দক্ষিণবঙ্গে সুপ্রাচীন কাল থেকেই নানা ধরনের লোকনাট্যের চর্চা প্রচলিত। এখানে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো যাত্রাপালা, অষ্টক গান, জবগান, পটগান, হালৈ গান, কথকতা, গাজীর গান, রয়ানী পালা, দুখে যাত্রা, বনবিবি জহুরনামা প্রভৃতি ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্য যুগে যুগে এখানকার মানুষের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এগুলো কখনো গীত আকারে, কখনো পালা আকারে আর কখনো বা নাটক আকারে পরিবেশিত হয়ে জনমানসে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে। কাজেই এসব ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা দক্ষিণবঙ্গের অমূল্য সম্পদ বলা যায়। লোকনাট্য বা ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারা শুধূ একটি অঞ্চলের পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর বিনোদনের জন্য নয়, বরং এর ভেতর দিয়ে সে অঞ্চলের জীবন-সংস্কৃতির নিত্য-নতুন রূপটিও উদ্ভাসিত হয়। এ প্রসঙ্গে সাইমন জাকারিয়ার মন্তব্য স্মর্তব্য:
ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার একটা বড় বিশেষত্ব এই যে, নতুন নতুন যুগে উত্তীর্ণ হয়ে এর মধ্যে নতুন নতুন উপাদান-উপকরণ সংগৃহীত হয়। ফলে জীর্ণতা তাকে খুব একটা স্পর্শ করতে পারে না। এর প্রধান কারণ, ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারায় প্রতিদিন প্রতিটি আসরে নতুন কিছু ঘটানো হয়। যে জন্যে একই আখ্যান বারবার অভিনীত হলেও দর্শকের কাছে তা প্রতিটি আসরে নতুন কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে আসে।
দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী লোকনাট্যের পরিচয় এবং চর্চার ইতিবৃত্ত সম্পর্কে নিম্নবর্ণিত লোকনাট্যধারার পর্যালোচনা আবশ্যক:
যাত্রা:
যাত্রা আমাদের নাট্যাভিনয়ের ইতিহাসে প্রাচীনতম ঐতিহবাহী শিল্প-মাধ্যম ও অমূল্য সম্পদ। এই শিল্পটি শুধু আমাদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গই নয়; আমাদের গৌরবময় প্রাচীন ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সূত্র। একদা এর মাধ্যমে পরিস্ফুট হয়ে উঠেছিল এদেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক কাহিনি ও আমাদের সমাজচিত্র। এক কথায়, যাত্রা আমাদের জাতীয় জীবনের একটা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি। বাঙালি সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক, ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের পারিবারিক-সামাজিক-রাজনৈতিক চালচিত্র, দেশমাতৃকা, বিভিন্ন রূপকথা প্রভৃতি বিষয় অবলম্বনে রচিত অসংখ্য যাত্রাপালার অভিনয় এক সময় খুবই জনপ্রিয় ছিল। অবিভক্ত বাংলায় যাত্রাভিনয়কে জনপ্রিয় করে তুলতে দক্ষিণবঙ্গের অনেক গুণিজন, অভিনেতা, যাত্রা-মালিক ও কলাকুশলীগণ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, অভিনয় ও সাধনায় যাত্রা একটি অনুপম শিল্প মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। এক সময় গ্রাম-বাংলার বিভিন্ন স্থানে, এমনকি শহর-বন্দরেও নানা উৎসব-পার্বণে শৌখিন এবং মাঝে মাঝে পেশাদারি যাত্রাভিনয় বাংলার সাংস্কৃতিক বিনোদনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। বাংলার মানুষ তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, মা-মাটি-দেশ প্রভৃতি বিষয় যাত্রাভিনয় দেখে উপলব্ধি করতেন। শুধু তা-ই নয়, ‘এ দেশের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে স্বদেশী যাত্রা যে ভূমিকা নিয়েছিল তার রেশ আজো আমরা বিস্মৃত হতে পারিনি। পঞ্চাশের মন্বন্তরকে, আকালের দেশ যাত্রাপালায় যেভাবে চিত্রায়িত করা হয়েছিল, সে স্মৃতির ভার যাত্রাশিল্প বহন করবে নিরবধি কাল।’ অতীব দুঃখের বিষয় যে, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সেই যাত্রাশিল্প আজ প্রায় সর্বাংশে বিলুপ্ত। যাত্রা এখন শিল্পের উঠোনে নেই-অশ্লীলতা আর জুয়াবাজির এক অরুচিকর মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। যশোর-খুলনা অঞ্চলের যাত্রাশিল্পের ঐতিহ্য ও অবলুপ্তির কারণ বিশ্লেষণের পূর্বে বাংলায় যাত্রার ক্রমবিবর্তনের ইতিবৃত্তের দিকে খানিকটা নজর দেয়া যাক।
প্রাচীনকাল থেকে যাত্রার যে পথপরিক্রমা উনিশ শতকের প্রথম দিকে তার বিষয়বস্তুতে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। দেব-দেবীর উপাখ্যানের গণ্ডি পেরিয়ে মানবীয় চেতনায় পালা শুরু হয়। এ সময় থেকে কলকাতায় যখন নব্য শিক্ষিত বাঙালিরা বিলেতি থিয়েটারের আঙ্গিকে দেশীয় নাট্যমঞ্চ গড়ে তোলার প্রয়াসে মেতে ওঠেন, তখন পূর্ববঙ্গের (বাংলাদেশ) গ্রাম-গঞ্জে বসতো রাত ভোর করে দেওয়া যাত্রা গানের আসর। ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সাধারণ রঙ্গালয়’। ১৮৭৩ সালে এ দেশে প্রথম পেশাদারী ভিত্তিতে বরিশালে ‘নট্ট কোম্পানী যাত্রা পার্টি’ প্রতিষ্ঠিত হয়। যাত্রাশিল্পের একটা জাগরণ চলছিল মধ্য ত্রিশ থেকে গোটা চল্লিশের দশক পর্যন্ত। বিশ শতকের তৃতীয় দশকে স্বদেশী যাত্রার হোতা চারণ কবি মুকুন্দ দাশ ব্রিটিশবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁকে ঠেকাতে গিয়েই ১৯৩৩ সালে তৈরি হয় সুষ্ঠু যাত্রার পরিপন্থী কুখ্যাত আইন ‘এন্ডোর্সমেন্ট’। ঔপনিবেশিক আমলের এই কালাকানুনটি এখনও বলবৎ রয়েছে। তবে যাত্রাপালাকে যুগোপযোগী চেতনায় সমৃদ্ধ করে সম্মানজনক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্বে যাঁরা বিশেষ অবদান রেখেছেন, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য সর্বাধিক পালা রচয়িতা ব্রজেন কুমার দে (শরীয়তপুর), জামালপুরের জিতেন বসাক, সাহিত্য সরস্বতী এবং সাতক্ষীরার সত্য প্রকাশ দত্ত। তাঁরা পালা রচনার মাধ্যমে দেশীয় যাত্রার ঐতিহ্যকে সমুন্নত করেছেন। ১৯১০ সালের দিকে যখন ঢাকায় অক্ষয়বাবু নামের এক ব্যক্তি ‘অক্ষয়বাবুর দল’ নামে যাত্রাদল গড়ে তোলেন, তখন যশোরে নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ও একটি যাত্রাদল গঠন করেন। এই নীলমাধববাবুর যাত্রাদলটি ‘নীলমাধবের দল’ নামে খ্যাতি অর্জন করে।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের কয়েক বছরের মধ্যে এসব বিখ্যাত যাত্রা নির্মাতারা ভারতে চলে যান। দেশ ছেড়ে চলে যায় বরিশালের ঐতিহ্যবাহী ‘নট্ট কোম্পানী’ যাত্রা পার্টি’ও। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে নীরস শুষ্ক প্রায় যাত্রা অঙ্গনকে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে যে সকল দল সজীব, সচল করে রেখেছিল, সেগুলো হলো: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘জয়দূর্গা অপেরা’ (১৯৪৬), গোপালগঞ্জের ‘রায় কোম্পানী’ (১৯৪৯), সিরাজগঞ্জের ‘বাসন্তী অপেরা’ (১৯৫৫), চট্টগ্রামের ‘বাবুল অপেরা’ (১৯৫৮)। প্রাক স্বাধীনতাকাল পর্যন্ত অন্যান্য উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে ছিল চট্টগ্রামের ‘গীতশ্রী অপেরা’, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ভাগ্যলক্ষ্মী অপেরা’, ফরিদপুরের ‘নিউ বাসন্তী অপেরা’, গোপালগঞ্জের ‘দীপালি অপেরা’ ময়মনসিংহের ‘বুলবুল ও নবরঞ্জন অপেরা’, খুলনার ‘মহামায়া অপেরা’, বটিয়াঘাটার ‘আরতি’, ‘বনানী’ ও ‘শিরিন অপেরা’ এবং সাতক্ষীরার ‘আর্য অপেরা’, ‘রঞ্জন অপেরা’ ইত্যাদি। এ-সময় এ দেশে যেসব গুণী শিল্পী অভিনয়ের মাধ্যমে স্মরণীয় হয়ে আছেন, তারা হলেন-আশরাফ আলী, নয়ন মিয়া (ময়মনসিংহ) মন্মথ দত্ত, নগেন্দ্র নন্দী, ব্রজেন নন্দী (নোয়াখালি), শ্যামাচরণ, রামাচরণ, অমলেন্দু বিশ্বাস, তুষার দাস গুপ্ত, নাজির আহেমদ, মঞ্জুশ্রী মুখার্জী, জাহানারা আহমেদ, নন্দ দুলাল অধিকারী, মিনু ভট্টাচার্য, অনিল ঘোষ, কালীপদ দাস, বিমল পাল, ধীরাজ ভট্টাচার্য, হরেণ বিশ্বাস (যশোর), গজেন দত্ত, সাদেক আলী (পাবনা), এম.এ. হামিদ, মরু ঘোষাল (চাঁদপুর), মোহনলাল রায় (কিশোরগঞ্জ), হরিপ্রসন্ন দাস (মানিকগঞ্জ), রঞ্জন খান (ঢাকা), এবং সত্য প্রকাশ দত্ত, মুকুন্দ লাল ঘোষ (সাতক্ষীরা) প্রমুখ।
এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে দক্ষিণবঙ্গে অনেক বিখ্যাত যাত্রাদলের ও যাত্রাশিল্পীর উদ্ভব ঘটে। এর মধ্যে ‘ইমাম যাত্রা’, ‘বীণাপাণি অপেরা’, ‘নিতাই গৌর অপেরা’, ‘শ্যামসুন্দর অপেরা’, ‘কমলা অপেরা’, ‘রঞ্জন অপেরা’, ‘মণিহার অপেরা’, ‘সপ্তগ্রাম সৌখিন নাট্যগোষ্ঠী’, ‘অঞ্জলি অপেরা’, ‘তরুণ অপেরা’, ‘অগ্রগামী অপেরা’, ‘রাজমহল অপেরা’, ‘হেনা অপেরা’, ‘নিউ প্রভাষ অপেরা’, এবং ‘সবিতা অপেরা’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। ১৯৭০ সালে বাগেরহাটের পরিমল হালদার প্রতিষ্ঠা করেন ‘জয়শ্রী অপেরা’। ১৯৭২ সালে নড়াইলের শেখ খলিলুর রহমান প্রতিষ্ঠা করেন ‘রঙমহল অপেরা’। এ বছরই খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘শিরিন যাত্রা ইউনিট’। ১৯৭৩ সালে নিরঞ্জন রায়ের উদ্যোগে যশোরে গড়ে ওঠে ‘জোনাকী অপেরা’। বাগেরহাটে নূর মোহাম্মাদ হাওলাদারের প্রচেষ্টায় ‘বঙ্গশ্রী অপেরা’, এবং যশোরে তুষার দাশগুপ্তের ‘তুষার অপেরা’ ১৯৭৪ সালে গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালে যশোরের প্রহ্লাদ বিশ্বাস হিটলারের ‘বৈকালী অপেরা’, বাগেরহাটের আফজাল হোসেন মোল্লার ‘জ্যোৎ¯œা অপেরা’; ১৯৭৭ সালে খুলনার আবদুল মালেক মোড়লের ‘সাধনা অপেরা’, ১৯৭৮ সালে যশোরের গণেশচন্দ্র কুণ্ডুর ‘প্রতিমা অপেরা’, খুলনার আরতি রানী বিশ্বাসের ‘আরতি অপেরা’, প্রদীপ বিশ্বাসের ‘প্রদীপ অপেরা’, আহমদ সরদারের ‘ভদ্রা অপেরা’, এস.এম মতিউর রহমানের ‘তুহিন অপেরা’ এবং ১৯৭৯ সালে খুলনার আবদুল মজিদ সরদারের ‘মিলন যাত্রা ইউনিট’ বিভিন্ন যাত্রাপালা অভিনয় করে সুনাম অর্জন করে। এ সময় এ অঞ্চল থেকে পেশাধারী যাত্রা অভিনেতা-অভিনেত্রী হিসেবে আবির্ভূত হন স্বপন কুমার ঘোষ, অশোক কুমার ঘোষ, পরিতোষ ব্রহ্মচারী, প্রবোদ কুমার ঘোষ, সুবোধ চন্দ্র ঘোষ, প্রহলদ কুমার ঘোষ, গোলাম মোস্তফা, ফারুক হোসেন, আশরাফ আলী, স্বপন কুমার দেবনাথ, ভিক্টর দানিয়েল নাগ, গায়ক সন্তোষ কুমার, অবিনাশ চন্দ্র মন্ডল, বিশ্বজিৎ কুমার, অমল বিশ্বাস, শচীন বিশ্বাস, সুশীল বাবু এবং নায়িকা ও নৃত্যশিল্পী মঞ্জুশ্রী রাণী, কবিতা, পূর্ণিমা ব্যানার্জী, গীতা সরস্বতী, আরতি মল্লিক, শেফালি দাশ প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
