সাম্প্রতিক কালে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে (১৮৩৮-১৮৯৪) নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে যে তিনি সাম্প্রদায়িক ছিলেন কি না। কেউ কেউ এ কথাও বলছেন তিনি মোটেই সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। আবার অনেকে এ কথাও ছোড়ে দিচ্ছেন যে, ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র যদি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’-কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে মেনে নিতে পারে তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ‘বন্দে মাতরম’ মানতে আপত্তি কোথায়? এ কথার জবাবে বলা যায় ‘আমার সোনার বাংলায়’ দেশকে ভালোবাসা ও তার প্রকৃতি নিয়ে গুণগান করা হয়েছে। আর বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’-এ মাতৃবন্দনা ও দেব-দেবীর গুণগানে মুখরিত যা মুসলিম দর্শনে আঘাত করে। মুসলিমদের আপত্তিটা ঠিক সেখানেই। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ‘বন্দে মাতরম’-এর অনেকাংশ নিয়ে আপত্তি করেছেন বঙ্কিমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও। শুধু রবীন্দ্রনাথ নয়, পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মতো জাতীয় নেতারা আপত্তি করেন ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে। কলকাতার তরুণ লেখক ও গবেষক আমিনুল ইসলাম ‘বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলমান চর্চা’ গ্রন্থের ‘বন্দে মাতরম : ধর্মনিরপেক্ষতা, সমকালীন রাজনীতি ও রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধে যথার্থভাবেই বলেছেন, ‘দেশমাতা প্রতিমার রূপ ধরেন এবং ‘দশ প্রহরণ ধারিণী’ দেবী দুর্গায় রূপান্তরিত হন। জাতীয়তাবাদের ওপর অনিবার্যভাবে হিন্দুত্বের রঙ এসে পড়ে। ফলে গীতটি (বন্দে মাতরম) জাতীয় আন্দোলনে প্রবল প্রেরণা সঞ্চার করলেও ভারতের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় একটা ধর্মনিরপেক্ষ সাম্রাজ্যবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার দিকে এই গানের ভূমিকা অনুকূল ছিল না। এই কারণেই নেহরু, গান্ধীজি, মাওলানা আজাদ প্রমুখ নেতা জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ‘বন্দেমাতরম’-এর বিরোধিতা করেন (পৃ. ১৯৯)। নিশ্চয়ই পাঠকসমাজ বুঝতে পারছেন, ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে মুসলিম সমাজেরই নয়, অনেক বিদগ্ধ ব্যক্তিত্বদের আপত্তি ছিল। পশ্চিমবঙ্গে অনেক বড় মুসলিম কংগ্রেস নেতাকেও ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আপত্তির কথা বলতে শোনা গেছে। আজও কলকাতায় প্রদেশ কংগ্রেস দফতর ‘বিধান ভবনে’ কোনও বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতার জন্মদিন অথবা মৃত্যুদিন পালিত হলে সংশ্লিষ্ট নেতার প্রতিকৃতিতে মাল্যদান করতে অনেক মুসলিম নেতাকর্মীদের অনীহা দেখা যায়। ‘বিধানভবনে’ এই বাস্তব অভিজ্ঞতা দেখা গিয়েছে।
এখন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সাম্প্রদায়িক ছিলেন অথবা ছিলেন না এ ব্যাখ্যাও আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে আবারও। বাংলাদেশের দুই প্রখ্যাত গবেষক, লেখক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ ছফা ও আবুল কাসেম ফজলুল হকের মধ্যে একটি পরস্পরবিরোধী মতামত রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রদায়িকতা ও মুসলিমবিদ্বেষ নিয়ে পারস্পরিক মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু এ কথা তো অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই যে, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদকে সমর্থন করতে গিয়ে সাহিত্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা ও হিন্দুত্ববাদের পুনর্জাগরণ ঘটিয়েছেন এক শ্রেণীর লেখক-সাহিত্যিকরা। অনেকেই এই অভিমত ব্যক্ত করেন যে, ১৮৫৭ সালের পর ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িকতা বিশালভাবে চাড়া দেয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত বঙ্গ বা ভারতের মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা বা ভেদাভেদের একটি চোরাস্রোত ছিল। পলাশীর যুদ্ধে দেশীয় বণিক সমাজ ও সামন্ত প্রভুদের মুসলিম নবাব সিরাজউদদৌলাকে বাদ দিয়ে ইংরেজদের শাসন অনেক আশীর্বাদই মনে হয়েছিল। কলকাতার বিখ্যাত জমিদার ও সামন্ত প্রভুরা নবাবকে হারানোর জন্য গোপন ডেরায় যে নীল নক্শা তৈরি করেছিল তা হিন্দুত্ববাদকে প্রতিষ্ঠা করারই একটি কৌশল। ১৮৩০ সালে বঙ্কিম-গুরু ঈশ্বর গুপ্তর ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকার মাধ্যমে তা অনেকটাই হিন্দুত্ববাদ ও মুসলিম বিদ্বেষ প্রকাশ্যে আসে। গুরুর শুরু, আর শিষ্য বঙ্কিমের মধ্যে তা আরো প্রকট আকার ধারণ করে। বঙ্কিমের সাহিত্য প্রতিভার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি বঙ্কিমের হিন্দুত্ববাদের জাগরণের দ্বারাই বঙ্গের বা অবিভক্ত ভারতে হিন্দুত্ববাদ বা হিন্দু সংগঠনগুলি গড়তে মন্ত্রের কাজ করে। আজকের আর এস এস, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, হিন্দু মহাসভা, জনসংঘ, বিজেপি তারই ফসল। হিন্দু মেলা, জাতীয় সভা, আর্য সমাজ, আত্মীয় সভা-র যথার্থই উত্তরসূরি এই সংগঠনগুলো। এমনকি যে ব্রাহ্মসমাজকে আমরা প্রগতিশীল বলে মনে করি তাদেরও ছিল ভেতরে ভেতরে হিন্দুত্ববাদের পরশ। একথা কি অস্বীকার করা