কিসের যেন একটা বিকট আওয়াজ শুনে ঘুম ভেঙে গেলো আদনান সাহেবের। আবছা অন্ধকারে ঘোর লাগা মানুষের মতো এদিক ওদিক তাকাতে থাকলেন তিনি। নাহ, কিছুই বোঝা গেলো না। কিন্তু আওয়াজ তো হলো! কিসের আওয়াজ সেটা? অনেকক্ষণ ধরে খাটের ওপর বসে থাকলেন তিনি। তারপর মশারি ঠেলে খাটের নিচ থেকে স্যান্ডেল জোড়া কোনোমতে পায়ে গলিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। টর্চটা নিয়ে হেঁটে চলে এলেন পাশের রুমে। এখানে তাঁর দুই ছেলে সাইফ এবং আবিদ ঘুমায়। এই রুমে ওদের দু’ভাইয়ের জন্য আলাদা আলাদা পড়ার টেবিলের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন তিনি। পড়াশোনা আর রাতের খাবার সেরে ওরা ওদের খাটে ঘুমিয়ে পড়ে। দু’ভাই একই খাটে ঘুমায়। ঘুমাবার আগে এসে আদনান সাহেবই ছেলেদের বিছানা ঠিকঠাক করে দেন। তারপর কিছুক্ষণ গল্পসল্প করে একসাথে রাতের খাবার খান। খাওয়া শেষ হলেই ঘুমোতে চলে যায় ওরা দু’ভাই। তখন আদনান সাহেব একা একা কিছুক্ষণ বসে থাকেন সোফায়। পত্র-পত্রিকায় চোখ বুলান। তারপর সেলফ থেকে নামিয়ে কিছুক্ষণ বই পড়েন। এ সময় হাতে একটা সিগারেট জ¦লতে থাকে তাঁর। অবশ্য সিগারেটে টান দেয়ার সুযোগ তিনি কমই পান। একসময় হাতের সিগারেটটি পুড়ে শেষ হয়ে গেলে, আরেকটি সিগারেট ধরান তিনি। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা তার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। চোখে ঘুম চাপলেই কেবল তিনি ঘুমোতে যান। ঘুম থেকে ওঠেন সকালে আলো ফোটার আগেই। তারপর ছেলেদের জাগান। কখনো তিনি নিজে আবার কখনো বড়ো ছেলে সাইফকে দোকানে পাঠান নাস্তা আনতে। তারপর তিন বাপ-ছেলে একসাথে নাস্তা করেন। সাইফ এবং আবিদ কিছুক্ষণ পড়াশোনা করে ইশকুলের প্রস্তুতি নেয়। আদনান সাহেব নিজেই গিয়ে দিয়ে আসেন তাদের। আবার ছুটির সময় গিয়ে নিয়েও আসেন। এই ফাঁকে তিনি তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘লিজেন্ড এন্টারপ্রাইজ’ এ বসেন। এই প্রতিষ্ঠানই তাঁর একমাত্র আয়ের মাধ্যম। অবশ্য এরচে বেশি কিছুও প্রত্যাশা করেন না তিনি।
আজ শুধু ব্যতিক্রম হলো। কিন্তু কিসের আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙলো তাঁর! ভাবলেন ছেলেদের রুমটা একটু দেখে নিয়ে বাইরে বেরোবেন। ঘরের চতুর্পাশটা একটু দেখে এসে ঘুমাবেন। অবশ্য ভোর হতেও খুব বেশি বাকি নেই। তবু চোখে যেহেতু ঘুম লেগে আছে- একটু ঘুমাতে হবে। হেমন্তের একেবারে শেষ দিক হওয়ায় ভোর রাতে খানিকটা শীতই লাগে। সাইফ আর আবিদ দু’ভাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। রাতে কখন যেন আবিদের কম্বলটা খাটের নিচে পড়ে গেছে। শীত লাগায় সে ঢুকে পড়েছে সাইফের কম্বলের ভেতর। কিন্তু ঠিকমতো কারো গায়েই কম্বল নেই। দু’জনেরই যে শীত লাগছে, তা বুঝতে পেরে কেঁপে উঠলেন আদনান সাহেব। আহা, ছেলে দু’টা তাহলে শীতে কষ্ট পাচ্ছে! খাটের নিচে পড়ে যাওয়া ছোট ছেলে আবিদের কম্বলটা তুলে তার গায়ের ওপর দিয়ে দিলেন এবং সাইফের গায়েও ঠিকঠাক মতো কম্বল দিয়ে দিলেন। এসময় ঘুমের ভেতরই ‘এই যা-যাহ’ বলে হাত-পা ছুঁড়ে আরো কী যেন বলে পাশ ফিরলো আবিদ। এতে গা থেকে আবারও কম্বলটা সরে গেলো তার। একটু শব্দ করেই নিশ্বাস ছাড়লেন আদনান সাহেব। তারপর বিড়বিড় করে বলে উঠলেন- ‘দ্যাখো তো পাজি ছেলেটার অবস্থা।’ আবারও কম্বলটা গায়ে তুলে দিয়ে পরম স্নেহে আবিদের কপালে একটা চুমু দিলেন তিনি। এই ছেলে দুটোকে বুকে আগলে রেখে দিন কাটছে তার। ছোট ছেলে আবিদের জন্মের পরপরই হাসপাতালে মারা যান তার স্ত্রী ইসমত জাহান। স্ত্রীর মৃত্যুর পর তার হাসি-আনন্দের একমাত্র সাথি এই দুই ছেলে। যখনই একা একা থাকেন স্ত্রীর কথা মনে পড়ে তার। কতো যত্ন করে সংসারটা গুছিয়ে রাখতেন এই বেচারি। আবিদ পেটে আসার আগ পর্যন্ত তাদের একমাত্র সন্তান সাইফের সাথে মেতে থাকতো সারাক্ষণ।
যুদ্ধের এক বছর আগে, অর্থাৎ উনিশশো সত্তর সালের গোড়ার দিকে বিয়ে হয় তাদের। বাবা আবিদুল করিম ছিলেন শেখ মুজিবের একজন খাঁটি ভক্ত এবং তুখোড় রাজনীতিকর্মী। তিনি তাঁর শৈশবের বন্ধু ও রাজনৈতিক সহকর্মী আতিকুল হকের সুন্দরী ও সুশিক্ষিতা মেয়ে ইসমত জাহানকে নিজের ছেলে ইশতিয়াক আদনানের জন্য প্রস্তাব করেন। মেয়ের বাবা, অর্থাৎ আতিকুল হক সাহেব কিছুটা অমত করেছিলেন। তার যুক্তি ছিলো- আত্মীয়তা করলে বন্ধুত্ব হালকা হয়ে যায়। তিনি চান তাদের দু’জনের বন্ধুত্ব ইহকাল-পরকাল দুই কালেই টিকে থাকুক। কিন্তু আবিদুল করিম সাহেব, মানে ইশতিয়াক আদনানের বাবা তার সেই যুক্তি মানেননি। ফলত এক শুভদিনে ইশতিয়াক আদনানের সাথে আতিকুল হকের কন্যা ইসমত জাহানের বিয়ে সম্পন্ন হয়ে যায়। বিয়ের পর একদিন দুই বেহাই মিলে গল্প করছিলেন আদনান সাহেবদের কাচারি ঘরে বসে। কথার একফাঁকে আদনানের বাবা আবিদুল করিম বললেন- ‘দ্যাখেন, খোদার কী মর্জি। আমার ছেলের নাম এবং বৌমার নামের প্রথম শব্দেই মিল। আমার ছেলের নাম ইশতিয়াক আদনান আর আপনার মেয়ের নাম ইসমত জাহান। এই কথা শুনে আতিকুল হক হো-হো করে হেসে উঠলেন। তারপর বললেন- ‘আপনি শুধু এইখানে মিল খুঁইজা পাইলেন? অথচ দ্যাখেন, আমাদের দু’জনের নামের আদ্যক্ষরেও কি সুন্দর মিল- আবিদুল করিম আর আতিকুল হক! হা হা হা।’
‘সবই খোদার মর্জি।’
একাত্তর সাল। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক টালমাটাল সময়। একটি জাতিরাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের সময়। এ দেশের মানুষ সর্বাত্মক মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে যুদ্ধ। বিশ্ব মানচিত্রে জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ। বাংলাদেশ। এই জন্ম প্রক্রিয়ায় পদ্মা-মেঘনা-যমুনার বহমান স্রোতে যে রক্ত স্রোত মিশেছে তাকে আরো বেগবান করতে অসংখ্য শহীদের সাথে শাহাদাতের নজরানা দিয়েছে আদনানের পুরো পরিবারও। মা, বড়োভাই ও তার স্ত্রী এবং বাবা আবিদুল করিম শহীদ হন।
ছোট ছেলে আবিদের নামটি রাখা হয়েছিলো স্ত্রী ইসমত জাহানের পছন্দেই। জন্মের আগে তিনি একদিন আদনান সাহেবকে বলেছিলেন- ‘দ্যাখো, আমাদের যদি একটি ছেলে হয় তাহলে তার নাম রাখতে চাই আমার শহীদ শ্বশুরের নামে।’ কথাটি শুনেই অনেকটা চমকে উঠেছিলেন আদনান সাহেব।
‘অ্যাঁ, বাবার নামে নাম রাখবো?’
‘হ্যাঁ, কেন নয়? আমার ইচ্ছে- ছেলেরা বড়ো হয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের মতো সাহসী আর দেশপ্রেমিক হয়ে বেড়ে উঠুক। মানুষের মতো মানুষ হোক তারা। তাছাড়া আমার শশুরের যে আত্মত্যাগ, তা যদি আমাদের সন্তানরা ধারণ করতে না পারে তাহলে আমরাও তো ব্যর্থ।’
‘আর যদি মেয়ে হয়?’
‘তাহলে তুমি যা খুশি রেখো।’
‘আচ্ছা তোমার দেখছি মেয়ের ব্যাপারে কোনো আগ্রহই নেই।’
‘নেই কে বললো! আছে তো। কিন্তু আমার মন বলছে আমাদের ছেলেই হবে।’
‘কিন্তু আমাদের তো এক ছেলে আছেই। এখন আল্লাহর কাছে একটি মেয়েই চাই আমি। আর আমাকে তো মেয়ের বাবাও হতে হবে।’
‘আচ্ছা তা হবে। এখন বলো, ছেলের বাবা হলে তুমি কি অখুশি হবে?’
‘অমন হয় বুঝি কেউ? আল্লাহ যা দিবেন, তাতেই খুশি।’
‘সেটাই। তবে আল্লাহ যদি আমাদের ছেলে দেন তাহলে শশুর আব্বার নামে নাম রাখবো।’
‘আচ্ছা।’
শুধু আচ্ছা বলে সেদিন কেমন উদাস হয়ে গিয়েছিলেন জনাব ইশতিয়াক আদনান। মনের পর্দায় তখন ভাসছিলো তার শহীদ পিতার অসংখ্য স্মৃতি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বাবা আবিদুল করিমের সাথে তিনি এবং তার বড়ো ভাই সাইফ আনোয়ার যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তখন তারা দু’ভাইই বিয়ে করেছেন। বড়ো ভাইয়ের বিয়ের দু’বছর পরই বিয়ে করেছেন তিনি। পঁচিশে মার্চের পর দেশে যখন পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হলো, চতুর্দিকে যখন বাড়িঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছিলো হানাদাররা, লুণ্ঠন, হত্যা ও ধর্ষণের মতো ঘটনা যখন একের পর ঘটতে থাকলো, তখন বাবার পরামর্শেই বড়োভাই সাইফ আনোয়ার মা এবং ভাবীকে কলকাতার উদ্দেশ্যে একটি যাত্রীবাহী বোটে তুলে দিয়েছিলেন। সেই যাওয়াই শেষ। কথা ছিলো, সীমানা পার হয়ে ওপারের মুক্তিযোদ্ধা চৌকিতে পৌঁছতে পারলেই নিরাপদে কলকাতা থাকার জন্য যে বাড়ি নির্ধারিত করে রাখা আছে, সেখানে যেতে পারবেন। কিন্তু তারা সেই মুক্তিযোদ্ধা চৌকিতে পৌঁছতে পারেননি। খোঁজখবর নিয়েও আর সঠিক কোনো তথ্য মেলেনি। মিলেছে যা তার অধিকাংশই গুজব। কেউ বলেছে- পাকবাহিনীর উপর্যুপরি গুলিবর্ষণে নৌকার অপরাপর যাত্রীদের সাথে তারাও মারা পড়েছেন। তাদের কারো লাশও নাকি পাওয়া যায়নি। আবার কেউ কেউ বলেছেন- নদী পার হয়ে তারা নাকি কলকাতায় পৌঁছতে পেরেছিলেন। কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি তো হলো। দেশের সব জায়গা এবং কলকাতারও সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তাঁদের আর সন্ধান মেলেনি।
পুরো নয় মাস ধরে যুদ্ধ চলতে থাকে। দেশের প্রতিটি এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা তাঁদের সম্মিলিত প্রতিরোধ সংগ্রাম অব্যাহত রাখলে কোণঠাসা ও পর্যুদস্ত হতে থাকে পাক বাহিনী। সীমান্তবর্তী একটি এলাকায় যুদ্ধের এক পর্যায়ে আদনানের বড়োভাই সাইফ আনোয়ার শাহাদাত বরণ করলে তাকে সেখানেই কবরস্থ করা হয়। কিন্তু আজ অবধি সেই কবরের চিহ্নও খুঁজে পাননি তারা। যুদ্ধের একেবারে শেষদিকে শহীদ হন বাবা আবিদুল করিম। তাঁকে পাকসেনারা যুদ্ধাবস্থায় বন্দি করে। তারপর দু’দিন ক্যাম্পে রেখে নির্যাতন করে নদীর পাড়ে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছিলো। মৃত্যুর আগেও তাঁর মুখ দিয়ে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ শব্দটি তারা উচ্চারণ করাতে পারেনি। বরং তিনি তাঁর সর্বশক্তি দিয়ে ‘জয় বাংলা’ উচ্চারণ করেছিলেন।
শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবা আবিদুল করিমের সেই আত্মত্যাগের কথা মনে পড়লে এখনো শিহরিত ও রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠেন ইশতিয়াক আদনান। নিজেকে একই সাথে একজন মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা বাবার সন্তান এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধার ছোটভাই ভাবতে গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে তার। নিজের স্ত্রী যতদিন বেঁচেছিলেন- ততদিন তার সাথে বাপ-ভাইয়ের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও শাহাদাতের কথা বলে গল্প করতেন। সে সময় তার চোখ অনেকটা ঝাপসা হয়ে আসতো অবাধ্য চোখের জলে। এখন এই গল্প তিনি তার ছেলেদের সাথে করেন। এ সময় মাঝে মাঝে তিনি বলেন- ‘বাবা সাইফ, তোমার নাম রেখেছি আমার শ্রদ্ধেয় শহীদ বড়োভাই’র নামে। মানে, তোমার জ্যাঠার নামে। আর বাবা আবিদ, তোমার আম্মুর শেষ ইচ্ছে অনুযায়ী তোমার নাম রেখেছি আমার শহীদ বাবার নামে। মানে, তোমার দাদাভাই’র নামে। তোমরা দু’জনই বড়ো হয়ে এই নামের মর্যাদা রাখবে।’
বড়ো দরজার সিটকিনি খুলে ছেলেদের রুম থেকে বেরিয়ে উঠোনে চলে এলেন তিনি। বাইরে ঠাণ্ডা বাতাস বইছে। আর ক’দিন পরেই শুরু হবে পুরোদমে শীত। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বের হওয়াই উচিত ছিলো। টর্চের আলো ফেলে বাইরের অবস্থাটা দেখতে থাকলেন এবং বড়ো বড়ো করে গলা খাঁকারি দিলেন কয়েকবার। ধীরে ধীরে ঘরের চতুর্পাশটাও ঘুরে এলেন। এতক্ষণে চোখ থেকে ঘুমের ভাবও অনেকটা কমে গেছে। না, কোনো কিছুই বোঝা গেলো না। আওয়াজের কোনো উৎসও খুঁজে পেলেন না তিনি। শুধু নিশাচর কিছু পাখি-পতঙ্গের ডাকার শব্দ কানে আসছে। মাঝে মাঝে দু’য়েকটি বাদুড় উড়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক। শেষরাতের কুয়াশায় আচ্ছাদিত নিয়ন বাতিগুলো জেগে আছে নিশাচরদের সাথে। সারাদিন কতো কতো যানবাহনের চলাচল, মানুষের কোলাহল, রাজমিস্ত্রিদের কাজকারবার-ভাঙচুর ইত্যাদি চলে; তখন বিচিত্র ধরনের শব্দে কান ঝালাপালা হলেও রাতের এই সময়টা সবকিছু থেকে মুক্ত। যেন কয়েকটা ঘণ্টার জন্য একটু জিরিয়ে নেয় সদা ব্যস্ত এই শহরটিও। আর তখন এর পাহারায় জেগে থাকে এইসব নিয়ন বাতি। উদোম গায়ে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে চলে এলেন তিনি। তারপর সিটকিনিটা তুলে দিয়ে খাটের উপর এসে কম্বল টেনে শুয়ে পড়লেন এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
আজ ঘুমটা একটু বেশিই হয়ে গেছে। ঘুম ভাঙলো আবিদের ডাকাডাকিতে। ‘আব্বু আব্বু, এই আব্বু ওঠো! আমাদের ইশকুলে যাবার সময় হয়েছে তো।’ আদনান সাহেব একরাশ অলসতা নিয়ে জেগে উঠলেন। তারপর চোখ কচলাতে কচলাতে জিজ্ঞেস করলেন- ‘এই, সাইফ কোথায়? ও রেডি হয়েছে?’
‘জ্বি আব্বু। ভাইয়াও রেডি হয়েছে।’
‘ও। তা তোমাদের নাস্তা করা হয়েছে?’