নড়াইলের যাত্রা ও নাটক রচয়িতা হিসেবে ঊনবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেওয়া অঘোরনাথ কাব্যতীর্থ বিখ্যাত হয়ে আছেন।৬ সিনেমার কাহিনীকার জলধর চট্টোপাধ্যায়ও বিশেষ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। আশির দশকে যাত্রাপালা ও যাত্রার গান রচনা করে এবং যাত্রাদলের অভিনেতা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন মহসিন হোসাইন। তিনি কালিয়ার ‘জোনাকি’ যাত্রাদল ও গোপালগঞ্জের ‘নরনারায়ণ অপেরা’র অভিনেতা ছিলেন। নড়াইলের যাত্রার ঐতিহ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:
আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগে শিংগাশোলপুর গ্রামে গড়ে ওঠে অজিত শিকদারের অর্থানুকূল্যে সত্যম্বর অপেরাপার্টি। নারাণদিয়ার বিশ্বাস ব্রাদার্স যাত্রাদলও প্রাচীন। ইতনায় শ্রী সত্যচরণ গুহ দস্তিদার একটি নাট্যশালা স্থাপন করেন দেশ বিভাগের আগে। কালিয়া নাট্যশালাও সেই যুগে বিখ্যাত ছিল। এ ছাড়া রেজিস্ট্রিকৃত নয় এমন অনেক যাত্রাদল নড়াইল জেলায় গড়ে উঠেছিল। এবং কিছু কিছু যাত্রা ও থিয়েটার দল আজো টিকে আছে।
যশোর জেলার মনোহরপুরের অধিবাসী হরেণ বিশ্বাস ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত অসংখ্য যাত্রাপালায় অভিনয় করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি নানাবিধ প্রতিকূলতাকে জয় করে যাত্রাভিনয়কে জীবনের ও শিল্পের সাথে একাকার করে তুলেছিলেন। তাঁর অভিনয় নৈপুণ্যে এক সময় এ অঞ্চলের তথা সমগ্র বাংলার মানুষ বিমুগ্ধ হতেন। বর্তমানে তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ হলেও অভিনয় বিষয়ে তাঁর মনের জোর একটুও কমেনি।
খুলনা জেলার রংপুর গ্রামের রাজেন্দ্রনাথ মল্লিকও এ অঞ্চলের লোকনাট্য চর্চায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। দেশভাগের অব্যবহিত পরেই এ অঞ্চলে ‘শ্রীদুর্গা অপেরা’ গড়ে ওঠে। বাংলায় গড়ে ওঠা অপেরার ইতিবৃত্ত থেকে এর ইতিবৃত্তটি স্বতন্ত্র। এটি একক কোনো মালিকানায় গড়ে ওঠেনি। সতীশ কীর্তনিয়া, জলধর পণ্ডিত, কালিপদ বৈরাগী, জিতেন্দ্রনাথ ঢালী, সুখচান বৈরাগী, রাজেন্দ্রনাথ ঘরামি, গোপালচন্দ্র মণ্ডল, ক্ষেত্রমোহন, ডা: সুরেন্দ্রনাথ মণ্ডল, সন্ন্যাসী কুমার ঢালী, নারায়ণ চন্দ্র সরকার প্রমুখের প্রচেষ্টায় এ অপেরা গড়ে ওঠে। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হন বনমালী বিশ্বাস, রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক, রবীন্দ্রনাথ ঘটক, কালিপদ মণ্ডল যতীশচন্দ্র মণ্ডল (পরে তিনি দিপালি অপেরার ম্যানেজার হন) প্রমুখ। ‘শ্রীদুর্গা অপেরা’ বিভিন্ন সময়ে ব্রজেন্দ্রনাথ দে রচিত ‘শঙ্খচূর বধ’, ‘দাউদ খাঁ’, ‘প্রবীরার্জুন’, ‘পরশমণি’, ‘রাজা দেবী দাশ’ ইত্যাদি; নন্দগোপাল রায়চৌধুরী রচিত ‘সাধক রামপ্রসাদ’; রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক (জ. ১৯৪০) রচিত ‘সাধক নেপাল পাগল’, ‘অসুর নিধন’ প্রভৃতি যাত্রাপালার সফল অভিনয় করে। বাংলার লোকজ ঐতিহ্যে সাধনতন্ত্র একটি বড় অংশ। রাজেন্দ্রনাথ মল্লিকের ‘সাধক নেপাল পাগল’ পালায় নানাবিধ সংস্কার, তন্ত্রমন্ত্র, প্রথা-পদ্ধতি, লোকবিশ্বাস ফুটে উঠেছে। এ অঞ্চলের লোকনাট্য চর্চার ক্ষেত্রে এ যাত্রাপালাটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। রাজেন্দ্রনাথ মল্লিক এক সাক্ষাৎকারে আমাকে জানান:
আমাদের নাট্যাভিনয় মূলত লোকজ। আমরা লোকজ স্বভাবের অভিনয় দেখে আমাদের প্রাণের বার্তাটির সাথে একাত্ম হই। আমরা এখনো আমাদের ঐতিহ্যমূলক যাত্রাপালা, কথকতা, জারি-সারি প্রভৃতির সুর-ঝংকারে আপ্লুত না হয়ে পারি না।
দক্ষিণবঙ্গের যাত্রাশিল্পের স্বর্ণযুগ বলা যেতে পারে আশির দশককে। এসময় সাতক্ষীরায় ‘আলফাজ মিয়ার ‘সবিতা অপেরা’(১৯৮২), যশোরে নির্মলকুমার সরদারের ‘সুদর্শন অপেরা’ (১৯৮২), যশোরের মফিজুল আলম খোকার ‘নিউ গীতশ্রী যাত্রা ইউনিট’ (১৯৮৩), জগদীশচন্দ্র বর্মণের ‘সারথী যাত্রা ইউনিট’ (১৯৮৩), সুকুমার সরদারের ‘দি তরুণ অপেরা’ (১৯৮৩), সাতক্ষীরার মেহবুব ইসলামের ‘আর্য অপেরা’ (১৯৮৪), বরিশালে ‘বুলবুল অপেরা’ (১৯৮৪) এবং খুলনার পরিতোষ ব্রহ্মচারীর ‘সোনালী অপেরা’ (১৯৮৫) ইত্যাদি খুব জনপ্রিয় যাত্রাদল হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। খুলনা জেলার দাকোপ উপজেলার বাজুয়া গ্রামের পরিতোষ ব্রহ্মচারী অসংখ্য যাত্রাপালা রচনা করে, অভিনয় করে, যাত্রাদল সংগঠন করে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তাঁর রচিত যাত্রাপালাসমূহের মধ্যে উভয়বাংলায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল দস্যুরাণী ফুলনদেবী। তিনি জীবদ্দশায় দেশের শীর্ষস্থানীয় পালাকারের মর্যাদা পেয়েছিলেন। এ অঞ্চলে নায়ক ও নায়িকা হিসেবে যাত্রাভিনয়ে যথেষ্ট খ্যাতি অর্জন করেছেন অশোক দাস ও গীতা সরস্বতী। গীতা সরস্বতী এক সাক্ষাৎকারে৯ আমাকে জানিয়েছিলেন যে, অশোক দাস খুবই দাপটে নায়ক ছিলেন। দীর্ঘদিন লাখ লাখ দর্শক তাঁর অভিনয় দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।
