তালিম হোসেন একজন আত্মভোলা সদাহাস্য দিলখোলা মানুষ, সবসময়ই যিনি অপরের জন্য অবারিত দ্বার আর নজরুল প্রেমে উৎসর্গীকৃত প্রাণ। যখন তার জীবনের শেষ মুখচ্ছবিটি কাফনের কাপড় সরিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম নজরুল একাডেমীর চত্বরে, তখন একটি সফল জীবনের সমাপ্তিকে একজন বেহশতি মানুষের অবয়ব প্রত্যক্ষ করছিলাম আমি। তার পার্থিব জীবনের সব গ্লানি বেদনা যেন ধুয়ে মুছে সাফ তার যাত্রার পূর্বের চার বছরের রোগশয্যায়। যেমনটি ঘটেছিল তার ‘হিরো’ নজরুলের জীবনে। নজরুল যেমন তার বেহেশতি ঠিকানা মৃত্যুর পূর্বেই অর্জন করেছিলেন দীর্ঘ রোগশয্যায়, তেমনি তার ভাবশিষ্য তালিম হোসেনও নজরুল চর্চায় সারাটি জীবন উৎসর্গ করেও নিজের পাথেয় সংগ্রহ করেছিলেন মুখ বুজে মাফরুহা চৌধুরীর সেবাকক্ষে দীর্ঘ চারটি বছর। তালিম হোসেন এর যে চেহারাটি আমার চোখের সামনে আঁকা হয়ে আছে সেই ছোটবেলা থেকে তা তাঁর পৌরুষদীপ্ত উচ্চারণে হারমোনিয়াম বাজিয়ে দৃপ্ত ভঙ্গিতে তার নিজের লেখা উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করার ছবিটি। সেই কলকাতার পার্কসার্কাস ৬ নং বেনিয়াপুকুর লেনে আমাদের বাড়িতে তাঁর লেখা গানটি গাইছেন : পাকিস্তান আজাদ, পাকিস্তান আজাদ, চলে সেই দেশে মুজাহিদ বেশে দৃপ্ত প্রাণের সাধ। কী সুন্দর চেহারা ছিল, তখন থেকেই তাকে ভালো লাগত। আমার আব্বার কথা ছিল গানটি রেকর্ড করার। তখন কবি গোলাম মোস্তফার লেখা প্রথম পাকিস্তানের গানটি ‘সকল দেশের চেয়ে পিয়ারা ও ঝির ঝির ঝির ঝির পুবাল বাতাসে ধাও’ গান মাত্র রেকর্ড হয়েছে। আবদুল আহাদ পরে ‘পাকিস্তান আজাদ’ গানটিতে সুরারোপ করেন। সুরটি ভালো হলেও তালিম হোসেনের নিজের দেয়া সুরের মতো তেজোদৃপ্ত ছিল না। যে কোনো কারণেই হোক, গানটি আব্বা আর রেকর্ড করতে পারেননি।
ঢাকায় এসে ভিক্টোরিয়া পার্কের পাতলা খান লেনে থাকতাম আমরা। সেই বাসায় আব্বার কাছে নিয়মিত যারা আসতেন পঞ্চাশের দশকে তাঁদের মধ্যে তখনকার কবি শিল্পী সাহিত্যিক কেউই বাদ ছিলেন না। তখন তালিম হোসেনের সবে বিয়ে হয়েছে। রথখোলার কাছে একটি বাড়িতে থাকতেন। একদিন তাদের বাড়িতে আমাদের বাড়িশুদ্ধ দাওয়াত। তালিম হোসেনের আব্বার চেহারাটা মনে পড়ছে। খুব সুন্দর শুশ্রুমণ্ডিত দীর্ঘ চেহারা রাজা-বাদশাদের মতো। তালিম হোসেনের বড় ছেলেও দাদার মতো শুশ্রুমণ্ডিত-যেন দাদার চেহারা। আমার চাচা আবদুল করিম ছিলেন তালিম হোসেন সাহেবের সমবয়সী ও বন্ধু। তাদের মধ্যে যাতায়াত ছিল আমার চাচার মৃত্যু অবধি। আমার চাচা স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন মারা যান। শিল্পী শেখ লুৎফর রহমান দীর্ঘকাল অকৃতদার ছিলেন। পরে তিনি তালিম হোসেন সাহেবের শ্যালিকাকে বিবাহ করেন। সে বিয়েতেও আমরা ছিলাম, মনে পড়ে। ’৫১ সনে আমরা পুরানা পল্টনে আসি ‘হিরামন মনজিলে’ নিজেদের বাসায়। অগণিত বার তালিম হোসেন আমাদের বাসায় সাহিত্য বাসরে উপস্থিত ছিলেন, কবিতা পড়েছিলেন। বিশেষ করে, বাংলা নববর্ষে অন্যান্য শীর্ষ কবিদের সঙ্গে তিনিও অংশ নিতেন, গান গাইতেন।
