মালিবাগের রেবেকা চৌধুরীকে যে জামিল সত্যিই চেনে না কথাটা কেউ বিশ্বাস করতে চাইলো না বরং বিচিত্র চুটকির ছিটেফোঁটা অলক্ষ্যে ওর ওপর নিক্ষিপ্ত হতে লাগলো।
যুব সংঘের রাজুতো সরাসরি বলেই বসল-
: এখানে বিশ্বাস অবিশ্বাসের কোন কথা নয় মাইডিয়ার ফ্রেন্ড। তবে তুমি আমাদেরকে যতোটা বোকা ভেবেছো, ততোটা বোকা আমরা নই।
জামিলের বোঝাবার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। শুধু রাজুই নয়-এ পাড়ার প্রায় সবারই এই ধারণা। যদিও অল্প কিছু দিন হয়-এই মালিবাগের বাসিন্দা হয়ে এসেছে তরুণ, সুদর্শন এবং কুমার অধ্যাপক জামিল আহমেদ।
সেদিন সকালে কলেজের খাতা দেখছিল জামিল।
পাড়ার বৃদ্ধ রসিক হালদার এলেন এমনি সময়। টেবিলে স্তূপীকৃত খাতাগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে বললেন-
বাবাজীর বুঝি মাস্টারি করা হয়? খাতার ওপর চোখ রেখেই জামিল বলল-
: জি হ্যাঁ,
: কোন স্কুলে-?
: কলেজে-
: কলে-জে !
রসিক সাহেব তার কোটরাগাত চোখ দুটো ঈষৎ বিস্ফারিত করলেন এবং আরেকবার যেন যাচাই করলেন জামিলকে-।
তারপর দন্ত বিকশিত করে বললেন-
: হেঃ হেঃ হেঃ। কিন্তু বাবা বড় সাবধান !
জামিল স্বপ্রশ্ন চোখ তুললো।
চেয়ারটা টেনে নিয়ে একটু ঘনিষ্ঠ হয়ে বসলেন রসিক সাহেব।
কণ্ঠে মধু ঢেলে বললেন-
: কথা কি জানো-? কেন জানি না- তোমার ওপর আমার কেমন যেন একটা মায়া পড়ে গেছে। তাই আপন মনে করে বলা আর কি।
ঘড়ি দেখলো জামিল।
কলেজের সময় হয়ে গেছে।
বোধ হয় বুঝতে পারলেন রসিক সাহেব।
ওঠার ভাব দেখিয়ে বললেন-
: কথাটা হচ্ছে এই যে পাড়ার ছেলেরা তোমায় হিংসে করে।
জামিল উঠে দাঁড়ালো। বলল-
: হিংসে করে-! আমাকে-! কেন বলুন তো-?
অমায়িক হাসি হাসলেন রসিক সাহেব।
বললেন-
: করবে না-। ওরা কি তোমার সমতুল্য হেঃ হেঃ হেঃ। বলতে গেলে তুমিই হচ্ছ গিয়ে এ পাড়ার ক্লাস ওয়ান ছেলে। কারণটা হচ্ছে গিয়ে ঐ রেবেকা চৌধুরী…. আর তার সাথে তোমার মিলবে ভালো। এটা সবাই জানে।
কাজেই-
একসাথে এতোগুলো কথা বলে একটু হাঁপিয়ে গেলেও আবারো কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন রসিক সাহেব।
ব্যস্ত হয়ে বাধা দিল জামিল।
বলল-
: মাপ করবেন-প্রথমত: রেবেকা চৌধুরীকে আমি চিনি না। দ্বিতীয়ত: আমাকে নিয়ে পাড়ার লোকেরা দুশ্চিন্তা বা হিংসা কোনটারই কোন কারণ নেই।
জামিলের কাঁধে মৃদু চাপ দিয়ে অর্থপূর্ণ হাসি হাসলেন রসিক সাহেব।
বললেন-
: এতে লজ্জার কি আছে বাবাজি? তুমি তো আর চুরি করছো না। দিব্যি লেখাপড়া জানা চৌকস ছেলে। রেবেকার সাথে একটু আধটু ইয়ে হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
এবার রীতিমত বিরক্ত হলো জামিল।
বলল-
: ভুল করছেন। ঐ ভদ্র মহিলার সাথে সত্যি আমার কোন সম্পর্ক নেই, বিশ্বাস করুন।
কিন্তু বিশ্বাস করলেন না রসিক সাহেব। তেমনি হাসতে-হাসতে বেরিয়ে গেলেন।
জামিল জানতো না রেবেকা চৌধুরী এই মালিবাগের ‘হিরোইন’।
জানা ছিল না, ওর সম্পর্কে কিছুই।
জামিলের মনে হলো-
এ পাড়ার সবাই ক্ষ্যাপা। এক সময় জানতে ইচ্ছে হলো ওর। জানতে ইচ্ছে হলো কে এই রেবেকা চৌধুরী?
