মিতালীদের গ্রামটা হঠাৎ করেই অন্ধকারের ছেঁড়া চাদরে মুড়ি দিলো। আর এই অন্ধকারের ছিদ্র দিয়ে হ্যারিকেনের আলো টিম টিম করতে থাকে। নটাও তখন বাজেনি, সারা গাঁ নিঝুম, নিস্তব্ধ। এদিকে ওদিকে দু’চারজন চাতালে বসে বিড়ি খেতে খেতে গল্প করছে। বিড়ির আগুন ঠিক যেন জোনাকির আলোর মতো জ্বলতে থাকে।
কুঁড়েঘরের সামনে উঠোনের কোনায় হাশেম বৈরাগী একতারাটা নিয়ে লালন শাহের গান ধরেছে। হাশেমের গলা ভয়ঙ্কর। কিন্তু লালনের গান বলে পাড়াপড়শি আর আপত্তি তুলে না। গাঁয়ের লোকেরা রাতে কুকুরের ‘ঘেউ ঘেউ আর তার সঙ্গে এই গান শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। ভাগ্নে দুলাল রাতের খাওয়া সেরে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে বাইরে বেরিয়ে আসে। কি মামা, উঠোনে মাদুর বিছিয়ে হ্যারিকেনটা কি রেখে দেবো?” এই বলে সে হাশেম বৈরাগীর গান গাওয়ায় বাদ সাধে। বৈরাগী একতারাটা নামিয়ে রেখে রেগেমেগে বলে ওঠে ‘রেখে দে-না! এক কথা রোজ জিজ্ঞেস করার কি আছে? আসলে ব্যাপারটা কি জানো, মামা! থানায় নতুন দারোগা আসায়, গত দু’দিন ধরে পুলিশের কড়াকড়ি বাড় বেড়েছে। তাই জিজ্ঞেস করছিলাম।’ আরে দুলাল, আমাকে পুলিশের কথা কি শোনাচ্ছিস। আমি কি কিছু জানি না। সাতবার জেল ঘুরে এসেছি। এরা এরকমই মিছিমিছি গুজব রটায় আর লোকেদের ভয় দেখায়। ব্যাপারটা এছাড়া আর কিছু নয়।
মামার সব কীর্তিই দুলাল জানে। সময় অসময় বৈরাগী নিজের আত্মকাহিনী বেশ গর্বের সাথে দুলালকে শোনায়। বৈরাগী লিখতে জানে না তাই, নয়তো নিজেই আত্মকাহিনী লিখে ফেলতো।
আত্মবিশ্বাস আর অহঙ্কার হাশেমের জন্মগত। ছোটবেলা থেকেই শরীরচর্চা করতো। তাই যৌবনে পা দেয়ার আগেই তার দেহ বেশ হৃষ্টপুষ্ট, মাংশপেশিগুলো নিটোল, যেন ঠিক ঘোড়ার মতো। দিন রাত শরীরচর্চা নিয়েই মেতে থাকতো। কোনোদিনই পরিশ্রমের কাজ করার কথা চিন্তাও করেনি। যে মেয়েটাকে ও বিয়ে করতে চাইলো, বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে তাকেই বিয়ে করলো। শ্বশুর বাড়িকেই নিজের ঘর করে নিল। শ্বশুর-শাশুড়ির অনেক বলা-কওয়াতে শেষে নাচার হয়ে, কখনও তাস খেলে কিংবা কখনও পকেট মেরে সে বাড়িতে দু’চার পয়সা রোজগার করে নিয়ে আসতো। একবার ধরা পড়ায় ছ’মাস জেল খাটে। জেল খেটে বাড়ি ফেরার আগেই হাশেমের বউ এক কন্যার জন্ম দিয়ে মারা যায়। মেয়ের খাওয়া পরার টাকা সে চুরি করে জোগাড় করতো। এইভাবে নানা এলাকা ঘুরে জেল খেটে পনেরোটা বছর সে বাড়ির বাইরে কাটিয়ে দেয়। পনেরো বছর পর বাড়ি ফিরে দেখে শ্বশুর-শাশুড়ি মারা গেছে। মেয়ের দেখা-শোনার পুরো দায়িত্ব এখন তার। মেয়ে বড় হয়েছে, একা ঘরে রেখে বাইরে যাওয়াও বিপদ। গাঁয়ে তাই একটা কুঁড়ে বানিয়ে সে বাস করতে লাগলো। এখন বয়স হয়েছে, শরীরও ভেঙ্গে পড়েছে। অতীতের উপর অনেক বিতৃষ্ণা, তাই নতুনভাবে জীবন শুরু করে। গেরুয়া পরে বৈরাগী হলো। একতারাটা এখন তার একমাত্র সঙ্গী। বৈরাগী এখন গানে দিন-রাত ব্যস্ত! কিন্তু এতে পেট চলবে কি করে? দুলাল আছে, তবে সেও এক নম্বরের কুঁড়ে। একটা টাকা রোজগার করার মুরোদ নেই। বাড়ির উঠোনে বসে যারা তাস পিটোয় তাদের জন্য মাদুর আর আলোর ব্যবস্থা করে দিয়ে সামান্য কিছু ভাড়া আদায় করে। মাদুর পাতা, আলো জ্বালানো আর বাইরে পুলিশ আসতে দেখলে ভেতরে খবর পাঠানো এই হলো দুলালের ডিউটি। খবর পেলেই বৈরাগী আলোটা নিভিয়ে দেয়। আর সবাই যে যার বাড়ির পথ ধরে ।
