বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ফলশ্রুতি পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম লীগ সরকারের পতন ও যুক্তফ্রন্টের বিজয়। তাদের একুশ দফা প্রতিশ্রুতির অন্যতম ছিল প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বর্ধমান হাউজে বাংলাভাষা উন্নয়নের গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা। তাই সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলা একাডেমি। তার হীরকজয়ন্তী উদযাপিত হয়েছে।
কোন জাতির জীবনে পঞ্চাশ/ষাট বছর তেমন কিছু না, তবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জীবনে পঞ্চাশ বছর অনেক। তাই আমরা প্রতিষ্ঠানের ২৫ বছর, ৫০ বছর, হীরকজয়ন্তী বা শতবর্ষ পূর্তি পালন করি। সে ভাবেই কয়েক বছর পূর্বে বাংলা একাডেমির ষাট বছরপূর্তি পালন করেছি। সকল প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও চরিত্র তৈরি হতে কিছু সময়ের প্রয়োজন। এই দীর্ঘ দিনে এর অবকাঠামো ও চরিত্র নির্ণীত হয়ে যাওয়ার কথা। হয়েছেও। বাংলা একাডেমির চরিত্র আজ অনেকাংশে স্পষ্ট। স্পষ্ট দিকটি প্রায় সকলের নিকট পরিচিত। স্পষ্ট দিকের মধ্যে রয়েছে এর প্রকাশনা ও বইমেলা; জীবিত কবি-সাহিত্যিককে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করা; প্রয়াত কবি-সাহিত্যিককে স্মরণ করা ইত্যাদি। আরও অনেক কাজ একাডেমি করে থাকে যার তথ্য এর বার্ষিক প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।
পঞ্চাশ ষাট বছর পর সম্ভবত একটুখানি স্থির হয়ে চিন্তা করা আবশ্যক বাংলা একাডেমি কী কী কাজ করেনি অথবা বাংলা একাডেমির এই দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ফলে জাতীয় জীবনে আমাদের সাহিত্য ও ভাষার কতখানি অগ্রগতি হয়েছে। তাই একাডেমির কর্মের মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন, একান্তই প্রয়োজন।
একাডেমির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের বা প্রকৌশলীদের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার থিসিস বাংলায় হয় না। কারণ আমরা মনে করি ইংরেজির মাধ্যমে আমি বিদেশে পরিচিতি লাভ করব। হয়তো তখন সেখানে কোন সুযোগ লাভ হবে। দেশে আমার মেধার কোন স্বীকৃতি লাভের সম্ভাবনা নেই। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর কদর আছে কিন্তু বিজ্ঞানের কদর নেই। কবিতা থেকে সাহিত্যের নানা বিষয়ে পুরস্কার দেয়া হয় কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় লেখার জন্য তেমন কোন পুরস্কার আছে বলে মনে হয় না। প্রতি বছর কবিকে বা গল্পলেখককে একুশের পদক দেয়া হয়। কোন বিজ্ঞানীকে সহজে একুশের পদক দেয়া হয় না।
সন্দেহ নেই বাংলা একাডেমি অনেক কাজ করেছে- কয়েক হাজার বই প্রকাশ করেছে, বহু সাহিত্যিককে পুরস্কৃত করেছে, শত শত আলোচনা সভার আয়োজন করেছে, একুশের বইমেলা করেছে এবং সেই মেলাকে ক্রমাগত বিস্তৃত করেছে। ইত্যাদি বহুবিধ কাজ করেছে। তবু ভাবতে ইচ্ছা করে যে বাংলা একাডেমি কোন কোন কাজ করেনি যা সে করতে পারতো।
বাংলা একাডেমি কি আমাদের মন মানসিকতার ওপর কোন প্রকার প্রভাব ফেলতে পেরেছে? এটা আমাদের জানা দরকার। কথাটি কি আর একটু স্পষ্ট করে বলা যেতে পারে। বাংলা একাডেমির প্রতিষ্ঠাকাল হতে স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত সময় বাংলা একাডেমির ভূমিকা ছিল প্রতীকী অথচ ব্যাপক, বিশাল। জাতি জানতো বাংলা একাডেমি শহীদ মিনারের মত ‘বর্ধমান হাউজ’ ভবনে আছে। বাংলা একাডেমি কী কাজ করে তা জানার প্রয়োজন ছিল না। বাংলা একাডেমিকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিশাল শামিয়ানা খাটিয়ে তেমন কিছু করার প্রয়োজন ছিল না। বাংলা একাডেমির উপস্থিতিই ছিল জাতির জন্য যথেষ্ট। সময়ের কারণে বাংলা একাডেমির উপস্থিতিই ছিল প্রতিবাদী। সাংগঠনিক নয়। এদিকে দিয়ে অনেক সহজ। যদিও অনেক ধ্রুপদী গ্রন্থ অনূদিত হয়েছিল। বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য পপুলার বিজ্ঞান সিরিজের বই প্রকাশিত হয়েছিল। তার ফলশ্রুতিতে আল মুতি শরফউদ্দীন ইউনেস্কোর কলিঙ্গ পুরস্কার পেয়েছিলেন। তবে ২১ ফেব্র“য়ারি ও বাংলা একাডেমি প্রতি বছর স্মরণ করিয়ে দিতো আমাদের কী নেই এবং আমাদের কী প্রয়োজন। আমরা উদ্বুদ্ধ হতাম। আমরা তা ই চাইতাম। এমনি করে চাইতে চাইতে চাইলাম স্বাধীনতা। পেলাম স্বাধীনতা।
