বারসামিয়ান: শাসনব্যবস্থা বা সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন (রেইজিম চেঞ্জ) শব্দকোষে যুক্ত হওয়া নতুন টার্ম। এটা এক ধরনের ঠিকানা পরিবর্তনের মতো। নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের অজুহাতও বটে। অবশ্য এটা আগ্রাসন, উৎখাত এবং দখলদারিত্বের চেয়ে অনেক ভালো। সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাত খুবই পোক্ত। আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন কয়েকটা সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের বিভিন্ন মেয়াদ পূর্তি হতে যাচ্ছে। আজ চিলির মার্কিন সমর্থিত অভ্যুত্থানের ৩০ বছর পূর্তি, ২৫ শে অক্টোবর ছিলো গ্রানাডার মার্কিন আক্রমণের ২০ বছর পূর্তি। কিন্তু আমি বিশেষভাবে ইরানের সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের কথা বলত চাচ্ছি। ৫০ বছর আগে, ১৯৫৩ সালের আগস্টে সিআইএ এজেন্টের নেতৃত্বে অপারেশন অ্যাজাক্স নামে একটি অপারেশন পরিচালিত হয়। ঘটনাক্রমে জানা যায়, এই এজেন্ট টেডি রুজভেল্টের নাতি ছিলো। অপারেশনটির মাধ্যমে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক নেতৃত্বাধীন রক্ষণশীল সংসদীয় গণতন্ত্রকে উৎখাত করা হয় এবং শাহকে ক্ষমতায় পুনর্স্থাপন করা হয়। শাহ পরবর্তীতে ২৫ বছর শাসনকার্য পরিচালনা করেন।
নোয়াম চমস্কি: মূল ব্যাপারটা হলো- রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদী সংসদীয় সরকার নিজেদের তেল সম্পদ নিজেদের অধিকারে নিতে চেষ্টা করেছিল। এগুলো অ্যাংলো-পারসিয়ান নামের একটি ব্রিটিশ কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল, পরবর্তীতে অ্যাংলো-ইরানী কোম্পানীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরা ইরানী শাসকদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এটা মূলত চুক্তি ছিল না, ছিল স্রেফ চাঁদাবাজি ও ডাকাতি। এ চুক্তির বিনিময়ে ইরানীরা কিছুই পায়নি, যা পাওয়ার পেয়েছিলো ব্রিটিশরা। তাদের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছিল। সাম্রাজ্যবাদী নীতির অধঃস্তনতার কঠোর সমালোচনাকারী হিসেবে মোসাদ্দেকের দীর্ঘ ইতিহাস ছিল। জনপ্রিয়তার কারণে শাহরা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে নিয়োগ দিতে বাধ্য হয়েছিল। তিনি ক্ষমতায় বসেই তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করতে শুরু করেন।
ব্রিটিশরা পুরো বোকা বনে গেলো। তারা কোন ধরনের আপোস করবে না। সৌদি আরবে মার্কিন তেল কোম্পানী যে চুক্তিতে রাজি হয়েছে এমন চুক্তির ধারেকাছেও তারা যাবে না। তারা ইরানের তেলের খনিগুলোতে ডাকাতি অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। আর এটাই মারাত্মক গণবিস্ফোরণের পথ প্রশস্ত করে দিল। ইরানের গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য ছিল, মজলিশ ছিল, সংসদ ছিল- এগুলোকে সবসময় দাবিয়ে রাখা হত। কিন্তু শাহ এগুলোকে দমন করে রাখতে পারেননি, সেনাবাহিনীও চেষ্টা করেছে কিন্তু পারেনি। অবশেষে ব্রিটিশ-মার্কিন যৌথ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকারের অবসান ঘটাতে সক্ষম হয় এবং শাহকে ক্ষমতায় পুনরায় বসায়। তারপর ২৫ বছর ধরে সন্ত্রাস, নৃশংসতা, সহিংসতার পরে ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের দেখা মেলে এবং ফলে শাহ-এর পতন হয়।
