রবার্ট ফ্রস্টের কবিতা সম্পর্কিত বক্তব্য হলো ”A poem begins as a lump in the throat, a sense of wrong, a homesickness, a lovesickness.” তিনি টি এস এলিয়টের ভাবনাচিন্তার সাথে একমত পোষণ করে বলেন, ‘একজন মানুষ যন্ত্রণা ভোগ করে আর একজন শিল্পী যিনি সৃষ্টি করেন, মূলত এটাই পার্থক্য দুইয়ের মধ্যে।’ ১৯৩২ সালে সিডনি কক্সের কাছে একটি চিঠিতে কবিতা সম্পর্কে এভাবে ব্যক্ত করেন : ‘The objective idea is all I ever cared about. Most of my ideas occur in verse…To be too subjective with what an artist has managed to make objective is to come on him presumptuously and render ungraceful what he in pain of his life had faith he had made graceful.’ ফ্রস্ট কখনও ঐতিহ্যগত বা চিরাচরিত ছন্দের বাইরে এসে কবিতা লেখেননি, সে জন্য তিনি অনেক সমালোচিত হয়েছেন। তাঁর কবিতায় রয়েছে সাবলীলতা; অহেতুক জটিলতাকে কবিতায় আরোপ করেননি কখনও; কৃত্রিম শব্দ নির্বাচন এবং ব্যবহার ক্ষেত্রে এড়িয়ে গেছেন বারবার। তিনি ‘Education by Poetry’ তে তাঁর কবিতা সম্পর্কে এভাবে বর্ণনা করেন ‘কবিতা শুরু হয়
মামুলি উপমা দিয়ে, তারপর মনোরম উপমা দিয়ে, তারপর লাবণ্য আর কমনীয়তা দিয়ে এবং পরিশেষে নিগূঢ় চিন্তনের দিকে এগিয়ে যায়।’ আবার বলেছেন, ‘Poetry is when an emotion has found its thought and the thought has found words’. অর্থাৎ কবিতা হলো আবেগ যখন তার ভাবনাকে খুঁজে পায় এবং ভাবনা যখন খুঁজে পায় শব্দ, বলেছেন আধুনিক কবিদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী কবি রবার্ট লি ফ্রস্ট (মার্চ ২৬, ১৮৭৪- জানুয়ারি ২৯, ১৯৬৩) যিনি আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে জন্মগ্রহণ করেন; কবিতার জন্য পুলিতজার পুরস্কার পান চার বার: নিউ হ্যামশায়ার : এ পয়েম উইথ নোটস অ্যান্ড গ্রেইস নোটস (১৯৪২), কলেকটেড পয়েমস (১৯৩১), এ ফারদার রেঞ্জ (১৯৩৭), অ্যান্ড উইটনেস ট্রি (১৯৪৩)। আর নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন একত্রিশবার কিন্তু তা অপ্রাপ্যই রয়ে যায়। আমেরিকাতে জন্মালেও জীবনের একটি দীর্ঘ সময় তিনি কাটিয়েছেন, খামারবাড়ি তৈরি করে কৃষিকাজ করেছেন ইংল্যান্ডের নিউ হ্যামশায়ারে। উদ্দেশ্য ছিল প্রকৃতির কাছে থেকে উপলব্ধি করবেন অকৃত্রিম মমতা; প্রকৃতির মনোমুগ্ধকর রূপ থেকে তুলে নেবেন সব ধরনের উপমা আর অনুষঙ্গ। লিখেছেন ‘ট্রি অ্যাট মাই উইন্ডো’ অ্যান্ড ‘মেন্ডিং ওয়াল’ এর মতো বিখ্যাত কবিতা। আর এ সময়ে তাঁর প্রথম দুটি কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয়: ‘এ বয়েজ উইল’ (১৯১৩) এবং ‘নর্থ অফ বোস্টন’ (১৯১৪)। ১৯১২ সালে অ্যামেরিকান ম্যাগাজিন তাঁকে ভীষণভাবে নিরুৎসাহিত করে এবং তাঁর অনেক লেখাই ছাপার অযোগ্য বলে দাবি করে। কিন্তু এ বয়েজ উইল’ এবং ‘নর্থ অফ বোস্টন’ কাব্যগ্রন্থ দুটি প্রকাশ হওয়ার পর অর্থাৎ ১৯১৫ সালে নিজ দেশে তিনি দারুণভাবে সমাদৃত হন এবং বিখ্যাত সাহিত্য ও সংস্কৃত ব্যক্তিত্ব বনে যান। ইংল্যান্ডে থাকাকালীন সময়ে সখ্য গড়ে ওঠে এডওয়ার্ড থমাস, টি ই হালমে এবং এজরা পাউন্ডদের মত কবিদের সাথে। উল্লেখ্য যে এজরা পাউন্ড তখন ইংল্যান্ডেই বসবাস শুরু করেছেন। ১৯৬১ সালে অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির শপথ গ্রহণের দিন কবি রবার্ট ফ্রস্টকে কবিতা পাঠের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং জন এফ কেনেডির অনুরোধে ‘The Gift Outright’ কবিতাটি পাঠ করেন।
