মুহাম্মদ ইসমাঈল
শ্রেষ্ঠ নক্ষত্র
সব শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে
নিরাকার এক নক্ষত্র
সব শ্রেষ্ঠ গ্রন্থের দরজা খুললেই ভোর
যে ভোরের প্রবাহ মিশে আছে একই মোহনায়।
যেমন :
আইনস্টাইন
হোমার
গ্যালিলিও
শেলী
নিউটন
স্টেপিং হকিং
শেখ সাদী
জালাল উদ্দিন রুমি
আল্লামা ইকবাল
নজরুল
রবীন্দ্রনাথ
এবং তুমি সেই মহাকালের পরম্পরা॥
লিপু রহমান
হঠাৎ পাওয়া সময়ে
কোনো কোনো সময় আমার
সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটা সচল হয়,
তখন আমাকে আমি চিনি না
তখন আমাতে আমি থাকি না
তখন হই হিমাচল গল্পের পরী।
আমি তখন হয়ে যাই স্রোতস্বিনী নদী
কিংবা রোদেলা হলুদ অটবী
অথবা অপেক্ষারত হৈমন্তি মেঘলা আকাশ।
কে যেন গহিন নিদ্রারত অন্তরে স্পর্শ করে
ধোঁয়াশার ভিতরে দেখি, আমার
নকল আমি, যে আমার পরম বন্ধু
একাকিত্বের রঙে
নর্তকীর ঢঙে
অসহায়ের টঙে
কিংবা অগোছালো শব্দের প্রতিশব্দে।
কোনো কোনো সময় আমার
অসহ্য রোদের মতো আসে
গায়ে বিশ্রী গন্ধ হয়,
পারফিউমে তা আরো দগদগে হয়
কষ্ট পেলেও আঘাত লাগে না।
অদৃশ্য ভাঙা কাচের দাগ-
আরো গভীর থেকে গভীরতর হয়।
মুহাম্মদ ফজলুল হক
নিষ্ফল রোদন
দীর্ঘ পথ চলে ক্লান্ত হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছি
অথচ আরো অনেকটুকু পথ পাড়ি দিতে হবে
উইলো গাছের পাতাগুলো ঝরে ঝরে কমে যাচ্ছে
কিন্তু নতুন পাতা গজাচ্ছে না!
বিপবী হব নাকি প্রেমিক হব ভাবতে ভাবতে দ্বিপ্রহর শেষ
বিপব কিংবা প্রেম কিছুই হলো না
সন্ন্যাসীকে বললাম দীক্ষা দিতে কিন্তু দিলেন না
শতাব্দীর দেয়াল লিখনগুলো ঝাপসা ম্রিয়মাণ
দেয়ালে লিখার মতো জায়গা নেই, মুছে ফেলো কিছু
বন্ধুত্বের ইটগুলো খসে খসে পড়ে এলোমেলো
ভালোবাসার পাপড়িগুলো একে একে ঝরে যায়
বিশ্বাসের দেয়ালটাতে অনেকগুলো ফাটল
আর বিশ্বস্ততার দরজা জানালায় কপাট নেই
বিকেলের বিস্তীর্ণ মরুরাশিতে পথ ফিরে তাকাই
ফেলে আসা পদচিহ্নগুলো অবশিষ্ট নেই পেছনে
বেলা শেষে বনস্পতির ছায়ায় ঠাঁই নেব বলে
কোন ছায়াই পেলুম না এমন কি নিজের ছায়াও
শেষে ঠাঁই হলো বল্কলের খাঁজে, সাথে এক দীর্ঘশ্বাস
উইপোকারা দানা বাঁধছে আমার কবিতার বই খাবে বলে
উইলো গাছে আর একটি পাতাও অবশিষ্ট নাই
আছে শুধু মর্মর, ঝড়ের পূর্ব রাত্রির নিস্তব্ধতা
সংগীত সুর সব থেমে নিস্তব্ধ নিরালা
হিম শীতল এক শূন্য, মহা শূন্য, শুধুই শূন্য।
ইশ্ যদি আরেকটা ভোর হতো
যদি আরেকটি বসন্ত আসতো
যদি উইলো গাছে আবার পাতা গজাতো
যদি আরেকটা কবিতা লিখতে পারতাম!
