পরিচ্ছন্ন প্রচ্ছদ, মার্জিত মুদ্রণ আর বত্রিশ পাতার বুক সাইজ ছড়াগ্রন্থ ধান খেয়ে যায় শালিকে। লিখেছেন ছড়াকার আরিফ বখতিয়ার। এ সময়ের ছড়া অঙ্গনের পরিচিত ছড়াকর্মী তিনি। প্রচারবিমুখ অথচ নিরলস। যতœশীল ছন্দের বুননে রচিত তার সকল ছড়াই চির নতুন। বইটির শিরোনাম বলে দেয় তিনি একজন সমাজসচেতন লেখক। তার ছড়ার বিষয়বস্তু আমাদের সমকালীন সমাজের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। ছড়াকে মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করে তিনি ছন্দিল কিছু ছবি এঁকেছেন। যে ছবি বাস্তবিক। সমাজের অসঙ্গতি ও অবয়ব পাঠকের সামনে উপস্থাপন করাই একজন সমাজসচেতন কবির কাজ। এ ক্ষেত্রে তিনি অনেকখানিই সফল।
যেমন তিনি লিখেছেন-
অফিস থেকে আমু মিয়া মাঝে মাঝেই ছুটি খান
বেহালালি টাকায় তিনি গোস্ত এবং রুটি খান
বছর খানেক শেষে
আমু গেলেন ফেঁসে
খবর পেয়ে বড়সাহেব ধরলো চেপে টুঁটিখান।
(আমু মিয়ার লিমেরিক, পৃষ্ঠা নং: ২৫)
অথবা তিনি লিখেছেন-
আমু মিয়ার দাদু নাকি ছিলেন
এই শহরের মস্তবড় ভিলেন
তাইতো আমু হেসে
একটুখানি কেশে
বড় বড় বোয়াল ইলিশ এক চুমুকে গিলেন ।
(আমু মিয়ার লিমেরিক, পৃষ্ঠা নং: ২৬)
তার প্রতিটি ছড়ার ভাষা ও শব্দ প্রয়োগ চটুল তালের যা পাঠকের কানকে আকৃষ্ট করে হৃদয়ে দোলা দেয়। ছড়া কবিতা ও পদ্যের যে ব্যাকরণগত পার্থক্য সেটা আরিফ বখতিয়ার অত্যন্ত দক্ষতার সাথে বুঝে ছড়াগ্রন্থটি রচনা করেছেন। তার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, লাভ-ক্ষতি, মহাজন, বাজারদর, অভাব, চিন্তা ইত্যাদি ছড়ায় ফুটে ওঠে সামাজিক অস্থিরতা ও স্থবিরতার বাস্তব চিত্র। একটি দু’টি উদাহরণ যেমন:
আসল হিসাব পায় না মালের
মালিকে,
ধান খেয়ে যায় ভিনদেশী কাক
শালিকে।
লাভটা শুধু দাদার
ক্ষতির পকেট পূর্ণ হলো
দেশের যত গাধার
(লাভ-ক্ষতি, পৃষ্ঠা নং: ১১)
ছড়াগ্রন্থের প্রতিটি ছড়ার মধ্যে এক ধরনের বিপ্লবী আবেগ ফুটে ওঠে। কখনো ব্যঙ্গ কখনো বিদ্রƒপ কখনো হাহাকার চিত্রিত হয়েছে। যেমন:
রোদের তাপে যায় পুড়ে যাক
সমাজপতির শিড়দাঁড়া
গরিব দুঃখীর মাথার ওপর
অত্যাচারীর বীর যারা।
(ভণ্ডবাজি, পৃষ্ঠা নং: ১৫)
আরিফ বখতিয়ার সচেতন ছড়াকার, তার ছড়াগুলোর নির্মাণশৈলী আধুনিক এবং সাবলীল। সব কয়টি ছড়াই বিষয়বৈচিত্র্যে ভিন্ন। বিষয়বস্তু ও অন্তমিলের ক্ষেত্রেও তিনি ব্যতিক্রম যেমন তার চেহারা ছড়াটি-
শ্বশুর আমার দেশের মানুষ
বউটা হলো ভিনদেশী
শালা এবং শালীর ছুরত
জাপান কিংবা চীনদেশী।
শাশুড়িমা ফ্যাশন করেন
আমেরিকান ভাষাতে
জামাই হবে তাহার মতো
ছিলেন তো এই আশাতে।
কিন্তু আমার চলন বাঁকা
কারো কথা যায় না রাখা
সবার কথা রাখতে গিয়ে
আমি হলাম তিনদেশী।
(চেহারা, পৃষ্ঠা নং: ৮)
এবং গ্রন্থটির আরেকটি ছড়া-
দিনে চলি রুটিন মাফিক
রাতে চলি রুটিনেই
শুক্রবারে সবার ছুটি
কিন্তু আমার ছুটি নেই।
(রুটিন, পৃষ্ঠা নং: ৭)
ছড়াগ্রন্থটি পাঠে ছন্দের বিনির্মাণ ও শব্দের পরীক্ষিত প্রয়োগ সুখপাঠ্য। এতে ছড়ার ছন্দের পাশাপাশি লিমেরিক, হাইকু ঢঙের ছড়াও রয়েছে। ছড়াপ্রেমী পাঠকদের কাছে গ্রহণযোগ্য ও সুখপাঠ্য হতে পারে ধান খেয়ে যায় শালিকে। ছড়া গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে শব্দশিল্প প্রকাশন হতে। একুশে বইমেলা-২০১৮তে। প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ করেছেন প্রতিশ্রুতিশীল চিত্রী ফারজানা পায়েল। শুভকামনা ছড়াকার আরিফ বখতিয়ারের জন্য।