‘ইজম’ শব্দটি সাহিত্য ও শিল্প ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ। এর অর্থ বাদ বা ধারণা বা আঙ্গিক বা দৃষ্টিকোণ প্রভৃতি। শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক এক সময় এক এক প্রকার ইজম নিয়ে কাজ করেছেন শিল্পী ও সাহিত্যিকগণ। সময়ের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধরনের ইজমের প্রয়োজন হয়েছে। নতুনত্বের স্বাদ আস্বাদন, ব্যতিক্রম চিন্তন, স্বাতন্ত্র্য বোধ প্রভৃতি বিষয় বিকশিত করার জন্য শিল্পী ও সাহিত্যিকগণ বিভিন্ন ইজমের আশ্রয় নিয়েছেন। কোনো ইজমই শাশ্বত বা ধ্রুব নয়। কালের প্রেক্ষাপটে এর বিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। বিভিন্ন প্রকার ইজমের ভেতর রয়েছে রোমান্টিসিজম, ক্লাসিসিজম, রিয়েলিজম, আইডিয়ালিজম, মিস্টিসিজম, ইম্প্রেসনিজম, ফবিজম, কিউবিজম, ফিউচারিজম, সিনথিসিজম, এক্সপ্রেশনিজম, ডাডাইজম, পিউরিজম, সুরিয়ালিজম, এক্সজিসটেনসিয়ালিজম, অ্যাবস্ট্রাক্ট এক্সপ্রেসনিজম প্রভৃতি।
১৯২৪ সালের দিকে প্রথম সুরিয়ালিজমের উন্মেষ হয় ফ্রান্সে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মর্মান্তিক ঘটনা সাধারণ মানুষেরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিল না। দীর্ঘদিন পৃথিবীর আকাশ-বাতাস শান্ত থাকার পর অকস্মাৎ এত দীর্ঘ ও সার্বিক যুদ্ধ মেনে নেয়া খুব কঠিন। অনেকেই পাগল হয়ে গিয়েছিল যুদ্ধের নৃশংসতার কথা মনে করে। শিল্পী-সাহিত্যিকদের ভেতরও বেশ পাগলামি প্রকাশ পেল। জুরিখের ‘ক্যাবারে ভলতেয়ার’ নামে এক রেস্তোরাঁয় এক উদ্ভ্রান্ত রুমানিয়ান তরুণ ‘ত্রিস্তান জারা’ বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে শুরু করলেন এক সাহিত্য আন্দোলন। প্রচুর হই-হুল্লোড় ও বিশৃঙ্খলার ভেতর থেকে শুরু করলেন তাদের যাত্রা। সাহিত্য আন্দোলনের নাম দিলেন ‘ডাডা ইজম’। যার অর্থ খেয়াল খুশি মতো যা ইচ্ছা করা। অর্থাৎ এই আন্দোলনের কোন উদ্দেশ্য থাকবে না, কোনো কল্যাণ সাধন নয়, মানবতার জয়গান করাও নয়, কেবলই বিপন্নতা, সম্পূর্ণ নৈরাজ্য। এই আন্দোলনের মূল বক্তব্য হলো ‘সব রকম নিয়মের অভাবও একটা নিয়ম এবং সেটাই শ্রেষ্ঠ নিয়ম।’ অনেকেই বিষয়টা সাগ্রহে গ্রহণ করেছিল। কিছু বন্ধু-বান্ধব জোগাড় করলেন এই তরুণ ত্রিস্তান জারা। তাদের সহযোগিতায় সাহিত্য আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে চাইলেন। জার্মানি, ফ্রান্স, আমেরিকার তরুণ কবি লেখকদের কাছে প্রচুর দীর্ঘ চিঠি লিখতে শুরু করলেন তার আন্দোলনে যোগদান করার জন্য। তার এই আন্দোলন সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য জুরিখ শহরকে ছোট শহর মনে হওয়ায় সদল বলে চলে এলেন সভ্যতার মুকুট মনি প্যারিসে। প্যারিসে তখন কবিদের ভেতর নানা বিষয় নিয়ে মতদ্বৈধতা চলছিল। এমন সময় এই আন্দোলনের সাথে অনেকেই একাত্মতা ঘোষণা করলেন এবং আন্দোলন আরও বেগবান হলো। খবরের কাগজের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য নানা রকমের উদ্ভট কাজ এরা করতে লাগল। রাস্তাঘাটে গোলমাল করা, থিয়েটারে যেয়ে চেঁচামেচি করা, জনাকীর্ণ রাস্তায় পথের ওপর বসে পড়ে কবিতা লেখা প্রভৃতি। কিন্তু যত পাগলামিই করা হোক না কেন, সাহিত্যের ক্ষেত্রে মূল সাহিত্যিক বিষয় ছাড়া অন্য উপসর্গ বেশি দিন টিকতে পারে না। ডাডাইজম ক্রমশ এক ঘেয়ামি হয়ে গেল। লোকজন এই নৈরাজ্য বেশি দিন পছন্দ করতে পারলেন না। দল ভেঙে গেল। আঁদ্রে ব্রেতো তার দল বল নিয়ে প্রকাশ করলেন সুরিয়ালিজম এর ইস্তাহার। যা এ শতাব্দীতে এ পর্যন্ত সবচেয়ে মূল্যবান শিল্পদর্শন।
সুরিয়ালিজম শব্দটি আঁদ্রে ব্রেতো পেয়েছিলেন অ্যাপোলিনেয়ারের রচনায়। যদিও এর বীজ ছিল আরও আগে র্যাবোর লেখায়। পৃথিবীর সেই চরম বিস্ময়কর কবি-দুর্দান্ত বখাটে বালক-র্যাবো আজ সুরিয়ালিজমের প্রধান পুরুষ, সিমবলিস্টদের প্রধান হিসেবে খ্যাত, এমনকি একজিসটেনসিয়ালিজমের প্রবক্তা হিসেবেও গণ্য। সুরিয়ালিজমের মূল বক্তব্য হলো, কবি শুধু যা দেখবেন তাই নিয়ে কবিতা লিখবেন, এমনটা নয়। একজন কবি হবেন একজন দ্রষ্টা, সে শুধু ভবিষ্যৎ দেখবেন না, শুধু অতীত দেখবেন না, দেখবেন নিজের আত্মার অবয়ব, অন্তঃকরণ, ছায়া, মগ্ন চৈতন্য আর হৃদয় খুঁড়ে জাগাবেন থোকা থোকা বেদনা, স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন, অখন্ড ভাগ্য লিখনের মতো আপাত যুক্তিহীনতা। অনেক সময় তারা মাদক সেবন করে অবচেতন থেকে তথ্য উদ্ধার করে লিখেছেন উৎকৃষ্ট কবিতা। মাদক সেবন ছাড়া স্বর্গ ও পৃথিবীকে মিলিয়ে দেখবার অন্য কোন অবকাশ তাদের ছিল না। এমন সময় ফ্রয়েডের ‘অবচেতন’ ধারণা বিশ্বব্যাপী সাড়া জাগিয়েছিল। মনের এই সব ধারণাকে সুরিয়ালিজম এর ভেতর গ্রথিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে দেখা যায়, জাঁ পল সাত্র এই ইজমের ওপর বেশ বড় ধরনের আঘাত হানেন তার একসিজটেনসিয়ালিজম বা অস্তিত্ববাদ তত্ত্বের দ্বারা। কিন্তু যেভাবেই হোক সুরিয়ালিজমকে আজও কেউ অস্বীকার করতে পারেনি।
