বৃন্দ আবৃত্তিকে গবেষকরা আধুনিক চিন্তা বললেও প্রকৃত অর্থে বৃন্দ আবৃত্তি অনেক পুরাতন ও আকর্ষণীয় প্রযোজনা; মনুসংহিতা পাঠে বা গ্রিক সাহিত্যের কোরাস চরিত্রে আমরা সেটা দেখতে পাই। তবে বর্তমান সময়ে বৃন্দ আবৃত্তিতে নতুন নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। মানুষ নানাভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে আবৃত্তির এ ধারা নিয়ে। সব পরীক্ষা যে সফল হচ্ছে তা হয়তো বলা যাবে না। কিন্তু প্রত্যেকটি পরীক্ষায় আবৃত্তি শিল্প যে নতুন কিছু পাচ্ছে সেটা দৃঢ়কণ্ঠে বলা যাবে। একক আবৃত্তির চেয়ে বৃন্দ আবৃত্তি অনেক জটিল ও দুরূহ শিল্পকর্ম। এ শিল্পকর্মে যদি সফলতা পাওয়া যায় তবে তা দীর্ঘদিন ধরে শ্রোতার অন্তরে বিরাজমান থাকে এবং এমন একটি প্রযোজনা উপভোগ করতে পারায় শ্রোতা নিজেকে ধন্য মনে করে। সত্তরের দশকের শেষের দিকে বাংলাদেশে বৃন্দ আবৃত্তির চর্চা প্রসার লাভ করে। মূলত বাংলাদেশে আবৃত্তিচর্চা হচ্ছে সংগঠনকে ভিত্তি করে। আর সংগঠনগুলো নিজস্ব চিন্তার আলোকে সৃষ্টি করছে নব নব বৃন্দ প্রযোজনা। বর্তমানে বৃন্দ আবৃত্তি শ্রোতা এবং শিল্পীর কাছে জনপ্রিয়তার শৈল চূড়ায় অবস্থান করছে। আবৃত্তি অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলেই শ্রোতা অপেক্ষা করতে থাকে কখন বৃন্দ প্রযোজনা শুরু হবে। বৃন্দ আবৃত্তিই এখন আবৃত্তি অনুষ্ঠানে প্রাণ হয়ে উঠেছে। এই বৃন্দ আবৃত্তি নির্মাণ সহজ নয় বিধায় আমরা এর নির্মাণ কৌশল ও মঞ্চ পরিবেশনা নিয়ে আলোচনা করবো।
বৃন্দ আবৃত্তি কয়েকজন মিলে করতে হয়। শুধু পুরুষ কণ্ঠেও করা যায় আবার শুধু নারী কণ্ঠেও করা যায়। তবে নারী-পুরুষের সমন্বয়েই বেশি ভালো লাগে। এ সমন্বয় সমসংখ্যক হলে ভালো হয়। অর্থাৎ যতজন নারী তত জন পুরুষ। এতে দর্শক অধিকমাত্রায় বৈচিত্র্য পান। আবার ভরাট ও চিকন সুরের মিশ্রণে নতুন ধ্বনিকলাও তৈরি হয়। কখনো একক নারী কণ্ঠ আবার কখনো একক পুরুষ কণ্ঠ, কখনোবা নারী-পুরুষ কণ্ঠের যৌথ উচ্চারণ বৃন্দ প্রযোজনাকে অর্থবহ ও আকর্ষণীয় করে তোলে। মাঝে মাঝে হামিং বা বাঁশির সুর কিংবা তবলার তাল বা সাঙ্গীতিক রুনুঝুনু ঝংকার বৃন্দ আবৃত্তির মধ্যে নতুন মূর্ছনা তৈরি করতে পারে। তবে এসবের আগে হলো বৃন্দ প্রযোজনা নির্মাণ।
বৃন্দ প্রযোজনায় সামগ্রিকতা দরকার। জাতীয় বা সম্মিলিত কোনো বিষয় নিয়ে লেখা কবিতা দরকার। কবির একান্ত ব্যক্তিগত ভাবোচ্ছ্বাস যেসব কবিতায় ফুটে উঠেছে সেগুলোর বৃন্দ প্রযোজনা করা যায় না। তবে কবির একান্ত ভাবোচ্ছ্বাসের অনেকগুলো কবিতার গুরুত্বপূর্ণ পঙক্তিগুলোকে কেটে কেটে একত্রিত করে নানা কণ্ঠে কবির অন্তরানন্দ বা অন্তর্বেদনাকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব। এই কাজ করতে হলে প্রচুর শ্রম ও কণ্ঠশীলন দরকার। এমনিতেই বৃন্দ আবৃত্তিতে একক আবৃত্তির চেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। তার ওপর কবির একান্ত ভাবোচ্ছ্বাসকে মিলিতভাবে বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে ধারণ করে কবির মনোলোককে দর্শকের কাছে বাঙময় করে তোলা হিমালয় চূড়া আরোহণের চেয়েও কঠিন। যারা যথার্থ শিল্পী, যারা আবৃত্তিতে নিজের অস্তিত্বকে জড়িয়ে নিয়েছেন। তাদের পক্ষে এটা সম্ভব। তবে সম্মিলিত ভাব ফুটে ওঠে এমন কবিতা নির্বাচন করাই ভালো। যেমন- নজরুলের ‘ছাত্রদলের গান’ বা ‘চল চল চল’ কিংবা সিকান্দার আবু জাফরের ‘সংগ্রাম চলবেই’ বা রবীন্দ্রনাথের ‘বোঝাপড়া’। এ ধরনের কবিতাগুলো বৃন্দ প্রযোজনার জন্য অধিকতর উপযোগী। নজরুলের কবিতাগুলো বৃন্দ প্রযোজনার জন্য আদর্শ। নজরুলের ‘সিন্ধু’ বা জীবনানন্দের ‘হাওয়ার রাত’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘আমি’র মতো কবিতাগুলো বৃন্দ আবৃত্তির জন্য নির্বাচন না করাই ভালো।
বৃন্দ আবৃত্তির জন্য প্রথমে একটা বিষয় নির্বাচন করতে হয়। সময়ের চলমান ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে মিল রেখে বিষয় নির্বাচন করা যেতে পারে। অথবা ধ্রুপদী কোনো বিষয় হলেও সমস্যা নেই। বিষয়ের জন্য কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে সময়োপযোগী হলে সহজে দর্শকের মনে সাড়া জাগানো যায়। বিষয় নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো একজন কবিকে সে বিষয়ে কবিতা রচনার দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। অথবা একজন আবৃত্তিশিল্পীকে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে ঐ বিষয় সংক্রান্ত যত কবিতা আছে সবগুলো একত্রিত করার। মোটামুটি সব কবিতা একত্রিত করার পর ওখান থেকে প্রয়োজনীয় পঙক্তিগুলো আলাদা আলাদাভাবে কেটে নিতে হবে। তারপর ভাবের সমন্বয় সাধন করে পঙক্তিগুলোকে সাজাতে হবে। ভাব অক্ষুণœ রাখার জন্য কবিতার ফাঁকে ফাঁকে গান আসতে পারে, হামিং দেয়া যেতে পারে, তবলার তাল দেয়া যেতে পারে, বাঁশির সুরলহরি দেয়া যেতে পারে কিংবা প্রয়োজন হতে পারে এমন যে কোনো বাদ্যযন্ত্রের সুর বা ধ্বনি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রয়োজনে গুলির শব্দ বা ঝড়ের শোঁ শোঁ ধ্বনি ব্যবহার করলেও ক্ষতি নেই। আবার ভাবের বিহার অব্যাহত রাখার জন্য গদ্যের পঙক্তিও ব্যবহার করা যেতে পারে। এসব ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজন অনুসারে। প্রয়োজন না থাকলে এসব ব্যবহারের কোনো দরকার নেই। তবে মনে রাখতে হবে এসব ব্যবহার করা যায়, এমন ধরনের প্রযোজনা নির্মাণ করাই ভালো। কারণ, এতে দর্শক একই সঙ্গে অনেক বিষয়ের যেমন আস্বাদ পায়, তেমনি প্রযোজনাটিও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