পাঁজিয়ার ধীরাজ ভট্টাচার্যের কথাও সর্বজনবিদিত। যাত্রাভিনয়কে ভালোবেসে তিনি পুলিশের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। বাংলা চলচ্চিত্রের নায়ক ও জনপ্রিয় অভিনেতার আসনে আসীন হবার পূর্বে তিনি যাত্রাপালা রচনা করতেন, অভিনয় করতেন। তাঁর রচিত ‘যখন নায়ক ছিলাম’ গ্রন্থ হতে তাঁর যাত্রাভিনয়ের পরিচয় মেলে। এ ছাড়াও যশোর-খুলনা অনেক জনপ্রিয় যাত্রাভিনেতা-অভিনেত্রী তাঁদের অভিনয়ের মাধ্যমে দীর্ঘকাল দর্শকের আকাক্সক্ষা নিবৃত্ত করে এসেছেন।
দক্ষিণবঙ্গের এসব যাত্রাদল ও যাত্রাশিল্পী শুধু এ অঞ্চলেই নয়, দেশের বিভিন্ন শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জে অভিনয় করে যাত্রাকে লোকশিক্ষা ও বিনোদনের একটি শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম রূপে গড়ে তুলেছিলেন এবং এ শিল্পমাধ্যমটিকে আমাদের ঐতিহ্যের অঙ্গীকার রূপেও প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষমও হয়েছিলেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্য আজ শুধুই ইতিহাস। বর্তমানে যাত্রা আর শিল্পের পর্যায়ে নেই। জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার, তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, পাশ্চাত্য অভিনয়ের চাকচিক্যময় রূপের দুর্নিবার আকর্ষণ, কর্পোরেট মিডিয়া জগতের নানা ধরনের ভেলকিবাজি প্রভৃতি কারণে আমাদের ঐতিহ্যবাহী যাত্রাশিল্প আজ মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে হাহাকার করছে। উল্লিখিত কারণসমূহ ছাড়াও দক্ষিণবঙ্গের যাত্রাশিল্প অবলুপ্তির নানাবিধ কারণ রয়েছে। এ অঞ্চলে যাত্রাভিনয়ে নানাবিধ অন্তরায় যেমন আছে, তেমনি নানাদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে পরিশীলিত যাত্রাভিনয়ের সম্ভাবনার হাজার দ্বারও উন্মুক্ত রয়েছে। এ অঞ্চলের শিল্প-সংস্কৃতিবান নাট্যামোদী মানুষ এবং সুধীজনের সামগ্রিক প্রয়াসে এখানকার যাত্রাশিল্প আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।
যাত্রা ছাড়াও এ অঞ্চলে অষ্টক গান বা অষ্টক যাত্রা, জব গান, হালৈ গান, পটগান, কবিগান, রয়ানী গান, গাজীর গান, বনবিবি জহুরনামা প্রভৃতি লোকনাট্যের আঙ্গিকে পরিবেশিত হয়। এসবের অধিকাংশ ক্ষেত্রে গানের প্রাধান্য থাকলেও নাট্য বা অভিনয়ের ভূমিকাটাও একেবারে কম নয়। গীত হবার সময় কুশীলবগণ কখনো নৃত্যের তালে, কখনো আঙ্গিকাভিনয়ের মাধ্যমে উল্লিখিত লোকসঙ্গীতসমূহ পরিবেশন করে থাকেন। দক্ষিণবঙ্গে এ জাতীয় লোকনাট্যাঙ্গিক অসংখ্য প্রচলিত থাকলেও এ প্রবন্ধে প্রধান প্রধান কয়েকটি আঙ্গিকের পরিচয় তুলে ধরার প্রয়াস পাবো।
গাজীর গান:
এদেশের মুসলমান জনসাধারণের মধ্যে যে সকল পরম পূজ্য হিসেবে সপ্তদশ শতক থেকে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে তাদের মধ্যে গাজী পীর উল্লেখযোগ্য। এই পীর কখনো গাজী জিন্দাপীর, কখনো বড় খাঁ বা গাজী সাহেব হিসেবে বিভিন্ন স্থানে পরিচিতি পেয়েছে। তবে বাঘের দেবতা হিসেবে এই গাজী পীর হিন্দু-মুসলমান সকল ধর্মের লোকের কাছেই সমানভাবে পূজ্য। আর গাজী পীরের আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় তা হচ্ছে- তার নামের পাশাপাশি একই সঙ্গে কালু এবং চম্পাবতীর নামটি জড়িত রয়েছে। বাংলার অন্য কোন পীরের দোসর হিসেবে দু’একজন পুরুষের নাম যুক্ত থাকলেও কোন নারী চরিত্রের নাম তেমনভাবে যুক্ত থাকতে দেখা যায় না। গাজী পীরের আখ্যানটি সে দিক দিয়ে ব্যতিক্রম। দক্ষিণবঙ্গের গাজীর গান সম্পর্কে সমালোচক বলেন:
এ দেশের ঢাকা, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, ময়মনসিংহ, নেত্রকোণা, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ ইত্যাদি অঞ্চলে গাজীর গানের অসংখ্য দলের অস্তিত্ব রয়েছে। অনেকের ধারণা, গাজী পীরের আখ্যান বিশেষত এদেশের সুন্দরবন সংলগ্ন সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলেই বেশি প্রচলিত। কিন্তু মাঠ সমিক্ষণে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের বৃহত্তর সিলেট জেলাতেও এই পীরের আখ্যান পরিবেশনার সন্ধান পাওয়া গেছে।
গাজীর গানের আখ্যান জানা যায় বৈরাট নগরের রাজা সেকেন্দার যুদ্ধে বলিরাজকে হারিয়ে কন্যা অজুপাকে বিয়ে করেন। তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় সন্তান জুলহাস। জুলহাস চলে যায় পাতালপুরে। অজুপা আর এক পুত্রের জন্য আল্লার দরবারে কাঁদতে থাকেন এবং আল্লাহ কবুল করেন। জন্ম হয় গাজীর। গাজীর রূপ দেখে প্রথম পুত্রের শোক ভুলে যান। গাজীর বয়স দশ বছর হলে পিতা সেকেন্দার তাঁকে রাজ্যভার নিতে বলেন। কিন্তু গাজী অস্বীকার হলে ক্রুদ্ধ পিতা গাজীকে হত্যার জন্য নির্দেশ দেন। গাজী শরণাপন্ন হয় কোরআন শিক্ষা গুরুর কাছে। অতি অলৌকিক ক্ষমতার বলে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপের পরও গাজীর সামান্য ক্ষতি হয় না। রাজা অবশেষে স্ব-স্বাক্ষরিত ‘সুই’ খুঁজে রাখার নির্দেশ দেয়। গাজী খোয়াজ খিজিরের সাহায্যে তাও এনে দেন। গাজী এক রাত্রে গোপনে মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে ভাই কালুসহ ফকির হয়ে যায়। নানা দেশ দেশান্তরে ঘুরে গাজী কালু সুন্দরবনে এসে উপস্থিত হন। এখানে সুন্দরবনের বাঘ গাজীর মুরিদ হয়ে যায়। তারপর গাজী ও কালু ‘আশা’ ভর করে নদী পার হয়ে আসে শ্রীরামপুরে। ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত দুই ভাই অন্ন লাভের আশায় শ্রীরাম রাজার দরবারে উপস্থিত হলেন। রাজা মুসলমানের হাক শুনে তাদেরকে রাজ্য থেকে বের করে দেন। কালুর অলৌকিক ইচ্ছা শক্তিতে রাজপুরীতে আগুন লাগে। দিশেহারা শ্রীরাম রাজা গত্যান্তর না পেয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যান।
