সম্পাদক ঝটপট একটা প্রেমের গল্প লিখে ফেলতে বলল শুভকে।
এমনভাবে বলল যেন গল্প লেখা, তাও প্রেমের গল্প, অতিশয় তুচ্ছ ও সহজসাধ্য এক কাজ।
শুভ নিরিবিলি টাইপের এক তরুণ। কোনোকালেই উদ্ধত প্রকৃতি নয় ওর। গত বছর নিজের গল্পের বইটা পুরস্কৃত হবার পরও সে যেমনি ছিল তেমনি আছে। বাড়তি উচ্ছ্বাস বা অহংবোধ- কোনোটাই জোরালোভাবে বাসা বাঁধেনি ভেতরে।
বন্ধুরা বলে, ভারতের বিশ্বখ্যাত সংগীতশিল্পী এআর রহমানের সঙ্গে ওর নাকি অনেকখানি মিলে যায়। দেখাশুনোয় যেমন, স্বভাব- বৈচিত্র্যেও কপি-কাট ফরম্যাট।
শুভ বলল,‘ কবে লাগবে হাসান ভাই ?’
‘তিন দিনের বেশি সময় নেয়া যাবে না । ’
‘আচ্ছা।’
‘কথা দিলে তো?’
‘হ্যাঁ।’
বলে তো ফেলল; কিন্তু মগজে এখন গল্প কোথায়? একেবারে ফাঁকা কবরস্থান হয়ে রয়েছে।
এসময়টায় শুভর যা অভ্যেস, তা-ই করল। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে আম্মাকে বলল, ‘আম্মা, আমি বেরোচ্ছি।’
শুভর আম্মা ছেলেকে জানে; চটজলদি প্রশ্ন করল, ‘রাতে ফিরবি তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘খেয়াল রাখিস।’ আসমার চোখ মুখ থেকে তবু উৎকণ্ঠার ছায়া কাটে না। ছোটবেলা থেকেই ও এরকম; কোথাও কোনো প্যাঁচগোছ দেখা দিলেই খুলনার বাসার ছাদে উঠে বসে থাকত। ঘন্টার পর ঘন্টা। একবার ক্লাস এইটের অংক পরীক্ষায় খারাপ করায় শুভর আব্বা ওকে বকে দিল। তারপর শুভকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই উদগ্রীব। ছাদের কার্নিশের ধারেও বসে নেই। তাহলে গেল কোথায়?
আসমাই ওকে খুঁজে বের করে আনল। বাড়ির পিছনে শাখা-প্রশাখাময় একটা বড় আমগাছের ত্রিভুজাকৃতি মগডালে সে পা ছড়িয়ে শুয়ে রয়েছে বৃক্ষমানব হয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বার সময় ওর এরকম নিজে থেকে গুম হয়ে থাকবার অভ্যেসটা পুরো পাল্টে যায়। তখনি জন্ম নেয় আরেকটি অভ্যেস; আর সেটি হলো মাঝে মাঝে সবাইকে বলে-কয়ে আচমকা ওর নিরুদ্দেশ-যাত্রা।
শুভর বাবা পুলিশের কর্মকর্তা; একমাত্র ছেলের এরকম আচরণে সন্দেহ হওয়ায় খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন ; কিন্তু কিছুদিন পর বুঝতে পারলেন, ছেলেটা কিঞ্চিৎ ভাবুক কিসিমের। সুযোগ পেলেই সে কোনো নদীর ধারে কিংবা আশপাশের কোনো নিরিবিলি গ্রামে আত্মগোপন করে থাকে। এটা ওর অভ্যেস। কাশবন, সর্ষেক্ষেত কিংবা ধূ-ধূ প্রান্তরের এককোণে একলা একটা গাছের নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিচ্ছে। হাতে একটা বই। প্রচণ্ড রোদে কখনো দরদর করে ঘামছে কিংবা কখনো কনকনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে।
তবু সে ঠায় বসে রয়েছে। যেন কোনো একটা ক্যানভাসের ছবি সে; মগ্ন চৈতন্যের আবির মেখে খেয়ালি প্রকৃতির সঙ্গে কোলকুলি করছে !
শুভর বাবা মন্দ কিছু নয় ভেবে উঠতি বয়সের ছেলের ব্যক্তি-স্বাধীনতার দেয়ালে শুধু শুধু কালি না ছিটিয়ে চুপচাপ রইলেন।
তবু মাঝে মাঝে ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠায় ভুগতেন তিনি। ভাবতেন, বিরূপ ও কর্কশ এ দুনিয়ায় নরোম দিলের ছেলেটার জায়গা হবে তো? নাকি দুষ্ট প্রকৃতির মানুষজনের অবিরাম লাথি-গুঁতা খেয়ে জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসবে- কে জানে!
