে পুনরায় দেহে প্রবেশ করানোই সাধকদের কাজ। যিনি এটা করতে পারেন তিনি পুরুষোত্তম হয়ে ওঠেন। এটা গুরুরা শিষ্যকে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। এক্ষেত্রে তাঁরা কঠোর গোপনীয়তা রক্ষা করেন। তাই গুরু-শিষ্য ছাড়া এ বিষয়টি সাধারণের কাছে অধরাই থেকে গেছে। সাধকরা সর্বপ্রকার মোহ থেকে মুক্ত থাকেন। এখানে ভারতের প্রচলিত তান্ত্রিকতাও কাজ করে। ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামে তিনটি নাড়ি আছে, এর মাধ্যমে আমরা কামচক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। শশ্বাস-প্রশ্বসাসের নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এই চর্চা করতে হয়। এর বাইরেও ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্নার আরো কাজ আছে। ঈশ্বর মানবদেহের প্রাণের ধারার সঙ্গে কিভাবে মিশে আছে সাধকরা সেই রহস্য আবিষ্কারে ব্রতী হন। তাই কাম সাধনার সহজিয়া ধারায় তারা আত্ম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অর্জন করেন। নারী পুরুষের মিলনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে তারা স্থির থাকেন। তখন সহজ মানুষের সাক্ষাৎ মেলে। আর তখনি তারা সাধন করতে চান। তখনি কাম নদীর নিম্নমুখী ধারাকে তাঁরা ঊর্ধ্বমুখিতে রূপান্তর করে সহজ মানুষ সাধন করতে করেন। যারা পারেন তারাই হলেন সিদ্ধ পুরুষ। লালন বলেন…
আমি কি সন্ধানে যাই সেখানে
মনের মানুষ যেখানে।
আঁধার ঘরে জ্বলছে বাতি
দিবা রাতি নাই সেখানে।
যেতে পথে কাম নদীতে
পাড়ি দিতে ত্রিবেণীতে
কত ধনীর ধারা যাচ্ছে মারা
পইড়ে নদীর তোড় তুফানে।
রসিক যারা চতুর তারা
তারাই নদীর ধারা চিনে
উজান তরী যাচ্ছে বেয়ে
তারাই স্বরূপ সাধন জানে।
লালন বলে মইলাম জ্বলে
মইলাম আমি নিশি দিনে
আমি মণিহারা ফণির মতো
হারা হলাম পিতৃধনে।
লালনের গান সাধারণ মানুষ যেভাবেই গ্রহণ করুক না কেন তাঁর গানের মূল আকর্ষণ হচ্ছে দেহতত্ত্বের মাধ্যমে আত্মতত্ত্বের সন্ধান। দেহ সাধনাক বাদ দিয়ে আত্মার সাধনা হয় না। তাই সাধনার সিদ্ধির জন্য নারী প্রয়োজন। নারী বাউলতত্ত্বে প্রকৃতি হিসেবে পরিচিত। নারীকে অবলম্বন করেই পরম পৌরুষে পৌঁছতে হয়। কিন্তু লালন, নারী সাধনা করেছেন এমন গ্রহণযোগ্য প্রমাণ আমরা পাইনি। লালন তাঁর আখড়াতে অনেক অসহায় নারীকে আশ্রয় দিয়েছেন। সেই অসহায় নারীরা সাধন সঙ্গিনী ছিলেন এমন প্রামাণ্য তথ্য আমাদের কাছে নেই। বরং সুফির যে সাধনপ্রক্রিয়া কিংবা বৌদ্ধ ধর্মের যে নির্বাণপদ্ধতি অথবা শূন্যতত্ত্বের পরম শূন্যে মিলনের আকুতির সঙ্গে লালনের সহজ মানুষ ভজন প্রক্রিয়ার মিল দেখা যায়। লালন তাঁর গানে শরিয়তের চেয়ে মারেফতের গুরুত্বের কথা বলেছেন বারবার। বিভিন্নভাবে তিনি মারেফতের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন- যদি ইসলাম কায়েম হত শরায়/কী জন্য নবীজী রহেন/পনের বছর হেরাগুহায়। তাঁর গানে দেখতে পাই..