ভক্তগণের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাজী কালু চলে আসেন সাত কাঠুরিয়ার বনে। গরিব কাঠুরিয়াদের দুর্দশা মুক্ত করার জন্য গাজী কালু গঙ্গীর কাছে স্বর্ণের আবেদন জানায়। স্বর্ণ পেলে শাহ্ পরী ও বায়ান্ন হাজার পরীকে দিয়ে বনের মধ্যে বন কেটে সহ¯্র দালান ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন এবং নাম রাখেন সোনাপুর। পরীরা চলে যায়। দুই ভাই পুরীটা ঘুরে ঘুরে এর নাম রাখেন সোনাপুর শহর।
এই সোনাপুর শহরে মসজিদে দুই ভাই পালঙ্কে ঘুমাচ্ছিলেন। ‘কুকাফ’ থেকে ছয় পরী ঘুরতে আসে সোনাপুর শহরে। গাজীর রূপ দেখে তারা মোহিত। পরীগণ বহু বাগ-বিতর্কের পর গাজীর জন্য যোগ্য নারী হিসেবে মনোনীত করল ব্রাহ্মণ্য নগরের মুকুট রাজার কন্যা চম্পাবতীকে। কথাতো কাজ, পরীরা গাজীর পালঙ্ক নিয়ে উড়াল দিল ব্রাহ্মণ্য নগরে। চম্পাবতীর পাশে গাজীকে ঘুমিয়ে রাখল। ঘুমের ঘোরে গাজীর হাত পড়ে চম্পাবতীর বুকে। চম্পাবতীর ঘুম ভেঙে যায়। প্রথম দর্শনেই গাজীর রূপ দেখে চম্পাবতী বিমোহিত হয়ে যায়। পরিচয় হয় তাদের দুজনের। চম্পাবতী, ভাগ্য শুনে দেখে গাজীই তার স্বামী। মুখের পান বদল ও হাতের আংটি বদল করে তাদের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। দুজনে আবার নিদ্রায় গেলে পরীরা গাজীকে নিয়ে সোনাপুর চলে আসে। ঘুম ভেঙে গেলে গাজী চম্পার জন্য পাগল হয়ে যায়। কালুকে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে পাঠায়। কালু বন্দি হয় মুকুট রাজার হাতে। গাজী জানতে পেরে বনের বাঘ নিয়ে যুদ্ধে নেমে যায় দক্ষিণ রায়ের সাথে। শুরু হয় পীর আর দেবতার লড়াই। বাঘ ও কুমিরের লড়াইয়ে মুকুট রাজের শক্তির কাছে গাজী প্রায় সর্বশান্ত হয়ে যায়। গাজী গো-মাংস দিয়ে মুকুট রাজার ‘মৃত্যুজীব কুপ’ ধ্বংস করে। আর ‘আশা’ ও ‘খড়ম’ দিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে গাজী মুকুট রাজাকে পরাজিত করে। পরাজিত রাজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং গাজী-চম্পাবতীর বিয়ে দেয়। রাজপুরীতে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর গাজী, কালু ও চম্পাবতী পাতালপুরে জুলহাসকে নিয়ে বৈরাট নগরে চলে আসে পিতা মাতার কাছে। তাদের সুখের মিলন হয়। দক্ষিণবঙ্গে সাধারণত সাতটি স্বতন্ত্র পালায় এ ধরনের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার আসর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। পালাগুলি হলো- ১.বিয়ের পালা, ২.দিদার বাদশার পালা, ৩.ধর্ম-বাদশার পালা, ৪.এরেঙ বাদশার পালা, ৫.তাইজুল বাদশার পালা, ৬.তারা ডাকাতের পালা এবং ৭.জামাল বাদশার পালা। তবে গাজীর গানের যে কোনো পালা শুরুর আগে গাজীর স্মরণ ডাকা উপলক্ষে এক প্রকার আবশ্যিকভাবেই ফোকরে পালা অভিনীত হয়ে থাকে। ফোকরে পালাতে মূলত গাজী ও কালুর ফকির হবার কাহিনি ব্যক্ত হয়।
অষ্টক গান:
বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার প্রণয়লীলা বিষয়ক আখ্যান ও লোকপুরাণ অবলম্বনে ‘অষ্টক গান’ বা ‘অষ্ট গান’ পরিবেশিত হয়ে থাকে। এ ধরনের পরিবেশনাতে গ্রামের ছেলেরা কৃষ্ণ, রাধা ও রাধা-সখী সেজে দুই দলে বিভক্ত হয়ে গান ও নাচ সহযোগে সাধারণত রাধা-কৃষ্ণের নৌকাবিলাস পালার অভিনয় করে থাকেন। অষ্টক গানের নামকরণ সম্পর্কে নানামত প্রচলিত আছে। কেউ কেউ বলেন, এতে আটটি বৈষ্ণবীয় প্রসঙ্গ আছে, কেউ বলেন আটজনে মিলে রাধা-কৃষ্ণের উক্তি-প্রত্যুক্তিমূলক নাট্যধর্মী গীত পরিবেশন করা হয় বলে এর নাম অষ্টক গান। ভিন্ন মতে জানা যায়, এটি শ্রীকৃষ্ণের অষ্ট প্রহরের লীলা সংক্রান্ত নাট্যগীত বলে একে অষ্টক গান বলা হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে বৃন্দাবন অঞ্চলে আটজন বৈষ্ণব সাধক ও সংগীতকারের (কন্তন দাস, কৃষ্ণ দাস, গোবিন্দ দাস, চতুর্ভুজ দাস, চিৎস্বামী, নন্দ দাস, পরমানন্দ দাস ও সুরদাস) সম্মিলিত রচনা সমগ্র ‘অষ্টছাপ’ হিসাবে খ্যাত। সম্ভবত এ অষ্টছাপ গীতির শিব, রাম ও কৃষ্ণ সম্পর্কিত গানগুলোই অষ্ট গান হিসেবে গীত হয়ে থাকে। বিষয়বৈচিত্র্যের কারণে সম্ভবত শ্রীচৈতন্য ও বেহুলা-লখাই সর্বোপরি সমসাময়িক ঘটনাবলিও এ গানে যুক্ত হয়েছে। এ গান ‘অষ্টগান’, ‘অষ্টক গান’, ‘অষ্টক যাত্রা’ বা ‘অষ্টক পালা’ ইত্যাদি নামেও যশোর-খুলনার বিভিন্ন অঞ্চলে গাওয়া হতো।
বাংলাদেশের রাজশাহী, কুষ্টিয়া, পাবনা, রংপুর, যশোর, বরিশাল, ঝিনাইদহ, মাগুরা ও খুলনা অঞ্চলে অষ্টগানের প্রাচীন অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও এর ব্যাপকতা ছিল দক্ষিণ অঞ্চলে। এ গান দলগতভাবে গীত হয় বলেই এতে নাটকীয় উপাদান যথেষ্ট থাকে। অষ্টক গান বছরের সুনির্দিষ্ট দু’একটি সময়, অর্থাৎ চৈত্রসংক্রান্তি ও জন্মাষ্টমীতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ফরিদপুর, যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ অঞ্চলে এ ধরনের পরিবেশনা দিনের বেলাতে হলেও নড়াইল ও খুলনা অঞ্চলের কোথাও কোথাও এ গীতিনৃত্যাভিনয় রাতের বেলায় অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া ও তেরখাদার কিছু অঞ্চলে অষ্টক গান নামমাত্র টিকে আছে।
