দুম করে সাততলা ভবনটি ধসে পড়ে গেল। তবে শব্দটা প্রথমে পতপত করে ওড়া ওড়নার মনে হয়েছিল কিংবা তিন চারটা মেয়ে একসাথে বসে থাকায় তাদের উচ্ছ্বাস বা সান্ত্বনার স্মারক মনে হয়েছিল। অথচ লুৎফা পেছনে তাকিয়ে দেখল জায়গাটা ফাঁকা।
লুৎফা ওয়াশরুমে গিয়েছিল। দরজার পাশে সিরিয়াল নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সায়েদা। সায়েদা আর লুৎফার মাঝের দেয়ালটা নেই। লুৎফার আরো তিন পাশে, মাথার ওপরে, এমনকি নিচেও দেয়াল ছিলো, ছাদ ছিলো, সেগুলোও নেই। তবু সায়েদা দাঁড়িয়ে আছে। পাশের সেকশনের বিশাল রুমে সত্তর আশিজন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেলাইয়ের কাজ করছিলো। তাদের মাথার ওপর ছাদ নেই, পায়ের নিচে মাটি নেই, হাতের কাছে সেলাই মেশিন নেই। সবাই সবার চোখের দিকে তাকাচ্ছে। সবার কানে গোঁ গোঁ ঝুরঝুর ধুমধাম শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। কিন্তু শব্দটা কোথায় থেকে আসছে, স্পষ্ট বুঝে উঠতে পারছে না।
সায়েদা নাকে ওড়না চেপে বলল, ‘ওই মাগি কাপড় ঠিক কর। সবাই তাকায়া রইছে।’
লুৎফার হুঁশ ফিরে আসে। তার মনে পড়ে, সে ওয়াশরুমে ছিলো। কিন্তু ওয়াশরুম কোথায়, দেয়াল কোথায়, কোথায় পানির ট্যাপ কিংবা কোথায় তাদের ফ্যাক্টরি- কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। তবু দ্রুত কাপড় সামলে বলে, ‘কিরে সাইদা, আমরা কই দাঁড়ায়া আছি?’ পায়ের নিচে কিছুই নাই ক্যান?
সায়েদা কী উত্তর দেবে সে জানে না।
সায়েদার মতো আরো সত্তর আশিজন মেয়ে শ্রমিক, দু’জন সুপারভাইজার দাঁড়িয়ে আছে। সবাই হাঁটাহাঁটি করছে। লুৎফা ওপরে তাকায়। অন্য দিন তাকালে ঘুরতে থাকা ফ্যান দেখতে পেতো যে ফ্যান থেকে প্রতিদিন প্রতিক্ষণ গুমোট বাতাস ভেসে আসে। দেখতে পেতো প্লাস্টার চটে যাওয়া ছাদ। কিন্তু আজ আকাশ দেখতে পেলো। দেখলো আরো তিন স্তর মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। চলাচলে ব্যস্ত। সবার চেহারায় আতঙ্ক আর ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়ার ছাপ। পাশের ভবনের লোকদেরও দেখা যাচ্ছে। বাহ। নিজের অজান্তেই শব্দ বেরিয়ে আসে লুৎফার। সায়েদা কিছু বলার আগেই লুৎফা নিচে তাকালো। দেখতে পেলো আরো তিন স্তর মানুষ। ভবন কী মুহূর্তের মধ্যে কাচের হয়ে গেল নাকি! লুৎফা পায়ের নিচে হাত দিয়ে কোন কাচ খুঁজে পেলো না। কিছুই পেলো না। ওয়াশরুমের বোটকা গন্ধটাও নেই। কিন্তু সবার কান তখনও সতর্ক অবস্থায় রয়েছে। সায়েদা লুৎফাকে বলে, ‘কিরে লুৎফা, মনে হইতাছে না যে আমরা নড়তেছি? যাইতেছি কই আর আছিই বা কই?’
লুৎফা উত্তর দিতে পারে না। সে পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘আমরা যে বিল্ডিংয়ে কাজ করছিলাম সেডা কই?’
‘তাই তো!’
সায়েদাও একই প্রশ্ন করে। তারপর চিৎকার শুনতে পায়। ‘রাসেল স্যার বিল্ডিং চাপা পইড়া মইরা গ্যাছে।’ চিৎকারটা কার, তারা কেউ বুঝতে পারে না।
লুৎফা বলে, ‘সাইদা রে, বিল্ডিং কি তাইলে ভাইঙা গ্যাছে?’
‘কাদেরডা ভাঙছে? স্যারদেরডা নাকি আমগো ডা?’
লুৎফা বলে, ‘বিল্ডিং তো আমগোডাই দেখতেছি না। আমাগোডাই ভাঙছে বোধয়।’
‘কিন্তু বিল্ডিং ভাঙলো আমগো, আর মরলো ওই বিল্ডিংয়ের স্যার। ক্যামনে কী!’