১
যেদিন জ¦লে উঠবে নূর তাজেল্লা
অধর মানুষ যাবে ধরা
আল্লাহ নবী দুই অবতার
এক নূরেতে মিলন করা।।
২
আত্মতত্ত্বে ফাজেল যে জনা
সেই জানে নবীর নিগূঢ় কারখানা
রসুলরূপে প্রকাশ রব্বানা
লালন বলে দরবেশ সিরাজ সাঁইর গুণে।।
৩
আহাদ নামে কেন ভাই
মানবলীলা করিলেন সাঁই
লালন তবে কেন যায়
অদেখা ভাবুক দলে ।।
৪
খোদ খোদার প্রেমিক যে জনা
মোর্শেদের রূপ হৃদয়ে রেখে
করে আরাধনা
আগে চাই রূপটি জানা
তবে যাবে খোদাকে চেনা
মুর্শিদকে না চিনিলে পরে হবে না
তোর ভজনা ।।
৫
আকার বান্দা
সাকাররূপ খোদা
আকারে সাকারে মিলে
হয় দেখা নিরাকারেতে
অনন্ত রূপ আকার
একরূপ সাকার
রয় সর্বঘটেতে
বান্দার রূপ খোদ খোদা হয়
আল্লাহ আদম বান্দাতে রয়
পাক পাঞ্জাতন যাতে
ভেদ জেনে বান্দা
লালন দেয় সেজদা
খোদার রূপেতে।।
৬
ডুবে দেখ দেখি মন
কী রূপ লীলাময়
যাঁরে আকাশ পাতাল খুঁজি
এইদেহে সে রয়।।
৭
শরিয়ত আর মারেফত আদায়
নবীর হুকুম এই দুই সদাই
শরা শরিয়ত
মারেফত নবুয়ত
বেলায়েত জানতে হয় গভীরেই।।
৮
যাঁর কালেমা দ¦ীন দুনিয়ায়
সে মুরিদ হয় কোন কালেমায়
লেহাজ করে দেখ মনুরায়
মুর্শিদতত্ত্ব অথৈ গভীরে।।
৯
নফি এজবাত যে জানে না
মিছেরে তার পড়াশোনা
লালন কয় ভেদ উপাসনা
না জেনে চটকে মারে।।
১০
আপনি আল্লাহ আপনি নবী
আপনি হন আদম শফি
অনন্ত রূপ করে ধারণ
কে বোঝে তার লীলার কারণ
নিরাকারে হাকিম নিরঞ্জন
মোর্শেদরূপ হয় ভজনপথে ।।
১১
খোদাপ্রাপ্তি মূল সাধনা
রসুল বিনে কেউ জানে না
জাহের বাতেন উপাসনা
রসুল হতে প্রকাশিলে।।
১২
ইশ্কে আল্লাহ ইশ্কে রসুল
ইশকেতে হয় জগতের মূল
ইশক বিনা ভজনসাধন
সবকিছু হয় ভুল।।
১৩
খোদার রূপ খোদ করে ধারণ
অকৈতব সে করণ কারণ
আয়ু থাকতে হয়রে মরণ
ফানার কারণ তারই হয়।।
একে একে জেনে বেনা
করতে হয় চাররূপ ফানা
একরূপে করে ভাবনা
এড়াবে সে সমন দায়।।
না জানিলে ফানার করণী
করণ হয় তার মিথ্যা জানি
সিরাজ সাঁই কয় অর্থ বাণী
দেখরে লালন মোর্শেদের ঠাঁই।।
সুফিতত্ত্বের এই রূপ লালনের অসংখ্য গানে প্রকটভাবে নজরে পড়ে। মুর্শিদের মাধ্যমে রাসুল ও আল্লাহকে দেখার যে প্রক্রিয়া তা ইসলাম সমর্থিত নয় অথচ ইসলামের একটি তাত্ত্বিক বিষয়কে কেন্দ্র করেই সুফিবাদের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ। সে হিসেবে সুফিদের যেমন মুসলিম বলা যায় না তেমনি লালনকেও মুসলিম বলা যায় না। সুফিরা জেকেরের মাধ্যমে মশগুল হয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলে পরম ঈশ্বরের সঙ্গে। এজন্য দেখা যায় সুফিরা দায়েমি নামাজের কথা বলে। যদিও বিষয়টি ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তবুও ভাববাদীদের জন্য অসাধারণ। সুফিদের কাছে জান্নাত বা জাহান্নাম মূল বিষয় নয় আল্লাহকে পাওয়াই তাদের লক্ষ্য। জানা যায় একবার রাবেয়া বসরি আগুন নিয়ে ছুটে ছিলেন জান্নাত ও জাহান্নামকে জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য। কারণ তাঁর ধারণা ছিলো মুসলমানরা জান্নাতে একটি প্রথম শ্রেণির কামরা বরাদ্দ করার লোভে আত্মসাধনা থেকে সরে গিয়ে শরিয়তেই থেকে গেছে। তারা দুনিয়াতে স্বর্গীয় সুখ লাভ থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। আর জাহান্নামের ভয়ে তারা সাহসী হতে পারছে না এবং নিজের আত্মার চাওয়াকে পূর্ণ করতে পারছে না। আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যকার পর্দা তুলে দিয়ে আল্লাহর রঙে রঙিন হয়ে আল্লাহত্ত্বপ্রাপ্ত হওয়াই মূলত সুফিতত্ত্বের আরাধ্য। আর এই সাধনা করতে হয় গুরু বা পীরের মাধ্যমে। তারা শরিয়ত, তরিকত, হকিকত, মারেফতের মাধ্যমে আল্লাহকে পাওয়ার সাধনা করে। এই চাররূপে সফল