যায় মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় হিন্দুত্ববাদ এসেছে নানান কৌশলে। আবার তার দুই ছেলে গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘হিন্দু মেলা’ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যিক আহমদ ছফার এই সব বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। [দ্র. সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, জাতীয় সাহিত্য-১]। সলিমুল্লাহ খানের ‘আহমদ ছফা সঞ্জীবনী’র ‘বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্কিমচন্দ্র’ নিবন্ধে আহমদ ছফার একটি উক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উক্তিটি হলো, ‘অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস, যে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের মাধ্যমে স্বদেশাত্মার মর্মবাণীটি আবিষ্কার করেছিলেন, সেই একই শক্তিমান মন্ত্র মহাকালের খড়গের রূপ ধারণ করে তার আপন মাতৃভূমিকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলল। মাতৃমুক্তির মন্ত্রের অপপ্রয়োগ করে বঙ্কিম মাতৃ অঙ্গচ্ছেদের ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করলেন।’ (ছফা: ১৯৯৭, পৃ. ২৬). আহমদ ছফার এই বলিষ্ঠ উক্তির মাধ্যমেই বলা যায়, ভারতে দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রবক্তা কিন্তু মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ কিংবা মুসলিম লীগ নয়। ১৯৪০ সালে কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে মুসলিম লীগের পাকিস্তান প্রস্তাব কিংবা ১৪ দফা উত্থাপিত ও গৃহীত হলেও দ্বিজাতি তত্ত্বের বীজটি কিন্তু নিহিত ছিল হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ও হিন্দুত্ব জাগরণবাদী সাহিত্য সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। সেই কাজটি ১৮৩০-৩১ সালে বঙ্কিম-গুরু ঈশ্বর গুপ্ত ‘সংবাদ প্রভাকর’-এর মধ্যে সৃষ্টি করেন। আর বঙ্কিম সাহিত্যে তা আরও প্রবল আকার ধারণ করে। আর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এসে আরও মহীরুহ রূপ নেয়। তাই আজও পশ্চিম বাংলার হিন্দুত্ববাদীরা প্রচার করে বেড়ায় যে অবিভক্ত বঙ্গের গর্ভ থেকে পশ্চিমবঙ্গকে শ্যামাপ্রসাদ বাবুরা ছিনিয়ে না নিতেন তাহলে কলকাতার বিধানসভা কিংবা রাইটার্স বিল্ডিং মুসলিম লীগ কিংবা মুসলিমদের দখলে থাকতো। আজকের পশ্চিমবঙ্গের জন্ম যদি না হতো তাহলে সেই রাজ্যটির মুখমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ, বিধানচন্দ্র রায়, জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় ও মমতা ব্যানার্জি হতে পারতেন না। ১৯৪৭ এ ভারত ভাগ হওয়ার আগে অর্থাৎ ৫৫ দিন আগে বাংলা ভাগ হয়ে যায়। সে সময় জ্যোতি বসুসহ কমিউনিস্ট পার্টির (অবিভক্ত) ৩ সদস্যই বাংলা ভাগের পক্ষেই ভোট দেন। এটাও কি হিন্দুত্ববাদী শ্রেণী স্বার্থের জন্য? কলকাতায় বসবাসকারী অবিভক্ত বঙ্গের পূর্ব ও পশ্চিমাংশের জমিদার, ব্যবসায়ী বণিক সম্প্রদায়ের স্বার্থে ঘা লাগছিল বলেই কি ১৯০৫ সালের ব্রিটিশদের বঙ্গভঙ্গ নিয়ে ‘বাংলা ও বাঙালি’ গেল গেল বলে রব তুলে মায়াকান্না করা হয়েছিল? কারা তারা? তারাতো সবাই বঙ্কিমের ও শ্যামাপ্রসাদের উত্তরসূরি। আর সেই বঙ্কিম ও শ্যামাপ্রসাদের উত্তসূরিরাই বাংলাকে ভাগ করে। তারাই কিন্তু শরৎচন্দ্র বসু, এ. কে. ফজলুল হক, আবুল হাসিম, সোহরাওয়ার্দী ও কিরণশঙ্কর রায়ের স্বাধীন বঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠাকে বানচাল করে দেয়। ভারত ভেঙে পাকিস্তান হয়েছে। আবার সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও পাক-আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করে বাংলাদেশ হলেও পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় বঙ্গসেনা, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, লিবারেশন টাইগার অব বাংলাদেশ (সংক্ষেপে এল টি বি, এরা সশস্ত্র), দুর্গাবাহিনী, আমরা বাঙালি, হিন্দু সংহতি, নারায়ণ সেনা- এদের প্রবল দাপট কেন? হিন্দু বাঙালি উদবাস্তুদের জন্য পৃথক ‘বঙ্গভূমি’ করার জন্য? এরা কাদের উত্তরসূরি? ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের সাফাই গাইতে গিয়ে সাহিত্যের ক্ষেত্রে যারা হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুত্ববাদী দর্শনকে স্থান দিয়ে মুসলিম বিদ্বেষ তৈরি করেছেন সেই লেখকরাই কি এদের পূর্বসূরি নয়? এসব লেখকদের জন্যই তো আজকের ভারতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বিজেপি, আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, বিশ্বহিন্দু পরিষদ। এসব লেখক বা কবির তালিকায় ঈশ্বর গুপ্ত (১৮১২-১৮৫৯), নবীন চন্দ্র সেন (১৮৪৭-১৯০৯), রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮২৭-১৮৮৭), হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৩৮-১৯০৩) এবং অবশ্যই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিম-উত্তর লেখকদের বা কবি কিংবা নাট্যকারদের মধ্যে দিজেন্দ্রলাল রায়ের নামও চলে আসে। আরও অসংখ্য কবি ও লেখকের নাম আসবে। তালিকায় নাট্যকার গিরিশচন্দ্রও বাদ যাবে না।
