ভাব ও ভাষা একে অপরের পরিপূরক। ভাব থেকেই ভাষার সৃষ্টি। ভাবের সূচারু প্রকাশই ভাষা। ভাষা মানুষের অমূল্য সম্পদ; যে সম্পদ তার সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে সারস্বত ভূমিকা রেখেছে। এও বলা যায়, মানবজাতির ক্রমবিকাশের বাহনই ভাষা; যা ছাড়া সভ্যতা অস্তিত্বহীন। যার ভাষা যত পরিপুষ্ট তার সভ্যতা ও সংস্কৃতি ততটাই উন্নত। একটি জাতি একটি সমাজ তথা তাবৎ সৃষ্টিসমূহ তার অস্তিত্বের কথা জানান দেয় ভাষার মাধ্যমে। ভাষার কথ্যরূপ ও লেখ্যরূপ দুটোই তার মানস বিকাশে ভূমিকা রাখে। সুতরাং ভাষা সৃষ্টির সব উপাদানই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আছে বলেই মানুষের সাহিত্য আছে; ভাষা আছে বলেই মানুষের সংস্কৃতি আছে। বলাবাহুল্য, মনের ভাব প্রকাশই ভাষা। অবশ্য তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে- শুধু মনের ভাব প্রকাশই ভাষা নয়; ভাষার আরও কিছু ‘ভেরিয়েশন’ আছে যেমন- নদীর একটা ভাষা আছে, উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের একটি ভাষা আছে, আকাশ ও বাতাসের একটা ভাষা আছে, গাছ-পালা ও পশু-পাখির একটি ভাষা আছে, নারীর একটা ভাষা আছে, চিত্র বা ছবির একটি ভাষা আছে, ঝড়-বৃষ্টির একটি ভাষা আছে, চাহনি বা মুখাবয়বের একটি ভাষা আছে, বালিকা বা কিশোরী যখন যুবতীতে রূপান্তর হয় তার একটি ভাষা আছে, বিভিন্ন বয়সের একটি ভাষা আছে, কুঁড়েঘর কিংবা সুউচ্চ ভবনের একটি ভাষা আছে, চাল-চলন বা আচার-আচরণের একটি ভাষা আছে, মৃতদেহের একটি ভাষা আছে, এমনকি বাক্প্রতিবন্ধী বা বোবার একটি ভাষা আছে, ভাষা সর্বত্র বিরাজমান।
এতদসত্ত্বেও, মানুষের মনের গভীর-গভীরতর ভাব বা চিন্তার বহিঃপ্রকাশই ভাষা। এটি মানুষের আত্মতৃপ্তির একটি জায়গা। কোনো কিছু ভাবা বা চিন্তা করা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তবে তা হলেও এটি তার দেখা বা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। সে যা দেখে তাই ভাবে; আর সেই ভাবনার প্রকাশ একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম; কেননা একেকজনের দৃষ্টিভঙ্গি একেক রকম। ভাব প্রকাশের মাধ্যমে একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব, রুচিবোধ, চিন্তা-চেতনার পরিচয় পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে তার চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো পরিপূর্ণরূপে ফুটে ওঠে। এটি তার মানসিক শক্তিও বটে! শারীরিক, মানসিক চাহিদাগুলো পূরণের নিমিত্তে ভাষা কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে ভাষার বিন্যাস ঘটে। একেক স্থানের পরিবেশ একেক রকম। পরিবেশের তারতম্যের কারণে ভাষা সৃষ্টিরও তারতম্য ঘটে। সমতল ভূমির ভাষা এক রকম, পাহাড়ি এলাকার ভাষা এক রকম, নদীমাতৃক এলাকার ভাষা এক রকম। সাগর-মহাসাগরীয় এলাকার ভাষা এক রকম। অর্থাৎ ভাষা সৃষ্টির ক্ষেত্রে পরিবেশের ভূমিকা ব্যাপকতর। এক্ষেত্রে ধর্মগত আচার-ব্যবহারেরও প্রভাব রয়েছে। যে যেই ধর্মের অনুসারী বা যে গোত্রের অন্তর্ভুক্ত তার ভাষাও সেই ধর্ম বা গোত্রের বৈশিষ্ট্য নিয়েই সৃষ্টি হয়। তাই স্থিতিশীল ও প্রতিকূল পরিবেশের ভাষা এক রকম নয়। সে কারণে ভাষার শব্দগুলোও বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। একই অর্থবোধক শব্দের উচ্চারণেও রয়েছে তারতম্য। শব্দটি আপনা-আপনি যে কণ্ঠস্বর থেকে উচ্চারিত হয় তার গঠন-গাঠন ওই পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। যে