সাধনার পর আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়া যায়। তখন মনছুর হাল্লাজের মতো নিজেকে আনাল হক দাবি করা যায়। সুফিরা গুরুকে মুর্শিদ বলে। এই গুরু আবার পীর হিসেবেও পরিচিত। আবার যারা গুরু হন তাদেরকে ফকিহ ও বলে। এই ফকিহ থেকে ফকির হয়েছে বলে অনেকে ধারণা করেন। লালন ফকির সুফি ফকিহ ছিলেন কিনা সেটাই আমাদের আলোচ্য। লালনের গান বিশ্লেষণ করলে তাঁকে সে রকমই মনে হয়। তবে তিনি গরিব অর্থে বা অনেক প্রশ্নের উত্তর জানেন না কিংবা অনেক তত্ত্বের ব্যাখ্যা জানেন না বা ভেদ বের করতে পারেন না এই অর্থে নিজেকে ফকির বলেছেন বলে অনুমিত। কারণ লালনের বেশির ভাগ গানেই দেখা যায় তিনি কোনো না কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন এবং তিনি বলেছেন তিনি সেই প্রশ্নের উত্তর বা সার জানেন না। তিনি আল্লাহর কাছে নিজের সব সঁপে দিয়ে নিজ অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছেন সে অর্থেও তিনি ফকির হতে পারেন।
লালন সাম্প্রদায়িক না অসাম্প্রদায়িক এ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক চলেছে এবং চলছে। লালন সাম্প্রদায়িক এ নিয়ে কারো মতভেদ থাকার কারণ দেখছি না। কারণ কোনো মানুষই সম্প্রদায়ের ঊর্ধ্বে উঠতে পারে না। যারা রাজনীতিবিদ তারা লালনকে নিয়েও রাজনীতি করছেন, যার জন্য লালনকে অসাম্প্রদায়িক বানানোর জন্য উতলা হয়ে উঠেছেন। যারা নিজেকে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে প্রমাণ করেন বৃহৎ অর্থে তারাও সাম্প্রদায়িক। তাঁরা অসাম্প্রদায়িক হিসেবে সাম্প্রদায়িক। অসাম্প্রদায়িক মতবাদটাও একটা সাম্প্রদায়িক মতবাদ। লালন ছিলেন উদার সাম্প্রদায়িক। বৃহৎ অর্থে বলা যায় সর্বসাম্প্রদায়িক। কারণ সব সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক রূপটি লালন গ্রহণ করেছেন। শুধু গ্রহণ নয় জীবনে আমলও করেছেন। তবে সব সম্পদ্রায় নিয়ে তাঁর প্রশ্নের শেষ নেই। লালনের গানের মহাকাব্যে প্রশ্নের পর প্রশ্ন এসে গানকে মহিমান্বিত করে তুলেছে। অসংখ্য প্রশ্ন লালন উত্থাপন করেছেন। কিছুর উত্তর ইঙ্গিতের মাধ্যমে তিনি দিয়েছেন। বেশির ভাগ প্রশ্নের উত্তরই তিনি দেননি। সে প্রশ্নগুলো আজো আমাদের ভারাক্রান্ত করে। চিন্তার অতলে নিয়ে যায়। আমরা ভাবের গহিনে বিহার করতে করতে সমস্যার সমাধান খোঁজার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠি। লালনের প্রশ্নগুলো এতটাই বুদ্ধিদীপ্ত এবং মৌলিক যে এগুলোর সমাধান দেয়া বড় বড় গবেষকের পক্ষেও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ভবিষ্যতেও এগুলোর সমাধান পাওয়া যাবে কিনা তা বলা মুশুকিল। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উত্থাপন করে লালন তার মতবাদ প্রকাশ করেছেন অনায়াসেই। তাতে তার বিন্দু পরিমাণও বেগ পেতে হয়নি। লালনের সার্বসাস্প্রদায়িকতা হয়তো তখনকার সমাজের কারণেই হয়েছে। সব সমাজের মানুষ লালনের কাছে সমান মর্যাদা পেয়েছে। তিনি কখনো কোনোভাবেই কোনো মতের বা ধর্মের মানুষের বিশ^াসের ওপর আঘাত হানেননি বা কটাক্ষ করেননি। তিনি সব সম্প্রদায়ের মৌল বিষয়টি ধারণ করে নিজস্ব পদ্ধতিতে তা মেনে চলেছেন।