রয়ানী গান:
দক্ষিণবঙ্গের বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে ‘রয়ানী গান’ নামে পদ্মাপুরাণের জনপ্রিয় পরিবেশনারীতি প্রচলিত রয়েছে। সারাদেশের ঐতিহ্যবাহী নাট্যধারার মধ্যে এটি একটি ব্যতিক্রমী পরিবেশারীতি। কেননা, ‘অন্যান্য পরিবেশনারীতিতে যেখানে সাধারণত পুরুষেরাই অভিনয় করে থাকেন এবং নারীর চরিত্রাভিনয়ের প্রয়োজন হলে যেখানে পুরুষেরাই নারী সেজে অভিনয়ে অংশ নেন সেখানে বরিশাল অঞ্চলের রয়ানী গান পরিবেশনকারী প্রধান শিল্পী-কুশীলবগণ হচ্ছেন নারী।’ রয়ারী গানের দলে পুরুষেরা প্রধানত বাদ্যযন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে। তবে, দু’একটি ক্ষুদ্র ও হাস্যরসাত্মক প্রক্ষিপ্ত অভিনয়ের ক্ষেত্রে বাদ্যযন্ত্রী দল থেকে উঠে দাঁড়িয়ে কোনো কোনো পুরুষ কুশীলবকে অভিনয়ে অংশ নিতে দেখা যায়। রয়ানীর নামকরণ প্রসঙ্গে বলা হয়:
রয়ানী মব্দটি ‘রওয়ানা’ বা যাত্রা অর্থে ব্যবহৃত হয়। আবার কারো কারো মতে, জাগরণ পালা হিসেবে রয়ানী শব্দটি প্রচলিত। আসলে সংস্কৃত ‘রজনী’ হতে ‘রয়ানী’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। আগে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সাধারণত রাতের বেলা জাগরণ পালা আকারে মনসামঙ্গল বা পদ্মপুরাণ গান গাওয়া হতো বলে এ ধরনের পরিবেশনারীতি স্থানীয় মানুষের কাছে ‘রয়ানী গান’ নামে পরিচিতি পেয়ে যায়।
বর্তমান অবস্থা ও শিল্পী-কুশীলব : দক্ষিণবঙ্গে প্রচলিত মনসামঙ্গলের বিখ্যাত কবি বিজয়গুপ্তের বাড়ি বরিশালের গৈলা থানার ফুলেশ্বরী গ্রামে প্রতি বছর শ্রাবণ-সংক্রান্তিতে মনসা পূজা উপলক্ষ্যে অসংখ্য ভক্ত সমাগম ঘটে। সেখানে দক্ষিণবঙ্গের বহু রয়ানী গানের দল এসে এ ধরনের গানের আসর করে থাকেন। একই সময়ে বৃহত্তর বরিশাল জেলার বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি অঞ্চলের আরও অনেক গ্রামে রয়ানী গানের আসর বসে থাকে। এছাড়া, বিভিন্ন মানতে উক্ত অঞ্চলে প্রায় সারা বছরই রয়ানী গানের আসর বসে। বাগেরহাট জেলার বিখ্যাত রয়ানী গানের দল হলো- মোড়েলগঞ্জ থানার শৌলখালি গ্রামের শ্রীমীরা সম্প্রদায়। এই দলের মাস্টার হলেন মনোরঞ্জন ডাকুয়া। মূলগায়েন হলেন মীরা রাণী মিস্ত্রি এবং অন্যান্য গায়েন হলেন – মায়া রাণী বৈরাগী এবং উজ্জ্বলা সাহা। এই দলটি প্রায় নিয়মিতভাবে সারা বছর বিভিন্ন মানতে বায়নার ভিত্তিতে রয়ানী গান পরিবেশন করে থাকে।
জবগান:
জবগান বর্গা চাষীদের গান হলেও এ জব কখনোই যব (ফসল) নয়। ‘জবাব’ বা ‘জওয়াব’ অর্থে শব্দটি ব্যবহৃত। বাগেরহাট জেলার রামপাল এলাকায় প্রচলিত একটি শব্দ ‘জবা-জোবি’ থেকেই জবগানের নামকরণ করা হয়েছে, তা এ গানের উপস্থাপনা ভঙ্গি ‘জবা-জোবি’ শব্দটি একটু বিশ্লেষণ করলেই সহজে বুঝতে পারা যায়। সাধারণত দুজনের মধ্যে মত ভিন্নতার কারণে যুক্তি ও পাল্টা-যুক্তি এরূপ বাক্য বিনিময়কে আমরা তর্ক-বিতর্ক বলে থাকি। রামপাল অঞ্চলে স্থানীয় ভাষায় এ ধরনের বিতর্ককে বলা হয় ‘জবা-জোবি’। আরবি ‘জওয়াব’ শব্দের অর্থ হলো উত্তর বা জবাব। ‘জওয়াব’ শব্দটি এ অঞ্চলের আঞ্চলিক শব্দ ‘জব’। কানে কানে যে কথা হয় তাকে বলে কানা-কানি, লাঠিতে লাঠিতে মারামারি হলে লাঠা-লাঠি, তেমনি জবে-জবে যে বিতর্ক বা দ্বন্দ্ব তাই হলো ‘জবা-জোবি’। সম্ভবত গানের মাধ্যমে এরূপ একটি বিষয় উপস্থাপিত হওয়ার কারণে এ গানের নামকরণ করা হয়েছে ‘জবগান’।
এ গান বিষয়ভিত্তিক হয়ে থাকে। গানের বিষয়বস্তু অনুসারে স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, দেবর-ভাবী, বাপ-ছেলে, চাচা-ভাতিজা প্রমুখ একজোড়া মুখ্য অভিনেতা থাকে। যারা একে অপরের সাথে একটি বিষয় নিয়ে বিতর্কে অবতীর্ণ হন। সরস খুঁনসুটি, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ও প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে অভিনেতাদ্বয়ের মাঝে সমঝোতা বা মধুর সম্পর্ক তৈরির মধ্য দিয়ে গানের পরিসমাপ্তি ঘটে। জবগান খুলনা অঞ্চলের গান। যতদূর জানা যায় বর্তমান খুলনা জেলার রূপসা, মংলা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও বাগেরহাটের রামপাল অঞ্চলে জবগান গীত হতো। আনুমানিক প্রায় তিনশত বছর আগে জবগানের উদ্ভব ঘটে এবং মাত্র একশত বছরের মধ্যে তা আবার হারিয়ে যায়। গানে গানে জবা-জোবির নমুনা:
পচার বাপ : সুজন, বিজন, হারান, গফুর হাল জুড়িছে মাঠে
(আর) আমার বিবি অ্যাহোন তলি বিছেনে নাক ডাহে।
মোরোগে বাঁক্ থামালো, ফজরের আজান হলো
অ্যাহোনো নুয়াবযাদীর চোখ মেলালো না।।
পচার মা : এতো ডাহা ডাহি আমার ভাল নাগে না।
ঐ বাপের বাড়ি গেলি কলাম আর আস্পো না।
খালি কও চ্যাটাং কথা, আরো তাতে রূপির খুটা
এমন মরদ আগে জানলি কবুল করতাম না।।
পচার বাপ : আমি ডাহি, পচা ডাহে, ডাহে ঝড়–র মা
আর ঘোমের ঘোরে পাশ ফিরে শোয় আমার পচার মা।
গেলরে বেলা উঠে, কহোন আর যাবো মাঠে
জানলি অমন সুন্দরী বউ বিয়ে করতাম না।।