আসমা তখন সান্ত্বনা দিত,
‘দেখো কিছু হবে না। চাকরি-বাকরি আর সংসারের চাপ এলে ঠিক ওগুলো সাদামেঘের মত কেটে যাবে।’
শুভর বাবা এটুকু আশায় বুক বেঁধে একদিন চলে গেলেন সুতোর ওপারে। বাবার দেখা সেই ভাবুক ছেলে এখন ব্যাংকের মাঝারি কর্মকর্তা; ভাবুক স্বভাব এখন লেখকসত্তা হয়ে লেখালেখির কাজে মগ্ন। গতবার ওর লেখা একটি উপন্যাস পুরস্কার জিতে নিয়েছে। এখন শুভর ভাবুক স্বভাবের ভেতর অনেকেই, বিশেষ করে ওর সম্পর্কে একদা হতাশগ্রস্ত শিক্ষিত ও সফল আত্মীয়-স্বজন, রবীন্দ্রনাথের ছায়া খোঁজেন এবং কথায় কথায় ওর এই খামখেয়ালিপনাময় ভাবুকতার মাঝে আগামী দিনের সেরা মানুষটিকে লক্ষ্য করে মুখভরা হাসি বিনিময় করেন নিজেদের ভেতর।
শুভ বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় যাবে ঠিক করতে পারছে না। সহসা ওর সামনে একটা বাস এসে থামল। বাসটির কপালে লেখা- ঢাকা নিকলী ভায়া ভৈরব।
নিকলী শুনতেই মনটা কেন যেন ভরে উঠল আনন্দে। জলময় জায়গাটার কথা অনেক শুনেছে সে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। বাসে উঠে পড়লে কেমন হয়?
শুভ একলাফে বাসে চড়ে বসল। ভাগ্যক্রমে জানালার ধারে সে মনের মতো একটা সিটও পেয়ে গেল। নিজের মতো করে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ চলে এলে মনটা একেবারে বৈরাগী হয়ে পড়ে। কোত্থেকে যেন অপরিচিত লতাগুল্মের গন্ধ নাকে আসতে থাকে; বুঝতে পারে, সে এখন ইট-কাঠ-পাথর-লোহা ছেড়ে প্রকৃতির দিকে ছুটছে, যেখানে ওর নাড়ি পোঁতা আবেগের ঝরনাটা কলকল-ছলছল করে নিরবধি বয়ে চলছে।
নিকলী জায়গাটায় শারীরিকভাবে ওর যাওয়া হয়নি। তবু সবুজ গাছগাছালি ছাওয়া একটা বনভূমি, যা সে বুকের গহিনে যতœ করে রেখে দিয়েছে, সেই সংগোপন ছবিটার সঙ্গে যেন হুবহু মিল খুঁজে পাচ্ছে। সেই মনোরম বনভূমিটার পায়ের তলায় আছড়ে পড়ছে হাওরের উল্লসিত লক্ষ-লক্ষ ঢেউ। সূর্যাস্তের সময় সেদিকে তাকিয়ে সে আর কিছু নয়, নিজেকে অনুভব করবে বলেই সেদিকে ছুটে যাচ্ছে।

ছুটির দিনে রাস্তায় কোনো জ্যাম নেই। খুব দ্রুত শুভ নিকলী পৌঁছে গেল। বাসটি ভৈরব থেকে খোলা হাওয়ার ভেতর উড়তে উড়তে চলে এল নিকলী।
বাস থেকে নেমে সে যখন নিকলীর মাটিতে পা রাখল তখন দুপুরবেলা। একটু আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বর্ষার আকাশ গাঢ় শ্যামল; মেঘের সঙ্গে মিলেমিশে মাঝে মাঝে কষ্টিপাথর।
বাসস্ট্যান্ড থেকে একাট রিক্সা নিয়ে উপজেলা কমপ্লেক্সের সামনে আসতেই প্রথমবার শুভর মনে হলো, এখানে আসবার সিদ্ধান্তটি মোটেই ভুল হয়নি।
ঘন্টাখানেক ধরে সে যেদিকে তাকাচ্ছে কেবল আদি-অন্তহীন অথৈ সাগর। স্বচ্ছ জলের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শ্রাবণের মাতাল হাওয়া। সেই পুলকে মাতোয়ারা কলকল-ছলোছল ঢেউগুলো; চারপাশে নিরন্তর আনন্দ-আবেগ ছড়িয়ে কূলে আছড়ে পড়ছে। আহা!
