সময়টা মধ্যদুপুর, অথচ বিলাতুননেছা এখন পর্যন্ত নাস্তা খায়নি। আর এই বিষয়ে কারো কোনো মাথাব্যথাও নেই। বিলাতুননেছা পথের মানুষ। তাই নাওয়া-খাওয়া, ঘুম কিংবা আল্লাহর বন্দনা- সবকিছু পথেই করা হয়। পথের মানুষেরা নাস্তা না খেলে রাষ্ট্রের তেমন কোনো দায় পড়ে কি না, সে ভাবনা বিলাতুননেছাকে স্পর্শ করছে না। বৈশাখ মাস শেষ হওয়ার পথে। তবুও ঝড়-বৃষ্টির কোনো রা’ নেই। বাতাসের গতি কিঞ্চিৎ বেশি হলেও সূর্যের তাপদাহে তা অনেকটাই ম্লান হয়ে আছে। নীরব ডাকাতিয়ার অদূরে তিন তলাবিশিষ্ট প্রেসক্লাব ভবন। দক্ষিণের আউলা বাতাস সে ভবনের দেয়াল-ইট স্পর্শ করে সাঁই-সাঁই ছুটে যাচ্ছে উত্তরে। খেয়াঘাট পাড় হওয়া মানুষের পাড়ের ঘাস, মাটি মাড়িয়ে স্বাভাবিক নিয়মেই হেঁটে যাচ্ছেন। এই যে বিলাতুননেছা সকাল থেকে নাস্তা খায়নি, এ বিষয়ে তাদেরও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নদীপাড়ে অনাদরে বড় হওয়া বেওয়ারিশ কড়ই গাছটা বহু বছর ধরে দাঁড়িয়ে আছে। গাছের ছায়ায় সেই সকাল থেকে নিজেকে বিছিয়ে শুয়ে আছেন সত্তরোর্ধ্ব বিলাতুননেছা। খেয়াঘাট থেকে তার দূরত্ব মাত্র পঁচিশ হাত। এই অযুহাতে কি একজন পথচারীও স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ায়নি। কেউ এসে জিজ্ঞেস করেনি- আজকে তিনি নাস্তা খায়নি কেন? তার খসে যাওয়া দেয়ালের প্লাস্টারের মতো মুখের কুঁচকানো চামড়ার ভাঁজে এমন প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক!।

বিলাতুননেছার আসল বাড়ি কোথায়, তা নিজেও জানেন না। তিনি ভবঘুরে মানুষ; তাই মাত্র তিনবার কলেমা পড়ে বিয়ে করেছেন। এই তিনটা বিয়ে শুধুমাত্র জৈবিক চাহিদা মেটাতে করেছেন তা কিন্তু নয়; বিয়েগুলো ছিলো- নিতান্তই পেটের ক্ষুধা মেটাতে। তার স্বামীগণ একাধিক বিয়ে করা পুরুষ ছিলেন। পথে বড় হওয়া মানুষের এই এক দোষ, এক বিয়েতে তাদের জনম কাটে না। তার প্রথম স্বামীর বাড়ি শাহাতলী বাজার নামক গ্রামে।
– দেশের বাড়ি কোথায়? কারো আচমকা এমন প্রশ্নে একবাক্যে প্রথম স্বামীর বাড়ির কথাই তিনি বলে দেন। ছেলেমেয়ে ক’জন এই হিসেব আপাতত সঠিক মনে নেই। দ্বিতীয় স্বামী একটা বাচ্চা বিক্রি করে দিয়েছিলো। এ কারণেই তার সাথে আর ঘর-সংসার করা হয়নি। একটু আগে যে মহিলা বিলাতুননেছাকে ভাত খেতে যাওয়ার জন্য সেধেছেন তার নাম খতেজা বানু। থাকেন শহরের প্রাণকেন্দ্র কালিবাড়ি রেলস্টেশনে। খতেজা বানু বিলাতুননেছার মেয়ের ঘরের নাতনী।