পরিবেশ অন্তরে লুক্কায়িত ভাবের শরীরে প্রাণের সঞ্চার করে। যা ভাবের চাহিদানুযায়ী কণ্ঠনালীর যোগসাজশে একটি কম্পন বা শব্দের সৃষ্টি হয়। শব্দগুলো একত্রিত হয়ে অর্থবোধক আঙ্গিকে প্রকাশ পায়। এই প্রকাশভঙ্গি একজন ব্যক্তিকে চিরন্তন সত্তায় রূপায়িত করে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, প্রত্যেক ব্যক্তির কাছে তার ভাষাভঙ্গি অমূল্য রতন। ভাষার প্রতি রয়েছে চিরন্তন এক মমত্ববোধ যা তাকে আত্মপ্রত্যয়ী হতে শেখায়। যার প্রমাণ মেলে বাংলাভাষা আন্দোলনে। ভাষাকে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষার তাগিদে স্বতঃস্ফূর্তভাবে জীবন উৎসর্গ করার ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই যে জীবনের বিনিময়ে ভাষাকে রক্ষা; এতেই বোঝা যায় ভাষার প্রতি মানুষের ভালোবাসা কতটুকু। যা কখনই মাপা যায় না, ভাবাও যায় না। অর্থাৎ একটি জাতির ভাষা বিলীন হওয়া মানে তার অস্তিÍত্বই বিলীন হওয়া। সজ্ঞানে কোনো জাতিই তার অস্তিত্বের বিনাশের কথা ভাবতে পারে না বা পারবে না। মহাকাল তার সাক্ষী। ভাষার প্রতি এই যে মমত্ববোধ এটা সে জন্মলগ্ন থেকেই অর্জন করেছে। প্রকৃতিগতভাবেই এর প্রতি সে দায়িত্বশীল। একজন ব্যক্তি তার প্রাণের আকুতি পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে তার মাতৃভাষার মাধ্যমে। একটি শিশু জন্মলাভ করার পরপরই মা বা মাতৃরূপী কারও কাছে অবলীলায় তার ভাষাটি রপ্ত করে নেয়। এটি তার সহজাত বৈশিষ্ট্য। তার মুখের আধো-আধো বুলিই তো ভাষা! মানুষ যা চিন্তা করে বা ভাবে তা কণ্ঠস্বরের মাধ্যমে প্রকাশ না পেলেও চাল-চলন, আচার-আচরণের মাধ্যমে পরিলক্ষিত হয়। এটিও ভাষার একটি বৈশিষ্ট্য। মানুষের শরীরীমৃত্যু ঘটলেও তার কথার কিন্তু মৃত্যু ঘটে না; যদি সেই কথাগুলো হয় উচ্চমার্গীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। ভাব অনুযায়ী ভাষার প্রকাশ অনেক ক্ষেত্রে সমীচীন না-ও হতে পারে। ভাব যতটা গভীর, ভাষাকে ততটা গভীরে নিতে অনেকেই সফল হতে পারেন না। একটি অপূর্ণতা থেকে যায়। সুতরাং ভাবের সুচারু প্রকাশের জন্য ভাষার ওপর দক্ষতা অর্জন অত্যাবশ্যকীয়। উপযুক্ত শিক্ষা, সাধনা, অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য।
শিল্পী-সাহিত্যিকগণ মানুষের না-বলা কথাগুলো উচ্চমার্গীয় ভাষায় প্রকাশ করেন। সেই চেষ্টা, সাধনা তাদের রয়েছে। একজন মানুষের ভাব বা চিন্তাধারার দূরত্ব কতটুকু তা নির্ভর করে তার শিক্ষা-দীক্ষা ও পারিপার্শ্বিকতার ওপর। যার ভাব বা চিন্তাধারা শিক্ষা-দীক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত তার ভাষা ততই উন্নত। আবার সব ভাষাকেই উন্নত ভাষা বলা যায় না। ভাষার মতো ভাবকেও যদি ব্যাকরণিক প্লাটফর্মে ফেলান যায়, তবে সেই ভাবের স্থাবর-অস্থাবর অবস্থা খুব সহজেই নিরূপণ করা যায়। ভাবের ব্যাকরণ দৃশ্যমান কিছু না হলেও পরিশীলিত, পরিমার্জিত, সংস্কারেই তা আবর্তিত হয়। সৃষ্টিশীলতার মূল উৎসই ভাব; ভাষা তার প্রকাশ মাধ্যম। ভাবের গতি শুদ্ধরূপে চালিত হওয়া একান্ত অপরিহার্য। সীমাবদ্ধ আঙিনা থেকে মুক্ত হাওযায় ভাবকে প্রসারিত করা প্রয়োজন। যে প্রয়োজন জীবনকে নিয়ে যায় অন্য এক জীবনে। ভাব মানুষের সহজাত প্রবৃত্তিকে লালন করে আর মানুষ ভাবকে লালন করে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণে। কিন্তু সেটা কদাচিৎ সহজতর নয়। আত্মশুদ্ধির জায়গা থেকে সফল হলেই তা সম্ভব। প্রাত্যহিক প্রয়োজনেই ভাবের প্রকাশ জরুরি হয়ে দাঁড়ায়। ভাষাকে তাই তৈরি করে নিতে হয় ভাবের প্রয়োজনেই। দক্ষ কারিগরির দৃষ্টি প্রতিফলিত হলে তা কখনও-কখনও রূপান্তর হয় শিল্পে। কিছু মানুষ ভাবের শৈল্পিক প্রকাশে নিরন্তর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত; যা মননশীল চর্চারই বহিঃপ্রকাশ। গতানুগতিক চিন্তার বাইরে এসে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে পরিচর্যা করলে তা সম্ভব। এর ওপরই নির্ভর করে ভাষার রুক্ষতা কিংবা সাবলীলতা। যাপিত জীবনের মতো ভাষাও নানা প্রতিকূলতায় আবর্তিত হয়, যা ভাবসর্বস্ব নাও হতে পারে। ফলে ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় দুরূহ হয়ে ওঠে। তাই প্রতিকূলতাও ভাব-কল্পনার অবস্থান নির্দেশ করে। ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমে একে অপরের সম্পর্কে জানা যায়, বোঝা যায়। আবার একটু কৌশলী হলে বা বিস্তর অভিজ্ঞতা থাকলে শুধুমাত্র ‘মুভমেন্ট’ দেখেও অনেক কিছু বোঝা যায়। ভাষার ব্যাপারটাই এমন! এটি ভাবের আদান-প্রদানের মাধ্যমও যাপিত জীবনকে সুষমামণ্ডিত করার একটি প্রয়াস। ভাষাকে আশ্রয় করে সৃষ্টি হয়েছে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক, সিনেমা আরও কত কী! জীবন ও জগতের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিরূপণের সর্বোত্তম মাধ্যম ভাষা। এর অনুসন্ধানে যুগ-জিজ্ঞাসার অনেক কিছুই উন্মোচন করা সম্ভব। ভাষার শক্তি, ভাষার প্রবহমানতা মানুষের মজ্জাগত; তার প্রমাণ মেলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে। মাতৃভাষা রক্ষার্থে সকল শ্রেণির মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এবং সেই আন্দোলনে জীবন পর্যন্ত বিলিয়ে দেয়ার নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। এই যে ভাষার জন্য অবলীলায় জীবন উৎসর্গ করা- এই লৌকিক ভাবনার উন্মেষ ঘটেছে শুধুমাত্র ভাষার প্রতি মানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও তার জাতিগত অস্তিত্ব রক্ষার কারণে। ভাষার নিরন্তর গতিময়তা প্রবাহিত হয়েছে মানুষের রক্তের ভেতর দিয়ে। তার ভাবনা-চিন্তা তথা বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গির মধ্য দিয়ে অত্যাবশ্যকীয় হয়ে উঠেছে ভাষা। মানুষের বিনাশ ঘটলেও ভাষার বিনাশ ঘটে না; হয়তো তার রূপান্তর ঘটে মাত্র। এটি ভূমণ্ডলের একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান। জাতি, জাতীয়তা, জাতিগতবোধ- এগুলো তৈরিই হয়েছে ভাষাকে কেন্দ্র করে। ধর্ম গ্রন্থানুযায়ী- মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত। সুতরাং মায়ের কাছ থেকে শেখা বুলির মর্যাদা কতখানি তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাষা হলো দ্বিতীয় মা। মায়ের মর্যাদা যতখানি ভাষার মর্যাদাও ততখানি। এটি তুচ্ছ কোনো বিষয় নয়। মা যদি ভক্তির বস্তু হয়; ভাষাও তবে তাই। ভাষাকে অবহেলা করা মানে মাকে অবহেলা করা, ভাষাকে অপমান করা মানে মাকেই অপমান করা। ভাষার মর্যাদার প্রতি তাই প্রতিটি মানুষের সু-বিবেচনা থাকা আবশ্যক। ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে আদবি-মনোভাব পোষণ করা অপরিহার্য। ভাষার যথোপযুক্ত ব্যবহার ও প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে ঘটে যায় নানা রকম বিশৃঙ্খলা। এর সুষ্ঠু বিকাশ ঘটলেই মানবসভ্যতা প্রাণস্পর্শী চূড়ায় অবস্থান করবে- এটি নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।