ঘটনাক্রমে অভ্যুত্থানের একটা প্রাপ্তি হলো ইরানী তেলের ৪০ শতাংশ শেয়ার ব্রিটেনের কাছ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেয়ে গেলো। আগে ১০০ শতাংশই ব্রিটিশদের ছিলো। যদিও এ অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য এটা ছিলো না, ঘটনাক্রমে এমনটি হয়ে গেছে। কিন্তু ও অঞ্চল থেকে, মূলত সারা পৃথিবী থেকেই ব্রিটিশ ক্ষমতাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনার অংশ ছিলো। ক্ষমতা বন্টনের এটা একটা সাধারণ চিত্র। নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ একটা দারুণ সম্পাদকীয় ছাপা হয়েছিল। অভ্যুত্থানকে প্রশংসা করে বলা হয়েছিল, ‘প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ অনুন্নত দেশের উন্নয়নের নির্দেশিক বিপুল পরিমাণ অর্থ রয়েছে যা তাদের লেনদেনের চালিকাশক্তি, আর এটাই নিকৃষ্ট, উগ্র ও কট্টর জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয়।’ এবং পৃথিবীর অন্যান্য মোসাদ্দেকদের শেখার হলো- ‘উত্তেজিত’ হয়ে কোন কিছু করার আগে এবং নিজেদের সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার আগে অবশ্যই সচেতন ও যত্নবান হতে হবে। কারণ ওগুলো শুধু তাদের না, অবশ্যই আমাদেরও।
কিন্তু আপনার পয়েন্ট বেশ সঠিক। মূলত সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক নীতি, এমনকি এটা স্বীকারও করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, বছর পাঁচেক আগে ক্লিন্টন প্রশাসনের সময় কিউবার বিরুদ্ধে বর্ধিত অর্থনৈতিক যুদ্ধের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন একটা অভিযোগ দায়ের করেছিল। আর এ যুদ্ধের কারণে এখানে সেকেন্ডারি বয়কট দীর্ঘায়িত হয়েছিল। এই বয়কট আন্তর্জাতিক আইনের সকল সম্ভাব্য ব্যাখ্যাতেও অবৈধ প্রমাণিত হয়েছে এবং সমস্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে এটার নিন্দা করা হয়েছে। বাণিজ্যের বাঁধা হিসেবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এটা ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশনের নজরে এনেছিল এবং ক্লিন্টন প্রশাসন স্রেফ তাদের বলেছিল, সেই ১৯৫৯ সালে তৈরী করা আমাদের নীতির উদ্দেশ্যই ছিলো কিউবার সরকারকে উৎখাত করা (এটাও সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন)। আর এমনভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কর্মকান্ডে ইউরোপের হস্তক্ষেপ করার কিছু নেই। মূলত, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা অন্য যেই লিখুক না কেন তারা মূলত নিজেদের ইতিহাস ভালোমতো জানে না। আপনি যদি কেনেডি বা জনসনের প্রশাসনের কথা চিন্তা করেন, তখন সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন নিয়ে সত্যিকারের উন্মত্ততা ছিলো। আর এটাই মূলত