লালন সব মতবাদ হাতড়ে দেখেছেন সবারই মূল লক্ষ্য হলো মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটানো। তাই লালন সেই মানুষের সাধনা করেছেন, যেই মানুষ আসল মানুষ, অলীক মানুষ, সোনার মানুষ। তিনি মানুষ ভজনা করে মানুষের ভেতরের মানুষকে পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মরমিয়াবাদী হিসেবেও লালনকে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। তিনি যে মানুষের সাধনা করেছেন সেই সাধনাটাও একটা সাম্প্রদায়িকতা। আমরা মুসলিম হিসেবে যেমন সাম্প্রদায়িক, তেমনি হিন্দু হিসেবেও সাম্প্রদায়িক। বাঙালি হিসেবে যেমন সাম্প্রদায়িক, তেমনি বাংলাদেশি হিসেবেও সাম্প্রদায়িক। উপজাতি হিসেবে যেমন সাম্প্রদায়িক, বাউল হিসেবেও তেমনি সাম্প্রদায়িক। আমরা অযথা নিজের রাজনৈতিক বিশ^াসকে বড় করে তোলার জন্য লালনকে অসাম্প্রদায়িক বানানোর চেষ্টায় রত হয়েছি। লালনকে দলে টানার একটা চেষ্টা আমাদের সব রাজনৈতিক দলের ছিলো, আছে এবং থাকবে। পাকিস্তান আমলে প্রথমে লালনকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখা হলেও পরবর্তীতে লালন নিয়ে ব্যাপক রাজনীতি হয়েছে। যার কুৎসিত রূপ এখনো আমাদের বহন করতে হচ্ছে। লালনের আখড়াকে লালন শাহের মাজার নামকরণ করে ডিসিকে এর সভাপতি করার যে প্রক্রিয়া পাকিস্তান সরকার নিয়েছিলো তা এখনো বহমান। যারা লালনের গান বুঝেন না, লালনকে অন্তরে ধারণ করার মত অন্তরাত্মা যাদের নেই তারা লালনকে নিয়ে মঞ্চে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। সেই তখনকার যুগে লালন যেই পরিমাণ উদার প্রগতিশীল ছিলেন আমাদের আজকের যুগের প্রগতিশীল আন্দোলন যারা করছেন তারা সেটা চিন্তা করার মতো শক্তিও অর্জন করতে পারেননি। পাকিস্তান সরকার লালন আখড়াকে মুসলমানী ঢংয়ে সাজানোর চেষ্টা করেছিলো; কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে।
লালনের মানবিক আন্দোলন এতটাই প্রগাঢ় ও গভীর ছিলো যে মার্কস বা এঙ্গেলসের সঙ্গে তুলনা করলে মার্কস-এঙ্গেলসকে দুর্বলই মনে হবে। কিন্তু আমরা গুণীর কদর বুঝি না। আর আমাদের চিরায়ত বৈশিষ্ট্য আমরা কোনো মহৎ ব্যক্তিকে পেলে তাকে নিজের দলের প্রমাণ করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ি। যারা লালনের ওপর গবেষণা করে অনেক বড় বড় পুস্তক রচনা করেছেন। যারা লালন দর্শন নিয়ে বড় বড় মঞ্চে বক্তৃতা দিয়ে দর্শক মাতিয়ে তোলেন, তাদেরও দেখি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বিশ^াসের কারণে অন্য মতে বিশ^াসী মানুষকে সম্মান করতে পারেন না। তাঁরা লালন পড়েন, বুঝেন, গবেষণা করেন, পাণ্ডিত্য জাহির করেন কিন্তু ব্যক্তিজীবনে লালনের আদর্শকে মানেন না। কিংবা মানার মতো মনন তাদের তৈরি হয়নি। এজন্য আমাদের সমাজ কাঠামোই দায়ী। উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছেন না বলে তাঁরা উদার হতে পারছেন না। কিন্তু লালন তো উপযুক্ত তো নয়ই বরং বিরূপ পরিবেশে বসবাস করেও উদার হতে পেরেছিলেন। তাহলে আমরা কেন পারছি না? কারণ আমরা লালনকে পেতে চাই ততটুকুই যতটুকু পেলে আমার বিশ^াসকে ব্যাখ্যা করা যাবে। আমাদের এই ক্ষুদ্রতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। লালনের সার্বসাম্প্রদায়িকতাকে গ্রহণ করতে হবে। হৃদয়ে লালনকে পালন করতে হবে। তবেই লালনের সর্বসাম্প্রদায়িক বোধ আমাদের জীবনকে সুন্দর করে তুলবে। আমরা তখন জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে সুন্দরের সৌভ্রাত্রে সম্মিলিত হতে পারবো। সুন্দরের সমৃদ্ধ আলোকে অবগাহন করতে পারবো। তখন আমরা জীবনকে সুন্দরের মোড়কে আবৃত করতে পারবো। তখন সুন্দরের আবাহনে সত্যের আঙিনায় আমরা পরিচ্ছন্ন বীজ বপন করতে পারবো। তখন আমরা জীবনের ভেতর মগ্ন হতে হতে মুগ্ধতায় পৌঁছব। আর ঠিক তখনি আমরা জীবনের মানে খুঁজে পাবো এবং জীবনকে উপভোগ করতে পারবো। তখন আমরা অনুভব করতে পারবো ভোগের চেয়ে উপভোগ বড়। আরো উপলব্ধি করতে পারবো ভোগে নয় ত্যাগেই প্রকৃত সুখ।