একজন সরল মানুষ বলতে যা বোঝায় তা-ই ছিলেন তিনি। দেখা হতো নানা সভা-সমিতিতে, বাসাতেও যেতাম, উনিও আসতেন। নানা প্রসঙ্গ। প্রায়ই আমাকে খোঁজ করতেন। হয়ত নজরুল একাডেমীর কোনো সমস্যা। শিল্পী সাহিত্যিকদের যে দলাদলি ছিল, তা মোটেই ভালো লাগত না তার। তিনি ছিলেন নজরুলের সত্যিকার প্রেমিক ও দলাদলির ঊর্ধ্বে।
আমাকে বলতেন, এই যে দলাদলি হচ্ছে। আমি এখন কী করি? সত্যিই তো চারদিকে যখন ছোট মানসিকতার মানুষের এত প্রাবল্য, তখন সত্যিকার নজরুল প্রেমিকরা কোথায় দাঁড়াই? তিনি বলতেন, আমরা তো দল করি না। কোন দলে নাম লেখাইনি, অথচ লেখানো কত সহজ। একশো টাকা দামের একটি ফুলের স্তবক নিয়ে যে কোনা দলে নাম লেখানো যায়, কাগজে নিখরচায় ছবিও উঠে যায়। কেন সবাইকে দলে নাম লেখাতে হবে? কিছু লোক কি দলের ঊর্ধ্বে থাকবে না? আমাদের সামনে কি তেমন কোনো মানুষের ছবি নেই, যারা দলের ঊর্ধ্বে, যারা আরেকটু উপরে, যারা সবার? নজরুল-রবীন্দ্রনাথ এরা কোন্ দলের? বলাবাহুল্য, এগুলো আমারও কথা।
আসলে নজরুল একাডেমীর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তালিম হোসেনের চিন্তা ছিল নজরুলের পরিপূর্ণ রূপটি দলাদলির ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠা করা। তিনি নিজকে প্রচার করছেন বলে আমার কখনও মনে হয়নি, বরং অনেকখানি প্রচ্ছন্ন রেখেছিলেন। একাডেমি থেকে কোনো রকম ফায়দা তিনি নেননি, বরং তার সময়, পরিশ্রম মেধা ও অর্থ এর পেছনে নিঃশেষে ব্যয় করেছেন। যারা তার সমালোচনা করেছেন অতীতে তারা ক্রমেই বুঝতে পেরেছেন যে, কবি নজরুলপ্রেমে কতখানি নিমজ্জিত ছিলেন। নজরুল একাডেমির স্বার্থে তিনি নিজের শরীরের দিকেও তাকাননি। একটি প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানো যে কতখানি কষ্টকর তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। তাঁর লেখার স্বীকৃতি তিনি পেয়েছেন বৈকি। বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৬৫; সিতারা-ই-ইমতিয়াজ ১৯৭০; একুশে পদক ১৯৮২; জাতীয় সাহিত্য পুরস্কার ১৯৯২ ও চুরুলিয়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে নজরুল পুরস্কার ১৯৯৩; তার সম্মানপ্রাপ্তি। এই সমস্ত স্বীকৃতি তিনি পেয়েছিলেন সহজভাবেই। মাথা পেতে তিনি সমাজের স্বীকৃতিতে কবির সারল্য নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। সফল জীবন ছিল তার। কোনো কিছু নিয়ে হতাশা প্রকাশ করতে দেখিনি। শুধু তার একটি আশা : নজরুল একাডেমি বিরাট প্রতিষ্ঠান হবে। নজরুলকে যেন সারা বাংলার প্রতিটি মানুষ ভালোবাসে, তেমনি নজরুল একাডেমির মাধ্যমে সারা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, নজরুলকে চিনবে, তার গান গাইবে, তাঁর কবিতা পড়বে, এই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান।
