এনতাজ আলির ঘাম তখনো শুকায়নি। মুখে পানির ঝাপটা দেবার জন্যে পানির ফোটাগুলোও ঘামের মত লাগছে। তবে শরীরের ভেতরটা তখনো স্যাতসেঁতে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। নগদ দলীয় প্রার্থীর সাথে ভিড়ে আছে। এই ওয়ার্ডের একটা বিশেষ দায়িত্ব পেয়েছে এনতাজ। এলাকার যুবকদের হাত করা আর তাদের দিয়ে বিশেষ বিশেষ কাজ করানো। যেমন পোস্টার দিয়ে সমস্ত এলাকা ঢেকে দেওয়া, বিরোধী পক্ষের পোস্টার লাগানোর সুযোগ না দেওয়া, বিশেষ বিশেষ তথ্য সংগ্রহ করে দলীয় পুলিশকে দেওয়া। বিরোধী দলের ছেলেদের নামের বেনামী মামলাগুলো চাঙ্গা করতে পুলিশকে সাহায্য করা; ইত্যাদি। আসলে পুলিশের পাশে আছে তারা সব সময়। পুলিশ যতটা জনগণের পাশে আছে, তারা পুলিশের পাশে আছে তার অধিক। তারা পুলিশের পরম বন্ধু।
ডাইনিং টেবিলে বসেছে সবাই। সবাই বলতে তিনজন। এনতাজ, তার ছেলে কিরণ আর বউ নাহার। মেয়ের রাখি এখন শ্বশুর বাড়ি। ছেলে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স করেছে তিন বছর হলো। বাপের স্বপ্ন ছিল, ছেলে বড় সাংবাদিক হবে। টকশোতে অংশ নিবে। বড় বড় সাংবাদিকের, বুদ্ধিজীবীর সাথে তর্ক করবে। রাত বরোটার পর মুখে পান গুঁজে, খাটের নকশার দিকে বালিশটা রেখে, তাতে পিঠের ঠেস দিয়ে মজা করে শুনবে। বউ নাহারও সুড়সুড় করে পাশে এসে বসবে। যাকে এতদিন বলে এসেছে বকবকানি। স্বামীকে রাগ দেখিয়েছে ঘুম কামাইয়ের জন্য, সেই নাহারও বাহাবা দিবে ছেলেকে। কিন্তু হলো না কিছুই। পরীক্ষা, ভাইভা দিয়েছে অনেক। চাকরি হয় না। অবশেষে হয়েছিল একটাতে। দেশের প্রথম শ্রেণির এক বেসরকারি টিভিতে। গতকাল সেখান থেকে চলে এসেছে। একেবারেই এসেছে। হয় তারা বিদায় দিয়েছে, নয়তো কিরণ নিজেই বিদায় নিয়েছে। এ নিয়ে বাড়িতে কোন কথা হয়নি। কিরণ শুধু বলেছে, চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এলাম। এ নিয়ে যা একটু কথা হয়েছে বাবা-মা’র মধ্যে। ছেলের সাথে তেমন একটা কথা হয়নি। এনতাজ আলি যে সময়ও পেয়েছে, তাও নয়। তবে এনতাজ ও নাহার দু’জনেই খেয়াল করেছে, তাদের ছেলে কিছুটা ঝিমধরা হয়ে গেছে। দশটা প্রশ্নে একটা উত্তর দেয়। খাওয়াতে তার কত বাতিক ছিল, এটা খাবে না সেটা দাও, ঝাল বেশি হয়েছে, লবণ কম হয়েছে; কত রকম বিপত্তি তার ভাত খেতে বসে। এখন আর কোন কথা নেই, মুখের সামনে যা দেওয়া যায়, তাই খায়। আজকেও সেভাবেই খাচ্ছিল কিরণ। মাথা গুঁজে, বলতে গেলে মজা করেই খাচ্ছে সে। এনতাজ মুখের ভাতগুলো খালি করে কিরণের দিকে তাকিয়ে বলল- সিটি নির্বাচন নিয়ে এমন উৎসব এর আগে কোনদিন হয়নি, বুঝলি?