লালনের গানে ভারতের শূন্যবাদ প্রভাব বিস্তার করেছে। লালন নিজ সত্তাকে শূন্য করে দিয়েছেন পরম প্রকৃতির সঙ্গে। সর্বশূন্য হয়ে তিনি ফকিরি অর্জন করেছেন। ভারতের শূন্যবাদ অনুসারে যাকে দেখতে পারি না তাই শূন্য। আবার এ শূন্যকে চিন্তা করলে পুরুষ হয় ধন্য। ‘নাম শূন্য, কাম শূন্য, শূন্যে যার স্থিতি / সেই শূন্যের সঙ্গে করে ফকির পিরিতি’। শূন্যতেই পরম হংস এবং শূন্যতেই ব্র্হ্মজ্ঞান। শূন্যতে পৌঁছতে পারলেই মানুষ পরমেশ^র হয়ে ওঠে। তখন মনের মানুষ, অটল মানুষ, অধর মানুষ, রসের মানুষ, সহজ মানুষ, মনমনুরা এবং অচিন পাখির সন্ধান পাওয়া যায়। যে এই শূন্যের সঙ্গে মিলতে পেরেছে লালন তাকে ধন্য বলেছেন। লালনের ভাষায়…
ধন্য ধন্য বলি তারে
বেঁধেছে এমন ঘর
শূন্যের উপর
পোস্তা করে।।
এই শূন্যের সাধনা করতে হয় বায়ুর মাধ্যমে। সাধকরা শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরম শূন্যে পৌঁছে। পরম শূন্যে পৌঁছার পর মানুষের আর কোনো দুঃখ থাকে না। তখন তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মের আলোকে নির্বাণ লাভ করেন এবং পরম সুখে পদার্পণ করেন। তখন জাগতিক বিষয়গুলোর ঊর্ধ্বে তারা অবস্থান করেন। জগৎ ও জীবন তখন তাদের কাছে অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। তখন দুনিয়াতেই তারা স্বর্গ বা জান্নাত পেয়ে যান।
লালনের যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক চলছে সেই বিষয়গুলো নিয়ে হয়তো অনাদিকাল ধরেই বিতর্ক চলবে। কিন্তু লালন যে বিতর্ক পছন্দ করতেন না। সেই বিতর্ক করে আর যাই হোক লালনকে উপলব্ধি করা যাবে না। লালনকে ধরে জাতে ওঠা যাবে। পরিচিতি লাভ করা যাবে। লালন গবেষক হিসেবে সুনাম কুড়ানো যাবে। মোটা মোটা বই লিখে লালন তত্ত্ব বা লালন দর্শন ব্যাখ্যা করা যাবে কিন্তু লালনকে পাওয়া যাবে না। লালনকে পেতে হলে সেই বিতর্কগুলো থেকে সরে এসে লালন যা বলেছেন তা ব্যক্তিজীবনে মানার চেষ্টা করতে হবে। আমাদের যারা প্রখ্যাত লালন বিশারদ আছেন তারা ব্যক্তিজীবনে লালনকে পালন করেন না। এমনকি ধারণও করেন না। অথচ তারা লালন গবেষক! যাই হোক যে রবীন্দ্রনাথ লালনকে বিশে^র মাঝে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন সেই রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তিজীবনে লালনকে কিছুটা হলেও পালন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবন অনেকটা লালনের মতই কেটেছে। লালনের জন্ম, ধর্ম, বিশ^াস নিয়ে ছুটোছুটি না করে লালন যা বলেছেন তা মানলেই লালনকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়া হবে। কেউ লালনকে নবী বানিয়ে দিয়েছেন কেউবা ঈশ^র। কেউ আবার চরিত্রহীনতার সর্বনিকৃষ্ট উপাধি দিতেও কুণ্ঠিত হননি। যেহেতু লালন শিষ্যরাই তাঁর জীবনী নিয়ে কথা বলেননি। এমনকি তাঁর শিষ্য দুদ্দু শাহ লালন জীবনী লিখতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন লালন এসব নিয়ে মাতামাতি করতে নিষেধ করেছেন। লালন যা নিষেধ করেছেন আমরা তাই নিয়ে আলোচনা করে বরং লালনকেই অস্বীকার করছি বা অবমাননা করছি।
আমার এই প্রবন্ধে লালনের যেসব বিতর্ক নিয়ে আলোচনা করেছি তার কারণ লালনের জীবন অনুসন্ধান নয় বরং লালন নিয়ে বিতর্কের অবসান। আমরা বিতর্ক না করে লালন ধ্যানে মজে গেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আমরা সেটা না করে বিতর্ক জিইয়েই রাখছি। কারণ লালন দর্শন মেনে জীবন চালানো বেশ কঠিন। এটা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু লালন নিয়ে বুদ্ধজীবী সুলভ মন্তব্য প্রদান করে নিজেকে মহৎ প্রমাণ করা বেশ সহজ। আর লালনকে ধরে যদি নিজের পরিচিতিটা বাড়ে তাতে ক্ষতি কী?