তালিম হোসেন দল করেননি, বাঁধেননি জোট। তাই তাঁর অসুস্থ হয়ে যাবার পর আর কেউ তাকে নিয়ে উচ্চবাচ্য করেনি। পরিবার এগিয়ে এসে ট্রাস্ট করেছে, অনুষ্ঠান করেছে তারপর সব চুপচাপ। অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন, খান আতাউর রহমান, শেখ লুৎফুর রহমান, বেদারউদ্দীন আহমেদ, আলতামাস আহমেদ, সত্য সাহা, এই নামগুলো এই মুহূর্তে মনে পড়ছে। এদের মৃত্যুর পর খবরের কাগজ, টেলিভিশন, রেডিও ছিল নিশ্চুপ। ওদের জন্য এতগুলো কাগজের সামান্য অংশেও কোন জায়গা পাওয়া যায়নি। হায়রে দলপাগল মানুষ! দলের বাইরেও যে মানুষ আছে। তারা সবার। সব মানুষের, তাই আবার কারও না। যেমন ভাগের মা গঙ্গা পায় না।
তালিম হোসেন কবিতাসমগ্র (সাড়ে পাঁচ শত পৃষ্ঠা) এখন আমার সামনে। চোখ বুলালেই আমাদের কবিতাঙ্গনের পঞ্চাশ বছর ডাক মন দিয়ে যায় যেন। ‘দিশারী’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ কী টাটকা, কী সুবাসিত কবিতাগুচ্ছ। তার পরিচয় ছিল ইসলামী রেনেসাঁর কবি, যে পথ হারিয়েছি তার অন্বেষণ তার প্রথম কবিতাটি-
নিরন্ধ্র এক জামানার জিন্দানে
ভেঙেছি আগল সেদিন বন্দী রাতে
সড়ক কেটেছি মৃত অরণ্যতলে
ঘন জুলমাতে আলোকের বন্যাতে।
কোথা মানবতা নির্জিত বেদনায়
কোথা ইনসান খিন্ন বিষাদে কাঁদে
কোন খান্নাস অশুভ মন্ত্র দিয়ে
বনি আদমেরে ফেলে মৃত্যুর ফাঁদে!
লোভ-অসাম্য-হিংসা-দৈন্য ঘেরা
মোহ-দস্তর-ভুলের পরিখা পারে
ইনসানিয়াত বিকৃত হলো যেথা
বিশুষ্ক হলো ইবলিস-কারাগারে
চির মানুষের রাহবার মুসলিম
সেখানে দিয়েছি আলোকের তসলিম
সেখানে এনেছি মনজিল-দিশা, সিরাত-মুস্তাকিম।
দিশারী’র ২৯টি কবিতার প্রতি ছত্রে আলোর কাফেলা নিয়ে নব-উত্তরণের আহ্বান।
আকাশে তোমার হেলালী নিশান উড়িয়ে দাও
আলোর ঝলকে কালো রাজপাট পুড়িয়ে দাও
নওজোয়ান
মুসলমান কালো!
ছড়াও দু’হাতে বিশ্বে তোমার
চিরবিপ্লবী প্রাণের দান।
তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শাহীন’-এ আছে ২৭টি কবিতা। শেষ কবিতা শান্তির জন্য-
তবে মুখ ফেরাও মুহম্মদের দিকে
মুখ ফেরাও ধ্যান ও জ্ঞানের মহান সনদ আল কোরআনের দিকে। আত্মার ফলকে-লব্ধ যে মুহাম্মদ বিশ্বের ওপরে বিশ্বপ্রভুর প্রতিনিধিত্বের দাবিদার করেছে তোমাকে।
শান্তির আবাদ করো নিজেরই মধ্যে
তারই ফুল-ফসলের সওগাত পৌঁছে দাও বিশ্বের কাছে
সে আবাদের পদ্ধতি শিখে নাও মুহম্মদের কাছে নাম যার আল-আমিন
চারিত্র্য যার ইসলাম
অবদান যার সালামত
শান্তি!