বর্তমানে বৃন্দ প্রযোজনার জন্য মঞ্চে আলোর নানামাত্রিক ব্যবহারও করা হচ্ছে। আবার মঞ্চকে সাজানো হচ্ছে প্রযোজনার আলোকে। এসব দোষের নয়। মনে রাখতে হবে, এসব করতে গিয়ে যেন আবৃত্তি হারিয়ে না যায়। সব কিছু মিলিয়ে প্রযোজনাকে মৌলিক আবৃত্তি করে গড়ে তুলতে হবে। কবিতাগুলো নির্বাচনের সময় ছন্দ বৈচিত্র্য রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। একজন সচেতন আবৃত্তিশিল্পী অবশ্যই তা করবেন। কারণ, সব কবিতা একই ছন্দের হলে দর্শকের কাছে একঘেয়েমি লাগতে পারে। আবার প্রযোজনার ফাঁকে ফাঁকে দর্শকের কিছু বিশ্রামেরও প্রয়োজন আছে। তাই মাত্রাবৃত্ত বা অক্ষরবৃত্ত ছন্দের মধ্যে একই ভাবের স্বরবৃত্ত ছন্দের কিছু পঙক্তি জুড়ে দিলে দর্শক কিছুটা ভিন্ন স্বাদ পেতে পারেন। সঙ্গে একটু নিঃশ্বাস নেয়ার বা হাঁফ ছাড়ার সুযোগও পাবে। বৃন্দ নির্মাতাকে দর্শকের অবস্থার কথাও চিন্তা করতে হবে।
যারা বৃন্দ প্রযোজনায় অংশগ্রহণ করবে তাদের সবার কণ্ঠের মান মোটামুটি একই হতে হবে। অর্থাৎ সবাইকে ভালো মানের শিল্পী হতে হবে। আমাদের সংগঠনগুলোতে মাঝে মাঝে সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে যারা একক কবিতা আবৃত্তির জন্য উপযোগী নয় তাদেরকে বৃন্দের মাঝখানে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এতে বৃন্দের মান বাড়ে না বরং ক্ষুণ্ণই হয়। এ কাজগুলো সংগঠন করে ওসব লোকদের সংগঠনে ধরে রাখার জন্য। কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে এতে বৃন্দ প্রযোজনার মান যেমন কমে যাবে তেমনি দর্শকপ্রিয়তাও হারাবে। এসব কারণে আবৃত্তির একটি জনপ্রিয় ধারা ম্রিয়মাণ হয়ে যেতে পারে। কারণ যারা দুর্বল তারা সবলদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক পঙক্তির পর অপর পঙক্তি ধরতে পারে না। আবার যে পঙক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে আবৃত্তি করার, সেগুলো সবার সম্মিলিতভাবে আবৃত্তি করায়, দুর্বলরা সেগুলো সবার সঙ্গে তাল ধরে রাখতে পারে না, ফলে তাদের কণ্ঠ অন্যদের কণ্ঠ থেকে আলাদা হয়ে যায় বা আগে পিছে হয়ে যায়। এতে আবৃত্তির মান যেমন নিম্ন হয় তেমনি দর্শকও বিরক্ত হয়। দর্শক বুঝতে পারে এরা যথাযথ চর্চা না করেই মঞ্চে এসেছে। এই কারণে পরবর্তীতে ঐ সংগঠনের অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে দর্শকরা বিরত থাকে। আর দুর্বলদের সব সময় মঞ্চভীতি থাকে। যার কারণে রিহার্সেলের সময় তারা সবার কণ্ঠের সঙ্গে কণ্ঠ মিলাতে পারলেও মঞ্চে গিয়ে ওলট-পালট করে ফেলে। তাই বৃন্দ প্রযোজনায় যারা অংশগ্রহণ করবে তাদের কণ্ঠের মান সমপর্যায়ে থাকা জরুরি।
