মানুষ স্বাধীনতা চায়, মানুষ মুক্তি চায়- স্বাধীনতা ও মুক্তি মানুষের মৌলিক অধিকার। মানুষের অস্থিমজ্জায় প্রবাহিত স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তির আকাক্সক্ষা এমনই এক রক্ত¯্রােত যা তাকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করায় তাকে উজ্জীবিত করে মহৎ কর্মে। স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার হলেও মানুষকে শৃঙ্খলিত করে রাখা হয় নানাভাবে। শুধু একক মানুষকে নয়; শৃঙ্খলিত করে রাখা হয় একটি জনগোষ্ঠীকে একটি জাতিকে। কিন্তু মানুষের চেতনায় প্রবাহিত স্বাধীনতার স্পৃহা তাকে কোনো শেকলেই বন্দি থাকতে দিতে চায় না। ফলে স্বাধীনতার জন্য মুক্তির জন্য মানুষকে হতে হয় সোচ্চার। অন্যদিকে ঔপনিবেশকি শাসকশ্রেণী এবং সা¤্রাজ্যবাদী শোষক চক্র সহজ পথে মানুষের স্বাধীনতা কিংবা মুক্তি দিতে চায় না। প্রয়োজনে এই সব অপশক্তি মানুষ নিধনে নিয়োজিত হয়। যার ফলে স্বাধীনতার জন্য, মুক্তির জন্য মানুষের জীবনে অনিবার্যভাবে এসে পড়ে যুদ্ধ। মূলত কাম, ক্রোধ, লোভ, প্রতিহিংসা, ভালোবাসা ইত্যাদির মতো যুদ্ধও মানুষের একটি আদিম প্রবৃত্তি। মানবজাতির ইতিহাস মূলত তার যুদ্ধের ইতিহাস। মানুষকে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য অবিরাম সংগ্রামে লিপ্ত থাকতে হয়েছে এবং আজো হচ্ছে। সাহিত্য যেহেতু মানুষকে নিয়ে, তাই মানুষের যুদ্ধ সাহিত্যের একটি প্রধান প্রসঙ্গ। অন্যান্য প্রসঙ্গের মতো যুদ্ধও শিল্পী-সাহিত্যিকদের চেতনালোকে নানাভাবে আলোড়নের সৃষ্টি করেছে। ফলে তাঁদের হাতে সৃষ্টি হয়েছে। যুদ্ধভিত্তিক অনেক কালজয়ী শিল্প-সাহিত্য।
পৃথিবীর প্রাচীন মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারত, ইলিয়াড, ওডেসি, শাহনামা ইত্যাদি রচিত হয়েছিল মূলত যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই। যুদ্ধভিত্তিক শিল্পকর্ম বা সাহিত্য যাঁরা সৃজন করেছেন তাঁদের অনেকেরই ছিল যুদ্ধের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
যুদ্ধের ভেতর তাঁরা যেমন মানুষের শীর্ষ-বীর্য, সাহস-বীরত্ব, দেশপ্রেম, ন্যায়নিষ্ঠা ইত্যাদি লক্ষ করেছেন, তেমনি দেখেছেন যুদ্ধের বিভীষিকা, অমানবিকতা, পাশবিকতা, নিষ্ঠুরতা যুদ্ধের বিভীষিকা, অমানবিকতা পাশবিকতা, নিষ্ঠুরতা, নিপীড়ন, হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসলীলা ইত্যাদি। যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মে অনেক মহৎ শিল্পী যুদ্ধবিরোধী মনোভাব গড়ে তুলেছেন। কারণ যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁরা প্রত্যক্ষ করেছেন অগণিত মানবাত্মার ‘ক্রন্দন-রোল। কিন্তু, যুদ্ধ যত ভয়াবহই হোক, যুদ্ধ যত অশ্রুই বয়ে আনুক, মানুষের ‘যুদ্ধ-নেশা’, মানুষের ‘মারণ নেশা’র শেষ নেই। তার প্রমাণ পর পর দুটো মহাযুদ্ধ।
যুদ্ধভিত্তিক অনেক সাহিত্যকর্মই বিশ্বসাহিত্যে স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য টলস্টয়ের ডধৎ ধহফ চবধপব, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অ ভধৎববিষষ ঃড় অৎসং, এরিক মারিয়া রেমার্কের অষষ ছঁরবঃ ড়হ ঃযব ডবংঃবৎহ ঋৎড়হঃ ইত্যাদি। বাংলা ভাষায় যুদ্ধ ও রাজনীতি কেন্দ্রিক সাহিত্যকর্ম নেহাত কম সৃষ্টি হয়নি। বাঙালি স্বাধীনচেতা জাতি; ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- বাঙালি পরাধীনতা থেকে মুক্তির জন্য বারবার সংগ্রাম করেছে। মোগল, ব্রিটিশ কোনো সা¤্রাজ্যবাদীর শাসনই তারা মানতে চায়নি সা¤্রাজ্যবাদী এসব অপশক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য তাদের লড়াই ছিল অব্যাহত। বাংলা ভাষায় রচিত যুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যকর্মের মধ্যে মাইকেল মধুসূদুন দত্তের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’, মহাকবি কায়কোবাদের ‘মহাশ্মাশান’ এবং মীর মশাররফ হোসেনের ‘বিষাদ-সিন্ধু’ এই তিনটি একটু আলাদাভাবে আলোচনার দাবি রাখে। এই তিনটি গ্রন্থে যুদ্ধে বীরত্ব ও গৌবর, শৌর্য-বীর্য সাহসিকতা শেষ পর্যন্ত করুণ সুরের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। যুদ্ধের ফলে এসব গ্রন্থে যে ‘প্রলয়’ ঘটেছে তা অত্যন্ত ট্র্যাজিক। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন- ‘প্রলয় নতুন সৃজন বেদন’ অর্থাৎ ‘নতুন-সুন্দর’ কিছু সৃষ্টি করার জন্য ‘কুৎসিত-পুরাতন’কে তিনি ধ্বংস করতে চেয়েছেন। তৎকালীন সা¤্রাজ্যবাদী বৃটিশের শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে তিনি ‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর কবিতায় স্বাধীনতার অভিপ্রায়ে বৃটিশ শাসকের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য যুদ্ধের উৎসাহ ও উদ্দীপনা যেভাবে জাগ্রত হয়েছিল সমকালীন আর কারো কবিতায় তা পাওয়া যায় না। এ প্রসঙ্গে শুধু ইসমাইল হোসেন সিরাজীর ‘অনল প্রবাহ’ (১৯০০) কাব্যটির নাম উল্লেখ করা যায়। ইংরেজদের বিরুদ্ধে যেসব আন্দোলন হয়েছে, যেমন অসহযোগ আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন, স্বদেশী আন্দোলন ইত্যাদি বাংলা কথাসাহিত্য অনেক ঔপন্যাসিকের লেখাতেই চিত্রিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ঘরে-বাইরে’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’, কাজী নজরুল ইসলামের ‘কুহেলিকা’, ‘মৃত্যুক্ষুধা’ ইত্যাদি বিশেষভাবে স্মরণীয়।
বৃটিশ শাসকের বিরুদ্ধে অসহযোগে আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন ইত্যাদি থেকে শুরু করে লাহোর প্রস্তাব, পাকিস্তান আন্দোলন ইত্যাদি বাঙালি-মুসলমান সমাজে যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল তা চিত্রিত হয়েছে আবুল ফজলের ‘রাঙা প্রভাত’, আবুল মনসুর আহমদের ‘জীবন ক্ষুধা’, শহীদুল্লাহ কায়সারের ‘সংশপ্তক’, আবু জাফর শামসুদ্দীনের ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, আবু রুশদের ‘নোঙর’, সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘অনেক সূর্যের আশা’, সত্যেন সেনের ‘উত্তরণ’, জহিরুল ইসলামের ‘অগ্নিসাক্ষী’ ইত্যাদি উপন্যাসে। সে সময় বৃটিশের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে বাঙালি মুসলমানরা ১৯৪৭ সালে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল, তা সত্যিকারের স্বাধীনতা ছিল না, ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের গোলামি- অল্প দিন পরেই তারা তা বুঝতে পারল। পশ্চিম-পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী প্রথম আঘাত হানল বাঙালির মাতৃভাষার ওপর। কিন্তু বাঙালিরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত ছিল। ফলে মাতৃভাষাকে কেন্দ্র করে শুরু হলো নতুন করে সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক সংগ্রাম। ১৯৫২ সালের মাঝে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের সবচে বড় ঘটনা এই ভাষা আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জহির রায়হান প্রথম ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি রচনা করে। মুনীর চৌধুরী ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচনা করেন- ‘কবর’ নাটক। স্বাধীনতা-উত্তর কালে রচিত সরদার জয়েন উদ্দীনের ‘বিধ্বস্ত রোদের ঢেউ’ (১৯৭৪), এবং সেলিনা হোসেনের ‘যাপিত জীবন’ (১৯৮২) উপন্যাসে এই ভাষা-আন্দোলন চিত্রিত হয়েছে। ভাষা-আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে অনেক কবিতা ও গান। বাঙালির ভেতর এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই জাগ্রত হলো স্বাধিকার আন্দোলন। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক-শ্রেণির শোষণ ও অত্যাচারে শোষিত-নিপীড়িত বাঙালিদের রূপ নিলো। বাঙালির গণ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব বাংলার ‘স্বায়ত্ত-শাসন’। তাদের এই দাবি ছিল ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু পশ্চিমা শাসক-চক্র বাঙালির এই ন্যায্য দাবিকে অগ্রাহ্য করে তাদেরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের কালো রাত্রিতে যে হত্যাযজ্ঞ চালালো পৃথিবীর ইতিহাসে তা অন্যতম বৃহত্তর নৃশংস গণহত্যা। বাঙালির লড়াই ছিল মুক্তির লড়াই, স্বাধীনতার লড়াই, বেঁচে থাকার ন্যায়সঙ্গত লড়াই। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক চক্র ও সামরিক জান্তার এই হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলা ছিল সম্পূর্ণ অন্যায় ও অমানবিক। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা যে পাশবিকতা, হত্যাযজ্ঞ, বিভীষিকা, নির্যাতন চালিয়েছে- পৃথিবীর ইতিহাসে তা এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। বাঙালি জাতি নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য, স্বদেশের মানুষের মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য বীর বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে, অনেক রক্ত এবং অনেক অশ্রুর বিনিময়ে, অনেক মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে, অনেক আপন-জনকে হারিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার পতাকাটি অর্জন করে।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়- এর একদিকে যেমন রয়েছে অনেক স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে রয়েছে শৌর্যবীর্যের গৌরব। এই যুদ্ধে বাঙালি জাতির তার বীরত্ব, সাহসিকতা, কষ্ট সহিষ্ণুতা, এবং মুক্তির ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিয়েছে; বিশ্বের কাছে নিজেদেরকে একটি স্বাধীন জাতি এবং বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাঙালি জাতির ইতিহাসে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ তাই সর্ববৃহৎ ঘটনা। জাতির এই সর্ববৃহৎ ঘটনা নিয়ে রচিত হতে পারে সর্ববৃহৎ শিল্পকর্ম।
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের ভেতর নিহিত রয়েছে আমাদের জাতীয় জীবনের মূল স্রোতধারা। আমাদের স্বদেশ সমাজ ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে বহমান আমাদের সাহিত্য। যে ঘটনারাজি আমাদের স্বদেশ, সমাজ ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে, সেই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে বহমান বাংলাদেশের সাহিত্য। আমাদের সাহিত্যের সকল শাখায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে: বিশেষ করে আমাদের কথাসাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধের বীরত্ব ও বেদনার কাহিনী: একটি জাতির স্বাধীনতার অর্জনের কাহিনী চিত্রিত হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্যে প্রথমেই শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসটির নাম উল্লেখ করতে হয়। এই উপন্যাসে আনোয়ার পাশা বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে দুই যুগের পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তুলে ধরেছেন। পাকিস্তানিদের শাসন ও শোষণ চিত্র এই উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। ২৫ শে মার্চের রাত্রিতে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ বাঙালির ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল তা ছিল ‘বাংলাদেশ সম্পর্কে পাকিস্তানিদের বিগত দুই যুগের মনোভাবের সংহত প্রকাশ মূর্তি। আনোয়ার পাশার ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট, বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পৈশাচিকতা, নারী নির্যাতন, বাঙালি সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রস্তুতি ইত্যাদি ব্যক্ত হয়েছে। মূলত উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের এক ঐতিহাসিক দলিল। উপন্যাসটির রচনাকাল ১৯৭১ এর এপ্রিল থেকে জুন। মুক্তিযুদ্ধ তখনো শেষ হয়নি। কিন্তু ঔপন্যাসিক আনোয়ার পাশা মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেই উপন্যাস শেষ করেছেন।
