‘পাবলিকের বাচ্চারা এখন হাসপাতালে যাওয়া শিখছে। দুশ্শালা, দুইশ টাকাও বেচা বিক্রি হলো না’- স্বগোক্তি করতে করতে কাঠের টুলে বসে পড়ে একটা সিগারেট ধরায় টুবলু তালুকদার। হাইওয়ে এলাকার লোকজন অবশ্য তাকে টুবলু কবিরাজ বলেই চেনে। তার মন মেজাজ এই মুহূর্তে খুব বেশি সুপ্রসন্ন নয়। বাঁশির সুর শুনে তার বানরের বাঁদরামিতে আকৃষ্ট হওয়া যে পঁচিশ ত্রিশজন পাবলিক টানতে পেরেছিল এই বিকেলের মজমায়, তাদের প্রায় দশ বারোজন বাদে বাকি সবাই তার সর্বরোগহর শরবত না গিলেই যে যার মতো চলে গেছে। শরবত বানানোর ভেষজ শেকড় বাকড়ের প্যাকেটজাত গুঁড়োগুলোরও তেমন কাটতি হয় নাই। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা জম্পেশ মজমা শুরু করবে টুবলু তালুকদার। সে বেশ বুঝতে পেরেছে বাঁশি আর বাঁদরামি দিয়ে আজ আর বেশি লোক জড়ো করা কঠিন, বাক্সের গোখরাটাকেও বের করে আনতে হবে দু’চার পয়সা বেশি কামাই রোজগার করতে চাইলে। তার আগে টুলে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং তুলে কয়েকটা সুখটান মেরে নিচ্ছে। তার দোকানের ডান পাশে থুতনিতে হাত দিয়ে বসে আছে খয়ের মাহ্মুদ আর বাম পাশে দবির দেওয়ান দু’হাতে ছাতাটা খাড়া করে ধরে বসে আছে।
না হলেও পঞ্চাশটা কাচের বয়াম পঞ্চাশ পদের ভেষজ বীজফল, শেকড়-বাকড় আরও কিছু দিয়ে প্রায় কানায় কানায় পূর্ণ। কাচের বয়াম দিয়ে বেষ্টনী তৈরি করে তিনদিক থেকে তার দোকানটা ঘেরাও করে রাখা হয়েছে। অবশিষ্ট দিক পাকুর গাছের বিশাল গোড়াটা দিয়ে বেষ্টিত। তার তলে বসেই টুবলু তালুকদার একের পর এক সুখটান মেরে যাচ্ছে।
এই তিনটি প্রাণী ছাড়া বিরাট পাকুর তলায় এই সময়ে আর কোন জনমানব নেই। অবশ্য শত গজ দূরের হাইওয়েতে বাস-ট্রাক, লরি-ভারওয়ালা মানুষজনের অভাব নেই। দিন কি রাত হাইওয়ের দীর্ঘ বুকটার বিশ্রামও নাই। কথা হলো পাকুর তলায় এই তিন অপেক্ষমাণ কেউ কাউকে চেনে না, দেখেওনি কোনদিন। সেটাই স্বাভাবিক। টুবলু তালুকদারের মজমায় প্রতিদিন কত লোক এসে ভিড় করে। কেউ কেউ তার তেলেসমাতি বয়ানে মগজধোলাই হয়ে সর্বরোগহর শরবত এক দুই গ্লাস গিলে ফেলে অথবা শরবতের জন্য রেডিমেড মিক্স নিয়ে বাড়ি ফেরে। কেউ আবার স্রেফ রং তামাশা দেখে যে যার পথে হাঁটা ধরে- কে কাকে চিনে রাখে।
এমনও হয় দূরের কোন যাত্রী নিছক সময় কাটাতেই মজমায় এসে জমায়েত হয়। তাদের না থাকে সর্বরোগহর শরবত খাবার ক্ষণিক বাসনা, না থাকে তামাশা উপভোগ করার বিশেষ মানসিকতা। তাদেরই দুইজন খয়ের মাহ্মুদ ও দবির দেওয়ান। টুবলু তালুকদারের এই সমস্ত পাকাপাকিই জানা। প্রতিটি মজমা শেষ হবার পরও যে দু-একজন তার দোকানের চারপাশের কোন একপাশে বসে বা দাঁড়িয়ে থাকে, তাদের দেখলেই অনুমান করতে পারে এদের কাজ করার সময় এখনও হয় নাই। তার অনুমান মিথ্যে নয়। খয়ের মাহমুদ মান্দিনা নগর যাবে মান্দিনা নগরের ট্রেন রাত সোয়া নয়টায়।