মীর জাহান
এপার ওপার
ওপার হতে ডাক এলো আজ এসো
তারার পানে সাড়া ভালোবেসো।
ওপারের চোখ – স্বাচ্ছন্দ্য চলায়,
অপার হাসি নীরব ভাষা বলায়।
শব্দে দু’জন গাঁথছি কথার মালা,
স্বপ্ন বুনন মনের বাঁশিওয়ালা।
সুর যে বাজে ওপার থেকে এসে,
মেঘ এখানে কপাট খোলে শেষে ।
ওপার বসে হাজার আঁকিবুকি,
এপার সুখে কেবল আকাশমুখী।
চুঁইয়ে পড়া নিবিড় প্রাণের সুর,
এপার ওপার ভাঙে সমুদ্দুর।
বাঁধলো বাসা সবুজ দক্ষিণ কোণে,
এপর ওপার সেই মধুসুর শোনে।
আহমেদ শরীফ শুভ
সুন্দরবন
আমরা তাকে মৃত্যুদন্ড দিলাম
আলো আর তাপের ক্ষুধায়
মৃত্যু হবে তিলে তিলে
বুলেটে নয় ফাঁসিতেও নয়, মৃত্যু হবে চিতায়
মেয়েটি এখন রাত গভীরে ডুকরে কাঁদে
হরিণ মায়া চোখে ঝরায় পশুর নদীর জল
শোকের মিছিলে চার পায়ে হাঁটে
কিংবদন্তি কিছু, দিকভ্রান্ত
হাঁটে কর্কটের চিহ্নমাখা আমাদের ফুসফুস
এই তবে সহমরণ!
যদিও নেই ব্রাহ্ম সমাজ তবু খুঁজে ফিরি রাম মোহন।
সাগরের উলাস শুনি
আইলা সিডরে খুবলে নেবে বাদামি মানুষের বদ্বীপ
মেয়েটি আর কোনদিন বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে না প্রতিরোধে
চিতায় পুড়বে শব
আমাদের তবু আলো চাই, আরো বেশি আলো
কালো কালো আলো বরফ শীতল তাপ
কয়লা আসছে কয়লা ভাসছে চিতায় জ্বলবে আগুন।
আদ্যনাথ ঘোষ
গন্তব্য
তোমার হৃদয়ের গোপন গান
বসন্ত বাতাসের ডানায় ভর করে
সকলকে ছাড়িয়ে সব পথ ফেলে
আকাশের পানে মেঘের রাজ্যে
কেন বারে বারে উড়ে যায়
ফেলিয়া তোমার দেহ-তনু-মন
কাহারে ভালোবাসো সখি?
নিবিড় ভালোবাসার সংগীতে
কী গান শোনো অই নক্ষত্রপুঞ্জে
আর দূর অশেষ নীলিমার কানে
কী চাওয়া তোমার গোপন প্রাণে
তোমাকে পাবার আশায়
ঝরাপাতার মতো নিজেরে ছেড়ে
বহুবার তোমার বৃক্ষতলে
লুটিয়ে পড়েছি চৈতি হাওয়ার দাপটে
ঘুমাতে চেয়েছে সে
তোমার ছায়াতলে
পাতাহীন তুমিও মৃত বৃক্ষের মতো
আকাশে মেলে ডানা
হারিয়ে ছিলে তুমি
আপন স্বর্গ ভুবনে।
মিজান মনির
অপ্রত্যাশিত
বিচিত্র রং-এ একফ্রেমে বন্দি
বদলে যায় জীবন, বদলে যায় সময়
স্বপ্নেরা লুকোচুরি খেলে এখানে-ওখানে
থেমে যায় কতক জীবন
একফোঁটা শিশির বিন্দুর প্রত্যাশী
তপ্ত বালিয়াড়ির সাথে সন্ধি।
জাহাঙ্গীর হোসেন বাদশাহ
ইতিহাস
খরগোশের চোখে কতটা ক্ষুদ্র হতে পারে সূর্য?
হয়ত জানো; তুমি।
হয়ত জানো- হুটতোলা রিকশায় উড়ে যায় ক’টা ফড়িং কিংবা
বারো মাসে চাঁদ কতবার হয় লাশ?
হয়ত- ভালো করে’ই জানো।
কবিতা- আমি এসবের হিসেব রাখি না।
তুমি জানো- কতটা দীর্ঘ হতে পারে সূর্যের সমীকরণ?
একটা রাত কতবার ল্যাংটা হয়?
কুকুরের প্রেমে মরে যায় কত মাছি?
