দীর্ঘ এক স্বপ্নের শহর থেকে এসে দেখি
পলাশীর সেই প্রান্তর যেখানে সিরাজের শার্টে
মুখ মোছে মীর জাফরের হাত
আমাদের গলদেশে ফিরিঙ্গির শেকল পরিয়ে
পায়ে দিলো গোলামির জিঞ্জির
বেওকুফ জাতি ফ্যাল ফ্যাল চেয়ে রলো পরাজিত জীবনের দিকে
বাহাদুর শাহ জাফর এক কবি, এক সম্রাট বটে
পরাজয় তাকে নিঃসঙ্গতার নৃশংস পাথর চাপিয়ে দিলো বুকের ওপর
তার চৈতন্যের শিখায় ছিলো যে বারুদ
সে বারুদ তারই হৃদয় পুড়িয়ে ছাই করেছে চিরদিন
একজন সম্রাট-সাড়ে তিন হাত জমি মেলেনি তার
আজ ভাবি কী হাহাকার রচেছিল তার হৃদয়জুড়ে
পৃথিবীর ইতিহাস এতোই নির্জলা নির্মম এতই নিষ্ঠুর
মুছে ফেলে পরাজিতের সমস্ত স্মৃতি
বিজয় ঝংকারে নৃত্য করে শুধু
সমস্ত শরীর জুড়ে জয়ের যৌবন
সময়ের জিহ্বায় মুছে ফেলে পরাজয়ের গ্লানি
অথচ পরাজয়ের বিবরে কত খুন কত রক্তের দাগ
কত জীবনের করুণ কাহিনী জড়িয়ে
কে রাখে এসব বিমর্ষ খবর
তবুও এটুকু জানি মিথ্যের জাঁতায় পিষ্ট ইতিহাস
হঠাৎ সত্যের হাত ধরে জাগে
জেগে ওঠে মিথ্যের আবর্জনা ঠেলে
উচ্চকণ্ঠে বলে- দেখো এই আমি সত্যের পূজারি
আমার শরীরে নির্মিত অক্ষর কালের হাঙর থেকে মুক্ত
সত্যের সৌন্দর্য মণ্ডিত করেছে আমার হৃদয়
আমি নিত্য দূত-মাটির ভেতর থেকে বেড়ে উঠি বিস্ময়ে
কখনো কখনো ক্ষমতার দণ্ড আমাকে দাবিয়ে ডুবিয়ে রাখে
মিথ্যের জলে
দন্ডের উত্তাপ নিভে গেলে সত্যের সায়রে ভেসে উঠি আমি
আমি ইতিহাস-মৃত্যুহীন মহাকালের যাত্রী
আমার শরীর ভরা দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষের নাম
বুকের ভেতর পুঁতে রাখি স্বৈরণীর চোখ
আমার হৃদয় খুলে দেখো
সময়ের পৃষ্ঠাগুলো ভরে আছে অবিচারী শোষকের স্বেদে
কারো নাম আমি ভুলিনি-ভুলি না একদম
আমি এক উদার অভিধান-সকল শব্দের শোষক
পৃথিবীর সব জালিমের মনোগন্ধী জুলুম
নিগূঢ় অর্থশুদ্ধ অঙ্কিত আমার নিজস্ব অক্ষরে
আমাকে শাসন করার হাত দীর্ঘ করে যারা
তাদের হাতই গুটিয়ে গুঁজে রাখি আমার ভেতর
তারপর সময়ের উত্তাল ঢেউ উলঙ্গ উচ্ছ্বাসে খোলে আচ্ছাদন
দেখেই হাসির অট্টরোল পড়ে পৃথিবীর মুখে
আমিই ভেংচাই-চেতিয়ে তুলি এদের বেজন্মা কাহিনী
আমাকে দোষায় এমন হিম্মত নেই কারো
আমার সিনার ভেতর যতটা স্মৃতির ওয়েব উত্তুঙ্গ
তার সব সাহসের ইউটিউবে রক্ষিত
আমি পৃথিবীর রাজকীয় ঘটনাপ্রবাহের অবাক ব্যাংক
আমার লকারে গচ্ছিত সমস্ত সত্যের সোনা
যেই হোক ক্ষমতার যাজক- আমি তার বুক ফেঁড়ে তুলে ধরি
অকথ্য বয়ন
২.
ঠিক দেখো আমার বোগল তলে রাখা ফেরাউনের মুখ
নীল নদে ডুবে যাওয়া নিঃশ্বাস আজো আমার শরীরে
ছড়ায় উষ্ণতার জল
তার দু’টি চোখ নিভে গেছে জলের তাণ্ডবে
দেহ ভরা পশমগুলো স্রোতে আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন হলেও
শরীর রক্ষণ করে নদীর ফ্রিজ
‘সব চেয়ে বড় খোদা’-কী অসহায় সামান্য জলের কাছে
পৃথিবীর মানুষের চোখে তার দেহ আজো বিস্ময়!
