ইতিহাস মানেই রাজা-রাণী, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, সুলতান-সুলতানা, নবাব-বেগম, উজির-সেনাপতির বীরত্ব অথবা কাপুরুষতার কাহিনী। দেশ-রাজ্য-ভূমি নিয়ে যুদ্ধ-সংঘাত। আর তাতে জয়-পরাজয়ের কাহিনী। অথবা সুশাসন-দুঃশাসনের কথকতা। হেরেম-চিত্রও বাদ যায় না। এসব চিত্র-বিচিত্র চালচিত্রের আড়ালে-অন্তরালে থাকে অজস্র বলা-না বলা কতো ঘটনার সমাহার। কখনো গবেষণার প্রক্রিয়া মেনে তুলে আনা হয় প্রকৃত ইতিহাস-চিত্র। আবার কখনো কিংবদন্তি-জনশ্রুতি আকারে প্রচারিত থাকে মুখে মুখে। তবে সব মিলিয়ে অবশেষে সবই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
এমনই কিছু ঘটনা, কিছু ‘কাহিনী’ কিছু জনশ্রুতি, কিছু ‘গল্প’ ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে আছে অতীব চমকপ্রদ হিসেবে। এই বাংলা ভূখণ্ডে যাকে বলা যায় গৌড়বঙ্গ- সংঘটিত এমনই কয়েকটি ঘটনার বিবরণ সংক্ষিপ্তাকারে উপস্থাপিত হলো।
একবেলার সম্রাট
বাংলা ভুখণ্ডের অনেকাংশই জয় করে ফেলেছেন আফগান সিংহ শেরশাহ। এখন তাঁর চোখ দিল্লির সিংহাসনের দিকে। সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করেই কেবল সে ইচ্ছা পূর্ণ হতে পারে। তিনি শক্তি প্রয়োগের চেয়ে কৌশলের দিকেই বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। বাংলা-বিহার সীমান্তের চৌষা নামক স্থানে হুমায়ুন-শেরশাহ মুখোমুখি। ধূর্ত শেরশাহের কৌশলের কাছে পরাজিত হলেন হুমায়ুন। প্রাণ বাঁচাতে গঙ্গায় ঝাঁপ দিলেন। সাঁতার কাটার এক পর্যায়ে পানিবাহক একজন ভিস্তিওয়ালা তার চামড়ার মশক ছুড়ে দিলো হুমায়ুনের দিকে। মশক ধরে প্রাণ বাঁচিয়ে তীরে উঠলেন সম্রাট। ভিস্তিওয়ালা নাজিমকে সম্রাট হুমায়ুন ওয়াদা দিলেন এর প্রতিদান তিনি একদিন শোধ করবেন। তাকে একদিনের জন্য হলেও সিংহাসনে বসাবেন।
মোগল সম্রাট হুমায়ুন (১৫৩০-১৫৪০ ও ১৫৫৫-১৫৫৬) শাহি মহলে দরবারে সমাসীন। ভেতরে জরুরি সভা চলছে। চারদিকে সতর্ক প্রহরীরা। হঠাৎ এক প্রহরীর দৃষ্টি পড়লো এক ভিস্তিওয়ালার ওপর। ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে প্রধান ফটকের দিকে। পরনে ছেঁড়া-ময়লা জামা। কাঁধে বহন করছে পানি বহনের চামড়ার ভিস্তি। হাঁক ছেড়ে ভিস্তিওয়ালার গতি থামিয়ে দিলো প্রহরী। শান্ত ও ধীর কণ্ঠে ভিস্তিওয়ালা বললো, ‘আমাকে বাদশাহর কাছে নিয়ে চলো’। অট্টহাসিতে প্রহরী তাকে ধমক দিয়ে বললো, এই মুহূর্তে তুমি বিদায় না হলে তোমাকে কারাগারে ঢোকানো হবে। কিন্তু ভিস্তিওয়ালা নাছোড়বান্দা। সে জোর দিয়ে বললো, ‘আমাকে বাদশাহর কাছে নিয়ে চলো। তিনি আমাকে দেখলেই চিনবেন। আমাকে একবার সাক্ষাতের সুযোগ দাও।’ এবার ক্রুদ্ধ প্রহরী ভিস্তিওয়ালাকে আটকে রেখে সম্রাটের কাছে খবর পাঠালো- জাঁহাপনা এক ভিস্তিওয়ালা আপনার সাথে দেখা করতে চায়। সম্রাট তাকে দরবারে পাঠাতে আদেশ দিলেন। হুমায়ুনের চোখে ভেসে উঠলো সেই খর¯্রােতা নদীর ঘটনা। এখন সেই ভিস্তিওয়ালা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তিনি আপ্লুত কণ্ঠে বললেন :
– তুমি ভিস্তি নিজাম না?