বৃন্দ প্রযোজনায় একটা ভাবের পর অন্য ভাব ধরতে হয়। অন্য ভাব ধরার সময়টুকু আগেই ঠিক করে নিতে হয়। সারাক্ষণ মঞ্চে সজাগ থাকতে হয়। মন একটু এদিক সেদিক হলেই বড় ধরনের ভুল হয়ে যেতে পারে।
বৃন্দ আবৃত্তির জন্য যেমন সুসংবদ্ধ দল দরকার। তার সঙ্গে দরকার যোগ্য দলনেতার। দলনেতার অভিজ্ঞতার সারবত্তা থেকে তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে দলকে ইঙ্গিত প্রদান করবেন। তিনি মহড়া পরিচালনা করবেন। মহড়ার সময় সবার ভুলগুলো সংশোধন করে দিবেন এবং সবাইকে ঐক্যবদ্ধ রাখবেন। তিনি মহড়ার নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করবেন। বৃন্দ প্রযোজনাটি সবাইকে মুখস্থ করাবেন। বৃন্দ প্রযোজনার পরতে পরতে লুক্কায়িত বোধের ফল্গুধারা সবাইকে অনুধাবন করাবেন। বিষয়টির প্রাসঙ্গিকতা দলের সামনে পরিষ্কার করে উপস্থাপন করবেন। প্রযোজনার প্রতিটি পঙক্তি এবং প্রতিটি স্তবকের ব্যাখ্যা দলের সামনে প্রদান করবেন। কোন জায়গায় কেন স্বর নিচে নামাবেন বা খাদে চড়াবেন তার ব্যাখ্যাও প্রদান করবেন। মাইক্রোফোনের ব্যবহার সম্পর্কে নিজে ওয়াকিবহাল থাকবেন এবং দলকে সচেতন করে তুলবেন। দলের সঙ্গে আলোচনা করে মঞ্চায়নের সময় নিজেদের পোশাক নির্বাচন করবেন। দলের সকল সদস্যকে তাদের গুরুত্ব সম্পর্কে বোঝাবেন। দলকে আনন্দের মধ্যে রাখবেন। কারো জড়তা থাকলে দূর করবেন। মঞ্চভয় অতিক্রম করে ওঠার যোগ্য করে তুলবেন। দলকে সাহস জোগাবেন। বৃন্দ আবৃত্তি যেহেতু একটি সামগ্রিক শিল্প তাই একটি দলকে শৃঙ্খলার মধ্যে রেখে কবিতাকে অর্থময় ধ্বনি নির্মাণে উপস্থাপন করা নিশ্চিত করবেন দলনেতাই। এ জন্য দলনেতাকে তার নিজস্বতার ওপর যৌক্তিক ও অবিচল থাকতে হবে।
বর্তমান সময়ে কবিতায় আবহসঙ্গীতের বেশ প্রচলন শুরু হয়েছে। সমগ্র বৃন্দব্যাপী এই সঙ্গীত চলতে থাকে। এজন্য কমপক্ষে দশ দিন আগ থেকে আবহ সঙ্গীতের সঙ্গে আবৃত্তি করে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে। তাই এখানে সময়ানুবর্তিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে পঙক্তির বা স্তবকের সময়ে যে আবহ যাওয়ার কথা তার একটু বেশ কম হলেই বৃন্দ আবৃত্তির সৌকর্য নষ্ট হবে। নাটকের মতো স্থান, কাল ঘটনার ঐক্য বৃন্দ আবৃত্তিতেও মেনে চলতে হয়। আবহ সঙ্গীত সেট করার সময় মনে রাখতে হবে আবহ সঙ্গীতের আওয়াজ যেন আবৃত্তির কণ্ঠের চেয়ে জোরালো না হয়। আবহ যেন বেশি প্রাধান্য না পায়। আবহ সঙ্গীত মঞ্চের পেছন থেকে যেমন দেয়া যায় তেমনি সরাসরিও দেয়া যায়। সরাসরি আবহ সঙ্গীত দিলেও কয়েকদিন আগ থেকেই যারা যন্ত্র বাজাবেন তাদের সঙ্গে মহড়ায় অংশগ্রহণ করতে হয়। বৃন্দ আবৃত্তি যেহেতু একটা নির্দিষ্ট ইস্যু বা বিষয়কেন্দ্রিক তাই বিষয়টি পরিস্ফুট করার দিকেই বেশি নজর দিতে হয়। মূলত সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে বৃন্দ আবৃত্তির সূচনা হলেও এখন তা আর নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কালের পরম্পরায় এখন বৃন্দ আবৃত্তিও একটি স্বতন্ত্র শিল্পধারা হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