বাংলাদেশের ঢাকা থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘নতুন এক মাত্রা’-র শরৎ সংখ্যার (২০১৮) একটি নিবন্ধ আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নিবন্ধটির নাম ‘আহমদ ছফার বঙ্কিমবিচার’। নিবন্ধকার আবুল কাসেম ফজলুল হক। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাকে শ্রদ্ধাও করি। নিবন্ধটির মধ্যে আহমদ ছফার বঙ্কিম বিরোধিতার বিরোধটাকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন ফজলুল হক সাহেব তাতে বঙ্কিম যেন মোটেই মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন না বা হিন্দুত্ববাদকে সেভাবে প্রশ্রয় দেননি। ফজলুল হক সাহেবের এই বঙ্কিম সাফাই নতুন কিছু নয়। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু লেখক ও গবেষক নতুন করে বঙ্কিমকে সাফাই দিতে চাইছেন। বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে লুকোতে চাইছেন। শান্তনু কায়সার, সারোয়ার জাহান, অধ্যাপিকা সৈয়দা তানভীর নাসরিনসহ বেশ কিছু লেখক-গবেষক বঙ্কিমকে নানানভাবে আড়াল করতে চাইছেন। শান্তনু কায়সার তার ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ গ্রন্থের ভূমিকায় কাজী আবদুল ওদুদের ভাষণকে ব্যবহারও করেছেন। বঙ্কিম জন্মশতবর্ষে কাজী আবদুল ওদুদ ঢাকার জগন্নাথ কলেজে আয়োজিত (এখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) ‘মুসলিম-বিদ্বেষ’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় বলেছিলেন, ‘বঙ্কিমচন্দ্র মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন এ অভিযোগ তিনি করিতে পারেন না, তবে তিনি হিন্দুত্বকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণে প্রচার করিয়াছেন বলিয়া তিনি অভিযোগ করিতে পারেন’ [দ্র. শান্তনু কায়সার, বঙ্কিমচন্দ্র, কথা প্রকাশ, ঢাকা]। কাজী আবদুল ওদুদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই বলতে হয়, তিনি কিন্তু বঙ্কিমকে ‘অতিরিক্ত পরিমাণে’ হিন্দুত্বকে প্রচার করেছেন তা কিন্তু স্বীকার করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের উপসংহারে নিজেই বলেছেন যে, ‘হিন্দু হইলেই ভাল হইবে, মুসলমান হইলেই খারাপ এমন কোনও কথা নাই’- ততক্ষণে ভারতবর্ষের আকাশে ও সাহিত্যের ক্ষেত্রভূমিতে হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দু জাগরণ-এর উত্তাল প্রবাহ তৈরি হয়ে গিয়েছে। যার বিষময় ফল কিন্তু আমরা ভোগ করছি।
বঙ্কিম ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ভক্ত। আর এখন এরা নয়া উপনিবেশবাদ অ্যামেরিকার দোসর, আর তাই আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ আমার কাছে একটি প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ, অন্ততপক্ষে আজকের ভারতের হিন্দুত্ববাদের দাপট উপলব্ধি করলে। আর আবুল কাসেম ফজলুল হকসহ যারা বঙ্কিমকে সাফাই গান তারা পরোক্ষে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন।
কলকাতার রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন প্রকাশিত ‘বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র’-র শেষাংশে বঙ্কিম পরিচিততে কাঞ্চন বসু জানিয়েছেন ‘যেহেতু ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমিকায় বাংলাদেশের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঘটনাকে জড়িয়ে এই উপন্যাসটি রচিত হয়েছিল, সেহেতু এটি প্রকাশের পর বহু পাঠকই জানতে আগ্রহী হয়েছিলেন, এই গ্রন্থের কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে কিনা! এর জবাবে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ‘উপন্যাসে ও ইতিহাসে বিশেষ অনৈক্য আছে। যে যুদ্ধগুলি উপন্যাসে বর্ণিত হইয়াছে তাহা বীরভূম প্রদেশে ঘটে নাই। উত্তর বাংলায় হইয়াছিল… এই ভুল আমি মারাত্মক বিবেচনা করি না- কেননা উপন্যাস ইতিহাস নহে।’ বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই একথা বলা যায় না কি, যুদ্ধের স্থান পরিবর্তন হলেও ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহ এড়িয়ে ইতিহাস মার্কা উপন্যাস রচনায় আসল ঐতিহাসিক ঘটনাকে উপেক্ষা করা উচিত কি? সন্ন্যাস বিদ্রোহ বা ফকির বিদ্রোহ যেখানে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল, সেখানে বঙ্কিমচন্দ্রের সন্ন্যাসীরা ব্রিটিশদের গুণগানে মুখরিত। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে সত্যানন্দ, ভবানন্দ কিংবা ধরানন্দ- প্রতিটি চরিত্রের মুখে মুসলিম নিন্দাই উচ্চারিত। আমাদের আরও স্মরণ করতে হবে যে, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের অভিন্ন হৃদয় বন্ধু ছিলেন বাংলার মুসলিম নবজাগরণের অগ্রনায়ক নবাব আব্দুল লতিফ। স্কট প্রভাবিত বঙ্কিমের প্রথম উপন্যাস ইংরেজিতে। আর তার নাম ‘জধলসড়যড়হদং ডরভব’। এই উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে লতিফের বিশেষ ভূমিকা ছিল। উৎসাহ ছিল। তার উপন্যাসটি তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি। পরবর্তীতে সজনিকান্ত দাশ এটি ‘রাজমোহনের স্ত্রী’ নাম দিয়ে বাংলায় অনুবাদ করেন। ১৮৫৬ সালে ‘ললিতা তথা মানসেই’ কাব্যগ্রন্থ রচনার মাধ্যমে বঙ্কিমের বাংলাসাহিত্যে আগমন। সেখানে কিন্তু হিন্দু জাগরণ বা হিন্দুত্ববাদ সেভাবে আসেনি। ‘আনন্দমঠ’ প্রথমে কিন্তু ছিল ব্রিটিশবিরোধী। কিন্তু ব্রিটিশদের ঊর্ধ্বতন অফিসারদের চোখ রাঙানির ফলে উপন্যাসে হিন্দুত্ববাদ, হিন্দু জাগরণ এবং ব্রিটিশ স্তুতিকেই বঙ্কিম হাতিয়ার করেন। ব্রিটিশ সরকারের কড়া নির্দেশে বঙ্কিমের সাহিত্য হয়ে উঠল ব্রিটিশ-স্তুতি আর হিন্দু জাগরণ ও হিন্দুত্ববাদের মহামন্ত্র। আবার এক্ষেত্রে তিনি গুরু ঈশ্বর গুপ্তের পথকেই অনুসরণ করলেন। কবি ঈশ্বরগুপ্ত মুসলিমদের হেয় করার জন্য লিখেছেন-
একেবারে মারা যায় প্যাজ খোর চাপ দেড়ে।
হাঁসফাঁস করে যত প্যাজ খোর নেড়ে।।
বিশেষত পাকা দাড়ি মোটা ভুড়ে।