আলোকবর্ষদে কত তারাদের সহবাস?
তুমি জানো না?
পায়ে পায়ে বেড়ে ওঠা সমুদ্র- আমি ।
নেড়েচেড়ে দেখ; কত ইতিহাস লুকানো !
ফরিদা ইয়াসমিন সুমি
বীজপত্র
অন্তরের গভীরে দৃষ্টিপাত করো, দেখবে
লাল-নীল পাথরের নীরব বসবাস
পাহাড়ের কান্নায় ধুয়ে যাচ্ছে তাদের বুকের সব রঙ,
প্রোথিত আছে সারিসারি গুল্ম, বৃক্ষরাজি
এলোমেলো উপড়ানো রয়েছে কিছু সমূলে!
আরো গভীরে যাও- দেখতে পাবে
টকটকে লালরক্ত গোলাপের স্নিগ্ধকর ঝাড়
আগাছার প্রচুর তাস ঠিক বাড়তে দিচ্ছে না তাদের,
বিষন্নতা নীল নদীর বুকে অস্তগামী সূর্যের লালিমা
মীনের চোখের মতোন পলকহীন শীতল রাত!
গভীর হতে গভীরে নামো-দেখবে
জাগ্রত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ জেগে আছে
রক্ত ক্ষরণের উদগীরণে ভেসে যাচ্ছে চারপাশ
প্রাচীন নগরীর ধ্বংসস্তূপের মতো ক্ষতের মাঝে
মাটি ফুঁড়ে সদ্য ওঠা জীবনের কাছে দায়বদ্ধ বীজপত্র।
রাসেল রায়হান
বর্ণবাদ
দু’মাস আগে যে যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছি, তা নারীর ত্বককে শঙ্খের মতো শাদা করে দেয়। ভেবেছিলাম এই যন্ত্র আফ্রিকার দেশগুলোতে বেশি চলবে। অথচ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ শাদা মহাদেশগুলির দু’ শ আটাশটি দেশ থেকে বারবার অর্ডার আসতে লাগল।
দ্রুত এমন কোনো যন্ত্র বানাব, যেটি নারীর চামড়াকে আবলুশ কাঠের মতো কালো করে দেবে। আফ্রিকা ও এশিয়ার মতো কালো মহাদেশগুলোকে অবহেলা করতে আমি রাজি নই।
রোকন জহুর
যদি ঘৃণায় ফিরিয়ে নাও মুখ
মিথ্যের সাথে ঘর করা যায় না যেনেও
স্বপ্ন দেখি বাঁচবার
কোন আলোয় পৃথিবীর এতো সুখ
দু’চোখ ভরে যায় জলে…
তোমার চোখের দিকে তাকাতে পারি না
স্বচ্ছতা বিশ্বাস নিয়ে- মনে হয় কঠিন অন্ধকারের দিকে
অবলীলায় হেঁটে যাই-
অসীম থেকে অনন্তে…
আমাকে ধরে দেখ- পুড়ে যেতে পার ক্ষণিকেই
ঠোঁটের ফাঁকে যে হাসি লেগে থাকে সারাক্ষণ
মুহূর্তেই বিলীন হতে পারে
ঘৃণায় ফিরে তাকাবে না হয়ত কোন দিন
বলবার কিছু নেই জেনেও ফিরে আসি একই রেখায়…
তোমাতে বিলীন হওয়ার সাধ ছিল
বহুকালের পুরনো-
যেভাবে আদম-হাওয়া মিশে ছিল কোন পর্বতে
সেই প্রতীক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়েছি-
প্রস্তুত আছি- অনন্ত আরাধনায়…
কষ্ট পোড়াতে পারিনি কোন দিন
শুধু চেয়ে চেয়ে মনে রেখেছি-
দেখা হতে পারে কোন অজানায়…
সাম্মি ইসলাম নীলা
অপেক্ষা