খয়ের মাহমুদ মতো গাছপাগল মানুষ তার গ্রামে আর একটাও নাই। পেশায় স্কুলমাস্টার হলে হবে কি, তার ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা সব বৃক্ষরাজিকেন্দ্রিক। কি নাই তার পেছন বাড়ির বাগানটাতে! সাধারণ প্রজাতির আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু থেকে শুরু করে বিরল প্রজাতির পারুল, বন কাঁঠাল, কাজু বাদাম, চিকরাসী, কাউফল, আকন্দ, জামাল কোটার মতো গাছে তার বাগানটা যেন একটা জার্ম প্লাজম হয়ে উঠেছে। ইদানীং রাম্বুটান, ড্রাগনফল কিংবা ওকের মতো বিদেশী গাছগুলোর প্রতিও ঝুঁকেছে সে। তার দুঃখ একটাই- বাগানে রক্ত চন্দনের সুবাস নাই। সে দুঃখ মোচনের উদ্দেশ্যেই মান্দিনানগর যাত্রা। সহকর্মী শিক্ষকের কাছে জানতে পেরেছে ওখানে অংশুমান মাড়োয়ারির বাড়িতে মিলতে পারে রক্ত চন্দনের দেখা।
পাকুর গাছের ডাল-পাতার ফাঁক- ফোকর দিয়ে বিকেলের মৃদ্যু রোদ এসে পড়েছে খয়ের মাহ্মুদের চান্দি মাথায়। সে উঠে গিয়ে টুবলু তালুকদারের কাছাকাছি পাকুরের একটা হোৎকামোটা শেকড়ে আস্তে বসে পড়ে। চান্দিতে এখন আর সামান্য তাপও সহ্য হয় না। বয়সও তো কম হলো না- চাকরির মেয়াদ আছে হয়তো বড় জোর বছর দশেক। টুবলু তালুকদারকেও তার বাবা একজন আদর্শ মাস্টার বানাতে চেয়েছিলেন। দুইবার আইএ ফেল করে বাপের আশার প্রদীপে জল ঢেলে দিয়েছে সে। বাপের অভাবের সংসারে ভ্রুক্ষেপ না করে বাঁদরামি করে পার করেছে যৌবনের সোনালি দিনগুলো। তারপর পড়াশুনার মর্ম যখন সে বুঝলো তখন বাপ মা হারিয়ে পাক্কা এক এতিম বাস ড্রাইভার। টুবলু তালুকদারের অবশ্য একটা ‘গুণ’ ছিল। সে কথার মারপ্যাঁচে মানুষকে ভোলাতে পারত আবার ঘায়েলও করে ফেলতে পারত। শৈশব থেকেই তার এই বিশেষ গুণ ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হতে থাকে। আড্ডার সঙ্গীরা তার ‘আজাইরা’ গল্পগুলো মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনত। শিষ্ট বালকের মতো হাঁ-করে গিলত বলা যায়। শৈশব থেকেই তার চাল-চলনের মধ্যে রাজনৈতিক নেতার প্রতিচ্ছবি খুঁজে পায় অনেকে। এই গুণের সুবাদেই বাসের স্টিয়ারিং হুইল ফেলে পাকুর তলায় সর্বরোগহর শরবত বিক্রির পেশা বেছে নিয়েছে সে। তার স্বপ্নে পাওয়া বিশেষ শরবত নিয়মিত সেবনে কোন রোগ সারে না, সে প্রশ্ন করবার ফুরসত পায় না মজমায় জমায়েত মন্ত্রমুগ্ধ পাবলিক। মাজা ব্যথা, হাঁটু ব্যথা থেকে শুরু করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এমনকি কোন কোন ক্যান্সার পর্যন্ত বেমালুম গায়েব হয়ে যাবে তার শরবতের হেকমতি গুণে- এমনই দাবি তার। নারী-পুরুষের গোপন রোগের আশ্চর্য প্রতিষেধক হিসেবে তার কাছে আছে সোলেমানি হালুয়ার বিশেষ প্যাকেজ। কৈশোর-যৌবনে কিছু বইপত্র পড়ার ইতিহাসও আছে টুবলু তালুকদারের। কিছু নয়, বলতে গেলে বেশ অনেক বইপত্র সে গোগ্রাসে পড়ত। কেবল পাঠ্যবইগুলো বাদে। পঠন পাঠনতার নেহাতই কম নয়। রূপকথা, কিশোর ক্লাসিক্স, গোয়েন্দা কাহিনী, ফিকশন্স, জনপ্রিয় সব গল্প-উপন্যাস কিংবা চটকদার ম্যাগাজিনগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ত। যৌবনে তার তোশকের তলায় দুচারখানা চটি বই কখনো সখনো খুঁজে পেয়েছে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা।
তবে এ কথা বলতেই হবে, টুবলু তালুকদারের পঠিত বইপত্রের তালিকা আর খয়ের মাহমুদের পঠিত বইপত্রের তালিকার মাঝখানে রয়েছে বিস্তর একটা ফারাক। খয়ের মাহমুদের তালিকায় গ্যেটে, দস্তয়ভস্কি, তলস্তয়, মপাসাঁ থেকে শুরু করে রয়েছে বার্নার্ড শ, ফ্রয়েড, বের্টল্ট ব্রেশ্ট, সার্ত্রে, ফুকো, দেরিদা, এডওয়ার্ড সাঈদ, চিনুয়া আচেবে বা মুরাকামির মতো লেখকের বই। বাংলা ধ্রুপদী সাহিত্য গ্রন্থের তো অভাব নেই, আলমারির তিন তিনটে তাক তা দিয়েই পরিপূর্ণ। রবীন্দ্র রচনার অনেকটাই আয়ত্ত করে ফেলেছে প্রাক যৌবনেই- যখন নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র মাত্র। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ-ই সত্য, গ্রামের এই সাধারণ স্কুল মাস্টারের সংগ্রহে রয়েছে দান্তে, ভলতেয়ার, রুশো আর কান্টের মতো বাঘা বাঘা মানুষের গ্রন্থের অনুবাদও। এই ধরনের পাঠাভ্যাস চেতনালোকে রীতিমতো বিপ্লব ঘটিয়ে তার ব্যক্তিসত্তাকে পৌঁছে দিয়েছে সাধারণ স্কুল মাস্টার সত্তার অনেক ঊর্ধ্বে।
সে যাইহোক, দবির দেওয়ানের ব্যাপারটা কিন্তু একটু আলাদা। মূর্খ মানুষ। পৈতৃক জমিজমা কিছু ভাগে পেয়েছে। আছে গোটা কয় গরু ছাগল আর একটা ছোট খাটো ভেড়ার পাল। ধুনধুনির পশুহাটে তিনটা ভেড়া বেচে বাড়ি ফেরার পথে টুবলু তালুকদারের মজমায় ভিড়েছিল। মজমা টজমায় তার মন নেই। মন অন্যখানে। মজমায় এসে আর আর লোকের সাথে দাঁড়িয়েছে ‘অন্যখানে’ যাবার আগের সময়টা কবিরাজের অপরিমিত বয়ানের সাথে বাঁদরের মনুষ্য আচরণ দেখে পার করতে। তা ছাড়া এসব মজমায় ফণাতোলা গোখরার নাচও প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। পকেটে যেহেতু দবির দেওয়ানের কিছু কাঁচা পয়সা ঢুকেছে, বাড়ি ফেরার আগে একটা যাত্রাপালা দেখার খায়েশ হয়েছে তার। হাইওয়ের ওই