বৃন্দ প্রযোজনার একটি নমুনা:
একক (নারী)
নমঃ নমঃ নমঃ/ বাংলাদেশ মম /
চির-মনোরম/ চির-মধুর /
বুকে নিরবধি/ বহে শত নদী /
চরণে জলধির/ বাজে নূপুর। /
কোরাস (পুরুষ)
গ্রীষ্মে নাচে বামা/ কাল-বোশেখী ঝড়ে /
সহসা বরষাতে/ কাঁদিয়া ভেঙে পড়ে /
শরতে হেসে চলে/ শেফালিকা তলে/
গাহিয়া আগমনী/ গীতি বিধুর /
কোরাস (নারী)
হরিত অঞ্চল/ হেমন্তে দুলায়ে /
ফেরে সে মাঠে মঠে/ শিশির-ভেজা পায়ে /
শীতের অলস বেলা/ পাতা ঝরার খেলা /
ফাগুনে পরে সাজ/ ফুল বধূর /
কোরাস (নারী+পুরুষ)
এই দেশের মাটি/ জল ও ফুলে ফলে /
যে রস যে সুধা / নাহি ভূ-মণ্ডলে /
এই মায়ের বুকে/ হেসে খেলে সুখে /
ঘুমাব এই বুকে/ স্বপ্নাতুর। /
নমঃ নমঃ নমঃ/ বাংলাদেশ মম /
চির-মনোরম/ চির-মধুর। /
দ্বৈত/{(নারী কণ্ঠে গান পুরুষ কণ্ঠে আবৃত্তি)
(আবৃত্তি গানের দুই মাত্রা পরে ধরতে হবে)}
এ দেশ আমার/ মাটি আমার /
লক্ষ কোটি স্বপ্ন আমার/ সবুজ আমার শ্যামল আমার /
জন্মভূমি প্রিয় বাংলা আমার /
কোরাস পুরুষ+নারী (একক)
একদিন শোনো /
ছবির মতো এই দেশটাতে/ দানবেরা দেয় হানা /
পুড়ে ছারখার/ মাঠের শস্য/ মানুষের আস্তানা /
বহে নিরবধি/ রক্তের নদী/ শকুনেরা মেলে ডানা /
এই দেশটাতে/ একদিন শোনো/ দানবেরা দেয় হানা /
গান-কোরাস (নারী+পুরুষ)
পূর্ব দিগন্তে/ সূর্য উঠেছে /
রক্ত লাল/ রক্ত লাল/ রক্ত লাল /
জোয়ার এসেছে/ জনসমুদ্রে /
রক্ত লাল/ রক্ত লাল/ রক্ত লাল।
একক (পুরুষ)
গানে আর ভিন্ন কি সুরের ব্যঞ্জনা /
যখন হানাদার বদ সঙ্গীতে/ ঘৃণার প্রবল মন্ত্রে জাগ্রত /
স্বদেশের তরুণ হাতে /
নিত্য বেজেছে অবিরাম/
মেশিনগান, মর্টার, গ্রেনেড /
কোরাস (নারী)
আমার বৃদ্ধ পিতার শরীরে এখন /
পশুদের প্রহারের চিহ্ন /
কোরাস (পুরুষ)
আমার বৃদ্ধ মাতার কণ্ঠে নেই/ আর্তহাহাকার /
নেই অভিসস্পাত /
কেবল/ দুর্মর ঘৃণার আগুন। /
তাঁর চোখে নেই অশ্রু/ কেবল অনল জ্বালা /
দু’চোখে তার/ শত্রু হননের আহ্বান। /
একক (নারী)
এ চোখে ঘুম আসে না/ সারারাত আমার ঘুম আসে না /
তন্দ্রার ভেতরে আমি শুনি/ ধর্ষিতার করুণ চিৎকার /
নদীতে পানার মতো ভেসে থাকা/ মানুষের পচা লাশ /
মুণ্ডুহীন বালিকার/ কুকুরে খাওয়া বীভৎস শরীর /
ভেসে ওঠে চোখের ভেতরে/ আমি ঘুমুতে পারি না। /
আমি ঘুমুতে পারি না…/
কোরাস (নারী+পুরুষ)
রক্তের কাফনে মোড়া/ কুকুরে খেয়েছে যারে/
শকুনে খেয়েছে যারে /