সমাজসচেতন ও রাজনীতিসচেতন ঔপন্যাসিক শওকত ওসমান ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন- চারটি উপন্যাস- ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’, ‘নেকড়ে অরণ্য’, ‘দুই সৈনিক’ এবং ‘জলাংগী’। ‘জাহান্নাম হইতে বিদায়’ উপন্যাসে ১৯৭১ এর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পুর্ব বাংলাকে যেভাবে ‘জাহান্নামে’ পরিণত করেছিল- তারই কয়েকটি খণ্ড খণ্ড চিত্র রয়েছে।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন সারাদেশে অকথ্য নির্যাতন শুরু করে তখন লক্ষ লক্ষ বাঙালি স্বদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। উপন্যাসটির প্রধান চরিত্র গাজী রহমান একজন স্কুল শিক্ষক, তিনি কোনো রাজনীতি করেন না, শিক্ষকতা করেন। কিন্তু তাকেও সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে আত্মগোপন করতে হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের লক্ষ্যে ভারতের উদ্দেশে স্বদেশ ত্যাগ করতে হয়েছে। শওকত ওসমানের ‘নেকড়ে অরণ্য’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদেশের অসংখ্যা মা-বোনের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যে অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল- তারই চিত্র ফুটে উঠেছে। ‘দুই সৈনিক’ উপন্যাসে স্বাধীনতা বিরোধীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার পাশাপাশি পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের লাম্পট্য ও নির্যাতনের চিত্র লেখক তুলে ধরেছেন। ‘জলাংগী’ উপন্যাসে মুক্তিযোদ্ধা জমিরালির দেশপ্রেম ও জীবনদানের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
ঔপন্যাসিক সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন ‘নীল দংশন’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ ইত্যাদি উপন্যাস। তাঁর উপন্যাসগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি, হানাদার বাহিনীর নির্মমতা, বাঙালির স্বদেশপ্রেম ইত্যাদি চিত্রিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হানাদার বাহিনীর হাতে এদেশের কবি-সাহিত্যিকরা কিভাবে নির্যাতন ভোগ করেছেন- তার চিত্র ফুটে উঠেছে ‘নীল দংশন’ উপন্যাসে। বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ নস্যাৎ করার জন্য বর্বর হানাদার বাহিনী বাঙালির ওপর শুধু দৈহিক নির্যাতনই করেনি, অনেক সময়ই করেছে মানসিক নির্যাতন। পাকিস্তানি হানাদারদের এসব অত্যাচার দেখে বাঙালি দমে যায়নি; বরং বিদ্রোহী হয়ে উঠেছে। ‘নিষিদ্ধ লোবান’ উপন্যাসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জিঘাংসাবৃত্তি বাঙালির বিদ্রোহী হয়ে ওঠার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। সৈয়দ শামসুল হকের ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। উপন্যাসে প্রধান চরিত্র শিক্ষক তাহেরের চেতনায় মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ে মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল নিয়ে যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তা উপন্যাসটিতে বিবৃত হয়েছে। এই উপন্যাসের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেনের ধারণা- “সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি, দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই দেশ থেকে এক লহমায় অশুভ শক্তি সমূহ অন্তর্হিত হয়নি; এখনো অস্ত্র ধারণ করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে, সম্ভবত আগের চেয়ে, মুক্তিযুদ্ধ চলার সময়ের চেয়ে, এখনই প্রয়োজনীয়তা আরো বেশ করে রয়েছে।” সৈয়দ হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে- ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘ত্রাহি’ ও ‘অন্তর্গত’।