শুভ রিকশা থেকে নেমে অন্তহীন এই জলধারা আর ঢেউয়ের উচ্ছ্বাস বিশুদ্ধ নিঃশ্বাসের মতো গ্রহণ করে চলে নিজের ভেতর। আনন্দে রাস্তার একপাশে পা ছড়িয়ে বসে পড়ে। মুগ্ধচোখ ছড়িয়ে দেয় জলের মোহময় রূপের গহিনে। মেঘলা আকাশে বকেদের ডানা মেলে উড়ে যাওয়া, ইঞ্জিন-নৌকার ভটভট শব্দ আর অনেক দূরে একফালি রহস্যময় সবুজ ওর পুরো অস্তিত্বের ওপর ঘন-গভীর হয়ে বসে; নিজেকে মেলে ধরার নিমগ্ন আকুতি এ সময় ওর পুরো সত্তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দূরে-বহুদূরে, অন্য কোনোখানে।
দিয়াশলাইয়ের বাক্সের মতো ঢাকার ফ্ল্যাটে থেকে থেকে কদিনেই শুভ হাঁপিয়ে ওঠে। কিছু ভালো লাগে না তখন। অফিস থেকে ফেরার পর টেলিভিশন দেখা, ফেসবুকিং আর টুকটাক পড়াশুনা করে অবসর সময়টুকু কাটছিল। থিতিয়ে পড়া একরকম ভোঁতা অনুভব ওকে যেন পঙ্গু করে দিচ্ছিল। লেখার কোনো আইডিয়া যেমন পালিয়ে বেড়াচ্ছিল ওর কাছ থেকে তেমনি কোনো টান জন্মাচ্ছিল না লেখার প্রতি। ওসব মনে হলে কোত্থেকে একরাশ অবসাদ আর বিষাদমাখা তীব্র বিরক্তিবোধ এসে ভর করত। কিছু একটা ভাবলেও চরিত্রগুলো একটু পর ক্ষয়াটে স্থিরচিত্র হয়ে পড়ে। নড়ন-চড়ন নেই তাদের। মন ও মস্তিষ্কের যেখানাটায় চরিত্রগুলো সেলুলয়েডের পর্দায় ছবি দেখায়, সেখানটা একেবারে ফাঁকা, সবকিছু প্রাণহীন নিঃসাড় হতে থাকে দিনদিন।
এরকম সময় শুভর বাইরে বেরনো ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা থাকে না। তাকে লিখতে হলে বেরোতেই হবে। কোনো না কোনোভাবে প্রকৃতির আলোয় মনকে তরতাজা করে তুলতে হয়। তারপর নির্জীব মন সজীব হলে আপনা থেকেই লেখককে ছবি দেখাতে শুরু করে অন্তর্গত সত্তা। সেই ছবি দেখে দেখেই এগিয়ে যেতে হয়।
শুভ তো তাই করে আসছে এদ্দিন। এখানেও এসেছে সেই সূত্র ধরেই।
আজ ঢেউয়ের সায়রের সামনে বসে সে ঠিক টের পাচ্ছে ওর মন থেকে নির্জীবতার ছাতা পড়া সব পলেস্তারা খসে পড়ছে। দূর হচ্ছে সব বিভ্রম। প্রকৃতির উচ্ছলতা ওর লেখক-মনেও; সে এটা টের পায়; টের পাচ্ছে এখানে আসা অব্দি।
শুভ চোখ বুজে নিরিবিলি নির্জন এ জলভূমিকে নিজের ভেতর গ্রহণ করে নেয়। ধীরে ধীরে ভেতরকার সমস্ত নাগরিক নিস্পৃহতা, স্বার্থপরতা আর নি®প্রাণ অন্তঃসারশূন্যতা বাষ্পের মতো উবে যায়।
একটু বাদে সে অনুভব করে ওর ফাঁকা ভেতরটা পূর্ণ হচ্ছে এক নিষ্কলুষ সতেজতায়। চোখের সামনে বিশাল জলাধার আর উন্মুক্ত নীলাকাশ ওকে এক উদার, মুক্ত ও আনন্দময় আবেগের দিকে ছুটিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে। সে ছুটছে সেদিকে; বুকভরা উচ্ছ্বাস নিয়ে একে আলিঙ্গন করার জন্য মরিয়া হয়ে সেদিকেই ছুটতে হচ্ছে তাকে। এরকম জীবনই তো সৃজনশীলতার, এরকম করে বেঁচে থাকাটাই তো লেখকের। এটাই হউক- তা-ই চায় শুভ।
এসময় চট করে মনে পড়ে গেল অপুর কথা। সে বসা থেকে দাঁড়িয়ে চারপাশে কাউকে খুঁজতে শুরু করল। একটু বাদে দু’জন পথচারীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা, খান লজটা কোথায় এখানে, বলতে পারেন?’