আমার থলের ভেতর গুঁজিয়ে রাখা নমরূদের নাম কে না জানে
তার ক্ষমতার খবর- তার বোঁচা নাকের বিকট চেহারা
এবং হুতুম পেঁচার কোটর মতো চোখ দন্ডের উত্তাপে কাঁপতো
তার চোখে চোখ রাখার উদ্যম ছিলোই না কারো
তোমরা তো জানো- নমরূদ পৃথিবীর প্রথম স্বৈরাচার
ক্ষমতার মদমত্তে এতটাই বেসামাল নমরূদ-
খোদার আরশ জয় করার বোকামি প্ররোচিত করেছিলো তাকে
শকুন ডানায় ভর করে আকাশ জয়ে উড়েছিলো উন্মাদ
অনল কুন্ডলী থেকে প্রশান্ত-চিত্ত স্মিত হাসির ইবরাহীম
প্রকাশ্য হলে বিস্ময়ে বিমূঢ় তার আঁখি
বিড়বিড় পাগলের প্রলাপ বকেছিলো সেদিন
চোখে মুখে ফুটেছিলো মৃত্যুর ফুল!
সাদ্দাদের কথা নিশ্চয় ভোলোনি হে পৃথিবীর মানুষ
জগতের কোনো বাগানই তার সে জান্নাত সমান নয়
প্রমোদ নৃত্যের এত প্রকাণ্ড বিস্তার দেখেনি দুনিয়ার কেউ
সে বেহেশতের দরোজায় মুহূর্তে ঝরে গেলো ক্ষমতার সমস্ত উত্তাপ
বিস্ময়ের ঘোরে তার শেষ নিঃশ্বাস নিয়ে গেলো মরুর বাতাস
বিশ্বাস রাখো হে মানুষ- এই আমি জগতের ইতিহাস
সোনালি কাহিনী-দুর্গন্ধময় অধ্যায় এবং বিকৃত রুচির
বীভৎস ঘটনার পুঞ্জীভূত বুদবুদ আমার রক্ষণে বিলকুল
৩.
আমি কারো পক্ষের নই
কেবল সত্যের সদম্ভ উক্তির উচ্চারক
আমার বিবরে সমস্ত বিজয় সনদ অবিকল
দন্ডমত্তে উদ্ভ্রান্তির উল্লম্ফনে বেসামাল চোখের বারূদগুলো
কালের হিমে আমিই রাখি ডুবিয়ে
ধরো আবরাহার কথা-হস্তী বাহিনীর শক্তির প্রচণ্ডতা
কিভাবে ধুলায় ধসিয়ে দিলো ক্ষুদ্র আবাবিল
মরুভূর লু-হাওয়ার তেজে হাতিবাহিনীর চামড়া বৃষ্টির সাথে ঝরছিলো
নির্বিকার বিশ্বাসের বিভায় চেয়েছিলেন মুত্তালিব
‘যার ঘর-রক্ষণের দায়িত্বও তারই’-এমন উচ্চারণে
বোকার মতোন বিকট হাসিতে মরুভূ কাঁপিয়ে তুলেছিলো আবরাহা
সেই ঠা ঠা হাসির বিকট শব্দ মুহূর্তে মিশে গেল সাইমুম ঝড়ে
এজিদের মুখ কে ভুলবে পৃথিবীর
ফোরাতের জল সম ঘৃণা- ভাসায় ডোবায় তাকে
নিষ্ঠুরতার এমন নজির এমন নৃশংসতার উপমা
উপহার দিলো তারই সেনানী সীমার
অথচ প্রেমের অশ্রুতে ভিজে আছে কারবালার বুক
হোসেনের প্রেমে আজো পৃথিবীতে ওঠে কান্নার রোল
চেঙ্গিসের চোখ দেখে ভয় হয়নি এমন কে ছিলো বলো
অথচ কালের ঝড়ে কি বিস্ময়ে নিভে গেলো চোখের আগুন
হালাকু খাঁর পা গিলে নিলো মাটির উদর
বিশ্বজয়ী বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট
আহা তার স্বপ্নের পৃথিবী-করতলে ক্ষমতার চাবি
দু’টি শূন্য হাত ছড়িয়ে খাটিয়া হেঁটে গেলো মাটির ঔরসে
হিটলারের যৌবন ভাসিয়েছিলো পৃথিবীকে
অদম্য লিপ্সার লকলকে আগুন তাকেই পুড়িয়েছে হায়
জঘন্য দৃশের সাক্ষী তারই চোখ
তারই নৃশংসতার নিশান ইতিহাসের পাখায় দুলছে
হোক বিশশতকের বুশ অথবা একবিংশের সুচি
মানুষের খুনে রঞ্জিত যাদের হাত
যারা মানুষের বুক থেকে কেড়ে নেয় প্রশ্বাস
তাদের জীবন রেখায় জাগ্রত নির্মম দাগ
৪.
