বাতিগুলো ক্রমশ নিভে আসছিল। ধীরে ধীরে। গোধূলিলগ্ন সূর্যাস্তের মতো। সেদিকে আমার কোন খেয়াল ছিল না। হঠাৎ চোখ যেতে শাহি আমলের জমিদারের প্রাসাদের চোরাপথে হারিয়ে যাওয়ার পর পথ খোঁজার মতো পরিস্থিতি দৃশ্যমান হতে থাকে। রোজকার মতো ঘটনা ঘটেনি, সম্পূর্ণ ভিন্নরকমভাবে হাজির হয় আমার কাছে, যদিও এখনও বাড়ির সব বাতিগুলো নিভানো, বাড়িময় অন্ধকার, দেয়ালে ঘড়ির কাঁটা বেড়ালের টিকটিক শব্দহীন পা তোলে পা ফেলার মতো শব্দ করে এগিয়ে চলেছে। কই মাছের ঝাপ্টানো রক্তের গভীরে ক্ষতের ওপর নুন মিশানো পরিপ্রেক্ষিত ক্রমশ শিরায়-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে এর তীব্রতা আমাকে অস্থির করে তুলতে থাকে।
আমার চিৎকারগুলো আকাশে বাতাসে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়; কেউ শুনছে মনে হয় না, বরং নিজের শরীরে আছড়ে পড়ছে। অকস্মাৎ শব্দ হতে হরিণ যেভাবে মুহূর্তে সতর্ক হয়, একইভাবে আমার শরীরের সমস্ত পশম দাঁড়িয়ে যায়, সঙ্গে কানও; পুরো মনোযোগ পড়ে দরজার সিটকিনির ওপর। উৎকণ্ঠাগুলো ভোরে প্রস্ফুটিত লালজবার পাপড়ি মেলে যেন রান্নাঘরে বেড়ালের ধীর পায়ে পা ফেলা।
‘আব্বার এত দেরি হচ্ছে কেন?’ নিজে নিজে বললাম, ফিসফিস শব্দে।
কাছে কিরণ ছিল, জিজ্ঞেস করে, ‘কিছু বলছেন?’
কিরণের দিকে তাকাই, আড়চোখে, কয়েক সেকেন্ড, পর মুহূর্তে দরজার সিটকিনির ওপর দৃষ্টি রেখে বলি, উদাস স্বরে, ‘না।’
‘তয় চুপ থাকেন। পড়তেছি।’ কিরণ বলে।
‘পন্ডিত।’ আমার উত্তর, স্বগতোক্তি স্বরে।
পাশে মিলন ছিল। ছবি আঁকছে।
কিন্তু এখনও আব্বা বাসায় ফিরতেছে না! দরজার উপর আব্বার বিশেষ নক-করা আওয়াজে কলিং বেল বেজে-ওঠার দিকে, আমরা বোন-ভাইয়েরা চোখগুলো বইয়ের কালো কালো অক্ষরের মধ্যে রাখলেও কানগুলো দরজার সিটকিনির দিকে। রাত বাড়ছে, ঘড়ির কাঁটা আট পার হয়ে ন’য়ের দিকে এগোয়। ভেতরে উত্তেজনা বাড়ছে। সঙ্গে, উশখুশ ক্রমশ জটিলতর হতে থাকে; মাথা ভোঁ ভোঁ করে, ঢিল পড়া মৌচাকের চারদিকে যেভাবে মৌমাছি ঘুরে। বুকের স্পন্দন ঊর্ধ্বগতি; কাঁপুনিও।
আব্বার ফেরার নামগন্ধ নেই। চিন্তার প্রতিটি স্পন্দনে প্রতিধ্বনিত হয়, মানুবশূন্য বাড়িতে আওয়াজ হলে যেমনটা হয়। বই থেকে চোখ তুলি এ উদ্দেশ্যে বাকিরা কে কী করছে; ওদেরও একই অবস্থা, জানতে মনে উশখুশ করছিল। যেমনটা আমার হচ্ছে।
কিরণ, সাখাওয়াত ও মিলন বইয়ের ওপর চোখ স্থির করে আছে। পড়ছে, ওদের পড়ার ধরন সে-ই কথা বলছে না। তবু কেন যেন মন বলছে, ওরা ভান করছে। আমি চোখ তুললে ওরা যেন খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়ছে, সে মত ওদের চোখগুলো বইয়ের ওপর। রাডার যেন ওদের চোখ আমাকে পর্যবেক্ষণ করছে, মন সে-ই কথা বলছে। মুখে কুলুপ তুলে রাখি।
আকস্মিক মুখ থেকে আলগোছে বেরয়, ‘ধ্যুৎ ছাই, ভাল্লাগছে না, আব্বা ফিরতে এত দেরি করছে কেন, কী হল।’
কিরণ বইয়ে মুখ রেখে বলে,‘ পড়েন, এত এদিক ওদিক তাকান কেন, পড়েন।’
তুই পড়, আমারটা নিয়ে তোর এত ভাবতে হবে না।
তয় চুপ থাকেন। আমরা পড়ি।
পড়। তোকে কে মানা করছে?
