জীবনশিল্পী শাহেদ আলী (১৯২৫-২০০১) জীবনের আয়তনিক রূপকল্পই তাঁর ছোটোগাল্পিক নিষ্ঠা। জীবনের পরতে পরতে জড়ান আনন্দ-বেদনা-দুঃখ-সুখের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি দিয়ে গড়া তাঁর গল্পের শরীর। জীবনের সফল প্রতিনিধি যে মানুষ, একজন শাহেদ আলী সেই মানুষেরই সমাজ পরিবার এবং পারিপার্শ্বিকতার অন্বর্থ রূপকার। তাঁর গল্প তাঁরই রক্তমাংসের বিশিষ্ট অভিজ্ঞতা। বিশেষভাবে গ্রামীণ পরিবেশে রচিত গল্পগুলি- ‘জিবরাইলের ডানা’, ‘একই সমতলে’, ‘ছবি’, ‘শা-নযর’, ‘কপাল’, ‘পোড়ামাটির গন্ধ’, ‘নতুন জমিনদার’, ‘অতীত রাতের কাহিনী’, ‘বরকতুল্লাহ’, ‘মহাকালের পাখনায়’, ‘উদগীরণ’ প্রভৃতি। এসব গল্পে চেনা জগতের বিচিত্র পেশার কিছু মানুষের জীবনের রূপরেখা অঙ্কনে সচেষ্ট হয়েছেন তিনি। খাজা, খোদা নেওয়াজ, হাতেম, বন্দা, কুলসুম, বোচা, বানু, শমশের, মর্তুজা প্রতিটি চরিত্রই তাদের স্বাভাবিক জীবনবৃত্তান্তে বিশেষ পরিবেশসচেতন এবং আত্মশক্তির প্রতীকস্বরূপ। একজন খাজার প্রতিকৃতি যেভাবে খুঁজে পাওয়া যায় ‘ছবি’ গল্পটিতে- জীবন-যাপনের অকাতর তাগিদ এবং কিছুটা দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির আকাক্সক্ষা তাতে উৎসাহিত করে ভিন্নধর্মী একটি পেশা চয়নে। গ্রাম-গঞ্জের নির্বিচার মানুষগুলির কাছে আর দশটি নিয়মিত পেশার বাইরের খাজা চয়নকৃত এই পেশাটি। তাই একদিন যখন সে মিলিটারির পোশাকে আচমকা হাজির হয়ে যায় স্ত্রী খালেদার সামনে, সরলমনা বধূটির প্রকৃত বিস্ময়ের সামনে সহজ হাসি হেসে বলে:
আরে, কও কী, হাসতে হাসতে ফেটে পড়েছিলো খাজা-পুলিশ না, পুলিশ না, এটা অইলো গিয়া মিলিটারি পোশাক। আমি আর্মির লোক। মুখ তুলে খালেদা অনেকক্ষণ তন্ময় হয়ে চেয়ে থাকে খাজার দিকে। গর্বে আনন্দে ভরে উঠতে থাকে খালেদার বুকের ভেতরটা, মুখে বলে- এ তো আরো খারাপ! বিস্ময়ে খাজার দু’চোখ চকিত হয়- ক্যান? খাজা প্রশ্ন করে। -মিলিটারি মানুষ মারে, খাজার চোখের উপর চোখ রেখে হাসি গোপন করে খালেদা। -কে কয় মিলিটারি মানুষ মারে?- তয়? খালেদা বিস্ময় প্রকাশ করে। -মিলিটারি মানুষ মারে না, দুশমন মারে, খাজা হাসতে হাসতে বলে।
এভাবে খাজার পেশা বাছাইয়ের স্বরূপটুকু আর অপ্রকাশিত থাকে না পাঠকের কাছে। পুরা ছ’ফুট দৈর্ঘ্যরে পেটা পেশল শরীর আর চওড়া বুকের চমৎকার স্বাস্থ্যের অধিকারী এই চরিত্রটিকে তার পেশার স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও চিনে নিতে কষ্ট হয় না তাই। গোটা গল্প জুড়েই দৃষ্টির সামনে থেকে অপসারিত রাখা হয় চরিত্রটিকে, তবুও বর্ণনার সহজ অভিব্যক্তিতে যেমন স্বচ্ছন্দে বিরাজমান সে তার পরিবারের মানুষগুলির সামনে তেমনি পাঠকবোধেও। গল্পের শেষ পরিণতিটুকুই করুণ থেকে বীভৎস রসে নিষিক্ত- স্ত্রী খালেদা এবং পুত্র আসাদের মনে আঁকা তার বীরত্বের প্রতিভাসটুকু নিমেষে মিলিয়ে যায় এক নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞে। শেষ দৃশ্যে ঠিক দুশমন মেরে নয়, উল্লসিত দুশমনের হাতেই শোভা পায় খাজার রক্তাপ্লুত কাটামু-খানি। ‘কপাল’ গল্পে জেলে খোদা নেওয়াজের কঠিন পরিশ্রমের জীবন, একই সঙ্গে তার পেশা বিমুখতা স্পর্শ করে পাঠক হৃদয়। ভাগ্যের দোষে পৈতৃক পেশা থেকে ছিটকে পড়েছে সে। পরিশ্রম ছিল বিগত পেশাতেও, কিন্তু পাশাপাশি ছিল আনন্দ। ছিল ঘর-গেরস্থালির সুখ:
সে ছিল গেরস্থ মানুষ। জমি-জমা যা ছিল তাই দিয়া তার বছরের ছয় মাস চলিয়া যাইতো; বাকি কয় মাস সে পাহাড়ে কাজ করিতো। কাঠ-বাঁশ কাটিয়া কাঁধে করিয়া পাহাড় হইতে নামাইতো, তার পা নাও-এ করিয়া ঘিলাগড়, মহেশখলা, মধ্যনগর, সাচনা প্রভৃতি বাজারে নিয়া গিয়া সেগুলি বেচিতো। অভাব বলিয়া খোদা নেওয়াজ কিছুই জানিত না। এ তল্লাটে আরো হাজার হাজার লোকের মতো পানির ছয়টা মাস সে এভাবেই কাটাইতো। কী হাসি-খুশিতেই না সবার দিন কাটিতো! যারা গতর খাটাইতে পারিত তাদের অভাব বলিয়া কিছুই ছিল না।
কিন্তু রাজনৈতিক দুরবস্থার কারণে দেশ বিভাগের নিষ্ঠুর নিয়মের নিগড়ে বাঁধা পড়ে গেছে সে, হাত-ছাড়া হয়ে গেছে পাহাড় আর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে মেনে নিতে হচ্ছে জেলে জীবনের মতো নিদ্রাহীন, সম্মানহীন সংকীর্ণ বৃত্তি। খোদা নেওয়াজের এই সূক্ষ্ম কষ্টবোধকে ঘিরেই এই গল্পের আবর্তন। ‘পোড়ামাটির গন্ধের’ হাতেমও কিন্তু পেশা বদল করেই আজ দেখে ট্যাংগুয়ার বিলে মাইলের পর মাইল ধানের সবুজ আর সবুজ খেতের স্বপ্ন। কিন্তু ভূমিহীন কৃষকদের এই স্বপ্নচ্ছবি ভেঙে চুরমার হতেও সময় লাগে না বেশি। অচিরেই ভূঁইফোঁড় জমিদারের মালিকানার বশ্যতা মেনে নিতে বাধ্য হতে হয় তাদের। এই জগতের নিয়ম, জমির দরকার ভূমিহীনদের:
তবু, জমি বিলি চলতে থাকলো-পয়লা কম দামে, তারপর অতি চড়া দামে। ভূমিহীনেরা তবু আসে। যেখানে ওরা প্রতিষ্ঠা করতে পারতো নিজেদের ভোগাধিকার, সেখানে ওরা মেনে নিলো জমিদারের মালিকানা। জমি তাদের চাই। আদম থেকে হাতেম পর্যন্ত মাটি উল্টানোর, বীজ বোনার, ফসল কাটার এক নিরবচ্ছিন্ন ইতিহাস। মৃত্তিকার জীবন জাগানো রসের সঙ্গে মিশে গেছে মানুষের প্রাণধারা। মাটির নেশায়ই ঘর বাঁধে মানুষের যাযাবর মন।
কিন্তু এ নিয়ম মেনে নিতে পারে না হাতেম, বিদ্রোহ জাগে তার রক্তে:
হাতেমের মাথাটা গল্ গল্ করে ওঠে- চোখটা জ্বালা করতে থাকে, দূরে চাইতে পারে না- মাটির দিকে চেয়ে আবার সে উল্টায় অতীতের। পাঁচ-ছয় বছর ধরে চলে জমি বিলি। ট্যাংগুয়ার চার পাশের ভূমিহীনেরা জমি পেলো সবাই। নিজেরা তারা আবাদ করলো জমি, অথচ মালিক মেনে বসলো এক ভূইফোঁড় জমিদারকে। ভূমিহীনদের কাপুরুষতা ও জমিদারের শয়তানি দু’য়েরই বিরুদ্ধে এক শ্বাপদ আক্রোশে নির্মম ওয়ে ওঠে হাতেম। কিন্তু তবুও সে একা, অসহায়।