এমন কী আছে ওর মধ্যে?
এরই মধ্যে একদিন বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছিল জামিল। রাস্তায় প্রচুর লোকজন।
গাড়ির শব্দ।
এমনি সময় কানে এলো-
: শুনুন-
প্রথমে খেয়াল করেননি জামিল।
কিন্তু একটু পরে আবার সেই কণ্ঠ-
: শুনছেন? আমি আমি আপনাকে বলছি মি. জামিল।
জামিল একটু সচকিত হয়ে দেখলো একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে ডাকছেন এক মহিলা।
: জি, আমাকে কিছু বলছেন?
: আপনিই বোধ হয় প্রফেসর জামিল আহমেদ?
: জি হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে আমি ঠিক…..
বিলোল হাসলো মহিলা-
বলল-
: আমি রেবেকা। রেবেকা চৌধুরী আপনার প্রতিবেশী। মালিবাগেই থাকি।
: ও-আচ্ছা !
জামিল হাসবার মতো মুখ করলো।
বলল-
: জি।
: হ্যাঁ চিনতে পেরেছি। কিন্তু এই অসময়ে আপনি বাসস্ট্যান্ডে…?
আবারো হাসলো রেবেকা চমৎকার করে। বুকের ভেতর থেকে একটা পাতলা রুমাল বের করে গলা ও ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে বলল-
: আজ দু’দিন হয় গাড়ি ওয়ার্কশপে গেছে।
: অ-
জামিল মুহূর্তের মধ্যে দেখে নিল মহিলার আপাদমস্তক।
পাতলা…প্রিন্ট শাড়ি খুব কায়দা করে পরা। মানুষকে আকর্ষণ করার মতো চেহারা এবং কথা বলার ভঙ্গি।
ঋজু এবং তীক্ষè দেহ বল্লরী খুব সহজেই চোখে পড়বার মতো।
একটা অব্যক্ত অস্বস্তিতে উসখুস করছিল জামিল।
কথা বলল রেবেকাই-
: বাড়ি ফিরছেন-
: জি।
: বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন?
জামিল রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলল-
: ভাবছি একটা রিকশা নিয়ে নেব।
: আমিও তাই ভাবছিলাম।
জামিল আর এক পলক দেখে নিল রেবেকাকে। একটা রিকশা কাছে আসতেই হাত দিয়ে থামালো সেটা।
বলল-
: আপনি এই রিকশায় উঠে পড়ুন। আমি আরেকটা দেখছি।
রেবেকা পরম বিস্ময়ে বলল-
: সে-কি-!