বাংলা ভূ-খণ্ডে সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য যারা আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন লালন তাদের কাণ্ডারি। কারণ তিনি সমাজের সকল দিক থেকেই সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। তিনি মানুষের মাঝে কোনো ভেদাভেদ দেখেননি। তাঁর কাছে নারী-পুরুষ একই নদীর দুই ধারা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। উঁচু-নিচু কিংবা ধনী-দরিদ্রে তিনি পার্থক্য সৃষ্টি করেননি। বিভেদ দেখেননি ব্রাহ্মণ আর শুদ্রে। রাজা-প্রজা তার কাছে একই রূপে ধরা পড়েছে। তিনি রূপে রূপে অরূপের ধ্যান করেছেন। আপনার মাঝে আপনাকে খুঁজে ফিরেছেন। মানুষের দিব্য দৃষ্টিকে সজাগ করে দিয়েছেন। মানুষকে ধর্ম সীমার ঊর্ধ্বে তুলে মানবতার জয়গানে মুখরিত করেছেন এবং মুখরিত হয়েছেন। দ¦ন্দ্ব বা সংঘাত তিনি একান্তভাবেই চাননি, যদিও তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য তাঁর শিষ্যদের পাঠিয়েছিলেন। তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে জাগাতে চেয়েছেন। ইন্দ্রিয় সত্তাকে ধরেই অতিন্দ্রিয়কে পেতে চেয়েছেন এবং পেয়েছেন। জগৎ ও জীবন সম্পর্কে তার ধারণা স্বচ্ছ ছিলো। তিনি জীবনের ঝড়-ঝঞ্জাকে অস্বীকার করেননি তবে তাকে অতিক্রম করতে চেয়েছেন। তিনি মানুষের ভেতরের সোনার মানুষকে আবিষ্কারের নেশায় মশগুল থাকতেন। তাকে যেমন সুফিবাদের গুরু বা মুর্শিদের ভূমিকায় দেখা যায়, তেমনি দেখা যায় বাউল তত্ত্বের স¤্রাট রূপে। তিনি যেমন দেহতত্ত্বের বিশারদ তেমনি আত্মতত্ত্বের নকিব। তিনি যেমন মুহম্মদ (সা.) এর নূরের তাজাল্লি পেতে আকুল হয়েছেন তেমনি রাধা-কৃষ্ণের জীবাত্ম-পরমাত্মা লীলায় মত্ত হয়েছেন। তিনি নিজে যেমন শিষ্য তেমনি নিজেই গুরু। যেমন জাগতিক তেমনি আধ্যাত্মিক।
সক্রেটিস নিজকে জানার জন্য যে পরামর্শ দিয়েছেন বাংলা ভাষায় তার সার্থক রূপকার হলেন লালন। যিনি সারা জীবন মানবতার ধর্মকে পালন করে গিয়েছেন। সংশয়বাদের সকল সংশয় তার মনে বিরাজমান ছিলো। যার কারণে তিনি অসংখ্য বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন আবার নিজেই সেগুলোর উত্তর দিয়েছেন। সমাজ সংস্কারক হিসেবেও তাঁর অবদান অবিস্মরণীয়। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশেছেন, মানুষকে ভালোবেসেছেন, কাছে টেনেছেন, আঁকড়ে ধরেছেন; মানুষের কাছে গিয়েছেন, মোহে আবিষ্ট করেছেন। ভক্তকে সর্বোচ্চ সম্মান দিয়েছেন। স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝের পর্দাকে তিনি সরিয়ে দিয়েছেন। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টির মাঝেই স্রষ্টা এবং স্রষ্টার মাঝেই সৃষ্টি। তিনি হিন্দু ও মুসলমান শাস্ত্রের পণ্ডিত এবং ধর্মগুরু। তিনি জাত-পাতের সীমা অতিক্রম করেছেন। তাঁর উদার মানবিকতা আজো মানুষকে প্রবলভাবে নাড়া দেয়। তিনি ছিলেন মর্মে মর্মে শিক্ষিত ও শিল্পিত। তিনি মানুষের অন্তরের ভাব ফেরি করে বেড়াতেন। যা কেউ বুঝতে পারতো কেউ পারতো না। তিনি বাংলার ভাবান্দোলনের পুরোহিত ব্যক্তিত্ব। তিনি যতটা বাউল ততটাই সাধক। যতটা সাধক ততটা গুরু। আবার যতটা গুরু ততটাই শিষ্য।