ফলস্বরূপ জমিদারের সঙ্গে দ্বন্দ্বে আহত হয় হাতেম, অবশেষে করুণ পরিণতি ঘটে তার জীবনের। আর এভাবেই শেষ হয় একজন পরাজিত ভূমিহীন কৃষকের এ গল্প। একইভাবে স্বপ্নের ঝিলিক জাগে নতুন জমিনদার গল্পের বন্দার চোখেও। বন্দার পেশাভিত্তিক পরিচয় ‘গণ্ডামি ষণ্ডামি’ করা, ‘পরের জিনিস হাতান’ আর ‘চেয়ারম্যানের ধামাধরা’। এহেন বন্দা স্বপ্ন দেখে সরকারি ব্যবস্থায় জমিনদার হওয়ার।
একদিন থানা সদরে গিয়ে, বন্দা আর মেন্দি সরকারের লোকজনের কাছ থেকে জমিনের কাগজপত্র বুঝে নিয়ে এলো। আর তখন থেকে, মা-পুত, জরু-বোনে মিলে কেবলি জমিনের খোয়াব-জমিনের কথা। বন্দা এখন চেয়ারম্যানের বাড়িতেও বড় একটা যায় না। এর কাণ্ড-কারখানায় চেয়ারম্যান হাসে। তার চেষ্টায়ই তো বন্দা জমিনটা পেয়েছে। সারাটা এলাকা এখনো তলিয়ে আছে পানির নিচে। গোটা ভাটি এলাকাই পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকে ছ’মাস। কার্তিকে পানি সরে গেলে জমিন ভেসে উঠবে- তখন জমি মেপে দাগ নম্বর চিহ্নিহ্নত করে দেবে আমিন।
অবশেষে কার্তিকের শেষে জমিন বুক ভাসালো পানির নিচে থেকে। অপেক্ষার প্রহর শেষে হল, কিন্তু জমিন দেখে মাথায় হাত দিয়ে বসল বন্দা- জমিন তো নয়- একটাপ টুক্-এলাকার আবাদি জমি থেকে অনেক উঁচু। মাটি কেটে যে আবাদি জমিনের লেভেলে আনবে- তাও সম্ভব নয়। হিজলের চারা, বিন্না আর বন-তুলসীর বনে ছেয়ে আছে জায়গাটি। এ জমিন সে কেমন করে আবাদ করবে? কিন্তু হাল ছাড়তে রাজি নয় সে, একদিন বাজার থেকে দেড় শো টাকায় কিনে নিয়ে এলো কোদাল। অতঃপর শুরু হল তার অমানুষিক পরিশ্রম-একদিন স্ত্রী মেন্দিকে অহঙ্কার করে বলেছিল সে, ‘যার জমিন আছে হেই তো জমিনদার’। সেই অহঙ্কারই জমি তৈরির কাজে পাশবিক শক্তি জোগায় তাকে। মহাজনের নগদ টাকার লগ্নির প্রলোভনেও নতুন জমিনদার হওয়ার কাতর স্বপ্ন ঘোচাতে পারে না বন্দা। ভালো হালের গরু নেই, পেটে ভাত নেই- তবুও ‘জমিন তাকে তৈরি করতেই হবে- ফসল তাতে বুনতেই হবে।’ এই স্বপ্ন আর জিদ গল্পের শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে বন্দা-ছেলে-বৌয়ের কাঁধে জোয়াল তুলে দিয়ে তার জমিনদার হওয়ার স্বপ্নটিকে চরমভাবে সার্থক করে তুলতে সচেষ্ট হয়ে ওঠে সে। ‘তার এবং তার মতো মানুষের আপন ঘর-বাড়ির দরকার হয় না; ওরা পরের বাড়িতে পরের জন্যই জন্মায়’ -এই আত্মোপলব্ধিবোধই স্পষ্ট করে দেয় ‘অতীত রাতের কাহিনী’ গল্পের কুলসুমের পেশাভিত্তিক পরিচয়। পরের বাড়ির অর্থাৎ বড় বাড়ির কাজের মেয়ে কুলসুম। তার মা-ও ছিল তাই, এ বাড়ির লোকদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে গেছে সে। বাড়ির বড়-সাবের নেক নজর ছিল দিয়ে গেছে ওপর। তাই খাস করে বড় সাবের খেদমত সেই করতো। মা মরে গিয়ে সে কাজ দিয়ে গেছে কুলসুমকে। আসলে বড় সাবের ঔরসের জন্ম কুলসুমের, আর একই ধারায় বড় বাড়ির পরবর্তী মালিক বড়মিঞার নেক নজর পড়ে কুলসুমের ওপর। এভাবেই মা-র ভাগ্য, মেয়ের ভাগ্য একই সুতোয় বাঁধা পড়ে যায় বড় বাড়ির জীবনের সঙ্গে। ‘বরকতুল্লাহ’ গল্পটিতে আমরা পাই একজন মালীর আত্মকাহিনী, যে তার পুরো জীবনটাই কোনো এক মহিলা কলেজের বাগান দেখাশোনার কাজে শেষ করেছে। শুধু বাগানের দেখা-শোনাই নয়:
ডিপার্টমেন্টের জন্য গাছ-গাছড়া, লতা-পাতা, ফুল জোগাড় করা ওর কাজ। ডেমোনেসেন্ট্রটর বা অধ্যাপিকারা ওকে ছাড়া চোখে দেখেন না। রেস্কোর্সের ময়দান, হাইকোর্টের উত্তরের খালি জায়গা, আজিমপুর দায়রা শরীফের জংগল এবং আরো নানা জায়গা থেকে ও এসব জোগাড় করে আনে। মাঝে মাঝে বোচা নিজের তাজ্জব বনে যেতো-গাছপালা, লতাপাতা যেন ডেকে ডেকে ওকে তাদের নাম বলছে। অতো নাম ডেমোনেস্ট্রেটর আর অধ্যাপিকারাও জানেন না।
এভাবেই একদিন অজানা একটা লতার রস লেগে চোখের দৃষ্টি হারায় বোচা। তবুও পিন্সিপালের দয়ায় সেই কলেজ প্রাঙ্গণ আঁকড়েই রয়ে যায় সে। অন্ধত্ব বোচার জীবনটাকে কিছুটা কর্মহীন এবং পরনির্ভরশীল করে তুললেও করুণ বা অসহায়ত্বই এ গল্পের শেষ উপজীব্য নয়। গল্পের শেষে এক পরিবর্তিত জীবনবোধের ধারক হিসেবে আমরা বোচাকে দেখতে পাই- তার বাইরের আলো ঘুচে যায় ঠিকই, কিন্তু ভেতরের আলোয় খুঁজে পায় সে এক নতুন বিশ্বাসের ঠিকানা। ধর্মান্তরিত হয়ে যায় সে, তার পৈতৃক নাম বীরেন্দ্র কুমার দেব পাল্টিয়ে নতুন নামকরণে তার পরিচয় হয়- ‘বরকতুল্লাহ আলায়হে’। এই নামেই শেষকৃত্য করা হয় বোচার, লেখকের ভাষায়:
আপনারা কেউ যদি আজিমপুর পুরনো গোরস্তানের রেজিস্টার খোলেন- দেখতে পাবেন ১৯৭৯ এর জুলাই থেকে যে সব লোককে এখানে কবর দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ৬৭১৭ নম্বরে, বরকতুল্লাহ্ আলায়হে বলে একজন লোকের নাম রেকর্ড করা রয়েছে। তার পিতার নামের জায়গাটা খালি।
‘মহাকালের পাখনায়’ গল্পটিতে পাওয়া যায় দুই যাযাবর বৃত্তির মানুষের জীবনালেখ্য। পেশাগত কারণে তাদের পায়ে কেউ শৃঙ্খল না গলাতে পারলেও সম্পর্কের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি খোঁজে ওরা দু’জনাই- ‘শমশের আর বানু। অথচ দু’জনাই দু’জনের জন্য ঘর ছেড়েছে ওরা, কেবল ঘর নয়, ছেড়েছে সমাজ-ধর্ম সব কিছু-বানু শুধু তার সমাজ তার বাপ-ভাইকে ছেড়েছে, কিন্তু শমশের শুধু বাপ-ভাইকে ছাড়েনি, বাপ-দাদার ধর্মও ছেড়েছে বানুর জন্য। মুক্তির আকাক্সক্ষাটা তাই শমশেরের ভেতরেই প্রবল, সে ভালোবাসা আজ তাদের সমাজবিচ্ছিন্ন যাযাবর করে তুলেছে, সেই ভালোবাসার আবেগের মায়াজাল থেকে মুক্তির তৃষ্ণা জাগে তার ভেতরে- ফেলে আসা দেশ, সমাজ-সংসার অদ্ভুত মমতায় হাতছানি দিয়ে ডাকে তাকে:
সেই বাঁশ-ফুল আর রাতা ধানের ভার আর খোশবুতে পাড়া মাত করা দুধ-শমশেরের নামের কাছে গন্ধটা হঠাৎ জীবন্ত হয়ে ওঠে! মনাই গাঙের শাই বড় বড় আইড়, কালবাউশ আর চিতল, শীতকালে জারি, ম’লখেলা, শরৎকালে পাল, নৌকা দৌড়ের আড়ং আর চৈতে-জ্যৈষ্ঠে কুশ্তি, লাঠি খেলা, ষাঁড়ের লড়াই-আজো শমশেরের পরাণটা আনচান করে- ওই দেশে ফিরে যাবার জন্য বুক তার হুহু করে ওঠে!