সুরিয়ালিজম কবিতাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে গদ্যের মর্মান্তিক প্রভাব থেকে। গত শতাব্দী থেকে উপন্যাস, ছোটগল্প, ইত্যাদির প্রবল প্রচার শুরু হয়। এ সকল গদ্যে যুক্তি ও বাস্তবতাবোধ সামঞ্জস্যভাবে উপস্থাপিত হয়। সেখানে কল্পনার অগাধ বিস্তারের কণ্ঠ রুদ্ধ। কিন্তু কবিতা কোন বিশেষ শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে পারে না। কবিতার মুক্তি অলৌকিকে, রহস্যে, স্বপ্নের মতো আপাত যুক্তিহীনতায়। সুরিয়ালিজম এমন এক রহস্য ঘেরা স্বপ্ন ও আলো ছায়ার দিক উন্মোচন করল, যার ফলে অনেকেই ধর্ম-দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে উঠল। কেননা যুক্তিহীনতার ভেতরই রয়েছে হয়ত আরও বড় ধরনের যুক্তি। আমাদের অস্তিত্বহীন অস্তিত্বই হয়ত সে কথা মনে করিয়ে দেয়। এই ইজম শুধু কবিতায় নয়, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ল চিত্রশিল্পে, ফিল্মে, নাটকে আর অন্যসব শিল্প মাধ্যমেও।
শরীরে এক বিন্দু ফরাসি রক্ত না থেকেও যিনি ফরাসি কবিতায় শ্রেষ্ঠ আসন পেয়েছেন, কবি গিয়ম আপোলিনেয়ার, যিনি হই-হুল্লোড় পছন্দ করতেন, মেয়েদের ব্যাপারে ছিলেন স্বপ্নচারী, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে মাথায় গোলার আঘাত নিয়ে ফেরেন এবং যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগের দিন মৃত্যু বরণ করেন। তিনি লিখেছেন,
হায়রে আমার পরিত্যক্ত যৌবন
শুকনো ফুলের মালা
এখন অন্য ঋতুর আসার পালা
সন্দেহ আর জ্বালা
সুরিয়ালিজম ধারার একজন প্রধান কবি আন্টোনিন আর্তো তার কবিতায় ঈশ্বর অর্থে কোন দেবতাকে, জিব আর ছুরি পুরুষদের প্রতীক অর্থে, আর ত্রিশুলকে সংসার, শরীর ও আত্মা অর্থে ব্যবহার করছেন। এখানে তিনি দুঃস্বপ্নচারী পৃথিবীর ধ্বংসস্তুপের ভেতর বসে দেখেছেন স্থূল অকিঞ্চিৎকর বাস্তবের জেগে ওঠা। তিনি লিখেছেন,
আমার সঙ্গে আছেন ঈশ্বর আর তার
ত্রিশূলের মতো জিব বিদ্ধ করে আছে
যা তাকে সব সময় উত্ত্যক্ত করেছে
পৃথিবীর দুই ভাঁজ গম্বুজের আস্তর
শতাব্দীর গভীরতম কবি পল ভালেরি তার কবিতায় ঘুমন্ত নারীকে প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করেছেন। ঘুমন্ত নারী অজান্তেই এক হাত দিয়ে ঢেকে রেখেছেন ঊরু সংযোগ স্থল। কবি আত্মা সেই দৃশ্য দেখে বিমোহিত এবং গোপন কাম বাসনায় ব্যগ্রচিত্ত। সেখানে শরীর ও আত্মা, সুন্দর ও রমণীয়, রক্ত মাংসের উন্মুখতা ও সাবলীল গোপন ইচ্ছা প্রভৃতি মিলে মিশে স্বপ্ন ও বাস্তবকে এক মোহনায় এসে দাঁড় করিয়েছে। কবিতার সার্থকতা এমন নিপুণ শিল্প কর্মে ঋদ্ধ। কবি লিখেছেন,
কি গোপন তার হৃদয়ে পোড়ায় আমার তরুণী সখা
ফুলের গন্ধ নেয় কি আত্মা মধুর মুখোশ পরে?
কোন শিল্প নিষ্ফল পুষ্টিতে তার অশিল্প উষ্ণতা
ঘুমন্ত এই রমণীর দ্যুতি আপনি সৃষ্টি করে?