বাংলা একাডেমির কর্মকাণ্ডের প্রভাবে চালিত হওয়ার কথা রাষ্ট্রীয় যাবতীয় কাজকর্ম বাংলায় এবং বাংলাই একমাত্র শিক্ষার মাধ্যম হয়ে থাকার কথা ছিল, অথচ হয়নি এবং যারা ইংরেজি শিখবে পড়বে বলবে ও লিখবে তারা সত্যই ভালো ইংরেজি শিখতে পারবে। ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ, জাপানি ইত্যাদি বিশ্বের সকল ভাষার পণ্ডিত থাকবে এদেশেই। ও লেভেল আর এ লেভেল পরীক্ষা দেয়ার জন্য জাতি উন্মাদ হয়ে যাবে না। বিদেশে পড়তে না গিয়ে বিদেশ থেকেই এখানে পড়তে আসবে, সব বিষয়ে না হলেও; কোন কোন বিষয়েতো বটে। যেমন জাপানিরা জাপানেই পড়ে, রাশিয়ানরা রাশিয়াতেই পড়ে, ফরাসিরা ফ্রান্সে পড়ে ইংরেজরা ইংল্যান্ডে পড়ে। উচ্চশিক্ষার জন্য কেউ বিদেশে যায় না। এমনকি ভিয়েতনামের ছেলেরা ভিয়েতনামে থেকেই উচ্চশিক্ষা লাভ করে। তেমনি আমাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে যাবে না। আমাদের মেধাবী ছেলেমেয়েরা দেশের উন্নয়নে অবদান রাখবে। এমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি করাটাই সম্ভবত ছিল বাংলা একাডেমির কাজ। সেই কাক্সিক্ষত সাংস্কৃতিক পরিবেশ সৃষ্টি হবে। কিন্তু তেমন পরিবেশ তো সৃষ্টি হয়নি।
বাংলা একাডেমির কাজ আমাদের ওপর কোন প্রভাব বিস্তার করেনি। আমার মনে হয় আমাদের কোন পরিবর্তন হয়নি। যদি তাই হতো তবে আমরা ইংরেজির পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেখতে পেতাম না। ইংরেজির পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজন এক নয়।
আমার ধারণা আমরা সঠিকভাবে বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা না করে ঔপনিবেশিক মানসিকতা নিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় বাংলাকে না এনে ঢালাওভাবে একমাত্র ইংরেজি শিক্ষা প্রসারের চেষ্টা করেছি। এ প্রকৃতির শিক্ষা যে আমাদের মেধাকে দেশান্তরী করেছে তা আমরা বুঝতে পারিনি।
সুদীর্ঘ ষাট বছরের কর্মকাণ্ড নিয়ে নিরপেক্ষভাবে জরিপ, গবেষণা বা মূল্যায়ন করার কোনো ব্যবস্থা কি করা যায় না?
একাডেমির কর্মকাণ্ডের সঙ্গে বিজ্ঞানীদের বা প্রকৌশলীদের কোনো সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় না। বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণার থিসিস বাংলায় হয় না। কারণ আমরা মনে করি ইংরেজির মাধ্যমে আমি বিদেশে পরিচিতি লাভ করব। হয়তো তখন সেখানে কোন সুযোগ লাভ হবে। দেশে আমার মেধার কোন স্বীকৃতি লাভের সম্ভাবনা নেই। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর কদর আছে কিন্তু বিজ্ঞানের কদর নেই। কবিতা থেকে সাহিত্যের নানা বিষয়ে পুরস্কার দেয়া হয় কিন্তু বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় লেখার জন্য তেমন কোন পুরস্কার আছে বলে মনে হয় না। প্রতি বছর কবিকে বা গল্পলেখককে একুশের পদক দেয়া হয়। কোন বিজ্ঞানীকে সহজে একুশের পদক দেয়া হয় না। তাদেরকে খুব বেশি হলে একাডেমির ফেলো করে নামেমাত্র, সম্মান প্রদর্শন করা হয়। দীর্ঘ অর্ধশতাধিক বর্ষ যাবৎ বাংলা একাডেমি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখার জন্ম কবি-সাহিত্যিককে পৃষ্ঠপোষকতা দান করেছে। বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থ রচনার জন্য কোন বিজ্ঞানীকে সম্মানিত বা পুরস্কৃত করার চিন্তাও আমরা করেছি বলে মনে হয় না।
ভাষার উন্নতি বলতে আমরা কী বুঝি? কবির সংখ্যা বৃদ্ধি? সাহিত্যিকের সংখ্যা বৃদ্ধি? ও সেই সঙ্গে প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধি? ভাষা উন্নয়নের মানদণ্ড কী? বাংলা ভাষা নিয়ে আমরা গর্ব করি। কিন্তু সেই ভাষার কতটা উন্নতি সাধন আমরা করতে পেরেছি তা কি কখনো ভেবেছি? বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন ভাষার কবি -সাহিত্যিক নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানি, রুশ, জাপানি ও স্পেনিশ ভাষায় একাধিক সাহিত্যিক নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। অন্য দিকে কেবল সাহিত্যে নয়, তারা বিজ্ঞানে আরো অনেক বেশি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। বাংলা ভাষার কবি রবীন্দ্রনাথই একমাত্র কবি নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন কারণ তার তেমন মেধা ছিল। আর ড. ইউনূস সাহিত্যে নয়, বিজ্ঞানে নয়, শান্তিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। আমরা মেধাবীদেরকে দেশান্তরী করি। তাই তো অমর্ত্য সেন আমেরিকায় অধ্যাপনা করে অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পান। আমরা বাংলা ভাষাকে কেবল সাহিত্যের ভাষা, কবিতার ভাষা করে রেখেছি। বিজ্ঞানের বা অর্থনীতির ভাষা করিনি।