তাই বোধহয়। বাবার দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলো। প্লেটের টেংরা মাছের কাঁটা থেকে মাংস আলাদা করাতেই তার বেশি খেয়াল। এনতাজ হতাশ হলো। ভেবেছিল এ বিষয় নিয়ে বেশকিছুদূর আগাবে। ছেলের যোগান না পাওয়াতে সেটি আর হলো না। তাকেও প্রসঙ্গ ঘোরাতে হলো।- হ্যাঁরে, তুই যে কাল ঢাকা থেকে এলি, কিছুতো বললি না?
চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি বাবা।
না, তা অবশ্য আমি জানতাম। তুই বেশিদিন থাকবি না সেখানে। তা বাছা, তুই ছাড়লি, না তারা তোকে তাড়িয়ে দিল। কিরণ কোন উত্তর দিলো না। ভাতও মুখে তুলল না। হাত প্লেটে রেখে বসে থাকল। মা ছেলেকে আন্দাজ করতে পেরে স্বামীর ওপর মৃদু রাগ দেখালো।- থামোত, খেতে বসেও তুমি খোঁচা মারতে কম করো না। তবে কি জানিস বাবা। নাহার ছেলের দিকে মুখ ঘুরালো।- আমি স্বপ্ন দেখতাম, তুই টিভির টকশোতে বড় বড় সাংবাদিকদের সাথে তর্ক করবি।
না মা, ও কাজটিও আমার দ্বারা হবে না। এনতাজ এমন ভাবে মাথা ঘোরাল, যেন বলল, তা হবে কেন?
অমন তোষামুদে আর তেলমারা সাংবাদিক আমি হতে পারব না।
দুনিয়ার সব সাংবাদিক মাথা বিক্রি করা, তুমি একাই সত্যবাদী জিলানী। টকশোতে যারা আসে তারা সবাই তেলমারা, না? এনতাজ অনেকটা রেগে গেল।
না, সবার কথা বলিনি তো। তবে অধিকাংশই লেবেনচুষ পাগল। কিরণ তরকারির বাটি থেকে এক চামচ ঝোল তুলে নিলো। খাওয়াতে মনযোগ দিতেই এনতাজ আলি বলল- আচ্ছা হয়েছে, কিন্তু এত সুন্দর একটা চাকরি তুই ছাড়লি কেন বাবা, বলতো? এনতাজের কথাতে কিছুটা কাতরতা প্রকাশ পেল।
ঘটনা অন্যকিছু নয়, আমার চাকরিটা খেল তোমাদের সিটি নির্বাচন।
আমাদের মানে, আমাদের এই সিটির নির্বাচন? এনতাজ চেয়ার বদলিয়ে কিরণের পাশেরটাতে বসল।
না এটার জন্য নয়। এনতাজের আগ্রহে কিছুটা ভাটা পড়লেও শোনবার জন্য কান খাড়া করে থাকল।

শোন আব্বা, আমার ধারণা ছিল, বেশিরভাগ স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোই নিরপেক্ষ। অন্তত যে টিভিতে আমি গেলাম, সেটা সম্পর্কে আমার ধারণা ছিল খুবই উচ্চ। কিন্তু যোগদান করে তা ভুল প্রমাণিত হলো। বিশেষ করে সিটি নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে।
কেন, তোকে দলীয় ছেলেপেলে তাড়িয়ে দিয়েছে নাকি?