জামিল বুঝতে না পেরে বলল-
: আপনি রিকশায় যাবেন বলছিলেন…।
: হ্যাঁ-
: তা হলে।
: আপনিও আসুন
: আমি মানে…।
মানে মানে করবেন নাতো। আসুন। এক পাড়াতেই তো যাবো। এক রকম প্রায় হাত ধরে টেনে জামিলকে নিয়ে রিকশায় উঠে বসলো রেবেকা।
সারাটা পথ একেবারে আড়ষ্ট হয়ে রইলো জামিল। কাজটা একেবারেই ভালো হোল না। রেবেকা এক সময় বলল-।
আপনি কি আমার ওপর রাগ করছেন?
: নাÑ।
রেবেকা হাসলো একটু।
বলল-।
: আপনার কথা এতো শুনেছি যে, মনে হচ্ছে আপনি আমার অনেক দিনের চেনা।
জামিল উদাসীন ভাবে বলল-।
: তাই নাকি !
: সত্যি তাই।
গলির মুখে আসতেই রিকশা থামিয়ে নেমে পড়লো জামিল। পকেট থেকে টাকা বের করে বলল-
: স্যরি। মার্কেটে একটু কাজ আছে। আপনি বাড়ি চলে যান। বিলোল হাসলে রেবেকা। বলল-
: থ্যাংক ইউ।
রিকশা আবার চলতে শুরু করলো।
জামিল যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।
কিন্তু ধরা পড়ে গেল বন্ধুদের কাছে।
ছুটির সকাল। প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বেশ ঝকঝকে।
ক্যাসেট প্লেয়ারে গোলাম আলীর গান বাজছে। জামিল কবিগুরুর নির্ঝরের স্বপ্ন-ভঙ্গ আবৃত্তি করছে।
অনেকদিন পর মনে পড়লো ছাত্রজীবনে আবৃত্তিকার বলে বেশ সুনাম ছিল ওর। কলেজের মেয়েরা ফ্যান ছিল ওর।
আজকাল আর তেমন সময় হয় না কবিতা নিয়ে নাড়াচাড়া করবার।
ছুটির দিন বলেই হয়ত বা বন্ধুরা এলো কয়েকজন।
এসেই হামলা করলো সবাই। বাড়িতে কোন মহিলা নেই বলে বন্ধুরা কেউ কেউ সরাসরি জামিলের শোবার ঘরেই ঢুকে পড়ে।
আজও তাই হোল।
গান এবং আবৃত্তির মধ্যেই জামিলকে পাকড়াও করলো ওরা।
রাজু বলল-
: এই না হলে হিরো?
জামিল হেসে ওঠে দাঁড়ালো।
বলল-
: আরে তোরা। আয় আয় বস
আসিক কৃত্রিম গাম্ভীর্যের ভঙ্গিতে বলল-
: বসতে আসিনি বন্ধু। উপলব্ধি করতে এসেছি।
: মানে?
: এই যে ছুটির সকাল… ওস্তাদ গোলাম আলীর গান… হাতে কবিতার বই… সব মিলিয়ে ব্যাপারটা একটু অন্যরকম মনে হচ্ছে নাকি?
জামিল বলল-
: চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। তোরা তো আছিস শুধু এই সব নিয়ে। যত্তো সব মেয়েলি স্বভাব।
কি খাবি বল-চা না কফি?
রাজু বলল-
নাথিং-। আমরা জানতে এসেছি এসবের মানে কী?
কিসের মানে?
: হিরোইনের সাথে এক রিকশায় ঘুরে বেড়ানো? এর পরও তুই বলতে চাস যে রেবেকাকে তুই চিনিসনে।
হাসলো জামিল।
আচ্ছা এই ব্যাপার? শোন-
: বললে তো বিশ্বাস করবি না। মেয়েতো নয় একটা বিচ্ছু। একেবারে আঠালি গাছের আঠা।
আরিফ গোয়েন্দার দৃষ্টিতে দেখলো জামিলকে। তারপর গলাটা একটু নামিয়ে বলল-
: এবার আসল কথা বল। কত দিন থেকে চলছে?