‘জি, হয়েছে। তুমি ওঠো, নাস্তা করে নাও।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
আদনান সাহেব হাতমুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে এলেন। তারপর নাস্তা খেতে বসলেন। আজ একা একা খাচ্ছেন তিনি। ইশকুল ড্রেস পরে ব্যাগ নিয়ে সাইফ এবং আবিদ বসে আছে সামনের চেয়ারে। সাইফ এবার ক্লাস নাইনে উঠেছে। আর আবিদ সবেমাত্র ক্লাস ফাইভে। দু’জনের ইশকুল আলাদা হলেও পাশাপাশি। আদনান সাহেবের জন্য এটা একটা সুবিধা যে, তিনি ওদের দু’জনকেই একসাথে ইশকুলে দিয়ে আসতে পারেন। দুপুরে ছুটি হয়ে যায় আবিদের। তখন গিয়ে তাকে আবার নিয়ে আসেন তিনি। আর বিকেলে ছুটি হয় সাইফের। তাকে সে সময় একা একাই ফিরতে হয় বাসায়। অবশ্য তার বয়সী অনেক ছেলেই একা একা ইশকুলে যাওয়া-আসা করে। আদনান সাহেবও চান ছেলেরা একা একা চলাফেরা করতে শিখুক। কিন্তু তাই বলে তো আর অবাধ স্বাধীনতাও দেয়া যায় না। তাছাড়া এই দুটো ছেলে ছাড়া তার আপনজন বলতেও আর কে আছে! তিনি তাই সব সময়ই ছেলেদের চোখে চোখে রাখতে চান। কোনো কারণে অনেকক্ষণ কাউকে না দেখলে অস্থির হয়ে ওঠেন। আর ছেলেরাও তাদের বাবাকে ভীষণ রকম ভালোবাসে।
ঘুম থেকে উঠে এ মুহূর্তে কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না আদনান সাহেবের। তবু একটা পরাটা কোনোমতে খেয়ে উঠলেন। তারপর ছেলেদের নিয়ে ইশকুলের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন।
ছেলেদের ইশকুলে দিয়ে এসে প্রতিদিনের মতো ‘লিজেন্ড এন্টারপ্রাইজ’ এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছেন আদনান সাহেব। এই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি তার বাসা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দক্ষিণে। বাজারের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে রাস্তার পূর্ব পাশে। এই বাজার থেকে তার বাড়ি পর্যন্ত একটা পাকা রাস্তা আছে। তবে তা দু’টা গলি ঘুরে অনেকখানি দূর দিয়ে এসেছে বলে তিনি প্রতিদিন কোনাকুনি পথে অর্থাৎ বিলের মধ্য দিয়ে যাওয়া-আসা করেন। খোলা এই বিলটি সরকারি জায়গা। অনেকে দখল খাটাতে চেয়েছে এই বিলে। বিগত আমলে সরকারদলীয় একজন নেতা তো বিলের একটা অংশ দখল করে দোতলা একটি বিল্ডিংও করেছিলেন। কিন্তু সরকার পরিবর্তন হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই তা বুল্ডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে। ধীরে ধীরে আবার সেখানে ঘাস জন্মেছে, বর্ষা মৌসুমে পানি জমেছে; জায়গায় জায়গায় আগাছা হয়ে বিলটা আবার আগের রূপ ফিরে পেয়েছে। শুকনো মৌসুম বলে সকাল-বিকাল ছেলেরা খেলাধুলা নিয়ে মেতে থাকে এই বিলে। সাইফ আর আবিদও ইশকুল থেকে এসে খেলতে নেমে যায় বিলে। সন্ধ্যাতক খেলে তারাও। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও তারা কারো থেকে পিছিয়ে না। বরং অন্যদের চেয়ে খানিকটা এগিয়েই থাকে। এ মৌসুমে বিলে অনেক গান-বাজনা, এমনকি ওয়াজ মাহফিলও হয়। বৈশাখী মেলা বসে কোনো কোনো বছর। আদনান সাহেব প্রতিদিন এই বিলের ওপর দিয়েই পথ সহজ হবে বিবেচনায় যাওয়া-আসা করেন। শুধু তিনি নন, তার মতো আরো অনেকেই।
সূর্যের আলো তখনো তেঁতে ওঠেনি বলে ঘাসের ওপর জমা শিশির বিন্দুগুলো প্রায় অবিকল থেকে গেছে। পা ভিজে যাচ্ছে আদনান সাহেবের। তিনি হেঁটে হেঁটে বিলের একেবারে মাঝামাঝি চলে এলেন। হঠাৎ একটা জায়গায় এসে ভ্যাবাচেকা খেয়ে দু’কদম পিছিয়ে এলেন তিনি। ভয়ে তার পুরো শরীর কাঁটা দিয়ে উঠলো। যেখানে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন তার মাত্র কয়েক গজ সামনেই অনেকখানি রক্ত জমে আছে। এই রক্ত যে কোনো চতুষ্পদ জন্তুর নয়, তা সহজেই বুঝতে পারলেন তিনি। কয়েকবার এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। জায়গাটা দেখতে থাকলেন আরো পরিষ্কারভাবে। রক্তের দাগ কিছুদূর পর্যন্ত চলে গেছে। বুঝাই যাচ্ছে যে, একটা মানুষকে টেনেহিঁচড়ে নেয়া হয়েছে। কিন্তু তারপর…? তারপর আর ভাবতে পারছেন না তিনি। মাথা ঝিমঝিম করছে। হঠাৎ কেন যেন ভয়ে কলিজা শুকিয়ে আসছে তার। নাহ, এখানে আর এক মুহূর্তও থাকা চলে না। এখন তার বুঝতে বাকি নেই যে গত রাতে কিসের আওয়াজে তার ঘুম ভেঙেছিলো।
দুই.
লিজেন্ড এন্টারপ্রাইজের এক পাশে গ্লাস করা একটি নির্দিষ্ট রুমে বসেন আদনান সাহেব। এটি তার অফিস। সব ব্যবসায়িক পার্টির সাথে এখানে বসেই তিনি আলাপ-আলোচনা করেন। রুমটি রুচিসম্মতভাবে নিজের মতো করে সাজিয়ে নিয়েছেন তিনি। দেয়ালে বড়ো পর্দার টেলিভিশন লাগানো। একপাশে একটি বিশুদ্ধ পানির ফিল্টার এবং কয়েকটি ফুলের টব রাখা। দু’টি টবে আছে রজনীগন্ধা গাছ। টবগুলো তিনি প্রতিদিন অফিসে এসে আলো-বাতাস লাগানোর জন্য বাইরে নিয়ে রাখেন। সামনের টেবিলে প্রতিদিনের খবরের কাগজগুলো থাকে। টেবিলের সামনে তিনটি চেয়ার রাখা। যেখানে ব্যবসায়িক পার্টির কেউ এলে বসতে পারে। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি অফিসে এসেছেন। কিন্তু আজ তার নিজের কাছে বড়ই অস্বস্তি লাগছে। মাথা থেকে কিছুতেই বিলের মাঝে দেখা জমাটবাঁধা মনুষ্য রক্তের দৃশ্য তাড়াতে পারছেন না। একটু পর পর বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ছাড়ছেন তিনি। এরইমধ্যে টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা রেখে গেলো কর্মচারী ছেলেটি। তিনি কাপ তুলে ঠোঁটে ছোঁয়ালেন। তারপর নিতান্ত অলসভাবে বাঁ হাতে রিমোট চাপলেন। টেলিভিশনের পর্দা ওপেন হলো। সেখানে ভারতীয় একটা সিরিয়াল চলছে। আদনান সাহেব রিমোট চেপে সেটা বদলালেন। এলো বাংলাদেশি একটা চ্যানেল। সেখানে চলছে একটা বাংলা ছবি। রিমোট টেবিলে রেখে তিনি অলসভাবে দেখতে থাকলেন ছবিটি। নায়ক মান্নার অ্যাকশন চলছে। একটি দালাল চক্রের সাথে ফাইট করছেন তিনি। এমতাবস্থায় পুলিশ এসে গেলে ইন্সপেক্টরের সাথে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে গ্রেফতার হন তিনি। আদনান সাহেবের কাছে ভালো লাগছে না কিছুই। তিনি আবারও রিমোট চাপতে যাবেন, এমন সময় তার চোখ আটকে গেলো টেলিভিশনের স্ক্রুলে। সেখানে একটি খবর বারবার আসছে। বলা হচ্ছে- ‘গত রাতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে জড়িয়ে অজ্ঞাতনামা এক সন্ত্রাসী নিহত হয়। তবে বিরোধী দল দাবি করছে, যুবকটি তাদের দলের একজন সক্রিয় কর্মী এবং সে নিতান্তই নিরীহ ও দেশপ্রেমিক।’ এখানে খবর শুধু এটুকুই আসছে। আদনান সাহেব একপ্রকার দমবন্ধ করে চ্যানেল পাল্টাতে থাকলেন। উদ্দেশ্য খবরটির বিস্তারিত জানা। অন্য একটি চ্যানেলে স্থির হলেন তিনি। সেখানে চলছে ‘অর্থ ও বাণিজ্য সংবাদ’। নিচের স্ক্রুলে ব্রেকিং নিউজ হচ্ছে। হ্যাঁ, এখানেও খবরটি আসছে। পুলিশের সাথে কথিত সংঘর্ষ যেখানে হয়েছে, সেই এলাকার নামসহ বলছে এখানে। মানে, ঘটনাটি এই বিলেই ঘটেছে, যার আলামত কিছুক্ষণ আগে তিনি দেখে এসেছেন। দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস ছেড়ে টেলিভিশন অফ করে দেন তিনি।
ঘড়ির দিকে তাকালেন জনাব আদনান। বেলা প্রায় সোয়া বারোটা বেজে গেছে। আর পনেরো মিনিট পরই আবিদের ইশকুল ছুটি হবে। এখনই ইশকুলে যাওয়া দরকার। অফিস থেকে বের হতে হতে দোকানের ম্যানেজারকে বললেন- ‘কাশেম, আমি বেরোচ্ছি। আজ আর দোকানে আসবো না। মনটা বেশ খারাপ। তুমি বরং সময়মতো সবকিছু গুছিয়ে রেখে দোকান বন্ধ করে যেও। আর আজ বোধ হয় দু’শো বস্তা সিমেন্ট আসার কথা ছিলো। এ ব্যাপারে কিছু কি বলেছে ওরা?’
‘না বলেনি। আমি ফোন করেছিলাম।’
‘কিছু বলেনি?’
‘বলেছে সিমেন্ট পাঠাতে পাঠাতে আগামী রোববার পর্যন্ত লেগে যাবে।’
‘কেন, অতো দেরি কেন?’
‘ওরা কোনোবারই তো কথা ঠিক রাখেনি। আমি বলছিলাম কী…!’
‘কী, বলো।’
‘ওদের থেকে আমরা আর মাল নেবো না। বরং ওরা ছাড়া তো আরো অনেক ব্র্যান্ড আছে, সেগুলো থেকে নিতে পারি। কী বলেন?’
‘কিন্তু ওই ব্র্যান্ডের তো কাস্টমার আছে।’
‘তা আছে। কিন্তু…।’
‘আর কোনো কিন্তু নয়। শোনো, ওদের সাথেও আমাদের সম্পর্ক ভালো থাকা উচিত। তুমি যোগাযোগ রাখো। দু’চারদিন লেট হলে হোক। আর তোমার অন্য ব্র্যান্ডের আইডিয়াটা ঠিক আছে। তুমি বরং আরো দু’য়েকটি ভালো ব্র্যান্ডের সাথে যোগাযোগ করো।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি করবো।’
‘ওকে। ভালো থেকো।’
ইশকুলের কাছাকাছি এসেই ছুটির ঘণ্টা শোনা গেলো। আদনান সাহেব তাড়াহুড়ো করে গিয়ে গেট থেকে একটু দূরে দাঁড়ালেন। গেটে অনেক মহিলা অভিভাবক ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই তাদের সন্তানদের খুঁজছেন। আবার কেউ কেউ তাদের বাচ্চাদের সাথে নিয়ে বাসার দিকে ফিরছেন। আদনান সাহেব সন্ধানী দৃষ্টি মেলে মনে মনে আবিদকে খুঁজছেন। এরই মধ্যে পেছন থেকে এসে ‘আব্বু’ বলে জড়িয়ে ধরলো আবিদ। আবিদকে পেয়ে মাথার চুল নেড়ে দিয়ে আদর করলেন তিনি। তারপর বললেন- ‘চলো আমরা বাসায় যাই।’
‘আব্বু, আজ না আমাদের ইশকুলে একজন নতুন ম্যাডাম এসেছেন। আমাদের অঙ্ক পড়াবেন নাকি। জানো আব্বু, কি লম্বা ম্যাডাম! অনেক আদর করে করে কথা বলেন।’
‘আচ্ছা! তা কী নাম তোমাদের নতুন ম্যাডামের? বলেছেন কিছু?’
‘হুম, কী যেন নাম, কী যেন নাম…। তাঁর নামের শেষে ‘খানম’ শব্দটি আছে। কিন্তু কী খানম যেন, ভুলে গেছি।’
‘হা হা হা। পাগল ছেলে।’
‘আব্বু।’
‘উ, বলো।’
‘তোমাকে আজ কেমন যেন দেখাচ্ছে। ভাত খাওনি?’
‘এই শোনো ছেলের কথা। তোমাকে রেখে খাই কখনো?’
‘আব্বু।’
‘বলো।’
‘তুমি আমাদের এতো ভালোবাসো কেন, আমাদের মা নেই বলে?’
‘কিসব বলছো বাবা? এতো কথা কই শিখেছো? সব বাবাই তাদের সন্তানদের ভালোবাসেন। আর সবার মা কি চিরদিন বেঁচে থাকে? সবাই একদিন মারা যাবে। যারা ভালো মানুষ, তারা আল্লাহর কাছে অনেক ভালো থাকবেন। জান্নাতে থাকবেন। তোমার আম্মু ভালো ছিলেন খুব। আম্মুর জন্য দোয়া করবে সবসময়, বুঝেছো?’
‘জি আব্বু।’
‘আজ দুপুরে খেয়েদেয়ে একটা লম্বা ঘুম দিবা। তারপর বিকেলে যখন তোমার সাইফ ভাইয়া ইশকুল থেকে আসবে, তখন তোমাদের দু’জনকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো। ওকে?’
‘জি।’
‘যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। ভাত খাবে।’
কথা বলতে বলতে বাপ-ছেলে দু’জন বাসায় চলে এলো। তারপর দুপুরের ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লো তারা। একটু পরেই আবিদ গভীর ঘুমে ডুবে গেলো। ঘুম আসছে না আদনান সাহেবের। অথচ গত রাতেও সেই শব্দ শুনে জেগে যাওয়ার পর থেকে আর ভালো ঘুম হয়নি। ঘুমিয়েছে বেলা ওঠার পরেও। কিন্তু ভালো ঘুম বা সাউন্ড স্লিপ বলতে যা বুঝায় তা হয়নি। এখনো ঘুম আসছে না। চোখ জালা করছে। আদনান সাহেবের মাথায় ঘুরছে গত রাতের ব্যাপারটি। বিলের মাঝে যে কথিত সংঘর্ষ হয়েছে এবং একজন তরুণ মারা গেছে সে বিষয়টি ঘুরছে। কী ভয়ঙ্কর রাজনীতি চলছে দেশটাতে! অঘটনঘটনপটিয়সী এদেশের সরকার। নির্দোষ মানুষকে হত্যা করার পর আবার তার নামেই মামলা ঠুকতে বিবেকে বাধে না তাদের। আদনান সাহেবের মাথায় এ মুহূর্তে আরেকটা জিনিস খেলছে। সেটা হলো, আবিদের কথাটা। সে বলেছে- ‘তুমি আমাদের এতো ভালোবাসো কেন, আমাদের মা নেই বলে?’ কথাটা মাথায় আসতেই চোখ দু’টো ঝাপসা হয়ে এলো তার। যেন হেমন্তের বিবাগী বাতাসে ভেসে আসছে দূরাগত কোনো কান্নার ধ্বনি। আর তা বুকের ভেতর আছড়ে পড়ে জোয়ারের জলের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি। কেউ শুনে ফেলতে পারে, আশঙ্কায় পাশ ফিরে বালিশে মুখ গুঁজে কান্নার গমক ঠেকাতে চেষ্টা করলেন। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর এই দশ বছরে কোনোদিন তিনি ভালো করে একবারও কাঁদতে পারেননি। যেন একটা ভারি পাথর চেপে আছে বুকের ওপর।
বিকেল সাড়ে চারটায় ইশকুল থেকে ফিরলো সাইফ। তার পুরো নাম সাইফ ইশমাম। জ্যাঠা সাইফ আনোয়ারের নামের প্রথম শব্দ যুক্ত করে রাখা হয়েছে। আবিদের পুরো নাম আবিদ ইমতিয়াজ। তার নামের প্রথম শব্দটি নেয়া হয়েছে তার দাদা আবিদুল করিমের নাম থেকে। সাইফ দেখলো, বাবা এবং ছোটোভাই আবিদ ঘুমোচ্ছে। সে মনে মনে ভাবলো, ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া করে আশিকদের বাড়িতে যাবে। আশিক সাইফের চেয়ে ছোটো। আবিদের ক্লাসমেট সে। খুবই মেধাবী স্টুডেন্ট। খেলাধুলা এবং আচার-আচরণ সবকিছুতেই ভালো সে। ‘আদর্শ ছেলে’ যাকে বলে। বিকেলে আশিকদের ওখানে খেলাধুলা হয়। তাদের উঠোন অনেক প্রশস্ত হওয়ায় সেখানে প্রতিদিন অনেক ছেলেরা আসে ক্রিকেট খেলতে। সাইফ ভালো খেলে। বিশেষ করে বোলিংয়ে সে ওস্তাদ! তাছাড়া ব্যাটিংয়েও খারাপ না। এলাকায় বা ইশকুলে যতোগুলো ম্যাচ হয়, তার প্রায় প্রত্যেকটিতেই সাইফ খেলে। বড়োদের সাথেও সে খেলেছিলো এক-দু’বার। সব মিলে খেলায় তার সুনাম আছে। ঘরের সেলফের পুরো একটা তাকজুড়ে শুধু ট্রফি সাজানো। রানার্স আপ, ম্যান অব দ্য ম্যাচ, চ্যাম্পিয়ন এইসব।
সাইফ ভাত খেয়ে ওঠার প্রায় সাথে সাথেই বাবা তাকে ডাকলেন- ‘সাইফ।’
‘জি আব্বু।’
‘এদিকে এসো।’
সাইফ কাছে এসে দাঁড়াতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন- ‘আজও খেলতে যাচ্ছো?’
‘জি, যেতে চেয়েছিলাম। কেন আব্বু?’
‘না মানে, আমি চেয়েছিলাম তোমাদের দু’জনকে নিয়ে আজ এক জায়গায় যাবো।’
‘কোথায় যাবে আব্বু?’
