টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমির দিকে যেতে চোখে পড়ে তিন রঙের তিনটা স্থম্ভ. যাতে লেখা রয়েছে ’৫২, ’৭১ ও ১৯। আর একটু সামনে যেতেই দেখা গেল এলইডি ডিসপ্লেতে পাঁচ ভাষাসৈনিকের ছবি আর সাথে বেজে চলছে ভায়োলিনে করুণ অথচ গৌরবোজ্জ্বল সুর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি…।’
‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ যে মেলাটার জন্য বাংলার পাঠক, লেখক, প্রকাশক ও আপামর জনসাধারণ একটা বছর অপেক্ষা করে থাকেন। এ মেলা বাঙালি জাতি ও বাংলাভাষাকে বিশ্বদরবারে অন্যভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়।
এবারের গ্রন্থমেলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভ উদ্বোধনের মাধ্যমে শুরু হয়। সে সময় তাঁর সাথে ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা। দিনটি ছিল ১লা ফেব্রুয়ারি শুক্রবার। প্রতিবারের মতো এবারও গ্রন্থমেলা বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সোহরাওয়ার্দীতে স্টল বারদ্দ দেয়া হয়েছে ৭৭০টি এবং ২৪টি প্যাভিলিয়ন। বাংলা একাডেমির মধ্যে লিটল ম্যাগের স্টল দেয়া হয়েছে ১৮২টি যার মধ্যে ওপেন স্টল ৫০টি। স্টল বিন্যাসের ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমির সাথে এবার সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন এদেশের স্বনামধন্য স্থপতি ইনামুল কবির নির্ঝর এবং তাঁর দল। অঙ্গসজ্জা ও অন্যান্য অনেক কাজে যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রসিদ্ধ সব শিল্পী ও চিত্রকরগণ। পাঁচ ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এবার মেলার মধ্যে করা হয়েছে পাঁচটি চত্বর। যথাক্রমে শহীদ সালাম চত্বর, শহীদ রফিক চত্বর, শহীদ বরকত চত্বর, শহীদ জব্বার চত্বর ও শহীদ শফিউর চত্বর। যার চারটি সোহরাওয়ার্দীতে ও একটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। এ ছাড়া প্রতিবারের মতো আছে শিশুচত্বর।
মোড়ক উন্মোচন মঞ্চ ছাড়াও এবার লেখকদের জন্য আলাদা একটা মঞ্চের ব্যবস্থা করা হয়েছে ‘লেখক বলছি…।’ প্রতিদিন পাঁচজন লেখক বিশ মিনিট করে তাঁদের বই ও লেখালেখি নিয়ে কথা বলতে পারবেন। বিকাল পাঁচটা থেকে এ মঞ্চের কার্যক্রম শুরু হয়।
এবারের বই মেলার জায়গা আরও বড় করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী বা হাঁটাচলাচলে অক্ষম ব্যক্তিদের জন্য রাখা হয়েছে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা। মেলার নিরাপত্তার জন্য নেয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ। মেলার খাবারের দোকানগুলোতে এবার কর্তৃপক্ষের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
অন্যবারের তুলনায় এবার প্রথম থেকেই ছিল পাঠকের ভিড়। সেই সাথে ছিল লেখক ও প্রকাশকের আনাগোনা। সপ্তাহের শুক্র-শনিবার মেলা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। বন্ধের দিন থাকাতে অনেক লেখকও আসেন এই দিনগুলোতে। পাঠক দেখা পান তাদের প্রিয় লেখকদের। প্রিয় লেখকের দেখা পেয়ে এবং অটোগ্রাফ নিয়ে খুশি অনেক পাঠক।
এবারের ১৩ ফেব্রুয়ারি ছিল ১লা ফাল্গুন এবং ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ফলে এই দু’দিন মেলাতে তরুণ-তরুণীর আনাগোনা অনেক বেশি ছিল। হাতে ছিল বইয়ের পাশাপাশি ফুল। অনেক তরুণীকে দেখা গেছে শাড়ি পরে আসতে। তরুণ-তরুণীর পাশাপাশি অনেকে এসেছেন তাদের পরিবারের সাথে।
এবারের বই মেলায় স্টলগুলোর অঙ্গসজ্জা ছিল চোখে পড়ার মত। অনেক স্টল লেখকের ছবি ব্যবহার করেছেন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পানির সাইটটা খোলা রাখাতে স্বাধীনতা স্থম্ভকে মেলার অংশ বলেই মনে হয় এবং মেলায় আশা ক্লান্ত পাঠক বিশ্রাম করতে পেরেছেন পানির ধারে বসে।
বইমেলা যখন জমে উঠেছে তখনই সবাইকে চোখের জলে ভাসিয়ে ওপারে চলে গেলেন বাংলাসাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ। ‘সোনালি কাবিনের’ কবি চলে গেলেন ১৫ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে।