My November Guest
আমার হেমন্তের অতিথি
তুমি যখন আমার পাশাপাশি, তখন দুঃখ-বিলাসী আকাশ নামে
ভাবতে পার শরত-বৃষ্টি-অন্ধকার-দিন কিংবা তারাভরা সাজি
আরও নান্দনিকতায় সাজতে পারে;
ভালোবাসতে পার বাকল খোলা শরীর, শীর্ণতায় জড়ানো বৃক্ষ রাজি;
ভালোবেসে হাঁটতে পার অথৈ সিক্ত সরু পথ, অবিরাম হেলেদুলে।
তার অভিলাষ চলন আমাকে নিরুদ্দেশের নাগরিক করে।
তার দুঃস্বপ্নের নদী উছলে উঠলে আমি খুঁজি গন্তব্য সহর্ষে:
তার মুগ্ধতার বর্ষণ ঝরে পাখিরা দল মেলে ডানা ছড়ালে,
উচ্ছ্বাসের কিরণ ওড়ে তার পশমি-উলে ধূসরতা বাড়লে
রুপোর-কুচি-মাখা সন্ধ্যা যখন কুয়াশা জড়িয়ে রাখে।
জনবিহীন-অনুচ্চারিত-জনপদ, শীর্ণ-বৃক্ষ-নিঃসঙ্গ
নির্বাক-ম্লান-নিসর্গ, ঝুলন্ত ভারী আকাশ, বিহঙ্গ
সে সত্যিকারের সৌন্দর্য অবলোকন করে চোখের তারায়
উদাসীন ভাবনায় মগ্নতা তার, ভাবে- এগুলো দ্যাখার সাধ্য নেই আমার!
উদয়াস্ত এসব ধাবিত করে, আমাকে তাড়িত করে অন্যথায়।
শুধু বিগত কোনো আলো-আঁধারি-দিনে নয়, আমি জানতে শিখেছি
নগ্ন হেমন্ত আর প্রারম্ভিক শীতের মনোরম দিনগুলোর ভালোবাসা
তুষার কিংবা শৈত্য-প্রবাহের আগে নদীগুলো বাড়ি ফেরার পথে বিশুদ্ধ নেশা
প্রকৃতি যেন আমার প্রেমিকা হয়ে ওঠে। কিন্তু এগুলো তার কাছে নিরর্থক, জেনেছি।
বরং সেগুলো তার কাছে প্রশংসা করার জন্য যথেষ্ট ভালো।
18/06/2018, 81.17 pm
214 Shaftesbury Avenue, London
A Late Walk
নিশুতি ভ্রমণ
পড়ন্ত শস্যখেতের মধ্যে দুরন্ত পা ফেলে-ফেলে এগিয়ে যায় আমার ছায়ারা
এক নির্বোধ ভবিষ্যৎ একদিন মায়ার আঁচল তুলে তাকায়
তখন স্নিগ্ধতায় জমে থাকা খড়-কুটো-শিশির হ্যালান দ্যায় অবেলায়
ফেলে আসা সে পথ আবার ভ’রে ওঠে লতাগুল্মে, পায়ে জড়িয়ে যায় পুরনো শব্দরা
মস্তিষ্কের পাতাল খুঁড়ে ফের উঠে আসে এক বিষণ্ণ অরণ্যদিন
প্রশান্ত পাখালি বাজায় করুণ পিয়ানোয় বিগত বসন্ত সঙ্গিহীন,
আগাছায় বাঁধে সম্পর্কের জট জেনে ন্যায় পারস্পরিক সমাচার
এ যেন নির্জন-একাকীত্বের কাছে যে কোনো শব্দই মেনেছে হার।
দেয়ালের ওপাশেই অপেক্ষার শেকড় ছড়িয়ে অনাবৃত বৃক্ষ
বহুকাল ধরে পত্র-পল্লবে তার পড়েছে অবিমিশ্র বাদামি ছায়া
অগোছালো যেন নির্জীব লোকালয়, শীর্ণ প্রশাখা ভীষণ রুক্ষ
এবার চৈতন্যে নামো ধীর লয়ে, ছড়িয়ে বসন্তের প্রাণবন্ত মায়া।
নতুন আলোর দিকে এগোনো আর কোনো প্রস্থান নয়
ম্লান নীলাভ আলপনায় এক নতুন সৃষ্টির উৎসধারায়
যা কিছু অবশিষ্ট আছে তার সব তোমার উৎসর্গ নামায়
বাগান বিলাসী ফুল আর নয়নতারা জড়ো হোক উঠোনময়
02/06/2018, 8.00pm
Shaftesbury Avenue, London
Love and a Question
ভালোবাসা এবং একটি প্রশ্ন
ভরসন্ধ্যে বেলায় এক আগন্তুক এসে দাঁড়ালে চৌকাঠে
নিঃসংকোচে যুবক এসে কথা বলে চোখে চোখ রেখে
আগন্তুকের ক্লান্তি তখন হেলে পড়েছে সাদা লাঠিতে
তল্পিতল্পা ঝিমিয়ে যেন, তবু চেয়ে আছে শ্রান্ত মুখখানিতে।
ঠোঁটের ভাষা বন্দি, তখন চোখের ইশারায় প্রশ্নরা কাছে দূর
দীর্ঘ রাত্রি যাপনে কোনো আশ্রয় যদি মেলে- ভালো!