গানে গানে জবা-জোবি বা তর্ক-বির্তক ছাড়াও অনেকে ক্ষেত্রে জবগানে নাটকীয় গদ্য-সংলাপেও বিতর্ক চলে। গানে গানে কিংবা গদ্যে যা-ই হোক না কেন, এ গানের মধ্যে যে নাটকীয় দ্বন্দ্ব-মধুর অবস্থাটি উপস্থাপিত হয় তার তুলনা বিরল। এ গান যশোর-খুলনা অঞ্চলে ছাড়া বাংলাদেশের অন্য কোনো জেলায় দেখা যায় না। বর্তমানে এ জবগানের চর্চা নেই বললেই চলে। তবে খুলনার বিশিষ্ট লোকসংস্কৃতি গবেষক, সুরকার বাসুদেব বিশ্বাস বাব্লা বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে মাঝে মাঝে গেয়ে থাকেন। বেশ পুরনো আঙ্গিক হওয়ায় বর্তমান কালের দর্শক-শ্রোতার পক্ষে বাসুদেব বিশ্বাসের একক গাওয়া গানের নাটকীয়তা বোঝা খানিকটা কষ্টকরও বটে। সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য ডিসিপ্লিনের শিক্ষক ড. রুবেল আনছার বিশ্ববিদ্যালয়ে বসন্ত-বরণ অনুষ্ঠানে উল্লিখিত জবগানটি অভিনয় সমেত (পচার বাপ চরিত্রে তিনি নিজে এবং পচার মা চরিত্রে ফারহানা রহমান টুম্পা) পরিবেশন করলে এর নাটকীয়তা সম্পর্কে দর্শকের একটা স্পষ্ট ধারণা লাভ হয়।
হালৈগান:
খুলনা ও তৎসংলগ্ন কিছু অঞ্চল ছাড়া বাংলাদেশের আর কোথাও হালৈগানের বিস্তার বা প্রসার ঘটেনি। ‘খুলনার আদি বাসিন্দাদের একটি অংশ ছিল পুণ্ড্র, যার অপভ্রংশ হলো ‘পোদ’। এদের প্রধান জীবিকা ‘হাল কর্ষণ’ হওয়ায় এদেরকে হালো পোদও বলা হয়ে থাকে। আর এ বিষয়টি সন্দেহাতীতভাবে সত্য যে, এই হালোদের গানই হলো ‘হালৈগান’। গানে ব্যবহৃত কথাবার্তা, বিষয়বস্তু এবং সর্বোপরি ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে দেখা তথ্য উপাত্তর আলোকে বিচার বিশ্লেষণ করলে এ সত্যটুকু মেনে নিতে কষ্ট হবে বলে মনে হয় না।’ বর্তমানে ‘হালৈগান’ সব জায়গাতে ‘হালৈগান’ নাম দিয়ে টিকে নেই। খুলনার যেসব এলাকায় লোকঐতিহ্যের সুপ্রাচীন ধারাটি কোনো মতে টিকে আছে সেসব এলাকায় প্রকৃত ‘হালৈ গান’ ভিন্ন ভিন্ন নামে তিনটি অঞ্চলে এখনও চৈত্র ও পৌষ সংক্রান্তিতে গীতাকারে অভিনীত হয়ে থাকে।
বালা গান:
বর্ধমানের বোলান গান আর দক্ষিণ খুলনার বালা গান মূলত একই ধারার গান। এ গান একই সময়, একই পার্বণে গীত হয়ে থাকে। বালা গান যারা পরিবেশন করেন তাদের গাজন সন্ন্যাসী, বালা সন্ন্যাসী, ভক্ত্যা বা ভক্তিয়া বলা হয়ে থাকে। চৈত্র-সংক্রান্তিতে গাজন উৎসবকে কেন্দ্র করে খুলনার বটিয়াঘাটা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, কয়রা প্রভৃতি অঞ্চলে এখনও স্বল্প পরিসরে বালা গান গীত হয়ে থাকে। সম্ভবত এ বালা গান দক্ষিণ খুলনা অঞ্চলের প্রাচীন জাতি গোষ্ঠীর পুণ্ড্র ক্ষত্রিয়রা এ অঞ্চলে নিয়ে আসে। যা এখন পর্যন্ত তাদের মধ্যেই সীমিত। তবে এই বালা গান সমগ্র খুলনায় তথা সারা দেশে প্রচার না ঘটলেও ক্ষত্রিয়দের মধ্যে ব্যাপক প্রচলিত। চৈত্র-সংক্রান্তিতে একাধিক দল সাত বা পনেরো দিন ধরে প্রায় প্রতি বাড়িতে অথবা স্থানীয় নির্দিষ্ট স্থানে এ গান পরিবেশন করে থাকে।
বালা গানের উৎপত্তি ঠিক কোন স্থানে হয়েছিল তা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। তবে এ গান বর্ধমান হয়ে রাজশাহী অঞ্চল দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তারপর ক্ষত্রিয়দের মাধ্যমে খুলনায় প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বর্তমানে আট প্রকারের বালা গান টিকে থাকলেও তার আদি রূপ অক্ষুণœ নেই। সময়োপযোগী করে তুলতে গায়েনরা তাদের সুবিধা মতো এক একটি গানের মধ্যে থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে মূল ঘটনাটি ঠিক রেখে পরিবেশন করে থাকেন। বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের কোথাও কোথাও বালা গান গীত হলেও এ গান মূলত খুলনার বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা, কয়রা, দাকোপ, ডুমুরিয়া থানা এবং বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার কিছু কিছু অংশে ব্যাপকভাবে গীত হয়ে থাকে।
পটগান:
পটগানের নাম থেকেই ধারণা করা যায় যে, পটগানের মধ্যে ছবি সম্পর্কিত একটি বিষয় জড়িত। পট্ শব্দের অর্থ হলো ছবি। গোল করে পেঁচানো লম্বা সাদা কাগজে পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত ধারাবাহিক কিছু সাদামাটা পট্ অঙ্কন করে গানের মাধ্যমে সেগুলো নেচে নেচে বর্ণনা বা ব্যাখ্যা করাই হলো পটগান।
পটগান কবে শুরু হয়েছিল তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা না গেলেও মোটামুটিভাবে ধারণা করা যায় যে, ‘পটগান ইংরেজ আমলের শেষ ভাগে অর্থাৎ ১৯৪৫ থেকে ১৯৫০ সনের মধ্যে কোনো এক সময় বর্তমানের খুলনা সদরে এই গায়ন পদ্ধতি শুরু হয়েছিল।’ আবার কালের ¯্রােতে মাত্র অর্ধ-শতাব্দী কালের মধ্যেই পটগান লুপ্ত প্রায় গীত পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। শহর অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষের কাছে পটগান একটি অজানা অধ্যায়। শুরু থেকে পটগান মূলত কিশোর বয়সের ছেলেমেয়েদের পার্বণ উপলক্ষে অর্থ সংগ্রহের প্রিয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেই ধারা আজও রক্ষিত আছে। প্রধানত চৈত্র-সংক্রান্তির দু’এক সপ্তাহ আগে থেকে পটগানের দল পট্ গাইতে নেমে পড়ে। এর মধ্যে নাটকীয়তা সম্পর্কে সমালোচক বলেন:
পট্ গান অভিনয় সম্বলিত গান হিসাবে ধরাই যুক্তিযুক্ত। কারণ গানের আসর শুরুতেই বাদ্যের তালে নৃত্য করতে করতে পালকি বহন করার মতো করে পট্ কাঁধে করে বহন করে আনতে হয়। তারপর পট্ মেলে ধরলে মূল গায়েন (শিল্পী) একটি লাঠির সাহায্যে একটি পট্ নির্দেশ করে সে সম্পর্কে গান পরিবেশন করে।
মানিক পীর ও মানিক পীরের গান:
বাংলাদেশের অনৈতিহাসিক পীরদের মধ্যে মানিক পীরের প্রভাব অতি ব্যাপক। এদেশের মানুষ এ পীরকে কেন্দ্র করে ‘মানিক পীরের গান’ নামে এক ধরনের ভক্তিমূলক নৃত্য-গীত পরিবেশন করে থাকে। মৌখিকরীতির এ ভক্তিমূলক পরিবেশনার পাশাপাশি এর লেখ্যরীতির পুঁথিও বিভিন্ন অঞ্চলে পরিদৃষ্ট। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রাজশাহী, নাটোর, রংপুর, দিনাজপুর; দক্ষিণবঙ্গের জেলার মধ্যে যশোর, খুলনা ছাড়াও ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ প্রভৃতি অঞ্চলে নানা অঙ্গিকে বা রীতিতে এ গান পরিবেশিত হয়ে থাকে। সাধারণত চারটি পালায় বিভক্ত করে মানিক পীরের গান পরিবেশন করা হয়। পালাগুলো হচ্ছে- ১. জন্মপালা, ২. বিদায় বা ফকরে পালা, ৩. জাহিরি বা ভিক্ষে করা পালা এবং ৪. মৃত্যু ও জিলানে পালা।
মানিক পীরের গানের আখ্যানে জানা যায় কলম বাদশা নামে একজন বাদশা ছিলেন। তার টাকা-পয়সার কোন অভাব ছিলো না। শুধু একটা সন্তানের অভাব ছিলো। কারণ বাদশার কোনো সন্তান ছিলো না। আর নিঃসন্তান করম বাদশার স্ত্রী দুধবিবির সন্তান প্রার্থনার ক্রন্দনে আল্লাহর আসন টলে ওঠে। আল্লাহ তখন জিবরাইলকে ডেকে মহাত্ম মানিকপীরকে করম বাদশার ঘরে জন্ম নেওয়ার কথা বলে দেন। আল্লার আদেশমতো জিবরাইল ফুলবাগান থেকে মানিকপীরকে ডেকে করম বাদশার ঘরে যেতে আদেশ করেন। সেই আদেশে মানিক পীর রওনা দেয় করম বাদশার ঘরে।ওইদিকে আল্লার ইচ্ছায় করম বাদশা আর দুধবিবির মিলন হয়ে যায়।
কবিগান:
উৎপত্তিকাল হতে আজ পর্যন্ত পরিশীলিত হতে না পারলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে কবিগান একটি জনপ্রিয় বিনোদনের মাধ্যম। ধারণা করা হয়, বাংলার এ কবিগান অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকের কোনো এক সময় তৎকালীন বাবুদের মনোরঞ্জনের নিমিত্তে বিতর্কমূলক খিস্তি খেউড় হিসেবে পরিবেশিত হতো। ঠিক কোন সময় বাংলাদেশ তথা পূর্ববঙ্গে কবিগানের যাত্রা শুরু হয়েছিল সে সংক্রান্ত সঠিক তথ্য আবিষ্কার সম্ভব হয়নি। ‘বাংলাদেশের ময়মনসিংহের বিশিষ্ট কবিয়াল বিজয় নারায়ণ আচার্য (১৮৬৮-১৯২৭) কবিগানের উৎপত্তিকাল সম্পর্কে ১৩২৩ বঙ্গাব্দের (১৯১৬ খ্রীস্টাব্দে) আষাঢ় মাসে প্রকাশিত সৌরভ পত্রিকায় লিখেছেন- ‘অনেকে অনুমান করেন যে,—বিখ্যাত কবি নারায়ণ দেবের পদ্মপূরাণ বা মনসার ভাসান রচনার কিছুকাল পূর্ব হইতে এস্থানে (ময়মনসিংহ) কবিগানের প্রচলন আরম্ভ হইয়াছে।’ বিজয় নারায়ণ আচার্যের এই অনুমান যদি সত্যি হয় তবেই কেবল বলা যাবে যে, কবিগানের উৎপত্তিস্থল পশ্চিমবঙ্গে নয়, পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশ। এবং সেটা হয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতে।
কবিগান কোনো কোনো অঞ্চলে কবির লড়াই নামেও পরিচিত। গানে গানে দুজন কবিয়ালের তর্ক-বিতর্ক চলে বলে একে লড়াই বলা হয়ে থাকে। তবে যা-ই হোক, নাটকীয় সেই লড়াই বেশ উপভোগ্য। খুলনা অঞ্চলে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধে দ্বারিক বিশ্বাস; ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে বিধু সরকার, কাশী নাথ, হরিবর সরকার, রাজেন্দ্র চন্দ্র বিশ্বাস,নদের চাঁদ সরকার, স্বামী মহানন্দ, অশ্বিনী কুমার সরকার; বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধে রাজেন্দ্র সরকার, হরিহর সরকার, মনহর সরকার, নারান সরকার, নিশিকান্ত সরকার, (বড়) দেবেন্দ্র নাথ সরকার, রসিক লাল সরকার, অনাদি সরকার, বিনয় সরকার, প্রিয়নাথ সরকার, ছোট হরিহর, শরৎ সরকার, কালিপদ সরকার, স্বরূপ সরকার, দিগেন সরকার, দ্বিজেন সরকার, রসময় সরকার, সরোজ সরকার, নিখিল সরকার, বিনয় সরকার-২, ছোট রজনী, বড় রজনী, মহিম বিশ্বাস, শশী সরকার, যাদব গুহ, মেঘু বয়াতী, নিশিকান্ত সরকার প্রমুখ বিখ্যাত কবিয়াল ছিলেন।
যশোর অঞ্চলে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধে কাশিনাথ সরকার, সূর্য নারায়ণ, কালিচরণ; ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে অক্ষর দাস বৈরাগী, আনন্দ সরকার, কালীচরণ দাস, পঞ্চানন দত্ত, রাশ মোহন দাস, সূর্য কুমার চক্রবর্তী, তারক চাঁদ সরকার; বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্দ্ধে বিজয় কৃষ্ণ অধিকারী, বিজয় সরকার, নবীন বসু, মধুসুদন সরকার প্রমুখ জনপ্রিয় কবিয়াল কবিগানের আসর জমাতেন।
দক্ষিণবঙ্গে এ ছাড়াও নানা ধরনের লোকনাট্য চর্চা হতো। তার অধিকাংশই আজ বিলুপ্ত হয়েছে। তবে এখনো কিছু কিছু লোকনাট্য গ্রামে-গঞ্জে মাঝে মাঝে পরিবেশিত হয়। এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এ লোকনাট্য চর্চার তাই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কেননা এর মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্য, জীবন-কৃষ্টি ও প্রথা-পদ্ধতির সম্যক পরিচয় আমাদের সামনে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।