যেদিন কোথাও খাবারের না মিলে, তখন খতেজার কাছেই ছুটে যান তিনি। নাতনি নানিকে পেটভরে ভাত খাইয়ে প্লটফর্মের ওপর বিছানা পেতে শুইয়ে দিতেন। বিছানা মানে বিভিন্ন পুরাতন প্লাস্টিক বা ব্যানার। অবশ্য প্লাটফর্মে তার কখনোই ভালো ঘুম হয়নি। দিন-রাত বিভিন্ন মানুষের হাঁক-ডাক আর যানবাহনের হুইসেল বিলাতুননেছার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায়। তাছাড়া রেল-পুলিশ আর আনসার অমল বাবু যেনো ঘরহীন এই মানুষের পিছে লেগেই আছে।
এক বিকেলে বিলাতুননেছা দুপুরের খাবার খেয়ে ভঙ্গুর প্লাটফর্মে ঘুমিয়ে ছিলেন। পাশাপাশি কাতার করে আরো কয়েকজন ভাগ্যহত নারী-পুরুষ। লাকসাম থেকে ছেড়ে আসা ড্রেমু ট্রেনের হুইসেল বাজতেই আনসার অমল দে তাদের গায়ে এক বালতি পানি ঢেলে দিলো। পানিগুলো পরিষ্কার হলে দুঃখটা কিছু কম হতো। কিন্তু লাল বালতিটায় পেটভর্তি যে পানি তাদের গায়ে ঢালা হয়েছে, তা পাশের দোকানো চায়ের কাপ ধোয়া ময়লাযুক্ত ছিলো। লোকটা এর আগেও কয়েকবার এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। একদিন খুব ভোরে বিলাতুননেচ্ছা কারো চিৎকার শুনে লাফিয়ে উঠলো। চোখ কচলাতে কচলাতে দেখে পাশে শুয়ে থাকা আঁধা পাগল কাশেম আলী চিৎকার করে কাঁদছে। আর পাশে দাঁড়িয়ে অমল দে হাতের লাঠিটা নাচিয়ে দাঁত বের করে হাসছে। তার আর বুঝতে বাকি রইলো না, কাশেম আলী নিজের পাছায় হাত বুলিয়ে কাঁদছে কেনো। আঁখের মতো দেখতে মোটা এই লাঠি দিয়ে একবার সে বিলাতুনেছার পাছায়ও গুঁতা মেরেছিলো। কাঁচা ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠেই অমলকে খানকিরপুত বলে গালি দেয়। অমলতো রেগে একদন আগুন যেনো। আশপাশে অপেক্ষমাণ যাত্রীর উপস্থিতি বেশি থাকায় সেদিন আর গালির প্রতিশোধ সে নিতে পারেনি। তবে বিষয়টা সে পরে দেখে নিবে বলে হুঁশিয়ার করে গেছে।
বিলাতুননেছার মাঝে মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে, ঘুমের মাইনষের পাছায় লাঠির গুঁতা দিয়ে অমলরা কী মজা পায়?। আবার উত্তরটাও নিজে নিজেই খুঁজে আনেন, রাস্তার মানুষের সব প্রশ্ন মনে আনতে নেই। তাছাড়া আনাসার অমল দে তাদের সাথে যে নানী শাশুড়ির মতো আচরণ করবে এটাও আশা করা একদম বোকামি। কারণ রাস্তার মানুষরা হলো এই সমাজের সবচেয়ে কমদামি ‘মাল’। কথাটা প্রতিবেশী জলিল মিয়া একবার বলেছিলেন। একটা খালি বোতল কিংবা কাগজও রাস্তায় পড়ে থাকলে কেউ না কেউ কুড়িয়ে নেয়। অথচ এই মানুষগুলো জনম জনম ধরে রাস্তায় পড়ে থাকলে; কেউ তাদের নিতে চায় না। তবে এই স্টেশন থেকে অনেকেই তিন সাইজের মানুষ কুড়িয়ে নেয়। এর মধ্যে এক নাম্বারে নবজাতক শিশু। অনেক নিঃসন্তান বাবা-মা