‘নাহ, তাতো বলছি না। তবে না গেলে মিস করবে খুব।’
‘হুম, চালাকি হচ্ছে! আমি অবশ্যই তোমার সাথে যাচ্ছি। এই আবিদ, ওঠ ওঠ।’ আবিদ আড়মোড় ভেঙে জেগে উঠলো।
বিকেলে জনাব ইশতিয়াক আদনান তার দু’ছেলেকে সাথে নিয়ে বেড়াতে বের হলেন। তার উদ্দেশ্য মূলত নিজের মনটা একটু হালকা করা এবং ছেলেদেরকে একটু সময় দেয়া। এ ছাড়া ছেলেরা বিকেলে খেলতে গিয়ে বা কোনোভাবেই যেন বিলের সেই রক্ত দেখতে না পায়, সেটাও একটা উদ্দেশ্য। রক্ত দেখে অভ্যস্ত না হোক তারা। মানবিক হয়ে বেড়ে উঠুক। অসভ্যতা ও বর্বরতার ক্লেদ তাদের কিশোর মনে কোনো দাগ না কাটুক, তাই চান তিনি। আজকাল খবর পাওয়া যায় ইশকুল পড়–য়া কিশোররাও নানা অপকর্মে জড়িয়ে যাচ্ছে। এমনকি গুম-খুনের মতো ঘটনাও ঘটছে কিশোরদের সাথে। তিনি ছেলেদের সাথে বিভিন্ন গল্প করতে করতে হাঁটছেন। বাজারে এসে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উদ্দেশ্যে একটা সিএনজি রিজার্ভ করে তাতে তিন বাপ-ছেলে চেপে বসলেন।
তিন.
বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে। একেবারে মস্তিষ্ক অবশ করার মতো। যেন একদল বুনো বাতাস বনের সুবাস নিয়ে ভুল করে ঢুকে পড়েছে এই জাদুর শহরে। এমনটা কী কেবল তাঁর কাছেই লাগছে? কে জানে, হতেও তো পারে! মাঝে মাঝে নির্মল বাতাসে এরকম গন্ধ ভেসে বেড়ায়। গলিপথের ডান দিকে অবশ্য একটা জবা ফুল গাছে অজ¯্র রক্তজবা ফুটে আছে। কিন্তু জবাফুল তো সুবাস ছড়ায় না এভাবে। হয়তো কাছেই কোথাও রজনীগন্ধাও ফুটে থাকবে, অথবা ঠিক বুনো ফুলের গন্ধই। একা একা হাঁটছে এক যুবক। নাম আহমেদ শাওকী। এই শহরে তখনো তার চেনাজানা লোক প্রায় ছিলো না বললেই চলে। দীর্ঘ বেকারত্বের পর একটি জাতীয় দৈনিকে জয়েন করেছে মাত্র। শহরে থাকার জন্য আপাতত একটা রুম দরকার। তারপর ধীরে ধীরে গুছিয়ে নিতে পারবে সবকিছু। প্রেসক্লাবের একটা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এবং এই শহরে আপাতত ওঠার জন্য একটা রুমের সন্ধান নেয়ার প্ল্যান করেই বাড়ি থেকে এসেছে। তার বন্ধু সাংবাদিক শফিক একটা রুমের কথা বলেছিলো। খোঁজ নিয়ে জানলো, সেটাও ভাড়া হয়ে গেছে। এখন অন্য কোথাও দেখতে হবে- এই আরকি। বলা বাহুল্য, তার বর্তমান চাকরিটি শফিকের বদান্যতায়ই জুটেছে। টেনেটুনে কোনোমতে মাস্টার্স শেষ করে টুকটাক লেখালেখি আর টিউশনির মতো মহান ব্রত করেই দিন পার করছিলো। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেখে দেখে কতো জায়গায় যে সিভি জমা দিয়েছে তার হিসেব নেই। সময়মতো কোথাও ডাক পড়ে, আবার কোথাও কোনো হদিসই মেলে না। অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ডাক পড়ার মানে হলো ভাইভা বোর্ড। আর ভাইভা বোর্ড মানেই সে বাদ! তার ধারণা, সমস্যা কিছুটা তার সার্টিফিকেটেও; একটাতেও ফার্স্ট ডিভিশন নেই। তা ছাড়া ওখানে যেসব প্রশ্ন করে তাও আজগুবি ধরনের। এই যেমন, একবার তাকে প্রশ্ন করেছে- ‘বলুন তো স্বাধীনতার ঘোষক কে?’ সে তো পুরোই থ! বুঝতে পারলো, এখানে একটা রাজনৈতিক প্যাঁচ আছে। কারণ অতি সম্প্রতি এই জিনিসটা নিয়ে রিট হয়েছে এবং তা এখন আদালতে ডিসিশনের অপেক্ষায় ঝুলে আছে। সে আমতা আমতা করে কোনোমতে জবাব দেবার একটা চিন্তা করতেই অনেকটা খেঁকিয়ে উঠলেন প্রশ্নকর্তা- ‘স্বাধীনতার ঘোষক কে সেইটাই জানেন না মিয়া, আসছেন চাকরি করতে! ওকে, যান আপনি, যান। পরেরজনকে আসতে বলেন।’ বুঝা গেলো না উনি কোন পার্টির লোক। হাল ছেড়ে বেরিয়ে আসলো অফিস থেকে। নিশ্চিত এখানেও হবে না। সেই মফস্বল থেকে ঢাকা পর্যন্ত আসা-যাওয়ার টাকাটাই গচ্ছা। তবে এসব ভেবে কাজ নেই তার। চাকরি পেতে হলে আরো অনেক সিভি জমা দিতে হবে। ভাইভা দিতে হবে, এটা সে বোঝে। তার অভিভাবকরাও এতে খুব একটা অখুশি নন। তাদের কথা হলো- যাক, ছেলেটা চেষ্টা তো করছে অন্তত। অবশ্য বাবা তাকে মাঝে মাঝে একটুআধটু বকাঝকা করেন। করুক। বাবারা অমন করেন।
একটা ভাইভা বোর্ড পেয়েছিলো, যেটা তার ভাষায়- অসাধারণ। একদম ব্যতিক্রম ছিলো। সেখানে যিনি তাকে প্রশ্ন করেছিলেন তিনি আধা বয়সী একজন অফিসার। তবে উপস্থিত সবার চেয়ে অনেক সিনিয়র, তা বুঝা যাচ্ছিলো। শাওকী দরজা ঠেলে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই অফিসার তাকে বসতে বললেন। সে বসামাত্র তিনি জানতে চাইলেন- ‘কেমন আছেন শাওকী সাহেব?’ ভাইভা বোর্ডে এই প্রথম কোনো অফিসার তাকে শাওকী সাহেব বলে সম্বোধন করলেন।
‘ভালো। আপনি কেমন আছেন স্যার?’ বিনীত ভঙ্গিতে পাল্টা জানতে চাইলো আহমেদ শাওকী।
‘ভালো আছি। এখন কী করছেন আপনি? মানে, কোথাও কোনো জবটব করছেন?’
‘জি-না স্যার।’
‘ও। তা বিয়েটিয়ে করেছেন?’
‘জি-না।’
‘আচ্ছা ভালো কথা। তো প্রেমটেম চলছে?’
এই প্রশ্নের সে কী জবাব দেবে বুঝতে পারলো না। তবু মুখে একটা কৃত্রিম হাসি টেনে জবাবে বললো-
‘জি-না, স্যার।’
‘ধুর মিয়া! এখন পর্যন্ত বিয়ে করেননি, চাকরি নেই তারপর আবার প্রেমটেমও নেই। কেমন কথা! আচ্ছা, ফ্যামেলিতে কে কে আছে আপনার?’
সে বাবা-মা, ভাই-বোন সবার কথা বললো। সবকিছু মনোযোগ দিয়ে শুনলেন অফিসার। তারপর খানিকক্ষণ চুপ থাকলেন। এই ফাঁকে শাওকী ভাবছে-তার কোনো প্রেম নেই, কথাটা বলা কি ঠিক হলো? নয়নার সাথে তার যে সম্পর্ক তাকে কি প্রেম বলা যায় না? কে জানে, হয়তো যায়। নয়নার খোঁজখবর না নিয়ে তো সে থাকতে পারে না! আবার দেখা হলে তাকে কী কী বলতে হবে তাও খুঁজে পায় না। অদ্ভুত সুন্দর করে কথা বলে মেয়েটা। একদম রেডিও-টেলিভিশনে উপস্থাপিকা মেয়েগুলো যেভাবে কথা বলে, ঠিক সেইভাবে। না, ঠিক সেইভাবে বলাও ঠিক নয়। আরো সুন্দর করে কথা বলে নয়না। এরই মধ্যে অফিসার তাকে আরেকটি প্রশ্ন করলেন-
‘আচ্ছা শাওকী সাহেব, বলুন তো কেমন বেতন হলে আপনার চলবে; মানে কতো টাকা বেতন হলে আপনি আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করতে পারবেন?’
‘অফিসের নিয়মানুযায়ী এই পোস্টে যতো টাকা বেতন ধার্য আছে, আপাতত তাতেই আমি জয়েন করতে চাই।’
‘এই পোস্টে কতো টাকা স্যালারি দেয়া হয় তা আপনি জানেন না। তা ছাড়া যা দেয়া হয়, তাতে আপনার পোষাবে কি না সেটাও তো ব্যাপার। শুনুন ইয়াংম্যান, আপনার যোগ্যতাই আপনাকে যথাযোগ্য আসনে অধিষ্ঠিত করবে। কনফিডেন্স রাখুন। এটা আপনার প্রতি করুণা নয়। শাওকী, নিজেকে নিজে সম্মান করুন। আপনি একজন গ্র্যাজুয়েট পার্সন, সেটা মনে রাখা উচিত আপনার। নিজেকে যদি নিজে সম্মান করতে না জানেন, তাহলে পৃথিবীর কে আর আপনাকে সম্মান করবে? ওকে। সি ইউ অ্যাগেইন।’
একদম তাজ্জব বনে গেলো শাওকী! প্রায় হয়ে যাওয়া চাকরিটাও বুঝি আর হলো না। তবে তার ধারণা, ওই অফিসে ইন্টারভিউ দিয়ে খুব বড়ো একটা শিক্ষা পেয়েছে সে। সারাজীবনই মানুষ শিখতে থাকে, কিন্তু তার কতোটুকু কাজে লাগাতে পারে বাস্তব জীবনে? সে পারে না। হয়তো অনেকেই পারেন। তবে নিজেকে সম্মান করার শিক্ষাটা নিজের জীবনে কাজে লাগাবার একটা প্রতিজ্ঞা করে ফেললো শাওকী। দেখা যাক, কদ্দুর কী!
এর মাঝে একবার সরকারি চাকরির জন্যও ট্রাই করেছিলো। ফলাফল শূন্য। মাঝে দুই দফায় তার প্রায় সত্তর হাজার টাকা জলে গেলো! এখন যে ঘুষ ছাড়া কোনো চাকরি হয় না সেটা তার জানাই ছিলো। সেই মোতাবেকই ঘুষ দিয়েছিলো। হয়নি যেহেতু, কী আর করা! একবার ভাবলো, চাকরি-বাকরির চিন্তা বাদ দিয়ে টুকটাক একটা ব্যবসা করবে। মোটামুটি প্ল্যান-পরিকল্পনাও পাকা হয়ে গেছে। এমন একটা সময় বন্ধু শফিকের কাছ থেকে এই পত্রিকাটিতে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে যোগদানের প্রস্তাব পায় সে। প্রস্তাব কথাটা এ জন্য আসে যে, শফিক তাকে এমনভাবে বলেছিলো যেন চাকরিটা ওর হাতেই! যদিও তাকে এবারও ভাইভা ফেস করতে হয়েছে। তবে এই যাত্রায় প্রায় দশ-বারোজন আবেদনকারীর মধ্যে কেমন করে যেন টিকে গেছে সে। এখন এই চাকরির জন্যই তাকে শহরে থাকতে হবে।
কথা ছিলো বাসা খোঁজার এই কাজে শফিকও তাকে হেল্প করবে। কিন্তু তার কী যেন এক ব্যস্ততা থাকায় তাকে একাই ঘুরে বেড়াতে হচ্ছে। ঠিক ঘুরে বেড়াচ্ছে না, বাসা খুঁজছে! একা একা বেশ কয়েকটা গলি ঘুরে দেখলো। তারপর মেইন রোডের প্রায় পাশেরই একটি পাঁচতলা ভবনের সামনে এসে দাঁড়ালো সে। ভবনের দেয়ালে এবং স্টিলের গেটে বিভিন্ন ধরনের পোস্টার সাঁটানো। কোনোটা পুরনো, কোনোটা ছেঁড়া আবার কোনো কোনোটা একদম নতুন। বেশির ভাগ পোস্টারই রাজনৈতিক পার্টির অথবা কোনো ওয়াজ মাহফিলের। আবার ‘চিকন স্বাস্থ্য মোটা করুন; এক ফাইলেই যথেষ্ট’ টাইপের পোস্টারও আছে। এর মধ্যে দেয়ালের এক কোনায় একসাথে লাগানো হাতে লিখা কয়েকটি পোস্টারে চোখ আটকে গেলো তার।
বড়ো বড়ো অক্ষরে লিখা ‘গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সুবিধাসহ ফ্ল্যাট বাসায় একজন রুমমেট আবশ্যক। ছাত্রদের অগ্রাধিকার দেয়া হবে’। নিচে একটি মোবাইল নাম্বারও দেয়া আছে। একটা নতুন আইডিয়া মাথায় এলো শাওকীর। ভাবলো, একা একটা রুম নিয়ে থাকার চেয়ে কারো সাথে রুমমেট হয়ে থাকাটাই তো বেশ ভালো! এতে বড়ো অঙ্কের একটা খরচও বেঁচে যাবে। কিন্তু ঝামেলা হলো, এখানে মাত্র একজন রুমমেট চেয়েছে। তা আবার ছাত্র হলে অগ্রাধিকার! ওই একজন যদি তারা ইতোমধ্যেই পেয়ে গিয়ে থাকেন তাহলে তাকে আবার নতুন বাসাই খুঁজে বের করতে হবে। উপায় নেই। অবশ্য পোস্টারে দেয়া নাম্বারটিতে একবার কল দিয়ে দেখা উচিত। যেই ভাবা সেই কাজ। পকেট থেকে মোবাইল বের করে নাম্বার টিপতে লাগলো সে। রিং পড়লো। ফোন রিসিভ করলো একজন। ঘুম জড়ানো কণ্ঠে জানতে চাইলো- ‘হ্যালো, কে বলছেন?’
‘জি, আমি আহমেদ শাওকী বলছিলাম।’
‘কাকে চাচ্ছেন?’
‘আসলে আমি পোস্টার থেকে এই নাম্বারটি নিয়েছি। মানে, একজন রুমমেট আবশ্যক বলে যে পোস্টার লাগানো হয়েছে সেখান থেকে।’
‘কে থাকবে, আপনি নিজেই থাকতে চান?’
‘হ্যাঁ, আমার জন্যই। আমি কি দেখা করতে পারি?’
‘অভিয়াসলি!’
‘কখন আসবো আমি?’
‘সন্ধ্যার পরে আসেন ভাই।’
‘আচ্ছা, ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ ভাই, এখন রাখি তাহলে। সন্ধ্যায় আসবো।’
‘ওকে। থ্যাঙ্ক ইউ।’
সন্ধ্যায়, ঠিক মাগরিবের পরপরই গিয়ে মেসের দরজায় কলিং বেল টিপলো আহমেদ শাওকী। অপেক্ষা করতে হলো না; এক তরুণ এসে দরজা খুলে দিলো। ‘স্লামালেকুম। কাকে চাচ্ছেন?’ সালাম দিতে অনভ্যস্ত ইশকুল-কলেজের ছাত্ররা এইভাবে সালাম দেয়। এই ছেলেটিও তার ডান হাতটি তুলে প্রায় কপালের কাছে নিয়ে বিনয়ের সাথে সালাম দিলো। শাওকী জবাব দিলো, ‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আমি আহমেদ শাওকী।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মিরাজ ভাইয়া আপনার কথাই বলেছিলেন। আসুন, ভেতরে আসুন।’ ছেলেটিকে অনুসরণ করে ভেতরে গিয়ে একটি চেয়ারে বসলো সে। দু’য়েক মিনিটের মধ্যেই আরেকজন তরুণ এসে সালাম দিয়ে হ্যাশেক করার জন্য হাত বাড়ালো। সেও হাত বাড়িয়ে হ্যাশেক করতেই তরুণটি নিজের পরিচয় দিলো- ‘আমি আবদুল্লাহ মিরাজ। অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান। আপনি তো শাওকী ভাই?’
‘হ্যাঁ, আমি আহমেদ শাওকী। কেমন আছেন?’
‘ভালো। আপনি?’
‘আমিও ভালো।’
‘আপনি নিজেই যেহেতু থাকবেন, সুবিধা-অসুবিধা সব বলে নিলেই ভালো হয়। আর আপনি কি ছাত্র?’
‘না, আমি সাংবাদিক। নতুন জয়েন করেছি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা, তাহলে তো খুব ভালো। আপনার কাছ থেকে অনেক কিছু শেখা যাবে। তবে আমাদের এখানে সমস্যা হলো, আমরা সবাই ছাত্র। এক্ষেত্রে আপনার সমস্যা হতে পারে।’ শাওকী খেয়াল করলো, সে যে অছাত্র এটাকে তারা সমস্যা মনে করছে না, বরং ওরা ছাত্র হওয়ায় তার কোনো সমস্যা হবে কিনা, সেটাই কনফার্ম হতে চাচ্ছে। তার মানে একজন রুমমেট ওদের চাই। ব্যাপারটা তার কাছে ভালোই লাগলো। বললো- ‘না, আমার এতে সমস্যা নেই। বরং আমি অছাত্র হওয়ায় আপনাদের কোনো সমস্যা হবে কি না, সেটাই ভাবছিলাম।’
‘না, আমাদেরও কোনো সমস্যা নেই। তাহলে তো খুবই ভালো হয়। আপনি কখন উঠতে চাচ্ছেন?’
‘কালই।’
‘আচ্ছা, উঠতে পারবেন সমস্যা হবে না।’
সব বিষয়ে কথাবার্তা চূড়ান্ত করে মেস থেকে বেরিয়ে এলো সে। নিচে নেমেই ফোন করলো বন্ধু শফিককে। শফিক ফোন রিসিভ করতেই জিজ্ঞেস করলো- ‘কিরে শফিক, কই তুই?’
‘হ্যাঁ শাওকী, আমি বাইকে আছি। রাউজান থেকে ফিরছি। তুই কোথায় আছিস?’
‘এইতো শহরেই আছি।’
‘ও আচ্ছা, এখনো আছিস তাহলে? ওয়েট কর কিছুক্ষণ, আমি আসছি।’
‘নারে, এখন ওয়েট করলে গাড়ি পাবো না। তুই বরং আয়, কাল দেখা হচ্ছে আরকি। আমি মেসে সিট পেয়েছি, কালই উঠতে চাচ্ছি।’
‘আচ্ছা, ওকে। ভালো থাকিস। গাড়িতে আছি তো, কথা বোঝা যাচ্ছে না।’
‘আচ্ছা, ভালো থাক।’
মেসে কথাবার্তা বলে কনফার্ম হওয়ার পর সেই রাতের খাগড়াছড়িগামী শেষ বাসে চড়ে বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হয় শাওকী। মূলত এ কারণেই শফিকের জন্য ওয়েট করলো না সে।
চার.
প্রায় ত্রিশ বছর বয়সে ইসমত জাহান মারা যান। তখন আদনান সাহেবের বয়স ছিলো তেত্রিশ বছর। স্ত্রীর ইন্তেকালের পর সন্তানদের পড়াশোনা করানো আর তাদেরকে নৈতিকভাবে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই হয়ে ওঠে তার জীবনের একমাত্র আকর্ষণের বস্তু। স্ত্রীর অনুপস্থিতিতে একজন বিবাহিত ও বয়স্ক পুরুষের জীবনে যে নিঃসঙ্গতা অনুভূত হয়, তা সত্ত্বেও দুই ছেলেকে নিয়ে তার বাবার আমলের পুরোনো দোতলা বাড়িটা আড়ম্বরপূর্ণ একটি নগরীর চেয়ে কম নয়। তাদেরকে নিয়ে বেশ আনন্দেই যাচ্ছে দিনকাল। দেখতে দেখতে কেটে গেছে আরো বিশটি বছর। আদনান সাহেবের বয়সও এখন তিপ্পান্ন বছর। ক্লাস নাইনে-টেন থেকেই তার চুল পাকলেও, এই বয়সে তা আরো অনেক বেড়েছে। মাথার প্রায় দুই তৃতীয়াংশ চুলই সাদা হয়ে গেছে। অবশ্য এই বৃদ্ধ বয়সে চুল পাকা বিষয়ে আদনান সাহেবের বিশেষ কোনো আগ্রহ নেই।
সাইফ মাস্টার্স শেষ করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছে। আর আবিদও এখন আর সেই ছোট্ট বালকটি নেই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে সে। তার সাবজেক্ট গণিত। কিন্তু গণিত তার সাবজেক্ট হলেও ছবি আঁকা, গান করা আর প্রচুর দেশি-বিদেশি বই-পুস্তক পড়া তার অন্যতম একটি নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। সারাক্ষণ গুণগুণ করে গান করে আর ছবি আঁকে। একবার বাড়ির পাশের বস্তিতে থাকা অসহায় অছিউদ্দিন বুড়োর ছবি এঁকেছিলো সে। সেই ছবিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রদর্শনী থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কিনেছিলেন একজন শিল্পপতি। সেবার অনেক নাম হয়েছিলো তার। সেই ছবি দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে আবিদ। এলাকার লোকজনের কাছেও অনেক সুনাম হয় তার। এমনিতেও এলাকায় তাদের দু’ভাইয়ের প্রশংসা আছে লোক মুখে। লোকেরা কথায় কথায় ইদানীং তাদের দু’জনের কথা বলেন। বলেন- ‘আল্লাহ ছেলে দিয়েছে আদনান ভাইকে। এরকম ছেলে হাজারেও হয় না।’ এসব প্রশংসাবাক্য অনেক শুনেছেন আদনান সাহেব। মনে মনে দারুণ তৃপ্তিবোধ করেন তিনি। ছেলেদের দেখলে চক্ষু শীতল হয় তার। আবিদ যেবার ছবি বিক্রি করে পঞ্চাশ হাজার টাকা পেলো, সেই পুরো টাকাটাই এনে সে দিয়েছিলো আদনান সাহেবের হাতে। তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন- ‘এ টাকা দিয়ে তুমি কী করতে চাও?’ একগাল হেসে দিয়ে আবিদ বললো- ‘আমি আবার কী করবো আব্বু! কিছু করার থাকলে তুমিই করো।’
‘আচ্ছা। তাহলে আমার পরামর্শ শোনো।’ বললেন আদনান সাহেব।
‘বলো, আব্বু।’
‘আমার পরামর্শ হলো, তুমি যেহেতু অছিউদ্দিনের দুরবস্থার ছবি এঁকেছো এবং ভালো ছবি এঁকেছো। আর সেই ছবিই বিক্রি করে এই টাকা পেয়েছো। সুতরাং আমার পরামর্শ হলো- তুমি এই পুরো টাকাটা অছিউদ্দিন বুড়োকেই দিয়ে দাও। উনি অসহায় মানুষ। পেয়ে অনেক খুশি হবেন। কি পারবে?’
আবিদ কোনো জবাব না দিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। তারপর ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো সে। আদনান সাহেবের চোখ দিয়েও পানি নেমে এলো। এক পর্যায়ে আবিদ বললো- ‘আমি জানতাম আব্বু, তুমি এরকমই বলবে। আচ্ছা আব্বু তুমি এতো ভালো কেন?’
‘পাগল ছেলে। সব বাবারাই ভালো, বুঝেছো?’
বুড়ো অছিউদ্দিনকে পরদিন বাড়িতে দুপুরের খাবার খেতে দাওয়াত দেন আদনান সাহেব। খাওয়াদাওয়া শেষে তার খোঁজখবর নেন এবং ছেলের আঁকা ছবি বিক্রির টাকাটা বুড়োর হাতে তুলে দেন। বুড়ো আবেগে জড়িয়ে ধরেন আদনান সাহেবকে। আবিদের মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে দোয়া করেন। বুড়ো জানান টাকার অভাবে তিনি তার মেয়েটাকে বিয়ে দিতে পারছেন না। এবার একটা চেষ্টা নেবেন।
এ ঘটনা ছাইচাপা থাকেনি। বুড়োর মেয়ের বিয়ের পর পরই জানাজানি হয়ে যায়। আবিদদের পরিবারের সুনাম তখন পুরো এলাকায়। এলাকার মুরব্বিরা আবিদ এবং সাইফকে রাস্তায় দেখলে খোঁজখবর নেন। ইশকুল-কলেজ পড়–য়া ছেলেরা আজকাল আবিদকে ফলো করার চেষ্টা করে। এই এলাকায় আরো একটা ছেলে আছে আশিক নামে। যার সাথে একদম ছোটোবেলা থেকেই আবিদের নিবিড় বন্ধুত্ব। খেলাধুলা-পড়াশোনা সবই একসাথে। আশিকও এখন ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। আইন অনুষদে দ্বিতীয় বর্ষে।
শীতের প্রায় শেষদিকের এক সন্ধ্যায় আবিদদের বাড়ির গেটের সাথে ঝুলানো জংধরা একটি সাইনবোর্ডে ‘টু-লেট’ লেখা দেখে কলিং বেল টেপে এক তরুণী। নাম নয়না। পুরো নাম নয়না চাকমা। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালায় তাদের বাড়ি। এবার চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে সে। সমাজবিজ্ঞানে। হলে উঠতে পারতো, কিন্তু ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ আর অনৈতিক কাজে ছাত্রীহলের মেয়েদের ব্যবহার করার কথা জানতে পেরে সেদিকে আগ্রহহীন হয়ে পড়ে সে। নিজেকে বাঁচিয়ে চলার যে নারীসুলভ প্রবৃত্তি তাই তাকে শহরকেন্দ্রিক থাকতে আগ্রহী করে তোলে। এ ছাড়া শহরে থাকার আরো একটি কারণ হলো, এখানে থেকে দু’য়েকটি টিউশনি পাবারও সম্ভাবনা আছে। বাড়ি থেকে টাকা এনে পড়াশোনা চালানো কঠিন। কলিংবেল টেপার পর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না তাকে। আবিদের বাবা আদনান সাহেব এসে গেট খুললেন। নয়না তার স্বভাবমতো নমস্কার বলতে গিয়ে আটকে গেলো। তারপর বললো, স্লামালেকুম আঙ্কেল।
‘ঠিক আছে ঠিক আছে, ওয়া আলাইকুম…। কাকে চাচ্ছো?’
‘বাসা ভাড়া হবে?’ সরাসরি জানতে চাইলো নয়না।
‘হুঁ, হবে। কিন্তু কিন্তু…।’
‘কিন্তু কী!’
‘না মানে, বাসা তো খালি আছে। কিন্তু আমরা ব্যাচেলরদের কাছে বাসা ভাড়া দেই না। তুমি নিশ্চয় স্টুডেন্ট?’
‘হ্যাঁ, স্টুডেন্ট।’
‘একা থাকবে নাকি আরো কেউ আছে?’
‘না আঙ্কেল, একাই থাকবো। যদি আপনার এখানে হয় আরকি। তা ছাড়া আমি অনেক জায়গায় বাসা খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত হয়ে গেছি।’
‘আচ্ছা শোনো, তুমি কিছু মনে করো না মা। একটা সিঙ্গেল রুম খালি আছে। ওটার পাশের রুমে আরেকটা মেয়ে থাকে। মেয়েটা অসহায়। পারলে ভাড়া দেয়, নইলে দেয় না। এই অবস্থা। তার পাশের রুমটা খালি আছে। তোমরা দুই মেয়ে মানুষ পাশাপাশি থাকবে, সমস্যা হবে না। আমাদের যে ক’টা বাসা ভাড়া হচ্ছে, তার সব ক’টাতেই ফ্যামিলি। কেবল ওই রুমটা ছাড়া। চাইলে তুমি বাসাটা দেখতে পারো। তোমরা দু’জন পাশাপাশি থাকলে মন্দ হবে না। তুমি বলেই বলছি। ছেলে মানুষ হলে তো দিতাম না। দেখতে পারো।’
‘আচ্ছা, তাই দেখি।’
‘এসো।’
আদনান সাহেবের পিছুপিছু হেঁটে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলো নয়না। পুরো বাড়ি জুড়ে অনেকরকম ফলের গাছ। সিঁড়ির কাছের টবে তরতাজা কতেক ফুল গাছও রয়েছে। পুরনো দেয়াল হলেও মানানসই সব জায়গায় শোভা পাচ্ছে হাতে আঁকা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি। ছবির নিচে ইংরেজি-বাংলায় শিল্পীর নাম সাইন করা আছে ‘আবিদ’। তার মানে, শিল্পী আবিদের আঁকা। মনে মনে এই গুণী শিল্পীর প্রশংসা করলো নয়না। সর্বত্রই বাড়ির মানুষজনের শিল্পিত রুচিবোধের ছাপ দেখে সে মুগ্ধ।
দোতলা বিল্ডিংয়ের উপরতলার পশ্চিম পাশের রুমটার তালা খুলে দিলেন আদনান সাহেব। তারপর লাইট জ্বালালেন। অন্ধকার রুমটা মুহূর্তেই আলোকিত হয়ে উঠলে ভেতরে উঁকি মারলো নয়না। নিজের অজান্তেই সে বলে উঠলো ‘ওয়াও! অনেক সুন্দর তো।’ হেসে ফেললেন আদনান সাহেব। বললেন- ‘ভালো করে দ্যাখো মা। তুমি একা মানুষ থাকবে। সব মিলিয়ে হয় কিনা দ্যাখো।’
‘রুম তো দারুণ! কিন্তু আমার এখানে থাকা হবে না।’
‘কেন, ভাড়ার কথা ভাবছো? এই রুমটা খালিই পড়ে আছে। এটার পাশের রুমটাতে ওই মেয়েটা থাকে। অসহায় মেয়ে। এ জন্য আর কোনো লোককে এই রুমটা দিইনি। তোমার পছন্দ হলে উঠে যাও। পাঁচ হাজার টাকা ভাড়া। তোমার বাজেট কতো শুনি!’
‘আমার বাজেটে হবে না আঙ্কেল। অনেক কম।’
সব ভাড়াটিই এসে কম টাকায় ভাড়া পেতে চায়। নির্ধারিত দাম থেকে দরাদরি করে কমাতে চায়। কিন্তু নয়নার চেহারায় বিশ^স্ততার ছাপ দেখতে পেয়ে আদনান সাহেব বললেন- ‘শোনো মেয়ে, এই চিটাগাং শহরে কোনো ছাত্রী হোস্টেলেও যদি ওঠো, আড়াই-তিন হাজারের কমে পাবে না। এ রুমটা তোমার পছন্দ হলে উঠে যাও। তুমি স্রেফ তিন হাজার টাকাই দিও।’
‘কী যে বলেন আঙ্কেল, এই রুম তো অনেক সুন্দর। তা ছাড়া দু’তিন জন অনায়াসে থাকতে পারবে। আমাকে দিলে তো আপনার লস হবে।’
‘বললাম তো, রুমটা খালি পড়ে থাকে। তুমি মেয়ে মানুষ, তোমার দিকটাই ভাবছি। দ্যাখো, ভেবে দ্যাখো।’
নয়না এক মুহূর্ত কী যেন ভাবলো। তারপর বললো, ‘হ্যাঁ আঙ্কেল, আমি এই রুমে উঠবো। রুমটা আমার ভালো লেগেছে। সবচে বড়ো কথা, আপনি আমাকে মা ডেকে কথা বলেছেন। আমার বাবা নেই, শুধু মা আছেন। আমি যতোদিন এই রুমে থাকবো, নিজের বাবার কাছে আছি বলেই মনে করবো।’ সত্যি সত্যিই আদনান সাহেবের সাথে কথা বলে প্রথম থেকেই নয়নার ভালো লেগেছে। শেষ পর্যন্ত কেমন যেন একটা বাবাসুলভ অস্তিত্বের সমর্থন পেয়ে আর কোনোদিক চিন্তা না করেই এই রুমে ওঠার ব্যাপারে পাকা সিদ্ধান্ত নেয় সে। এ পর্যায়ে আদনান সাহেব বললেন- ‘আচ্ছা ঠিক আছে, উঠে যাও। কালই উঠবে?’
‘না, আজই উঠবো।’
‘অ্যাঁ, আজই?’
‘জি আঙ্কেল। আমার বেডিংপত্র এক ফ্রেন্ডের বাসায় রেখে এসেছি। কাছেই, নিয়ে আসতে সমস্যা হবে না। আর আমি আজই যদি রুমে উঠতে না পারি, তাহলে থাকবো কোথায়? ছেলে বন্ধুর বাসায় তো আমি থাকতে পারবো না। যদিও শাওকী অনেক ভালো ছেলে।’
‘এ ক’দিন কোথায় থেকেছো?’
‘বাড়িতে। গত পরশু আমার ছোটোভাইটা এসে বেডিংপত্র রেখে গেছে। বাসা খোঁজাখুঁজি করেছি, পাইনি। আজও না পেলে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে বাস ধরতে হতো।’
‘আচ্ছা, বিছানাপত্র নিয়ে এসো তাহলে। এই নাও, চাবি রাখো।’
রাত সাড়ে আটটা। আবিদ সবেমাত্র বাসায় এলো। এসেই ক্লান্ত শরীরটাকে একপ্রকার বিছানায় ছুঁড়ে দিয়ে বিশ্রাম করলো কিছুক্ষণ। তারপর জামাকাপড় পরিবর্তন করে ওয়াশরুমে ঢুকলো। এদিকে গেটে পরপর দু’বার কলিংবেল বাজলে আদনান সাহেব ডাকলেন- ‘বাবা আবিদ, দ্যাখো তো গেটে কে আছে।’ আবিদ ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরোলো। আজ একটা খেলা ছিলো। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট। আজকের ম্যাচে দুই উইকেটে হেরে গেছে তাদের দল। আবিদ একাই তিনটি উইকেট নিয়েছে। কিন্তু তারপরও ভালো হয়নি শেষটা। মাথার ভেতর আজকের খেলাটা ঘুরছে। একটুর জন্য তাদের জেতা হলো না। মুন্নার ব্যাটিংটা আরেকটু ভালো হলেই হতো। শেষ দু’ওভারের আটটি বলেই সে কোনো রান করতে পারেনি। অবশ্য তাদের দল সেমি-ফাইনালে কোয়ালিফাই করেছে ইতোমধ্যেই। নানা জল্পনা-কল্পনা করতে করতে গেটের চাবিটা নিয়ে বেরোলো আবিদ। গেট খুলতেই সে দু’জন শক্ত-সামর্থ্য এবং দারুণ স্মার্ট ধরনের লোককে দেখতে পেলো। একজন যুবক এবং অন্যজন যুবতী। তবে দু’জনের চেহারা দেখে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে যে, ছেলেটা বাঙালি এবং মেয়েটা উপজাতি। মেয়েটার হাতে একটা কালো স্যুটকেস। আর সঙ্গী যুবকটির পাশে রাখা বড়োসড়ো একটা বস্তা। বাহির থেকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, ওর মধ্যে বইপুস্তক এবং কাঁথা-কাপড় থাকবে। এই অচেনা যুগলকে দেখে খানিকটা অবাক হলো আবিদ। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মেয়েটা কথা বললো- ‘জি, আমি নয়না। নয়না চাকমা।’
‘আর আমি শাওকী।’ বললো সাথের যুবকটি।
‘আমি এই বাড়ির নতুন ভাড়াটি। দোতলার সিঙ্গেল রুমটা নিয়েছি। আঙ্কেল অবশ্য আগামীকাল উঠতে বলেছিলেন। কিন্তু আমাকে আজই উঠতে হচ্ছে। উনি কি বাসায় আছেন?’ বললো নয়না।
‘হ্যাঁ, আছেন। আচ্ছা এক মিনিট। আপনারা একটু দাঁড়ান। আমি আব্বুকে ডাকছি।’
‘আবিদ, ওদেরকে ভেতরে নিয়ে এসো।’ বলতে বলতে পেছন থেকে এগিয়ে এলেন আদনান সাহেব। আবিদ এবার নিশ্চিত হলো- এরা তাদের নতুন ভাড়াটি। আর এও বুঝলো, মেয়েটিই মূলত তাদের ভাড়াটি এবং সাথের যুবকটি এসেছে তাকে হেল্প করতে।
আদনান সাহেব হাতে টর্চ নিয়ে তাদের সাথে সাথে দোতলায় উঠলেন। রুমের ভেতরে জিনিসপাতি রেখে তার দিকে তাকিয়ে নয়না বললো- ‘আঙ্কেল, এ আমার বন্ধু শাওকী।’
‘ও তাই! আচ্ছা আচ্ছা। কোথায় থাকো তুমি? পড়াশোনা করো বুঝি?’
‘জি-না আঙ্কেল। পড়াশোনা শেষ করেছি। একটা পত্রিকায় কাজ করি। আর বাসা নন্দনকানন।’
‘আচ্ছা আচ্ছা। খুব ভালো। সাংবাদিক তাহলে?’
‘জি।’
‘খুব ভালো। তোমাদের বাড়ি কোথায় পড়েছে?’
‘মাটিরাঙ্গা।’
‘বহুবার গিয়েছি। ইউসুফ চৌধুরীকে চেনো?’