ইসলামের সুমহান বাণীর প্রতি তিনি যেমন প্রগাঢ় ভালোবাসা পোষণ করতেন, তেমনি কৃষ্ণের বাণীর প্রতি তার মমত্ব উছলে উঠতো। তিনি আল্লাহর মধ্যে মোহাম্মদ (সা.) কে দেখেন আবার মোহাম্মদ (সা.) এর মধ্যে আল্লাহকে দেখেন। কোরআন বলেছে, ‘তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসুলের আর আনুগত্য কর তোমাদের মধ্যে কর্তৃত্বশালীদের।’ এই আয়াতের সরল ব্যাখ্যা করলে দাঁড়ায় আল্লাহর আনুগত্য করা মানে রাসুলের আনুগত্য করা আর রাসুলের আনুগত্য করা মানে নেতার আনুগত্য করা। আবার উল্টো দিক থেকে ব্যাখ্যা করলে- নেতার আনুগত্য মানে রাসুলের আনুগত্য আর রাসুলের আনুগত্য মানে আল্লাহর আনুগত্য। এই নেতাই আসলে গুরু। লালন বলতে চেয়েছেন মানুষ যখন নিজেকে বিনাশ করে দিয়ে পরম নাস্তির মাধ্যমে অস্তিত্বে পরিণত হয় তখন সে নিজেই ঈশ^র হয়ে ওঠে। তখন নেতা অর্থাৎ গুরুর নেতৃত্ব আর আল্লাহর আনুগত্য সমান। তখন নেতাই রসুল, নেতাই আল্লাহ। কোরআন বলেছে, ‘তোমরা আল্লাহর রঙে রঙিন হও, তার রঙের চেয়ে ভালো রং আর কিছু হতে পারে না’। লালন ফকিরও একই কথা বলেছেন। তিনি সুফিবাদের আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে নিজেকে ফানা ফানা করে দিয়ে মহান রবের সঙ্গে নির্বাণ লাভ করেছিলেন। যার জন্য তাঁর কিছু রচনায় শিরকের প্রভাব আছে বলে কাঠ মোল্লারা তাঁর বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, এখনও আছেন। অথচ লালন যে গভীরতা থেকে ইসলামকে বুঝেছিলেন আমাদের মোল্লারা এখনও তা অনুধাবন করতে পারেননি। বিদায় হজের ভাষণে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ তুলে দেয়া হয়েছে অথচ আমাদের মাওলানারা এখনও ভেদাভেদ সৃষ্টি করেই চলেছেন। আর লালন স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝখানের দেয়াল তুলে দিয়ে মধ্যবর্তী মোল্লাকে হাঁকিয়ে দিয়েছেন, ঝাঁকিয়ে দিয়েছেন। মোল্লাত্তের দেয়ালে ফাটল সৃষ্টি করে দিয়েছেন। জান্নাত-জাহান্নামকে বড় করে না দেখে আল্লাহর রঙে রঙিন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়েছেন। সত্যকে খুঁজে পেয়েছেন আপন দেহে, আপন অন্তরে।
সৃষ্টি লীলাই স্রষ্টার কথা মনে করিয়ে দেয়। এ সৃষ্টি বৈচিত্র্য দেখে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কবোধ জন্মে। স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির জন্য মাধ্যম প্রয়োজন হয়। সেই মাধ্যম হলো গুরু। গুরুর চরণ স্পর্শে শিষ্য সোনায় রূপান্তরিত হয়। গুরুর আদর্শ অনুসারে শিষ্য তার পুরো জীবন অতিবাহিত করে। গুরুকে ধরেই পরপারের সাঁকো পার হতে চান শিষ্য। ধীরে ধীরে গুরু শিষ্যের মধ্যে ভাবতরঙ্গ প্রবেশ করাতে থাকে। প্রাথমিক স্তরে জাগতিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা দিলেও পূর্ণাঙ্গ স্তরে এসে জাগতিক বিষয়কে অতিক্রম করে কিভাবে পরম সত্তার সঙ্গে নির্বাণ লাভ করা যায় সে দীক্ষা প্রদান করেন গুরু। তখন শিষ্য গুরুর মধ্যেই অসীমকে দেখতে পায়। অধরাকে ধরতে, পরমকে কাছে পেতে কিংবা নিজ আত্মাকে উপলব্ধি করতে গিয়ে ভক্তের হৃদয়ে বারবার গুরুর ছবিই ভেসে আসে। গুরু তিনিই হন, যিনি মানবের অজ্ঞান চিত্তাকাশে অন্ধকার বিদীর্ণ করে আলোকের জ্ঞানসূর্য জ্বালিয়ে দেন। মানবের আবহমান জীবনধারার সঙ্গে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে গুরু দেখার জগৎকে ধ’রে অদেখার জগতের সন্ধান দেন। গুরু হলো পথপ্রদর্শক। গুরু ¯্রষ্টা এবং দ্রষ্টা। গুরুই রূপ আবার গুরুই অরূপ। লালন গুরুর শিষ্য ছিলেন আবার নিজেও গুরু হয়ে উঠেছিলেন। লালন পরম সত্তার সন্ধান করেছেন আত্মজ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে কোনো শাস্ত্র ঘেঁটে নয়। তাই শাস্ত্রীয় ধর্ম পালন বা উপাসনা তাঁর কাছে অবান্তর। মানুষই তাঁর কাছে মুখ্য। তিনি মানুষের সাধনা করে সোনার মানুষ হয়েছেন।