স্টেশন থেকেই শিশু বাচ্চা কিনে নেয়। দ্বিতীয়ত দশ থেকে ১৫ বছরের কিশোর ছেলে। তাদের ভাড়া করে নেয়া হয় চুরি-ছিনতাই আর মাদক বিক্রির কাজে লাগানোর জন্য। ইদানীং রাজনীতিক দলের মিছিল-সমাবেশেও তাদের ডাক আসে। এছাড়া শরীরের বান আর মুখের রং ভালো এমন অল্প বয়সের মেয়েদের অনেকেই খুঁজতে আসেন স্টেশনে। তবে সেটা শুধুমাত্র রাত্রিবেলায়।
এই পথে যাওয়ার সময় খতেজা বানু আরো একবার বিলাতুননেছাকে ডাক দিলো- আমার লগে আয় বুড়ি, চাইরটা ভাত খাইয়া যা। আইজ আলুর চোকলা ভর্তা করছি। মশইর ডাইল শুকনা করই রানছি। এমন না খাইয়া থাকলে মরতে গেলেও কষ্ট বেশি পাবি।
– ভুখা শরীরের মরার সময় মানুষ কী কষ্ট বেশি পায়? এমন কথার উত্তর বিলাতুননেছার জানা নাই। তাই কথা না বাড়িয়ে নীরব কণ্ঠেই বলে দিলো- তুই অহন যা বইন, আমার শরীলডা বেশি ভালা না, আমি যামু না।
এই যে খতেজা বানুর মুখের ওপর সে না করে দিলো, তার মানেও এ নয় নাস্তা না খাওয়া তার ক্ষুধা পালিয়ে গেছে। নাতনীকে না করে দেয়ার কারণ হলো, গত পাঁচ দিন তার প্রচন্ড জ্বর। আর জ্বরের মুখে কোনো কিছুই স্বাদ লাগে না। তা ছাড়া কয়টা ভাত খাওয়ার জন্য এতো দূর হেঁটে কালিবাড়ি যেতে ইচ্ছেটাও সায় দিচ্ছে না। খতেজা বানু এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়েই ফিরে গেলো।
বিলাতুননেছার বড় মেয়ের নাম ফজিলতুননেছা। থাকেন বকুলতলা বড় রেলস্টেশনে। সেখানে পরিত্যক্ত যাত্রীছাউনির নিচে তার ঘরবসতি। মাথার ওপর টিনের চাল থাকায় ওখানে রোদ-বৃষ্টির ভয় নাই। বিলাতুননেছা ভিক্ষা করতে করতে প্রায় বড় মেয়ের কাছে চলে যান। সেখানে ডাকাতিয়া নদীর পাড় থেকে আসা দক্ষিণের বাতাসে তার ভালো ঘুম হয়। তা ছাড়া এই মেয়ের প্রতি তার দরদটা ভিন্ন কারণে। বিলাতুননেছার বাম হাত নেই। নেই মানে, জন্মের সময় থেকে নেই তা নয়। হাতটা ট্রেনে কাটা গেছে।
বছর দশেক আগে সে প্রথম স্বামীকে দেখতে শাহ্তলী গ্রামে যাচ্ছিলেন। মাঝ দুপুর। মাথার উপর উত্তপ্ত সূর্য। সূর্যের এমন রোদ্রকে উপেক্ষা করে সে রেলপথের পাথর মাড়িয়ে ছোট ছোট পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলো। হঠাৎ হাতির মতো চিৎকার দিয়ে কুমিল্লা থেকে ছেড়ে আসা মেঘনা নামের ট্রেনটা দেখতে পায়। অসুস্থ শরীরে একটু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে পাথরে হোঁচট খেয়ে রেল-লাইনের পাশে পড়ে যান। ভাগ্যক্রমে ডান হাতটা রাস্তার স্লিাপারের উপর ছিলো। কিছু বুঝে ওঠার আগেই নির্দয় ট্রেনটা বিলাতুননেছার শরীর থেকে বাম হাতটা আলাদা করে চলে