এত কথা বললে পড়া সম্ভব না।
তয় পড়িস না।
মানে, বুঝলাম না?.
মিলনের কথায় ভেতরের ক্ষোভ যেন লকলকে সাপের জিহ্ব, কিন্তু পরিস্থিতি কল্পনা করে, লেজ গুটিয়ে চাপা ক্ষোভ নিয়ে বইয়ে মনোনিবেশ করি। কিন্তু পড়ায় মন বসে না। কী করব, বুঝে আসে না। মিলনের দিকে কানজোড়া কৈমাছের কান করে রাখি। সাখাওয়াত চুপ, আমাদের প্রতি কোন আগ্রহ দেখা যায় না। ভেতরে ভেতরে যে রাগছে, টের পাচ্ছি। আমার বোনের হদিস নেই, হয়ত রান্নাঘরে মায়ের সঙ্গে আড্ডায় মজেছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কথা চিংগামের বেলুনের আকৃতি করছে। কথা বলতে বলতে কখন সে মায়ের সমান হয়, মা-মেয়ের গল্প শোনে বোঝার জো নেই-কে মা কে মেয়ে। গল্পের অতল রসে মা ডুবে যাওয়ার পূর্বে কখনও সখনও মা-র চোখ আমাদের পড়ার ঘরের দিকে যেতে মা’র গলা উঁচু হয়, বলেন, তুই গেলি পড়তে, পড়া কামাই দিয়া গল্প, উঠ, যা পড়ার ঘরে। গেলি, এখুনি। বোন আমার তখনও হয়ত ঠাঁই দাঁড়িয়ে পড়ে। মাকে যদি একটু পটানোর মওকা মেলে, না, সে-ই লক্ষণ নেই। এখন সেটা হবে না। তাই নীরবে আমাদের দিকে পা ফেলতে হয়।
মিলনের কথায় চেতনা ফিরে আসে।
‘থামবেন, কি লাগাইচেন, নিজে পড়েন না, অন্যরেও পড়তে দিতেছেন না।’
কিরণ গুদগুদ শব্দ করে পড়ে। কিন্তু আমি মনে কোন শান্তি না। মনটা দাপাতে থাকে তীরবিদ্ধ কবুতর হয়ে, বইয়ের অক্ষরগুলো অচেনা ঠেকে। এখন কী করি, মাথা কিলবিল করতে থাকে, অস্থিরতায়।
দেয়ালের ঘড়ি দেখি। এখন রাত ৮:৪৫ মিনিট। আব্বা দেরি করছে কেন, কী এত কাজ। আসার কোন লক্ষণ নেই, চিন্তায় কোন তল পাই না। আব্বা ত এত রাত করে না!
মিলন জোরে জোরে পড়ছে। ওর পড়ার আওয়াজ ক্রমশ বাড়ছে, সঙ্গে সঙ্গে আমার চিন্তা দ্বিধাবিভক্ত হয়। তখনই ঢুকে আমার বোন।
কিরে, কি করছিস।
আমাদের ভাইদের চোখে মুখে পরিত্যক্ত প্রাচীন রাজবাড়ীর নীরবতা শঙ্কায় প্রকাশিত; ভয়ে, উদ্বিগ্নতায় সবাই ভাষারহিত। যে যে অবস্থায় আছি, নিজেদের সেভাবেই রাখি। বোন কোন পাত্তা পায় না সত্ত্বেও তার মনে কোন প্রতিক্রিয়া তৈরি হয় না।
মিলন, পড়া মুখস্থ হইছে?
মিলন নিরুত্তর। যেভাবে পড়ছিল, সেভাবেই সে পড়ছে।
কিরে, কথা বলছিস না কেন, কি হইছে?
এবারও সে নিশ্চুপ।
এবার বোনের গলার স্বর উঁচু হয়। বলে, ‘পা ভারি হইল কখন, কানে কথা ঢোকে না? কি জিগাইছি?’
মিলন মাথা তুলতে যাবে, এ সময় সাখাওয়াত বলে, ‘দেখেন না, পড়ছে। শুধু শুধু ডিস্টার্ব করেন কেন?’
এটুকু বললে কি পড়া উইড়া যাইত?
