বিপন্ন সময়ের ধ্বনি
একি আমার স্বপ্নে দেখা ফুলের বাগান
হিসেব করে তোমার কথা বলতে হবে
হিসেব করে তোমায় ভালোবাসতে হবে;
একি আমার ছেলেবেলার সেই শোনা গান
রাত-বিরেতে মাতম শুনে জেগেই থাকা
অষ্টপ্রহর তেলের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখা;
একি আমার গজিয়ে ওঠা চরের ভূমি
স্রোতের তোড়ে ভাঙে যে চর অশ্রুজলে
ভাঙতে ভাঙতে সশব্দে যে বিসর্জনের বার্তা বলে;
একি আমার ভালোবাসার বাগান দামি
যে বাগানে বিষন্নতা উদয়গামী;
এ তো দেখি ভালোবাসার কাজল ভ্রমর
অপচ্ছায়া বিষন্নতার রক্ত-সমর!
ফররুখ আহমদ
মধ্যরাতে একা একা সিন্দবাদ মাঝির মতন
নাবিক ঘুরেছো তুমি সমুদ্রের সুনীল গভীরে;
আপন আত্মার মোহে অজানা দ্বীপের তীরে তীরে আলোকে
খুঁজেছো তুমি পাড়ি দিয়ে উজানি পবন।
‘রাত পোহাবর দেরি’ অতএব সবুজাভ বন
খুঁজছো অজস্র রাত; নোঙর ফেলেনি কোন ঘাটে;
বিষন্ন হওনি তুমি জীবনের শতবাঁক মাঠে
মনজিল কতদূর? বহুদূর হেরার তোরণ!
অনেক আশার পথ বারবার টাইফুন ঝড়ে
হারিয়েছো দীর্ঘশ্বাসে; তারপর আবার সফর
এইভাবে কাটিয়েছো বহুদিন সমুদ্রে সময়।
তামাম দিনের শেষে সকালের সূর্য ওঠা ভোরে
লবিদের মতো তুমি এনে দিলে বিজয় খবর,
মানুষের রক্তে বহে যে রকম সবুজ বিনয়।
মধ্যযামের কবিতা
বয়স তো আর খুব বেশি না
কিংবা হয়তো হবেও-বা তা
আমি কিন্তু এসব কিছু ঠাঁই দেই না
যেহেতু ওই বছরগুলো তুষার পাতা।
মানুষগুলো যদিও অসাড়, চন্দ্র পালায়
তারার আকাশ সন্ধ্যামুখে সূর্য ডোবায়
দাঁড়াবে না কোনকিছু একই স্থানে
ঘণ্টা সেকেন্ড চলছে সবাই
ভাটির ছন্দে জোয়ার টানে।
‘শব্দাবলী’ সূর্য তো না, চন্দ্রও নয়
নদীও নয় চলবে যে ওই
ক্রমান্বয়ে খরস্রোতা পানির বানে।
অবশেষে গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা আসে
বর্ষা শেষে অন্য ঋতু, ঘূর্ণায়মান মহাকাশে
যেমন করে মধ্যযুগের প্রজ্ঞা বয়স
বুলেট ছোঁড়া শব্দাবলী’র সাক্ষী সাহস।

মৃত্যুর চিত্রকল্প
কবি আবিদ আজাদ স্মরণেষু
আবিদ ভাই, আপনিও তো কবিতায় বারবার মৃত্যুদৃশ্য এঁকেছেন:
মৃত্যু আপনাকে সাদা স্কুল ড্রেস পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ‘নতুন ইশ্কুলে।’
আপনি তো কবরের মাটি খোঁড়ার শব্দ শুনেও মৃত্যুকে উপেক্ষা করেননি।
বরং হাসপাতালে হাসপাতালে কেবিনে কেবিনে কবুতরের মতো
আপনার কবিতার শব্দেরা ফরফর করেছ ওড়াউড়ি।
আপনার শব্দের মৌতাতে হাসপাতালের ফেনাইল ভরাগন্ধও শরম পেয়েছে।
জানেন আবিদ ভাই,
আপনার ‘হাসপাতালে লেখা’ কবিতা থেকে কিছু মৃত্যুর চিত্রকল্প
পরম মমতায় তুলে এনে আমি আমার সাদা রুমালে বেঁধে রেখেছি।
মৃত্যু তো এমনই। নির্মমও না, নির্দয়ও না;
সকল অসুখের চিরনিরাময়।
মৃত্যু এক দূর পথে দীর্ঘ সফরের প্রথম প্রান্তর।
মাটি ও প্লাবন
মানুষকে বলো
তার প্রতিশ্রুতি স্মরণ করুক,
জিনকে বলো
সে যেনো আর অভিশপ্ত না হয়
এবং
পৃথিবীকে বলো
আমরা দ্বিখণ্ডিত ত্রিখণ্ডিত হবো না
আমরা পৃথিবীর মাঝখানটায়
অথবা কোন নির্দিষ্ট সীমানায়
ফারাক্কার মতো আরেকটি বাঁধ দিতে দেবো না।
প্রতিশ্রুতিহীন জীবন আমাদের কাছে অর্থহীন,
অভিশপ্ত হওয়া মানে আদিম শত্রুতা
আর দ্বিখণ্ডিত ত্রিখণ্ডিত হওয়া মানে
নির্লিপ্ততাকে ছাড়িয়ে যুদ্ধের কাঁটাতারে
মাটিকে রক্তাক্ত করা।
আমাদের দেহের আত্মীয় মাটি
যেটুকু উদ্ভিদহীন
তাকে উর্বরা করতে আবার আসুক ঝড়
একটি নূহের প্লাবন
ভেসে যাক মুছে যাক তাবৎ পাপের স্তূপ
মাটি আবার নবজাত হোক।
প্রতিবিম্ব
সামনে তোমার আয়না ধরে তুমি
দিনগুলোকে আধখানা ভাগ করো
নাকের ওপর তিলটি দেখার মতো
দেখবে আমি ভাসছি অবিরত।
ঠোঁটে ঠোঁটটি কামড়িয়ে তুমি দেখো
কেমন জ্বালা ফিরিয়ে আমায় দিলে
চোখের উপর চোখটি রেখে বলো
কেন আমার সুখটি কেড়ে নিলে?