আর বানু, সে ভাবে-ভালোবাসার আবেগ ছেড়ে মুক্তির পথ কি এতই সহজ? সকল অনুতাপ, সকল অবিশ্বাস, সকল উপেক্ষাকে মেনে নিয়ে তাই সে আরও কঠিন বাঁধনে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলতে চায় শমশেরকে। ‘উদ্গীরণ’ একজন মর্তুজার গল্প। পৈতৃকভাবে চাষাবাদই মর্তুজার মূল পেশা হলেও শরীরে তার শিকারের নেশা। কাশ আর নলখাগড়ার জঙ্গলে ভরা ক্ষেত পাহারা দিতে বসে বাঘের হামলাও প্রতিহত করতে হয় তাকে। আর সেখান থেকেই মর্তুজার খ্যাতি একজন হিম্মতওয়ালা বাঢ়-শিকারি হিসেবেও। শিকারির সীমাহীন শক্তি এবং সাহসের পাশাপাশি বেপরোয়া স্বভাবেরও অধিকারী সে। তাই বিবাহিত হয়েও সুন্দরী বিধবা সুরৎজানের প্রণয় প্রত্যাশায় ‘শিরায় শিরায় যেন ঝড়ের উন্মাদনা’ জাগে তার। সুরৎজানের নিকার সংবাদে সেই ঝড়ের মুখেই জ্বলে ওঠে অগ্নিদাহ, খুন করে সে সুরৎজানের নিকার স্বামী আজিজ খোন্দকারকে:
আজিজের মুখটা তেমনি বাঁধা- তেমনি পানির ভিতর থেকে নড়ছে ওর হাত দু’টি। আক্রোশে এক কোপে মর্তুজা ওর ডান হাতটা আলাদা করে দেয়-তারপর বাঁ হাতটা। চাঁদের আলোয় দেখতে পায়-রক্তির পানি লাল হয়ে গেছে আজিজের লোহু মিশে। অনেকক্ষণ… আবার ওর শরীরটাকে পানির নিচে ডুবিয়ে সে ধরে রাখে। তারপর ওকে টেনে তুলে এক কোপে ধড় থেকে মাথাটা আগলা করে দেয়। হাত দুটো আর মাথাটা পয়লা ছেড়ে দেয় রক্তির পাখর-কাটা ¯্রােতে। নৌকায় বসে বসেই ধড়টাকে কুচি কুচি করে কাটে দা দিয়ে, তারপর, টুকরোগুলো পানিতে ছেড়ে দেয়- মাছের খাবার হবে। রক্তির শাঁ শাঁ করা স্রোতে আজিজের সব নিশানা নিশ্চিহ্নহ্ন হয়ে যায়।
ভয়ঙ্কর পরকীয়া প্রেমের উত্তাপে বাঘের চেয়েও হিংস্র হয়ে ওঠে মর্তুজা, আর এভাবেই গল্পের পরিণতিতে আমরা পাই অন্য এক মর্তুজার আত্মপ্রকাশ- খুনি, অথচ সাক্ষী-সাবুদের অভাব। বিচারহীন, শাস্তিবিহীন, একইসঙ্গে নিদারুণ আত্মদংশনে জর্জরিত অত্যন্ত অসহায় করুণ সে প্রতিকৃত।
এভাবে প্রায় প্রতিটি গল্পেই একজন নিষ্ঠাবান পর্যবেক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ লেখক। জীবনকে খুঁটিয়ে দেখার অসাধারণ ক্ষমতা রাখেন তিনি। তবুও সার্থকতার বিচারে গল্পগুলি কতখানি শিল্পসমর্থযুক্ত, নান্দনিক, পরিশীলতায় সুসম্পন্ন ভেবে দেখার বিষয়। ‘ছোটগল্প জীবনের বিশ্বরূপ দেখার উপযোগী ছোট ছোট প্রতিবিম্ব-চকিত আয়না।’ জীবনের টুকরো অভিজ্ঞতাকেই হয়ত প্রতিবিম্বিত করতে চেয়েছেন লেখক তার গল্পে, কিন্তু জীবনের সঙ্গে ব্যক্তি চরিত্রের প্রতিনিয়ত যে ঘাত-প্রতিঘাতের সম্পর্ক সে সম্পর্কের শিল্পসম্মত উপস্থাপনার অভাব গল্পের অন্তর্ময়তাকে ক্ষুণ্ণ করেছে প্রায়শ। এতে আহত হয়েছে সৃষ্টির স্বতঃস্ফূর্ততা। কেননা প্রয়োজন রয়েছে ‘গল্পের জীবন-ভূমির সঙ্গে শিল্পীর ভাব-লোকের একাত্মতার, এই দুয়ের সর্বাঙ্গীণ সমন্বয়ের সঙ্গম-মূলে ই ছোটগল্পের শিল্প-ব্যঞ্জনা।’ যেমন ‘ছবি’ গল্পটির পরিণতি ঘটেছে যেভাবে-স্ত্রী খালেদার প্রতীক্ষা, সন্তান আসাদের স্বপ্ন ইত্যাদির পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠাব্যাপী বিবরণের শেষে গল্পের যে আকস্মিক পরিণতি, তাতে খাজা সম্পর্কে পাঠকের মনের অন্তরালে সৃষ্ট আবহটি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে যায় যেন। যদিও আকস্মিকতা একটি ছোটগল্পের শিল্প-সংহতিকেই প্রগাঢ় করে তোলে, তবে এর জন্য প্রয়োজন রয়েছে ঘটনার ক্রমসংকোচনের। ‘জীবনকে বিন্দু-বদ্ধ, তথা একটিমাত্র কেন্দ্রে সুস্থির করে তোলে এবং সেই অবিচল স্থিরতার অতলে ডুব দিয়ে অনন্ত জীবনের স্বাদ আহরণ করাই একটি ছোট গল্পের শ্রেষ্ঠত্ব; উপন্যাসের মতো বিস্তার এবং বিশ্লেষণ ছোট-গল্পাঙ্গিকের আত্মমুক্তির পক্ষে বাধাস্বরূপ।’ সুতরাং শুরু থেকেই বিবরণ প্রধান গল্পের এ জাতীয় আকস্মিকতা পাঠককে বিমূঢ় করে দেয় আরো। আকস্মিকতাটাই তখন বড় ত্রুটি হয়ে বিঁধে থাকে পাঠকের চোখে। এ ধরনের ত্রুটির প্রকাশ চোখে পড়ে ‘অতীত রাতের কাহিনী’ এবং ‘বরকতুল্লাহ’ গল্প দুটিতেও। প্রথম গল্প দুটিতে দুই প্রজন্মের কাহিনী বিবৃত হয়েছে- গল্পটির ত্রুটি পরবর্তী প্রজন্ম কুলসুমের শেষ পরিণতিতে, মেয়ের জীবনেও যে তার মায়ের জীবনেরই অনুবৃত্তি ঘটতে চলেছে সে বিষয়ে পাঠকের বোধ গোড়াতেই নিঃসংশয় হয়ে ওঠে। ফলে দীর্ঘপৃষ্ঠাব্যাপী বিবরণপ্রধান গল্পটি পাঠে অচিরেই ধৈর্যচ্যুতি ঘটে পাঠকের। দ্বিতীয় গল্প ‘বরকতুল্লাহ’- শুরুতেই এই অভিনব চরিত্রটি সম্পর্কে যথেষ্ট কৌতূহল জন্মায় পাঠকের মনে।
গল্পের শেষটিও চমৎকার- কিছুটা নাটকীয় কায়দায় প্রতিষ্ঠিত করা হয় একটি ধর্মান্তরিত চরিত্রের নয়া নামকরণের গূঢ়ার্থ। তবে প্রশ্ন জাগে ‘ধর্মান্তরের’ প্রসঙ্গটিতে-অন্ধ মালীর মানসিক এই রূপান্তরের কোনোরকম অন্তর্মুখীনতা বা ‘দার্শনিক বিস্তৃতি’র অভাব পাঠকের বোধে বিশেষ অতৃপ্তির জন্ম হয়। উল্লিখিত অন্যান্য গল্পগুলিতেও বিবরণের ঝোঁক মাত্রাতিরিক্ত। তবুও কাহিনীর বৈচিত্র্যে, ঘটনার মৌলিকতায়, চারিত্রিক আচরণে এবং প্রকাশের আন্তরিকতায় গল্পগুলি ঐশ্বর্যমণ্ডিত হয়ে উঠতে পেরেছে। এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য ‘কপাল’, ‘নতুন জমিদার’ এবং ‘উদ্গীরণ’ গল্পটি। তিনটি গল্পেরই কেন্দ্রীয় বিষয়-মানবপ্রবৃত্তির সঙ্গে পারিপার্শ্বিকতার দ্বন্দ্ব। কেবল দ্বন্দ্ব নয় দ্বন্দ্বের পরিণতির বিষয়টিও সুস্পষ্ট-খোদা নেওয়াজ, বন্দা এবং মর্তুজা জীবনযুদ্ধে পরাজিত তিন মানব সৈনিক। অথচ শক্তির পরাক্রমে, সামর্থ্যরে লালিত্যে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়েও আশ্চর্য দীপ্তিমান তারা। মনে হয়, এক্ষেত্রে এসেই বর্ণনায় প্রাবল্য কাটিয়ে কিছুটা শিল্প-সংহতির স্পর্শলাভেও সমর্থ হয়েছে গল্পগুলি।
এ কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ছোটোগল্পের সর্বায়তনিক বিচারে শাহেদ আলীর তিনটি গল্পই যথেষ্ট- ‘জিবরাইলের ডানা’, ‘একই সমতল’ এবং ‘শা-নযর’। এই তিনটি গল্পই বাস্তব জীবনবীক্ষার সকল সূক্ষ্ম এবং অন্তর্ময়তাসহ তিনি ঝলসে উঠতে পেরেছেন। পৌঁছে যেতে পেরেছেন আধুনিক ছোটগল্পকারদের সংকেত সন্ধানী, প্রতীকী, অনুভববেদ্য নির্মিতি-নৈপুণ্যের কাছাকাছি। আজকের গল্পকার চাইছেন সামাজিক সত্যের নির্বাধ ও পরিপূর্ণ প্রকাশ;… ছোট গল্পের আধার ও আধেয় জীবনের চলিষ্ণুতা এবং রূপান্তরশীল অবয়ব ব্যক্ত করতে গিয়ে ‘বলা’ বা ‘জানানো’র চেয়ে ‘সঞ্চার’ বা ‘উদ্ভাস’ করার শৈল্পিক আর্তি প্রাধান্য পাচ্ছে ইদানীং।… ঘটনার বৃত্তান্ত নয়, হওয়া না হওয়ার বিন্যাস-প্রতিন্যাস এবং বহুস্তর ও কৌণিকতায় বিকাশমান অনুভূতি কিংবা অভিজ্ঞতার পরস্পরাই গল্পের অন্বিষ্ট।’ উক্তিগুলি সর্বতোভাবে শাহেদ আলীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হলেও সামাজিক সত্যের পরিপূর্ণ প্রকাশে এবং জীবনতত্ত্বের জটিল জিজ্ঞাসার আবহে উল্লিখিত তিনটি গল্পই বিশিষ্ট হয়ে উঠতে পেরেছে। যদিও বর্ণনাধর্মিতাই ‘জিবরাইলের ডানা’ গল্পের প্রকৃত প্রকাশমাধ্যম, কিন্তু পাশাপাশি সৃষ্টি করা হয়েছে বিশেষ সেই ইঙ্গিতবাহী আবহের। আট বছরের নবী-মাত্রই কৈশোরে পদার্পণ ঘটেছে যার, তারই মনের অপার কৌতূহল আর বিশ্বাসের প্রান্ত ধরে উত্তর অন্বেষণ করেছেন তিনি এক চিরকালীন সত্য-জিজ্ঞাসার:
ফেরেশতারা খবর নিয়ে যায় আল্লাহর কাছে! তাদের খবরও কি নিয়ে গেছে ফেরেশতা! … নবী ঘাবড়ে যায়। কাঙাল যারা, মিসকিন যারা, তাদের আর কোন ভরসাই তাহলে নেই। এতো সোনা-রূপাও তারা পাবে না, তাদের আরজিও গিয়ে পৌঁছাবে না আল্লাহর কাছে। আর এ জন্যই তো গরিবদের যারা নামাজ পড়ে তাদের মালদার হতে দেখা যায় না! দুঃখ তাদের ঘুচ্ছে কই! সোনা-রূপার শিরীন আওয়াজেই তাহলে ঘুম ভাঙে আল্লাহর! সেই জন্যই বুঝি মালদারেরা আরো মালদার হয়, একগুণ দিয়ে প্রায় সত্তর গুণ!
দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিমজ্জমান মানুষ হয়ত এভাবেই জর্জরিত হয় নিরন্তর ক্ষোভে। অন্নের জোগাড়ে এই বয়সেই উপার্জনের পথ ধরতে হয় নবীদের। কিন্তু তার কৈশোর চির সবুজ মন অণুক্ষণ জানার আকাক্সক্ষায় কল্পনার রঙিন নেশায় উদ্বেল। তার সীমিত অভিজ্ঞতাই উসকে দেয় তাকে এক বিষম প্রতিজ্ঞা পালনের। ঘুড়ির রশি ধরে সাত আসমানে পৌঁছানোর আকাক্সক্ষা কিশোর নবীর। তার বিশ্বাস- এভাবেই সে টলিবে দেবে আল্লাহর আরশ, একবুক জিজ্ঞাসা নিয়ে দাঁড়াবে সেই অনন্ত শক্তির সামনে:
রশি বেয়ে বেয়ে নবীর বিস্মিত দৃষ্টিও হারিয়ে যায় আসমানে। আজকে আর সে ঘুড়ির রশি গুটাবে না, লোকচক্ষুর ওপারে ঘুড়ি উড়ে বেড়াক আপন ইচ্ছায়-আপন খুশিতে। এক সময় হয়তো আটকে যাবে আরশের পায়ায়-আরো শক্ত টান পড়বে হাতে, তখন রশিতে টান দিয়ে সে টলিয়ে দেবে আল্লাহর আরশ! চকিত আঁখি মেলে আজ আল্লাহ মাটির মানুষের দিকে তাকাবেন- অনিচ্ছায়ও শুনতে হবে তার দুঃখী বান্দার কাহিনী-তাদের বঞ্চনা, লাঞ্ছনা ও যন্ত্রণার কথা!
গল্পের শেষেও রয়েছে ক্ষুৎপীড়িত নিঃসহায় নিঃসম্বল নবীদেরই স্বপ্নভঙ্গের জ্বালা। বাস্তবের কঠোর কঠিন নিষ্পেষণে স্ফুটানোন্মুুখ এই কিশোরেরা এভাবেই অপারগ আত্মশ্লেষে প্রজ্বলিত হয় কেবল। সমবিচারে লেখকের একই সমতলে গল্পটি যথার্থ অর্থেই শিল্প হয়ে উঠতে পেরেছে। এ গল্পের প্রধান নান্দনিক বৈশিষ্ট্য বিন্যাস এবং পরিমিতিবোধে। ঠিক আখ্যানবয়সের ভঙ্গিমায় নয়, জীবনের বিশেষ এক খণ্ডিত তাৎক্ষণিক উপলব্ধি, সামগ্রিক দ্যোতনায় অখণ্ডভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস পেয়েছেন তিনি। আট বছরের জৈগুন তার একদার অনুধ্যানে যে সত্যকে উপলব্ধি করতে শেখেনি, সময়ান্তরের অভিজ্ঞতায় সেই সত্যই মর্মান্তিক কুশবিদ্ধে জাগ্রত করে তাকে। বিশেষ কুশলী কৌশলে মাত্র দুটি দৃশ্যে গল্পের মূল ঘটনাটি উপস্থাপিত- প্রথম দৃশ্যে পিতার দহনক্রিয়ায় সহায়ক শক্তি হিসেবে কার্যকর জৈগুন, আবহাটি দরিদ্রতার কিছুটা পাশবিক লোখের একইসঙ্গে অপরিমেয় বাৎসল্যের:
মিয়াদ শেখ গাই ক্ষীরাচ্ছে। বাছুর ধরেছে তারই আট বছরের মেয়ে জৈগুন। বাঁট দিয়ে মিয়াদ শেখ জোরে জোরে টানছে আর তীরের ফলার মতো দুধ এসে ছিটকে পড়ছে দোনার ভেতর।… সামনের বাঁট দুটো ক্ষীরানো হয়েছে- পেছনের বাঁট দুটোও প্রায় শেষ করে এসেছে মিয়াদ শেখ।… মিয়াদ শেখ বাঁট দুটো ছেড়ে দেয়-দে ছাইড়্যা দে বাছুরডা। জৈগুন বাছুরটাকে ছেড়ে দেয়। উন্মাদের মতো কয়েকটা টান দিয়েই বাছুরটা জোরে জোরে গুঁতো মারতে থাকে গাইটির ঊরে। ঊরটা কিছুটা স্ফীত হয়ে ওঠে-হয়তো আবার এসে দুধ ভর করেছে। …- কী পাজি গাই, … দুধ লুকাইয়া রাখে বাছুরের লাইগ্যা! নে ধর বাছুরডা। দু’হাত দিয়ে বাছুরের গলা জড়িয়ে ধরে জৈগুন। বাছুরটা ক্ষেপে যায়, সামনের পা দুটো তুলে বেপরোয়া লাফাতে শুরু করে দেয়। জৈগুন তবু ছাড়ে না। টানতে টানতে মিয়াদ শেখের আঙুলে ব্যথা ধরে যায়। তবু তার ওঠার নাম নেই। এবার দুধ আর বেশি আসে না। বাঁট থেকে ছিটকে পড়া দুধের আওয়াজ ক্রমেই মন্দীভূত হয়ে আসে দোনার ভেতর। … মিয়াদ দোনা নিয়ে ওঠে পড়ে-দে ছাইড়্যা দে- আর নাই। ক্ষুধার্ত বাছুরটি লাফ মেরে গিয়ে পড়ে গাইটার ঊরে, আর বাঁট মুখে নিয়ে অস্থিরভাবে টানতে শুরু করে- দুটো টান আর একেকটা প্রচণ্ড গুঁতো। কিন্তু বাঁটের ছিদ্র পথে দুধের ফোয়ারা আর নেমে আসে না।
দ্বিতীয় দৃশ্যে একই আবহের অবতারণা আবার- তবে এবারে আর সক্রিয় বালিকাটি নয় জৈগুন, তরুণী সে, আর তার পরিবর্তিত অবস্থান দর্শকের, নিপুণ পর্যবেক্ষকের:
তরুণীর বড় বড় কালো চোখের উৎসুক দৃষ্টি উঠানের দিকে প্রসারিত। সে দৃষ্টিতে কী এক রহস্য যেন ছায়া ফেলে-কী বেতমিজ গাই! চারটে বাঁটেই চেছে নিয়ে মিয়াদ শেখ বিরক্তির সঙ্গে উচ্চারণ করে- দে ছাইড়্যা দে বাছুরডা- ছেলেটি বাছুরডাকে ছেড়ে দেয়! তরুণীর দৃষ্টি অচঞ্চল, আবিষ্ট। স্তনের বোঁটাটা সে সরিয়ে নেয় শিশুটির মুখ থেকে। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির কি চিৎকার!… বাচ্চাকে বুকে চেপে ধরে তরুণী আগের মতোই চেয়ে আছে। একটা আত্মবিস্মৃত তন্ময়তায় চোখ মুখ তার উজ্জ্বল সি্গ্ধ। চোখের রহস্যে তার আচমকা সত্যের ঝিলিক জাগে। বুকটা তার হঠাৎ যন্ত্রণায় মোচড় দিয়ে ওঠে! কে যেন তার স্তন ধরে টানছে। দস্যু-তার বাচ্চার দুধ কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে দস্যুরা।
এভাবেই জীবনের বাস্তব নির্যাস বিশেষ প্রতীকী-উদ্ভাসে ব্যক্ত গল্পটিতে। ‘শা-নযর’ একজন অন্ধমানুষের অভিব্যক্তি, তার আবেগ-যন্ত্রণার নিরুদ্ধ প্রকাশ। অথচ অত্যন্ত সহজবোধ্য এবং সাবলীল সে প্রকাশের ভঙ্গি। জন্মান্ধ মিরাদ স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সে স্বপ্নের রঙ সম্পর্কে তার কোন ধারণা সেই। সে জানে না প্রকৃতির অকৃত্রিম রূপসুধায় কিভাবে ভরে ওঠে মানুষের জীবন, একইভাবে সৌন্দর্যের অবয়ব নিয়েও দিশেহারা বোধ করে সে:
জয়নাবের সারা শরীর জরিপ করে সৌন্দর্যের চড়াই-উতরাই সে ভাঙলো তাতেই তার মনে হলো, সৌন্দর্য একটি কথার কথা, এর কোন নির্দিষ্ট মানে নেই। সেই থেকে যখন কেউ সুন্দরের কথা বলে মিরাদের ভাবনায় একেবারে তালগোল পাকিয়ে যায়। বুঝবার চেষ্টা করেও এর কোন অবয়ব সে খুঁজে পায় না। মাঝে মাঝে মিরাদের মনে হয় সৌন্দর্য তাহলে একটা স্বাদ, একটা সুগন্ধম, একটা অনুভূতি!