রৌদ্র গিয়া পেটে ঢোকে নেড়ে মাথা ফুঁড়ে।।
কাজি কোল্লা মিয়াঁ মোল্লা দাড়ি পাল্লা ধরি।
কাছা খোল্লা তোবা তোল্লা বলে আল্লা মরি।।
ঈশ্বর গুপ্ত ‘দিল্লির যুদ্ধ’ কবিতায় লিখেছেন-
চিরকাল হয় যেন ব্রিটিশের জয়
ব্রিটিশদের রাজলক্ষ্মী স্থির যেন রয়
ভারতের প্রিয় পুত্র হিন্দু সম্প্রদায়
মুক্ত মুখে বল সবে ব্রিটিশের জয়।
পাঠকবর্গ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন ঈশ্বরগুপ্তের কবিতায় হিন্দু জাগরণ ও ব্রিটিশ-স্তুতি কতখানি ফুটে উঠেছে। তার ‘সংবাদ প্রভাকর’ পত্রিকায় এইভাবে ব্রিটিশ-প্রশংসা ও হিন্দু জাগরণের পরিধি বৃদ্ধি করেছিলেন। তাই ডেপুটি মাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র গুরু ঈশ্বর গুপ্তের পথকেই অনুসরণ করেন। ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকরে’র ১৮৫৭ সালের ২২ জুনের সম্পাদকীয়তে লেখা হলো ‘বন্য পশু শিকার নিমিত্ত শিকারিগণ যেমন পরমানন্দে দলবদ্ধ হয়ে গমন করে, শ্বেতাঙ্গ সৈন্যগণ সেইরূপ পুলকিত চিত্তে সিপাহি শিকারে গমন করিতেছে, নরাধম অকৃতজ্ঞ দিগের আর রক্ষা নেই…’। ঈশ্বরগুপ্তের এই ‘নরাধম’ ও ‘অকৃতজ্ঞ’ নিশ্চয়ই মুসলিম সিপাহী বিদ্রোহীরা। আর এতেই বোঝা যায় ঈশ্বর গুপ্তের মুসলিমবিদ্বেষ কোন পর্যায়ে ছিল।
আর এই ঈশ্বর গুপ্তের যোগ্য উত্তরসূরি সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ঐতিহাসিক মার্কা উপন্যাস ও পৌরাণিক মিথ সমন্বিত প্রবন্ধ সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দু জাগরণকে দক্ষ কারিগরের মত সাহিত্যে আমদানি করলেন এবং ব্রিটিশদের জয়গান করলেন। নবাব আব্দুল লতিফের একজন অভিন্ন হৃদয় বন্ধু হিসাবে তিনি এতখানি ডিগবাজি মারবেন, তা ধারণার বাইরে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৮৬৫ থেকে ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত ২২ বছরে ১৪ খানি উপন্যাস রচনা করেন। এ ছাড়াও তার প্রবন্ধ গ্রন্থের সংখ্যা ১১টি। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসগুলো হলো ১. দুর্গেশ নন্দিনী (১৮৬৫), ২. কপাল কুন্ডলা (১৮৬৬), ৩. মৃণালিনী (১৮৬৯), ৪. বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), ৫. ইন্দিরা (১৮৭৩), ৬. যুগলাঙ্গরীয় (১৮৭৪), ৭. চন্দ্রশেখর (১৮৭৫), ৮. রজনী (১৮৭৭), ৯. কৃষ্ণ-কান্তর উইল (১৮৭৮), ১০. রাজসিংহ (১৮৮২), ১১. আনন্দমঠ (১৮৮৪), ১২. দেবী চৌধুরানী (১৮৮৪), ১৩. রাধা রানী (১৮৮৬), ১৪. সীতারাম (১৮৮৭)।
এ ছাড়াও বঙ্কিমের ১১টি প্রবন্ধ গ্রন্থ হলো ১. লোকরহস্য (১৮৭৪), ২. বিজ্ঞানরহস্য (১৮৭৫), ৩. কমলা কান্তের দপ্তর (১৮৭৫), ৪. বিবিধ সমালোচনা (১৮৭৬), ৫. সাম্য (১৮৭৫), ৬. প্রবন্ধ পুস্তক (১৮৭৯), ৭. কৃষ্ণ চরিত্র (১৮৮৬), ৮. বিবিধ প্রবন্ধ (প্রথম ভাগ- ১৮৮৭), ৯. ধর্মতত্ত্ব (১৮৮৮), ১০. বিবিধ প্রবন্ধ (দ্বিতীয় ভাগ- ১৮৯২), ১১. শ্রীমদ্ভগবদগীতা (প্রচার পত্রিকায় ১২৯২ ও ১২৯৫ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয়)।
আমাদের একটা কথা স্বীকার করতে হবে ভারতে প্রকৃত ইতিহাস চর্চার দিশারি আরব্য, তুর্কি বা পার্সিয়ান ঐতিহাসিক ও ইতিহাসবিদরা। ইংরেজ ঐতিহাসিক ও ইতিহাসবিদরা হলেন তার অনুবাদক মাত্র। আর এই অনুবাদের কাজটি করতে গিয়ে তারা অনেকেই ইতিহাস বিকৃতি ঘটিয়েছেন। ব্রিটিশ শাসিত ভারতের বেশির ভাগ ভারতীয় ঐতিহাসিক-লেখক-গবেষক-ইতিহাসবিদরা সেই পথকেই অনুসরণ করেছেন যা দুঃখের হলেও সত্য। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম উপন্যাস ‘দুর্গেশ নন্দিনী’-তে সেই ইতিহাস বিকৃতিরই ঘটনাটি ঘটেছে। ইতিহাস প্রামাণ্য নয় এমন ঘটনারও অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। এর মূল ঘটনাটি বঙ্কিমচন্দ্র সংগ্রহ করেছেন চার্লস স্টুয়ার্টের ‘হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল’ থেকে। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার তাঁর ‘ভূমিকা : দুর্গেশ নন্দিনী’ গ্রন্থে (বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, কলকাতা, পৃ. ১১) যথার্থভাবেই বলেছেন, ‘ডাও সাহেবের মেকী ইতিহাস হইতে লইয়াছেন ক্যাপ্টেন চার্লস স্টুয়ার্ট’। তাই এ কথা বলা হয়তো অসঙ্গত হবে না, ‘দুর্গেশ নন্দিনীতে ইতিহাস বিকৃত ঘটেছে। প্রকৃত ঐতিহাসিক তথ্যকে বিকৃত করা হয়েছে’। এই উপন্যাসে আয়েশা চরিত্রকে বঙ্কিম বিকৃত করেছেন। ইতিহাস কাঠামোর ওপর নিজের কল্পনার রঙ চাপিয়েছেন। ‘তাই দুর্গেশ নন্দিনী’ হয়ে পড়েছে রোম্যান্সপ্রবণ ঐতিহাসিক উপন্যাস। যদুনাথ সরকার যথার্থই বলেছেন যে, ‘মানসিংহ, জগৎসিংহ, কৎলু খাঁ, খাজা ইসা, ওসমান- ইহারা সকলেই ঐতিহাসিক পুরুষ এবং সে যুগে বঙ্গের ঠিক সেই স্থলে বাস করিতেন। ইহাও সত্য যে, জগৎসিংহ অগণিত পাঠানের নিকট পরাজিত হইয়া এক দুর্গে আশ্রয় লন এবং তাহার দেওয়ান খাজা ইসা কৎলুর বালক পুত্রদের রাজ্য বাঁচাইবার জন্য মানসিংহের সহিত দেখা করিয়া বহুমূল্য উপঢৌকন দিয়া সন্ধি করেন। ইহা ভিন্ন ‘দুর্গেশ নন্দিনী’-র আর সব কাল্পনিক (প্রাগুক্ত)। আর কল্পনার রং চড়িয়ে বঙ্কিম বাবু শেষ পর্যন্ত কৎলু খাঁকে নারী লোলুপ বানিয়ে ছেড়েছেন। আর তবেই তো স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়সহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা ভাববে মুসলিম রাজা-রাজড়া আর সেনাপতি-সেনাবাহিনীরা কতোখানি নারীলোলুপ হতে পারে। আয়েশা-জগৎ সিংহের প্রণয়-কাহিনী নির্মাণ করতে গিয়ে ইতিহাসের বাস্তবতাকে গুলিয়ে দিয়েছেন বঙ্কিম। বঙ্কিমের বিখ্যাত আরেকটি উপন্যাস ‘কপাল কুন্ডলা’-য় মুসলিম নারীকে কলুষিত করা হয়েছে। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসে হিন্দু ধর্মীয় রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখিয়ে হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দু জাগরণ ঘটিয়েছেন। ‘কমলা কান্তের দপ্তর’-এ আর্যভবনকৃত ভারতের সন্ধান দিয়েছেন। ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসে প্রতাপ-শৈবলনীর পাশাপাশি মীর কাশিম-দলনি বেগম পার্শ্ব কাহিনী জড়িয়ে মীর কাশিমকে হীনচরিত্রে চিত্রিত করেছেন। আর উদার-দলদিরাজ সৎ তকি খাঁকে খলনায়ক বানিয়েছেন। ‘রাজ সিংহ’ উপন্যাসে মুসলিম জীবনের বিকৃত ঘটিয়েছেন। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ‘বিদ্রোহী’ সন্ন্যাসীরা স্বদেশ প্রেমে উদ্বেলিত হলেও তাতে মুসলিম-বিদ্রোহের তরঙ্গ। নবাব ও মুসলিমদের ধ্বংস করতে সন্তান-সেনাদের মুখ দিয়ে রুঢ় ভাষা বলিয়ে নিয়েছেন। এই উপন্যাসে ইংরেজদের তুষ্ট করতে গিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়কে ক্ষুব্ধ ও আহত করেছেন তিনি। এই উপন্যাসে সত্যানন্দের মুখ দিয়ে লেখক যখন বলেন, ‘শত্রু কে? শত্রু আর নাই। ইংরেজ মিত্র রাজা’। ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে অন্যতম চিকিৎসক চরিত্র-র মাধ্যমে সত্যানন্দর প্রতি যে সংলাপ বসানো তা হলো- ‘সত্যানন্দ কাতর হইও না। তুমি বুদ্ধির ভ্রমক্রমে দস্যুবৃত্তির দ্বারা ধন সংগ্রহ করিয়া রণ জয় করিয়াছ। পাপের কখনও পবিত্র ফল হয় না। অতএব তোমরা দেশের উদ্ধার করিতে পারবে না। যাহা হইবে, তাহা ভালোই হইবে। ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। …ইংরেজ রাজ্যে প্রজা সুখী হইবে- নিষ্কণ্টকে ধর্মাচরণ করিবে। অতএব হে বুদ্ধিমান, ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে নিরস্ত্র হইয়া আমায় অনুসরণ কর।’ হিন্দুত্ব পুনরুত্থান ও ব্রিটিশরাজকে অভিনন্দন জানানোর এর চেয়ে ভাল সংলাপ আর কী হতে পারে? সমগ্র ‘আনন্দমঠ’ জুড়ে এই অনুরণন। নিবন্ধের কলেবর বৃদ্ধি না করে এখানেই থামছি। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘দেবী চৌধুরানী’-তে (১৮৮৪) রক্ষণশীল হিন্দুত্বের আহ্বানকে বঙ্কিমচন্দ্র বেশি করে ফোকাস করেছেন। আর ‘সীতারাম’ উপন্যাসে (১৮৮৭) উগ্র হিন্দুত্ববাদের প্রকাশ ঘটেছে বেশি। এ নিয়ে বিশ্লেষণের প্রয়োজন বলে মনে করি।
‘দেবী চৌধুরানী’ উপন্যাসে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের শাসনকাল বিস্তৃত ও বিধৃত। নবাবী শাসন তখন নামে মাত্র। আবার ব্রিটিশ শাসনও সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। একটি পারিবারিক কাহিনীর মাধ্যমে সেখানে বঙ্কিম অনুশীলন তত্ত্বের বর্ণনা দিয়েছেন। বাড়ি থেকে পালিয়ে আসা এক গৃহবধূ প্রফুল্লার ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে পরিণত হওয়া, ভবানী পাঠক নামে ব্রাহ্মণ-ডাকাতের কাছে গীতার শিক্ষা অনুধারণ করে কীভাবে প্রফুল্লা থেকে ডাকাতরানীতে পরিণত হয়ে ‘দেবী চৌধুরাণী’-তে পরিণত, তার কাহিনীই প্রাধান্য পেয়েছে। আবার ভবানী পাঠকের কাছে যাবতীয় ঐশ্বর্য ত্যাগ করে কিভাবে আবার স্বামীর ঘরে এসে দেবী চৌধুরাণী পুকুর ঘাটে বাসন মাজছে তারও বিস্তার ঘটিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র। রক্ষণশীল হিন্দুত্বের বিস্তারই প্রাধান্য পেয়েছে। ‘দেবী চৌধুরানী’-র ভবানী পাঠক অনেকটাই ‘আনন্দমঠে’র সত্যানন্দ। ‘আনন্দমঠ’-এর সত্যানন্দ মহাপুরুষকে অবলম্বন করে হিমালয় শিখরে গমন করে, ভবানী পাঠকও পূর্ব প্রায়শ্চিত্তের জন্য দ্বীপান্তরে চলে যায়। আর এই ভাবে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘দেবী চৌধুরাণী’ তে রক্ষণশীল হিন্দুত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
‘সীতারাম’ (১৮৮৭) উপন্যাসে আমাদের সাহিত্যসম্রাট ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রক্ষণশীল হিন্দুত্ব থেকে উগ্র হিন্দুত্বে চলে এলেন। মুসলিম শাসকদের হাতে হিন্দু নির্যাতনকে দেখাতে গিয়ে ইতিহাসকে অপ-ইতিহাসে পরিণত করেছেন। ইতিহাস-কে বিকৃত করেই তিনি ‘সীতারাম’ উপন্যাসে যুদ্ধে তোরাব খাঁকে সীতারামের হাতে খুন করিয়েছেন। অবশেষে ‘মহাপাপিষ্ঠ’ মুর্শিদকুলি খাঁ-র সৈন্যবাহিনী ভূষনা দখল করলেও সীতারামকে সপরিবারে বৈরিশূন্য স্থানে পৌঁছে দিয়েছেন। চূড়ান্ত ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে উগ্র হিদুত্ববাদের বীরত্ব উন্মোচন করতে গিয়ে। ইতিহাস কী বলে? ইতিহাস এটাই বলে, তোরাব খাঁ শিকারে গেলে তাকে চিনতে না পেরে সীতারাম দলবল নিয়ে তাকে হত্যা করে। অবশেষে মুর্শিদকুলি খাঁ-ও সৈন্য সামন্তর হাতে সীতারাম ধরা পড়ে যায়। অবশেষে মুর্শিদাবাদে এনে তাকে হত্যা করা হয়। ‘সীতারাম’ উপন্যাসে যেন মনে হচ্ছে মুসলিমদের প্রতি প্রতিশোধ নিয়ে উগ্র হিন্দুত্বেরই জাগরণ ঘটালেন। বঙ্কিমের একপেশে প্রবণতা বেশিমাত্রায় প্রকাশিত হয়েছে। উপন্যাসের ঘটনা বিন্যাস বা চরিত্র চিত্রণে এমন চিত্র কল্প ফুটে উঠেছে সেখানে সনাতন ধর্মের আধ্যাত্মিক ও শান্তির দিক বাদ দিয়ে গোঁড়ামি ও কঠোরতা প্রকাশ পেয়েছে। সীতারামের স্বজাতিপ্রীতি ও ধর্মীয় জাতীয়তাবোধ যেভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে তা আজকের হিন্দুত্ববাদেরই বহিঃপ্রকাশ।