– জি আলমপানাহ! আপনার স্মৃতিশক্তি প্রশংসারও ঊর্ধ্বে।
– আমি তোমাকে বলেছিলাম একদিনের জন্য হলেও তোমাকে সিংহাসনে বসাবো। আজ অর্ধেক বেলা পার হয়ে গেছে। তারপরও তুমি চাইলে আজই সিংহাসনে বসতে পারো। তুমি কি আজই সিংহাসনে বসতে চাও?
– সম্রাটের অনুগ্রহ এবং মহানুভবতা সমুদ্রের পানির চেয়েও বেশি। আমি আজই সিংহাসনে বসতে চাই।
দরবার কিছুক্ষণের জন্য শব্দহীন হয়ে গেলো। সামান্য ভিস্তিওয়ালা দিল্লির সম্রাট! এ কেমন কথা! সবার দৃষ্টি ভিস্তি নিজামের দিকে। দরবারের শান-শওকত দেখে সে খুব বিচলিত বলে মনে হচ্ছে না। তার দৃষ্টি সম্রাটের দিকে নিবদ্ধ।
ভিস্তি নিজাম গম্ভীর মুখে সিংহাসেন বসে আছেন। তাঁর চেহারা মলিন, পোশাক মলিন। তবে রাজমুকুট ও পাদুকা চকচক করছে। রাজমুকুট স্বয়ং হুমায়ুন নিজামের মাথায় পরিয়েছেন। প্রধান নকিব ঘোষণা করলো : আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল আল মুকাররাম জামিই সুলতানই হাকিকি ওয়া মাজিজি ভিসতি নিজাম পাদশাহ।
সন্ধ্যেবেলায় নতুন সম্রাটের সময় শেষ হলো। তিনি প্রচুর ধনরত্ন নিজে গ্রামের দিকে রওয়ানা হলেন। সঙ্গে দু’টি গাধার পিঠে ধনরত্ন, ১০ জন রক্ষী। পথে ডাকাত পড়লো, সব লুটে নিলো। নিজামের লাশ পড়ে রইলো। ডাকাতের ছদ্মবেশে আসলে ওরা ছিলো সম্রাটের ভাই মির্জা কামরানের লোকেরা। কামরান এই ঘটনা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। (সূত্র : হুমায়ূন আহমেদ, বাদশাহ নামদার ও অন্যান্য)
হাঙ্গা তুই মোরগাঁ যা
গৌড়ের সুলতান সাইফুদ্দীন আবুল মুজাফ্ফর ফিরোজ শাহ (১৪৮৭-১৪৯০) একটি যুদ্ধ জয়ের স্মৃতি রক্ষার্থে ফিরোজ মিনার তৈরির কাজ শুরু করেছেন। রাজধানী গৌড়ে এই মিনার নির্মাণ শেষ হলে ফিরোজ শাহ তা পরিদর্শনে গেলেন। প্রধান রাজমিস্ত্রি নিজের গৌরব প্রকাশ করতে গিয়ে বললো, ‘আমি এর চেয়ে উঁচু মিনার তৈরি করতে পারতাম।’ সুলতান বললেন, ‘করনি কেন?’ রাজমিস্ত্রি বললো, ‘উপযুক্ত মালমসলা পাইনি।’ সুলতান বললেন, ‘চাওনি কেন?’ রাজমিস্ত্রি কোন উত্তর দিতে পারলো না। সুলতান তাকে মিনারের ওপর থেকে ফেলে দেয়ার আদেশ দিয়ে ক্রোধভরে নিচে নেমে এলেন। আদেশ প্রতিপালিত হলো, হতভাগ্য রাজমিস্ত্রি মারা গেলো।
সুলতান তখনই তার এক পাইককে দেখতে পেয়ে হুকুম করলেন, ‘হিঙ্গা তুই মোরগাঁ যা।’ হিঙ্গা সুলতানের উগ্রমূর্তি দেখে জিজ্ঞাসা করার সাহস পেলো না যে সে মোরগাঁ গিয়ে করবে। মোরগাঁ অদূরবর্তী একটি গ্রামের নাম। সে মোরগাঁয় গিয়ে ভাবতে লাগলো যে সে কী জন্য এখানে এলো। তার চিন্তাযুক্ত চেহারা ও ইতস্তত ঘোরাফেরা দেখে সনাতন নামে এক ব্রাহ্মণ যুবক তাকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলো। হিঙ্গা তাকে পুরো ঘটনা জানালো। সনাতন বৃত্তান্ত শুনে মনে মনে এই সিদ্ধান্তে এলো যে, মোরগাঁয় ভালো রাজমিস্ত্রি পাওয়া যায়। সুলতান নিশ্চয় হিঙ্গাকে রাজমিস্ত্রি সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছেন। সনাতনের পরামর্শ মোতাবেক হিঙ্গা রাজমিস্ত্রি নিয়ে ফিরতি পথ ধরলো।