কবিতার অঙ্গনে অত্যন্ত বড় মাপের, ক্ষমতাবান, বিশুদ্ধ কবিতার বাহক, একনিষ্ঠ ধার্মিক কবি পল ক্লোদেল তার কবিতায় ধর্ম বিশ্বাসকে একান্তে ঠাঁই দিয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেশ-বিদেশে চাকরি করেছেন। চীনে যেয়ে ব্যর্থ হয়েছেন প্রেমে, যা তাকে স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নের ভেতর জাগরিত করেছে বারবার। জীবন যন্ত্রণা সয়েছেন মৃত্যুকে ভালোবেসে। তিনি লিখেছেন,
এবং আবার আমি ফিরে এলাম উদাসীন তরল সমুদ্রে
আমার মৃত্যুর পর আমাকে আর যন্ত্রণা সইতে হবে না
পিতা ও মাতার মধ্যে কবরে যখন শুয়ে থাকবো
আমাকে আর যন্ত্রণা সইতে হবে না
এই অতিরিক্ত ভালোবাসাময় হৃদয় আর বিদ্ধ হবে না বিদ্রুুপে
বেশির ভাগ সময় ফ্রান্সের বাইরে থেকেও সুরিয়ালিস্ট ধারার অন্যতম ও ফ্রান্সের জনপ্রিয় কবি সাঁ-ঝঁ প্যার্স। স্বেচ্ছা নির্বাসনে থেকেও শেষ পর্যন্ত পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। তার কবিতাগুলি দুর্বোধ্যময়। মূলত তার কবিতা একটি দীর্ঘ চরণমাত্র। হঠাৎ শুরু ও হঠাৎ শেষের নাটকীয়তা তার কবিতায় উজ্জ্বল। ইউরোপের ভাঙা-গড়া, নিজের জীবনের যন্ত্রণা, নির্বাসন, ধর্মীয় উৎসব সব মিলিয়ে তাকে অশান্ত করে তুলেছে কবিতাঙ্গনে। কবিতার আকাশে এক মহাপুরুষ হিসেবে তিনি উজ্জ্বল, ভাস্কর হয়ে আছেন অদ্যাবধি। তিনি লিখেছেন,
….বর্ষণের বটবৃক্ষ নগরে ছড়ায় তার বিচারের সভা
স্বর্গের হাওয়ার প্রতি এই সেই ভ্রাম্যমাণ আদালত
আমাদের মধ্যে বসবাসে আগমন!
তুমি অস্বীকার করো না;
যারা অকস্মাৎ শূন্য হয়ে আসে আমাদের জন্য…
প্যারিসের সৌধ, স্তম্ভ, মিনার, শিল্প কীর্তি, যা কিছু আছে সব চেয়ে আকর্ষণীয় কীর্তি কবি জাঁ ককতো। তিনি শিল্প মাধ্যমের সব কটি শাখায় নিরন্তর পরীক্ষা চালিয়েছেন। ধনী ঘরে জন্মেছেন এবং প্রচন্ড বেপরোয়া জীবন কাটিয়েছেন, ভালবেসেছেন বিশ্ববিখ্যাত গায়িকা এদিথ পিয়াফকে। শেষ পর্যন্ত দু’জনে দু’জনার প্রতি গুণমুদ্ধ ছিলেন এবং মৃত্যু একই দিন প্রায় একই সময়ে। তার কবিতায় সুরিয়ালিজমের অবস্থান খুবই দৃঢ় এবং অনেকটা দুর্বোধ্য প্রকৃতির। দেবতা ও পরী তার প্রিয় শব্দ। জটিল অবস্থানের ভেতর থেকে তিনি সহজকে বুঝিয়েছেন ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্ন মাত্রায়। তিনি লিখেছেন,
নাবিক, এখন দারু দেবদূত, ডানার আঘাতে
আফ্রোদিতির অস্ট্রিচ পাখি, হীরকের হার
শান্ত সাগর থেকে নিয়ে আসে তোমার জন্য তটের প্রান্তে
বিশ্বাসী ঢেউ, মুক্তাখচিত টমটমে জোড়া ক্লান্ত অশ্ব