‘হ্যাঁ, ইউসুফ চেয়ারম্যান।’
‘উনার সাথে কতো চা-কফি খেয়েছি। আড্ডা দিয়েছি।’ এরপর তিনি নয়নার দিকে তাকিয়ে বললেন- ‘তোমার রুম গুছিয়ে নাও, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। একটু শুয়েছিলাম। গেটে আবিদকে পাঠিয়ে ভাবলাম, তুমি এসেছো হয়তো। পরে ভাবলাম, ও তো তোমাদের চিনবে না। তাই বেরোলাম। তোমরা কথা বলো। আমি আসি।’ শাওকীর দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বেরিয়ে গেলেন আদনান সাহেব।
পাঁচ.
রুমটা ভালোভাবে ঝাড়ামোছা করে সবকিছু গুছিয়ে রাখতে প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সময় লেগে গেলো। সবকিছু গোছানো শেষে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে তারা দু’জন ফ্লোরে বিছানা পেতে বসলো। ‘রুমটা কেমন হলো বলো তো।’ শাওকীর দিকে তাকিয়ে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হেসে জানতে চাইলো নয়না।
‘ভালো।’
‘তোমার বলার ঢং দেখে মনে হচ্ছে, তুমি আমার প্রতি রেগে আছো। আচ্ছা, একটা কথা বলবো?’
‘বলো।’ নির্বিকারভাবে বললো শাওকী।
‘তুমি তমালকে চেনো?’
‘হ্যাঁ, চিনি তো। তমাল চাকমা।’
‘কিভাবে চেনো?’
‘চিনি একভাবে। কিন্তু হঠাৎ তার প্রসঙ্গ এলো কেন?’
‘আমাদের ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হয়েছে সে। বললো তোমাকে নাকি সে চেনে।’
‘আমাকে চেনে- ভালো কথা। সেটা তোমাকে বললো কেন?’
‘সাংবাদিকদের এই একটা দোষ। শুধু খোঁচানো।’ এটুকু বলে হাসলো নয়না। তারপর আবার বললো- ‘আমার সাথে তোমাকে দেখেছে বলে জানতে চেয়েছে যে, তোমার সাথে আমার পরিচয় হলো কিভাবে?’
‘তা তুমি কী বললে?’ এবার নয়নার দিকে ফিরলো সে।
‘তমালও চালাক ছেলে। তোমার মতো শুধু খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে প্রশ্ন করে।’
‘তারপর?’
‘তারপর আর কী? পরিচয় কিভাবে হলো সেটা বললাম।’
‘সবটা বলেছো?’
‘না। ওভাবে বলিনি। কিছুটা বানিয়েও বলেছি।’
‘ও। আমি ভাবছিলাম, সবটাই হুবহু বললে কিনা।’
‘হা হা হা।’ হাসলো নয়না।
শাওকীর মনে পড়লো এখন থেকে তিন বছর পূর্বের কথা। যেভাবে নয়না এবং তমালের সাথে তার পরিচয় ঘটে। এক্ষেত্রে নয়নার সাথে সম্পর্ক হওয়াটা ছিলো অনেকটা নাটকীয় ধরনের, যা তাকে অনেকখানি কুখ্যাতি এনে দিয়েছিলো সে যেখানেই যেতো, লোকেরা ওই এক কথাই জানতে চাইতো তার কাছে- কিরে শাওকী, তুই নাকি চাকমা মেয়ের সাথে প্রেম করিস?’ এর জবাবে কী বলা যায়? মামুলি পরিচয়কে যদি কেউ প্রেম হিসেবে ধরে বসে থাকে, তাহলে কিছু করার থাকে না। তারও ছিলো না। অবস্থা যে এতো দ্রুত বদলাবে সেটা ছিলো তার ধারণার অতীত। ইশকুল পড়–য়া এক পাহাড়ি মেয়ের লাজরক্তিম চেহারা দেখেই যে সে মুগ্ধ হয়েছিলো, তাও সত্য নয়। সত্য হলো নয়নাই এগিয়ে এসেছিলো। অথবা তারা দু’জনই এগিয়ে এসেছিলো পরস্পরের দিকে। নইলে পরিচয়টা এভাবে হয়ে উঠতো কিনা কে জানে। একটি মামুলি দুর্ঘটনা তাদের পরস্পরের সাথে পরিচয় ঘটার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তাদের দু’জনকে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে। এদেশের উপজাতীয় সম্প্রদায়ের ছেলে-মেয়ের সাথে বাঙালি ছেলে-মেয়ের প্রেমের ঘটনা বিরল নয়। অবস্থাটা তারা দু’জনই জানতো। তাদের জানা ছিলো- পার্বত্য এই জনপদের আঞ্চলিক রাজনীতি, রেষারেষি, হিংসা-বিদ্বেষ, গণহত্যা ও শান্তিচুক্তির কথা। তাদের উভয়ের সামাজিক রীতি-নীতি, কৃষ্টি-কালচার- সবই আলাদা। কারো সাথে কারো দূরতম সাদৃশ্যও ছিলো না। তা সত্ত্বেও তাদের সম্পর্ক এগিয়ে যায়। অবশ্য পাহাড়ি উপজাতিরা আজকাল নিজেদের আদিম সংস্কৃতি জলাঞ্জলি দিয়ে এদেশের মূল জনগোষ্ঠী তথা বাঙালিদের সংস্কৃতির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। সুযোগ পেলেই তাদের তরুণীরা বাঙালি ছেলেদের প্রেমে পড়ে যাচ্ছে। ধর্ম পরিবর্তন করে বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হচ্ছে অনেকে। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাদের সমাজ। ভালোবাসায় বিচ্ছেদ ঘটাতে এবং বিবাহোত্তর সংসার ভেঙে দিতে ভিলেনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় একশ্রেণীর যুবক। নিজেদের জাত রক্ষার নামে নির্যাতন চালায় উভয় পরিবারের ওপর। কখনো কখনো তরুণীদের অপহরণ করে ধর্ষণ করে। হত্যার হুমকি দেয়। এসব বাধা উপেক্ষা করেই পাহাড়ি তরুণীরা বাঙালি ছেলেদের বিয়ে করে চলছে। এ হার বাড়ছে বৈ কমছে না।
সেটা ছিলো ঘোর বর্ষার একদিন। সম্ভবত শ্রাবণের প্রথম দিকের রবিবার-সোমবার হবে। আবার মঙ্গলবারও হতে পারে। ঠিক মনে নেই শাওকীর। রশিকপুর বাজার থেকে টিউশনি শেষ করে বাসায় ফিরছিলো সে। তখন জামতলা বাজারের পাশেই ছিলো তার বাসা। বৃষ্টি না থাকলে সাইকেল চালিয়েই সে টিউশনিতে যায়। কিন্তু সেদিন সারাদিন মুষলধারে বৃষ্টি হওয়ায় সাইকেল ছাড়াই হেঁটে হেঁটে গিয়েছে। বৃষ্টির সময় কাদাযুক্ত কাঁচা রাস্তা দিয়ে ছাতা নিয়ে হেঁটে আসতে দ্বিগুণ সময় লাগে। কিছু করার নেই। বৃষ্টির সময় পাহাড়ি পথঘাট বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। সাইকেল চালানোর উপযোগী থাকে না। তারচে বড়ো কথা, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ কাজে সাইকেলে বসে প্যাডেল মেরে ভিজে ভিজে যাওয়ারও কোনো মানে হয় না। তা ছাড়া সাইকেলের দ্রুত ঘূর্ণায়মান চাকা থেকে ভেজা রাস্তার কাদা-জলে কাপড়-চোপড়ও খানিকটা মাখামাখি হয়ে যায়। এজন্যই এই দ্বিচক্রযানটি বৃষ্টিহীন শুকনো রাস্তায় চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে শাওকী। বৃষ্টি থাকলে তাকে টিউশনিতে যেমন হেঁটে যেতে হয়, তেমনি পথও চেঞ্জ করতে হয়। তখন সে বাসা থেকে বের হয়ে শশী হেডম্যান পাড়া দিয়ে রশিকপুর বাজারে চলে যায়। শাওকী যে রুমটাতে পড়ায় তার চাবি সে তমালের কাছে দিয়ে রেখেছে। তমাল সবার আগে আসে এবং এসে রুমটা খুলে দেয়। শাওকীর ধারণা- এই এলাকায় তমালের মতো মেধাবী ছেলে খুব কমই আছে। এই ছেলেটা ক্লাস এইটে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবেই তার ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়ে ভালোভাবে পড়াশোনা করার কথা। কিন্তু প্রায় দু’তিন মাস তার কোনো দেখা-সাক্ষাৎ না পেয়ে একদিন সে নিজেই চাকমা পাড়া গিয়ে হাজির হয়। অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর তাদের বাসার সন্ধান পায় সে। তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করে তমালের ইশকুলে অনুপস্থিতির কথা বলে। কিন্তু সমস্যা হলো, তমাল যে একজন মেধাবী ছেলে এবং তার ইশকুলে যাওয়া জরুরি- এ বিষয়টা তার অশিক্ষিত ও মদ্যপ বাবাকে বুঝাতেই বেগ পাচ্ছিলো।
এ দিকে হয়েছে আরেক কাহিনি। আশপাশের চাকমা ফ্যামেলির যুবা-পুরুষ ও মহিলারা তাকে অবাক হয়ে দেখছে। অনেকে তমালদের উঠোনেও এসে দাঁড়িয়েছে। ব্যাপারটা অস্বস্তিকর ঠেকছিলো শাওকীর কাছে। অগত্যা তমালের বাবা-মা’র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে উঠতে যাবে- এমন সময় তমাল এসে হাজির। সে মাছ ধরতে গিয়েছিলো। উঠোনে শাওকীকে দেখে সে যেন ভূত দেখার মতো অবাক হয়েছে। ওকে দেখে খানিকটা স্বস্তি পেলো শাওকী। এতক্ষণ ওর বাবা-মায়ের সাথে কথাবার্তায় এবং এ পাড়ার আশপাশের লোকজনের কৌতূহল দেখে যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছিলো, তা যেন মুহূর্তেই কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে গেলো।
হেসে তমালকে কাছে ডাকলো শাওকী। তমাল সামনে এসে দাঁড়ালো। চেহারায় কেমন যেন একটা বিষণ্ণতা লেপ্টে আছে ওর। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওকে কেমন অদ্ভুত সুন্দর লাগছে। একটি ভেজা থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে আছে ও। গায়ে ময়লা টি-শার্ট। মাথার চুলগুলো ঈষৎ এলোমেলো হয়ে আছে। নিটোল ফর্সা চেহারার সুঠামদেহী ষোলো-সতেরো বছর বয়সী তমালকে দেখে তার মাঝে মাঝেই মনে হয়- এই ছেলে চাকমা উপজাতি এবং বাঙালিদের চেয়ে আলাদা। এ মুহূর্তে তার বাবা-মা এবং আশপাশের লোকজন তাকিয়ে আছে শাওকীর দিকে। আসলে সে যে একজন বাঙালি সেটাই তাদের কৌতূহলের প্রধান কারণ। আর বাঙালিরাও এসব পাড়ার বাড়িঘরে খুব একটা আসে না। যারা আসে- তারাও মূলত মদ্যপানের তাগিদেই আসে। উপজাতিরা একধরনের কড়া মদ নিজেরা তৈরি করে থাকে। যেটা কম দামে পাওয়া যায় বলে কিছু খেটে খাওয়া দিনমজুর শ্রেণীর বাঙালিরাও চাকমাপাড়ায় যায় সেটা খেতে। বলা বাহুল্য, এ ধরনের বাঙালিদের সাথে উপজাতিদের সম্পর্ক খুবই ভালো।
সবার সামনে তমালকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছিলো না শাওকীর। সাধারণ খোঁজখবর নিয়ে তার বাবা-মা’র কাছ থেকে বিদায় চেয়ে দ্রুত রাস্তায় নেমে পড়ে সে। ভেতরে কেমন যেন একটা ‘পালাই পালাই’ অবস্থা কাজ করছে তার। যেন এ পাড়া থেকে বেরুলেই বাঁচে! রাস্তায় নেমে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা পশ্চিমদিকে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করে আহমেদ শাওকী। তমালদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর পর্যন্ত হেঁটে আসার পর পেছনে কারো পায়ের আওয়াজ শোনা গেলো। থপথপ শব্দ করে দৌড়ে আসছে কেউ। শাওকী পেছনে তাকানোর আগেই শুনলো- ‘স্যার!’ তমালের কণ্ঠ। দাঁড়িয়ে পেছনে তাকালো শাওকী। তমাল হাঁপাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলো- ‘কী ব্যাপার তমাল?’
‘স্যার, আপনি নিশ্চয় আমার খোঁজেই এসেছেন। আসলে…।’ সে পুরোপুরি বলতে পারলো না। গলা কেমন ভারি হয়ে এসেছে তার।
‘হ্যাঁ তমাল, আমি তো তোমার খোঁজেই এসেছি। কিন্তু তুমি অমন হাঁপাচ্ছো কেন?’
‘স্যার…।’ তমাল আবার কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেলো। ছেলেটির বিনয়ে মুগ্ধ হলো শাওকী। বললো- ‘আচ্ছা, তুমি নাকি ইশকুলে যাও না অনেকদিন। তা ছাড়া আমার কাছে পড়তেও তো আসছো না। ব্যাপার কী বলো তো।’
‘স্যার, আমার আর পড়াশোনা হবে না। বাবা আমাকে বলেই দিয়েছেন- এখন থেকে পড়াশোনা করতে হলে নাকি নিজ খরচেই করতে হবে। আমি কী করবো স্যার?’ এ সময় তাকে খুব বিমর্ষ দেখা গেলো। শাওকী তার মাথাটা টেনে বুকের সাথে চেপে ধরতেই সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। শাওকী তাকে সান্ত¡না দিতে গিয়ে বললো- ‘পাগল কোথাকার! কাঁদছো কেন? বাবা-মা অসচেতন হলে ওরকম বলে। সমস্যা নেই; তুমি বরং কাল একবার আমার কাছে এসো। গল্প করবো।’
‘জি-স্যার।’
তমালের সাথে কথা শেষ করে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে আহমেদ শাওকী।
পরদিন কথামতো তমাল বাসায় এলে তার সাথে অনেকক্ষণ ধরে গল্প করে শাওকী। এক ফাঁকে তাকে পড়াশোনাও চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেয়। শাওকী তার নিজের কাছে আসা একটা টিউশনি ফোনে কথাবার্তা পাকা করে তমালকে দিয়ে বললো- এখন থেকে সে যেন আগের মতোই তার কাছে পড়তে আসে। আর এ জন্য তাকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হবে না। অবশ্য সে আগে যখন তার কাছে পড়েছে, টাকা দিয়েই পড়েছে। আর সেই টাকাও তার নিজেরই আয় করা ছিলো। এতো চাপ নিয়েও এইটুকু ছেলে যে পড়াশোনা করতো এবং ক্লাসেও যে সবার চেয়ে ভালো রেজাল্ট করতো, সেটা ভেবে কিছুটা অবাক হয় শাওকী। কিন্তু অভিভাবক যেখানে সচেতন নন এবং পুরোদস্তুর মদ্যপ, সেখানে এরকম মেধাবী ও স্বাপ্নিক তমালদের বিকাশের আর সুযোগ থাকে কই! এই দৃশ্যটা যে শুধু উপজাতি সমাজেই আছে, এমনটি নয়। বাঙালিদের মধ্যেও ব্যাপক। এই যেমন এলাকার জহির উল্লাহ, তার ভাই কহির উল্লাহ এবং আলফাজ মোল্লা তার জীবন্ত উদাহরণ। এই তিনজনের বিঘা-বিঘা ফসলি জমিন আছে, পাহাড়ি ভূ-সম্পত্তি আছে। সেই সাথে প্রত্যেকেরই প্রায় এক ডজন করে ছেলেমেয়ে আছে। কিন্তু তাদের একজনকেও কখনো ইশকুলে পাঠাননি। কাকতালীয় বটে- এই তিনজনেরই প্রায় একই বৈশিষ্ট্য। এই যে আলফাজ মোল্লা, তিনি ছেলে-মেয়ে এমনকি বউকে দিয়ে পর্যন্ত মাঠে কাজ করান। আর নিজে লম্বা আলখেল্লা গায়ে দিয়ে, মাথায় টুপি পরে বসে থাকেন ক্ষেতের আইলে। জহির উল্লাহ-কহির উল্লাহ অবশ্য বউকে নামান না। তবে ছেলেদের মাঠে নামিয়ে দিয়ে আইলে বসে বসে আয়েশ করে পান চিবান। শাওকীর ধারণা, এই অবস্থা শুধু পাহাড়ে নয়; সারাদেশেই কমবেশি দৃশ্যমান হবে। এই দেশে সরকারে যারা আসেন কেউই জনগণের মাঝে সচেতনতা এবং শিক্ষা বিস্তারে কার্যকর ব্যবস্থাটি নিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। অবশ্য তার মনে করাতে আর কী এমন যায় এসে। বাস্তু-ভিটাহীন লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায়, ডাস্টবিনে এবং রেললাইনে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। পরিবেশের অভাবে পড়াশোনা তো দূরের কথা, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া এমনকি মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু পর্যন্ত করতে না পেরে মাদক সেবন, বিপণন এবং আমদানিতে ব্যবহার হচ্ছে একশ্রেণীর দুষ্টচক্রের মাধ্যমে।
শাওকীর কথায় তমাল হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে চুপচাপ বসে রইলো। তমালের সাথে নানান বিষয়ে গল্প জুড়ে দিলো সে। আসলে তার উদ্দেশ্য হলো তমালকে একটু ইজি রাখা। একপর্যায়ে তাকে বিদায় দিলো শাওকী। আর কড়া ভাষায় বলে দিলো- কাল থেকে যেন সে নিয়মিতই ইশকুলে যায়। সেই থেকে এই ক্লাস টেন পর্যন্ত তমাল রেগুলার ইশকুলে আসছে। আর তার কাছে কোচিংয়ে পড়তেও আসছে নিয়মিত। তার কোচিং সেন্টারের চাবিটা ওর কাছেই দিয়ে রেখেছে শাওকী। কারণ অধিকাংশ দিনই তমাল তার আগে এসে যায়। মজার ব্যাপার হলো, সে পড়াশোনায় আগের চেয়েও মনোযোগী হয়েছে। আর ফলাফলও আগের চেয়ে ভালো। শাওকীর ধারণা, সে এসএসসিতে গোল্ডেন এ প্লাসই পাবে। এভাবেই, অর্থাৎ তমালের সাথে শাওকীর পরিচয় মূলত তার কোচিংয়ের ছাত্র হিসেবেই হয়েছিলো।
সেদিন বৃষ্টি থাকায় যেহেতু সাইকেল আনেনি, তাই হেঁটে হেঁটেই বাসার দিকে যাচ্ছিলো শাওকী। হাইস্কুুলের পাশের রাস্তাটি দিয়ে শশী হেডম্যান পাড়া হয়ে যাওয়ার প্ল্যান করেছে সে। ছাতা মাথায় পা টিপে টিপে পাকা রাস্তা পার হয়ে চাকমা পাড়ামুখী কাঁচা রাস্তায় উঠলো। এখান থেকে একটু ভেতরে ঢুকলেই চাকমাদের ফসলি জমিন। তারপর একটি পাহাড়ি নদী এবং এরপরই পাহাড়ের ওপর দিয়ে পায়ে চলা পথ। পথের দু’পাশেই ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মাঝে মাঝেই দু’য়েকটি চাকমা বাড়ি। এরপর আরো কিছুটা পথ। মানে, আরো প্রায় কিলোখানেক হাঁটলেই চাকমা পাড়া। চাকমারা একটি পাড়ায় সবাই একসাথে থাকতে পছন্দ করে। তাদের জায়গা-জমি যতোই থাকুক এবং যেখানেই থাকুক- বাড়িঘরগুলো সব এক জায়গায় থাকে। যুগ যুগ ধরে এই বৈশিষ্ট্য তারা ধারণ করে এসেছে।