এবার আমরা দেখে নিতে পারি বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’ (১৮৬৯) উপন্যাসটিকে। সেখানেও দেখা যায় বঙ্কিমের ধর্মীয় রাজ্য পুনরুদ্ধারের বাসনা। মুসলমান শক্তির কবলমুক্ত হয়ে স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য বঙ্কিমকে খুবই তাড়া করেছে, যা ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের প্রধান দিক। আর তাই দেখা যায় ‘ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি’-র নবদ্বীপ বিজয়কে বঙ্কিম মোটেই মেনে নিতে পারেননি। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের মাধবাচার্যকে দিয়ে হেমচন্দ্রকে আশ্বাস দিয়েছেন এইভাবে-
বৎস! দুঃখিত হইও না। দৈব নির্দেশ কখনো বিফল হইবার নহে। আমি যখন গণনা করিয়াছি যে, যবন পরাভূত হইবে, তখন নিশ্চয় জানিও তাহারা পরাভূত হইবে। যবনেরা নবদ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপ তো গৌড় নহে। প্রধান রাজা সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন। কিন্তু এই গৌড় রাজ্যে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন, তাহারা তো এখনও বিজিত হয়েন নাই। কে জানে যে, সকল রাজা একত্র হইয়া প্রাণপণ করিলে যবন বিজিত না হইবে? [দ্র. বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র, রিফ্লেক্ট পাব্লিকেশন, কলকাতা]
‘মৃণালিনী’ উপন্যাস প্রসঙ্গে সুপ্রিয় সেনের অভিমত খুবই প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি। তিনি তাঁর ‘ঊনবিংশ শতাব্দীর স্বদেশ চিন্তা ও বঙ্কিমচন্দ্র’ গ্রন্থে যথার্থভাবেই বলেছেন, ‘হিন্দুর স্বদেশপ্রীতি জাগ্রত করার জন্য বখতিয়ারকে মিথ্যাবাদী, কুচক্রী ও ভণ্ড করে এঁকেছেন। এবং অন্তিম আশার সঞ্চার করেছেন, পশ্চিম দেশীয় বণিক কর্তৃক ‘যবন’ রাজত্বের অবসানের সম্ভাবনার কথা বলে। এর সঙ্গে মুসলমান বিরোধী বীরত্বের এক হাস্যকর রূপায়ণ আছে যখন হেমচন্দ্র নগর মধ্যে একা প্রচুর মুসলমান সৈন্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে অবিজিত থাকেন’। সুপ্রিয় সেনের সঙ্গে এ ব্যাপারে শতাংশ পরিমাণ সহমত করেই বলতে হয়- হিন্দুরাজ্য পুনরুদ্ধার করার মানসিকতা নিয়ে হিন্দু মুসলমানদের সম্পর্ককে বঙ্কিম তিক্ত করার চেষ্টা করেছেন। আর ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস তারই সূচনা।
‘রাজসিংহ’ (১৮৮২) উপন্যাসেও হিন্দুত্ব, হিন্দু জীবন, হিন্দু জাগরণ নিয়ে এক পক্ষপাতপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে। মোগল জীবনধারা নিয়ে অনেক বিকৃতি। উপন্যাসের প্রথম খন্ডের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রূপনগরের রাজকন্যা ‘চঞ্চল কুমারী’ ধীরে ধীরে অলঙ্কার শোভিত বাম চরণ খানি ঔরঙ্গজেবের চিত্রের উপরে সংস্থাপিত করিলেন, চিত্রের শোভা বুঝি বাড়িয়া গেল। ‘চঞ্চল কুমারী’ একটু হেলিলেন, মড় মড় শব্দ হইল, ঔরঙ্গজেব বাদশাহের প্রতিমূর্তি রাজপুত কুমারীর চরণতলে ভাঙিয়া গেল।
রাজপুত কুমারী হাসিয়া বলিলেন, ‘যেমন ছেলেরা পুতুল খেলিয়া সংসারের সাধ মিটায়, আমি তেমনই মোগল বাদশাহের মুখে নাতি মারার সাধ মিটাইলাম’। তারপর নির্মলের মুখ চাহিয়া বলিলেন ‘সখি নির্মল? ছেলেদের সাধ মিটে; সময়ে তাহাদের সত্যের ঘর-সংসার হয়। আমার কি সাধ মিটেবে না? আমি কখনও জীবন্ত ঔরঙ্গজেবের মুখে এইরূপ’- রাজসিংহ উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে দেখা যাচ্ছে দয়ার অনুকরণে হিন্দু সাম্রাজ্য পুনঃস্থাপিত করলেও কিন্তু রাজমন্ত্রী দয়াল শাহ সে প্রকৃতির লোক নহেন। তিনিও যুদ্ধে প্রবৃত্ত। মালবে মুসলমানের সর্বনাশ করিতে লাগিলেন। ঔরঙ্গজেব হিন্দুধর্মের ওপর অনেক অত্যাচার করিয়াছিল। প্রতিশোধের স্বরূপে ইনি কাজিদিগের মস্তক মুণ্ডন করিয়া বাঁধিতে লাগিলেন। কোরান দেখিলেই কুয়ায় ফেলিয়া দিতে লাগিলেন।
এইভাবে ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের পরতে পরতে, ছত্রে-ছত্রে মুসলিমবিদ্বেষ মাত্রাতিরিক্ত স্থান করে নিয়েছে। আর উপন্যাসের উপসংহারে বঙ্কিম একরকম সাফাই দিয়ে বলেছেন, ‘কোনও পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু-মুসলমানের কোনও তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য’। এটা তো বঙ্কিমচন্দ্রের একধরনের জুতো মেরে গরু দান করারই শামিল। কলকাতার বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক-লেখক-গবেষক, জাঁদরেল পুলিশ অফিসার (অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস) ড. নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক’ গ্রন্থে যথার্থভাবেই বলেছেন ‘রামকৃষ্ণ’, বিবেকানন্দ এবং বঙ্কিমচন্দ্র এই মনোভাবকে (হিন্দুত্ব) আরও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের (১৮৩৬-৮৬) ‘যত মত তত পথ’ বাণী প্রচারের মাধ্যমে মূর্তিপূজাকেও ঈশ্বর প্রাপ্তির উপায় হিসেবে স্বীকার করলেন। বেদান্তবাদী স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) রামকৃষ্ণের বাণীকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিলেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোর মহাধর্মসভায় বক্তৃতা করে তিনি হিন্দু ধর্মের মহিমা বৃদ্ধি করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র পৌরাণিক হিন্দুধর্ম এবং মূর্তিপূজাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য কলম ধরলেন। কৃষ্ণচরিত্র (১৮৮৬), ধর্মতত্ত্ব (১৮৮৮), শ্রীমদ্ভগবতগীতা (১৯০২), দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম প্রভৃতি প্রবন্ধগ্রন্থে তিনি পৌরাণিক হিন্দু ধর্মকে তৎকালীন আধুনিক মনের কাছে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপিত করেন। [দ্র. ড. নজরুল ইসলাম, বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, পৃ. ১৬৭]