পারে ঠিক উত্তরের ছাতিম গাছটার তলায় সন্ধ্যার পর পরই যাত্রাপালা শুরু হবে। দবির দেওয়ানের মুখে কাঁচা-পাকা এক গোছা দাড়ি। পরনে মোটা কাপড়ের টিয়ে রং ফতুয়া আর নীল সাদা রঙের গ্রামীণ চেকের নতুন লুঙ্গি। বয়সও তার একেবারে কম বলা যায় না। এমন একটা মুরুব্বি টাইপের মানুষকে যাত্রাপালার আশপাশে ঘুরঘুর করতে দেখলে লোকে কি না কি বলবে। কোন ইঁচড়ে পাকা ছোকড়া হয়তো তিরস্কারও করে বসতে পারে। তাই সন্ধ্যার অপেক্ষায় টুবলু তালুকদারের মজমা শেষেও পাকুর তলায় ঠায় বসে থাকা। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এলেই সুরত করে ঢুকে পড়বে হাইওয়ের ওইপারের যাত্রার সুরম্য প্যান্ডেলের ভেতর। যাত্রা দেখার জন্য দবির দেওয়ানের মন উতলা হয়ে আছে অন্য কারণে। কিছুদিন যাবৎ গ্রামের কঁচি ছোকরাগুলোর মনে কি যে রঙ লেগেছে। মিসকিনের ঘরের ছেলেটাও চুলে সরিষার তেল চপচপে মেখে যাত্রা দেখতে ছুটছে। গ্রামের উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম থেকে তার কানে কিছু কিছু ভয়ানক কথা বাতাসে ভেসে আসছিল। দবির দেওয়ানের ওসব বিশ্বাস হতে চায় নাই। যৌবনে গ্রামের দহলিজে অনেক যাত্রা দেখেছে অনেক রাত কাবার করে ; কস্মিনকালেও এমনটা দেখেনি সে। কিন্তু গত পরশু যখন পাশের গ্রামের আস্থাভাজন জুলমত কানে কানে ছবক দিল, ‘হাইওয়ের যাত্রায় খুউব দেখাতিছে ভায়রা’, তখন দবির দেওয়ানের পঞ্চাশোর্ধ্ব পোক্ত শরীরটাও কেমন শিরশির করে ওঠে। সে নিতান্তই সাদাসিধা মানুষ, কুটচালাকি অতোশত বোঝে না। কারও দুপয়সা মেরেও খায় না আবার বউ বাচ্চার ভাত কাপড়ের সংস্থানে বেশ মনোযোগীও বটে। এমনকি বিড়ি সিগারেট মুখে তুলবার বদঅভ্যাসটাও তেমন নাই। মাঝে মধ্যে মধু বিড়িটা অন্যের মুখ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দু একটা টান মারে- এর বেশি নয়। কেবল মেয়ে মানুষের ব্যাপার স্যাপারে তার আগ্রহটা বরাবরই একটু বেশি।
পোশাক আশাক, চেহারা সুরতে যা পার্থক্য থাকে থাক- পাকুর তলায় এই তিনটি প্রাণীতে এক কাকতালীয় মিল। তিনজনের বয়সই প্রায় কাছাকাছি। এতক্ষণ যে যার মতো আপন মনে ছিল, কারও সাথে কারও কথা হয় নাই। দবির দেওয়ান পাকুর গাছটার বিপরীতে হাইওয়ের পাশে সুবিশাল একটা বিলবোর্ডের দিকে কিছুটা নিমগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে। ‘ঐখানে হাতির ছবি লাগাছে ক্যা কবিরাজ ভাই? সার্কাস-টার্কাস আসতিছে নাকি?’ হাতের ছাতাটা বোর্ডের দিকে উঁচিয়ে ধরে দবির দেওয়ানই প্রথম তিনটি প্রাণীর মধ্যে বিরাজমান সুদীর্ঘ নীরবতা ভাঙে। টুবলু তালুকদার সিগারেটের ধোঁয়া নাক মুখ দিয়ে বাতাসে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলে, ‘না মিয়া, এটা ক্যাঙ্গারু মার্কা সিমেন্টের অ্যাডভার্টাইজ। ঐ কোম্পানি পাবলিকরে বুঝাতে চায় ওদের সিমেন্ট দিয়ে বানানো ব্রিজের ওপর দিয়া হাতি গেলেও কিচ্ছু হবে না। বুঝলা মিয়া?’ দবির দেওয়ান কিছুটা উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, ‘অ্যাডভার্টাইজটা কিন্তু বেশ সুন্দর হচ্ছে। গেল বার হাটে নেয়ার সময় আমার রাম ছাগলটারেই দুইজন মিলি ভ্যানত তুলবার যায়্যা জান বার হয়া যাতিছিল। তাইলে হাতির ওজনের কতা তো ভাবাই যায় না কবিরাজ। হাতির যে ওজন, একটা হাতি উঠলেই একটা পুলের ম্যারম্যারি উটি যাওয়ার কতা। সে জায়গাত তিন তিনখান হাতি বিরিজের ওপর দিয়া হাঁটি গেলেও বিরিজের কিচ্ছু হয় না। কি কতা বাহে ! কোম্পানি ভালো করিই বুঝাতে পারছে ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্ট এক নম্বরি সিমেন্ট।’ বাকি দুই জনার কথাবার্তার সূত্রে ইতোমধ্যে খয়ের মাহ্মুদের নজর পড়েছে সুবিশাল বিলবোর্ডটার ওপর। টুবলু তালুকদার টুলে বসা অবস্থাতেই একটু বাঁয়ের দিকে ঝুঁকে দবির দেওয়ানকে যেন ধমকের সুরেই বলে বসে, ‘কি কও মিয়া! ঐ অ্যাডভার্টাইজের আইডিয়াটা কার জানো? গাধার বাচ্চার, গাধার বাচ্চার।’ ‘গাধার বাচ্চার!’- দবির দেওয়ান একটু অবাক হয়। ‘গাধার বাচ্চার আইডিয়া নয়তো কি! আরে হাতির আর এমন কি ওজন মিয়া। হাতির বদলে ধানের বস্তা বোঝাই তিনটা ট্রাক যদি ব্রিজের ওপর দেখাত, পাবলিক ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্ট ছাড়া আর কিছু বুঝতোই না। না হয় তিনটা স্টিম রোলারও যদি ব্রিজের ওপর রেখে ছবিটা তুলতো, তাহলে সিমেন্টের হেকমতি আমার সোলেমানি হালুয়ার হেকমতির মতোই মনে হতো। রাস্তা বানানি স্টিম রোলারের ওজন জানো মিয়া? এই কম্পিউটার প্রযুক্তির যুগে ব্রিজের ওপর দিয়া বন-জঙ্গলের হাতি টাতি আর যায় নাকি? দেখছিলা কোনদিন? শিক্ষিত মানুষের মগজ আজকাল আউলিয়া গেছে, মগজের ভেতর মাল নাই। যত্তসব ফাউল আইডিয়াবাজ।’ দবির আলী শুধু নড়েচড়ে বসে একটু, কিছু বলে না। আসলে টুবলু তালুকদারের জোর গলার কথাগুলোর পিঠে বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না সে। হয়তো কবিরাজ ব্যাটার কথাই ঠিক।
খয়ের মাহমুদ এতক্ষণ দুইজনের কথাবার্তা শুনছিল আর সুবিশাল বিলবোর্ডটার দিকে নিবিড়ভাবে তাকিয়ে ছিল। হাতি তিনটা গায়ে গতরে মস্তবড়- আফ্রিকান হাতি। এবার সে টুবলু তালুকদারের দিকে মুখ ফেরায়, ‘আমার কাছেও কিন্তু মনে হচ্ছে অ্যাডভার্টাইজমেন্টের আইডিয়াটা বেশ চমৎকার হয়েছে। তিনটা হাতি ব্রিজের ওপর তুলে দেয়াতে ব্রিজের শক্তি-সামর্থ্য যথেষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছি। সেই সাথে ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের হেকমতিও।’ টুবলু তালুকদার খানিকটা বিরক্ত চোখে মুখে খয়ের মাহমুদের দিকে তাকায়। মাস আটেক আগে প্রথম যখন বিল বোর্ডটা এখানে স্থাপন করা হয়, তখনই বিজ্ঞাপন চিত্রটির আইডিয়ার ব্যর্থতা নিয়ে সে একটু আধটু ভেবেছে। পেশাসূত্রেই প্রতিদিন ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের বিজ্ঞাপনচিত্রটি তার চোখে পড়ে।
তার কাছে বিলবোর্ডটা অনেকটা পয়সা ব্যয়ে গাধার বাচ্চার কাজ বলে মনে হয়। আজকে এ নিয়ে কথা ওঠায় আট মাস ধরে মনের কোনায় লুকিয়ে থাকা আপত্তি অভিযোগ প্রকাশের প্রথম সুযোগ এসেছে তার। ‘আপনাকে দেখে তো জ্ঞানী মানুষ বলে মনে হচ্ছিল। আপনিও বলছেন আইডিয়াটা চমৎকার হয়েছে? আরে একটা শালকাঠের পুলের ওপর দিয়াও তো দু-তিনটা হাতি অনায়াসে হেঁটে যেতে পারবে। তাহলে এত ব্যয়বহুল একটা কনক্রিটের ব্রিজে ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের বাহাদুরিটা কোথায়?’ দবির দেওয়ান হাঁ-হয়ে টুবলু তালুকদারের কথাগুলো শুনছিল। তার কাছে কথাগুলো ভালোই ঠেকছে। সমস্যা হলো খয়ের মাহ্মুদের মতো তার কাছেও বিজ্ঞাপনের আইডিয়াটা কেন জানি চমৎকার আর বেশ আকর্ষণীয় মনে হয়।
খয়ের মাহমুদ টুবলু তালুকদারের দিকে তাকিয়ে একটু হেসে উত্তর করে, ‘আসলে কবিরাজ ভাই, অ্যাডে হাতিগুলোকে অনেক অনেক ভারী বস্তুর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। হাতির ওজন টোজন এখানে মুখ্য নয়। হাতি হলো গিয়ে পৃথিবীর স্থলভাগের সবচেয়ে বড় প্রাণী। সেই প্রাণীগুলোকেই প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের উৎকৃষ্ট মানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। হয়তো হাতির চেয়েও অনেক বেশি ভারী বস্তু ব্যবহার করা যেত অ্যাডটিতে কিন্তু তা এত আকর্ষণীয় আর শক্তির প্রতীক হয়ে উঠত না’। টুবলু তালুকদার খুব একটা গুরুত্ব সহকারে কথাগুলো কানে তুলল না। খয়ের মাহমুদের যুক্তিগুলো সে হয়তো একটু বুঝলো, হয়তো কিছুই বুঝলো না। তবে এটা ঠিক বুঝেছে- কাঁচা-পাকা দাড়িওলা ও টাকওলা উভয়ের কথাগুলো তার আটমাস বয়সী ভাবনার বিরুদ্ধে চলে গেছে। প্রতীক ট্রতীক সে অতোশত বোঝে না। সে এখনো মনে করে তার ধারণাই ঠিক। ওটা অ্যাডের জাতই নয়। হাতির চেয়ে বরং চার পাঁচখান দোতলা বাস ব্রিজের ওপর তুলে দিলে অ্যাডটা যে ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের আরও বহুত কাটতি বাড়াত সে ব্যাপারে সে নিঃসন্দেহ।