পৃথিবীতে নেমেছে গোধূলি বিকেল; অ-সমান গায়ে জড়িয়ে হলুদ শাড়ি; ফড়িং প্রজাপতির মেলা গালিচার উঠোনে। বেদনারা ঘিরে রেখেছে পথপ্রান্তর, অপেক্ষারা বৃষ্টি হয়ে ঝরে বাংলোর বাগান, সময় বোঝে না অসময়ের উপলক্ষ ঠোঁটের কোণে এক টুকরা উষ্ক হাসি মুহূর্তে ম্লান। চারপাশে শঙ্কা ধরেছে! আকাশ হারিয়ে যায় শহরের গহ্বরে। পশ্চিমের জানালায় ইহকালের শেষ বিকেল উবু হয়ে পড়ে আছে; সোনাঝরা অতীত রোদ উঁকি মেরে স্পর্শ করে আখেরি ঢেউ; অপেক্ষারা ফিরে কাঁদে অনিয়মের গোপালঘরে, নিয়ম বুঝে না পবিত্র অনুলিখন; উড়িয়েছি নীলার অসমাপ্ত কার্বন চিঠি।
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
আলো এখন
কালচে অন্ধকারে ভরে গেছে সমাজ।
একটুও আলো অবশিষ্ট নেই তার।
এই ক’টা দিন দেখলাম-দেখলাম ক’টা মাস।
দূষণে ভরেছে নদী
ভরে গেছে মানুষের মন।
নদী তো আগে নয়-মানুষ আগে
মানুষের মন।
খুন হচ্ছে একটা আলোর বিপরীত
ধর্ষণ হচ্ছে আরও একটা আলোর বিপরীত
আলোর পাল্টা শরীর।
আলো এখন অ-নে-ক বেকুব।
আলো এখন কোথায় দাঁড়াবে-জায়গা নেই।
জব্বার আল নাঈম
কবি বাঁচলে বাঁচবে সুশ্রী পৃথিবী
পড়ন্ত বিকেলে দীর্ঘ নদীর পাড় ঘেষে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি মহাবিশ্বের মানুষের কথা। হঠাৎ পেছনের পাহাড় ধসে পড়ার বিকট শব্দ শুনে বিচলিত হয় মন! এদিক-সেদিক ঘুরে তাকিয়ে দেখতে পাই- পেছনে মানুষের চেয়ে দুই গুণ বড় শরীরের একটি বিচ্ছু; আমার দিকে এগিয়ে আসছে; ভয়ে আঁতকে উঠি শিরা-উপশিরা, একি! আমাকে খেতে আসছে!
ভেতরে তখনও চিন্তারা ঘুরপাক খায়…
একটি কচ্ছপ নদী হতে ভেসে আসতে দেখে
বিচ্ছু লাফ দিয়ে-আকারে ছোট কচ্ছপের গায়ে বসে;
এরপর ভাসতে থাকে ত্রিভুবনের নদী। এমন দৃশ্য জীবনেও দেখিনি। না দেখলে অপূর্ণতা জড়িয়ে ধরবে; আমার কৌতূহল বেড়ে গেলো কয়েকগুণ।
শেষ দেখার তীব্র বাসনায় হাঁটা শুরু করি মাঝ নদী। যে নদীতে বড় বড় লঞ্চ, স্টিমার চলে। সেখানে আমার হাঁটুর সমান জল। কচ্ছপ অন্যপ্রান্তে থামলে বিচ্ছু লাফ দিয়ে নদী পাড়ে নামে।
কিছু দূরে
অনিন্দ্য বটবৃক্ষের নিচে
ঘুমিয়ে আছে
এক সুশ্রী যুবক
কচ্ছপসঙ্গ নিয়ে বিচ্ছু-সন্ত্রাসী এপাড়ে এসেছে যুবককে হত্যা করতে! সবকিছু তালগোল মনে হচ্ছিল যুবকের মাথার ওপর বিষাক্ত সাপের ফোঁস ফোঁস দেখে। ছোবল দিলে আরও নীল হয়ে যাবে পৃথিবী। ভাবনাগুলো এলোমেলো ভুল প্রমাণ করে বিচ্ছু লাফিয়ে সাপের মগজে বসে কামড় দেয়। বিকট শব্দে অনুশোচনার কম্পন তৈরি হয় মাটিতে। আমার মাথার ওপর কতগুলো রঙিন বেলুন উড়লে- সাপের মৃত্যু ঘটে।
বিচ্ছু পথ ধরে
পুনরায়
অপেক্ষমাণ কচ্ছপের পিঠে বসে…
সুশ্রী যুবকের কাছে গিয়ে দেখতে পাই, সে আমারই কবিআত্মা। বুঝতে পারি কবিরা অন্যজাতের। পৃথিবীর প্রাণ; তাজা ফুল।
কবিকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব, সমাজের সবার। কবিরা কষ্টের অবতার। কবিকে প্রাণভরে ভালোবাসুন।
সাইয়্যিদ মঞ্জু
বাউন্ডুলে জীবন
মধ্যরাতের আকাশ যেন কবিতার নগরী
কবিতার মুগ্ধতায় কেঁপে উঠে চারপাশ
চোখ মেলে কবিতার কাছে যাই
ভালোবাসায় বিমুগ্ধ বিশ্বাস স্থাপন করি
হৃদয়ে যে কাব্য প্রেম তা অনাদিকালের।
দৃশ্যকল্পের ভিতর হারিয়ে যাই
মনের ভিতর সৃষ্টি হয় দ্যোতনার
সব ভালোবাসা এসে কবিতায় হারায়
অদ্ভুত তন্ময়তার ভেতর নিজকে করি সমর্পণ।
কবিতার দেবীর সাথে হয়
মুগ্ধ দৃষ্টি বিনিময়
তার রূপের আগুন স্রোতে ভেসে যায়
যুগ-যুগান্তর।
সংসারে অশান্তির তাণ্ডব, বাউন্ডুলে জীবনে
ঘর বুঝি না, সংসার বুঝি না
কষ্টের কালিমায় লেপন করি যাপিত জীবন।
কাজী মোহিনী ইসলাম
বাসন্তী রঙ আঁচল
খোঁপার বাঁধন দেয় খুলে গো দক্ষিণ হাওয়া
রঙ বিলাসী এলো কি ওই বসন্ত আজ?
ব্যাকুল চোখের আকাশ হবো তোমার চোখে
বাজাও বাঁশি কোন সুদূরে যায় ভেঙে লাজ
বাঁশির সুরে লাগলো কাঁপন মাদল জোড়ায়
রেশমি চুড়ি পায়ের পায়েল উঠলো নেচে
কান পাশা আর নাকের নোলক সোনার বালা
ফুলের দামে আজ সবই তা দিলাম বেচে
তোমার সুরে সুর মেলানো বিভোর হৃদয়
এমন করে আর ডেকো না আকুল প্রাণে
বাসন্তী রঙ আঁচল উড়া আজ দুপুরে
চোখের পাতায় লাগলো আবেশ ফুলের ঘ্রাণে!
অরুণ পাঠক
লেখা
লেখাকে আক্রান্ত করে যে সহজ ছন্দটি ফিরে যায়
তার ঘরে পঙ্গু স্বামী, ছেলেটি অপুষ্টি রোগে ভুগছে
ছন্দ রোজ ভাগীরথীর পার হয়ে আসে আর সূর্যবৃত্তান্ত
রেখে যায় কবির টেবিলে, কবি তার সংজ্ঞা নয়, ছায়ায় মুগ্ধ
অন্ধকারে পেড়ে ফেলা বুক, মুখে শুদ্ধ সরস্বতীযোগ
যেন কোনও ওষধির গুণে রাজ্যপাট বুনে যায় বিভাব সা¤্রাজ্যে
রুগ্ন লেখা, মনযোগহীন, তাকে দেখে চিন্তিত কবিটি
যান ছন্দের বাড়িতে, তখন সে অপাবৃতা, নিষ্পাপ কুমারী
লেখাটিকে নয়, লেখাটির অন্তর্গতে যে সমুদ্র থাকে
তাকে শুধু অপরিচিত একটি নদীতে ঢুকিয়ে দিতে হয়
ফাহিম ফিরোজ
পূবালিনামা
পুকুরটা যখন আমার হল- একেবারে দলিল সমৃদ্ধ
তার আগে, সেখানে গোপন এক শোল খেলছিল। তখন এতটা
ঘেঁটে দেখেনি। অথচ ভেবেছি বিশ্বাসী ফলি মাছ আছে পাশে
পূবালি প্রথম আমাকেই খোঁচা দিয়েছিল, পথঘাট এইখানে
ভালো নয় উছিলায়। পিতৃকুল থেকে প্রথমে বিচ্ছিন্ন করা হল
দূরাদূর বাগান বাড়িও হল। গুচ্ছ গুচ্ছ তারাকুল ডাইনিংয়ে
আছড়ে পড়লো। ঘাসেরা প্রফুল্ল হল আমাকে মাথায় নিয়ে
আর আর পূবালির জাদুতে জাগালো গাঁও। এর মধ্যে সে পুকুরে
শোল এবং তার পোনা হঠাৎ আমার নজরে আসলো
প্রেম ও শরীর ওর থেকে দূরবর্তী হল। সেই জলাশয়ে
আবার বোয়ালও দেখলাম…। পূবালি কিনারে পারে?