লোকটি মুখস্থের মতো করে উত্তর দিল, ‘বাজারে যাইন, বাজার ফার অইলেই খান লজ ফাইবাইন। একটু কষ্ট করুইন যে।’ বলে অপরিচিত লোকটি একটা রিক্সাকে ডেকে কিছু একটা বলল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘ফাঁচ ট্যাকা দিয়েন। সোজা খান লজে লইয়া যাইব।’
শুভ মিনিট দশেকের ভেতর খান লজের গেটের সামনে এসে গেল। পুরনো বাংলো বাড়ি। চারপাশে এলোমেলোভাবে বেড়ে ওঠা গাছ-গাছালির অন্ধকার। এর উপর মেঘলা আকাশ; মনে হচ্ছে কোনো বাড়ির উঠোন নয়, ঘন রেইন ফরেস্টের ভেতর ঢুকে পড়েছে সে।
অপু অবশ্য বলেছিল, ‘তুমি নিকলী গিয়ে যে কাউকে বললেই হবে, খান লজে নিয়ে যাবে।’
অপুর কথা সত্য প্রমাণিত হলো। শুভর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়ে তারপর হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। কোথাও খোঁজ নেই ওর। পরে শুনেছিল, ওর কী একটা জটিল রোগ ধরা পড়েছে। আর পড়বে না।
অপুর সঙ্গে শুভর সখ্যের প্রধান কারণ হলো দু’জনই একই স্বভাব নিয়ে জন্মেছে। অন্তর্মুখী টাইপ। দু’জনারই নিরিবিলি নির্জন জায়গা পছন্দ; সন্ধ্যার পর ঘন্টার পর ঘন্টা ওরা বুড়িগঙ্গার তীরে বসে সময় কাটাত। বুড়িগঙ্গার জলে কম্পমান আহসান মঞ্জিলকে ঘিরে এসময় আলো-আঁধারির যে রহস্যময় মরীচিকা তৈরি হতো, দুই উঠতি বয়সের যুবক সেদিকে অপার বিস্ময় নিয়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে থাকত।
তখনি শুভ জানতে পারে অপুর সঙ্গে ওর খালাতো বোন লিজার গভীর প্রণয় চলছে। পড়াশুনো শেষ হলে এ সম্পর্কটিকে বিয়ে পর্যন্ত এগিয়ে নেবার ব্যাপারে দু-পক্ষই সম্মত। তবু আত্মতুষ্ট প্রেমিক অপু ক্ষণে ক্ষণে আর্তস্বরে গান গেয়ে ওঠে, ‘আমার বন্ধু দয়াময়, তোমারে দেখিবার মনে লয়… ’
সেই অপুকে আজ মনে পড়ল এদ্দিন পর। আর এখন সেই অপুর বাড়ির আঙিনায় দাঁড়ানো সে। বড় উঠোনজুড়ে পচা লতা-গুল্ম আর পাতা, বৃষ্টি ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার। স্যাঁতস্যাঁতে চারপাশ। উঠোন পেরোলে রং ওঠা দোচালা ঘর।
শুভ পাকা দাওয়ার উপর উঠে কাঠের দরজার একপাশে লাগানো কলিংবেল চেপে ধরল। বছর দশেকের অদর্শন, নিশ্চয়ই অনেক বদলে গেছে সে। কাঠিদেহের ছেলেটার শরীরে কি মাংস লেগেছে? খালাত বোন লিজাকে কি বিয়ে করেছে নাকি বিচ্ছেদের অনলে পুড়ে শেষ পর্যন্ত আশ্রয় মিলেছে বিদেশের মাটিতে?