‘উদা কথা বলেন, পড়েন।’ সাখাওয়াত বলে।
বোনের মুখটা রান্না করা পাতিলের তলার মতো গুমোট, কালো দেখাল। মুখে স্পষ্ট কোন শব্দ বলে না; তবে বিষহীন সাপের মতো ফোঁসফাঁস করছে। এসব কেউ গায়ে তুলছে না। বোন আমার দেখছি ধীরে আস্তে ওর টেবিলের কাছে চলে গেল। আমার দিকে ওর বড় বড় চোখ। লাল ডালিমের মতো। এখনই বুঝি ফেটে মাটিতে লুটাবে। এর অর্থ আমার কাছে পরিষ্কার। সে সব নিয়ে বেশি চিন্তা করবে, এজন্য বহু সময় তোলা রয়েছে। ওকে বুঝিয়ে বলা যাবে, বোন আমার, আমার মনটা তখন ভালো ছিল না, বেশ উদ্বিগ্ন ছিলাম আব্বাকে নিয়ে। আব্বা এত দেরি করে কখনও দেরি করে বাসায় ফিরে না।
বোন হয়ত বলবে, আব্বা কি উড়ে গেছিল, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করবি না; আমাকে নিয়ে মজা করছিস, তাই না?
মাথা ঠাণ্ডা কর, বোন। তোরে কী করে বোঝাব তখন আমার মনের অবস্থা কী ছিল। আমার মন ভালো ছিল না রে।
কথায় ছাই দিও না। আমি কিন্তু ফিডার খাই না। আব্বা তোর একার, এত মায়াকান্না আমাকে দেখাবি না। এসব আমি বুঝি।
আমার চিন্তায় শাখা প্রশাখা বিস্তৃত হচ্ছে, তাতে বজ্রপাত পড়ছে; কিন্তু কারও এ দৃশ্য দেখাতে পাচ্ছি না। শুধু রক্তক্ষরণের ছোপ ছোপ দাগগুলোর তীব্রতা বাড়ছে।
বোন আমার বুঝুক, না-বুঝুক; ধাপে ধাপে সব চিন্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে আমার শিরায়, প্রবহমান নদী¯্রােতে।
এখন কোন শব্দ আমার ভেতরে ঢুকছে না, নির্জন দুটো পাহাড়ের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে আওয়াজ করলে যেমন এর প্রতিধ্বনি নিজের কাছে ফিরে আসে, ঠিক তেমনি আব্বার ফিরে আসা।
মাথাটা কি শেষ পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে? আমার মধ্যে শ্রাবণের মেঘ যেমন বলা নেই কওয়া নেই মাটির পৃথিবীর সব কিছু উলট পালট করে দিয়ে যায়, তেমনি এখন আব্বা না-আসার চিন্তাটা আমাকে একইভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে।
ঘড়ির কাঁটা রাত ১০টা স্পর্শ করতে মনটা তাতিয়ে উঠল। কারও দিকে কোনও ভ্রুক্ষেপ না করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম; কিছুটা দূরে এ্কটি ৫তলা বিল্ডিংয়ের ৩ তলার জানালাটা খোলা। এনার্জি বাল্বের আলোয় বেশ দেখা যাচ্ছে মিনা ও ওর বাবাকে। মিনা ও আমি একই শ্রেণিতে পড়ছি। এবার ওর জন্মদিনে ও আমাকে আমন্ত্রণ করেছিল; কিন্তু আমার সেই জন্মপার্টিতে যাওয়া হয়নি। আমাদের শ্রেণির অনেকে ওর জন্মদিনের পার্টিতে গিয়েছিল, পরে আমি সে খবর শুনেছি। পার্টির পরের দিন ওর মুখোমুখি হয়েছিলাম, ঠিক করে রাখি, ওর সঙ্গে দেখা হলেই ওকে বলব, স্যরি, মিনা, কিছু মনে করিস না, ইচ্ছে ছিল, কিন্তু আসা সম্ভব হয়নি, প্রমিজ পরের বার অবশ্যই যাব। কী বলব, সেরকম একটা গল্প বানিয়ে রেখেছিলাম। বিধি বাম, ওসব বলার কোন সুযোগ ও আমাকে দিল না। বড় বড় চোখ করে আমাকে পাশ কাটিয়ে ও চলে গেল। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবা-মেয়ে কী সুন্দর কথা বলছে। কী চমৎকার দৃশ্য! মিনিট কয়েক হবে, মিনা এসে সেই দৃশ্যটা আর আভিজাত্যের রঙ চড়ায়। ওসব দেখতে এখন তেতো ঠেকছে।