দুলাল একেবারে মামার নকল। বাঁধা বলিষ্ঠ শরীর, কোঁকড়ান চুলে তাকে বেশ সুন্দর দেখায়। মামার চেয়ে বেশি সমঝদার লেখাপড়াও জানে। শুধু যা কোমর বেঁধে কাজ করতে পারে না। ভাগ্নের ওপর তাই রাগ হয় বৈরাগীর। বৈরাগীর মেয়ে মিতালী ঘর থেকে ছিলিম আর তামাক নিয়ে আসে। বৈরাগী ছিলিম সেজে আগুন লাগাতে লাগাতে বলে, “মা! আজ তোর মামার চিঠি এসেছে। লিখেছে ওর ছেলের একটা চাকরি হয়েছে কোর্টে পিওনের। মিতালী দুলালের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। মিতালী হাসছে দেখে দুলালের সারাদেহে পুলক জাগে। মিতালীর রূপের আলো অন্ধকারেও জ্বলতে থাকে। তার অপরূপ রূপের মায়ায় পাড়া-পড়শি সবাই মুগ্ধ। মিতালীর হাসির কারণ শুধু দুলালই জানে। মিতালী দুলালকে দিয়ে চিঠিটা পড়িয়ে নিয়েছে। মামার ইচ্ছে মিতালীকে ছেলের বউ করে ঘরে নিয়ে আসা। বৈরাগীরও তাই ইচ্ছে। একটু যা মুশকিল। ওর সঙ্গে তোর বিয়ে হয়ে গেলে আমি একলা হয়ে যাবো। তা না হলে আমাকেও তোর সঙ্গে ওখানে যেতে হবে। বৈরাগীর মনে এই সব তোলপাড় হতে থাকে। আর সত্যি বলতে কি বৈরাগী মেয়েকে ছেড়ে এক মুহূর্তও থাকতে পারে না। মেয়েকে ও বড় ভালবাসে। “ঠিক আছে, তাই হবে। এতো ভালো ঘর পরে আর পাওয়া যাবে না। এখানকার বাঁধন ছিঁড়ে ওখানেই গিয়ে থাকবো।’ বৈরাগী মনস্থির করে ফেলে।
‘থাক-না বাবা, এতো তাড়াই বা কিসের?’ মিতালী বলে। তাড়া করবো না কেন মা?
‘আমি ওকে বিয়ে করবো না বাবা! একেবারে কসাই-এর প্রাণ, আছে মন প্রাণ, না আছে দয়ামায়া।
‘তুই কি বলছিস মা! প্রতি মাসে সে অনেক টাকা রোজগার করে। মাইনে বাদে উপরিও আছে। সৎ আর ভালো লোক এক টাকাও রোজগার করতে পারে না মিতালী। মন বস্তুটা আমার মত বৈরাগীর থাকে, যে রোজগার করে তার নয়। কিন্তু মা, এ সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। তাছাড়া আমি কথাও দিয়েছি। মেয়ে এখন বড় হয়েছে। কিন্তু বৈরাগী ভাবে সে এখনও তেমনি ছোট। বৈরাগী মেয়ের কথা ধর্তব্যের মধ্যে নেয়। নয়। ভালো ঘরে পড়লে ওর জীবনটা সুখে কাটবে, বৈরাগীরও আর রোজগারের চিন্তা করতে হবে না। বাকি দিনকটা সৃষ্টিকর্তার নাম করতে করতে কাটিয়ে দেবে। মিতালী বাপের মনের ভাব বুঝতে পারে। তাই আর কিছু বলে না। দুলাল হাশেমকে উঠোনের বাইরে ডেকে আনে। উঠোনের কোনায় তখন জনাদশেক লোক মাদুর বিছিয়ে বসার আয়োজনে ব্যস্ত। এক কোণে হ্যারিকেন জ্বলছে। একজন তাস বাঁটায় ব্যস্ত। বৈরাগী লোকগুলোর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। “কি হাশেম, হ্যারিকেনটা টিমটিম করছে কেন? তেল নেই বুঝি? ‘তেল থাকবে না কেন? আজই তো ত্রিশ টাকার তেল কিনে ওটায় ঢালা হয়েছে। হাওয়ার জন্য এই রকম হচ্ছে। বৃষ্টিও হতে পারে। তাড়াতাড়ি খেলা শেষ করলে সবার জন্যে ভাল হয়। ‘বৃষ্টি এলেই বা কি? খেলার কোনো অসুবিধে হবে না। বরঞ্চ পুলিশি হয়রানি থেকে বাঁচা যাবে।