কোচিং শেষ করে এতটা পথ পায়ে হেঁটে আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেছে তার। এতক্ষণে হেঁটে হেঁটে পাহাড়ি নদীটার কাছে চলে এসেছে। নদীতে প্রচণ্ড ঢল। বৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়ধোয়া পানি নেমে এসেছে নদীতে। ঘোলা পানি। গাছের গুঁড়ি, মুলি বাঁশের আঁটি, কলাগাছ, বুনো লতাপাতা ইত্যাদি ভেসে যাচ্ছে ভাটির দিকে। ঝুপঝুপ শব্দ তুলে দাঁড়াশের ক্ষীপ্রতা নিয়ে ছুটছে উন্মাতাল পাহাড়ি নদী। আনমনে হাঁটছে আর সেদিনের ঘটনাগুলো নিয়ে ভাবছে। বিশেষ করে উপজেলা সদরের সরকারি পুকুরটাতে বস্তাবন্দি যে লাশটা পাওয়া গেছে তাই নিয়ে। এদেশে মানুষের জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। কতো কারণেই যে মানুষ মানুষকে মারছে। খোদ রাষ্ট্রযন্ত্রই তো মানুষের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার তুলে দিচ্ছে! এসব ভাবতে খারাপ লাগে তার। এ ধরনের আরো কিছু বিষয় মাথার ভেতর কাজ করছে। ভাবতে ভাবতে নদী পার হয়ে পাহাড় দু’টো পেছনে ফেলে পরের পাহাড়ে উঠে এসেছে শাওকী। পাহাড়ি পথ বৃষ্টিতে ভিজে মারাত্মক পিচ্ছিল হয়ে আছে। সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। বাঁশঝাড়টা পেছনে ফেলে একটু সামনে গিয়েই চমকে উঠলো সে- পাহাড়ের নিচে কাদাপানিতে মেয়েটিকে পড়ে থাকতে দেখে। এক মুহূর্ত এদিক ওদিক তাকিয়ে নিয়ে সে মেয়েটির দিকে দৃষ্টি নিবন্ধ করলো। পরনে নেভি ব্লু রঙের কামিজ ও শাদা সালোয়ার। ইশকুলের ইউনিফর্ম। পাশে কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে বইগুলো। পাহাড় থেকে নামার সময়ই কি পড়ে গেলো? হতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে কী করবে সে? কিছুই ভাবতে পারছে না। মেয়েটিকে এই অবস্থায় রেখে না পারছিলো সামনে যেতে, আর না পারছিলো পেছনে ফিরে যেতে। তার মনে হলো কেউ যেন তার পা দুটোকে মাটির সাথে পেরেক মেরে আঁটকে দিয়েছে। যেন সে নড়াচড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছে সে। এরই মধ্যে মেয়েটি গুঙিয়ে উঠলো একবার। তারপর আবার চুপ। শাওকী এক মুহূর্ত ভাবলো। তারপর আবারও এদিক ওদিক তাকিয়ে চারপাশটা দেখে নিয়ে মেয়েটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। কপালের একপাশ থেকে রক্ত বেরিয়ে সেই রক্ত জমাট বেঁধে কপালেই লেপ্টে আছে। নিশ্চয় মেয়েটি অনেকক্ষণ ধরে এখানে পড়ে আছে। বৃষ্টি থাকায় হয়তো এই পথ দিয়ে এতক্ষণ কেউই এদিকে আসেনি। শাওকী মেয়েটিকে ডাকলো। ‘এই যে, এইÑ হ্যালো, শুনছো?’ যেহেতু নাম জানা নেই, তাই এরকম করে বোকার মতো কয়েকবার ডাকলো। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সেন্স হারালো নাকি মেয়েটা! হতে পারে। সে এবার মেয়েটিকে হাত দিয়ে মৃদু ধাক্কা দিলো। কাজ হলো। গুঙিয়ে উঠলো আবার। তারপর একটু পরই ভয়ার্তভাবে চোখ মেলে চাইলো তার দিকে। শাওকী কী বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। অগত্যা বললো- ‘তোমার এ অবস্থা কেন? এইখানে কতক্ষণ ধরে পড়ে আছো এইভাবে? বাসা কোথায় তোমার? অনেক ব্যথা পেয়েছো নিশ্চয়। দেখি, ওঠো।’ তার কথায় মেয়েটি কোনো জবাব দিলো না। তবে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো। কিন্তু দাঁড়াতে পারলো না। নিশ্চয় পায়ে প্রচণ্ড চোট পেয়েছে সে। একটু জেগেই আবার বসে পড়লো। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো সেই সাথে। এখন কী করবে শাওকী? বললো, ‘তোমাদের বাসা কোথায়?’ জবাবে কিছু না বলে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকলো শুধু। শাওকী ভাবছে- এ অবস্থায় তাকে এখানে কেউ দেখলে খুবই খারাপ হবে। তবু সে মেয়েটিকে আরেকবার বললো- ‘চলো, আমার সাথে চলো। তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিই। সন্ধ্যা তো হয়েই গেলো। তুমি কি এখানে এইভাবে বসে থাকবে নাকি!’ এটুকু বলে তার জবাবের অপেক্ষা না করে শাওকী ওর বিক্ষিপ্তভাবে কাদাপানিতে ছড়ানো বইগুলো গোছাতে থাকলো। তারপর হাত ধরে টেনে দাঁড় করিয়ে দিলো তাকে। প্রচণ্ড ব্যথায় সে আবারও বসে পড়তে চাইছে। শাওকী হাত ধরলো তার। মেয়েটিও তার নিজের হাত দিয়ে শাওকীর কোমর পেঁচিয়ে ধরেছে। শাওকী বাম হাতে মেয়েটির বইগুলো নিয়ে তার সাথে ধীরে ধীরে এগুতে থাকলো। তারপর নিঃশব্দে কিছুদূর এসে তাকে জিজ্ঞেস করলো- ‘তোমাদের বাড়ি কোথায়? সে ইশারায় দেখিয়ে দিলো সামনের দিকে।’ এ পর্যন্ত সে তার সাথে কোনো কথাই বলেনি। নিশ্চয় লজ্জা পাচ্ছে। সেই সাথে হয়তো খানিকটা ভয়ও কাজ করছে। কারণ এ মুহূর্তে সে অপরিচিত একজন বাঙালি ছেলের সাথে অসহায়ভাবে হাঁটছে। মাঝে মাঝে ব্যথায় কঁকাচ্ছে। সেই সাথে খুব ধীরে ধীরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে তার সাথে। একটু আগেই মাগরিবের আজান হয়েছে। আকাশে মেঘ থাকায় এবং চতুর্পাশে ঘন জঙ্গল থাকায় জায়গাটা প্রায় অন্ধকার হয়ে গেছে। আর কিছুক্ষণ পর হয়তো পথঘাট কিছুই দেখা যাবে না ঠিকমতো। ঠিকই, তারা যখন হেঁটে হেঁটে ওদের বাড়ির প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে তখন পথঘাট নিñিদ্র অন্ধকারে ঢেকে গেছে। শাওকীর ভয় হচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, এই অপরিচিত চাকমা মেয়েকে নিয়ে সে যখন ওদের বাসায় পৌঁছবে তখন ওর বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের প্রতিক্রিয়া কী দঁড়াবে। ওদের পাড়ার লোকজন দেখলেই বা কী বলবে। তারা দু’জন যখন হেঁটে হেঁটে মেয়েটার বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে, এমন সময় হঠাৎ মেয়েটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে তাদের নিজস্ব ভাষায় তার মাকে ডাক দিলো। খানিকটা ভয় পেয়ে গেলো শাওকী। এমন অবস্থা যে ওকে আমি ছেড়ে দিতেও পারছে না। তার ইচ্ছে করছে এক দৌড় দিয়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু তাও তো সম্ভব নয়। দেখতে দেখতে টর্চ লাইট হাতে দু’জন লোক সামনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। মনে হচ্ছে মেয়েটির মা এবং ছোটোভাই।
সেদিনের সেই মেয়েটি- যাকে পাহাড়ের নিচ থেকে আহতাবস্থায় তাদের বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলো শাওকী। সে-ই আজকের নয়না। যার সাথে এই মুহূর্তে সে বসে আছে। আর তমাল হচ্ছে সেই ছেলে- যাকে শাওকী তার কোচিংয়ে পড়িয়েছিলো। এ বছর নয়না ও তমাল দু’জনই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিটিক্যাল সায়েন্সে চান্স পেয়েছে। আরো কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বের হওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়ালো এবং নয়নাকে বললো- ‘আমি এখন উঠি, রাত তো কম হলো না। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে। তা ছাড়া এরকম একজন সুন্দরী মেয়ের সাথে গল্প করতে থাকলে, বাড়ির লোকেরাও কিছু মনে করতে পারে।’
‘তুমি বাড়ির লোকদের সম্পর্কে জানোই না। আঙ্কেলটা খুবই ভালো মানুষ। উনি একজন মুক্তিযোদ্ধাও। উনার পুরো নাম ইশতিয়াক আদনান। আবার আসলে আঙ্কেলের সাথে সময় নিয়ে কথাবার্তা বলো, এতে তার যদি তোমার প্রতি একটা আস্থার জায়গা তৈরি হয়, তাহলে তোমার আসা-যাওয়ায় উনি আর কিছুই মনে করবেন না। আর যে যাই মনে করুক, আমার কাছে তুমি একজন দেবতুল্য মানুষ।’
ছয়.
নয়নার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো শাওকী। উঠোনে এসে একমুহূর্ত দাঁড়ালো সে। শহুরে বাড়িতে এরকম উঠোন খুব একটা দেখা যায় না। আকাশে দ্বাদশীর চাঁদ উঠেছে। আম, কাঁঠাল আর পুরনো নারকেল গাছের ডালপালার ফাঁক গলিয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া আলো এসে পড়ছে উঠোনে। মায়াবী জোছনা লেপ্টে আছে সবখানে। অবশ্য গ্রামের মতো বনান্ত ছেয়ে ফেলা জোছনার ঢল ইট-পাথরের এই নগরীতে নেই। নিয়ন আলোতে মিলেমিশে একাকার হয়ে বহুতল ভবনের ছাদে কিংবা এ ধরনের উঠোনে যৎকিঞ্চিৎ এসে পড়ে! উঠোনের পাশের একটি গাছে বাদুড়-টাদুড় ধরনের কিছু একটা এসে বসলে গাছটি ঈষৎ দুলে উঠলো। খানিকটা চমকে উঠলো শাওকী। তাকালো সেদিকে। গাছটি রক্তজবা ফুলের। পুরো গাছজুড়ে রক্তলাল ফুলেরা থই থই করছে। জোছনার আলোয় সবকিছু অনেকটা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, গাছটির ওপর লাল রঙের একটি ম্লান চাদর বিছিয়ে রেখেছে কেউ। ফুলগাছ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে পাশের বড়ো গাছটির দিকে তাকালো শাওকী। কিছু দেখা যাচ্ছে না। তবে সে বুঝতে পারলো যে, ওটা বাদুড় বা কাকটাক কিছু ছিলো। গেটের দিকে পা বাড়ালো সে। ‘কি, ভয় পেলেন বুঝি!’ পেছন থেকে কেউ একজন বললে শাওকী তাকালো সেদিকে। এক তরুণ হেসে তার দিকে আসছে। হ্যাঁ, সেই ছেলেটি। যার সাথে এ বাড়িতে প্রবেশকালে গেটে দেখা হয়েছিলো। আদনান সাহেবের ছেলে আবিদ। শাওকী হ্যান্ডশেক করলো তার সাথে। বললো- ‘না প্রথমবার ভয় পাইনি, পরে পেয়েছি।’
‘মানে?’
‘মানে, পেছন থেকে আপনি যখন হঠাৎ আমাকে ভয় পেয়েছি কিনা জানতে চেয়েছেন, তখন খানিকটা চমকে উঠেছি। এই আরকি।’
‘ও তাই! হা হা হা।’
অদ্ভুত সুন্দর করে হাসে আবিদ। জোছনা প্লাবিত এই উঠোনে আবিদের হাসিতে যারপরনাই মুগ্ধ হলো সে। তার ধারণা, এরকম দিগি¦জয়ী হাসি জগতের কম লোকই হাসতে পারে। ‘স্টাডি কিসে করেন?’ জানতে চাইলো শাওকী।
‘সিইউতে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান দ্বিতীয় বর্ষে।’
‘আচ্ছা আচ্ছা।’
‘আপনি কী করেন? দিদির সাথে পরিচয় কিভাবে?’
‘আমি সাংবাদিক। ও, মানে নয়না, আমাদের এলাকার মেয়ে। শহরে এসে একা একা রুম খুঁজে পাচ্ছিলো না। আমিও ব্যস্ততার জন্য সময় দিতে পারিনি। তো আজ সে বললো, রুম নাকি পেয়েছে। আর তার পছন্দও হয়েছে। তার বইপুস্তক ও কাপড়চোপড় আমার বাসায় ছিলো। সে রুম পেয়েছে বলায় আমি খানিকটা লজ্জিত হয়েছি এ জন্য যে, তাকে রুমটা আমারই খুঁজে দেয়া দরকার ছিলো। সেটা যেহেতু পারিনি, তাই তাকে একটু হেল্প করতেই হয়।’
‘না না, নিশ্চয়। খুব ভালো হয়েছে। আপনি আসবেন মাঝে মাঝে।’
‘দেখি, হয়তো আসবো।’
‘আচ্ছা, আপনাকে আমি আগে কোথাও দেখেছি। গত দু’চার দিনের মধ্যে ভার্সিটির দিকে গিয়েছিলেন নাকি?’
‘হ্যাঁ। ওখানে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনের নিউজ করতে গিয়েছিলাম।’
‘শিওর। আমি আপনাকে সেখানেই দেখেছি।’
‘আপনিও আন্দোলনে থাকেন নাকি?’
‘হ্যাঁ। এটা তো সাধারণ ছাত্রদের ন্যায্য আন্দোলন। তা ছাড়া ওরা ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস করবে, বগি দখল করবে, সাধারণ ছাত্রীদের যৌন হয়রানি করবে। সাধারণ ছাত্রদের থেকে চাঁদা নেবে। ভার্সিটি প্রশাসনের স্পষ্ট সহযোগিতায়ইতো এসব হচ্ছে। এখানে কি পড়াশোনার কোনো পরিবেশ আছে?’
‘সেটাই। কিন্তু প্রশাসন তো বলছে, আপনারা পুলিশের কর্তব্যকর্মে বাধা দিচ্ছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করছেন, ভিসিকে অবরুদ্ধ করেছেন। এটা না করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি করতে পারতেন। সেটা আপনারা নিয়মানুযায়ী অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে করতে পারতেন।’
‘তা তো আমরা করেছিই। আমাদের দাবি ছিলো, পিযুষ, বুলু, মিন্টু, রিংকু এবং আরো যারা যারা প্রকাশ্যে ছাত্রীদের যৌন হয়রানি এবং আফতাব হত্যার সাথে জড়িত, তাদেরকে সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট থেকে বহিষ্কার করার। কিন্তু প্রশাসন সেটা তো করেনি। পরে তাদের সাহস আরো বেড়ে যায়। বলতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং পুলিশের ছত্রছায়ায় তারা দোর্দণ্ড প্রতাপে চলছে। বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। শাটলে সেদিনও একজন ছাত্রকে তারা বেদম পিটিয়েছে। শুধু তাই নয়, ছেলেটিকে বেহুঁশ অবস্থায় চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় তারা। ভাবতে পারেন, একটা বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় আছে?’
‘ইতিবাচক কিছু পেলেন, এ যাবৎ আন্দোলন করে?’
‘আমরা আগামীকাল থেকে সকল বিভাগের নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করতে যাচ্ছি। এরপরও ইতিবাচক কিছু না পেলে পরবর্তী কর্মসূচিতে যাবো আমরা।’
‘কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে এরপর?’
‘আসলে অনেক কথা বলে ফেললাম আপনার সাথে। আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম। স্যরি, ভাইয়া।’
‘না না, সমস্যা নেই। কী ধরনের কর্মসূচি আসতে পারে এরপর?’
‘সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার এই একটা সমস্যা। বিপদে পড়তে হয়। হা হা হা। কী কর্মসূচি আসবে সেটা এখন বলা যাবে না। তবে একান্ত বাধ্য হলেই আমরা নতুন কর্মসূচি দেবো।’
‘ওরাও তো পাল্টা কর্মসূচি দিবে বলছে।’
‘ওরা কর্মসূচির নামে সন্ত্রাস করবে। কেন আগেও করেছে না!’
এ পর্যায়ে ঘরের ভেতর থেকে বাবা ইশতিয়াক আদনান ডাকলেন- ‘আবিদ।’
‘জি আব্বু।’
‘এদিকে আসো।’
‘আসছি।’
আবিদ সাংবাদিক আহমেদ শাওকীকে বিদায় দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলো। বাপ-ছেলে অনেকক্ষণ ধরে বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বললো। ততক্ষণে রাত এগারোটা বেজে গেছে। কিন্তু তখনও সাইফ বাসায় ফেরেনি। অথচ প্রতিদিন আটটার মধ্যেই বাসায় চলে আসে সে। ইশতিয়াক আদনান সাহেব আবিদকে বললেন- ‘সাইফকে একটা কল দাও তো বাবা। এখনও বাসায় আসেনি। কী করছে, কোথায় আছে ও।’ সাইফকে কল দিলো আবিদ। কিন্তু কল যাচ্ছে না। বন্ধ বলা হচ্ছে। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো আবিদ। ‘ভাইয়ার নাম্বারে কল যাচ্ছে না তো, বাবা।’ বাবা আদনান সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললো আবিদ।
‘কি বলছো! ওর গ্রামীণ নাম্বারে দাও।’
‘ দুটোতেই দিয়েছি।’
‘ ও।’
‘ নাম্বার বন্ধ থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু রাত তো কম হলো না। রাস্তায় জ্যাম থাকলেও তো ন’টার মধ্যে বাসায় আসার কথা।’
‘ওর কোনো অফিস কলিগকে চেনো তুমি?’