সেটা হলেও মনে সান্ত¡না পেতাম। কিন্তু আমাকে সংবাদ সাজাতে হবে টিভি মালিকের মন মতো। বলতে পারো কোন একটা দলের মন মতো। এই যেমন তোমরা বিরোধীদের পোস্টার মারতে দিচ্ছ না, কর্মীদের এলাকাতে প্রচারণা করতে দিচ্ছ না। এগুলো আমাদের সরাসরি বলা যাবে না। আমি যেমন সেখানে দেখলাম বিরোধীদের বিশেষ করে পোলিং এজেন্টদের অনেকের বাড়িতে গিয়ে আগের দিন রাতে শাসিয়ে আসা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে পুলিশ পাঠানো হচ্ছে। কোন কোন ভোটকেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্টকে বের করেও দেয়া হয়েছে। অথচ সেগুলো আমাকে সরাসরি বলা যাবে না। বলতে হবে বিরোধী প্রার্থী এসব বিষয়ে অভিযোগ করছেন। নিজের বিশ্লেষণের কোন ক্ষমতা নেই। শালার সাংবাদিকতার কী বলেছি! কিরণের ক্ষোভটা যেন প্লেটের ওপর পড়ল।
বর্তমান জামানাতে এক আধটু মানিয়ে না চললে টেকা যাবে নারে বাপ। তা যেখানেই হোক।
না আব্বা, অন্তত সাংবাদিকতা পেশায় আমি তা পরব না। তার চেয়ে বেঈমানি কাজ বোধ হয় দ্বিতীয়টি নেই। তাছাড়া এমন সাংবাদিকতা আমাদের এইট পাশ রঘুনাথও পারবে। সাংবাদিকতায় পড়াশোনার দরকার কি? এনতাজ আলির কথা বাড়াতে ইচ্ছা হলো না। ছেলের কথা শুনে তার মনটাও খারাপ হলো।
বাপ, ওসব কথা এখন থাক। রিজিক যেখানে আল্লা রেখেছে সেখানে হবে। বাপ এবার আমার কথাটা মন দিয়ে শোন। তোমাকে এলাকার মানুষ খুব ভালোবাসে। তোমার কথা শোনেও দেখি। তুমি বাপ কম বুঝের মানুষদের এ-কথাটা বোঝাও। ক্ষমতাশীন দল থেকে মেয়র নির্বাচিত হলে এলাকার উন্নয়ন দ্রুত হবে। তারা যেন গতবারের ভুলটা আর না করে।
আব্বা থামো। মাছের স্বাদটাই নষ্ট করে দিলে।
তোর কাছে মাছের স্বাদটাই বড় হলো। এতবড় একটা ঘটনা ঘটতে যচ্ছে, তোর কাছে সেটা কিছুই না?
ট্যাংরা মাছের স্বাদ আর তোমার সেই মেয়র নির্বাচন এক হলো। ধ্যাৎ আর খাব না, তোমরাই খাও। হাত ঝেড়ে উঠে গেল কিরণ। নাহারও উঠে গেল ছেলের পিছুপিছু। বাপ উঠল না, তবে রাগ দেখাল ঘাড় ফুলিয়ে। মনেমনে বলল- ওরে হারামি ছেলে, ছয়শো টাকা কেজির ট্যাংরা কি তোর বাপের টাকাতে কেনা। সেতো ভোট করা টাকাতেই কেনা। এনতাজের কথা সে নিজেই শুনলো, আর টেবিলটা সহ্য করলো তার থাবড়ানির ধকল।
যে নগরটাকে নিয়ে ফুটন্ত-উত্তাপ আজ টিভির পর্দাতে বা অনলাইন পত্রিকাতে, সে উত্তাপের অর্ধেকও নেই সেই নগরে। ভোট হচ্ছে খবরে, ভোট হচ্ছে ভোটকেন্দ্রে, ভোট হচ্ছে ব্যালট পেপারে ব্যালট বাক্সে। বাড়ছে হোবু নগর-পিতার ব্যালট পেপারের স্তুপ। এক দলের কাঁধে জয়ঢাক ঝুলিয়ে বাড়ি দেবার অপেক্ষা। অন্যদলের কাছে পূর্বের ঝোলান খোল।
ভোট গ্রহণ শেষ হলো, উত্তেজনা বাড়লো। উত্তেজনা হারজিতের নয়, উত্তেজনা একটি ঘোষণা শুনবার। এনতাজ আলিদের চোখেমুখে একটা দ্যুতি খেলা করে। আবার মনে মধ্যের চকমকি পাথরটা আপনমনে লাফায়। অন্য একটা পাথর কাছে এলেই হয়। ঘঁষা না লাগলেও জোর করে লাগাবে। চায়ের কাপে প্রমোশন, সিগারেটে প্রমোশন। পান না খাওয়া মুখ আজকে খায় কাঁচা সুপারি দেওয়া পান। পূর্বের জানা খবরও যে একটা ঘোষণার মাধ্যেমে শোনা কত সুখকর, তা আজ মর্মে বুঝতে পারছে বিজয়পথের যাত্রীরা।