সব স্মৃতি ভ্যানে তুলে একদিন…। নিজেই ফিরলো
তবে একেবারে হাত মুখ ধুয়ে মোছে। আবারও
মাস্টারির সূচনা। অথচ স্কুলে সেটা ফিট
আমি তো গোবর ছাত্র, বেত্রাঘাতে বেঁকে যাই, সিদ্ধিধরি-
রাতকে ভাবতে থাকি দিবসের পথ-ঘাট। আপাত কবিতা ছেড়ে
ইতিহাসে কাৎ। কারণ, সত্যকে যেখানে প্রকৃত দেখা যায়।
আইউব সৈয়দ
জলসারাঙা বর্ষা
আমি জীবনচেতনার কদমফুল।
সবুজ রঙের কত যে সুগন্ধী মেখে আজো দাপিয়ে বেড়াই
স্বপ্ন-ঘাটে । সঁপে দিই…
বাহারি জাতের উঁকিঝুঁকি, বেনামীর চিঠি ফেলে রেখে,
অনন্ত সোহাগে
শ্রাবণের প্রিয় সাথী হই।
বৃষ্টি ঝরা গান বুঝি শুভাকাক্সক্ষী হয়ে মজে আছে মুন্সীপাড়ার
জলনৃত্যের পুকুরে…
আমি যেন বাঁশি; ভাবঘোরে রচি জলসারাঙা বর্ষার
সকল ইতিবৃত্ত…
আবদুল হাই শিকদার
জুতা নাস্তি
আমার জুতা আমাকে দেমাক দেখায়। চোখ ঠারে।
বলে, আমার ফিতার চাইতেও হালকা যারা,
তারা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে।
জুতা বহনকারীদের নিয়েও সমস্যা কম নয়।
যারা আমার জুতা স্তুতিতে একসময় অস্থির হয়ে উঠতো
এখন মাঝে মধ্যেই তাদের জুতাওয়ালা পা
ঘাড়ের ওপর টের পাই।
চোখে চোখ পড়লেই হলো-
দু’কথা শুনিয়ে দেয় জুতা,
-দ্যাখ যাদের মগজ আমার শুকতলি
অতিক্রম করতে পারে না
তাদের একফোঁটা কৃপার জন্য এখন
কুর্নিশ করতে করতে বাঁকা হয়ে গেছে কত মিনার!
আর তুমি আর তুমি-
ওয়াসার পানির চাইতেও কম দাম যার বুকের রক্তের
এখনও আমাকে পায়ের নিচে নিয়ে ঘুরে বেড়াও!
-তোমার কাণ্ডজ্ঞান দেখে তাজ্জব হই।
হাসান হাফিজ
ভিতরের তাপশক্তি
অপমান করো যদি
আবদ্ধ হবোই জেনো
চিরঋণে কৃতজ্ঞতা পাশে
ছল করে প্রিয়তার ভান করা
নিন্দনীয়, এই কথা সক্কলেই জানে
অপমান আসলেই ছদ্মবেশী প্রখর বারুদ
তীব্র হয়ে জ্বালাতে পোড়াতে চায়
এইমাত্র কাজটিই চমৎকার সম্পাদনে সুনিপুণ
কৃত্রিম সখ্যের বিষ বর্জনীয় অহর্নিশ
ধারে কাছে যেতে চাই না কখনো ভুলেও।
সানাউল হক খান
তরুণ কবিতা
এই কবিতা নীরবকে সরব করে, সরবকে নীরব
এই কবিতা বিষণœ বিয়ে-বাড়ির সাজ-সাজ রব
এই কবিতা বরফকে আগুন করে, আগুনকে বরফ
এই কবিতা কাটা-কান, নাক-মুখ অন্ধচোখে বসায় হরফ
এই কবিতা পানিকে রক্ত করে, রক্তকে পানি
এই কবিতা ভীতু আর সাহসীর নিঃশব্দ কানাকানি
এই কবিতা জন্মকে মৃত্যুদিন দ্যায়, মৃত্যুকে জন্মদিন
হাত-পা খোয়ানো, প্রায়-প্রতিবন্ধী, এই কবিতার সালাম নিন।