পারমানবিক যুদ্ধের দিকে দেশকে ঠেলে দিয়েছিল। কাস্ত্রোর শাসনব্যবস্থার পতন পরিবর্তনের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা অভ্যন্তরীণভাবে একটি কারণ দেখিয়েছিল, সেটা হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ বছরের মনরো নীতির প্রতি অবজ্ঞাশীল ছিলো কাস্ত্রোর সরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনরো নীতিটি হলো, আমরা অর্ধ-পৃথিবীর আধিকারিক এবং কাস্ত্রো সরকার আমাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ, তাই তাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সন্ত্রাসী ও অর্থনৈতিক যুদ্ধ পরিচালনা করে তাদের অবশ্যই উৎখাত করতে হবে। এই মন্তব্যের মজার বিষয় হলো- এই গুরুতর সন্ত্রাসী প্রচারণার লক্ষ্য ছিলো সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন এবং এটা একটি প্রান্তিক পারমানবিক যুদ্ধের দিকে পৃথিবীকে ঠেলে দিয়েছিল।
বারসামিয়ান: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে ইরাকী শাসকদের স্থানে ব্রিটিশরা তুর্কিদের স্থান করে দেয়। একটা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, তারা দেশটিকে দখল করে নিয়েছিল এবং এজন্যই শুরু থেকেই ‘সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন’ মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এর মধ্যে একটি বিদ্রোহ ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করে। এজন্য ব্রিটিশরা একটা মুখোশ লাগিয়ে দেয়াটাকেই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে। পররাষ্ট্র সচিব লর্ড কার্জন বলেছিলেন, ব্রিটিশ নির্দেশনার অধীনে আরব শাসন ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং এটা সম্ভবত কোন স্থানীয় মুসলিম নেতার মতো আরবপ্রেমীর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। ইরাকে মার্কিন ভাইসরয় পল ব্রেমার কর্তৃক নিযুক্ত ২৫ জনের ‘শাসক পরিষদ’ রয়েছে।
নোয়াম চমস্কি: প্রকৃতপক্ষে লর্ড কার্জন সে সময়ে খুব সৎ ছিলেন। এটা আরব মুখোশ (অ্যারাব ফ্যাসাদ) ছিলো এবং তারপর এটা চলতেই থাকল। বাফার স্টেট এবং অন্যান্য টার্মের মতো ‘সাংবিধানিক কল্পকাহিনী’র আড়ালে শাসন করতো কিন্তু এটা মূলত আরব শাসন নামক মুখোশে ঢাকা ছিলো। আর তারা এভাবেই পুরো অঞ্চল, মূলত পুরো সাম্রাজ্য পরিচালনা করছে। ধারণাটা স্বাধীন রাষ্ট্রের কিন্তু ক্ষমতায় সবসময় দূর্বল সরকারকে রাখা হয়। আর এই দূর্বল সরকার তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ওপর নির্ভর করে। তারা যদি চায় এভাবেই জনগণের সাথে প্রতারণা করতে পারে, সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তাদের আসল শক্তির শাসনের আড়ালে মুখোশের ভূমিকায় থাকতে হবে। এটাই আদর্শ সাম্রাজ্যবাদ। লর্ড কার্জন অন্যদের চেয়ে এদিক থেকে সামান্য বেশি সৎ ছিলেন, এই আর কি।