এভাবে গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক নিজের অজান্তেই পৌঁছে যেতে পারে মিরাদের খুঁটিনাটি বোধগুলির সমান্তরালে। বিয়ের রাতে নববধূর প্রথম স্পর্শের অনুভূতি:
কেবল ওর বুকের ভেতরটাই ধুক ধুক করছে, আর তারই শব্দ সে শুনছে, আর শুনছে আরেকটি বুকের শব্দ, যেন আঁধার রাতে সব শব্দ হারিয়ে যাওয়ার পর, সময়ের বুকের উপর দিয়ে টিক্টিক্ করে এগিয়ে চলেছে একটি টেবল ঘড়ির কাঁটা।
প্রথম পিতৃত্বের সেই অতুলনীয় উপলব্ধির স্বচ্ছন্দ প্রকাশ:
মিরাদ ধীরে ধীরে জল চৌকিটির উপর বসে পড়ে। একটা নতুন কাঁথায় পেঁচিয়ে নবজাত শিশুকে মিরাদের কোলে দিলেন মা। কিছুক্ষণের জন্য, মিরাদ গহীন সাগরের তলদেশের মৌনতায় হারিয়ে যায়। তার হাত কাঁপতে শুরু করে, বুকের ভেতর তার সামুদ্রিক উচ্ছ্বাস শুরু হয়। চোখের পাতা তার ঘন ঘন ওঠানামা করতে থাকে।
বর্ণনার সারল্যে অনুভূতির আবেদনটুকু আড়াল হয়নি কোথাও। গল্পের শেষটাও চমৎকার- নতুন প্রজন্মকে নিয়ে মিরাদের পরিতৃপ্ত আত্মোপলব্ধি, অন্ধকারের গহ্বরে নতুন আলোর উদ্বোধন। এই নতুন আলোর অবগাহনেই ঘুচবে তার চিরঅন্ধত্বের সূক্ষ্মতম বেদনার অবসান।
নিজেকে নগর জীবনের অভ্যস্ত মানুষ হিসেবে চিহ্নিহ্নত করেছেন শাহেদ আলী। কাজেই নিভৃত পল্লীর দুঃখ-দারিদ্র্য জীর্ণ জীবন নিয়ে উপরোল্লিখিত গল্পগুলি রচিত হলেও নগর জীবনের পরিচর্চা থেকে নিজেকে ঠিক নিরত রাখেননি তিনি। ‘নতুন চর’, ‘পুতুল’, ‘দীন ব্রাদার্স’, ‘লুকাস’, ‘সোনার খনি’, ‘অস্তরাগ’, ‘মন ও ময়দান’, ‘দাবী’ ইত্যাদি প্রায় ডজনখানেক গল্প শহুরে জীবন ও পরিবেশ নিয়ে রচিত। মধ্যবিত্তের পেশাসচেতনতা এবং অর্থনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এ ধারার গল্পমালার প্রধান বিবেচ্য বিষয়। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজ-স্কুল উত্তীর্ণ নব্য শিক্ষিতের সমবায়ে ক্রমবিকাশিত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক নব্য মধ্যবিত্ত শ্রেণির চেতনার সঙ্কট, রূপান্তর, তাড়িত মূল্যবোধ’ ইত্যাদি নানাবিধ জীবন-সংকল্পের সরল রূপায়ণ ঘটেছে তাঁর এ ধারার গল্পগুলিতে। যেমন ‘নতুন চর’ গল্পটি-সামাজিক ঘেরাটোপে বন্দী দুটি চরিত্র শাব্বির এবং ফারহানা। শাব্বির শিল্পী, তার পেশাগত পরিচয়েও ধরা পড়ে শিল্পীসত্তারই আবেদন- একটা প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করে শাব্বির। ছবি আঁকা,
ডিজাইন করাই তার কাজ। স্ত্রী ফারহানা আবার সাইকোলজির বিদ্যায় বিদুষী-স্বামীর সকল আচার-আচরণে মনতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা রাখে সে। গল্পটি এদের দু’জনেরই দাম্পত্য সম্পর্কের টানাপড়েনের গল্প। দুজনাই তাদের জীবন শুরু করেছিল একটি চৌকস আদর্শকে ভিত্তি করে- সেখানে বাস্তবের খুঁটিনাটি আবশ্যকতাকে মূল্য দেয়নি তারা। কিন্তু সংসার জীবনে এসে বাস্তবতাই প্রকৃত কণ্ঠরোধ করে দাঁড়াল তাদের এতদিনের লালিত জীবনদর্শনের। ভেতরে ভেতরে পরাজয় স্বীকার করে নিল দুজনাই। তবুও কেন যেন সহজক অভ্যস্ততায় মেতে উঠতে পারে না তারা। সংসারের সকল চাহিদা মিটিয়েও অতৃপ্তি রয়ে যায় মনে। এ গল্পের মূল সঙ্কট এখানেই। শহুরে মধ্যবিত্ত পেশাজীবী সচেতনতার আদর্শে রচিত এমনি আরেকটি গল্পের নাম ‘সোনার খনি’। অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রত্যাশায় নিজ দেশ, সমাজ, পরিবার-পরিজন ছেড়ে এক অনন্ত নির্বাসিত জীবন ডাক্তার কামরানের। স্ত্রী জিনাত প্রতিপত্তি আর প্রতিষ্ঠা চায় সমাজে, গড়ে তুলতে চায় উত্তর পুরুষের জন্য সমৃদ্ধময় জীবনের নিশ্চয়তা। মধ্যবিত্তের গতানুগতিক জীবনালয়ে থেকে যা অসম্ভব। তাই তো স্বামী কামরানের প্রবাসী জীবন ব্যবস্থাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে পরিণত করতে দৃঢ়সঙ্কল্প হয়ে ওঠে সে। জীবনকে একটি বিশেষ ছকে ফেলে হিসেব কষে জীনাত, স্বামীকে লেখা চিঠিতে সেই মনোবৃত্তিই প্রকাশ পায় তার:
লোকে যতো ফিলসফিই আওড়াক, মোদ্দা কথা হচ্ছে- নিজের সুখ, নিজের স্বাচ্ছন্দ্যই পরমার্থ। ক্যাপিটালিজম বলো, আর কম্যুনিজম বলো- লক্ষ্যতো একই- জাগতিক সুখ, বৈষয়িক সমৃদ্ধি। অর্থই দেয় সেই জাগতিক সমৃদ্ধি। আমাদের সমৃদ্ধির স্বার্থেই আমি তোমাকে বিদেশের ঐ মহামূল্য চাকরিটা ছেড়ে এখানে চলে আসতে বারবার বারণ করেছি। তার ফলেই তো আমাদের সমৃদ্ধির এই ইমারত গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।
কামরানের মনের হিসেব কিন্তু অন্যরকম, দীর্ঘদিনের প্রবাস জীবন শেষে আবার পরিচিত পরিজনের বৃত্তে ফিরে আসতে চায় সে। সমৃদ্ধির ইমারাত গড়তে দিয়ে নিজের অজান্তেই তার সকল সাধ সকল আকাক্সক্ষার কবর হয়ে গেছে এক সময়। আজ সে নিজের কাছে নিজের পরিত্যক্ত, অবয়বহীন, নিরাশার অন্ধকারে বন্দি:
মনের রুশনি যখন নিবে যায় মাঝে মাঝে, যখন মেঘে মেঘে আঁধার হয়ে ওঠে মনের আকাশ-দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত- তখন মুখেও পড়ে তার ছায়া। ওভাল শেপের বিশাল আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে কামরান নিজের মুখখানা দেখে। আসলেই কি এ মুখ তার নিজের মুখ? তার মুখ কি কখনো সে দেখেছে? হঠাৎ এক রহস্যময় প্রশ্ন জাগলো তার মুখে। সবার মুখই সে দেখলো জীবনভর-কেবল নিজের মুখখানাই দেখলো না!