কে জানে। এ সময় দরজা খুলে দিল একজন সুন্দরী মহিলা। চেহারায় কিঞ্চিৎ বিষণ্ণতার আলগা স্পর্শ থাকলেও বেশ পরিপাটি চৌকস মহিলা। নিকলীর তুলনায় বেশ অগ্রসর তাতে কোনো সন্দেহ নেই, ভাবল শুভ।
মহিলার চোখে জিজ্ঞাসা।
শুভ বলল, ‘এটা কি অপুদের বাড়ি? অপু আছে?’
সঙ্গে সঙ্গে মহিলার চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। একছুটে ভেতরে ঢুকে গেল।
একটু পর একজন ভদ্রলোক, পরনে গেঞ্জি ও লুঙ্গি, একরাশ বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকে চাই?’
‘অপুদের বাড়ি এটি? অপু আছে?’
‘আপনি কেডা?’ বেশ কর্কশ শোনাল কণ্ঠস্বর।
‘আমি ওর বন্ধু। ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে পড়েছি। আমার নাম শুভ।’
লোকটির দৃষ্টি এবার নরম হলো। ফ্যাল-ফ্যাল করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল শুভর দিকে। আগলে রাখা দরজাটি পুরো খুলে একটি ছবি দেখিয়ে বলে উঠল, ‘এই যে আফনের বন্ধু। আমি তার ছোডোবাই।’
আচমকা ইলকেট্রিক শক খেল শুভর শরীর। প্রচণ্ড শীতকাঁটায় লোমকূপগুলো দাঁড়িয়ে গেল সঙ্গে সঙ্গে।
শুকনো ফুলের মালা জড়ানো একটি অপরিচ্ছন্ন ছবি ওকে নিমিষে অস্তিত্বহীন করে দেয়।
শুভ আর দাঁড়াতে পারল না। ছিটকে বেরিয়ে আসে উঠোনে। ওর নিঃশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। লোকটি ওর পিছু পিছু ছুটে এল। কোমল গলায় বলল, ‘বসবেন না? ভাইজানের কাছে আপনার কথা অনেক হুনছি। আসেন, ভিতরে বসেন।’
কিন্তু শুভ আর সেখানে দাঁড়াতে পারেনি। তাড়া খাওয়া কোনো জন্তুর মতো শুভ অপুদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে একটি রিক্সায় চেপে বসল। মাথা ঘুরছে। এদ্দিন ধরে এত বড় সত্য কথাটা সে জানতে পারেনি? তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জা ওকে দংশাতে থাকে। বারবার একটা সত্য ওর পুরো অস্তিত্বকে যেন শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলতে চাইছে, অপুর মৃত্যুর খবরটা সে জানল না?
শুভ ফিরে এলো আগের জায়গায়। বর্ষার দমকা হাওয়া শরীরে আদর বুলিয়ে দিলেও মন বড় অস্থির আর উদ্ভ্রান্ত হয়ে রয়েছে।
রিক্সাওয়ালার টাকা পরিশোধের কথা পর্যন্ত বেমালুম ভুলে গেল সে।
সহসা রিক্সাওলাটি বলে উঠল, ‘স্যার কি খান-লজে গেছলাইন।’
সম্বিত ফিরে পেয়ে রিক্সাওয়ালার দিকে তাকাতেই ভাড়ার কথা মনে পড়ে গেল শুভর।
ভাড়া মিটাতে গিয়ে শুভ জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি চেনেন এদের? অপু আমার বন্ধু।’
‘চিনুম না কেরে? সাত আট বচ্ছর আগে মারা গেছুইন তাইনে। ক্যান্সার অইছিল তো। জামাই বাঁইচত না, মইরা যাইব গা জাইনাও লিজাপা বিয়া করছিল অপুভাইজানরে। একঅই পরিবার, কডা বাড়ির পরই তো লিজা আপাগো বাড়ি। একটা বাইচ্চা অওনের পর মইরা গেল অপু ভাইজান। হগলে ধইরা বাইন্দা লিজাপারে অপুভাইর ছোডডা হাছানের লগে বিয়া করাইয়া দিল। হায়রে পিরিত, হায়রে লিজাপার কান্দন, কেডা হুনে কার কতা। গ্যারাম না, চাইলেই কি নিজের মতন চলন যায়?’ বলতে বলতে লোকটি রিক্সা নিয়ে চলে গেল।
শুভ একদৃষ্টিতে চোখের সামনে নিঃসীম শূন্যতায় ভরা ঢেউখেলানো জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকে।
সহসা মনে পড়ল একটু আগে অপুদের বাড়িতে দেখতে পাওয়া এক নারীর মলিন মুখ।
এই কি লিজা, অপুর দয়িতা?