কলকাতার জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘দেশের অর্ধেক সংখ্যক মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখে এ কোন ধরনের দেশপ্রেম’? দীনবন্ধু মিত্র ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত দু’জনই মোটা দাগে বঙ্কিমচন্দ্রের সমকালীন লেখক। ‘নীলদর্পণে’ চেষ্টা করেছেন দীনবন্ধু হিন্দু-মুসলমানকে এক জায়গায় মেলাতে, একটি প্রহসনে মাইকেলও তাই করেছেন, আর বঙ্কিম তার উপন্যাসগুলোতে অনবরত চেষ্টা চালিয়েছেন হিন্দু- মুসলমানের বিরোধ সৃষ্টির। [দ্র. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতার জন্য ও অন্যান্য, প্যাপিরাস, কলকাতা]। ‘কবিতার জন্য ও অন্যান্য’ গ্রন্থে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আরও স্পষ্ট বক্তব্য: ‘যে মানসিকতার ফলে ভারতবর্ষকে বাধ্য হয়ে বিভক্ত করা হলো, তার উৎপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ ‘আনন্দমঠের’ মত উপন্যাস রচনা এবং এই উপন্যাসের লেখককে ‘স্বদেশী মন্ত্রের উদ্গাতা’ হিসেবে গণ্য করা’।
তাই সঙ্গত কারণেই বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ আহমদ ছফা ‘শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ গ্রন্থে যথার্থভাবেই বলেছেন: ‘উনিশ শতকের হিন্দু মনীষীরা এই উপমহাদেশে প্রায় হাজার বছরের মুসলিম শাসনকে আতঙ্কিত দুঃস্বপ্ন জ্ঞান করে আলাদা করে রাখলেন’। আহমদ ছফার এই যুক্তিসঙ্গত-তীক্ষè বক্তব্য বঙ্কিমের বিদ্বেষ ও বিভাজন স্বরূপকে নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। তাই আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ নিবন্ধটিকে বিরোধিতা করে যারা বঙ্কিমের সাফাই দিতে চান তারা কিন্তু প্রজন্মকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর ‘আহমদ ছফার বঙ্কিম বিচার’ (নতুন এক মাত্রা, শরৎ সংখ্যা, ২০১৮) নিবন্ধে বঙ্কিমের ‘যবন’ শব্দ ব্যবহারকেও লঘু করে দেখা হয়েছে, তা কিন্তু যুক্তিসঙ্গত নয়। ফজলুল হক সাহেবের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলছি ‘যবন’ শব্দের অর্থ বিদেশী। ধীরে ধীরে এই শব্দটি সংকুচিত হয়ে গালিতে পরিণত হয়ে গেছে। যে সময়টিতে বঙ্কিম মোগলদের ‘যবন’ বলছেন কিংবা বাংলার তুর্কিশাসক কিংবা নবাবদের ‘যবন’ বলছেন ততদিনে তারা ‘বিদেশী’ মোটেই ছিল না। তারা ততদিনে ভারত আত্মার সঙ্গে মিলে মিশে গেছেন। বরং আহমেদ শাহ আবদালি কিংবা নাদির শাহকে আমরা বিদেশী বলতে পারি। তারা এদেশের ধনসম্পদ লুঠ করে পারস্য নিয়ে গেছেন। মুহম্মদ ঘোরী থেকে মোগল বাদশাহরা ভারতবর্ষকে গঠন করেছেন। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন কায়েম হয়েছিল বলেই নিম্নবর্গীয় হিন্দুরা তাদের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। আর ফজলুল হক সাহেব যদি আজও মুসলিম শাসকদের ‘যবন’ বা ‘বিদেশী’ হিসাবে ব্যাখ্যা করেন, তাহলে তা ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি, আরএসএসসহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর হাতে অস্ত্র হিসেবে তুলে দেবেন। আর সেই অস্ত্র পেয়ে এরা ভারতের মুসলিম শাসক থেকে মুসলিম নাগরিকদের ‘বিদেশী’ বলার আরও সুযোগ পেয়ে যাবে। আহমদ ছফা ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বঙ্কিম অনুধাবন ছিল যথার্থই।

আহমদ ছফা
১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সালের চোরাস্রোত মার্কা সাম্প্রদায়িকতা ও প্রচ্ছন্ন মার্কা হিন্দুত্ববাদ ১৮৫৭ সালে পরবর্তী বঙ্কিম থেকে ভায়া বিবেকানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ পর্যন্ত খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ দেশবিভাজন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ পথ নিলেও (অবশ্য ভারতের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি লিখিতভাবে এসেছে ১৯৭৬ সালে) হিন্দুত্ববাদ জীবন্ত ছিল। জওহরলাল, গান্ধীজি কিংবা আবুল কালাম আজাদের মতো ব্যক্তিত্বরা যথেষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। কিন্তু তার অভ্যন্তরে প্যাটেলজিরা ছিলেন প্রো হিন্দুত্ববাদী, নাহলে ভারতে যত দাঙ্গা হয়েছে সবটাই কংগ্রেসের আমলে বেশি। আজ গুজরাট হচ্ছে বিজেপির আমলে একটি সফল গণহত্যা। পশ্চিমবঙ্গে ৫০-৬০-এর দশকে দাঙ্গা তো সবাইকেই বিশেষভাবে মুসলিমদের আতঙ্কিত করে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিপন্ন করেছে। তারা পালিয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশে। নেলি (আসাম), মুম্বাই, ভাগলপুর, সুরাট, মিরাট, মুজাফফর নগরে দাঙ্গা ভারতের সংখ্যালঘুদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। তাই বলা চলে বঙ্কিমের হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুজাগরণে প্রভাবিত রাজনৈতিক দলগুলো। কংগ্রেস নরম সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী; বিজেপি- আরএসএস ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী’ এবং কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীরা ‘সূক্ষ্ম সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী’। আর সব রাজনৈতিক দলগুলো ব্রাহ্মণ্যবাদের নিগড়ে বাঁধা। তা না হলে ৩৪ বছর (১৯৭৭-২০১১) সিপিআই (এম) নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় থাকার পরও সংখ্যালঘু মুসলিমদের চাকরির হার মাত্র সাড়ে তিন (৩.৫) শতাংশ, যে রাজ্যে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিমদের বসবাস। যদিও হিন্দুত্ববাদী আরএসএস বিজেপিকে বামফ্রন্টের আমলে সেভাবে বাড়তে দেয়া হয়নি। আলোচনার খাতিরে আমি একজন বামপন্থী হিসাবে এ কথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কলকাতায় মায়াকান্না করতে এসে ভারতের মুসলিমদের কার্যত অস্বস্তিতে ফেলে। কেন এটি করা হবে? যে কোনও দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে আমি নিন্দা করি। যেদেশে এটি হবে সেই দেশেই মোকাবিলা করা দরকার।