পশ্চিমের সাহিত্য থেকে যখন নারী নির্বাসিত হয়েছে প্রায়, যখন মালার্মে বা ভালেরি নারীকে নিয়ে কবিতা লেখা হাস্যকর মনে করতেন, তখন যে কবি নারীকে নারী ও বিশেষভাবে রহস্যময়ী হিসেবে পুনরায় সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তিনি কবি পল এলুয়ার। তিনি মনে করতেন নারীকে ভালোবাসার ভেতর থেকেই পৃথিবীর সব বস্তু ও অবস্তুকে ভালোবাসা যায় এবং তাই হয়ে থাকে। আমরা এক থেকে বহুর দিকে প্রসারিত হতে পারি। তিনি নারীর শরীরের সব কটি অঙ্গকেই নারীর কমনীয়তা, পেলবতা, মাধুর্য হিসেবে ভাবতে চেয়েছেন এবং নারীর শরীরের যাদু ও চুম্বকতাকে শিল্প সফল করে তুলতে চেয়েছেন। নারী তার কাছে দেবী ও ভালোবাসার সফলতম অস্ত্র। বাস্তব থেকে স্বপ্নের ভেতর কবি এভাবে প্রবেশ করেছেন। কবি লিখেছেন,
যে আছে দাঁড়িয়ে আমার চোখের পাতায়
তার চুল এসে মিশেছে আমার চুলে
আমার হাতের মতো অঙ্গের গড়ন হয়েছে তার
আমার চোখের মতো তার রং দেখেছি চক্ষু খুলে
তাকে আমি গ্রাস করেছি নিজের ছায়ায়
বিশাল আকাশে যেমন হেলানো পাহাড়
প্রেমিকাকে নিয়ে কবিতা লেখার প্রচেষ্টা বিশ্বজুড়ে সব সময় হয়েছে। কিন্তু নিজের স্ত্রীকে নিয়ে কবিতা লেখার পরিমাণ খুবই কম। যিনি নিজের স্ত্রীকে বিশ্বপ্রিয়ার ভেতর স্থান দিতে পেরেছেন, এমনকি গ্রন্থের নামও করেছেন তার নামে, তিনি কবি লুই আরাঁগ। গ্রন্থের নাম ‘এলসার চোখ’। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ফ্রান্সকে আর প্রিয়তমা বধূকে ফিরে পাননি। তবু পথের পাশের গুচ্ছ গুচ্ছ লিলি বুকের বেদনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণে। নিজের সত্তা থেকে তিনি বিশ্বের সর্বজনীন সত্তার দিকে এগিয়ে গেছেন নির্দ্বিধায়। তার কবিতার ভাষা নির্মাণ সহজ ও সাবলীল। তিনি কবিতাঙ্গনে খ্যাতির শীর্ষে আরোহণ করেছেন সব মানুষের ভেতর। তিনি লিখেছেন,
কুসুমের মাস রূপান্তরের মাস
মে মেঘহীন জুনের পৃষ্ঠে ছুরি
ভুলবো না আমি লিলির গুচ্ছ গোলাপের নিঃশ্বাস
বসন্তে আরও লুকানো যে মঞ্জরি
সুরিয়ালিস্ট ধারার কনিষ্ঠতম কবি রেনে শাঁর। দেশকে শত্রুর হাত থেকে বাঁচানোর জন্য প্রাণ উৎসর্গ করতেও প্রস্তুত ছিলেন। তিনি জাতীয় বীর হিসেবে স্বীকৃত এবং এ জন্য তার কবিতাও সুপ্রতিষ্ঠিত। তবে কবিতাকে তিনি সাধারণ একটি কর্ম হিসেবে মনে করেননি। তিনি মনে করতেন, কবিতা একান্ত আরাধনার বিষয়, সর্বোচ্চ মন্ত্রোচ্চারণ এবং এ জন্য তার কবিতাগুলিও অনেকটা দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছে। তিনি দুর্দান্ত বখাটে বালক র্যাবোকে সমর্থন করেছেন। র্যাবো লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছেন মাত্র উনিশে। তারপর দীর্ঘদিন তিনি জঙ্গলে বসবাস করেছেন। কবি বন্ধুদের সঙ্গ আর গ্রহণ করেননি।
র্যাবোকে নিয়েই তিনি লিখেছেন-
‘তুমি ছেড়ে গিয়ে ভালোই করেছো, আর্তুর র্যাঁবো
বন্ধু ও শত্রুদের প্রতি সমানভাবে তোমার আঠার বছরের অবহেলা