ঔপন্যাসিক রশীদ হায়দার মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন ‘খাঁচায়’, ‘অন্ধ কথামলা’, ‘নষ্ট জোছনায়’, ‘এ কোন অরণ্য’ ইত্যাদি উপন্যাস। এদেশের অগণিত তরুণ-যুবক ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল; বীর বিক্রমে তারা যুদ্ধ করেছে। স্বদেশ আর স্বাধীনতা মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে তারা জীবন উৎসর্গ করেছে। এইসব মুক্তিযোদ্ধাকে সহযোগিতা করেছে এদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ; যারা সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, কিন্তু স্বদেশের স্বাধীনতার মন্ত্রে তারাও ছিল উজ্জীবিত। দীর্ঘ নয় মাসের জীবন ছিল অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তায় পরিপূর্ণ, প্রতি মুহূর্তে তারা উপলব্ধি করেছে- দেশের ভেতরই তারা এক প্রকার বন্দি। তাদের এই দুঃসহ বন্দিজীবনের চিত্র ঔপন্যাসিক রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে। খাঁচায় বন্দি পাখি যেমন প্রতি মুহূর্তে মুক্তির জন্য ছটফট করে, তেমনি এদেশের সাধারণ মানুষ প্রতি মুহূর্তে মুক্তির জন্য প্রহর গুনেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারা দেশকে বন্দি শিকলে পরিণত করেছিল। জাফর, তাহের সাহেব, মিন্টু, ফিরোজ চাচা-প্রমুখ এই উপন্যাসের সাধারণ জনগণের নমুনা মাত্র। মূলত তাদের মতো অবস্থা ছিল এদেশের হাজার হাজার জনগণের যারা নিজ গৃহে বন্দি জীবন যাপন করেছে। মাতৃভূমি থেকে একবার পালিয়ে জীবন বাঁচতে চেয়েছে; কিন্তু পরিবার পরিজনের দিকে তাকিয়ে পালাবার পথ পায়নি। একবার তারা আশায় বুক বেঁধেছে, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে, আবার নিরাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে, মৃত্যুর প্রহর গুনেছে।
কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন- ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’, ‘যুদ্ধ’ ইত্যাদি। হলদী গায়ের ‘বুড়ি’ নামের এক নারীর স্বদেশপ্রেম এবং স্বাধীনতার স্পৃহা ব্যক্ত হয়েছে। ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসে ‘বুড়ি’ নামের এই নারী হলদী গায়ের একজন গৃহবধূ, একজন মা এই ভাবমূর্তির মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি সে হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের হাজার হাজার গ্রামের লক্ষ লক্ষ মায়ের প্রতিনিধ যারা মুক্তিযুদ্ধের নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করতে দ্বিধা করেনি। ঔপন্যসিক সেলিনা হোসেন ‘হাঙর নদী গ্রেনেড’ উপন্যাসটিতে একটি গ্রামীণ পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ছবি তুলে ধরেছেন। বুড়ির বিয়ে হয় তার চাচাতো ভাই বিপতœীক গফুরের সাথে। সলীম তার কলীমকে রেখে গফুরের আগের স্ত্রী মারা গিয়েছিল। বুড়ি গফুরের সংসারে এসে সলীম আর কলীমকে নিজের সন্তানের মত মানুষ করতে থাকে। কিন্তু কোথায় যেন তার অপূর্ণতা থেকে যায়; সে চায় নিজের সন্তান; ‘নাড়ী ছেঁড়া ধন’। একদিন বুড়ির সেই আশাও পূর্ণ হয়- কিন্তু দুঃখ হলো সন্তান বুড়ি জন্ম দেয়- তা বোবা এবং কিছুটা পঙ্গু। এই পঙ্গু সন্তান রইসকে নিয়ে বুড়ি দিন কাটায়। কিন্তু স্বীমর মৃত্যুর পর এক সময় দেশে শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ- বুড়ি বুঝতে পারে হলদী গায়ের চেহারাটা হঠাৎ করে বদলে গেল। সলীম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আর তাকে হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী খুঁজতে এসে না পেয়ে কলীমকে গুলি করে হত্যা করে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ‘গুলির শব্দ এসে বিঁধে বুড়ির হৃদয়ে। গুলির শব্দটা ঠিক সেই মুহূর্তে কলীমের মা ডাকের মতো তীক্ষè, তীব্র। এফোঁড় ওফোঁড় করে বেরিয়ে যায়।’ বুড়ি চায় হলদী গায়ের জন্য একটা কিছু করতে। কিন্তু একে একে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। বুড়ির চোখের সামনে। হানাদার বাহিনী গ্রামে নারকীয় উৎসবে মেতে ওঠে, কখনো মেশিন গানের ব্রাশফায়ারে ঘুম ভেঙে যায় গ্রামবাসীর। বুড়ির প্রতিবেশীর মেয়ে ফুলি নির্যাতিত হয়; কিন্তু কিছুই করতে পারে না চার পাশের লোকজন। অক্ষমতার যন্ত্রণায় ফুলে ওঠে বুড়ির শরীর। গ্রামের যুবকরা একে একে অনেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু বুড়ির দুঃখ হয়- তার পঙ্গু ছেলে রইস দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে কিছুই করতে পারেলা না বলে। মুক্তিযুদ্ধে উপেক্ষিত এই সন্তানকে নিয়ে বুড়ির নিদারুণ কষ্ট হয়। বুড়ি চায় তার ছেলেও মুক্তিযুদ্ধে শরিক হোক। শেষ পর্যন্ত বুড়ির এই প্রত্যাশা পূর্ণ হয়। সে রাতে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এসে বুড়ির কাছে আশ্রয় নিলো এবং হানাদার পাকসেনারা এসে বুড়ির বাড়ি তল্লাশি শুরু করলো- সে রাতে বুড়ি রইসের হাতে এল.এম.জি গুঁজে দিয়ে পাকসেনাদের হাতে তুলে দিলো। পাকসেনারা রইসকে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে গুলি করে হত্যা করে আর রইসের রক্তের বিনিময়ে রক্ষা পায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার জীবন। নিজের সন্তানের জীবন উৎসর্গ করে বুড়ি দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখে গেল।
বাংলাদেশের পাঠকনন্দিত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচনা করেছেন ‘শ্যামল ছায়া’, ‘১৯৭১’, ‘সৌরভ’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘সূর্যের দিন’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ ইত্যাদি উপন্যাস। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর সহজ সরল ভাষায় উপন্যাসগুলোকে মুক্তিযুদ্ধের খন্ড খন্ড চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর উপন্যাসগুলোতে স্বদ্রেশপ্রেম এবং মানবিক মূল্যবোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ‘শ্যামল ছায়া’ উপন্যাসে কয়েকজন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার একটি থানা অপারেশনের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। আবু জাফর শামসুদ্দীন, হুমায়ূন আহমেদ, হাসান আলী, আবদুল মজিদ, আনিস স্যার প্রমুখ গেরিলা মুক্তিযোদ্ধোর জবানীতে উপন্যাসটির কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭১-এ পাকিস্তানি মিলিটারি এবং রাজাকারদের হত্যাযজ্ঞ ও পাশবিকতায় বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল- তার কিছু চিত্র রয়েছে এ উপন্যাসে। উপন্যাসটিতে বেশ কয়েকটি খন্ড-যুদ্ধের বর্ণনা রয়েছে। ১৯৭১ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের গ্রামে গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী রাজাকারদের নিপীড়নে বাঙালিরা যেভাবে জর্জরিত হয়েছিল তার কিছু চিত্র রয়েছে। উপন্যাসটির কাহিনী নির্মিত হয়েছে নীলগঞ্জ নামক একটি গ্রামের প্রেক্ষাপটে; গ্রামটি বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামেরই প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। ‘সৌরভ’ উপন্যাসে ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অবরুদ্ধ ঢাকা নগরীর মানুষগুলোর ভেতর যে বন্দিদশা, যে আতঙ্ক, যে আশা, যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব- প্রতিনিয়ত তাদেরকে বিচলিত করতো- তারই কিছু চিত্র ফুটে উঠেছে। উপন্যাসটির শেষাংশে ঔপন্যাসিক মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারে এই বলে আশাবাদ করেছেন যে, ‘একদিন এই দুঃস্বপ্ন কাটবে।’ ‘আগুনের পরশমনি’ উপন্যাসটি একদল গেরিলা মুক্তিযোদ্ধার ঢাকা শহরে অপারেশনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে। গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতা বদিউল আলম, তার অন্যান্য সহযোগী- সাদেক, রমান, নূরু, নাজমুল, গৌরাঙ্গ, আশফাক প্রমুখ। উপন্যাসটিতে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা দলের দেশপ্রেম, স্বাধীনতার স্পৃহা, বীরত্ব, সাহসিকতা এবং আত্মত্যাগের পাশাপাশি ঢাকা শহরের সাধারণ বাঙালিদের দেবাপ্রেম, স্বাধীনতার স্পৃহা, সহযোগিতা এবং আত্মত্যাগের কথা ব্যক্ত হয়েছে। উপন্যাসটি শুরুই হয়েছে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ঢাকা শহরের মানুষগুলোর ভেতর যে চাপা উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা অস্থিরতা বিরাজমান ছিল তারই আভাস দিয়ে- “সারাটা সকাল উৎকণ্ঠার ভেতর কাটল। উৎকণ্ঠা এবং চাপা উদ্বেগ।” ‘সূর্যের দিন’ উপন্যাসে কয়েকজন দেশপ্রেমিক কিশোরের স্বাধীনতার স্পৃহা এবং স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের ২২ শে ফেব্রুয়ারিত ছয়জন কিশোর ‘ভয়াল ছয়’ নামে একটি দল গঠন করে; যাদের উদ্দেশ্য পায়ে হেঁটে পৃথিবী ভ্রমণ। কিন্তু তখন বাঙালি জাতি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত, ঢাকা শহর তখন মিছিলের নগর। বাঙালি স্বাধীনতা আন্দোলনে এইসব কিশোরও গুরুজনের আদেশ উপেক্ষা করে যোগ দিল। কিশোর খোকন মে মাসের শেষ দিকে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়ার জন্য বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। আর চৌদ্দ বছরের সাজ্জাদ মুক্তিযুদ্ধে নিহত হয়। মূলত ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল সব বয়সের বাঙালি। ঔপন্যাসিকের ভাষায় “বৃদ্ধরা যেমন এগিয়ে এলো, তেমনি এলো নিতান্ত অল্প বয়সী কিশোরেরা। তাদের সবচে বড় অস্ত্র মাতৃভূমির জন্য ভালোবাসা …এদের স্বপ্ন একটিই অন্ধকার রজনী শেষে এরা আনবে একটি সূর্যের দিন।”
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরো অনেকেই উপন্যাস রচনা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসগুলো হচ্ছে- শওকত আলীর ‘যাঁতা’, রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারি সূর্য’, আল মাহমুদের ‘উপমহাদেশ’, ‘কাবিলের বোন’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষরে’, হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘তিনি’, আমজাদ হোসেনের ‘তাবেলায় অসময়’, ‘যুদ্ধযাত্রার রাত্রি’, আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’, ‘অলাত চক্র’, ‘একজন আমি কেনানের উত্থান-পতন’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘কালো ঘোড়া’, ‘ঘেরাও’, ‘মহাযুদ্ধ’, মইনুল আহসান সাহেবের ‘পাথর সময়’, ‘কবেজ লেঠেল’, মঞ্জ সরকারের ‘তামস’, মাহবুব সাদিকের ‘উত্তাল’, মাহবুব হাসানের ‘অর্ধসত্য’, আবিদ আজাদের ‘এই বেলা’ ইত্যাদি। প্রচুর উপন্যাস রচিত হয়েছে যেগুলোতে কোনো না কোনো-ভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট তথা একটি জাতি উত্থান, রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বিজয়, স্বাধীনতা ইত্যাদির বিস্তারিত চিত্র খুব কম উপন্যাসে পাওয়ায় অধিকাংশ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের খন্ড খন্ড চিত্র পাওয়া যায়, সম্মুখ যুদ্ধের বর্ণনা তেমন পাওয়া যায় না। মূলত শিল্পোত্তীর্ণ-কালজয়ী- উপন্যাসের সংখ্যা বেশি নয়। তবে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে উপন্যাস রচনা শেষ হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের মতো বিশাল প্রেক্ষাপট নিয়ে আমরা মহা-উপন্যাসের আকাক্সক্ষা করতে পারি; যা হয়ে উঠতে পারে বাঙালি জাতির মহাকাব্য।