তৃতীয় গ্রন্থ ‘নূহের জাহাজ’ তার আনন্দবেদনার নিত্যসাথী মাফরুহা চৌধুরীকে উৎসর্গীকৃত। বিভিন্ন স্বাদের কবিতা তাঁর কাব্যিক মনের অনুরণন।
কত ফাগুনের আগুন ঝরানো
স্মরণের প্রান্তরে
শহীদ মিনার সোপানে তোমার
রক্তিম ফুল ঝরে
আমি ভুলিনি তা ভুলব না-
ভুলব না তার মনের যন্ত্রণা।
এই কবিতাসমগ্রে তাঁর লেখা ১৬৬টি অগ্রন্থিত কবিতা, তাঁর কালামই ইকবাল, গানের সংকলন মলয়া ও শিশু-কিশোর রচনা ধাইকিড়ি ধাইকি, জমজম ও বীর বাচ্চার গান স্থান পেয়েছে।
তাঁর অসংখ্য গানের মধ্যে দু’টি গান বাংলাদেশের, উপরে খুবই সুন্দর।
বাংলাদেশ বাংলাদেশ
মৃত্যুবিজয়ী বাংলাদেশ
যুগ-যুগান্ত পথের প্রান্ত
অতিক্রান্ত প্রাণ অশেষ
বাংলাদেশ।
আরেকটি :
আমার দেশের মাটি যে আমার
বেহেশতী আমানত
এখানে আমার জীবন-মরণ
আল্লাহর রহমত॥
আল্লাহর পরে পূর্ণ ঈমান
আমার প্রাণের জ্যোতি অম্লান
মুহম্মদের হাতের নিশান
আমাকে দেখায় পথ ॥
তার লেখা প্রচুর আধুনিক গান আছে, যার মধ্যে আছে তার কবিমনে প্রেমের আবাহন-
ওগো রানী আমার- হৃদয় সিংহাসনে
তোমার অভিষেকের লগন ঘনায় ক্ষণে ক্ষণে। (পৃ: ৪০২)।
আরেকটি গান খুব সুন্দর কথা :
হে সুন্দর মম মধুর দুরন্ত
মরণ হিম পন্থে আমি তোমার পান্থ।
কুজ্ঝটিকার পাড়ে
সূর্যের অভিসারে
জানি জানি মোর পথচারী প্রেম হবে মিলনান্ত। (পৃ: ৪০১)।
বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর শিক্ষিত সমাজের একটি মোটা অংশ এখন ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কহীন হয়ে পড়েছে। তাই ধর্ম সম্পর্কিত সাহিত্যকর্ম, শিল্পকর্ম, গান, কবিতা, সবই অপাঙক্তেয় বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে তরুণদের কাছে। বাংলা একাডেমিতে কিছুদিন আগে গান গাইতে গিয়ে দেখি, নজরুলের নানা গান পরিবেশন করার পর যখন ধরলাম সেই গানটি, ‘আল্লাতে যার পূর্ণ ঈমান কোথা সে মুসলমান’, তখন বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে দেখি, একে একে দশ-বারোজন তরুণ আসন ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। তখন নজরুলের ছবি আমার আব্বার করুণ মুখচ্ছবি ভেসে উঠল আমার চোখের সামনে। হয়ত এইসব কারণেই ইসলামের রেনেসাঁর কবি হিসেবে পরিচিত তালিম হোসেন আর বেশিদিন ইসলামের গৌরবজ্জ্বল ছবি আঁকেননি তাঁর পরবর্তী কবিতাসমূহে। তবে যতটুকুই লিখেছেন তিনি, তাতে তার দিকনির্দেশনা স্পষ্ট। ইসলামের মানবতা, প্রেম তাঁর দৃষ্টিতে সবসময়ই উজ্জ্বল ছিল, তাই তিনি লিখতে পেরেছেন।
প্রেমের তীর্থে ঘর বাঁধো আপনার
আনো আরমান নতুন দিনের নব উষা সম্ভার।