ফলাফল এলো টিভির পর্দাতে। সময়ের আগেই এলো। জানা খবর জানালো টিভি। তবে ব্যবধানটা হলো অনেক। এত বেশি ভোটে না জিতলেও পারত তারা। ব্যবধানটা ১০ বা ১৫ হাজারের হলে নগদ দল মিডিয়াতে দাম পেত। এখন আর তা হলো না। তবুও আনন্দ। ভাশুরের বিছানায় থাকা লোকের দেবরের কাছে এ আর তেমন লজ্জা কি? এনতাজ বাহিরে বেশি সময় থাকল না। বাড়িতে আজ যা যা রান্না হয়েছে, সবকটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভেসে উঠল মনে, নাকে আর পেটে। দুই পদের মাংস, ইলিশ ভাজা, বিরিয়ানির সৌরভ, ইত্যাদি। টেবিলে একসাথে বসে খাবে চারজন। ভোট-উৎসবে যোগ দিতে মেয়ে রাখি এসেছে।
বাসাতে ঢুকেই ডাইনিং টেবিলে একএক করে সব দেখল। বউয়ের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বাথরুমে গেলে। দরজা লাগাতে ভুলে গেল। মুখ-হাত ধুতে ধুতেই সমস্ত দিনের ফিরিস্তি বলে চলে এনতাজ। গলা ফাটিয়ে বলে। বউ যেন রান্নাঘর থেকে শুনতে পায়। নাহার রান্নাঘরে শশা কাটছে।
এনতাজ খবরের একটা চ্যানেল ধরে টিভিতে ভলিউম বাড়িয়ে দিলো। খুব আয়েশ করে বসল খাবার টেবিলে। প্লেট সামনে নিল বটে, কিন্তু স্বস্তি পেল না। এতক্ষণে খেয়াল করল, কিরণ নেই। ঘরের দিকে তাকিয়ে বুঝল, ছেলে ঘরে নেই। কাউকে কিছু না বলেই ফোন করল। ফোনে কিছুটা রাগারাগি হল। আর এই রাগারাগির ধরনে যা বুঝা গেল, তা হলো- কিরণের ফিরতে আরও কিছুটা দেরি হবে। মা ও মেয়েকে খেতে বলে এনতাজ লাফ দিয়ে উঠল। নাহার বাধা দিল কিন্তু এনতাজ শুনল না। ছেলেকে এনে তবেই একসাথে খাবে। এত পদ, এত স্বাদ, এত গন্ধ একা খেতে বিস্বাদ ঠেকবে।
বাড়িটা শহরের মধ্যে কিন্তু শহর থেকে আলাদা। ভোট, ভোটের শোরগোল চলছে চারদিক, কিন্তু এখানে অনেকটা নীরব। বাড়ির পেছন বারান্দায় খেলছে তারা। খেলছে কিরণ আর তার তিন বন্ধু। ক্যারামবোর্ড। বারান্দার অন্যপাশে দু’টি গাভি বাঁধা। চালের উপরে লাউগাছ। এনার্জি বাল্বের আলোতে স্পষ্ট দেখা যায়, বেশ কয়েকটি লাউ ধরে আছে। একপাশে কবুতরের কয়েকটি টঙ। কবুতর দেখা না গেলেও ডাক শোনা যায়। ডাকে বাদশাহী ভাব। এই বাড়ির মেজছেলে কিরণের বন্ধু। সে এগুলো পোষে। এনতাজ যতটা রাগ নিয়ে এলো, ততটাই ঠা-া হলো এখানে এসে। তারা চারজন বেশ নিমগ্ন এই খেলাতে। আনন্দ বন্যাতে ভেসে যাক চারদিক। তাদের ভিটে ছুঁতে পারে না সেই বন্যা। চারজনেই এমএ। ভালো সাবজেক্টে খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়েছে তারা। এখনও কোন অফিসের টেবিলে ঝুলতে পারেনি। তাদের বাপ বা দাদা, কেউ-ই মুক্তিযোদ্ধা ছিল না। ছিল না বিরোধী পক্ষ। তারা কেউ প্রতিবন্ধীর সনদ অর্জনের যোগ্যতাও রাখে না। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ঘরে জন্মালেও কথা ছিল না। উচ্চতা ও যোগ্যতায় খাটো হলেও কিছু না কিছু জুটে যেত। চিনচিন করে উঠল এনতাজের বুক। মলিন হল মন। রাগ ভুলে কিছুটা হাসি মুখে দাঁড়াল ছেলের কাছে। তার মনে হল, এরা ভোটের ফলাফল এখনও বোধহয় জানে না। তাই সে অতি উৎসাহি হয়ে বলল- কিরণ, তোরা শুনেছিস, আমরা জিতে গেছি।