জানালাটা বন্ধ করলাম। দরজার দিকে তাকালাম। সিটকিনির কোনো নড়াচড়ার শব্দ পেলাম না। আম্মার সাড়াশব্দ পাচ্ছি না। আব্বা এখনও এল না, কেন আসছে না, কী হল তার, কোন কিছু হয়নি তো তার, রাস্তায় ওঁৎ পেতে আছে কত দুর্ঘটনা-আম্মার মনে কি সেকেন্ডের জন্য এ নিয়ে শঙ্কা জাগছে না। কি জানি; তবে আম্মার নির্লিপ্ততা সেই কথা বলছে না।
রান্নাঘরে আম্মা কী স্বাচ্ছন্দ্যে রান্না করে যাচ্ছেন, যেন মনে হচ্ছে, পৃথিবীতে রান্না ব্যতীত উনার আর কোন কাজ নেই। আব্বা কেন এখনও ফিরছেন না, কেন তার দেরি হচ্ছে, পথে বিপদ-টিপদ হয়নি তো? হয়ত ভাবছেন, হয়ত বা ভাবছেন না। মুখে এর ছিটেফাঁটা বোঝা যাচ্ছে না।
সাখাওয়াত, কিরণ ও মিলন যে যার ঢঙে পড়ে যাচ্ছে। কী নিষ্পাপ মুখগুলো, দেখলে প্রচণ্ড মায়া হচ্ছে। আমি ওদের বড় ভাই। আব্বার পরে ওদের দেখাশোনার দায়-দায়িত্ব আমার ওপর বর্তাবে। আমার বয়স খুব বেশি তাও নয়। এবার সবে একাদশ শ্রেণিতে পড়ছি। দুটো টিউশনি করছি। তাতে বেশ আমার চলে যাচ্ছে। মাঝে-মধ্যে ওদের যৎসামান্য টিপস দেই। তখন ওদের চোখে মুখে কী স্বর্গীয় হাসি খেলা করে, হাঁ-করে চেয়ে থাকি। ওদের কিছু বলি না। আমার চোখগুলো দুপুরবেলায় ব্রহ্মপুত্রের উদোম বুকের মধ্যিখানে বালুচরের বালুর মতো চিকচিক করে ওঠে তখন, আমার মাথাটা আকাশ স্পর্শ করে; বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে নিচে নেমে আসে, আ:, আরও কিছুটা বেশি ওদের দিতে পারতাম। আরেকটা টিউশনি করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আম্মার বারণ রয়েছে, এখন অর্থের লোভ কর না, পরে অনেক সময় পাবে, এখন ওসব করতে গেলে তোমার পড়ায় সমস্যা হবে। এখন যেভাবে আছ, সেভাবেই চল। পড়াশোনা শেষ কর, চাকরি-বাকরি কর, তখন ইচ্ছে মতো পরিবারের সবাইকে দিতে পারবে। তখন যেন বউ পেয়ে বোনভাইদের ভুলে যেও না।
কি যে বলেন, আম্মা।
‘তাই দেখছি সর্বত্র।’ একটা ভারি নিঃশ্বাস তার বুকের থেকে বের হয়ে এলো।
আমার বোনটি কোথায় থেকে উড়ে এসে আম্মার মুখে থেকে কেড়ে নিয়ে বলল, ‘ঠিকই বলছেন। বউয়ের জন্য এটা ওটা। লুকিয়ে, চুবিয়ে। আর আমাদের জন্য বুড়ো আঙুল। তাই না, আম্মা?’
মুখে কোন কিছু এলো না, শুধু হাঁ করে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
আমি কোন কিছু বলছি না দেখে আম্মা আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বোনের দিকে চেয়ে বললেন, ‘ওসব তোমাকে ভাবতে হবে না। ভাবার অনেক সময় পাবে। এখন নিজের জন্য ভাব।’
বোন যেন আকাশ থেকে পড়ল। আমতা আমতা স্বরে বলল, ‘আমাকে নিয়ে কী ভাবব!’