তবু দৃষ্টি তার ফেলেছে ছায়া সুদূর রাস্তার দিকে যতদূর
অন্ধকার জমেছে, যেন ভুল করে জানালা আজ ফ্যালেনি আলো।
অবসন্ন রাত্রি ছায়া, যুবক নির্মোহ চোখে দাঁড়িয়ে বারান্দায়।
নেমে এসো আকাশের কাছে- নক্ষত্রবহরে দৃষ্টি ছড়াও
ছুড়ে দিতে পারো প্রশ্নবাণ- কী হতে পারে প্রলম্বিত সন্ধ্যায়?
আগন্তুক- তুমি আর আমি, দূরগ্রহে ঝাড়বাতি–ফিরে তাকাও।
উডবাইনের সবুজ পাতা উঠনে বুনেছে নকশি-কারুভাঁজ
নীলাভ-উডবাইন বেরিগুলোর শরীরে যেন ঋতুর বহু-সাজ
শরত উড়িয়েছে পাল, হাওয়ায় তখনও শীতের কোলাহল
আগন্তুক, জেনেও এ ধীর-পথ যেন হাঁটেনি বহুদিন বহুকাল
এর মধ্যে নববধূ ম্লান অন্ধকারে চেয়ে থাকে এক বিষণ্ণ মনে
ধনুকের মতো একটু বেঁকে, কী যেন খোঁজে সে অনুরণনে
জ্বলন্ত পাথুরে কয়লার মতো প্রদীপ্ত তাঁর মুখচ্ছবি ঠিক গোলাপি আভা
আর ভাবনার বৈভবজুড়ে অন্তর্দেশের অভিপ্রায় যেন প্রবল স্বর্ণালি প্রভা।
নির্জন নীলগিরি থেকে বিষাদী চোখ চেয়েছিল যুবকের চোখে
আর প্রিয়তমা, তবু সে ছাইরঙা কুয়াশায় দাঁড়িয়েছে আছে ঠাঁই
সোনা-আভরণে মোড়া থাক তার হৃদয়- প্রার্থনা যুবকের বক্ষে
রুপালি পিন-ই যেন পাহারায় থাকে হৃদয়-প্যানডোরা, প্রার্থনা তাই।
যুবকটি এখন ভাবনার ঘোড়া ছুটিয়ে মনস্তাপ করেছে অবশেষে
হয়তো ছোট কিছু দেবে আগন্তুককে, আশ্রয় অথবা অর্থমুদ্রা ভালোবেসে।
গভীর প্রার্থনায় জুড়েছিল হাত- এমন উদ্বাস্তু-গৃহহীন, মানুষের মতো বাঁচুক
অথবা ধনীদের জন্য অভিসম্পাত, একবার ওরা পথে নেমে দেখুক।
কিন্তু হয়তো হয়তোবা না, প্রতিহিংসা ছড়িয়েছিল কারো মনে
অমানিশায় পোড়াতে দু’জনের ভালোবাসাকে
পুষে রাখা দুর্ভাগ্য দিয়ে, অনিষ্ট করতে নববধূর প্রশান্তিকে।
হয়তো সে কথা যুবক টের পেয়েছিল আনমনে।
11/06/2018
8.00pm
Shaftesbury Avenue, London