এদিকে সুলতান ফিরোজ শাহও একটু ধাতস্থ হয়ে ভাবলেন, হিঙ্গাকে তো মোরগাঁ পাঠানো হলো। কিন্তু কী জন্য পাঠালাম তা তো বলা হয়নি। যা হোক, ইত্যবসরে হিঙ্গা রাজমিস্ত্রি নিয়ে সুলতানের নিকট উপস্থিত হয়েছে। সুলতান হিঙ্গাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কিরূপে আমার মনোভাব জানতে পারলে? হিঙ্গা যুবক সনাতনের পরামর্শের কথা জানালো। সুলতান সনাতনের বুদ্ধির প্রশংসা করলেন এবং তাকে যথোপযুক্তভাবে সম্মানিত করলেন। অন্যদিকে ফিরোজ মিনারের অবশিষ্ট কাজ নতুন মিস্ত্রি দিয়ে সম্পন্ন করা হলো। আজও এটি প্রবাদ হয়ে আছে যে, কেউ অনির্দিষ্টভাবে কাউকে কিছু বললে বলা হয়, ‘ও, হিঙ্গা তুই মোরগাঁ যা?’ (সূত্র : রজনীকান্ত চক্রবর্তী, গৌড়ের ইতিহাস, দ্বিতীয় খণ্ড)
সুলতান গিয়াসউদ্দীনের ন্যায়বিচার
বাংলার শাসক সুলতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (১৩৮৯-১৩৯৬) একদিন শিকারে গেলেন। এ সময় তাঁর নিক্ষিপ্ত একটি তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এক বিধবার পুত্রকে আহত করে। বিধবা কাজীর নিকট বিচারপ্রার্থী হন। কাজী সিরাজউদ্দীন সম্রাটের বিরুদ্ধে সমন জারি করতে প্রথমে দ্বিধা করলেও পরে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তাঁর কর্তব্য করলেন। বিচারালয়ের পেয়াদা সমননামা সুলতান গিয়াসউদ্দীনের নিকট পৌঁছাতে ভয় পেলো। ফলে সে কৌশল অবলম্বন করে রাজদরবারের কাছে আজান দেয়া শুরু করলো। অসময়ে আজান দেয়ার জন্য সুলতানের নির্দেশে পেয়াদাকে ধরে দরবারে নিয়ে যাওয়া হলে সে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যক্ত করলো। সুলতান একটা ছোট্ট তরবারি জামার তলায় গোপন করে যথারীতি আদালতে উপস্থিত হলেন। কাজী সুলতানকে আলাদা কোন সম্মান না জানিয়ে আদালতে তাঁর আসনে স্থির বসে রইলেন। বিচারে সুলতান দোষী প্রমাণিত হলেন। রায়ে বিধবাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ মোটা অংকের অর্থ প্রদানের আদেশ দেয়া হলো। সুলতান তক্ষুণি তা পরিশোধ করে দিলেন।
এইবার কাজী সিরাজউদ্দীন আদালতের আসন ছেড়ে নিচে এসে সুলতানকে যথোচিত সম্মান দেখালেন। সুলতান বললেন, ‘ভাগ্য যে আপনি সুবিচার করেছেন। নচেৎ আমি এই তরবারি দিয়ে আপনার মাথা কেটে ফেলতাম।’ কাজী সিরাজও আদালতের মঞ্চের তলায় রাখা বেত বের করে বললেন, ‘আপনি যদি আদালতে আমার অবাধ্য হতেন তাহলে আমি এই বেত দিয়ে আপনার পিঠের চামড়া তুলে ফেলতাম।’ সুলতান এই দৃশ্যে খুবই পুলকিত হলেন এবং তাঁর রাজ্যে এমন ন্যায়বিচারক আছে জেনে কাজীকে যথোপযুক্ত পুরস্কারে ভূষিত করলেন। (সূত্র : দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড)