: কত দিন থেকে? হাঃ হাঃ হাঃ। আরে ঐ দিনইতো প্রথম দেখা জামিল আর হাসি সামলাতে পারলো না।
আরিফ গম্ভীর হয়ে বলল নারী নিকেতনের রেহানা ভাবী ঠিকই বলেছিল। বলছিল-তুমিই হবে-মালিবগের ‘হিরো’।
আবারো হাসিতে ফেটে পড়লো জামিল।
বলল-
: কিন্তু এই জ্যোতিষ ভাবীটি কে?
সামু বলল-
মালিবাগের মেয়েদের ক্লাব, নারী নিকেতনের সেক্রেটারি।
জামিল বুঝলো মালিবাগের নর নিকেতন নারী নিকেতন-সবাই মাথা ঘামাতে শুরু করেছে ওকে নিয়ে।
তা ঘামাক। ক্ষতি নেই। কিন্তু তার সাথে রেবেকাকে জড়ালো কেন?
শেষ পর্যন্ত জামিল মালিবাগের কিংবদন্তিকে অস্বীকার করতে পারলো না। কাজেই তা সওয়ার হয়ে গেল।
জামিলের মনে হলো যেন ও নিজের সাথে প্রতারণা করছে। রেবেকা যেন ওর অনেক দিনের চেনা। শুধু সংস্কারাচ্ছন্ন মনের জড়তার জন্যই সাথে সে সহজ হতে পারে না। এর পর ইচ্ছে করেই রেবেকার সাথে জামিল অসংকোচে মিশতে লাগলো।
সেদিন পাড়ার মাথায় রেবেকার সাথে দেখা। বললো-
: কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
: ভার্সিটিতে।
: আমিও সেই দিকে যাচ্ছি। চলুন না এক সাথে যাওয়া যাক। একটু যেন ভাবলো রেবেকা। বলল-
: তার আগে আমার একটু রেডিওতে যেতে হবে। একটা রিহ্যারসেল আছে। জামিল হেসে বললো-
: বেশতো চলুন পৌঁছে দি। একটু চমকালো রেবেকা। বলল-
: না না সেখানে আমার বেশ কিছুক্ষণ থাকতে হবে। আপনার কি অতো সময়…।
: জামিল বলল-স্যরি-স্যরি-দুর্ভাগ্য। হাতে বেশি সময় নেই।
বাস এসে গেল। রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়লো রেবেকা।
এরপর আরো অনেক দূর এগিয়েছে ওরা। সম্পর্ক আপনি থেকে ‘তুমিতে’ এসেছে। পাড়ায় “মুখরোচক” আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হলো ওরা দু’জন।
জামিল হঠাৎ ঠিক করলো- আর নয়। ঢের হয়েছে নিরিবিলিতে থাকা। যে করেই হোক মালিবাগের মায়া ওকে কাটাতেই হবে।
একদিন রসিক সাহেবকে বলল-
: আপনিতো এখানকার পুরনো বাসিন্দা। অন্য কোন পাড়ায় একটা বাড়ি টাড়ির খোঁজ দিন না।
চোখ বিস্ফারিত করে তিনি বললেন-
: মানে?
: মানে এখানে মন টিকছে না।
: মন টিকছে না?
অবিশ্বাস্য সুরে বললেন-রসিক সাহেব। তারপর হঠাৎ জামিলের চিবুকে হাত দিয়ে মুখ তুলে ধরলেন জামিল। সভয়ে বললো-
: করছেন কী?
গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। বললেন-
: মন কষাকষি হয়েছে? বেশ হয়েছে। এনা হলে প্রেম সফল হয় না। কিন্তু তাই বলে ‘বাস’ উঠিয়ে দেবে? এ কেমন অভিমান? ওটি হতে দেবো না আমি রেবেকাকে আজই।
ব্যস্ত হয়ে বাধা দিয়ে বললো জামিল-
: আপনি কি যাতা বলছেন রসিক সাহেব। ছিঃ ছিঃ ছিঃ ওসব কিছু না। এমনি কাজের বড় ক্ষতি হচ্ছে এখানে। তাছাড়া কলেজ বেশ দূর-বাড়ি থেকে।
কেমন ধারা হাসলেন রসিক সাহেব।
বললেন-
: বাবাজি এখন না হয় চুলে পাক ধরেছে। কিন্তু আমারো তো একদিন তোমার মতো কাঁচা বয়স ছিল। আমার পুটির মায়ের সাথে… বিয়ের আগে… বুঝলে কিনা… একটু আধটু হয়েছিল। হেঃ হেঃ একেবারেই যে না বুঝি-এমন নয়।
জামিলের কিছু বলার নেই। বুঝতে এরা চায় না। আর যেটুকু বোঝে-তা এদেরই আবিষ্কৃত।
না-
কাউকে বলা কওয়া নয়।
নিজে থেকেই চুপ করে সরে যেতে হবে। নইলে মালিবাগদের অক্টোপাসের বন্ধন থেকে কেউ ওকে বাঁচাতে পারবে না।
বাড়ি না পায়-কোন বন্ধুর আস্তানায় অন্তত মাথা গুঁজবার জায়গাটা নিশ্চয়ই হবে। আশ্চর্য এই এলাকা-সেদিন সন্ধ্যায় ‘নারীনিকেতনের’ বার্ষিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত হয়ে গেলো জামিল-
ক’জন সুবেশিনী তরুণী অভ্যর্থনা করে ভেতরে নিয়ে গেল। এক ফাঁকে রাজু জানিয়ে গেল-যে ওরাই সীমা নীলু আর কুল্লরার দল।
জামিল দেখলো প্রথম সারিতে মরাল গ্রীবা ভঙ্গি করে সম্রাজ্ঞীর মতো বসে আছে রেবেকা। ওর কানে আর গলায় নীল পাথরের ইমিটেশন-হীরের মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে। চার পাশে ঘুর ঘুর করছে কম বয়সী কয়েকটা মেয়ে।
একটু পরেই সেক্রেটারি হেনাভাবী বেরিয়ে এলেন ব্যস্ত হয়ে। বললেন-
: কি ব্যাপার রেবেকা, তুমি নাকি আজ গাইতে পারবে না।
করুণ করে হাসতে চেষ্টা করলো রেবেকা। বলল-
: সত্যি বলছি ভাবী-মামস্ এর মতো হয়েছে। না এলে আপনি রাগ করবেন-
শুধু তাই।
জামিলকে দেখতে পেয়ে উঠে এলো রেবেকা। কোন রকম ভনিতা না করেই জিজ্ঞেস করল। তুমি নাকি চলে যাচ্ছো?
: যচ্ছি।
: কোথায়?
: ঠিক করিনি।
: কেন যাচ্ছো?
: জানি নে –
জামিলের চোখে চোখ রাখলো রেবেকা। তারপর আদেশের সুরে বলল-
: এসো আমার সাথে।
ক্লাব ঘরের পেছনে নির্জন বারান্দায় এসে দাঁড়ালো ওরা। কয়েক জোড়া চোখ ছুয়ে গেল ওদেরকে। কে যেন বলল-
: ইনি প্রফেসর আহমেদ
: জামিল
রেবেকা ওর মুখোমুখী দাঁড়ালো। চোখে চোখে রেখে দৃঢ় কণ্ঠে প্রশ্ন করলো।
: সত্যি কারণটা বলবে?
: বলব।
কেন যাচ্ছো?