‘থাক, এখন না ভাবলেও চলবে। এখন পড়তে যাও। তাতে চলবে।’ বললেন আম্মা।
বোন আর কথা বাড়াল না। মনে মনে কি বলতে বলতে ঘরের দিকে পা বাড়াল। রান্নাঘরে, না পড়ার ঘরের দিকে গেছে, বোঝা গেল না।
আব্বার মুখের দিকে তাকালে ভেতরটা অতিশয় বৃদ্ধার মুখের আদল ধারণ করল। বুকের গহিনে লুকিয়ে থাকা কষ্টগুলো তখন হাত-পা ছড়িয়ে বসে। সদ্যোজাত শিশু যেমন ক্ষুধা লাগলে মায়ের দুধের জন্য কান্না জুড়ে দেয়, জোরে জোরে হাত-পা নাড়তে থাকে, আমাকে তখন সেই অবস্থা পেয়ে বসে। বাইরে প্রকাশ করার জো নেই। আব্বার প্রতি একটা অজানা আকর্ষণ গাঢ় হতে থাকে। বুকের মধ্যের রক্তক্ষরণ নিজের ভেতরের বারান্দায় শুকোতে দেই, কারো জানতে দেই না। বাইরে থেকে আব্বা বাসায় ঢুকতেই ফ্যানটা অফ থাকলে অন করে দেই। আম্মার আসতে কিছুটা দেরি হলে আম্মাকে ডাকতে থাকি। ‘আম্মা, ও আম্মা, এদিকে আসেন, আব্বা আসছে।’
আম্মা রুমে ঢুকতেই আমি অন্য রুমে চলে যাই। কোন কোনদিন আম্মার আসতে দেরি হয়, এতে আমার প্রচণ্ড রাগ হয় আম্মার ওপর। এত কি কাজ, আব্বা এলে। আব্বার কোন রাগ নেই। কষ্ট নেই। শুধু বলেন, ‘ও, তুমি আসছ। পানি দাও ত। তৃষ্ণা লাগছে খুব।’
আম্মা পানির গ্লাস এগিয়ে দেন।
কোন কোন দিন আব্বা আমাকে যেতে দেন না। বলেন, বস কাছে। যখনই বাইরে যেতে পা বাড়াব, তখনই বলেন, দাঁড়া, কই যাস, কাছে এসে বস।
গিয়ে তার কাছে বসি। কখনও পাশে। কখনও মোড়া নিয়ে তার মুখোমুখি। কথা বলার মুহূর্তে আব্বা আমার মুখের তাকিয়ে থাকেন। নীরবে আমাকে দেখেন। কোন কিছু বলেন না। কী দেখেন আব্বার আমার মুখে। বুঝি, তবে তাকে কোন প্রশ্ন করি না।
কলেজ কেমন চলছে, কোন সমস্যা হচ্ছে না ত, পরীক্ষা কবে, নানা কিসিমের প্রশ্ন। সব প্রশ্নের জবাব দেই। এক এক করে। ছোট, ছোট বাক্যে। আব্বা, আপনি কেমন আছেন, জিজ্ঞাসা করতে পারি না। কত দিন করব করব করে করা হয় না কখনও। কিভাবে করব, করা উচিত কি-না, নানাবিধ প্রশ্ন স্রোতে হাঁটতে থাকি; কিন্তু কোন সিদ্ধান্ত পৌঁছতে পার না।
আব্বা, আম্মা আসতাছে, আব্বা কোন কথা বলার পূর্বে অন্য রুমে চলে আসি।
‘বেচারা, ছেলে আমার।’ আব্বাকে বলতে শুনি।
রক্তের ভিতরে একটা উথাল-পাতাল উচ্ছ্বাস উঠতে-পড়তে থাকে, মুহূর্তে এক রকমের ভালো লাগাবোধ শরীরের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে ধাপে ধাপে পড়ে, কারো ব্যাখ্যা করা কঠিন।
ঘড়ির কাঁটা বার ছুঁই ছুঁই, শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে, এখনও আব্বা এলো না, রক্তে মৌমাছির হুলের মতো হুল ফোটাচ্ছে। এর সংখ্যা এখন গাণিতিকভাবে বেড়ে চলেছে। আব্বার ওপর প্রচণ্ড রাগ হচ্ছে। চুপিচুপি মোবাইলেও চেষ্টা করেছি বেশ ক’বার, যতবার সংযোগের আপ্রাণ চেষ্টা করি, ততবার শুনতে হচ্ছে, এ মুহূর্তে মোবাইল বন্ধ রয়েছে, সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আব্বা কখনও এভাবে মোবাইল বন্ধ রাখেন না? এরকম বেশ ক’বার হয়েছে, সেক্ষেত্রে অন্য মোবাইল থেকে তিনি আম্মাকে জানাইয়া দিছেন। এবার তিনি তাও করছেন না। এসব ব্যাপারে তিনি সচেতন। কারো কথা দিলে, অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। আজকে এর ব্যত্যয় কেন?
আমার কিছু ভালো লাগছে না। ভেতরে শঙ্কা চেপে বসছে, অস্থিরতা বাড়ছে। দরজাটা খুলে বারান্দায় পায়চারি করছি। এলোমেলোভাবে। এখন আমার কী করা উচিত, চিন্তায় বিক্ষিপ্তভাবে আজেবাজে কথা জুড়ে বসছে কখনও, আবার কখনও পলকে মিলিয়ে যাচ্ছে। চিন্তা ডালপালা বাড়ছে। কোন তল পাচ্ছি না।
‘ভাইয়া।’ কিরণ ডাকল।
ফিরে তাকালাম। কিরণও পায়চারি করছে।
‘কিছু বলবি?’ বললাম।
‘না, কিছু না। তয় …।’
‘কি?’