পৃথিবীর সেই প্রথম মানব থেকে আজতক
কি বিস্ময় মানুষের মিছিল-যাচ্ছে ভবিষ্যতের দিকে
যাচ্ছে প্রেম ও প্রার্থনার গান করে
প্রেমের টানই জগতের স্থিতির শিল্প
অথচ মানুষ মানুষের খুনি
মানুষই মানুষের গুপ্ত ঘাতক
জঘন্য হন্তারক এইসব মানুষ কলঙ্কের ভাগী
জিঘাংসায় বিকৃত মানুষ দেশে দেশে দ্রষ্টব্য
মানুষের খুনে লালে লাল তাদের হাত
ওই যে দেখুন ফিলিস্তিনের বুক-রক্তের ছিটানি বাতাসে প্রতিদিন
আরাকানে মানুষ খুনের উৎসব-সিরিয়ায় সীমাহীন বর্বরতা
ইরাক খুনের নহরে ভাসছে-রক্তনদী নিত্য এখন আফগানের বুকে
ভেবো না ভুলেছি তোমাদের বাংলাদেশ
সাগর সমান রক্তের উপহার নিয়েছে মুক্তির সূর্য
পৃথিবীর ইতিহাসে এক বিস্ময় একাত্তর
কি প্রবল বেগে উড়েছিলো স্বাধীনতার পতাকা
এর মূলে জাগ্রত অসংখ্য শহীদ
অজস্র স্বপ্নের সমাধি এই বাংলাদেশ
কত জীবনের দুঃখ জমা এই মাটির বিবরে
লড়াই সংগ্রাম ঝড়ের গতিতে প্রতিবাদের ধুম
কত অবিচারীর খড়গ খসে গেছে সহসা
সত্যের পক্ষে ঠিক ঠিক ফোঁসে ওঠে বাংলার মানুষ
৫.
মনে আছে ইবনে বতুতার সেই উপলব্ধির বাণী
বলেছিলেন তিনি-বাংলাদেশ উত্তম জিনিসে পরিপূর্ণ এক নরক
হোক না নরক তবুও উত্তম জিনিসে পরিপূর্ণ-এইতো বাংলাদেশ
বাংলাদেশ পীরের দেশ- আউলিয়ার দেশ-শত শত দরবেশের দেশ
এ মাটির বুকে শুয়ে সেই পীর সেই দরবেশ-যারা
কেবল সত্যের গানে ছিলেন মুখর
যারা ঊর্ধ্বে তুলেছেন মানুষের মর্যাদার মুকুট
এ মাটি পবিত্র-মাটির সর্বত্র ওলিদের সেজদার দাগ
সবুজ ঘাসের ওপর জায়নামাজের বিছানা
অসংখ্য আওলিয়ার পদভারে নির্বিঘ্ন এ জমিন
অজস্র গাউস কুতুব ঘুমিয়ে এ মাটির ভেতর
অসূচির নগ্নগন্ধ মাখায় না এ মাটির শরীর
দেখো সেই দৃশ্য-সেই চার কোণার চার খুঁটি
শাহজালাল শাহ মাখদুম খান জাহান আলী এবং
বারো আওলিয়ার পবিত্র দেহের নিশানি
মানুষের জিহ্বা সেলাই করার কল যত হোক দাম্ভিক
তবু সে বিচূর্ণ আয়নার মতো চুরচুর হবে
তবু খান খান হবে ধ্বংসের দণ্ডে
মানুষ যাদের কাছে মানুষ বিবেচ্য নয়
ক্ষমতার দম্ভে যারা রাতকে দিনের দিকে ঠেলে
এবং দিনকে ডোবায় রাতের গহনে
তাদের চোখও একদিন হবে আলোহীন
একদিন ক্ষমতার শক্ত হাত পাঁজরের পাশে হবে একদম শিথিল
নিশ্চিত বিশ্বাস রাখো বুকের ভেতর
আমি ইতিহাস-আমিই খাবলে খাই এইসব
নিপীড়ক রাজা ও রাজন্যের সব
রাণীময় অহঙ্কারও কেবল আমার আহার
দৈত্যের ধ্বংসও আমার নিকট যৎকিঞ্চিৎ
পৃথিবীর বাতাসের কাছে দীর্ঘ করো শ্বাস
পরিধান করো ধৈর্যের বর্ম-শোনো
জালিমের শ্বাস ক্রমাগত ক্ষীণ থেকে হবে ক্ষীণতর
একদিন বাজবেই বাঁশি বিজয়ের
একদিন আসবেই শান্তির কপোত
এইতো সামনে নতুন আগামীকাল।