আবহাওয়া ভালো যাচ্ছিল না। মেলা কর্তৃপক্ষ বারবার মাইকে সতর্ক করে দিচ্ছিলেন ঝড় ও বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে। সেই সম্ভাবনা সত্যি করে ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে বেশ জোরেশোরে শুরু হলো বৃষ্টি। যে সকল স্টল আগে থেকে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন তারা বেঁচে গেছেন। বাকিরা অনেকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকেরই লাখ টাকার বেশি বই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্টলও ভেঙে পড়েছিল। সোহরাওয়ার্দী ও বাংলা একাডেমির মধ্যে হালকা পানি জমেছিল। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা তা সময়মতো অপসারণ করেন। বৃষ্টির দিন বিকালে সময়মত মেলা শুরু হয়েছিল এবং সেদিন পাঠকের আগমনও ছিল চোখে পড়ার মত। বৃষ্টিতে একটা উপকার হয়েছে, সেটা হলো ধুলার উৎপাত কমেছে। তাতে মেলায় একটা ঝকঝকে পরিবেশ ফিরে এসেছে।
বাংলা একাডেমি ও প্রকাশকদের তথ্য মতে এবার নতুন লেখকদের বই অন্যবারের তুলনায় বেশি প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়া নবীন, তরুণ ও প্রবীণ লেখকদের বইও প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা একাডেমির তথ্য মতে ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট নতুন বই এসেছে ২৬৮৭টি, এর মধ্যে কবিতা-৮৩৮টি, গল্প-৪৩৭, উপন্যাস-৪২৮টি। এ ছাড়া প্রবন্ধ, গবেষণা, মুক্তিযুদ্ধ, ছড়া, শিশুতোষ ও অন্যান্য বই। প্রকাশকদের মতে এবার শুরু থেকেই বইয়ের বিক্রি ভালো ছিল। পাঠক প্রবীণ লেখকদের পাশাপাশি তরুণ ও নতুন লেখকদের বইও ভালোভাবে গ্রহণ করছেন।
বইমেলায় প্রকাশিত প্রবীণ লেখকদের বই, বিশিষ্টি শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট এবনে গোলাম সামাদের ‘বাংলাদেশ : সমাজ সংস্কৃতি রাজনীতি প্রতিক্রিয়া’ এবং ‘বাংলাদেশে ইসলাম’ শিরোনামে গ্রন্থ দু’টি এসেছে পরিলেখ প্রকাশনী থেকে। একই প্রকাশনী থেকে এসেছে কবি খুরশীদ আলম বাবু’র কাব্যগ্রন্থ ‘সক্রেটিসের সাথে একদিন’, কবি ও গবেষক ফজলুল হক তুহিনের কাব্যগ্রন্থ ‘উজানে উৎস’ এবং কথাশিল্পী মাতিউর রাহমানের শিশুতোষগল্পগ্রন্থ ‘রমিমের ইচ্ছা পূরণ’। প্রথমা প্রকাশন থেকে আনিসুল হকের ‘এই পথে আলো জ্বেলে’ ও ‘সফল যদি হতে চাও’, আগামী প্রকাশন থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘মুক্তিযুদ্ধের গল্প’ ও ফরিদুর রেজা সাগরের ‘এবারে সাভারে’। ঐতিহ্য থেকে এসেছে বুলবুল সরওয়ারের ভ্রমণগদ্য ‘মহাভারতের পথে তিন’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস থেকে আসাদুল্লাহ্ মামুনের শিশুতোষগ্রন্থ ‘টুলু মামার কাণ্ড’ ও কাকলী প্রকাশ থেকে ‘টুলু মামার মজার গল্প’, অর্জন থেকে আহসান হাবীবের ‘উন্মাদীয় রম্য’, বিভাস থেকে নির্মলেন্দু গুণের ‘কবিতাকুঞ্জ’, অক্ষর থেকে হাসান হাফিজের ‘মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠকবিতা’, আদিগ্রন্থ থেকে আলম তালুকদারের ‘দশ ফালি রোদ’, চমন প্রকাশ থেকে এসেছে কবি বান্দা হাফিজের কাব্যগ্রন্থ ‘নৃপতি ঘুঙুর হয় কবিদের পায়ে’। চৈতন্য থেকে কথাকার ফাহ্মিদা বারী’র ‘ছায়াপথ’।
বইমেলায় নবীন ও তরুণ লেখকদের বই পদক্ষেপ থেকে মামুন সারওয়ারের ‘আঁকতে আঁকতে হলদে পাখি’, অন্বেষা থেকে কিঙ্কর আহসানের ‘বিবিয়ানা’, আদি থেকে রফিকুজ্জামান সিফাতের ‘মনোপাখি’, য়ারোয়া বুক থেকে এসেছে তরুণ গবেষক চৈতী রাণী সাহার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘আসাদ চৌধুরীর কবিতালোক’, অক্ষরপ্রকাশ থেকে জান্নাতুল যূথী’র গবেষণাগ্রন্থ ‘দিলারা হাশেমের উপন্যাস : বিষয় ও প্রকরণ’, ছায়াবীথি থেকে শাহীন রহমানের ‘আবার আসব ফিরে’, চন্দ্রাবতী একাডেমি থেকে রোমেন রায়হানের ‘রুহামনামা’, নালন্দা থেকে তকিব তৌফিকের ‘অধ্যায়’ এবং মনোয়ারুল ইসলামের ‘বকুল ফুল’।
প্রতিবারের মতো এবারও বাংলা একাডেমির বই বিক্রির হার খুব বেশি। তবে অন্যান্য স্টল মালিকেরা ২১, ২২ ও ২৩ পরপর তিন দিন ছুটি থাকায় বই বিক্রির একটা বড় সম্ভাবনা দেখেছেন। আর যদি কোনো দুর্যোগ না হয় তবে লেখক, পাঠক ও প্রকাশক সবাই খুশি মনেই ঘরে ফিরতে পারবেন।