প্রসূতিকে উল্টো করে ঝোলানো
গৌড়ের শাসক রাজা লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৬) মাতৃগর্ভে থাকাকালেই তাঁর পিতার মৃত্যু হয়। তাঁর জন্মের সময় উপস্থিত হলে রাজ জ্যোতিষীরা গণনা করে বললো, এই শিশুর যদি এখনই জন্ম হয় তাহলে সে কখনোই রাজা হতে পারবে না। তবে দুই ঘণ্টা পরে জন্ম হলে সে ৮০ বছর রাজত্ব করবে।’ এই ভবিষ্যদ্বাণী শুনে রাজমাতা আদেশ দিলেন তার দুই পা উপরে করে মাথা নিচে ঝুলিয়ে রাখতে। সেই আদেশ প্রতিপালিত হলো। শুভমুহূর্ত উপস্থিত হলে তাকে নামিয়ে দেয়া হলো। শিশুর জন্ম হলো বটে কিন্তু রাজমাতা মারা গেলেন। এই শিশুই রাজা লক্ষণ সেন। তিনি ২৮ বছর রাজত্ব করেছিলেন। তবে ইখতিয়ার উদ্দীন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে এই লক্ষণ সেনের প্রাসাদ দখল করে নেন। আর লক্ষণ সেন নগ্নপদে পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন। (সূত্র : শ্রী রমেশ চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, প্রথম খণ্ড)
মীর কাসিমের ভক্ত
বাংলার নবাব মীর কাসিম (১৭৬০-১৭৬৪) যুদ্ধে পরাজিত হলেন। মীর কাসিমের ওপর লুটেরা বাহিনী লুটপাট শুরু করলো। এই লুণ্ঠনের কাজে কাসিমের অনুগত ভৃতরাও বাদ পড়লো না। তবে একজন ব্যতিক্রম- তার নাম ইতিহাসে অমর হয়ে আছে- সেখ মহম্মদ অসুর। তিনি কিছু ধনরত্ন নিয়ে গোপন পথে রোহিলাখণ্ডে পলায়ন করে মীর কাসিমের পরিবারের অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা করলেন। আর অপেক্ষা করতে লাগলেন মীর কাসিমের মুক্তির। কিছুদিন পর শত্রু শিবির থেকে মুক্তি পেয়ে বহুকষ্টে রোহিলাখণ্ডে উপস্থিত হতে সক্ষম হলেন। কিন্তু জীবন রক্ষা হলেও জীবন ধারণের সুব্যবস্থা হলো না। প্রভুভক্ত সেখ মহম্মদ অসুরের যত্নে অল্পদিন কয়েকদিন কাটানোর পর একেবারে সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়লেন মীর কাসিম। অতঃপর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন দিল্লির উপকণ্ঠে একটি জীর্ণ কুটির প্রাঙ্গণে এক অজ্ঞাত পুরুষের মৃতদেহ ধূলিলুণ্ঠিত হচ্ছিলো। তা সমাধিস্থ করার সম্বল ছিলো না। নাগরিকগণ কুটিরের মধ্য থেকে একখানা জীর্ণ শাল পেয়ে তাই বিক্রি করে মৃতের দাফনের ব্যবস্থা করা হলো। কবরে লাশ নামানোর সময় কেউ একজন অকস্মাৎ কেঁদে উঠে প্রকাশ করলো যে এই সেই মীর কাসিম! (সূত্র : অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, মীর কাসিম)
কালাপাহাড়ের বিবাহ