এবার যে-যার গুরুর নাম করে খেলাটা শুরু করে দাও। ভাগ্য যাদের সহায় সে দলই শেষ হাসি হাসবে। তবে এক বাজি খেলা শেষ হলেই যে দল জিতবে তারা আমাকে শতকরা বিশ টাকা হারে ভাড়া দিবে। সবাই যে যার ভাড়া দিয়ে যাবে ভেবে কাল আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, গতকাল আমার অনেক টাকা লোকসান হয়েছে। আহা, বেচারার লোকসান হয়ে গেছে? হাশেম! একবার মাত্র তোমার মুখ থেকে আমরা সত্যি কথা শুনতে চাই। খেলাটা যখন বেশ জমে উঠে তুমি তখন ‘পুলিশ’ ‘পুলিশ’ রব তুলে বাতিটা নিভিয়ে দাও। আর এই হট্টগোলের মাঝে আমাদের টাকাগুলো হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে থাকে। এ রকম করার করেছো সত্যি করে বলো ।
‘বাব-দাদার দিব্যি, এতো নিচ কাজ আমি কখনও করিনি। কে জানে, অন্ধকারে কে কার টাকা মেরে নেয়? আমি বৈরাগী মানুষ। টাকায় আমার কি হবে? ‘ঠিক আছে বৈরাগী! ভাই, তুমি ঠিক বলছো। হাত জোড় করে তাই তোমায় বলছি যে তুমি এখানে থেকো না। যদি চাও তো তোমার ভাগ্নেকে পাঠিয়ে দাও। তুমি বরঞ্চ একতারা বাজাও।’
‘ঠিক আছে। সবাই সৎ হলে কারুরই আর দরকার হয় না। ভাড়ার পয়সা আলাদা রেখে দিও।’
‘ন্যায্য না পাওনা, সেটা তুমি নিয়ে নিও। আমরা না করবো না। কিন্তু খেলার মধ্যে পুলিশের ভয় দেখিয়ে আলো নিভিয়ে পয়সা লুট করলে আগেই বলে দিচ্ছি পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবো।’
একতাসের জুয়াড়ি বৈরাগীকে আগেই সাবধান করে দেয়। খেলা শুরু হয়। শুরু হয়েই বাজি খেলাটা বেশ জমে ওঠে। খেলা দেখতে দেখতে বৈরাগী ওখানেই বসে পড়ে। বাইরের রাস্তায় দুলাল আর মিতালী কথা বলছে।
‘আরে পাগলী! তুই এতো উতলা হয়ে পড়ছিস কেন? দু’দিনের মধ্যেই তোর বাবার রাগ পড়ে যাবে। তারপর আবার এখানেই ফিরে আসবে। মুকবুল দোকানি আমার কথা খুব শোনে। যখন বলবো তখনই কাজ দিয়ে দেবে। আরাম করে থাকবো।’
দুলাল বনে হাশেম বৈরাগী বাইরে এসে দেখে দুলাল মিতালীর সাথে অনেক কথা বলছে। সে দুলালকে বারান্দায় পাঠিয়ে দিয়ে মেয়েকে ভেতরে গিয়ে শুয়ে পড়তে বলে। বৈরাগী মেয়ে মিতালীর বিয়ের কথাই ভাবছিলো। বিয়ের জন্য হাজার বিশেক টাকা যোগাড় করে রেখেছে। গয়নাগাটি বাবদ আলাদা কিছু টাকাও রাখা আছে। বৈরাগীর ইচ্ছে মেয়ের বিয়েটা বেশ ধুমধাম করে দিবে। গ্রামের লোকদের কানাঘুষা শুনেছে কাঙাল বৈরাগী মেয়ের বিয়ে কিভাবে দিবে। কিন্তু বিয়ের জাঁকজমক দেখে সবাই হতভম্ব হয়ে বলবে বৈরাগী কি অদ্ভুত লো; ব্যাপারে কাউকেই সে ত্রুটি ধরার সুযোগ দিবে না।
ছিলিমটা পাশে রেখে বৈরাগী শুয়ে পড়ে। ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখে জামাই ওকে খুব সম্মান করে। মেয়ের কাছে থাকার জন্য অনুরোধ করতে থাকে।
পুলিশের বাঁশির আওয়াজে বৈরাগীর ঘুম ভাঙে। বাজির লোকজনও নেই। দুলাল মিতালীকেও কোথাও খুঁজে পাই না। হঠাৎ মনে পড়ে টাকাগুলো ঠিক জায়গায় আছে কিনা? দেখে নেই। বৈরাগীর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। নিজের মেয়ে তাকে এমনভাবে ঠকালো। আজ জীবনটা সত্যি সত্যিই নরক হয়ে গেল। জীবনের প্রকৃত বাজিতে হেরে বৈরাগী আজ কোনো পথই খুঁজে পায় না।