তিনি ছিলেন ইকবাল, রুমির-র ভক্ত। অনুবাদ করেছেন ইকবালকে এভাবে :
নতুন চাঁদের বাঁকা তলোয়ার কওমি নিশান যার
সেই মুসলিম আমি, ঘর মোর এ বিশ্ব সংসার (পৃ: ৩৮১)।
যাবিদনামার অনুবাদ এভাবে :
কেবল অন্ধই দেখে যত মন্দ ছায়া
সূর্যের দৃষ্টিতে নাই আঁধারের মায়া।
(যাবিদনামা পৃ: ৩৭৯)।
রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করেছেন :
আমার ভাষার এমনি তুমি কবি
চিরকালের আকাশ পরে
গর্ব আমার ছড়িয়ে পড়ে
সে যে তোমার কাব্য-কিরণ, রবি। (রবীন্দ্রনাথ পৃ: ১৮৮)
নজরুলের উদ্দেশে তাঁর কবিতা একাধিক। লিখছেন :
তুমি এসে ভাঙালে সে ঘুম
জাগালে প্রাণের সাড়া পড়ে গেল জীবনের ধুম।
মাফরুহা চৌধুরী তাঁর স্ত্রী। লেখিকা হিসেবে বাংলা সাহিত্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘদিন তিনি সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে সুন্দর রূপটি ছিল গত চার বছর যেভাবে তিনি তাঁর স্বামীর সেবা করেছেন। যখনই গিয়েছি তার বাসায় হাসিমুখে এগিয়ে এসেছেন, এবং প্রতিটি মুহূর্তে কিভাবে স্বামীর একটু ভালো লাগবে তার প্রতি সদা জাগ্রত দৃষ্টি আমি কোনদিন ভুলব না। মাফরুহা চৌধুরী দৈনিক বাংলায় সহকারী সম্পাদক ও মহিলা বিভাগের সম্পাদিকার দায়িত্ব পালন করেছেন বহুদিন। তিনি লিখতেন মিতশ্রী ছদ্মনামে, সদর-অন্দর কলামটি লিখতেন। মাঝে মাঝে তিনি ও তালিম হোসেন দু’জনেই দৈনিক বাংলা অফিস থেকে আমাদের পুরানা পল্টনের বাসায় চলে আসতেন, আর আমার আম্মাকে দেখতে অনেক সময় কাটাতেন।
দেখা হলেই তালিম হোসেন সাহেব বলতেন, বুলু তুমি এবার আমাকে একটু রেহাই দাও। তুমি নজরুল একাডেমির সম্পাদক হও আমি আর পেরে উঠছি না। আমি বলতাম, এই পোস্টটা আর কাউকে মানাবে না। আপনিই থাকুন, আমরা আপনাকে সহযোগিতা করব। এর পর তার অনুরোধে আমি কয়েক বছর নজরুল একাডেমির কার্যকরী সংসদে মেম্বার হই। মাফরুহা চৌধুরী ও তালিম হোসেন যৌথভাবেই নজরুল একাডেমির কাজ করতেন। আমি সবসময়ই মাফরুহা চৌধুরীকে তাঁর সঙ্গে কাজ করতে দেখেছি। ১৯৪৮ সনে তাঁদের বিয়ে হয়। স্বামীর উৎসাহেই তিনি বিএ, বিএড পাস করেন। মাফরুহা চৌধুরীর কথা সাহিত্যিক হিসেবে যে প্রতিষ্ঠা তার পেছনে ছিলেন একজন গুণগ্রাহী স্বামী। আর তালিম হোসেনের যে দীর্ঘ সংগ্রামী জীবন কবি হিসেবে ও নজরুল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তার পেছনে ছিলেন একজন নিবেদিতা স্ত্রী। এই দু’জনের পরিপূরক ভূমিকা আমাদের সমাজে একটি আদর্শ বৈকি। ২২শে ফেব্রুয়ারি সকালটা তাই বেদনাবিধুর। সর্বংসহা মাফরুহা চৌধরীর সাথীদাত্রী রূপটি আমার কাছে বেদনাদায়ক। সঙ্গীতে তাদের তিনটি উপহার।