প্যারিসের কবিদের ন্যাকামির প্রতি
… … … … …
তুমি বেশ করেছো, ছেড়ে চলে গেছ অলসদের রাস্তা
লিরিক প্রস্রারাবকারীদের সরাইখানা-পশুর নরক স্থানের জন্য
প্রতারকদের ব্যবসা এবং সরল মানুষের অভ্যর্থনা
কবিরা খ্যাতি পাবার জন্য রাজধানীকেন্দ্রিক হবার চেষ্টা করে, এ কথা বলাই বাহুল্য। যে কবি সারা জীবন থেকে গেছে মফস্বলে- গ্রামাঞ্চলের শান্ত পরিবেশে, পাখিদের কলতানের ভেতর মিশে সৃষ্টি করেছেন নতুন সরল দোলা, সে কবি রেনে গি কাদু। প্রেমিকাকে নিয়ে লেখা কবিতাগুচ্ছই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে বিবেচিত। কবি শান্ত, সরল ও তুষারের মতো ধবল শীতল। তিনি লিখেছেন,
যে দৈবাৎ ঢুকে পড়ে কবির নিজস্ব ঘরে, সে জানে না
এ ঘরের প্রতিটি আসবাব তাকে জাদু করতে পারে
চেয়ার আলমারির কাঠে সব কটি গ্রন্থি ধরে রাখে
যত বিহঙ্গের গান অরণ্যের বুকে আছে, তারও বেশি
অসাধারণত্বের বেশ নয়, বরং আধুনিক কবিরা মিশে গেছেন সাধারণ মানুষের ভেতর। তাদের কবিতার ভাষা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা, তাই অধিকাংশ আধুনিক কবি সাধারণদের জয় করে নিচ্ছেন সহজেই। এমন একজন কবি পিলিপ জাকোতে। সাধারণ শব্দাবলি যার কবিতায় অসাধারণ আঙ্গিক কাঠামো। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখার মতো উপমা। বিশেষ থেকে নির্বিশেষের দিকে যার উত্থান। কবি মহান হয়ে উঠেছেন তার কবিতায়। তিনি লিখেছেন,
‘আমাদের এ জীবনে যেহেতু এসেছি আমি এক আগন্তুক
শুধুই তোমার সঙ্গে কথা বলি অজানা ভাষায়
কেননা তুমিই বুঝি হতে পারো একমাত্র আমার স্বদেশ
আমার বসন্ত, টুকরো খড়কুটোর বাসা, বৃষ্টিপাত বৃক্ষ শাখে
নিগ্রোদের নিয়ে শেতাঙ্গদের তাচ্ছিল্য ও হাসি ঠাট্টার অভাব ছিল না কখনোই । নিগ্রোদের এক পাশে সরিয়ে রাখার প্রচেষ্টা সর্বজন স্বীকৃত। নিগ্রো বলে বর্ণ-বিদ্বেষের শিকার হয়েও যে কবি কবিতাঙ্গনে রাজ পুরুষের বেশ ধারণ করেছেন, তিনি লেও পোল্ড সেঙ্ঘর। বন্ধুর প্রতি আন্তরিক ও প্রচন্ড শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। সেই বন্ধুটিও ছিল নিগ্রো। দু’জনই উচ্চশিক্ষিত বলা যায়। লেখাপড়া করেছেন প্যারিসে। সুরিয়ালিজম ধারায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। কেইসড্রাট বৃক্ষকে জীবনের উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। আর ভালোবেসেছেন বন্ধুত্বের কোমলতা। তিনি লিখেছেন:
হে বন্ধু, তোমাকে ফিরতে হবে
আমি তোমার প্রতীক্ষায় থাকবো
কেইসড্রাট গাছের নিচে, জলপোতের
অধিপতির কাছে আমি এই গোপন কথা বলেছি
অনেক প্রতিশ্রুতি নিয়ে তুমি ফিরে আসবে
সূর্য ডুবে গেলে ম্লান রাত্রি
যখন ভর করে বাড়ির ছাদে
খেলোয়াড়েরা যখন বরের বেশে যৌবন দেখায়
সেই কি তোমার ফিরে আসার শেষ চিহ্ন?