‘একজনকে চিনি। তা ছাড়া ভাইয়ার অফিসের নাম্বার তো আমাদের বাসায়ও আছে! ওটাতে কল দিয়ে দেখি।’
‘ হ্যাঁ, তাই দ্যাখো।’
‘কিন্তু তুমি অমন চিন্তা করছো কেন, বাবা? উনি তো ছোটো বাচ্চা নন। আর গ্রামের ছেলেও নন যে, পথ ভুলে গেছেন। বাসায় চলে আসবে। তুমি ঘুমাও।’
‘শোনো আবিদ, ও বাসায় না এলে আমার ঘুম হবে না। তোদের আগে আমাকে কখনো ঘুমোতে দেখেছিস? তুই বাবা ওকে একটু কল দে।’
‘দিচ্ছি, বাবা।’
অনেক জায়গায় কল দিয়েও ব্যর্থ হলো আবিদ। অফিসের কলিগ বলছে- সাইফ নাকি সন্ধ্যায়ই অফিস থেকে বের হয়েছে। তাহলে গেলো কোথায়! আবিদের ধারণা, নিশ্চয় কোনো বন্ধুর সাথে আছে সাইফ। কিন্তু ফোন বন্ধ কেন? কোনোদিন তো সে এমনটি করেনি। দুই বাপ-ছেলে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকলো সাইফের অপেক্ষায়। এক পর্যায়ে আবিদ ঘুমোতে গেলেও জেগে থাকলেন বাবা ইশতিয়াক আদনান। তিনি জুমাবার ছাড়া কখনোই নামাজ পড়েন না। যদিও ঘরে জায়নামাজ, কুরআন শরীফ এবং ধর্মীয় অজিফার কিতাবাদি আছে। স্ত্রী ইসমত জাহান নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। আদনান সাহেবের চিন্তা হচ্ছে সাইফের জন্য। রাত তিনটা বেজে গেছে। মনে শান্তি নেই। অস্থির লাগছে। এরই মধ্যে আরো কয়েকবার সাইফের নাম্বারে ট্রাই করলেন তিনি। স্থির করলেন- নামাজ পড়বেন। তাহাজ্জুদ নামাজ। অজু করে নামাজে দাঁড়ালেন তিনি। আট রাকাত নামাজ শেষে ছেলের জন্য হাত তুলতেই ঝরঝর করে চোখ থেকে পানি বেরিয়ে এলো তাঁর। প্রাণ ভরে কাঁদলেন তিনি। এরকম কান্না তিনি শেষবার কবে কেঁদেছেন, মনে নেই। দোয়া করলেন সাইফের জন্য। একপর্যায়ে ফজরের আজান হলে তিনি জায়নামাজটা কাঁধে নিয়ে মসজিদের দিকে চলে গেলেন।
গতকাল সন্ধ্যা সাতটায় অফিস থেকে বের হয়েছিলো সাইফ। একজন বন্ধুর সাথে দেওয়ানহাট মোড়ে কিছুক্ষণ বসে আড্ডা দেয় সে। তারপর যথারীতি বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। টেম্পো থেকে নেমে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটতে থাকে সে। বিদ্যুৎ না থাকায় গলির মুখটা অনেকটা অন্ধকার। সাইফ গলির মুখে আসতেই পেছন থেকে কেউ একজন তার নাক চেপে ধরলো। আরেকজন ল্যাং মেরে ফেলে দিলো তাকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই জ্ঞান হারালো সে। শক্তিশালী কোনো স্মৃতিনাশক ওষুধ তার নাকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। যেটা মস্তিষ্কে বিষক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। চার-পাঁচজন লোক মিলে খুব দ্রুত এবং মুহূর্তেই টেনে-হিঁচড়ে তাকে মাইক্রোবাসে তুললো।
সাইফের যখন জ্ঞান ফিরলো, তখন সে নিজেকে আবিষ্কার করলো ঘুটঘুটে অন্ধকার একটি জায়গায়। সে এখন কোথায় আছে, তার কোনো আলামতই বুঝতে পারছে না সে। উপরে-নিচে, ডানে-বামে চতুর্দিকে অন্ধকার। এমনকি বাইরের কোনো আওয়াজও শোনা যাচ্ছে না এখানে। ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতরে উঠলো সে। এক পর্যায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করলেও ধপাস করে পড়ে গেলো। এই প্রথম তার খেয়াল হলো, সে যেখানে আছে তার মেঝেটা কাঁচা। তাহলে কি তাকে কোনো গর্তের ভেতর রাখা হয়েছে! ভয়ে শিউরে উঠলো সাইফ। কী শত্রুতা তার সাথে, আর কারাইবা ওরা? কী চায় ওর কাছে? এসব প্রশ্নের কিছুই জানা নেই তার। এমন একটা জায়গা, যেখান থেকে কোনো আলো-বাতাসের দেখা মেলে না। ইচ্ছে করেই কয়েকবার ডাকাডাকি করলো সাইফ। ‘কারা, কে আছো এখানে? আমাকে কেন এনেছো? আমার অপরাধ কী?’ কোনো আওয়াজ এলো না। এমনকি দেয়ালে বাড়ি খেয়ে তার নিজের আওয়াজ নিজের কাছেই ফিরে ফিরে এলো। ভূতুরে শোনালো সেই আওয়াজ। খুব অসহায় লাগছে নিজেকে। বাবা এবং ছোটোভাই আবিদের কথা মনে হলো তার। তারা নিশ্চয় তাকে নিয়ে টেনশন করছে। নিশ্চয় অস্থির হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে তাকে। ডুকরে কেঁদে উঠলো সাইফ। বাবা এবং ভাইকে রেখে এ পর্যন্ত খুব বেশি বাইরে থাকা হয়নি তার। যাও থেকেছে, তা বাবার অনুমতি নিয়েই। কিন্তু এটা কী হলো!
প্রায় এক মাস এই অন্ধকার গুহায় কেটে গেলো তার। আশপাশে কিছুই দেখা না গেলেও, এতদিনে এই জায়গাটার আয়তন মাপা হয়ে গেছে তার। অন্ধকারেও এখন সে কিছু কিছু দেখতে পারে। তার মানে অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। প্রতিদিন মুখোশ পরে কেউ একজন এসে খাবার দিয়ে যায়। দুর্গন্ধ আসে। বিস্বাদ লাগে। তারপরও নিতান্ত বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই সেই খাবার খেতে হয় তাকে। অন্ধকারে লোকটির অবয়ব ঠিকমতো বোঝা যায় না। এখানে দিন-তারিখের কোনো হিসেব নেই। আজকাল সে খুব একটা কাঁদেও না। খুব খারাপ লাগলে অন্ধকারেই তায়াম্মুম করে নামাজে দাঁড়িয়ে যায়। নামাজের সালাম ফিরিয়ে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে সে। এসময় প্রচণ্ড কান্না পায় তার। বাবা এবং ছোটোভাইয়ের জন্য দোয়া করে। এখানে কখন কোন নামাজের ওয়াক্ত হয়, তা কিছুই বোঝা যায় না। আজান, পাখির কলরব কিংবা মানুষের কোলাহল কিছুই শোনা যায় না। নিজের মতো করে যখন মন চায় নামাজ পড়ে সে।
একদিন ঘুমোচ্ছিলো সাইফ। এমন সময় কারো ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো তার। চোখ মেলতেই সে দেখলো, প্রশস্ত একটি কক্ষে শুয়ে আছে সে। চতুর্দিকে আলো। বোঝা যাচ্ছে, এটা দিনের আলো না হয়েই যায় না। ওপরে ফ্যান ঘুরছে। ঝারবাতি দুলছে। বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না তার। সে তো ওই অন্ধকার গুহায় ঘুমাচ্ছিলো। কিন্তু এখানে এলো কিভাবে? বুঝতে পারলো, তারা আবার সেই ওষুধ তার নাকে দিয়েছে; যেটা দিয়ে প্রথমদিন তাকে বেহুঁশ বানিয়ে এখানে এনেছিলো। সামনের দেয়ালের দিকে তাকালো সে। সেখানে একজন পরিচিত মহান নেতার ছবি ঝুলছে। ছবি দেখে চমকে উঠলো সাইফ। তার বুঝতে বাকি থাকলো না, কারা তাকে অপহরণ করেছে। এরা যে নিশ্চিত তার প্রতিপক্ষ দলের, তাতে আর সন্দেহ নেই। সাইফ যখন এসব ভাবছে, ঠিক এমনসময় পেছন থেকে কেউ একজন এসে প্রচণ্ড জোরে লাথি মারলো তাকে। হুমড়ি খেয়ে মেঝেতে পড়ে গেলো সে। সেই সাথে নাক ফেটে রক্ত বেরিয়ে এলো তার। মাথায়ও প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে। ব্যথায় কঁকিয়ে উঠলো সে। দু’জনে মিলে টেনে তুলে দাঁড় করালো তাকে। সবাই মুখোশ পরে আছে। সাইফ সামনের দিকে তাকালো। অনেকদিন পর আলোতে এসে তার যে ঘোর লেগেছিলো, তা কেটে গেছে। তবে মাথায় আঘাত খাওয়ায় চোখের সামনে কেমন অন্ধকার নেমে আসছে। পাশ থেকে কেউ একজন অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিলো তাকে। মাথা তুলে অনেক কষ্টে সামনে তাকালো সে। দেখলো, তার পরিচিত একজন লোকই বসে আছে সামনের চেয়ারে। কপট একটা হাসি লেগে আছে তার মুখে। এক মুহূর্ত লোকটির দিকে তাকিয়ে অন্য দিকে চোখ ফিরিয়ে নিলো সাইফ। রাগে-ক্ষোভে-ঘৃণায় চেহারা লাল হয়ে গেলো তার। চেয়ারে বসা লোকটির নাম আওলাদ মিয়া। সাইফের খুব চেনা। ছাত্ররাজনীতির নামে সন্ত্রাসী করে বেড়ায় এই লোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হল দখল করে সেখানে সব ধরনের অপরাধ-অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে এই আওলাদ মিয়া। মেধাবী ছাত্রদেরকে টানছে এই অপরাজনীতির দিকে। অসংখ্য ছাত্ররা পদ-পদবি ও টাকা-পয়সার জন্য যোগ দিয়েছে ওই তথাকথিত ছাত্রসংগঠনটিতে। আর ওদের নেতৃত্বেই বিশ্ববিদ্যালয়ের যাবতীয় অপকর্ম পরিচালিত হচ্ছে। যখন-তখন গোলাগুলি হচ্ছে। সাধারণ ছাত্রদের হল থেকে বের করে দিচ্ছে এবং জুলুম-নির্যাতন করছে। সব মিলিয়ে একটা মিনি ক্যান্টনমেন্ট যেন এই বিশ^বিদ্যালয়। আর এসবের নাটের গুরু হলো এই আওলাদ মিয়া। লোকটির সাথে একবার তর্ক হয় তার। তর্কটা হয়েছিলো খুবই সিম্পল বিষয় নিয়ে। বিষয়টা হলো, আওলাদ সাইফকে বলেছে- তার ছোটোভাই আবিদ যেন আগামী দু’মাস ভার্সিটিতে না যায়। সাইফ প্রথমে তার কথাটা বুঝতে পারেনি। তাই আওলাদের সাথে কথায় কথা বাড়তে থাকে তার। একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্ক হলে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে আওলাদ মিয়া। সাইফও তার কথার তোয়াক্কা না করে সেখান থেকে উঠে চলে আসে। বাসায় এসে আবিদের সাথে কথা বলে পুরো বিষয়টি বুঝতে পারে সে।
এ মুহূর্তে সাইফ সেই আওলাদের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। আওলাদ তার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘সোজা অঙ্গুলে যে ঘি ওঠে না, সেটা আমিও জানতাম। তারপরও তোকে সুযোগ দিয়েছিলাম। এই কুত্তার বাচ্চা, তুই আমাকে চিনিস? কথা বল হারামজাদা।’ এটুকু বলেই সে চেয়ার থেকে উঠে এলো। তারপর এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে লাগলো তাকে। পাশের একজনকে ইশারা করে বললো, কী দেখছিস দাঁড়িয়ে? শালারে রদ্দা বানা।’ রদ্দা যে কী জিনিস তা বুঝতে পারলো না সাইফ। এই শব্দটা সে এই প্রথম শুনেছে। তার মনে হলো, ওরা তাকে প্রাণেই মেরে ফেলবে। এ পর্যায়ে সে বললো- ‘তোমরা কী চাও আমার কাছে? আমার অপরাধ কী?’
‘চুপ কর, শুয়োরের বাচ্চা। এখন আর চাওয়ার কিছু নাই। শুধু তোর জানটাই চাই এখন। আমাদের ক্ষতি যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। এবার তোরও যা হবার হয়ে যাবে। ভার্সিটি থেকে মনে হয় আমাদের বেরই হতে হবে। যদি তাই হয় তবে তোর যে ভাই আছে, আবিদ না যেন সাবিত; সে তো সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনের বিশাল নেতা। তাকেও বের করার ব্যবস্থা করা হবে। শুধু তাই নয়, একদম ক্লোজ করে ফেলা হবে, বুঝলি?’
‘সাধারণ ছাত্রদের অধিকারের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তারা যৌক্তিক দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছে, তাতে আপনাদের সমস্যা কী? তাদের দাবি তো ন্যায্য।’
‘শালা সাধু সাজছিস? কিছু বুঝিস না, না? এই শালা রাজাকারের বাচ্চারে রদ্দা বানা।’ এটুকু শুনে রাগে আহত সিংহ শার্দুলের মতো গর্জে উঠলো সাইফ। সে বলে উঠলো- ‘খবরদার, আমাকে রাজাকারের বাচ্চা বলবি না। মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সন্তান আমি। বরং তোরা রাজাকারের বাচ্চা, তোদের চৌদ্দ গোষ্ঠীও রাজাকার।’ আহত-রক্তাক্ত শরীর নিয়ে রাগে-ক্ষোভে ফুঁসছে সে। উপস্থিত আওলাদ এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা এসময় মুহূর্তকাল কী যেন ভাবলো। তারপর হায়েনার হিংস্রোতা নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো তারা। মুহূর্তেই জ্ঞান হারালো সাইফ।
সাত.
বড়ো ছেলে সাইফ ইশমাম গুম হওয়ার চতুর্থ দিনে প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বাবা ইশতিয়াক আদনান। আবিদও উপস্থিত ছিলো। সাংবাদিকদের মধ্যে আহমেদ শাওকী এবং তার বন্ধু শফিক আহমেদ ছাড়াও দেশের প্রভাবশালী প্রায় সব ক’টি মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাও ছিলেন। আবিদ ইমতিয়াজ সাধারণ ছাত্রদের চলমান আন্দোলনের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তি বলে এবং এই নেতৃত্ব দেয়ার জন্যই যে সাইফ গুম হয়েছে তা বুঝতে পেরে আবিদের ইউনিভার্সিটি ফ্রেন্ডরাও এসেছে বিপুল পরিমাণে। সাইফের মুক্তির দাবিতে ‘আমরা সাইফের বন্ধুমহল’ নামে ব্যানার নিয়ে হাজির হয়েছে তার বন্ধুরাও। প্রেসক্লাবের বাইরে মানববন্ধন করছে তারা। এই মানববন্ধনে যুক্ত হয়েছে আবিদের ভার্সিটির বন্ধুরা সবাই। সব মিলে জনারণ্যে পরিণত হয়েছে প্রেসক্লাব এলাকা।
প্রেসক্লাবের ভেতরে চলছে সংবাদ সম্মেলন। সেখানে সাংবাদিকদের স্বাগত জানিয়ে প্রথমে বক্তৃতা করে আবিদ ইমতিয়াজ। সে সাংবাদিকদের সামনে ঘটনার পূর্বাপর সবকিছু তুলে ধরে এবং আশঙ্কা প্রকাশ করে যে, তার ভাইকে আওলাদ মিয়ার লোকজন তুলে নিতে পারে। কারণ সে ইতঃপূর্বে সাইফকে হুমকি দিয়েছিলো। এছাড়া অন্যকিছুও হতে পারে। তবে যাই হোক, শুধু ভিন্নমতের কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে সরকারি দলের লোকজন যদি গুম করে কিংবা কোনোরকম নির্যাতন করে, সেটা লজ্জার। আবিদ বললো- ‘আমরা সাইফ ইশমামের পরিবার, তার প্রাণনাশের আশঙ্কা করছি। প্রশাসনের কাছে আমাদের দাবি, সাইফকে যেন নিরাপদ অবস্থায় পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়।’ আবিদের বক্তৃতা শেষ হলে কথা বলেন তার বাবা ইশতিয়াক আদনান। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন- ‘এরচে লজ্জার, ঘৃণার এবং দুঃখের বিষয় কী হতে পারে যে, একজন মুক্তিযোদ্ধা সন্তানকে এইভাবে গুম হতে হবে স্বাধনীতার এতোগুলো বছর পরও! মুুক্তিযুদ্ধে তিনি তার পরিবারের অবদানের কথা তুলে ধরে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন- তোদের প্রয়োজন হয়, আমাকে নিয়ে যেতি। কিন্তু আমার ছেলেকে নিলি কেন? কী অপরাধ ওর? আমি প্রশাসনের কাছে দাবি জানাই, আমার ছেলেকে যেন আমার কাছে ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। আমরা ইতোমধ্যেই থানায় জিডি করেছি। আমি আশাবাদী হতে চাইÑ এ ব্যাপারে যে, আমার বড়ো ছেলে সাইফ ইশমামকে শিগগিরই আমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এরপর তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানিয়ে এবং সাবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিয়ে আয়োজনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সাইফের গুম হওয়ার ঘটনা ইলেক্ট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়াতে ফলাও হয়। কিছু মিডিয়া দায়সারা নিউজ করলেও বাকিগুলোতে ভালোই কাভারেজ পায়। প্রশাসনও ব্যাপারটি নিয়ে সিরিয়াস হয়ে ওঠে। এটা বোঝা গেলো, কোনো প্রকার চাপ সৃষ্টি না করেই পরিবারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সব তথ্য সংগ্রহ করার ব্যাপারটা দেখে। এদিকে সাইফের গুমের ঘটনা ছাত্রদের আন্দোলনে নতুন ইস্যু হিসেবে যুক্ত হয়। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ক্যাম্পাসের বাইরেও। শহরেও মিছিল এবং মানববন্ধন হচ্ছে দু’দিন ধরে। এই সূত্রে ‘জাগ্রত একাত্তর’ নামের একটি সংগঠনেরও আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তারা সাইফের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধন, মিছিল এবং প্রশাসন বরাবর স্মারকলিপি দেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সব কর্মসূচি পালন করছে।
আট.