তালিম হোসেন-মাফরুহা চৌধুরীর। শবনম, পারভীন, ইয়াসমীন, কী সুন্দর তিনটি নাম। প্রত্যেকের কণ্ঠমাধুর্য আলাদা, আলাদা পরিবেশনভঙ্গি, আলাদা সৌকর্য। কবি একদিন আমাকে ফোন করে বললেন : বুলু আমার ছোট মেয়েটির গান শুনেছো? গলার কাজ লক্ষ্য করেছো? আমি কোনোদিন ভাবিনি ও এত ভালো গজল গাইবে। বললাম : শুনেছি, রেডিওতে। আমি চমৎকৃত। যদি ভালো ট্রেইনার থাকত তাহলে উপমহাদেশে ও হতো টপ গজল সিঙ্গারদের মধ্যে একজন। আমার কথা শুনে কবি হয়ত খুশি হয়ে উঠলেন, যেমন আমি একটুকুতেই খুশি হয়ে উঠি যখন কেউ আমার মেয়ে সামিরা ও লাবণীর গলার প্রশংসা করে।
টেলিভিশনে ‘আমার ঠিকানা ও ভরা নদীর বাঁকে’ নামে দু’টি লোকসংস্কৃতিভিত্তিক অনুষ্ঠান পরিচালনা করার সময় শবনমকে পাওয়া গেল না। তখন পারভীনকে শেখালাম কয়েকটি লোকসঙ্গীত। সুন্দর তার গলা ও ভঙ্গি। জনপ্রিয়তা পেল তার পরিবেশনা। কবি ফোন করলেন একদিন আমাকে : বুলু, পারভীনের গাওয়া ও রঙ্গিলা নায়ের মাঝি গানটি কি তুমি শিখিয়েছ? আমি বললাম, ‘না। মুসা আহমেদ শিখিয়েছে। আমি ঠিক করে দিয়েছি।’ উনি বললেন, ‘কেমন গেয়েছে বলে তোমার ধারণা!’ আমি বললাম, ‘এক কথায় অপূর্ব। আমার আব্বার এই বিখ্যাত গানটির সেন্টিমেন্টটা সে সঠিক ধরতে পেরেছে।’
শবনম নজরুল সঙ্গীতের একজন সার্থক রূপকার। তাঁর মিষ্টি গলা নজরুলের গানে একটি নতুন আমেজ এনে দেয়। কাজী সব্যসাচী ও কাজী অনিরুদ্ধ আমাকে এ কথা বলেছেন। তাঁর গানের সিডি এখন দেশে-বিদেশে সবাই খোঁজে।
তালিম হোসেন সঙ্গীত ভালোবাসতেন। হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান গাইতেন উদাত্ত গলায়, নজরুলের ইসলামী গান, হামদ, নাত ও গজল। এ কথাও সত্যি যে তিনি আমার গানের সমঝদার ছিলেন। বলতেন, তুমি তোমার আব্বার অনেকটাই পেয়েছ। জানি না সত্যি কি না। তবে কবি আমাকে চিরদিন ভালো চোখে দেখতেন।
তালিম হোসেন ট্রাস্টের অনুষ্ঠান হয় ২০ মে ১৯৯৮ জাতীয় জাদুঘর মূল মিলনায়তনে। কল্পতরু সেনগুপ্ত ও খালেদ হোসেনকে তাদের অবদানের জন্য স্বীকৃতি দেয়া হয়। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সিদ্দিকুর রহমান, সানাউল্লাহ নূরী স্যুভেনিরে সুন্দর বক্তব্য রাখেন।
তালিম হোসেন বাংলা ভাষার একজন প্রধান কবি, তাঁর স্থান তিনি করে নিয়েছেন কবিতায় গানে, আর নজরুল একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। পরিণত বয়সে তিনি সমর্পণ করেছেন জীবন পরম বন্ধু মৃত্যুর কাছে। মৃত্যুই পরম সত্তার কাছে ফিরে যাওয়ার পথ। এ পথে আমরা সবাই ফিরব। আমাদের সবার দোয়া বেহেশতের বাগানে হোক তার স্থায়ী ঠিকানা।