: তোমার জন্যে।
: আমার জন্যে…! কি করেছি আমি তোমায়? চোখে ওর ঘৃনায়মান অবাক প্রশ্ন।
: জামিল বললো-
: তুমি কি করেছো জানি না। তবে আমি…আমি তোমায় ভাল বেসেছি। আর তাই তোমার মঙ্গলের জন্যেই…।
: ভালো বেসেছো…।
আশ্চর্য বেসুরোভাবে কথাটা উচ্চারণ করলো রেবেকা। তারপর হঠাৎ দু’হাতে মুখ ঢেকে ডুকরে কেঁদে উঠলো। বিস্ময়ের সীমা নেই জামিলের।
অনুতপ্ত কণ্ঠে বললো-।
: কি হোল রেবেকা? আমি কি তোমায় আঘাত দিয়েছি? অশ্রুসিক্ত থমথমে মুখ তুললো। বলল-
: না কিছু না।
সে দিন নারী নিকেতনের অনুষ্ঠান না দেখেই বাড়ি চলে গেল রেবেকা জামিলকে অবাক করে দিয়ে। সেদিন ও বোঝেনি-মালিবাগের সম্রাজ্ঞী রেবেকা জামিলের একটি সাধারণ সত্যি কথা শুনে অমন করে আকস্মিক কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল কেন।
মনের নির্দিষ্ট সুরটা আজ হারিয়ে গিয়েছিল। বারান্দায় চেয়ার পেতে সিগারেট ধ্বংস করছিলো জামিল। সন্ধ্যা নেমেছে চারদিকে। সেই সাথে অঝোরে বৃষ্টি। চারদিকে একটা বিষন্ন ভাব—-।
নারী নিকেতনের ক্লাব ঘরও আজ অন্ধকার।
পাড়ার আপা ভাবীরা জোটেনি আজ। জোটেনি নীলু, শীলা, সীমার দল। কি করছে ওরা এখন……? হয়ত বা গল্প করছে। গান গাইছে। নয়তো বা চুপ-চাপ গালে হাত দিয়ে জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখছে…।
কি করছেন এখন রসিক সাহেব?
পাড়ার কোন তরুণ কোন তরুণীর ওপর মান করেছে হয়ত বা তারই থিওরি আবিস্কার করছেন মনে মনে।
বেচারা রসিক সাহেব। তার চাইতে বরং পুটির জন্যে একটা বর খুঁজে হন্যে হলেও কাজে আসতো তাঁর।
কি করছে এখন রেবেকা? বৃষ্টির মতো করে কাঁদছে কি?
কিন্তু কেন? রেবেকার মতো মেয়ে কেন সেদিন অমন করে কাঁদলো। নাকি জামিলের ভালোবাসি কথাটা ওর সম্মান কে আঘাত করেছে…। কে জানে?
মালিবাগরে পুরোন বাসিন্দা রাজু, হাসান আর সোহেলের মতো ছেলেদের আমল দেয়নি যে মেয়ে, জামিলের মতো নতুন প্রতিবেশীর প্রেম নিবেদন তার কাছে অসম্মানজনক বৈকি। রেবেকা মহৎ। তাই ওর দুঃসাহসের জবাব না দিয়ে নিজেই ব্যথা পেয়েছি শুধু।
মালিবাগের কিংবদন্তী জামিলকে আকাশে তুলেছিল। কিন্তু রেবেকা তারও অনেক উর্দ্ধে …। এজন্যে ক্ষমা চাওয় উচিৎ ওর… লজ্জা পাওয়া উচিৎ। হঠাৎ কি খেয়াল হোল।
গায়ে বর্ষাতি চাপিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লো। জামিল বৃষ্টির মাত্রা ক্রমশ বেড়ে চলল। সেই সাথে বাতাসও।
একটু একটু করে ঝড়ের মাত্রা বেড়ে চলল। বেড়ে চলল আমার আকাক্সক্ষার দুঃসাহস।
কে একজন ছাতা মাথায় এদিকে আসছিল। উঁচু গলায় জিজ্ঞেস করলো জামিল-।
: ও সাহেব-রেবেকা চৌধুরীর বাড়ি কোনটা বলতে পারেন?
: রেবেকার বাড়ি? সাহেব বুঝি নতুন এ পাড়ায়?