এভাবেই শাহেদ আলীর এ ধারার ছোটগল্পগুলিতে উঠে এসেছে মধ্যবিত্তের জীবন উপাখ্যান। আবার এই মধ্যবিত্তের আপাত জীবনবীক্ষা থেকেই তিনি সন্ধানী হয়েছেন ব্যক্তি ও সমাজ-সম্পর্কের সত্য-রহস্য উদঘাটনে। এই রহস্যের অন্তরালে নিহিত ‘নাগরিক অবরুদ্ধতা, সেই সঙ্গে ব্যক্তিত্বের শূন্যতা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দূরুত্ব’। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় নাগরিক ব্যক্তিত্বের মনোভূমির দিক-নির্দেশনায় যেভাবে বলেন, ‘আমরাও অন্যের দিকে সমবেদনা আর মমতার বাহু বাড়িয়ে দিতে পারি; কিন্তু আমাদের স্বভাবজাত বিচ্ছিন্নতা, আত্মপরতা এবং মনোনৈঃসঙ্গ আমাদের অন্যের জীবনকে স্পর্শ করতে দেয় না।… আমাদের এই উপায়হীন আত্মিক নিঃসঙ্গতা-যার আবেষ্টন থেকে আমরা বারবার নিষ্ক্রান্ত হতে চাই, অন্য কোনো জীবনের সন্নিহিত হতে চাই- অথচ যে আত্মবলয় থেকে আমরা কোনোমতেই পরিত্রাণ পাই না।’ ‘দীন ব্রাদার্স’ এবং ‘লুকাস’ গল্প দুটির নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়। দুটি গল্পেই অপরিচয়ের আড়াল থেকে পূর্ণরূপ দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে দুটি চরিত্রের। প্রথম চরিত্র অধ্যাপক রিয়াজউদ্দিন- লোকটি রহস্যময়, তার আচার-আচরণ স্বাভাবিকতার গুণাগুণরহিত, কথাবর্তা বিরক্তিকর, ভদ্রতা-জ্ঞানশূন্য, অশালীন। লেখকের ভাষায়:
যেমন তার ব্যবহার চেহারাটাও তেমনি। কালো কুচকুচে রঙ, মুখে বসন্তের দাগ। তার উপর, ঘন কালো চাপ দাড়ি আর কাঁধ অবধি বাবড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল; অন্ধকারের মধ্যে যেন ফসফরাস্ জ্বলছে। বাবড়ির উপর আবার সাদা গোল টুপি। পরনে পাজামা আর লম্বা শার্টের ওপর লাল রঙের কোট।… বুক পকেটে একটা নীল পেন্সিলের অর্ধেকটা বেরিয়ে আছে। চিৎকার আর টেবিলে আঘাত ছাড়া কথা নেই মুখে। … কিন্তু ওর সব কথা অনুসরণ করতে পারি- তারই বা সাধ্য কি। কথার মাঝে মাঝে ও ‘নর্মান্ডির ডিউক’, ‘মিস্ জম্মু’, ‘মামা-ভাগনা’, ‘ভাটিদেশ’, ‘ডাউন উইথ মাইমেনসিং’ ইত্যাদি শব্দের ব্যবহার করে চলেছে ঘন ঘন। আমি কোন কূল-কিনারা খুঁজে পাইনে। … ভেতরে ভেতরে তেতো বিরক্ত হয়ে উঠছি-অধ্যাপকদের কমনরুম-এখানে এই পাগলটাকে ডেকে আনলো কে?…
অথচ গল্পের শেষে এই লোকটিই অসাধারণ এক মানবিক সুসম্পন্নতায় প্রস্ফুটিত পাঠক-চেতনায়। তখনকার লেখকের ভাষা:
আহমদ আলী বলল- আপনি জানেন না স্যার! উনিই তো টাকা-পয়সা দিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়েছেন। – তোমাদের? বহু বচনের প্রয়োগে আমি আরো উৎসুক হয়ে উঠলাম। – জি, হ্যাঁ, আহমদ আলী বলতে থাকে, রাস্তার দু’পাশে গরিব মুহাজিরদের যে-সব দোকান দেখছেন সে-সব কি অম্নি হয়েছে? কানা কড়িও ছিল না স্যার আমাদের। সব তো উনারই টাকায়! … আহমদ আলীর কাছ থেকে রিয়াজের নতুন পরিচয় পাওয়ার পর থেকে ওকে রীতিমতো সম্মান করে চলি। বল্তে কি, ওকে এতো বড় মনে হয় যে কিছুটা এড়িয়েই চলি আজকাল। কথায়-বার্তায় ওর সঙ্গে আর আগের
মতো সহজ হতে পারিনে।… এর দিন তিনেক পরেই আরেক কলেজ থেকে আমার নিয়োগপত্র এলো। বিদায়ের সময় অধ্যাপক রিয়াজউদ্দিনও স্টেশনে এসেছিল, বলল- শুনেছি ও লাইব্রেরিতে নাকি অনেক দুষ্প্রাপ্য পুঁথি আছে। পাণ্ডুলিপিগুলোর তালিকা অবশ্যি আমাকে পাঠাবেন!
আসলে নিত্যদিনের ঘাত-প্রতিঘাতে প্রতিনিয়ত পর্যুদস্ত এ শ্রেণির মানুষগুলি। অর্থনৈতিক পর্যুদস্ততার পাশাপাশি রয়েছে টিকিয়ে রাখা মূল্যবোধের নানাবিধ অগ্নীপরীক্ষা। একদিকে সারাজীবনের লালিত অভ্যাস আর সংস্কারের বাঁধন, অপরদিকে শিক্ষা আর অভিরুচির দ্বন্দ্ব-পরিবর্তনের এই তাগিদ মানুষকে করে তোলে দুর্বোধ্য, রহস্যপ্রিয়। মানুষ তার আচরণের আড়াল দিয়ে সৃষ্টি করে বিশেষ রহস্যময়তার। ‘দীন ব্রাদার্স’ এর রিয়াজউদ্দিন তেমনি রহস্যময় বা দুর্বোধ্য এক মানুষ, সাধারণ পর্যবেক্ষণ শক্তি দিয়ে যাকে চেনা যায় না। একইভাবে নিজেকে আড়াল করে রাখতে চায় ‘লুকাস’ গল্পের বিদেশিনী নার্স মেয়েটি। সেবার ব্রত নিয়ে নেপাল থেকে আগত নার্সটির নাম-ই লুকাস। লেখকের সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হাসপাতালের ‘তেরো নম্বর ওয়ার্ডের তেইশ নম্বর বেডে’। সেবায়এ স্নেহ-আন্তরিকতায় খুব সহজেই লেখকের মন জয় করে নিতে পেরেছিল লুকাস’। একটা সহজ স্নেহের বন্ধন গড়ে উঠেছিল দুজনার ভেতরে, হয়ত কিছুটা রোমান্টিকতার আবেশও। কিন্তু সেই আবেশে জড়িয়ে খুব বেশিদূর এগোতে পারেনি ওরা- লুকাসের পেশাবৃত্তির দ্বন্দ্ব এবং লেখকের বিশ্বাসের সংস্কার অচিরেই চিড় ধরায় তাদের সম্পর্কের। পেশাগত কারণে অন্যের মনোরঞ্জনেও ব্যবহৃত হতে হয় লুকাসকে। যে উষ্ণতা সেবার প্রাণ, অথচ কত সহজে সে উষ্ণতাকেই বিকিয়ে দিতে হয় পাশবিক লালসার বিবরে:
একটা স্নিগ্ধ হাসিতে ও অপরূপ হয়ে উঠলো-তা নয়, এখানে তোমার কেউ নেই বলেই তোমার বিশেষ কেয়ার নিতে হয়েছে। সবারি আত্মীয়-স্বজন রোজ ওদের দেখতে আসে, তোমার কেউ আসে না, কেমন লাগে বলতো? তোমার এই লোনলিনেস্ থেকে তোমাকে বাঁচাতে চেয়েছি মাত্র!-সত্যি আমি কৃতজ্ঞ! কৃতজ্ঞ আমি-। ও আমার মুখ চেপে ধরে- ডোন্ট আটার দিজ ওয়ার্ডস। আমি আমার কর্তব্য করেছি। আমি নার্স, সেবা আমার কর্তব্য, আমার ধর্ম । কিন্তু সেবার সঙ্গে প্রাণের এই উষ্ণতা-আমি শেষ করার ও বলে-হ্যাঁ, এই উষ্ণতাই সেবার প্রাণ।… একদিন ও ডিউটি রুম থেকে এলো মুখে একরাশ অন্ধকার নিয়ে। দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, হেল, জাহান্নাম!… বললাম,- বলতে পারবো না। তুমি গিয়ে আয়নায় নিজের মুখখানা একবার দেখো। বলে মাথা নিচু করে আমি আমার যন্ত্রণা গোপন করতে চাইলাম। আমি কী করে ওকে বলবো, ওর গোলাপের মত গাল দু’টিতে দু’পাটি দাঁতের ছাপ অঙ্কিত রয়েছে। রক্তের মতো লাল এক একটি দাগ- রক্তই জমে আছে! কিন্তু আমি না বললেও ও বুঝতে পারলো। দু’হাতে মুখ ঢেকে ও ফুঁপিয়ে উঠলো- ও, হেল, জাহান্নাম!… আরো পরে শুনেছিলাম, লুকাস নয়াদিল্লির কোন এক হাসপাতালে কাজ নিয়ে চলে গেছে। জাহান্নাম থেকে কি সে বেঁচেছে? না নতুন কোন জাহান্নামে গিয়ে পড়েছে? জানি না!