বলিষ্ঠ, সুদর্শন এবং উজ্জ্বল গৌরবর্ণ যুবক। কালাপাহাড় নামে পরিচিত। বরেন্দ্র অঞ্চলের নওগাঁর নিয়ামতপুরের বীর জোয়ান গ্রামের সন্তান। পিতা নয়ান চাঁদ রায় গৌড়েশ্বরের ফৌজদারি বিভাগে কাজ করতেন এবং তাঁর উপাধি ছিল ‘ভূঁইয়া’। একটাকিয়া ভাদুড়ী বংশের রীতি অনুসারে সংস্কৃত, বাঙলা প্রভৃতি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করে অশ্বচালনা ও অস্ত্রব্যবহার প্রভৃতি বীরোচিত গুণেও প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিলেন কালাপাহাড়।
কালাপাহাড় তাঁর সদগুণের কারণে শিগগিরই গৌড়ের সুলতান সুলেমান কররানির (১৫৬৫-১৫৭২) দরবারে উচ্চপদে চাকরি পেলেন এবং গৌড়ে প্রাসাদের অতি নিকটে উচ্চ হিন্দু আমলাদের গৃহে বাস করতে লাগলেন। কালাপাহাড় রোজ অতি প্রত্যূষে মহানন্দায় স্নান করতে যেতেন। নবাব-কুমারী দুলারী বিবি তখন সপ্তদশ বর্ষীয়া পরমা সুন্দরী। তিনি প্রত্যহ প্রাতে এই রূপবান যুবককে স্নানান্তে বাড়ি ফিরে যেতে দেখতেন। একদিন তিনি সহচরীদেরকে বললেন, ‘এই যুবক ছাড়া আমি অন্য কাউকেও বিবাহ করব না।’ অজ্ঞাতকুলশীল ব্যক্তির প্রতি এমন অনুরাগ অনুচিত- সহচরীরা এই কথা বললে রাজকুমারী উত্তরে বললেন ‘তার গলায় পৈতা-উনি ব্রাহ্মণ, তার পশ্চাতে ছাতা-র্বদার এবং হাতে সোনার কোষা সুতরাং ইনি ধনী, ইনি সুকণ্ঠে স্তোত্র আবৃত্তি করতে করতে যান সুতরাং মূর্খ নন। তারপর তার মনভুলানো রূপ, তার সাক্ষী আমার দুটি চক্ষু, আর পরিচয় নিষ্প্রয়োজন।’
সুলতান ও বেগম উভয়েই রাজকুমারীর মনোভাব জানলেন। অনুসন্ধানে জানলেন, ইনি একটাকিয়ার ভাদুড়ী বংশজাত। এই বংশের অনেক যুবকের সঙ্গেই পাঠান সুলতানরা কন্যার বিবাহ দিয়েছেন। সুতরাং তাঁদের আপত্তির কোন কারণ রইলো না। সুলতান কালাপাহাড়কে ডেকে মুসলমান ধর্ম্ম গ্রহণপূর্বক কুমারীকে বিবাহ করার প্রস্তাব করলেন। কালাপাহাড় তেজের সঙ্গে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। ক্রুদ্ধ সুলতান কালাপাহাড়কে শূলে দেয়ার আদেশ করলেন। যখন সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন, তখন অকস্মাৎ ভূতলে পতিত একটি বিদ্যুতের ন্যায় দুলারী বিবি রাজপ্রাসাদ থেকে অবতরণ করে ঘাতককে আদেশ করলেন, “আগে আমাকে হত্যা করো, তারপরে এর অঙ্গ স্পর্শ কর।” রাজকুমারীর অসামান্য রূপ এবং অপূর্ব্ব অনুরাগ দেখে কালাপাহাড়ের গোঁড়ামি ভেঙে গেলো, ফুলশরের আঘাতে ধর্ম্মবেদী বিদীর্ণ হলো। কালাপাহাড় বিবাহে সম্মত হলেন, কিন্তু তিনি হিন্দু ধর্ম্ম ত্যাগ করলেন না। তবে মুসলিম নারী বিবাহের কারণে তিনি বহু অনুনয় বিনয় এবং অজস্র অর্থ ব্যয় করেও সামাজিক অত্যাচার ও নিগ্রহ থেকে নিস্তার পেলেন না। তিনি ঊড়িষ্যার বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দিরে