ও আচ্ছা। কিরণের এই সংক্ষিপ্ত জবাবে হতাশ হলো এনতাজ। ভেবেছিল তার এমন হঠাৎ আসাতে কিরণেরা চমকাবে। কিন্তু চমকাল না। এমনকি আগ্রহ নিয়ে তাকালো না পর্যন্ত। না তাকিয়েই এমন উত্তর দিল। তারা যেন আগে থেকেই জানত, এনতাজ আসবে।
কী গো, তোমাদের ভাব দেখে মনেই হচ্ছে না, আজকে একটা নির্বাচন ছিল। মনেই হচ্ছে না, আমার কথা তোমরা শুনেছ। এই কিরণ, এই, আমার জিতেছিরে। মেয়র এবার আমাদের।
এমন সময় কিরণ মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়ল। চুল আঁকড়ে ধরে বলল- ওহ, সিট! আব্বা তোমার কাজ নেই। এখানে এসে বকবক করছ কেন? তোমরা পাশ করেছ তো কী হয়েছে? জাতিকে উদ্ধার করেছ, না? তোমার জন্যই রেডটা ফেলতে পারলাম না। গেমটা নির্ঘাত আমাদের ছিল। পড়া ঘুটি পড়ল না। এনতাজ পাথর হয়ে দাঁড়াল। বুঝতে পারছে না এখন তার কী বলা মানাবে। ভাবতে পারেনি ছেলে এভাবে রেগে যাবে। শুধু বুঝল, তার জন্যই কিরণ রেডটা ফেলতে পারেনি। তারপরেও কিছুটা কাতর হয়ে বলল- কিরণ, কী বলছিস তুই। এতবড় খবরের চেয়ে তোর রেডটাই বড় হলো?
এই রেড পয়েন্ট পেলে আমাদের অবশ্যই গেম হতো। তুমি জান, রেড পয়েন্টের এখন কত মূল্য।
তার মানে? একটা মেয়র নির্বাচন হলো, আমাদের দল থেকে মেয়র হলো। আর এর থেকেও তোর রেড পয়েন্টের দাম বেশি হলো? এই তোরা কিছু খেয়েছিস নাকি?
ধ্যাৎ, কি যা তা বকছো। তোমরা মেয়র কর আর প্রধানমন্ত্রীই কর, তাতে আমাদের কি? আমার রেড পয়েন্ট তাদের থেকেও দামি। তুমি যাও এখান থেকে। মাথা খারাপ কর না।
মাথা খারাপ বলছিস কিরে, মাথা তো খারাপ হয়েই গেছে। শিঘ্রই বাড়ি চল।
কি অশান্তি শুরু করলে। যাও বলছি। উল্টো ধমক দিলো বটে, কিন্তু সেই সাথে জোরে ঘুঁষি মারলো বোর্ডে। মুখে উচ্চারণ করল একটা বাজে শব্দ। তবে কথাটা কেউ স্পষ্ট শুনতে পেল না। খেলার বোর্ড ভাঙার শব্দে গালিটা উড়ে গেল। বোর্ডে তখন তিনটি ঘুটি ছিল। লাল, সাদা, কালো। উড়ে গেল ঘুটি তিনটি। উড়ে গেল রেড। উড়ে গেল রেড পয়েন্ট। উড়ে গেল নির্বাচন; উড়ে গেল মেয়র। উড়ে গেল খেলা। এখন চলছে একটাই খেলা। শুধুই উড়াউড়ির খেলা। খোপে ডাকন্ত কবুতরগুলোর কণ্ঠ থেমে গেল । জাবরকাটা থামালো গাভি। একটা পাখিও বোধহয় উড়ে গেল লাউগাছের পাতার আড়াল থেকে। এনতাজও উড়তে পারত। কিন্তু সে এখন কাঁপছে। ছেলেকে একজন সাইক্রিস্ট দেখাতে যে হবে, এ বিষয়ে সে নিশ্চিত হয়েছে। কোন ডাক্তারকে দেখাবে এটাও সে ভেবে নিলো। এনতাজ এক এক করে সামনে কিছু বিষয় সাজালো। নির্বাচন, মেয়র, রেড পয়েন্ট, চাকরি, চিকিৎসা। কোনটাকে সে সামনে রাখবে ভেবে পেল না। তবে বারবার সাজাতে লাগল ক্রমানুসারে ।।