বললাম-
: কতটা তাই। দয়া করে বাড়ির নাম্বারটা বললেই চলবে।
: নাম্বার? হেঃ তা জানিনে সাহেব। গলির ভেতরে ঢুকে যান। শেষ মাথায় দেখবেন-
রাধাচুড়ার গাছওয়ালা বাড়ি ওটাই।
বিরক্ত হয়ে চলে গেলেন ভদ্রলোক। জামিল কৃতার্থ হয়ে এগিয়ে চললো। ঝড়ের মাতালামো আর বৃষ্টির ঝাপটায় পথ চলা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তবুও অতি কষ্টে নির্দিষ্ট বাড়ির দরজায় এসে ডাকলো-
: কে আছেন?
অনেক্ষণ ডাকা ডাকির পর মাঝ বয়সী একটা লোক বেরিয়ে এলো দরজা খুলে। বলল-
: কাকে চাই?
: রেবেকা চৌধুরীকে, আছেন?
: ও-রেবুকে-কেমন ধারা হাসলো লোকটি। বলল-
: আছে। কিন্তু সাহেব বুঝি নতুন? তাই একেবারে বৃষ্টি মাথায় করে….।
জামিল বলল-
: দরকার-বিশেষ দরকার ওকে…। লোকটি বলল-
: কতক্ষণ থাকবেন? বৃষ্টির দিনেতো রেবু কারো সাথে-
: বেশীক্ষণ না।
ভেতরে চলে গেল লোকটি। কিছুক্ষণ পরেই ডাক এলো।
ভেতরে একটি সুদৃশ্য ঘরে গিয়ে বসলো জামিল।
মেঝের পুরু কার্পেট পাতা… দু’একটি বাদ্য যন্ত্র রাখা।
ধুপের গন্ধ…কোনায় রজনীগন্ধার ঝাড়…। দেয়ালে টাঙ্গানো রেবেকার চমৎকার একটা ছবি…। অপূর্ব……।
সব মিলিয়ে রেবেকার ঘরটাই যেন ওর পরিচয় বহন করছে।
হয়তো মেঘমল্লার গাইছিল রেবেকা ঐ তানপুরার সুরে-সুর রেখে….হয়তো উঠে গেছে একটু আগে।
রেবেকার অপূর্ব ছবির নীচে দাঁড়িয়েছিল জামিল তন্নয় হয়ে।
পেছনে থেকে বিলোল হেসে অভ্যর্থনা করলো রেবেকা-
: আসুন-
ঘুরে দাঁড়ালো।
আর অমনি বিদ্যুৎ স্পৃষ্ঠের মতো চমকে উঠলো রেবেকা।
: তুমি?
জামিল স্তব্ধ।
নির্বাক। দেখছিল-সুদৃশ্য কারুকার্য করা কাচুলী আর রেশমী ঘাঘরা পরা মুখে রং মেখে সং সাজা রেবেকাকে।
নিজেকে সামলে নিয়ে-দরজার দিকে পা বাড়িয়ে জামিল বললো-
: মাফ চাচ্ছি। আমি না জেনে এসেছিলাম।
এগিয়ে এসে দরজা আড়াল করে ওর মুখোমুখী দাঁড়ালো রেবেকা। চোখে আগুন জ্বেলে প্রশ্ন করলো-সত্যি করে বল কেন এসেছিল?
জামিল বলল : এসেছিলাম-অসামান্য দর্শনে
: তুমি আমায় অসামান্য মনে করতে?
: করতাম।
হঠাৎ উপুড় হয়ে ওর পা চেপে ধরলো রেবেকা। আকুল কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল-
: তুমি মহৎ। কিন্তু আমি তা নই। আর যাই করি না কেন তোমাকে আমি এ পথে টানতে পারব না। তুমি যাও… যাও…. আমি তোমার ঘৃণার যোগ্য। দাঁতে দাঁত কষে জামিল বলল-
মালিবাগের নায়িকা তুমি। মহত্ত্ব দেখাচ্ছ না?