আবার পূর্বপ্রসঙ্গে ফিরে যাই। ঊনবিংশ শতাব্দীর ৫০-এর দশক থেকে অবিভক্ত ভারতে বিশেষ করে বঙ্গের মাটিতে হিন্দুত্ববাদ হিন্দুজাগরণ মাথা চাড়া দিতে থাকল, তখন কিন্তু শিক্ষিত মুসলিমসহ মুসলিমসমাজ পরিচয় সঙ্কট, বিপন্নতা ও আতঙ্কে ভুগতে থাকেন। তাই বঙ্কিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩) কলকাতার তালতলাতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (২ এপ্রিল, ১৮৬৩)। তার আগে ওই তালতলায় ১৮৫৫ সালের ৬ মে কলকাতার মহম্মদ মাজহার স্থাপন করলেন ‘আঞ্জুমান ইসলামী’ বা ‘মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’। বঙ্গ তথা ভারতের মুসলমানদের এটিই প্রথম যৌথ প্রতিষ্ঠান। সৈয়দ আমির আলী স্থাপন করেন তালতলা এলাকায় ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন।’ মুসলিম স্বার্থ রক্ষাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্দেশ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ থিতিয়ে পড়লে কলকাতার সমাজহিতৈষী মুসলিম যুবকরা গঠন করল ‘কলিকাতা মহামেডান ইউনিয়ন’। এটি গঠিত হয় ১৮৯৩ সালে। ১৮৯৬ সালে ব্যারিস্টার আব্দুর রহিম ও আইনজীবী মহম্মদ ইউসুফের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয় ‘মহামেডান রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন’। কলকাতা মাদ্রাসা কলেজের (আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্ররা প্রতিষ্ঠা করে ‘মাদ্রাসা লিটারেরি অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব’ (১৮৭৫)। ঢাকা মাদ্রাসার সুপারিন্টেনডেন্ট উবাইদুল্লাহ আল উবায়দী সোহরাওয়ার্দী গঠন করেন ‘সমাজ সম্মিলনী সভা’ ও ‘ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সম্মিলনী’ (১৮৮৩)। মুসলিমদের খেলাধুলা ও শারীরিক চর্চার জন্য গঠন করতে হয় ‘মহামেডান এল্গিন স্পোর্টিং ক্লাব’ (১৮৯৯)। আর সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার জন্য স্থাপিত হয় ‘মুসলিম ইনস্টিটিউট’ (১৯০২)। কাকাবাবু মুজাফফর আহমেদকেও প্রতিষ্ঠা করতে হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। তারপর তো স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ-র আলিগড় মুভমেন্ট তো আছেই। আর সবার শেষে ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহর ‘মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠা একটি মুসলিম সংগঠন হিসেবে। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বিভাজন। পাকিস্তান। ভারত-ভাগ। ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম লীগ পাকিস্তানে জ্বললেও ভারত আর বাংলাদেশে কিন্তু টিম টিম। আর স্বাধীন ভারতে হিন্দু সংগঠনগুলো দুর্বার গতিতে বাড়ছে। আরএসএস বিজেপি সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করে। আরএসএস-বিজেপি এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর। আবার তারা ইতালির মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী ও জার্মানির হিটলারের নাৎসিবাদী (ব্রাহ্মণ্যবাদী) নীতি অবলম্বন করে। আবার এরাই ইসরাইলের জায়নবাদকে শুভেচ্ছা জানায়। বঙ্কিম ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ভক্ত। আর এখন এরা নয়া উপনিবেশবাদ অ্যামেরিকার দোসর, আর তাই আহমদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারি : বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ আমার কাছে একটি প্রাসঙ্গিক গ্রন্থ, অন্ততপক্ষে আজকের ভারতের হিন্দুত্ববাদের দাপট উপলব্ধি করলে। আর আবুল কাসেম ফজলুল হকসহ যারা বঙ্কিমকে সাফাই গান তারা পরোক্ষে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন।
তথ্যসূত্র
১. বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র, রিফ্লেক্ট পাবলিকেশন, কলকাতা।
২. সলিমুল্লাহ খান, আহমদ ছফা সঞ্জীবনী, জাতীয় সাহিত্য-১, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা।
৩. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতার জন্য এবং অন্যান্য, প্যাপিরাস, কলকাতা।
৪. বদরুদ্দীন উমর, সাম্প্রদায়িকতা, ঢাকা।
৫. দৈনিক কালান্তর শারদীয় ১৪১৫, কলকাতা।
৬. রমেশচন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা।
৭. যোগেশ চন্দ্র বাগল, হিন্দু মেলার ইতিবৃত্তি কলকাতা, ১৯৬৮, কলকাতা।
৮. ড. অমলেন্দু দে, বাঙালি বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাজ্যপুস্তক পর্ষদ, ১৯৯১, কলকাতা ।
৯. ড. নজরুল ইসলাম, বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, মিত্র ঘোষ, পাবলিশার্স প্রা. লি., কলকাতা।
১০. মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, ইতিহাস ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা, শোভা প্রকাশ, ঢাকা।
১১. আমিনুল ইসলাম, বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলমান চর্চা, লেখা প্রকাশনী, কলকাতা।
১২. আনিসুজ্জামান, মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, ঢাকা।