প্রত্যেক মানুষকেই তার সমাজ লালন করে, আবার মানুষ সমাজকে টিকিয়ে রাখে। কেউ কেউ সমাজকে উন্নত করে। তাদের কারণে সমাজ পরিচিত হয়ে ওঠে, সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। কালের অমরায় সমাজ তাদের টিকিয়ে রাখে। কেউ কেউ নতুন সমাজের জন্ম দেন। যারা নতুন সমাজের জন্ম দেন তারাও পুরাতন সমাজ থেকে উপাদান সংগ্রহ করেন। পুরাতন সমাজের সমস্যাই তাকে নতুন সমাজ সৃষ্টিতে উৎসাহ দেয়। লালন ফকিরও নতুন সমাজ সৃষ্টি করেছেন পুরাতন সমাজ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে। লালনের সমাজের নাম মানবসমাজ। সে সমাজে মানুষে-মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই। সেই সমাজের বৈশিষ্ট্যগুলো তিনি ধার করেছেন ভারতের চিরায়ত গুরুবাদ, ভক্তিবাদ, যোগশাস্ত্র, কামশাস্ত্র, বৌদ্ধবাদ, জৈনবাদ, হিন্দু পুরান, ইসলামের কোরআন-হাদীস-সুফিবাদ, চার্বাকের নিরীশ^রবাদ, সন্ত কবীর, দাদু এর ধর্মের সরল ব্যাখ্যা ও বাঙলার চৈতন্যবাদ থেকে। বৈষ্ণব ধর্ম লালনের চেতনার আকাশে ধ্রুব তারার মতো জাজ্বল্যমান। তিনি প্রেমের সাধক। প্রেমেই জীবন, প্রেমই যৌবন, প্রেমই মুক্তির পথ। তিনি প্রেমে মশগুল থাকতেন অধিকাংশ সময়। তাই তাঁর গানের পরতে পরতে প্রেমের ফল্গুধারা প্রবহমান। এ প্রেম যেমন নর-নারীর, তেমনি নর-নারী রূপকে ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির। তিনি প্রেমলীলায় মত্ত থাকতেন। জগৎকে তিনি প্রেমময় করে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি সর্বপ্রকার ইগোর ঊর্ধ্বে উঠে সহজ মানবের সাধনা করেছেন।
আমরা লালনকে আঁকড়ে ধরবো, লালন দর্শন উপলব্ধি করবো, ব্যক্তিজীবনে বোঝার চেষ্টা করবো তাহলেই লালনকে আপন অন্তরে খুঁজে পাবো। তাহলেই ভারত উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে লালনকে আবিষ্কার করতে পারবো। হ
তথ্যসূত্র:
১. আহমদ শরীফ, বাউল ও সুফি সাহিত্য, ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০১০।
২. আবদুল ওয়াহাব, লালন-হাসন জীবন-কর্ম-সমাজ, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ২০০৯।
৩. মফিদুল হক, লালনকে কে বাঁচাবে, ঢাকা, বিদ্যাপ্রকাশ, ২০১০।
৪. জিতেন্দ্রনাথ বড়–য়া, আত্মঅন্বেষা: বাংলাদেশে বৌদ্ধধর্ম ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৯।
৫. মুহম্মদ ইফতেখারুল ইসলাম খান, হিন্দৃ পুরাণ, ঢাকা, অয়ন প্রকাশন, ২০১৫।
৬. আবদেল মাননান সম্পাদিত, অখণ্ড লালন সঙ্গীত, ঢাকা রোদেলা প্রকাশনী, ২০১০।
৭. আবদেল মাননান, লালনভাষা অনুসন্ধান ১, ঢাকা, রোদেলা প্রকাশনী, ২০০৯।
৮. আবদেল মাননান, লালনভাষা অনুসন্ধান ২, ঢাকা, রোদেলা প্রকাশনী, ২০১০।
৯. আবদেল মাননান, লালন দর্শন, ঢাকা, রোদেলা প্রকাশনী, ২০১০।
১০. আবুল আহসান চৌধুরী, কালান্তরের পথিক লালন, ঢাকা, মুক্তধারা ২০১২।
১১. ফরহাদ মজহার, সাঁইজীর দৈন্য গান, ঢাকা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০০৯।
১২. শাহমুর জুয়েল, বাউল স¤্রাট লালনের ভাব দর্শন ও ভক্তিবাদ, চাঁদপুর, চাঁদপুর কণ্ঠ, ২০ জানুয়ারি, ২০১৬।
১৩. ফরহাদ মজহার, নফি ও এজবাত, ঢাকা, দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২৪ আগস্ট, ২০১৫।
১৪. লালন, উইকিপিড়িয়া (bn.wikipedia.org)।
১৫. হাবিবুর রহমান স্বপন, লালন সাঁই : ভবে মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার, ঢাকা, রাইজিং বিডি, ৭ মার্চ, ২০১৫।
১৬. অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক, ফকির লালন শাহকে নিয়ে যত কথা, ঢাকা,sbdnews24.com, ২৩ মার্চ, ২০১৩।
১৭. ফরহাদ মজহার, লালনকে তান্ত্রিক বানাবার বিপদ, ঢাকা,www.chintaa.com, ২৭ অক্টোবর,২০১৫।