গল্পের শেষে লুকাসের আচরণের সকল আড়াল ঘুচিয়ে সেই আত্মবৃত্তেরই উদঘাটন ঘটান হয়েছে যেন। ‘পুতুল’, অস্তরাগ’, ‘দাবী’, ‘মন ও ময়দান’ ইত্যাদি গল্পটিতে রয়েছে মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব-সংঘাত-মমতা-ভালবাসার ইঙ্গিত। ‘পুতুল’ এবং ‘মন ও ময়দান’ গল্প দুটির পরিপ্রেক্ষিত এক্ষেত্রে একই-নারীব্যক্তিত্ব এবং স্বাতন্ত্র্যবোধ। স্বকীয়তা এবং আত্মমর্যাদায় উত্তীর্ণ হতে চায় ওরা দুজনাই- পুতুল এবং শিরি। সামাজিক বিধি-বিধানগুলো ডিঙিয়ে বেরিয়ে আসতে চায় পুতুল। অবসান ঘটাতে চায় নারী জীবনের সকল অবমাননার-হাজার হাজার বছর ধরে এমনি করে পুতুলের বিয়ে দিয়ে এসেছে বাপ-মারা, নিজে না চাইলেও বাপ-মার পছন্দ করা পুরুষেরই শয্যাসংগিনী হতে হয়েছে পুতুলদের,… এভাবে বিয়ের নামে ‘অনিচ্ছুক নারীর ওপর জবরদস্তির কুৎসিত’ ছবি দেখতে পায় পুতুল। তাই বাবা-মার নির্বাচিত পাত্রের হাতে নারীত্বের নীরব আত্মসর্মর্পণে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সে। তার চারপাশের নিগৃহীত নারী জীবন উদ্বুদ্ধ করে তাকে একজন প্রকৃত মানুষ হিসেবে জেগে উঠতে। ‘মন ও ময়দান’ গল্পের শিরি, পরিপূর্ণ মানবিকবোধসম্পন্ন এক চরিত্র- তার শিক্ষা-রুচি-বিশ্বাস নির্বিশেষে তার ভেতরে জন্ম দেয় এক শক্তির- ‘সত্যের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায়ের প্রতিরোধ’ এই শক্তির জোরেই প্রচণ্ড আঘাত হানতে সক্ষম হয় সে পিতার দীর্ঘদিনের অর্জিত বিশ্বাস আর মর্যাদার গোড়ায়। অথচ:
আব্বার উপর কী প্রচণ্ড বিশ্বাসই না ছিল শিরির। তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি শিরিকে চঞ্চল করেছে, নতুন নতুন জগতের সন্ধান দিয়েছে একদিন। আকবর বিশ্বাস করেন, তৌহিদের আইডিয়ার মত এত বিপ্লবী আইডিয়া আর নেই। তৌহিদ মানুষকে পীড়ন-পুরুত, ব্যক্তি, দল, দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র সব কিছুই গোলামি থেকে মুক্ত করেছে- একটা বিশ্বজনীন নৈতিক বিধানের নিচে সব মানুষকে এনে দাঁড় করিয়েছে; মানুষের কল্যাণ বিধান ছাড়া পৃথিবীতে আর কোন কিছুরই আনুগত্য স্বীকার করবে না মানুষ!… শিরি চঞ্চল হয়ে উঠতো আব্বার গুরুগম্ভীর স্বরে, উত্তেজনায় কেঁপে কেঁপে উঠতো। কিন্তু- কিন্তু বিপ্লব কি আব্বা করেছেন; এ আমানত নিয়ে যারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী-স্বার্থের ইমারত গড়ে তুলেছে আব্বাও কি তাদের দলে নন? বিপ্লব কি শুধু তর্কের বস্তু? বিশ্বাস শুধু মনের ব্যাপার? জাতীয়তার বিশ্বাস নেই মিঃ আকবরের! আন্দালুসিয়া থেকে চীন, ইকবালের কবিতা আউড়িয়ে বলেন, দুনিয়ার সব জায়গাই তাঁর দেশ। এক জাতির উপর আরেক জাতির শ্রেষ্ঠত্ব, তিনি কল্পনাও করতে পারেন না; অথচ বাংলার মুসলমানদের তিনি ছোট মনে করেন। আরবি-ইরানী কোন লোকের সাথে কথা বলতে পারলে তিনি বর্তে যান, নিজের সৌভাগ্যের গর্বে তিনি স্ফীত হয়ে ওঠেন। আরবিয়ানদের অহংকারে বুক ফুলিয়েই এরা এদেশে আসেন শ্রদ্ধা কুড়াবার জন্য। আর এরা আরবি বলেই আকবর ওদের মাথায় করে নাচতে সুখ পান। ইতিহাসের ছাত্রী শিরি।… ক্ষমা নেই- কোন আপস নেই, নিপীড়িত মানুষের আত্মা কথা কয়ে ওঠে শিরির বুকের ভেতরে।
এভাবে সঠিক অর্থে নারীত্বের অবমাননা বা অবহেলা থেকে না হলেও মনুষ্যত্বের অবমাননাই এ গল্পের কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি। তবুও প্রচণ্ড প্রতিরোধের আবেগে শিরির এই আত্মজাগরণই হয়ত সকল সামাজিকতা এবং প্রথানুগত্যের বিপরীতে উদ্বোধিত নারীত্ব শক্তির আরেক বলিষ্ঠ ইঙ্গিত। ‘অস্তরাগ’ গল্পের শুরুটা চমৎকার-এক বর্ষণমুখর দিনে হবিগঞ্জের আই-ক্যাম্পে হামিদা বানুর আগমন-তাহমীনা, বেদৌরা, হাম্মাদ, সালমান, কিবরিয়া প্রমুখ তরুণ ডাক্তারদের কাছে তার আভিজাত্যময় উপস্থিতি- তার আচরণের সূক্ষ্ম রহম্যময়তা পাঠকের কাছে গল্পের আবেদন অনেকখানি বৃদ্ধি করে। কিন্তু ডা: মুদাব্বিরের সঙ্গে হামিদা বানুর প্রকৃত সম্পর্কের উদ্ঘাটনের বর্ণনার নাটকীয় আবেগ গল্পটির নান্দনিক ও শৈল্পিক মাত্রার শিল্পমূল্যকে রক্ষা করে। লেখকের সঙ্গে বন্ধু সোমধনের সামাজিক দূরুত্ব বা শ্রেণীগত সঙ্কটের ইঙ্গিত তেমন প্রকটভাবে না এলেও, বন্ধুর পরিবারটিকে ঘিরে তার উপলব্ধির প্রগাঢ়তা একজন পাঠকের ভেতরে জন্ম দেয় সচেতন মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতার। এদিকে থেকে গল্পটি অবশ্যই সার্থকতার দাবি মেটায়।
শাহেদ আলী জীবনকে যেভাবে দেখেছেন অনুভব করেছেন, যেভাবেই তাঁর উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছেন পাঠকের দরবারে। তাঁর ভাষার আশ্রয়ও তাই- কোনো রকম সচেতন শৈল্পিক অবলম্বনের প্রশ্রয় নেই সেখানে। গল্পসৃষ্টিতে চরিত্রগত আবেগ-আবেদনকে গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। নিজস্ব অভিজ্ঞতাকেই প্রসারিত করে দিয়েছেন পাঠক অনুভূতির উৎসমূলে। তাঁর শহর এবং আঞ্চলিক উভয়ধারার গল্পগুলিতেই এই আবেদন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে- বর্ণনার সঙ্গে মুখের ভাষার সুসামঞ্জস্য, আরবি-ফারসি ও খাঁটি বেশি শব্দের সুষম প্রয়োগ। এ জাতীয় যে-কোনো ছোটগল্পেই লক্ষ্য করা যায়। যেমন ‘মা’ গল্পটি- ভাগ্যবিতাড়িত, নিঃসম্বল, ছিন্নমূল কিছু মানুষের অতি সাধারণভাবে বেঁচে থাকার কাহিনী। বড় কাটারার প্রাচীন ইমারত এদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, পেশা ভিক্ষাবৃত্তি। মায়মুনা, বুড়ো বশিরম গোদ্-ওয়ালা রহিম ভাগ্যতাড়িত এই মানুষগুলিকে যেমনভাবে দেখা যায় শহরের আনাচে-কানাচে সেভাবেই উঠে এসেছে তারা:
মায়মুনা ছেঁড়া চট্টার উপর আশ্রয় নিয়েছে। শিয়রের কাছে চটের নিচে কতকগুলো খড় মায়মুনার বালিশ। তারই উপর মাথাটা রাখা। শাদা কটা ময়লা জট্ পাকানো চুলে মাথাটা ভর্তি। কুড়ি বাইশ দিন ধরে তার ভীষণ জ্বর, আজ সাতদিন ধরে সে একবারেই বেখতিয়ার-জবাব পর্যন্ত নেই মুখে। পাশের ঘেরাটকুটুতে থাকে বুড়ো বশির। সে শুধু ভিক্ষেই করে না, তার জট্ ধরানো বাবড়ি ও দাড়ির মধ্যে অনেক কামালিয়তও লুকিয়ে আছে। যতো রকমের ঝাড়ফুঁক তার ইলেমে কুলায় বশির তার কোনটাই বাদ রাখেনি। মায়মুনাকে সে পানি পড়াও খাওয়ায়। কিন্তু মায়মুনার অবস্থা খারাপের দিকেই যাচ্ছে। … গোদ্ওয়ালা রহিম বসে বসে তামাক টানে। বুড়ি শহরবানু তার কাছে বসে পাটায় হলুদ মরিচ পিষছে আর তারই আওয়াজে বড় কাটারার আঁধার গহ্বরটিতে একটা করুণ বিষণœতার আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে। একটা বোবা বেদনায় গোঙাতে থাকে মায়মুনা। মাঝে মাঝে অন্ধের মতো হাত বাড়িয়ে ও কী যেন খোঁজে আর চোখ না মেলেই ছেঁড়া চট্টার কিছুটা অংশ দলা পাকিয়ে সজোরে চেপে ধরে বুকের উপর।
‘ফসল তোলার কাহিনী’তে এই বিবরণ আরও বেশি জীবন-ঘনিষ্ঠ। একটি গরিব, খেটে খাওয়া সাধারণ কৃষক পরিবারের দৈনন্দিনতার চালচিত্র গল্পটির পরতে পরতে রেখায়িত। তাদের স্বপ্ন-আশা-সম্ভাবনা, তাদের সুখ-দুঃখ-পরাজয়-পরিশ্রমের বয়ানে ঠাসা গল্পটির বর্ণনার ভুবন। বিভিন্নভাবে এসেছে সে বর্ণনা-বজলু, পঙ্খি, বানু, জায়তুন, ডালিম, ময়না, নফি, সফি, সাদি প্রত্যেকেরই ফসল বোনা, ফসল তোলা, ফসল রক্ষার বাস্তব জীবনাংশের এক একটি খণ্ডচিত্রের মতো। শুরুতেই ফলন্ত ফসলের বর্ণনা, একইসঙ্গে কৃষকের স্বপ্ন-রঙিন জীবনাবেগ:
কার্তিকে জানা বুনেছে কিষাণরা। অঘ্রাণে মাটি উল্টিয়ে, পৌষ আর মাঘে ধান রুয়েছে ক্ষেতে। নিদ্রায় আর জাগরণে ফসলের কামনায় ওরা উন্মুখ রয়েছে। চৈত্রের শেষ দিকে ফসলে রঙ ধরে মাঠে মাঠে যৌবন যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলো। চাষীরা অপেক্ষা করে অধীর আগ্রহে; নতুন ফসলের সজিগন্ধি মায়ায় কল্পনা তাদের সজীব হয়ে ওঠে, মনের আকাশে যেন রঙের আগুন লাগে। আর মাত্র ক’দিন, চাষীরা, কাঁচি নিয়ে ক্ষেতে নামবে, ঘরে ঘরে শুরু হবে নবান্নের খোশরোজ-নতুন করে জীবন আরম্ভ করবার পাথেয় সঞ্চয়। একটা ব্যস্ততা আর তাড়াহুড়ায় পল্লী সরগরম হয়ে ওঠে। কেউ ‘ভাঁটার’ ঠিক করতে ব্যস্ত, কেউ ভাঙা ‘ডোল্টা’ মেরামত করছে- কেউ বা ধান মাড়াই করবার জন্য বাড়ির নামায় মাটি চেঁছে ‘খলা’ তৈরি করতে লেগে যায়। কেউ আবার খলার কাছে তৈরি করছে ছোট্ট একটা ছনের ঘর, কড়া রোদ আর ঝড় বৃষ্টির সময় যেখানে আশ্রয় নেবে মেয়েরা; আর রাতের বেলা ধান ‘উনা’ দিতে দিতে শরীর যখন একান্তই ভেঙে আসবে, তখন ঘুম দেবে শিথিল এলায়িত দেহ ঢেলে দিয়ে।
এরপরে আসে ফসল তোলার সময়- ছেলেরা কাঁচি হাতে নামে মাঠে, ‘ধানের মুঠা’ এনে ঝড় করে বাড়ির ‘খলায়’ আর মেয়েরা অংশ নেয় ‘মাড়াই’-এ। আরও রয়েছে ধান ‘উনা’ দেয়া, ধান শুকানো আর ধান উড়ানোর কাজ:
মাড়া দিয়ে খড় ঝেড়ে পুরুষেরা খেয়ে দেয়ে চলে গেছে মাঠে। মেয়েরা ধান নাড়ছে, ধান উড়াচ্ছে আর খলার ঘরে আশ্রয় নিচ্ছে; কেউ কেউ বা গাছতলায় বসে ভিড় জমাচ্ছে। পঙ্খির কাজ আজ কম। আজ মাড়া ছিল না তাদের। কালকের কিছু ধান উড়ানোর বাকি ছিল, সে ধানই কুলায় করে বাতাসের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিতে লাগলো মাটিতে। বাতাসের ঝাপটা, বিরতি- এ সবের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে না ছাড়লে উড়ানো হয় না ধান, পঙ্খি তা ভাল করেই জানে। কাজেই ছন্দটা সে আয়ত্তে এনেছে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে। ধানের সুঙা আর চুঁচা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়, মসৃণ সোনালি ধান পড়ে থাকে পায়ের উপর স্তূপীকৃত হয়ে; ধানের স্তূপের উপর বুক চেপে পড়ে থাকবার জন্য, নাক ভরে তার আঘ্রাণ নেবার জন্য লোভ যায় পঙ্খির- সত্যি, অপূর্ব মাদকতা এই নতুন ধানের গন্ধে। জীবনের মর্মবাণীটি যেন পরম যতেœ লুকানো আছে এই গন্ধের কেন্দ্রবিন্দুতে।
রয়েছে প্রাকৃতিক দৈব-দুর্যোগ, যার সঙ্গে ওতপ্রোতে জড়িত এদের ভাগ্যলিপি। অকাল বন্যায় ডুবে যায় ফসলের ক্ষেত, আসে স্বপ্নাহত মানুষগুলির জীবনে ফসল রক্ষার নতুন লড়াই:
মুহূর্তমাত্র না দাঁড়িয়ে কাঁচি নিয়ে বজলু হন্ হন্ করে বেরিয়ে যায়। মাঠের ধান ডুবে যাওয়ার আগে আকুল হয়ে ডাকছে। দেড়হাল জমির ধান কেটে তুলতে হবে একদিনের মধ্যে। মাত্র ছয়জন ভাগালু আর তারা তিনজন, এই ন’জন। এই ন’জনের পক্ষে এত ধান কেটে তোলা কি সম্ভব? … বেলা পড়বার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা দেখতে পায়-সাদা হয়ে যাচ্ছে সোনালি ফসলে ভরা হাওর। আর মানুষগুলো প্রথমে হাঁটু পানিতে, তারপর কোমর পানিতে ‘হামসি’ ‘হামসি’ করে ধান কাটছে। সন্ধ্যার সময় দেখা গেল, হাওরের মাঝখানে যেখানে গভীরতা একটু বেশি, শুধু মানুষের কালো মাথা সাঁতার কাটছে, আর অন্যান্য জায়গায় পেট পানিতে বুক পানিতে দাঁড়িয়ে প্রায় ডুব দিয়ে গিয়ে ওরা কাঁচি চালাচ্ছে। আজকের সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে এ হাওরের বুকে হবে যবনিকা-কাল আর ফসলের নাম নিশানা থাকবে না, তীরে থাকবে শুধু অসহায়ের নির্বোধ কান্না-বুক ছেঁড়া করুণ আর্তনাদ।
আবার আধুনিক নগর জীবনের অভ্যস্ততা থেকে মধ্যবিত্তের জীবনাচরণের বর্ণনায় নিবিষ্ট হন তিনি যখন, তাঁর বাকভঙ্গিতেও সহজেই মেলে নাগরিকতার কৃত্রিম অবয়ব। যেমন ‘সোনার খনি’ গল্পটি, ড. কামরানের আধুনিকা স্ত্রী জীনাতের বিশেষ প্রতিযোগিতামুখী প্রবণতা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, দৃষ্টিভঙ্গির অসারতা, আধুনিক ফাঁপা জীবনবোধের সবটুকু প্রভাব এ গল্পের ভাষায় সুস্পষ্ট:
জিনাতের নজর হামেশাই উপরের দিকে। প্রচণ্ড একটা কম্পিটিশনের, একটা প্রতিযোগিতার নেশা তার রক্তে। অর্থ-বিত্ত প্রতিপত্তির দিক দিয়ে যারা তার চাইতে অনেক উপরের, জিনাতের নজর তাদের দিকে। তাদের বাড়ি, গাড়ি, বিদেশী আসবাবপত্র, ক্রোকারি, দুর্লভ সংগ্রহ, পর্দার কাপড়, গালিচা, সোফাসেট ইত্যাদি তাকে মোহাচ্ছন্ন করে ফেলে- তার দু’চোখে কেবলি ঝিলিক মারতে থাকে। ঘুরে ঘুরে সে দেখে কিচেন, বাথরুম। তারপর তার মনে ওঠে ঝড়, যে জিনিসটা তার ঘরে নেই, সেটি সংগ্রহ করার জন্য সে পাগলামি শুরু করে দেয়। সে চলমান সময়ের দ্রুত ধেয়ে চলা ঢেউ-এর মাথায় ভাসাতে চায় তার ডিঙিখানা-সে থাকবে সকলের আগে। সেকেলের জন্যও জিনাত পিছে পড়তে রাজি নয়। সে কারো কাছে হারতে পারে না। তার টেবিলে বাবুর্চিখানা লাগবে, তার গাড়ি চালাবে উর্দীপরা ড্রাইভার।
তবে বাস্তব অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ বর্ণনা তাঁর গল্পে যত এসেছে, চরিত্রের দ্বন্দ্বমথিত অভিব্যক্তির বহিঃপ্রকাশ ততটাই কম। ‘গল্পের ভাষা নিছক বিবরণ দেয় না কখনো, সঞ্চারিত করে কখনো স্ফুট আর কখনো অস্ফুট ইশারা’। এই বিচারে শাহেদ আলীর অধিকাংশ ছোটগল্প কেবলই বর্ণনার বিন্যাস। তবুও গ্রাম এবং নাগরিক পরিশীলনে অভ্যস্ত সাধারণ মানুষগুলির সাধারণ জীবন অভিজ্ঞতার কথকতা নির্মাণে আগাগোড়া সচেষ্ট থেকেছেন গল্পকার শাহেদ আলী। তাঁর এই প্রচেষ্টার আন্তরিক প্রয়াসে গল্পগুলিতে ভিড় করে আসা মানুষেরা তাদের সুখ, দুঃখ, আনন্দ, ব্যথা, বেদনা ও যন্ত্রণা নিয়ে, বুকভরা আশা ভরসা নিয়ে, তাদের নিজ নিজ চেহারা ও অবয়ব নিয়ে তাদের সুখের বুলি ও অনন্য বাকভঙ্গিসহ উঠে এসেছে জীবন্ত-সত্য হিসেবে। শাহেদ আলীর গল্পের নির্বাচিত রূপাঙ্গিক তাঁর এই চোখে দেখা জগতেরই সরাসরি অনুকরণ, জীবন-সারল্যের সাবলীল ও সহজ ধারাভাষ্য। হ
তথ্যসূত্র:
১. শাহেদ আলী, স্বনির্বাচিত গল্প, ঢাকা: গতিধারা, ২০০০।
২. বীরেন্দ্র দত্ত, বাংলা ছোটগল্প: প্রসঙ্গ ও প্রকরণ, কলকাতা: পুস্তক বিপণি, ২০০০।
৩. শ্রীভূদেব চৌধুরী, বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প ও গল্পকার, কলিকাতা: মডার্ন বুক এজেন্সী প্রা. লি. ১৯৯৯।
৪. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, বাংলা গল্প বিচিত্রা, কলিকাতা: প্রকাশ ভবন, ১৯৫৮।
৫. তপোধীর ভট্টাচার্য, ছোটগল্পের অন্তর্ভুবন, কলিকাতা: মহাজাতি প্রকাশন, ২০০০।
৬. সৈয়দ আকরম হোসেন, প্রসঙ্গ: বাংলাসাহিত্য, ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স, ১৯৯৭।
৭. সিরাজুল ইসলাম, বাংলাদেশের পঁচিশ বছরের সাহিত্য (১৯৭২-৯৭), সম্পাদনা সাঈদ-উর-রহমান, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০০৩।
৮. নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, ছোটগল্পের সীমারেখা, কলিকাতা: বাক্-সাহিত্য প্রা. লি.।