সে আমার ভাই,/ সে আমার মা/ সে আমার প্রিয়তম পিতা। /
বাতাসে লাশের গন্ধ ভাসে /
মাটিতে লেগে আছে রক্তের দাগ /
এই রক্তমাখা মাটির ললাট ছুঁয়ে/ একদিন যারা বুক বেঁধেছিল /
জীর্ণ জীবনের পুঁজে/ তারা খুঁজে নেয়/ নিষিদ্ধ আঁধার /
আজ তারা/ আলোহীন খাঁচা ভালোবেসে/
জেগে থাকে রাত্রির গুহায়। /
এ যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায়/ আড়ষ্ট কুমারি জননী /
স্বাধীনতা/ এ কি তবে নষ্ট জন্ম? /
এ কি তবে/ পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল? /
একক+একক {(পুরুষ কণ্ঠে গান নারী কণ্ঠে আবৃত্তি),
(আবৃত্তি গানের দুই মাত্রা পরপর ধরতে হবে)}
মায়ের চোখে জল/ ছেলে তার একমাত্র সম্বল /
কাঁদছে ছোট বোন/ সেও করছি না সমর্থন /
বাবা বললেন/ যাবি নাকি খোকা? /
সব প্রশ্নের/ উত্তর হলো/ আসি…। /
আমি যুদ্ধে যাবো মা,/ যুদ্ধে যাবো…/
আমি দেশকে ভালোবাসি। /
কোরাস (পুরুষ)
তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে স্বাধীনতা/
তোমাকে পাওয়ার জন্য /
আর কতবার ভাসতে হবে/ রক্ত গঙ্গায়? /
আর কতবার দেখতে হবে/ খা-বদাহন? /
কোরাস (নারী)
তুমি আসবে বলে/ হে স্বাধীনতা /
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো।/ রিকয়েললেস রাইফেল /
আর মেশিনগান/ খই ফোটালো যত্রতত্র। /
তুমি আসবে বলে/ ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম। /
তুমি আসবে বলে,/ হে স্বাধীনতা /
অবুঝ শিশু/ হামাগুড়ি দিলো/ পিতা-মাতার/ লাশের ওপর। /
একক (পুরুষ)
স্বাধীনতা,/ তোমার জন্য /
মোল্লা বাড়ির এক বিধবা দাঁড়িয়ে আছে /
নড়বড়ে খুঁটি ধরে/ দগ্ধ ঘরের। /
একক (নারী)
স্বাধীনতা,/ তোমার জন্য /
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী/ শূন্য থালা হাতে /
বসে আছে পথের ধরে। /
তোমার জন্য /
সগীর আলী/ শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক /
কেষ্ট দাস/ জেলেপাড়ার সবচেয়ে সাহসী লোকটা /
মতলব মিয়া/ মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি /
গাজী গাজী বলে/ যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে /
রুস্তম শেখ,/ ঢাকার রিকশাওয়ালা/ যার ফুসফুস /
এখন পোকার দখলে /
কোরাস (নারী+পুরুষ)
আর রাইফেল কাঁধে/ বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো /
সেই তেজি তরুণ/ যার পদভারে /
একটি নতুন পৃথিবীর/ জন্ম হতে চলেছে/
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে/ তোমার জন্য/ হে স্বাধীনতা/
পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে/
জ্বলন্ত ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে/
নতুন নিশান উড়িয়ে,/ দামামা বাজিয়ে দিগি¦দিক /
এই বাংলায়/
তোমাকে আসতেই হবে/ হে স্বাধীনতা।