টুবলু তালুকদার কিছুটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায় খয়ের মাহমুদের দিকে। সে খয়ের মাহমুদকে দেখে জ্ঞানী লোক বলে মনে করেছিল। কিন্তু দবির আলীর মতোই তার নির্জ্ঞান মন্তব্য শুনে টুবলু তালুকদার মনে প্রাণে বুঝলো তার জ্ঞানের গভীরতা বোঝার ক্ষমতা না আছে এই মূর্খ চাষার না আছে ভদ্রলোকের মতো দেখতে এই টাকওয়ালার। এইসব মানুষের সাথে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বাড়িয়ে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে রাজি নয় সে। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে তাকে আরেকটা মজমার আয়োজন করতে হবে। সে খয়ের মাহমুদ কিংবা দবির দেওয়ান- কারও সাথে কথা না বাড়িয়ে সর্বরোগহর শরবত তৈরির উপাদানচূর্ণগুলো প্যাকেটজাত করতে শুরু করলো। বানরটাও হঠাৎ কেন জানি অস্থির হয়ে চ্যাঁও চ্যাঁও শুরু করে দেয়। টুবলু তালুকদার ছোট্ট বেতটার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই বানরটা আবার ভদ্র হয়ে টুবলু তালুকদারের কাঁধে উঠে বসে। কাঠের তোরঙ্গ থেকে গোখরা সাপের বাক্সটা বের করে আনে আলগোছে। তারপর সাপের বাক্সটার ডানে বাঁয়ে মৃদু দুটো চপেটাঘাত করে ওটা সামনে থপ করে নামিয়ে রাখে সে। বাতাসে উড়ে আসা ধুলোবালিতে কাচের বয়ামগুলো কিছুটা মলিন দেখাচ্ছে। একটা ছেঁড়া কাপড়ের গোছা দিয়ে ধুলোমলিন কাচের বয়ামগুলোর ওপর সপাং সপাং করে দ্রুত কয়েকটা ঝাড়া মারে। খয়ের মাহমুদ আর দবির দেওয়ান চুপচাপ কবিরাজের আসন্ন মজমার জোর আয়োজন দেখছে। সন্ধ্যার আবছা অন্ধকার যেন হাইওয়ে এলাকাটাকে চারদিক থেকে গ্রাস করে ফেলতে চাচ্ছে। কবিরাজ তার হ্যাজাকটা জ্বালিয়ে নেয়। খয়ের মাহ্মুদ উঠে দাঁড়ায়- অপেক্ষার পালা শেষ। সে হাত ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে স্টেশন রোডের দিকে পা বাড়ায়।
হাইওয়ে এলাকার আবছা অন্ধকারের মতই একটা অজানা অচেনা উত্তেজনা দবির দেওয়ানের মনটাকে ধীরে ধীরে উতলা করে তুললে, সেও লুঙ্গিটা ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে। তারপর হারিয়ে যায় হাইওয়ের দিকে। টুবলু তালুকদার তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বাঁশিটা হাতে তুলে নেয়ার আগে আনমনে একটাবার শুধু ভাবল, একটু আগেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া পথিক দুইজন ক্যাঙারু মার্কা সিমেন্টের বিলবোর্ডটি দেখে কি নির্বোধের মতো উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে গেল- ওরা বোধ বুদ্ধি বিচারে দুইজনে সমান। কেবল স্কুল মাস্টার খয়ের মাহমুদ আর গেরস্থ দবির দেওয়ানই বুঝেছিল, বোধ বুদ্ধি বিচারে তারা পরস্পর সমান নয়।