এর ওপর আপনি অসংখ্য উদাহরণ পাবেন। পল ব্রেমার একজনই। ব্রেমার নিয়োগ পাবার পরপরই, ৭-মে’র কাছাকাছি কোন সময়ে নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ একটি চমৎকার অর্গানাইজেশন চার্ট প্রকাশিত হয়েছিল। দূর্ভাগ্যবশত এটা আর্কাইভে সংরক্ষিত নেই, তাই আপনাকে সেই সময়ের কাগজের হার্ড কপি থেকেই দেখতে হবে। এটাতে ১৬ কিংবা ১৭-টার মতো বক্সের একটা চার্ট ছিলো। একদম আদর্শ সংস্থা চার্ট। শুরুতে একজনের নাম, তারপর ক্রমান্বয়ে নিচে নেমে এসেছে। সবার ওপরে পল ব্রেমারের নাম, তারপর বিভিন্ন জেনারেল ও কূটনৈতিকদের নাম দেখতে পাবেন। এদের সবাই মার্কিন কিংবা ব্রিটিশ। বড় বক্সে তাদের নাম আর অফিসে তাদের কী দায়িত্ব তা বোল্ডফেসে লেখা, এবং তারপর আপনি যদি একদম নিচের ঘরে নজর দেন, একদম নিচের ১৭ নম্বর বক্সে, এসব বক্সের লেখাগুলো প্রথমগুলোর চেয়ে অর্ধেক, বোল্ডফেস নেই, এসবে ব্যক্তিদের দায়িত্বও লেখা নেই। চার্টের ওপর লেখা ছিল, ‘ইরাকের উপদেষ্টামন্ডলী’। এটাই হলো ক্ষমতার মুখোশ। আমার ধারণা, এই তালিকা প্রকাশ করে তারা ভুল করেছিল, আর হয়তোবা এজন্যই তারা এটা আর্কাইভে সংরক্ষণ করেনি। তবে এই তালিকা তাদের চিন্তাভাবনাকে উন্মোচন করে দিয়েছে। কিন্তু লর্ড কার্জন এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছিলেন।
তবে এটা স্পষ্ট না যে, তারা এটাকে পরিচালনা করতে পারে কারণ আমার ধারণা এই পেশাটা সুবিদাজনক না। এতে ব্যর্থ হতে সত্যিকারের মেধা লাগে। একটা বিষয় হলো, সামরিক পেশা প্রায় সবসময়েই কাজ দেয়। দখলকৃত ইউরোপের নাৎসিদের সহযোগীদের সাথে দেশ চালাতে সমস্যা হচ্ছিল না বললেই চলে। প্রত্যেক দেশের অসংখ্য সহযোগী থাকে যারা মুখোশের ভূমিকা পালন করে এবং এরাই জনগণকে দমিয়ে রাখে। এটা ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ের নিষ্ঠুরতা। উপরন্তু, তারা বাইরের আক্রমণের ওপর ছিল এবং প্রতিরোধও ছিলো বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণে ও সমর্থনে। অথচ নাৎসিরা দাবী করল: ‘সন্ত্রাসীরা বিদেশী দ্বারা সমর্থিত এবং লন্ডন থেকে নিয়ন্ত্রিত’। জানেনই তো, সবচেয়ে কুৎসিত রটনার মাঝেও সত্যতার কিছু উপাদান থাকে।
যাই হোক, ঘটনা যদি এটা না হয়ে থাকে যে ভয়ঙ্কর বহিঃশক্তির দ্বারা আক্রমণের শিকার হয়েছে, তাহলে দখলকৃত ইউরোপ পরিচালনায় তাদের কোন সমস্যা থাকতো না। মুখোশের আড়ালে পূর্ব ইউরোপ পরিচালনায় রুশদের সামান্য সমস্যা হতো বটে এবং এটাও আরেকটা অত্যন্ত নৃশংস শাসন। আসলে আপনি যদি ইতিহাসের দিকে তাকান, দেখবেন- বাস্তবে এমনটাই হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে গণজাগরণের ঘটনা একেবারে বিরল।
উপরন্তু, এটা অস্বাভাবিকভাবে সহজ ব্যপার। একটি দেশ রয়েছে এক দশকের হত্যাযজ্ঞের অনুমোদনের কারণে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে, শত শত হাজার হাজার মানুষ খুন হয়েছে, পুরো এলাকা হয়েছে ছিন্নভিন্ন। আর ছিন্নভিন্ন এলাকা যেন স্কচ টেপ দিয়ে একত্রে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। যুদ্ধে একেবারে বিধ্বস্ত। এ যুদ্ধ নিষ্ঠুর শাসক চালিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের জন্য বহিঃশক্তির কোন সহযোগিতা ছাড়া আপনি সামরিক সহযোগিতা পেতে পারেন না। কেউই পায় না। আমার মনে হয়, এটা প্রায় কল্পনাতীত। আমার এও মনে হয়, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির এই ফ্লোরে যদি কিছু লোক আমরা পাই, তাহলে আমাদের লোকেরা সম্ভবত ইলেকট্রিসিটি চালনার উপায় বের করে ফেলবে। তাই এটা তাদের আশ্চর্যজনক ব্যর্থতা; এবং এটা আমাকে সত্যিই অবাক করে। প্রকাশিত সংস্থা চার্টে তাদের মূল পরিকল্পনা দেখে মনে হয় না যে এটা আদৌতেও কাজ করবে।