মুখ তুললো রেবেকা।
অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল-।
: না জামিল। মহৎ আমায় মালিবাগ করেছে। আমার কোন গুণ নেই। পাপ আমার মজ্জাগত। ছলনা আমার ধর্ম। ভদ্রতা আমার মুখোশ। প্রেম আমার অভিনয়। মালিবাগের দিনের রেবেকা চৌধুরীকে চেনে একটি অসামান্য মেয়ে হিসেবে। তারা জানে না রাতের এক বারবনিতাকে। যারা চেনে-তারা ভিন্ন পাড়ায় বড় ঘরের বাসিন্দা। কিন্তু তুমি….তুমি… আমায়-না-না-না যাও জামিল তুমি যাও।
জামিল অবাক হলো।
কি বলছো তুমি? তোমার বাবা মা?
রেবেকা চোখ মুছে বলল-।
না এই দুনিয়ায় কেউ নেই আমার, যে আছে সে আমার বস। ছদ্মবেশী দালাল মালিবাগের কিংবদন্তি আমায় সম্মানের উঁচু শিখরে তুলে দিয়েছিল।
একটু দম নিল রেবেকা।
তারপর আবার বলল-।
তুমি আমার চোখ খুলে দিয়েছো জামিল। আমি এই প্রথম উপলব্ধি করতে পেরেছি যে সব পুরুষ একরকম নয়। আর আমি যখন অনুভব করলাম যে তুমি সত্যি আমায় ভালোবাসো- তখন মনে মনে শুধু নিজের মৃত্যু কামনা করতে লাগলাম।
কেন রেবেকা?
কারণ তোমার ভালোবাসায় অমৃত পান করার কোন অধিকার আমায় তখন ছিল না।
: রেবেকা।
: হ্যাঁ জামিল।
জামিল রেবেকার হাত দু’টি ধরলো। কম্পিত কণ্ঠে বলল-।
এখনো সময় আছে রেবেকা।
আমার জন্য-আমার ভালোবাসার জন্য-তুমি ফিরে এসো রেবেকা
রেবেকা জামিলের চোখে চোখ রেখে বলল-
: সব জেনেও তুমি এ কথা বলছো-।
: বলছি- তুমি তো আমায় কাছে কোন কথা গোপন করনি- আমাকে ঠকাতে চেষ্টা করনি-
: জামিল-
দু’হাতে মুখ ঢেকে ঢুকরে কেঁদে উঠলো রেবেকা। বলল-
: সব জেনেও কেন তুমি এমন করছো জামিল?
: বললে বিশ্বাস করবে?
: নিশ্চয় করব।
জামিল রেবেকার চিবুকে হাত দিয়ে মুখটি তুলে ধরলো-
: একটি পাঁকে পড়ে যাওয়া ফুলকে গৃহে স্থাপন করে নিজেকে ধন্য করবো।
রেবেকা ছিটকে দু’পা পিছিয়ে গেল। অস্ফুট কণ্ঠে বলল-
: এ হয় না-এ হতে পারে না।
জামিল স্থির কণ্ঠে বলল-
: কাল সন্ধ্যায় আসব। তৈরি থেকো।
চলে গেল জামিল।
তেমনি দাঁড়িয়ে রইলো রেবেকা।
পরদিন সকাল।
খবরের কাগজ পড়ছিল জামিল।
সামনে ধূমায়িত চা।
একটি ছেলে এসে একটি খাম দিয়ে গেল-
একটু অবাক হয়ে খামটি খুলে ফেললো জামিল-
লেখাছিল-
জামিল-
আমি মনস্থির করেছি। বনের পশুরা যে ফুলকে দলে যায় তা দিয়ে বাসর সাজানো যায় না-আমাকে খোঁজার বৃথা চেষ্টা কর না।
রেবেকা।
চিঠি হাতে স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো জামিল বুকের ভেতরটায় যেন কেমন করে উঠলো।