যায়। এরপর ফজিলতুননেছাই তাকে সেবাযতœ দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। এক হাত কাটা যাওয়ায় ভিক্ষার আয় বাড়লেও স্বামী-সন্তানদের কাছে তার কদর কমে যায়। ফজিলতুননেছা ছাড়া বাকিসব ছেলে-মেয়েরা বুড়ে বিলাতুননেছাকে ‘অচল মাল’ হিসেবে চিহ্নিত করে। একটা সময় স্বামী-সন্তান সবাই তার খোঁজ রাখা বন্ধ করে দেয়।
ডাকাতিয়া নদীর এই স্থানটি বিলাতুননেছার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। মন খারাপ হলে প্রায় সে এখানে এসে বুড়ো কড়ই গাছটার তলে বসে থাকেন। বিকেল হলে অসংখ্য মানুষ বেড়াতে আসে নদীর পাড়ে। তবে সবচেয়ে বেশি আসে জোড়া কবুতর। তারা শেষ বিকেল আর সন্ধ্যার পরে নৌকায় ঘুরে বেড়ায়। উঠতি বয়সের যুবক-যুবতীকে ঘাটের মাঝিরা জোড়া কবুতর বলে। বলে, জোড়া কবুতর নৌকায় উঠলে ভাড়া নাকি বেশি দেয়। হাত পাতলে বিলাতুননেছাকেও তারা ফিরায় না। যারা দেয় তারা, সর্বনিম্ন দশ টাকার নোট দেন। এই জোড়া কবুতর দেখতে বিলাতুননেছার খুব ভালো লাগে। মাঝে মাঝে মন চায় নিজেও কারো হাত ধরে জোড়া কবুতর হয়ে যেতে। কিন্তু তিনি জানেন, রাস্তার মানুষের কবুতর হওয়ার স্বপ্ন দেখা অভিশাপ। ফজিলতুন্নেছার এক মেয়ে একবার কবুতর হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলো। পরিচয়হীন এক যুবকের হাত ধরে সে কবুতর হওয়ার বদলে খারাপ পাড়ায় বিক্রি হয়ে যায়। এরপর আর নাতনীর কোনো খোঁজ পায়নি বিলাতুননেছা। নাতনির কথা মনে হলে খুব মন খারাপ হয় তার। মেয়েটা স্টেশনে বড় হলেও খুব মিষ্টি চেহারা ছিলো।
বিকেল তখন সন্ধ্যা দেবীর হাতে নিজেকে সঁপে দিয়েছে। ফলে ডাকাতিয়ার পাড়ের বেওয়ারিশ কড়ই গাছে পাখিদের ডাকাডাকি বেড়ে গেলো। দীর্ঘ বয়সী গাছটায় অনেকগুলো পাখির বাসা। সন্ধ্যা হলে সব পাখি যখন বাসায় ফিরে আসে, তখন তাদের কিচির-মিচির ডাকে আশপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে। সূর্যের বিদায়ক্ষণে ছায়াও বড় থেকে আরো বড় হয়ে ওঠে। তেজ কমে আসা বুড়ো সূর্যটা কখন যে মধ্যাকাশ থেকে পশ্চিমে হেলে পড়ছে সেটা বিলাতুননেছা টেরও পায়নি। দক্ষিণের আউলা বাতাসও সমস্ত উত্তাপ বিসর্জন দিয়ে শীতল হতে শুরু করেছে। পেটে ক্ষুধা আর চোখে ঘুম নিয়ে বিলাতুননেছা আস্তে আস্তে শুয়ে পড়েন ঘাসের গালিচায়। নদীর ঢেউ গুনতে আসা জোড়া কবুতরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। তারা বিলাতুননেছার পাশ দিয়ে নৌকায় উঠে-নামে। অথচ বিলাতুননেছা যে এখন পর্যন্ত নাস্তা খায়নি তা এই ব্যস্ত শহরের কেউ জানে না ।।