সাইফ গুম হওয়ার আরো ক’দিন আগেই বাড়িতে গিয়েছিলো নয়না। সে বাড়িতে যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত প্রায় এক মাস হয়ে গেলো। ভার্সিটিতে ক্লাস হয় না আন্দোলনের কারণে। এ ছাড়া যে কারণে সে শহরে থাকছে, সেটা হলো দু’য়েকটা টিউশন পেয়ে যাওয়া। কিন্তু এখনো তা পাওয়া যায়নি। এই এক মাসে শাওকীর প্রতিদিনই মনে হয়েছে নয়নার কথা। কিন্তু ব্যস্ততার কারণে একদিনও সে তাকে ফোন করতে পারেনি। দিনে ভাবে রাতে ফোন দেবে। আর যখন রাত হয়, তখন হয়ে যায় গভীর রাত। সে সময় একটা মেয়েকে ফোন দেয়া মোটেও ঠিক মনে করে না শাওকী। আজকাল সাইফকে উদ্ধারের কাজে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে সেও। এই পরিবারটির সাথে কেমন করে যেন একটি আত্মিক সম্পর্ক হয়ে গেছে তার। একবার আবিদদের বাড়ি, আরেকবার থানায় এবং আরেকবার পেশাগত কাজে- এভাবে ছোটাছুটির মধ্য দিয়েই দিন যাচ্ছে তার। নয়নার জন্যও মনটা কেমন যেন করে। সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে নয়নাদের বাড়িতে গিয়ে তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে তার। নয়নার সাথে তার যে সম্পর্ক, তা একান্তই ঘনিষ্ঠ। নয়না লাজুক মেয়ে। নানানভাবে সে তার ভালোবাসার কথা বোঝাতে চায়। সেটা বুঝতে পারে শাওকী। প্রেমের এই অব্যক্ত অথচ উন্মাতাল সিম্ফনি যে মৌখিক প্রকাশের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তারকারী সেটা টের পায় যে কোনো প্রেমিক পুরুষ। শাওকীও পায়।
সেই যে শহরে এসে প্রথম মেসে উঠেছিলো সেখানেই প্রায় দু’বছর কাটিয়ে দেয় শাওকী। বর্তমানে সে নতুন একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মাত্র এক মাস হলো সেখানে উঠেছে। এতোদিনে তার একার থাকার জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র যা দরকার তা প্রায় সবই জোগাড়-যন্তর করা হয়ে গেছে। তার শখ ছিলো একটি বুকশেলফ কেনার। ইতোমধ্যে তাও হয়েছে। বইয়ের সংগ্রহও কম হয়নি। উপর-নিচ সবগুলো তাকে ঠাসানো বই। যখনই বাসায় থাকে নিয়ম করে পড়াশোনা করতে চেষ্টা করে। অকেদিন যাবৎ লেখালেখিও করছে সে। মূলত কবিতা লিখলেও আজকাল ছোটোগল্প লিখতে চেষ্টা করছে শাওকী। তবে লেখার চেয়ে পড়ছেই বেশি। এটাও একটা নেশা। বই পড়ার এই নেশাটা সেই ছোটোবেলা থেকেই তাকে পেয়ে বসে। এই নেশা সৃষ্টিতে তার বাবা-মায়ের ভূমিকাই ছিলো সবচে বেশি। তার মা দুর্দান্ত সব ছড়া-কবিতা মুখস্থ জানতেন এবং অবসরে ছেলেমেয়ে সবাইকে নিয়ে যখন গল্প করতে বসতেন, তখন শোনাতেন। তারা মুগ্ধ হয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো। কবিতার প্রতি দুর্বিনীত একটা ভালোবাসা সৃষ্টি হয় সেই তখন থেকেই। পাঠ্য বইয়ের সব কবিতাই মুখস্থ থাকতো শাওকীর। পরবর্তীতেও যখনই কোনো কবিতা তার নজরে এসেছে, প্রথম সুযোগেই তা পড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। এখনো সে কবিতার একজন মুগ্ধ পাঠক। আর তার বাবা তো শহরে গেলেই কিছু না কিছু বই কিনে আনতেন। অদ্ভুত সব বই। সেগুলো তিনি নিজেই পড়তেন। শাওকীও তখন দেখে দেখে ভালোই পড়তে পারতো। হাতের কাছে যা পেতো তাই পড়ে ফেলতো। বাবার বইপত্র থেকে সেই বয়সেই গল্প-কবিতা, ইতিহাস-উপন্যাস অনেক কিছু পড়ে ফেলার সুযোগ পায় সে। কিন্তু আশৈশব সমস্যা তার একটাই ছিলো- সে পাঠ্য বইয়ের মধ্য থেকে কেবল বাংলাটাই ভালো করে পড়তো। আর অন্যগুলো সে হিসেবে পড়াই হতো না। ফলে তার রোল নম্বরও কখনো এক-দুই হয়নি। অবশ্য কোনো ক্লাসে দু’বছরও থাকতে হয়নি তাকে। এখন এই পরিণত বয়সে এসে দারুণভাবে ফিল করছে- বইয়ের সাথে সখ্যতা গড়াটা তার সাংবাদিক জীবনে সফলতারও অন্যতম একটা কারণ হয়েছে। সে প্রথম থেকেই দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করেছে বলেই এখন এই পেশাকে একটা শ্রেষ্ঠ পেশা বলে মনে হচ্ছে তার কাছে। অথচ তার সাথের অনেকেই সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে দু’বছরের আইন কোর্স করে নিম্ন আদালতে প্র্যাকটিস করছেন।
নয়.
চোখের ঘুম কিছুটা হালকা হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় গোলাগুলির একটা ক্ষীণ আওয়াজ শুনে আচমকা উঠে বসে সাইফ ইশমাম। চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে বসে যায় সে। ভীত-সন্ত্রস্ত চোখে এদিক ওদিক তাকায়। কিন্তু কিছু বোঝার উপায় নেই। এখানে দিন-রাত সবই সমান। এখানে আসার পর থেকে প্রায় দু’মাস হয়ে গেছে। এই দু’মাসই অন্ধকারের সাথে বসবাস করেছে সে। অন্ধকারটাও সয়ে গেছে এতদিনে। বাবা এবং ছোটোভাই আবিদকে আল্লাহর কাছে সঁপে দিয়ে তাদের ধৈর্য ধারণের তওফিক চেয়ে দোয়া করছে প্রতিনিয়ত। এতোদিনে তার বিশ্বাস জন্মে গেছে যে, এদেশের ভাগ্যবিড়ম্ভিত আরো অনেকের মতো সেও আর মুক্ত বাতাসে নিশ্বাস গ্রহণ করতে পারবে না। সূর্যালোক দেখা তার আর হবে না। বাবা আর কোনোদিনই তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবেন না। ছোটোভাই আবিদের সাথে তার আড্ডা-গল্প এবং মান-অভিমানের ঘটনাও আর ঘটবে না। বুকের ভেতর একটা কষ্টের ক্ষত থিতু হয়ে গেছে তার। সাইফ কান খাড়া করে বুঝতে চেষ্টা করলো, কিসের গোলাগুলি হচ্ছে বাইরে। নিশ্চয় অনেক জোরে হচ্ছে, যেটা এই গুহার ভেতর থেকেও ক্ষীণভাবে শোনা যাচ্ছে।
ব্যাপার হলো, সাংবাদিক আহমেদ শাওকীর রিপোর্টের সূত্র ধরে গোয়েন্দা সংস্থা তাদের দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর আওলাদের এই আস্তানার সন্ধান পেয়ে গেছেন। তারা এও জানতে পেরেছেন যে, এই জায়গা থেকেই আওলাদ তার সকল সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। সে মোতাবেক যাবতীয় ইনফরমেশন নিয়ে পরিকল্পিতভাবেই এই রাতে তার আস্তানায় রেড দিয়েছে যৌথ বাহিনী। একঘণ্টা পর মাইকিংয়ের আওয়াজ শোনা গেলো- ‘খবরদার, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ নিজেদের বাসাবাড়ি থেকে বের হবেন না, উঁকিঝুঁকি দেবেন না। পুরো এলাকা নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া বেষ্টনীর মধ্যে রয়েছে। ভয় পাবেন না কেউ। আমরা একটি তথ্যের ভিত্তিতে অভিযানে এসেছি।’ সাইফ বুঝতে পারলো, বাইরে ভয়ঙ্কর কিছু হচ্ছে।
আরো আধা ঘণ্টা পর সাইফ যেখানে বন্দি হয়ে আছে, সেই গারদের কপাট ভাঙার আওয়াজ শোনা গেলো। আর তার পরপরই শোনা গেলো, কয়েকজন মানুষের বুটের আওয়াজও। সেই সাথে কয়েকটি টর্চের আলো একসাথে জ¦লে উঠলো গারদের দরজায়। মুহূর্তেই গারদের ভেতরকার তীব্র অন্ধকারের ওপর টর্চের লাফিয়ে পড়া আলোয় এতোদিনকার জমাটবাঁধা অন্ধকারটা কোথায় যেন পালিয়ে গেলো। দু’জন সৈনিক সাইফকে তার হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। তারপর দ্রুত তাকে হেলমেট এবং সেফটি জ্যাকেট পরিয়ে গাড়িতে তুললো। সবকিছু কেমন জানি কয়েক মিনিটের মধ্যেই হয়ে গেলো। সাইফ তাকিয়ে দেখলো, নিচে আওলাদের আস্তানার সামনে দু’টি লাশ পড়ে আছে। একটি তার চেনা। আর সেটি স্বয়ং আওলাদেরই! লাশটি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন বেশ ক’জন পুলিশ সদস্য। পেছনের গাড়িতে পাঁচজন বন্দি। তাদের প্রত্যেকেরই হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো। কোমরে রশি বাঁধা। মাথায় হেলমেট এবং গায়ে সেফটি জ্যাকেট।সাইফের সাথে ওদের পার্থক্য হলো- তার হাতে হ্যান্ডকাফ এবং কোমরে দড়ি নেই। সে বুঝতে পারলো, এই অভিযান তাকে উদ্ধারের জন্যই হয়েছে। চোখ থেকে পানি বেরিয়ে এলো তার। তাকে বহনকারী গাড়িটি প্রথমে আস্তে এবং তারপরই ফাঁকা রাস্তা পেয়ে দ্রুত ছুটে চললো। সাইফ একরাশ ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে থাকলো আওলাদ মিয়ার আস্তানার পাংশুটে পাঁচিলের দিকে।
গোয়েন্দা সংস্থা তিনদিন ধরে সাইফকে তাদের হেফাজতে রাখার পর নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সাইফের চেহারা ভেঙে পড়েছে। কেমন ফ্যাকাশে অথচ মলিন এবং রোগাক্রান্ত হয়ে গেছে সে। ডাক্তার বলেছেন, অন্তত ছ’মাস যেন সে সম্পূর্ণভাবে বিশ্রামে থাকে এবং ভালো ও পুষ্টিকর খাবারদাবার গ্রহণ করে।
দেশে নানান ইস্যুতে আন্দোলন হচ্ছে। গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ ইস্যু ছাড়াও রাজনৈতিক আরো অনেক ইস্যুতে আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী দলগুলো। এদিকে সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্বিকার অবস্থার কারণে ছাত্রদের আন্দোলনও নতুন মাত্রা পেয়েছে। জাতীয় একটি পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে আবিদের স্লোগানরত একটি ছবি। ছাত্রদের ন্যায্য দাবি মেনে নেয়ার পরিবর্তে প্রশাসন পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে মোতায়েন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এদিকে শিক্ষার্থীদের কিছু অংশ ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে গেলেও আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে সাধারণ ছাত্ররা।
সেদিনও মিছিল হয় ক্যাম্পাসের বাইরে। জলকামান-সাঁজোয়াযান নিয়ে যুদ্ধোংদেহী পুলিশ বেপরোয়াভাবে গুলি ছোঁড়ে ছাত্রদের মিছিলে। তিন শতাধিক ছাত্র আহত হয়। স্লোগানরত অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় একজন। প্রতিবাদে সন্ধ্যায় আবারো মিছিল হয় ছাত্রদের। মিছিলে ছাত্রদের সাথে রাস্তায় নেমে আসে বিক্ষুব্ধ জনতাও। আবারও গুলি ছোঁড়ে পুলিশ। নিক্ষেপ করে টিয়ারশেল। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় মিছিল। দিগি¦দিক ছুটতে থাকে ছাত্ররা। আবিদও ছিলো ওই মিছিলে। ফুটপাথে রাখা কনস্ট্রাকশনের বালুর স্তূপটা পেছনে ফেলে ভাঙা বাউন্ডারি ওয়াল পার হতে যাচ্ছিলো সে। এমতাবস্থায় তার পাকে নিশান বানিয়ে গুলি করে একজন পুলিশ কর্মকর্তা। আর্তচিৎকার দিয়ে ধপাস করে পড়ে যায় সে। টেনেহিঁচড়ে তাকে নিয়ে আসা হয় ফুটপাথে। তারপর কিছু বুঝে ওঠার আগেই আরো দু’টি গুলি করে ওই পুলিশ অফিসার। তৃতীয় গুলিটি করা হয় তার মাথায়। রক্তের গঙ্গা বয়ে যেতে থাকে তার গুলিবিদ্ধ মাথা ও শরীর থেকে। এ অবস্থায়ও বারবার উঠতে চেষ্টা করে আবিদ। অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে- মা…! দূর থেকে সিভিল পোশাকে দৌড়ে আসে সরকার দলীয় এক ক্যাডার। এসেই লাথি মারে আবিদের মাথায়। তারপর আরো ক’বার। ক’য়েকবার মাত্র কেঁপে ওঠে সে। তারপর নিথর হয়ে যায় তার দেহ। তবু ক্ষান্ত হয় না ওই ক্যাডার। মৃত্যু নিশ্চিত জানার পরও হাতে থাকা লোহার রড দিয়ে পিটাতে থাকে তাকে। একপর্যায়ে খুঁচিয়ে তুলে ফেলে তার চোখ দু’টিও।
রাজপথ ফাঁকা। এমনকি যান চলাচলও প্রায় বন্ধ। পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। কখন যে চলে গেছে কে জানে। সন্ধ্যার সেই ঘনায়মান অন্ধকার এখন আরো গাঢ় হয়েছে। প্রায় সব ক’টি মিডিয়ার সাংবাদিক এসেছেন ঘটনাস্থলে। ছবি তুলছেন এবং সংবাদ ইন্ট্রো করছেন তারা। সাংবাদিক আহমেদ শাওকীও এসেছেন। ইন্ট্রো করছেন তিনিও। হঠাৎ সাংবাদিকদের কেউ একজন বলে উঠলো- ছেলেটির নাম আবিদ। চমকে উঠলো আহমেদ শাওকী। এতক্ষণ রক্তমাখা চেহারা দেখে চিনতে পারেনি সে। ভালোভাবে তাকালো এবার। হ্যাঁ, ছেলেটি আবিদই! থ হয়ে গেলো শাওকী। এ তিনি কি দেখছেন! নিজেকে সংবরণ করলেন অনেক কষ্টে। সাংবাদিকদের আবেগের ঊর্ধ্বে থাকতে হয়!
সাংবাদিক এবং পুলিশ ছাড়া এই জায়গাটাতে সাধারণ লোকজন আর নেই। পুলিশ কাউকে এখানে আসতে দিচ্ছে না। এরই মধ্যে ঘটনাস্থলে এলেন জনাব ইশতিয়াক আদনান। কিভাবে খবর পেয়েছেন কে জানে। পুলিশ অনেকক্ষণ ধরে আটকে রেখেছেন তাঁকেও। নানা রকম জেরা শেষে তারপরই আসতে দিয়েছে। তিনি খুব ধীরে ধীরে গিয়ে ছেলের কাছে বসলেন। তারপর রক্তমাখা কপালে চুমু খেলেন এবং স্নেহে তার দু’গালে হাত বুলাতে লাগলেন। শুধু একবার বললেন- ‘আমাকে রেখে এতো তাড়াতাড়ি তোর আম্মুর কাছে চলে গেলি বাবা! বাবার ওপর বুঝি খুব অভিমান ছিলো তোর!’ এরপর তিনি আর কোনো কথা না বলে চুপ হয়ে গেলেন। ছেলের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে তিনি তাকালেন অন্যদিকে। তারপর তাঁর নিষ্পলক চোখজোড়া স্থির হলো রাস্তার ওপারের সরকারি ভবনে। আশ্চর্য! রাতেও ভবনের ছাদে পতপত করে উড়ছে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। ছাদের ম্লান আলোতে তা স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে। চোখ নামিয়ে তিনি আরেকবার তাকালেন ছেলের রক্তের দিকে। যে রক্তের স্রোত ফুটপাথ থেকে গড়িয়ে নেমে গেছে নিচের পিচঢালা পথে। চোখ তুলে তিনি আবারও তাকালেন পতাকার দিকে। এবার কেঁদে উঠলেন বৃদ্ধ বাবা ইশতিয়াক আদনান। উপস্থিত সবার চোখেই পানি এসে গেলো। কিন্তু এলো না ঘাতক পুলিশ অফিসার এবং আরো কতিপয় লোকের। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাওকীর চোখও ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমশ। চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে তার। আর সেই সাথে চোখ থেকে টপটপ করে ঝরতে থাকে অশ্রু। হাতের ন্যাপকিন পেপার দিয়ে কোনোমতে চোখ মুছে সেও একবার পতাকার দিকে আরেকবার আবিদের প্রাণহীন ও রক্তাক্ত শরীরের দিকে তাকাতে থাকে। তার ভাবনায়, আবিদের রক্ত ফুটপাথ থেকে পিচঢালা রাজপথ হয়ে মিশে যেতে থাকে লাল-সবুজ পতাকায়। আর তার সুঠাম ও তরুণ দেহের তাজা লাল রক্তে গাঢ় রক্তজবার মতো লাল হতে থাকে পতাকার লাল বৃত্ত। সেই সাথে সবুজ ক্যানভাস হতে থাকে কালো। নিকষ এই রজনীর মতো কালো।