টিভিতে এইমাত্র দেখাল, একটা লোক বাসায় ফিরছিল। মিরপুর ১০ থেকে রিকশা করে। শেয়ার করে। তাকে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে মিরপুর সাড়ে এগারোতে। রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। হঠাৎ এক পথচারী তাকে দেখতে পায়, পরে জানা যায় তারা একই অফিসে কাজ করেন, তিনি সেই ভদ্রলোককে হাসপাতালে নিয়ে যান। তার পরিবারকেও জানান। লোকটি সংকটাপন্ন। তিনি-ই পরিবারের একমাত্র উপার্জনাক্ষম পুরুষ। লোকটির ওয়াইফ বলেছেন, তার হাজবেন্ডের কিছু হলে তাদের পথে বসা ছাড়া উপায় থাকবে না। লোকটির দুই ছেলে এক মেয়ে। তাদের সকলের বয়স দশের নিচে। বুঝতে পারছ কী অবস্থা।
মাথা নিচু করে কিরণের কথা শুনছিলাম। ওর শেষের কথাটি শরীরে ইনজেকশনের সুঁইয়ের মতো বিঁধেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম, ধীরে। কিরণের কথায় আরও চুপ হয়ে গেলাম। এইসব বলে কী বোঝাতে চাইছে। ভেতরে ভেতরে শিউরে উঠলাম। কিরণকে বললাম, দেখ, আকাশে কী সুন্দর চাঁদ।
কিরণ চুপ, আমার চোখের ওপর চোখ রাখল। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। অন্য দিকে। সঙ্গে সঙ্গে। ওদিকে আম্মা রান্না শেষ করে বোধ হয় আঁচলে হাত মুছে মুছে আমাদের দিকে আসছিলেন, কিরে মিলন, তোরা কই, বলতে বলতে যখন আমাদের পড়ার ঘরের দিকে যেই পা রাখতে যাবেন, তার চোখ গিয়ে পড়তে দেয়াল ঘড়ির দিকে, তার চোখজোড়া যেন সদ্য ফোটা সকালের কড়া লাল রক্তজবা।
‘এখনও তোদের বাবা? লোকটার কাণ্ডজ্ঞান কবে যে… এই তোরা কই গেলি … অন্তত একবার মোবাইল করতে পারতিস তোরা কেউ … লোকটার না হয় কাণ্ডজ্ঞান নেই, তোদেরও কি … ’ এক শ্বাসে আম্মা কথাগুলো বললেন।
মিলন মোবাইলে বেশ ক’বার চেষ্টা করেছে, একই কণ্ঠ, এ মুহূর্তে মোবাইলটি বন্ধ রয়েছে, সংযোগ দেয়া সম্ভব নয়।
‘আম্মা, আব্বাকে পাইতেছি না, তার মোবাইল বন্ধ?’ মিলন বলল।
‘কি, দে আমাকে?’
আম্মা যেন মুহূর্তে পাল্টে গেলেন। অনেকটা লাফিয়ে পড়ে মিলনের থেকে মোবাইলটি নিয়ে নিলেন। আব্বার নম্বরের অনেকবার চেষ্টা করলেন। এর ফলাফল শূন্য। আবারও আব্বার ওপর বিরক্ত হলেন। তার সারামুখে এর বিচ্ছুরণ। সে-ই রাগ, সঙ্গে অভিমান নিয়ে পরিচিত সব স্থানে চেষ্টা করলেন। সবাইর একই জবাব আম্মার শঙ্কাকে উসকে আরও তীব্র করল। তার চোখে মুখে অগ্নিমূর্তি, যেন ফুলকি দিয়ে চোখ ফেটে এখুনি বেরবে।
আমার মতো তার চারপাশ ঘিরে থাকা ভাই-বোনরাও নিশ্চুপ, গম্ভীর, মা’র দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। আম্মা আমাদের কারও কিছু বললেন না। মিলনরা যেখানে পড়ছিল, এর সঙ্গে একজন শুতে পারে এমত একটি খাট রয়েছে, উঠে সোজা আম্মা ওখানে গিয়ে বসলেন। সম্ভাব্য পরিচিত সবাইর কাছে কল করলেন। আবার। সবাইর এক জবাব, জানি না ভাবি, এখানে আসে নাই, দেখছি ভাবি, কোন তথ্য পেলে আপনাকে জানাব, কেউ কেউ কল ধরেননি। কেউ কেউ সৌজন্যবশত কল ব্যাক করেছেন। জানতে চেয়েছেন, কেন আম্মা কল করেছিলেন। কারণটা জেনে, ও তাই নাকি, ও আচ্ছা, জানিয়ে কলটা কেটে দিয়েছেন।
আম্মা এসব কথা কানে তুলছেন না। বলছেন, ভাই কোন খবর পেলে জানাবেন। কল কেটে অন্য দিকে চেষ্টা করছেন।
ভেবেছিলাম, আম্মা বুঝি কোন হৈ চৈ বাধিয়ে দেবেন, বাসাকে মাথায় তুলবেন, আমাদের কারও কারও তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বললেন, না, কিছু করলেন না। আমাকে কাছে ডাকলেন। কাছে যেতে, বসতে বললেন। সুবোধ বালকের মতো আমি তার পাশে বসলাম। আম্মা ও আমার সামনে আমার বোন-ভাইরাও দাঁড়িয়ে। হাঁ-করে তাকিয়ে। আম্মা ও আমার মধ্যে কী কথা হবে, শোনতে সবাই থ, পাথর।
‘দেখলি ত, কেউ কিছু বলতে পারছে না। এখন কী করা উচিত, বল?’