গিয়ে এ অবস্থায় কি কর্তব্য, প্রত্যাদেশের জন্য সাত দিন অনাহারে ধরনা দিয়ে থাকলেন। কিন্তু কোন আদেশ তো পেলেনই না, উপরন্তু মন্দিরের পাণ্ডারা অত্যন্ত অপমান করে তাঁকে শ্রীমন্দির থেকে তাড়িয়ে দিলো। এর পরে প্রতিশোধের পালা। মুসলমান ধর্ম্মগ্রহণ করে সুলতানের সৈন্যের সাহায্যে তিনি ‘হিন্দুধর্ম্ম জগৎ থেকে একেবারে বিলোপ করবেন’- এই সঙ্কল্প করে বসলেন। ইসলাম ধর্ম্মাবলম্বী হওয়ার পর তাঁর নাম হলো ‘মহম্মদ ফর্ম্মুলি’। কিন্তু তাঁর ‘কালাপাহাড়’ নামই দেশবিখ্যাত। এই নাম অবশ্য হিন্দুরা দিয়েছিলেন। তার নাম কালাচাঁদ রায় হতেই সম্ভবত এই নামের উদ্ভব। কালাপাহাড় জয় করলেন ঊড়িষ্যা-কামরূপসহ বহু অজেয় নগর-জনপদ। (সূত্র : দীনেশচন্দ্র সেন, বৃহৎ বঙ্গ অবলম্বনে সরদার আবদুর রহমান, ঊড়িষ্যা-কামরূপ বিজয়ী বাঙালি বীর কালাপাহাড়)
মুর্শিদকুলির কন্যার কলিজা ভক্ষণ
বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খানের (১৭১৬-১৭২৭) কন্যা ছিলেন আজিমুননেসা বেগম। জনশ্রুতি রয়েছে, কঠিন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় নবাবি হেকিম দৈনিক একটি মানবশিশুর কলিজা দিয়ে ওষুধ তৈরি করে দিতেন। অসুখ সেরে গেলেও তিনি মানবশিশুর কলিজায় নেশাগ্রস্ত হয়ে নিয়মিতভাবে গোপনে শিশুদের কলিজা খেতে থাকেন। এই ঘটনা নবাব মুর্শিদকুলি খান জানতে পেরে তাকে জীবন্ত কবর দেয়ার নির্দেশ দেন। মুর্শিদাবাদের মহিমাপুর এলাকায় একতলা পাকা মঞ্চের ওপর মসজিদে উঠার সিঁড়ির নিচে আজিমুননেসার সমাধি। কথিত আছে, সাধারণ মানুষের পদধূলিতে তার শিশু হত্যার পাপ মোচন হবে- এই আশায় মসজিদের সিঁড়ির নিচে তাঁকে দাফন করা হয়। বর্তমানে অবশ্য মসজিদ বিলুপ্ত হওয়ার পথে। তবে সমাধি ও মঞ্চ বিদ্যমান। সরকারিভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে এটি সংরক্ষণ করা হয়। তবে শিশুর কলিজা খাওয়ার বিষয়টি নেহায়েতই জনশ্রুতি- এর ঐতিহাসিক ভিত্তি অনুসন্ধান করা হয়নি। (সূত্র : লেখকের শোনা স্থানীয় জনশ্রুতি ও ওয়েবসাইট)
বল্লাল সেনে স্ত্রীর আত্মাহুতি
বল্লাল সেনের (১১৫৮-১১৭৯) সেনাবাহিনী অনেক বড়। এরপরেও তিনি প্রাসাদে বলে রেখেছিলেন যদি আমি মারা যাই তোমরা প্রাসাদের সব মহিলা আত্মাহুতি দেবে। রানীরা জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে আমরা বুঝবো তুমি মারা গেছো? তিনি জানালেন, তার জামার ভেতরে একটা কবুতর লুকানো থাকবে। মারা গেল সেই কবুতর ছাড়া পেয়ে উড়ে আসবে আর তার পরে সব মহিলা আত্মহত্যা করবে।