বারসামিয়ান: ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের আরেকটি দিক নিয়ে একটু বলেন। নিউ প্রেস-এ পুনর্প্রকাশিত ‘টোয়ার্ডস আ নিউ কোল্ড ওয়ার’ শিরোনামের প্রবন্ধে আপনি ভারতে ব্রিটিশবিরোধী নেতাদের অন্যতম জওহরলাল নেহেরুকে নিয়ে লেখেছিলেন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের দর্শন সাম্রাজ্যবাদী ‘হেরেনভক ও মাস্টার রেস’-এর মতো ছিলো এবং ‘অথোরিটিতে তারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সেটা ঘোষণাও করেছিল’ এবং বাস্তবায়ন করেছিল যেন ‘ব্যক্তি হিসেবে ভারতীয়রা অপমান, লাঞ্ছনা ও অবমাননাকর আচরণের যোগ্য’। সাম্রাজ্যবাদের মধ্যে সহজাত ও লুকায়িত যে বর্ণবাদের বিষয়টি আছে, তা নিয়ে যদি কিছু বলতেন…
নোয়াম চমস্কি: এটা স্মরণ করাই শ্রেয় যে, নেহেরু বেশ ইংরেজঘেঁষা মানুষ ছিলেন। আমার যতদূর মনে পড়ে, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ কারাগারে বসে সেটা লিখেছিলেন। আর হ্যাঁ, তিনি ভারতের অভিজাত উচ্চশ্রেণী থেকে এসেছিলেন এবং আচার-আচরণ ও স্টাইলে ছিলেন ব্রিটিশদের মতো। তিনি সঠিক মন্তব্যই করেছিলেন। কাউকে ছোট করা বা অপমান করা সাম্রাজ্যবাদী শাসনের মধ্যে লুকায়িত থাকে, এবং আমার মনে হয়, আপনি সাইকোলজি বুঝতে পারবেন। আর যখন আপনার বুট কারো কণ্ঠের ওপর চেপে ধরবে, তখন আপনি শুধু এটুকুই বলতে পারেন না যে, ‘আমি এমনটি করছি কারণ আমি ক্রুদ্ধ, কারণ আমি নিষ্ঠুর।’ বরং আপনাকে বলতে হবে, ‘আমি এমনটি করছি কারণ তারা এটারই যোগ্য। এটা তাদের ভালোর জন্যই। এজন্যই আমি এটা করতে বাধ্য হয়েছি।’ তারা ‘দুষ্টু ছেলেমেয়ে’। এই ‘দুষ্টু ছেলেমেয়ে’ টার্ম দিয়ে মার্কিন নেতারা লাতিন আমেরিকার ছেলেমেয়েদের বুঝিয়েছিলেন। তারা দুষ্টু ছেলে, আর এজন্যই তাদের শিষ্টাচার শেখাতে হবে। ফিলিপিনোদেরকেও একইভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। কিন্তু যদি আপনার ক্ষমতাসীন শক্তিদের মধ্যে অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা না থাকে, তবেই এটা শাসনব্যস্থার সহজাত অংশ হয়ে যায়। আপনার ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সেই সংবেদনশীলতা নাই। আপনার ঘনিষ্ট আন্টির মতো মানুষেরা প্রশাসন চালায় না বরং ডোনাল্ড রামসফেল্ডের মতো লোকজন দ্বারা পরিচালিত হয়। তাই তার মন্তব্য খুবই সত্য এবং সঙ্গতিপূর্ণও বটে। এর ব্যতিক্রম চিন্তা করা বেশ কঠিন। দখলকৃত অঞ্চলগুলোতেও ঠিক এটাই হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরেই হচ্ছে। ইজরাইলের কথা ধরুন, ইজরায়েলী দখলদারিত্বের সবচেয়ে বাজে ব্যপারটাই হলো প্রতি মুহূর্তে স্থানীয়দের অবমাননা ও মর্যাদাহানি করা। ভারতেও একই ঘটনা ঘটেছে।