‘আপনে বলেন, এখন কী করব?’
‘বাবা, কিছু মাথায় আসতাছে না। কার কাছে যামু, কোথায় যামু, কোথায় যাইলে তোর বাবার সংবাদ পামু।’
সাখাওয়াত বলল, আম্মা, থানায় গেলে কেমন হয়, সঙ্গে আশপাশের হাসপাতালগুলো?’
‘না, বাবা, এত রাইতে তোদের পাঠাইয়া শেষে আরেকটা চিন্তা তার লগে জোড়া দেই।’ আম্মা বললেন।
‘আম্মা, একটা কাজ করলে হয় না, আব্বার অফিসের বসের কাছে একটা কল করলে হয় না। উনারে বিষয়টা জানাইয়া রাখলে হয় না।’ কিরণ বলল।
‘উনাকে কেমনে জানাব? রাইত ত কম হইল না? এছাড়া উনার নম্বর আমার কাছে নাই।’
‘আম্মা, আব্বা আসব ত!’ বলল মিলন, কান্না কান্না স্বরে।
‘আল্লাহকে ডাক, বাবা।’
মিলনের চোখে মুখে অশ্রু টলমল করছে। সাখাওয়াত চুপ। বোন আমার থম ধরা কালো মেঘের আকাশ। এতক্ষণ যে বাসাকে মাথায় তুলে রেখেছে, সে লজ্জাবতী পাতার মতো কুঁকড়ে রয়েছে। তার মুখের ভাষাগুলো যেন কোথায় উধাও হয়ে গেছে। কিরণ আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে। ওর চোখেও অশ্রু, টলমল। এখন আমি কী করব, বুঝতে পারছি না। ভেতরে সবকিছু জড়িয়ে যাচ্ছে। কতগুলো মুখ আমার দিকে কী গভীর প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে রয়েছে, সে-ই দিকে তাকাব, তাও পাচ্ছি না। আমার কিছু করা দরকার, আব্বা এখন কোথায়, কোন অঘটন …, অসুস্থ হয়ে পড়লেন না তো (!), নানা চিন্তা মনের গভীরে খোঁচা দিতে লাগল।
পাশে জালাল উদ্দিন নানার বাড়ি, এত রাতে তাদের বৈঠকখানায় বাতি জ্বলছে। শহীদ মামা, কফিল মামাসহ সবাই জড় হয়ে বসে রয়েছে। মৃদু স্বরে কান্নার ধ্বনি থেমে থেমে আসছে আমাদের বাসার দিকেও। কমরু খালার হার্টে একটি ফুটো ধরা পড়েছে। চকরিয়া হাসপাতালের হেড ডাক্তার নানাকে ডেকে বলেছে, কমরু খালার বাঁচার সম্ভাবনা একদম কম, একটি নির্দিষ্ট সময়ও ডাক্তার বলে দিয়েছেন। নানির হাউমাউ কান্না এখন কিছুটা ম্রিয়মাণ। তেল ফুরিয়ে আসা সল্তের মতো কমরু খালার জীবনের সলতে জ্বলছে। চিরিংগা থেকে এখনও বুঝি সাহাবুদ্দিন মামা এসেছে, সিরিন খালা দরজা খুলে দিয়েছে। জানালা দিয়ে সব চোখে পড়ছে। এখন আমি কী করব, কার কাছে যাব, মামাদের কারও এ সময়ে ডাকা উচিত হবে কি না চিন্তা করতে করতে আম্মার দিকে তাকালাম।
‘শফি মামা চট্টগ্রামে। শহীদ মামাদের কারও ডাকব, আম্মা?’ জিজ্ঞাসা করলাম আম্মাকে।
‘না, থাক বাবা, ওদের কারও মন ভালো নেই।’
‘এখন? কিরণকে নিয়ে ফাসিয়াখালি যাব আব্বার অফিসে?’
‘এখন রাত ১টা’র বেশি বাজে। সবকিছু বন্ধ। কিভাবে যাবি?’
‘তাইলে, আম্মা?’