কেউ উত্তর দিতে পারে না। ততক্ষণে সাততলার সবাই রাস্তায় জড়ো হয়েছে। কিভাবে এলো কেউ জানে না। বিশাল দেহের ভবন দুমড়ে মুচড়ে পড়ে আছে, রাসেল স্যারের লাশ তোলার জন্য ফায়ার ব্রিগেড গাড়ি আসছে। গাড়ির শব্দ শোনা যায়।
লুৎফা এফএম রেডিও চালু করে তার এগারোশো টাকায় কেনা মোবাইলে। সকালে যে বোতলে করে চা নিয়ে ফ্যাক্টরিতে আসে, সেটার মুখে স্পিকার বসালে কেমন ঢবঢবে শব্দ হয়। রেডিওতে খবর পড়ার সময় মনে হয় এখন। খবরে একজন সুকণ্ঠী নারী পড়ছে, ‘গার্মেন্টস ধসে ব্যবস্থাপনা পরিচালক- এমডি- রাসেলসহ দুজন কর্মকর্তার মৃত্যুর সাথে জড়িতদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আটকের আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’
লুৎফা তাকায় সায়েদার দিকে। বলে, ‘স্যারকে কি কেউ মাইরা ফালাইছে? বিল্ডিং ভাঙলো আমগো, মরলো স্যার।’
সায়েদা বলে, ‘নিশ্চয় কেউ ঘটনাটা ঘটায়তেছে।’
‘কে ঘটায়তেছে?’
‘গত মাসে রাসেল স্যার আমগো দাবি মাইনা নিছিলো। হ্যারপর বেতন বাড়াইতে চাইছিলো, সুমায়মতো বেতন দিতে চাইছিলো, নিরাপত্তা দিতে চাইছিলো, ভুইল্যা গেলি? আমগো এসবের লাইগ্যা আমগো লগে স্যারকেও মাইরা ফালাইবে?’
‘কিন্তু মারলো কেডা?’
‘তোর মাথায় গু না ছাই, এইডাও বুঝিস না।’
লুৎফা তবু বুঝতে পারে না। সে ভাবতেই থাকে।
তখন তাদের নীরবতা ও ভাবনার মাঝে ছেদ করে পেছন থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ বলে, ‘কেমন লাগছে আজ? খুব তো দাতাগিরি আর মতোব্বরি দেখাইলা। শ্রমিকদের নিরাপত্তা তুই না, তোর বাপে দিবে এবার। শালা বাইনচোদ। মালিকের বেতন খাস, আর শ্রমিকের লাইগা আন্দোলন মারাস।’
তারা পেছনের তাকিয়ে কাউকে দেখতে পায় না। তবে হাস্যোজ্জ্বল চেহারার রাসেল স্যারকে দেখতে পায়। কিন্তু কণ্ঠস্বরটা তার না, নিশ্চয় অন্য কেউ কথাটা বলছে এবং কথাটা যে রাসেল স্যারকেই বলা হচ্ছে, সায়েদা বুঝতে পারে। বুঝতে পারে লুৎফাও। লুৎফা প্রশ্ন করে, ‘তাহলে কি আমরাও আপনার সাথে মারা গেছি?’
‘হ্যাঁ। যাদের ভাসতে দেখছো, তোমাদের পাশে যাদের দেখতে পাচ্ছো, তারা সবাই। দেখছো না, আমিও তোমাদের সারিতেই। আর যাদের কথা শুনছো কিন্তু দেখতে পাচ্ছো না, তারা বেঁচে আছে, আহত কিংবা সুস্থ অবস্থায়।’
‘ও আচ্ছা। কিন্তু আমাদের নাম যে খবরে বলল না, স্যার?’ লুৎফা প্রশ্ন করে। সায়েদা বলে, ‘পৌরসভা এই বিল্ডিংডা বন্ধ করতে কইছিলো না স্যার? কিন্তু করলো না ক্যান? বড়ো স্যার জোর কইরা আমগো আবার এই বিল্ডিংয়ে ঢুকাইলো ক্যান? আজ যে এইডা ধইসা যাবে, স্যার জাইনতো নাকি? আমরা যাদের দেখতে পাইতেছি, হ্যারা সবাইতো আমগো সাথে বেতন সুমায়মতো দেওনের লাইগা আর নিরাপত্তা বাড়ানোর লাইগ্যা মিছিল করছিলো স্যার।’
রাসেল স্যার কারোর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘কণ্ঠস্বরটিকে চেনা যায়? চিনতে পারো?’
তারা সবাই চিনতে পারে। কণ্ঠস্বরটা গার্মেন্টসের মালিক স্থানীয় নেতা দেওয়ান আলীর। লুৎফা এবং সায়েদার মুখ বিস্ময় আর রাজনীতির মারপ্যাঁচের ভাবনায় হাঁ হয়ে যায়, তখন রাসেল স্যার বলেন, ‘আমি তার নাম বলিনি, তার নামেও কিছু বলিনি। আমরা কেউ তার নাম বলতে পারি না। আমরা আমাদের বাঁচার কথা বলতে পারি না, আমরা বাঁচতে পারি না। শ্রমিকরা কাজ করবে, বেঁচে থাকবে কেন?’ শেষ প্রশ্নটি নিজেকেই করেন কিংবা লুৎফা বা সায়েদাকে। তারা কেউ এ প্রশ্ন বুঝতে পারে না। তারা ভাবে, বেঁচে না থাকলে শ্রমিকেরা কাজ করবে কিভাবে। কিন্তু লুৎফা বোকার মতো প্রশ্ন করে বসে, ‘বিল্ডিং ধসায়া আমগো মাইরা হ্যার কী লাভ হইলো, স্যার?’