ফ্রান্সের এই সুরিয়ালিজম ধারার কবিরা কোমলভাবে স্বপ্ন ও সত্যের সুধারস পান করেছেন এবং নিমগ্ন থেকেছেন কবিতা নির্মাণে। ডাডাইজম ধারার পরবর্তী থেকে রিয়ালিজম ধারার পূর্ব পর্যন্ত সুরিয়ালিজম ধারার একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। এরপর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য অন্যান্য আরও বহু ইজম এলেও ঘুরে ফিরে বিশেষত কাব্যাঙ্গনে সুরিয়ালিজমের কোনো বিকল্প নেই। কবিতা মানুষকে তথা মানুষের আত্মাকে মুক্তি দিয়েছে বারবার। সেখানে শুধু যুক্তি তর্কের অবস্থান থাকতে পারে না। কল্পনার অবাধ প্রসারণও প্রযোজন, যা আপাতভাবে যুক্তহীন মনে হয়। আমাদের আত্মা, আমাদের বেঁচে থাকা, শূন্যের ওপর পৃথিবীর ঘূর্ণন সবই অলৌকিক। সুতরাং কবিতা গদ্যের মত সর্বদা সরল-প্রাঞ্জল-যুক্তগ্রাহ্য-সুবিন্যাস্ত আঙ্গিক কাঠামোয় পরিশীলিত হবে এমন কোন বিশেষ কারণ নেই। কবিতা আত্মার মতো মুক্ত, মনের দীর্ঘ অবয়ব আর হৃদয়ের মতো সতত প্রসারণশীল। কবিতা উন্মুক্ত পাখির ডানা-ঝাপটানির মতো সর্বদা স্বাধীন। মানুষ স্বপ্ন দেখবে, স্বপ্নকে বাস্তবে নির্মাণের জন্যই তার এত ব্যাকুল প্রচেষ্টা এবং পৃথিবী যে আবাসযোগ্য হয়ে উঠেছে, তাও এজন্যই। এই নির্মিতি, এই জাগরণ, এই স্বপ্নচারী মনকে কখনো স্তব্ধ করে দেয়া যায় না। তাইতো ১৯২৪ থেকে আজও সুরিয়ালিজমের কোনো বিকল্প চলে না। ফ্রান্সে এর সূত্রপাত এবং ক্রমান্বয়ে সমস্ত পৃথিবী। আধুনিক কবি মাত্রই কোন না কোন ভাবে সুরিয়ালিজম ধারার অন্তর্গত পথিক।
বাংলাসাহিত্যে সুরিয়ালিজম ধারা কিছুটা পরে প্রবেশ করলেও এর অবস্থান অত্যন্ত মজবুত ও দৃঢ়। কবি জীবনানন্দ দাশ থেকে এর উত্তরণ বলা যায়। পঞ্চ পাণ্ডবের হাতে এর সুবিস্তৃত উত্তরণ ঘটেছে। পরবর্তীকালে আবদুল মান্নান সৈয়দের হাতে এই ধারা বেগবান হয়। বাংলাকে যদিও অনেকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখেন এবং মনে করেন বিদেশী সাহিত্যের ওপর নির্ভরশীল এবং অনুকরণপ্রিয়। বিষয়টি আদৌ সঠিক নয়। এ বিষয়ে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘বাংলা কবিতা পৃথিবীর যেকোন ভাষার কবিতার তুলনায় পশ্চাৎপদ নয়, বরং মনে হয় অগ্রবর্তী, বিদেশের কাছ থেকে গ্রহণ করার কিছু থাকলেও অনুকরণ করার কোন প্রয়োজন নেই। বরং, বাংলা কবিতা সুপ্রচার হলে, বিদেশী কবিরাও আমাদের থেকে অনেক কিছু গ্রহণ করতো। কিছু কিছু যে এখন করছে, তাও ঠিক।’ সুতরাং সহজেই বলা যায়, বিশ্বের যে প্রান্তের যে কবিই হন না কেন, তিনিই সুরিয়ালিজম ধারায় আংশিক বা সম্পূর্ণ রূপে অন্তর্গত ।।
তথ্যসূত্র
* অন্য দেশের কবিতা- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
* কিউবিজম ও অনুষঙ্গ- ম. রফিকুল আলম
* সমকালীন শিল্প ও শিল্পী- নজরুল ইসলাম
* প্রকৃত শিল্পের স্বরূপ সন্ধান- ড. আব্দুস সাত্তার
* গিয়ম আপোলিনেয়ারের কবিতা
* আন্টোনিন আর্তোর কবিতা
* পল ভালেরির কবিতা
* পল ক্লোদেলের কবিতা
* সাঁ-ঝঁ প্যার্সের কবিতা
* জাঁ ককতোর কবিতা
* পল এলুয়ারের কবিতা
* লুই আরাগেঁর কবিতা
* রেনে শাঁরের কবিতা
* রেনে গি কাদুর কবিতা
* পিলিপ জাকোতের কবিতা
* লেওপোল্ড সেঙ্ঘরের কবিতা