আমার বুক উগড়ে কান্না উঠে আসছে, গলা ফাটিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু কাঁদতে পারছি না। আমি কাঁদলে, আম্মাকে ঠেকিয়ে রাখা কঠিন, ভেবে নিজের বুকের উপর পাথর তুলে রাখি। বোন-ভাইরা তখন কী পরিস্থিতি তৈরি করবে, কল্পনা করতে কান্নাগুলো কর্পূর হয়ে মিলিয়ে গেল, কল্পনায়, মুহূর্তে। নিজেকে আরও শক্ত করি।
‘বাবা, একটা কাজ কর।’ আম্মা বললেন।
‘কি, আম্মা?’
‘রাতটা শেষ হোক। সকালে একটা ব্যবস্থা হবে। কি, বলিস?’
আম্মা যা বলেছেন, মন্দ বলেননি। আর ক’ঘন্টা বাদে রাত শেষ। প্রায় সবমানুষ এতক্ষণে ঘুমের গভীরে। কাকে জাগাব, সবাই বিরক্ত হবে। বরং আম্মা যা বলছে, তাই হোক।
আম্মা সবাইকে ডাইনিং টেবিলে খেতে ডাকলেন। সবাই খেতে বসল। আম্মা সবাইর পাতে খাবার তুলে দিচ্ছেন। খাবার দেয়া হলে আম্মা বললেন, নে, খেতে শুরু কর। দিচ্ছেন, আর লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের সবাইকে দেখছেন। আমার চোখ এড়াল না। তাঁকে কিছু বুঝতে দিলাম না।
পাত থেকে মুখে খাবার তুলছি, আর আব্বার কথা প্রতিটি লোকমায় উঠে আসছিল। যাবার সময় আব্বা বলে গেলেন, তোর আম্মাকে বলিস না, আজকে আসার সময় ইলিশ মাছ নিয়ে আসব। একেবারে ডিমঅলা ইলিশ। মাসের শেষ। আব্বার হাত খালি। গতকাল আম্মা থেকে লোন নিয়ে আব্বা বাজার করেছেন। আম্মা বলেছেন, এ সপ্তাহে বাজার করতে হবে না। বেতন পেয়ে আব্বাকে বাজার করলে চলবে। গত রাতে আব্বার সঙ্গে খেতে খেতে বলছিলাম, আব্বা, অনেক দিন ধরে ইলিশ মাছ খাই না। তখন আম্মা ধমক দিলেন। আব্বা আম্মাকে হাত উঁচিয়ে থামিয়ে দিলেন। আব্বা আঙুলের ইশারায় বোঝালেন, হবে। এখন খা। আম্মার দিকে না-তাকিয়ে খাবারে মন দিলাম।
ডুবাতেলে আম্মার ইলিশ মাছ ভাজা আব্বাসহ আমরা বোন-ভাইরা বসে খাচ্ছি। একত্রে। গত রাতে আব্বার সঙ্গে ভাবার সময় কল্পনায় দেখা ভাবার দৃশ্যগুলো চোখে লেপ্টে রয়েছে। খাবারগুলো পেটে ঢুকছে না।
‘কি ভাবছিস, এখন খা।’ আম্মা বললেন।
আম্মার কথায় চিন্তাগুলো দ্বিধাবিভক্ত, শঙ্খচূড়। খাবারের দিকে দৃষ্টি দিলাম। পাতের খাবারগুলো শেষ করে সোজা বিছানায় চলে আসি। অন্যরা তাই করে। আম্মার স্থানে আব্বা হাজির যেভাবে যিশু খ্রিষ্ট রাজার লোকেদের হাতে বন্দি হওয়ার পূর্বের রাতে তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে শেষ ভোজ গ্রহণ করছিলেন, আব্বা যেন আমাদের ভাইদের নিয়ে খেতে বসেছেন। আমরা খেয়ে যাচ্ছি, আব্বা আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। সবিস্ময়ে। আব্বা অন্তর্ধান হয়ে কি তাহলে আমাদেরকে পূর্বাভাষ দিতে চাচ্ছেন?
‘বড় ভাইয়া?’ কিরণ বলল। সবাই বিছানায় চলে যাওয়ার প্রায় ঘন্টা দেড়েক পরে হবে।
আমি শুনলাম। সম্বিত ফিরে আসার পর। চুপ করে থাকলাম। কিরণও চুপ।
চারিদিকের স্তব্ধতা ক্রমশ কাটছে। সূর্যের আড়মোড়া ক্রমে ভাঙছে হেতু প্রভাতের স্ববিভায় শহর জেগে উঠছে। সেই জেগে-ওঠা মুখর স্তব্ধতায় আমি ও আমার মা-বোন-ভাইরা চুপ, কাতর, তাদের কানগুলো পাতা আছে, কখন কলিংবেলে কিংবা সিটকিনিতে নাড়া পড়বে? একটি অদৃশ্য সুতোয় যেন আমরা সবাই বাঁধা।