যুদ্ধে মুসলমানরা হেরে গেল। শেষে মুসলিম সেনাপতি বাবা আদম যুদ্ধক্ষেত্রেও নামাজ পড়ছিলেন। কিন্তু বল্লাল সেনের তীরন্দাজরা তার চুল পরিমাণ ক্ষতি করতে পারলো না। বাবা আদম নামাজ শেষে বল্লাল সেনের মুখোমুখি লড়াই হলো। বাবা আদম বললেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছে আমি তোমার হাতে মারা যাবো। চালাও তলোয়ার। বল্লাল সেন তরবারি চালালেন কিন্তু তাঁকে একটুও আহত করতে পারলো না। বাবা আদম বললেন, আল্লাহ চান না কাফিরের তলোয়ারে আমার মৃত্যু হোক। তুমি আমার তলোয়ার নাও। বল্লাল সেন এবারে বাবা আদমের তলোয়ার নিয়ে তাকে আঘাত করলেন এবং বাবা আদম শহীদ হলেন। বাবা আদমকে হত্যার পর গায়ে লেগে থাকা রক্ত ধৌত করতে বল্লাল সেন নদীর পানিতে ঝুঁকে পড়েন। ঠিক এই সময় জামার নিচে রাখা কবুতরটা পালিয়ে যায়।
বল্লাল সেন বিপদ বুঝতে পেরে দ্রুত প্রাসাদে ফেরেন। কিন্তু ততোক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। কবুতরটিকে ফিরতে দেখে প্রাসাদের রাণীসহ মহিলারা সবাই বিশাল অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে তাতে আত্মাহুতি দেন। শোকে দুঃখে কাতর বল্লাল সেন নিজেও আত্মহত্যা করেন। (সূত্র : মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওয়বসাইট)
গরুর বদলে শিশু হত্যা!
রাজা বল্লাল সেন প্রচণ্ডরকম ধর্মান্ধ ছিলেন। তার রাজ্যে একজন মুসলিম প্রজা ছিলেন। তার কোন সন্তান হয় না। একদিন এক ফকির তার বাসায় ভিক্ষা চাইতে এসে বলে, বাবা আমাকে ভিক্ষা দাও। আল্লাহ তোমার মনের আশা পূর্ণ করবে। সেই গৃহস্থ রাগ করে বলে, ‘তোমাকে ভিক্ষা দিবো না। তুমি ভণ্ড ফকির। আমার কোন পুত্র সন্তান হয় না।’
ফকির বলল, আমি দোয়া করলাম তোমার পুত্র সন্তান হবে। কিন্তু সন্তান হলে তুমি অবশ্যই আল্লাহর নামে একটা গরু কোরবানি দিবে। তার এক পুত্রসন্তান হলো। বল্লাল সেনের রাজ্যে গরু হত্যা ও গোশত খাওয়া বড় অপরাধ। কাছেই ছিল জঙ্গল। গৃহস্থ জঙ্গলে লুকিয়ে গরু জবাই করে হাড়গোড় মাটি চাপা দিলো। কিন্তু একটি কাক মাংসের একটি টুকরা নিয়ে যাওয়ার সময় বল্লাল সেনের প্রাসাদে ফেললো।
বল্লাল সেন ক্রুদ্ধ হয়ে ঘটনার অনুসন্ধান করে সেই মুসলমান প্রজাকে ধরা হলো। বল্লাল সেন আদেশ করলেন গরুর বদলে তার সদ্যোজাত পুত্রকে হত্যা করার। পুত্রকে বাঁচাতে গৃহস্থ পালিয়ে গেলেন। পালাতে গিয়ে পৌঁছে গেলেন পবিত্র মক্কা শরীফে। মক্কা শরীফে বাবা আদম নামে একজন নেতৃস্থানীয় ধার্মিক ব্যক্তির সাক্ষাৎ পেয়ে ঘটনা খুলে বললেন। তিনি কয়েক হাজার মুরিদ নিয়ে বিক্রমপুর এলেন এবং এখানে তাঁরা উচ্চস্বরে আজান দিয়ে নামায পড়া শুরু করলেন। এ জন্য একটা মসজিদও নির্মাণ করা হলো। এই অঞ্চলের প্রথম মসজিদ। নাম বাবা আদমের মসজিদ। বল্লাল সেন তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন।
(সূত্র : মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের ওয়বসাইট)