বারসামিয়ান: রিসোর্স বা সম্পদের চালিকাশক্তি নিয়ে কিছু বলুন।
নোয়াম চমস্কি: এটা শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তবে এটা একমাত্র ফ্যাক্টর না। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিস্তিনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্রিটিশদের যে ইচ্ছা তা ফিলিস্তিনের সম্পদের কারণে না। এটার মূল কারণ হলো ফিলিস্তিনের ভূতাত্ত্বিক অবস্থান। তাই আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ পেতে অনেকগুলো কারণ কাজ করে, আর সম্পদ হলো এগুলোর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য কারণ মাত্র। প্রায় ১৫০ বছর আগে টেক্সাস আর মেক্সিকোর প্রায় অর্ধেক অংশের মার্কিন দখলের কথা ধরুন। এজন্য এটাকে সম্পদের জন্য যুদ্ধ বলা যায় না। তবে এটাকে যদি একটি কারণ হিসেবে চিন্তা করেন, তাহলে তা বলা যায়ই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের গণতন্ত্র, জেমস নক্স পক ও তৎকালীন প্রেসিডেন্টসহ অন্যান্য লোকজনের কথা চিন্তা করেন। ১৯৯০ সালে সাদ্দাম যে দোষে সাব্যস্ত হয়েছিলো ঠিক একই কাজ করার চেষ্টা তারাও করেছিল। এরা শুধু এটা খোলাখুলিভাবে চেষ্টা করেছিল, এই আর কি।
তারা পৃথিবীর অধিকাংশ সম্পদের ওপর একক আধিপত্য পেতে চেষ্টা করেছিল। সে সময় সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলো তুলা। বর্তমানে তেল যেমন এখনকার শিল্প জগতকে ত্বরান্বিত করছে, ঠিক সেভাবেই তখন তুলাশিল্প বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করেছিলো, ইন্ধন জুগিয়েছিল; এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর সুতা উৎপাদন হতো। বিশেষভাবে টেক্সাসসহ অন্যান্য অঞ্চল দখলের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো, তাদের সুতা শিল্পের ওপর একক আধিপত্য নিশ্চিত করা যাতে করে ব্রিটিশরা তাদের পদতলে চলে আসে। কারণ আমরা সেই সম্পদের নিয়ন্ত্রণ করবো যার ওপর ব্রিটিশরা নির্ভরশীল। তারা যখন নেতৃস্থানীয় শিল্পশক্তি ছিল, ঠিক তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছিল ছোট শিল্প শক্তি। কিন্তু এদের এতো সম্পদ ছিলো যার জন্য ব্রিটিশরা লালায়িত ছিল। তাই আমরা যদি এটা আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে পারতাম, তাহলে আমরা ব্রিটিশদের নতজানু করে ফেলতাম। এবং মনে রাখবেন, সে সময়ে গ্রেট ব্রিটেন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শত্রু ছিল। এটা খুবই প্রভাবশালী শক্তি ছিল যা কানাডার উত্তর দিকে ও কিবউবার দক্ষিণ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যকে প্রসারিত করতে বাঁধা দিচ্ছিল। আর, হ্যাঁ, খুবই গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, সেখানে সম্পদের জন্য যুদ্ধ হয়েছিল, অবশ্য এতে অন্য অনেক কারণও ছিল। সম্পদের বিষয়টা এখানে খুঁজে পাওয়া অস্বাভাবিক না। পশ্চিম তীরের ইজরায়েলী দখলের কথা ধরুন, এটার পেছনে অন্য কারণ ছিল। এটা কিছুটা পানি সম্পদের কারণে হয়েছিল, কারণ এই পানি তাদের প্রয়োজন কিন্তু এর আরো অনেক কারণও ছিল ।।